ছোটগল্পের শিল্পরূপ : বিশ্বজিৎ ঘোষ

প্রচ্ছদ রচনা : ছোটগল্পের শিল্পরূপ

রেনেসাঁস-উত্তরকালে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরম বিকাশের যুগে, আধুনিক মানুষের জীবনে দেখা দেয় বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য এবং সীমাহীন জটিলতা। আধুনিক মানবচৈতন্যের সমুদ্রবিস্তৃতি ও বিভঙ্গতা, বহুভুজ বিসঙ্গতি ও বিপর্যয়,  অন্তর্গূঢ় বেদনা ও উজ্জ্বল আশাবাদএইসব প্রবণতা প্রকাশের অনিবার্য মাধ্যম হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে নতুন শিল্প-আঙ্গিক রূপে ছোটগল্পের আত্মপ্রকাশ। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্স-রাশিয়া-ইংল্যান্ড-আমেরিকায় ছোটগল্পের যে শিল্পিত বিকাশ ঘটেছে, তার প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে, ভারতবর্ষেও। পাশ্চাত্য ছোটগল্পের প্রেরণায় বাংলা সাহিত্যেও এ সময় আত্মপ্রকাশ করে ছোটগল্প। উনিশ শতকের মধ্যপর্ব থেকে বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প-নির্মিতির প্রাথমিক প্রয়াস পরিলক্ষিত হলেও, প্রকৃত অর্থে সার্থক ছোটগল্প রচিত হয় শতাব্দীর শেষ দশকে।

পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের প্রেরণায় উনিশ শতকে বাংলায় সংঘটিত হয় সীমাবদ্ধ নবজাগরণ। নবজাগরণের অনুপ্রেরণায় সৃষ্টি হয় ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যচেতনা, সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে এ সময় ঐতিহাসিকভাবেই ঘটে ব্যক্তির জাগরণ। এই ব্যক্তিবোধের অন্তরগরজ ও অভ্যন্তর প্রেরণা, ব্যক্তির সংকট আর সম্ভাবনা আর সীমাবদ্ধতা উন্মোচনের আকাক্সক্ষায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষলগ্নে বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের আবির্ভাব। অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা অনুপ্রবেশের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষের কাছে সময় হয়ে ওঠে অর্থের সমার্থক। যন্ত্রের সঙ্গে তাল-মিলিয়ে-চলা মানুষের সময় ধারণাকে শ্রদ্ধা জানাতেই আমাদের সাহিত্যে দেখা দিল নতুন সাহিত্য-রূপকল্প ছোটগল্প। আধুনিক মানুষের ক্ষুব্ধ জিজ্ঞাসা আর অর্থচিন্তা ছোটগল্পের আবির্ভাবের পশ্চাতে কীভাবে কাজ করেছে,  সে-সম্পর্কে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিমত স্মরণ করা যায় :

… উনিশ শতকের ছোটগল্পের ক্ষুব্ধ জিজ্ঞাসা-মূলকতার ধর্মটিকে বহুমুখী আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তুর ভিতর দিয়ে ত্রিবিধ-পদ্ধতিতে বুঝতে চেষ্টা করতে হবে : অভিধায়, লক্ষণায় এবং ব্যঞ্জনায়; বুঝতে হবে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির  সম্পর্কে, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সম্পর্কে।… সংক্ষিপ্ত পরিসরএকটিমাত্র ভাবএকটি সংকটের সৃষ্টি করে পাঠককে নগদ বিদায় করাএই স্থুল ব্যবসায়িক প্রয়োজনও ঊনবিংশ শতাব্দীর ছোটগল্প সৃষ্টির অন্যতম মুখ্য কারণ। প্রসঙ্গত বাংলা সাহিত্যে আধুনিক গল্পের প্রবর্তক রবীন্দ্রনাথকেও মনে পড়তে পারে, তিনিও ছোটগল্প লিখতে শুরু করেছিলেন সাপ্তাহিক হিতবাদীর তাগিদেই।

সাহিত্য-রূপকল্প ছোটগল্পের স্বরূপ ও সংজ্ঞার্থ নিয়ে রয়েছে নানা মত, ভিন্নমত। তবে প্রায় সব তাত্ত্বিকই একমত প্রকাশ করেছেন যে, ছোটগল্প রচিত হয় জীবনের কোনো খণ্ডাংশকে অবলম্বন করে। উপন্যাসের মতো ছোটগল্পের পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত নয়ছোটগল্পে শিল্পিত হয় না জীবনের পূর্ণ রূপ। ছোটগল্পে ঔপন্যাসিক ব্যাপ্তির পরিবর্তে থাকে জীবনাভিজ্ঞতার গভীরতা। ছোটগল্পের যথার্থ শিল্পরূপ অনুধাবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী কাব্যের ‘বর্ষাযাপন’ কবিতাটি উপর্যুক্ত সূত্রে অর্থবহ হয়ে ওঠে :

ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা,                ছোটো ছোটো দুঃখকথা

                            নিতান্তই সহজ সরল,

সহস্র বিস্মৃতিরাশি               প্রত্যহ যেতেছে ভাসি

                        তারি দু-চারিটি অশ্রুজল।

নাহি বর্ণনার ছটা                 ঘটনার ঘনঘটা,

               নাহি তত্ত্ব, নাহি উপদেশ।

অন্তরে অতৃপ্তি রবে,           সাঙ্গ করি মনে হবে

               শেষ হয়ে হইল না শেষ।

জগতের শত শত               অসমাপ্ত কথা যত,

            অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,

অজ্ঞাত জীবনগুলা,         অখ্যাত কীর্তির ধুলা,

               কত ভাব, কত ভয় ভুল

রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনা পৃথিবীর সব ছোটগল্প সম্পর্কে হুবহু মিলে যাবেএমন কথা নয়; তবু ছোটগল্পের পরিমিত, প্রতীতি সমগ্রতা, সামান্যের মধ্যে অসামান্যকে ফুটিয়ে তোলা, গভীরতর অনুভূতিময়তাছোটগল্পের এসব বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রনাথের কাব্যাংশে সুনিপুণভাবে প্রকাশিত।

আকৃতি এবং প্রকৃতিউভয় ক্ষেত্রেই ছোটগল্পের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। আকৃতির দিক দিয়ে এটি ছোট হবে, কিন্তু কতটা ছোট ? এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় পঞ্চাশ পৃষ্ঠার ‘নষ্টনীড়’ ছোটগল্প, আবার বনফুলের দেড়-পৃষ্ঠার ‘নিমগাছ’ও ছোটগল্প। এডগার অ্যালান পো আধ-ঘণ্টা থেকে দু’ঘণ্টার মধ্যে পড়ে শেষ করা যায়, এমন গল্পকাহিনিকে ছোটগল্প বলে আখ্যায়িত করেছেন; অন্যদিকে এইচ. জি. ওয়েলস এই শিল্পরূপের জন্য বরাদ্দ করেছেন ১০ থেকে ৫০ মিনিট। ছোটগল্পের আকৃতির বিষয়ে জে. এ. কুডডনের অভিমত এখানে স্মরণ করা যায় :

When it comes to classification this is one of the most elusive forms. It is doubtful, anyway, whether classification is helpful. Certainty there seems to be little point in measuring it. One is confronted with the question : How long (or short) is short ? In athlectic terms, it we take the novella as a `middle-distance’ book/story, then the short story comes into the 100/200 metre class. Nevertheless, there are very long short-stories and very short ones. D. H. Lowrence’s `The Fox’ (1923) is about 30,000 words; Kleist’s ghost story `Das Battelweib von Locarno’ (1810) is only 800 words. In his preface to his Complete Short Stories Somerset Mougham remarks that the shortest item runs to about 1600 words and the longest to about 20,000 words. The vast majority of short stories would fall somewhere the two.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাংশে উদ্ধৃত ‘নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা’ সূত্র ছোটগল্পের আকৃতির হ্রস্বতার পরিচায়ক। ছোটগল্পে থাকে না কোনো শাখা-কাহিনি, এখানে ঘটনার গতি থাকে একমুখী, তাই ছোটগল্পের পরিধি বড় হওয়ার তেমন সুযোগ থাকে না। নানা মত-ভিন্নমত থাকলেও একটা স্বতঃসিদ্ধ কথা এই যে, আকৃতিতে ছোটগল্প হবে ছোট। উপন্যাসের মতো ছোটগল্পে জীবনের পূর্ণরূপ চিত্রিত হয় না, এখানে থাকে খণ্ডাংশের শিল্পায়ন। সংক্ষিপ্তির মধ্য দিয়েই ছোটগল্প দেয় জীবনের পূর্ণতার আভাসপদ্মপাতার শিশির বিন্দুতে যেমন হেসে ওঠে প্রভাতের সম্পূর্ণ সূর্য। তবে আকৃতিতে ছোট হলেই যে সার্থক ছোটগল্প হবেএমন কোনো কথা নেই। এক্ষেত্রে সাহিত্যতাত্ত্বিকরা ছোটগল্পের অভ্যন্তর চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় কবীর চৌধুরীর অভিমত :

…আকৃতিতে ছোট হলেই ছোটগল্প হয় না। জীবনের খণ্ডাংশকে যখন লেখক রসঘন করে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন, সকল রকম বাহুল্য ও অতিকথন বর্জন করে অনাবশ্যক চরিত্র ও ঘটনার ভিড় পরিহার করে লেখক যখন তার রচনাকে একটা সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনায় ভূষিত করেন তখনই সার্থক ছোটগল্পের সৃষ্টি হয়।

ছোটগল্পের আরম্ভ এবং সমাপ্তিতে থাকে নাটকীয় ব্যঞ্জনা। কীভাবে আরম্ভ হবে, সমাপ্তিই-বা ঘটবে কীভাবে, এজন্য ছোটগাল্পিককে অবলম্বন করতে হয় শিল্পিত কৌশল। অন্তিমের ব্যঞ্জনার্থ ছোটগল্পের সার্থকতার মৌল সূত্র বলে সাহিত্যতাত্ত্বিকেরা উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’, তারাশঙ্করের ‘তারিণী মাঝি’, টলস্টয়ের ‘চিলড্রেন মে বি ওয়াইজার দ্যান দেয়ার এল্ডারস’, হেমিংওয়ের ‘এ ক্লিন, ওয়েল-লাইটেড প্লেস’ প্রভৃতি গল্পের কথা বলা যায়। একটি সুনির্বাচিত ঘটনাংশকে অবলম্বন করে ইঙ্গিতময় পরিণতি অঙ্কনই ছোটগাল্পিকের কাছে বিশেষভাবে প্রাধান্য পায়। তবে আপাত পরিণতি নির্মিত হলেও, প্রকৃত প্রস্তাবে সমাপ্তির পরে ছোটগল্প যেন আরও কিছু বলতে চায়! পাঠক নিজের অন্তরে লেখকের অলিখিত গল্পটাকেই যেন কল্পনা করে নেন। প্রসঙ্গত মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ ছোটগল্পের অন্তিমে চন্দরার ‘মরণ’ সংলাপটির কথা। ‘মরণ’ কথাটির মাধ্যমে চন্দরা কত কথাই তো বলতে চেয়েছে। পাঠক নিজের মতো করে সেই কথাগুলো ভেবে নিতে পারেন। তাই গল্পকার গল্প শেষ করলেও, পাঠকচিত্তে গল্প কিন্তু রচিত হতেই থাকে। ছোটগল্পের এই চরিত্রকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, কবিতায়, এভাবে : ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে/শেষ হয়ে হইল না শেষ।’

আকৃতিতে যতই ছোট হোক, এ কথা অবশ্যস্বীকার্য, ছোটগল্প এক প্রকার স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পকর্মএর কোনো পূর্বাপর নেইখণ্ডাংশকে অবলম্বন করেই ছোটগল্পে শিল্পিতা পায় মানুষের বিপুল সম্ভাবনা, অন্তহীন সীমাবদ্ধতা, অতুল জীবনরহস্য। এ প্রসঙ্গেই ছোটগল্পের সঙ্গে উপন্যাসের শিল্পরূপগত পার্থক্য এখানে উল্লেখ করা যায়। ব্যক্ত হয়েছে যে, উপন্যাসে জীবন শিল্পিত হয় বিস্তৃত পরিসরে, পক্ষান্তরে ছোটগল্পে জীবনের বিশেষ কোনো ঘটনা বর্ণিত হয়। এই দুই শিল্প-আঙ্গিকের পার্থক্য বুঝাতে গিয়ে শ্রীশচন্দ্র দাশ লিখেছেন : ‘উপন্যাস বিস্তৃত, ছোটগল্প সংহত; উপন্যাসে পরিতৃপ্তি, ছোটগল্পে ব্যঞ্জনার অতৃপ্তি। উপন্যাস পাঠককে সবই বুঝাইয়া দেয়, ছোটগল্প তাহাকে বুঝিবার অবকাশ দেয়। সুতরাং যে-লেখক বৃহৎ আখ্যান-রচনায় সিদ্ধহস্ত, যিনি বহুবিধ চরিত্র-সৃষ্টিতে নিপুণ এবং জীবনের সর্বাঙ্গীন আলোচনায় অলস, তাঁহার পক্ষে ছোটগল্প লেখক না হইয়া ঔপন্যাসিক হওয়া শ্রেয়ঃ। কিন্তু যিনি আখ্যানভাগ অপেক্ষা চরিত্র-সৃষ্টিতে অধিকতর পটু, যাঁহার পরিতৃপ্তি অপেক্ষা ইঙ্গিতের দিকেই লক্ষ্য বেশি, তাঁহার পক্ষে উপন্যাস না লিখিয়া ছোটগল্প লেখাই বিধেয়।’ সমালোচকের এই কথা যে সর্বাংশে সত্য, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ বিশ্বসাহিত্যে এমন বহু লেখক আছেন, যাঁরা একইসঙ্গে যেমন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, তেমনি সুনিপুণ ছোটগাল্পিক। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই স্বীকার্য, ঔপন্যাসিক বিস্তৃতি ছোটগল্পের শিল্পসিদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

ছোটগল্পকে ছোট হতে হবে, আকৃতিতে তা হবে হ্রস্বএমন ধারণার কারণে অনেকে ছোটগল্পকে কাঠামোসর্বস্ব বলতে চেয়েছেন। কিন্তু ছোটগল্পকে কিছুতেই কাঠামোসর্বস্ব বলা যাবে না। ছোটগল্পের রয়েছে একটি সামগ্রিক ও ঐক্যবদ্ধ রূপআছে সংহত বিন্যাস। ছোটগল্পের সংহত জৈব-কাঠামোতে বেশি কিছু দিলে, কিংবা কোনো কিছু বাদ দিলে শিল্প হিসেবে তা সফলতা লাভ করতে পারে না। সার্থক ছোটগাল্পিক তাঁর চিন্তাকে প্রকাশ করার জন্য মৌল আখ্যানে ঘটনার জোগান দেন না, বরং তাঁর পূর্ব-পরিকল্পিত ঘটনাকে তিনি একটি ভাবগত ঐক্যসূত্রে গ্রথিত করেন। ছোটগল্পের ভাবগত ঐক্য তথা শিল্পরূপের কথা বলতে গিয়ে টেলস্ অব দি গ্রোটেস্ক অ্যান্ড অ্যারাবেস্ক গ্রন্থে এডগার অ্যালান পো লিখেছেন :

In the whole composition there should be no words written, of which the tendency, direct or indirect, is not to the one pre-established design. And by such means, with such care and skill, a picture is at length painted which leaves in the mind of him who contemplates it with a kindred art, a sense of the fullest satisfaction. The idea of the tale, its thesis, has been emblemished, because undisturbed an-end absolutely demanded, yet, in the novel, altogether unattainable.

এডগার অ্যালান পো ছোটগল্পের ভাবগত ঐক্যসূত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উপর্যুক্ত ভাষ্যে যে কথা বলেছেন, তা থেকে এই শিল্পরূপের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা যায়। প্রথমত, সকল শিল্পের মতো ছোটগল্পও পাঠককে আনন্দ দান করে, তার চিত্তে সঞ্চার করে চমৎকৃতির স্বাদ। দ্বিতীয়ত, ছোটগল্পে শিল্পিতা পায় জীবনবিন্যাসের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপ, যা পাঠ করে পাঠক আবিষ্কার করেন আপন অভিজ্ঞতার সংহত কোনো প্রতিভাস। তৃতীয়ত, আধুনিক মানুষের জীবন-রূপায়ণে ছোটগল্প, প্রকৃত প্রস্তাবেই, নিপুণ এক শিল্প-আঙ্গিক। ছোটগল্প ঐক্যবদ্ধ একক অনুভূতি বা  single effect-এর শিল্পকথা। ঘটনা, চরিত্র, সংহতি, ভাবসূত্র, পরিবেশ, ভাষিক চারিত্র্য, দৃষ্টিকোণ, পরিচর্যাসবকিছু মিলে এক ঐক্যময় শিল্পরূপ হিসেবে ছোটগল্পের কালজয়ী প্রতিষ্ঠা। ছোটগল্পের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের প্রধান লক্ষণ ভাবগত ঐক্য। ছোটগল্প পলকস্থায়ী বিদ্যুৎবিকাশের মতো মানবজীবনকে উদ্ভাসিত করে তোলে। ছোটগল্পের এই বৈশিষ্ট্য একটি উপমার আশ্রয়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন উজ্জ্বলকুমার মজুমদার :

উপন্যাস যেমন কাহিনির বিকাশ, বিস্তার, প্রসারিত ব্যাখ্যা ও সমীক্ষা, চিন্তা-প্রতিচিন্তা এবং ঘাত-প্রতিঘাত সবকিছু নিয়ে পূর্ণতাকে স্পর্শ করে, ছোটগল্প তেমনি মুহূর্তজীবী বিদ্যুৎ-বিকাশেই তার বক্তব্যকে শেষ করে জীবনের দিগদিগন্ত প্রসারিত করে দেয়। উপকরণের বিস্তার নয়, সযত্নে নির্বাচিত কয়েকটি উপকরণ নিয়েই ছোটগল্পে ব্যঞ্জনার অখণ্ড আকাশে উধাও হতে চায়। উপন্যাস যদি একটি বিরাট যুদ্ধক্ষেত্রের অসংখ্য মৃত্যুদৃশ্যের ও পরিবেশের বর্ণনা দিয়ে বোঝাতে চায় মনষ্যত্বের মহৎ অপচয়, ছোটগল্প সেই মহৎ অপচয়কেই ফুটিয়ে তুলবে একটি তরুণ সৈনিকের মৃত্যুতে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের নীরব আশ্রুপতনের ছবিতে।

ইতঃপূর্বেই ব্যক্ত হয়েছে যে, ছোটগল্পে শাখা-কাহিনি অনুপ্রবেশের তেমন সুযোগ নেই। উপন্যাসে মূল কাহিনির সঙ্গে এক বা একাধিক শাখা-কাহিনি থাকতে পারে, যেমন দেখি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসে। কিন্তু ছোটগল্পে এমনটা কল্পনাও করা যায় না। উপন্যাসে লেখক কাহিনির পর কাহিনি সৃষ্টি করতে পারেন, নির্মাণ করতে পারেন সুদীর্ঘ আখ্যান, রূপ দিতে পারেন একের পর এক চরিত্রেরছোটগল্পে এমন স্বাধীনতা নেই স্রষ্টার। উপন্যাসের গ্রন্থন অনেকটা শিথিলছোটগল্প সংহত এবং একমুখী। সংহত একক অভীপ্সায় জীবনের ব্যাপ্তি ও গভীরতা ও অন্তর্গত উপলব্ধিকে আস্বাদ করবার আকাক্সক্ষাতেই ছোটগল্পের সৃষ্টি। ব্যাপ্তি নয়, গভীরতাই ছোটগল্পের মৌল দর্শন। এ কারণেই বোধ করি, উনিশ শতকে রোমান্টিক যুগ-ব্যাপ্তির পরিবর্তে যখন গভীরতার প্রাধান্য স্বীকৃত হলো, তখনি আবির্ভাব ঘটল বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী ছোটগাল্পিকদের। উপন্যাসের শিল্প-কাঠামো কিছুটা শিথিল, ছোটগল্প ঘনবদ্ধ, আঁটসাঁট। ছোটগল্পে থাকে একমুখী ভাব, ঘটনার বিস্তারের পরিবর্তে থাকে দ্রুত ক্লাইম্যাক্স। অন্তিম পরিণতিতে পৌঁছতে যে আখ্যানের অবতারণা, ছোটগল্পে থাকে তার সংহত ইঙ্গিতএক্ষেত্রে ঔপন্যাসিক বিস্তার ছোটগাল্পিক সিদ্ধির প্রতিকূল। ছোটগল্পের আরম্ভে পরিণতির আভাস থাকে না, থাকে অভাবনীয় ব্যঞ্জনার আভাস। এ কারণে ছোটগল্পের সমাপ্তির দিকে কথাকারকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হয়। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় ভবতোষ দত্তের এই বিশ্লেষণ :

ছোটগল্পের আরম্ভে উপসংহারের কোনো আভাস থাকে না, অথচ তাতে অতি সতর্ক ও পরিমিত বাক্যপ্রয়োগে ব্যঞ্জনা নিয়ে এসে একটি অপ্রত্যাশিত অথচ স্বাভাবিক সমাপ্তিতে পরিপূর্ণতা, তারপরে আর কোনো প্রত্যাশা থাকে না। কিন্তু ছোটগল্পের সমাপ্তি পাঠকের কাছে অজস্র কল্পনার সম্ভাবনা মেলে ধরে। গল্পশেষে এই ভাবপূর্ণ অনির্বচনীয়তাই ছোটগল্পের সবটুকু রসকে সংহত করে নিয়ে আসে।

উপন্যাসের মতো ছোটগল্পেও নানা ভাব প্রকাশিত হয়। প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ, সমাজ, অতি-প্রাকৃত, হাস্যরস, ইতিহাস, বিজ্ঞান, গার্হস্থ্য সম্পর্ক, কল্পকাহিনি, উদ্ভট, প্রতীকী, মনস্তাত্ত্বিক, রহস্যযে ভাব ও বিষয় নিয়েই ছোটগল্প রচিত হোক না কেন, তার ভাষা ও রীতিতে থাকবে সুনির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য। ছোটগল্পের ভাষাকে হতে হয় ইঙ্গিতময়। ভাষিক ইঙ্গিতের মধ্য দিয়ে একজন ছোটগাল্পিক অনেক কথা বলতে চান তাঁর সৃষ্টিতে। দৃষ্টিকোণ নির্বাচন, পরিচর্যা-কৌশল এসবের ওপর নির্ভর করে ছোটগল্পের শিল্প-সার্থকতা।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, ভাষাবিদ, অধ্যাপক ও উপাচার্য,

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares