গল্প চলুক অন্তহীন : হামিদ কায়সার

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর ২০২০ গল্পসংখ্যায় প্রকাশিত গল্পের বিশ্লেষণ

মৃত্যুর কিছুদিন আগে, মে ১৯৪১ সালে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘ভেবে দেখলে বুঝতে পারবে, আমি যে ছোট ছোট গল্পগুলো লিখেছি, বাঙালি সমাজের জীবনের ছবি তাতেই প্রথম ধরা পড়ে।’ সেই রবীন্দ্রযুগ কবেই পেরিয়েছে, মাঝখানে আরও কত যুগ এল-গেল, কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকেরা গল্পের জগতের খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে, কমিউনিজমের প্রভাবে গল্পে শ্রেণিবৈষম্যের নতুন রেখায়ন হলো―বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গকে ঘিরে গল্পের আলাদা দুটি ধারা প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু বাংলা গল্প আজও সেই রবীন্দ্রনাথ-কথিত বাঙালি সমাজের জীবনের ছবিটি তীব্রভাবে ধরে রাখছে! ধরে রাখতে সমর্থ তো হয়েছেই, আরও জোরালো আরও স্পষ্ট হয়েছে জীবনের বাস্তবতা। সম্প্রতি শব্দঘর গল্পসংখ্যা ২০২০-এর পনেরোটি গল্প পড়ে এ ধারণাটিই পাকাপোক্ত হলো। সেই সঙ্গে আফসোসে মাথা কুটে মরতে ইচ্ছে করছে যে, কেন বাংলাদেশের তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণির একটি বৃহৎ অংশ গল্প পাঠ করে না, কেন প্রকাশকেরা গল্পের বই বের করতেই সবচেয়ে বেশি দ্বিধাগ্রস্ত, অনাগ্রহী ?

কেন যেন মনে হয় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায় ওই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ, তাই অলীক জগতে ভাসতেই তাদের স্বাচ্ছন্দ্য বেশি। অথবা এও বলা যায়, গল্প পাঠ করলে যে চটকানাটা খেতে হয় নিজেদের দু-গালে, তা হয়তো হজম করতে তারা অভ্যস্ত নন। নিজেদের ন্যাংটো দেখতে হয়তো ঘরের আয়নার সামনে ভালো লাগে, কিন্তু অন্যের দেখার দৃষ্টিতে নিজের নগ্নছায়া দেখতে পেলে বুঝি একেকজনের জাত যাওয়ার জো হয়।

এই যেমন চন্দন আনোয়ার-এর ‘পরদেশি জরায়ু’ গল্পের কথাই যদি ধরি, সে বড় তীব্রভাবে দেখিয়েছে যে, আজকের সময়ের নৈতিকতার অবক্ষয় এমন এক শেষ ধাপে পৌঁছেছে, সন্তানের কাছে মায়ের চেয়ে সম্পত্তির লোভই প্রধান হয়ে ওঠে, সম্পদের লোভে যে সন্তানেরা মনে মনে মায়ের মৃত্যু কামনায় মাতে, সে বাস্তবতাকেও চিহ্নিত করেছেন গল্পকার।

এ গল্পের পটভূমি বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার একটি মফস্সল এলাকা। জায়গাটা ধীরে ধীরে আরবান হয়ে উঠছে। জমির ওপর লোভী চোখ পড়েছে অর্থলোলুপদের। এমনি একজন এলাকার প্রভাবশালী লায়েক আলি। সে নিঃসঙ্গ একাকী বৃদ্ধা আলেয়া বেগমের ভিটেবাড়িটুকুও কেড়ে নিতে চায়। নানাভাবে সে আলেয়া বেগমকে সে-মেসেজটা দিয়েও যাচ্ছে। আলেয়া বেগম ভেতরে ভেতরে অসহায় বোধ করে, সে বোস্টন, নিউ ইয়র্ক, অকল্যান্ডে থাকা তিন ছেলেমেয়ের কাছে দেশে আসার জন্য আকুলতা প্রকাশ করে, এক নজর চোখের দেখার মিনতি জানায়। কিন্তু তিন সন্তানই বিভিন্ন উসিলায় দেশে আসাটা কেবল এড়িয়েই চলে, যদিও ওরা মায়ের খোঁজখবর রাখে, টাকা পাঠায়, মোবাইল পাঠায়, কিন্তু সেটা যে কেবল লোক দেখানো, সেটা আর মায়ের বুঝতে বাকি থাকে না। বিত্তশালী লায়েক আলি ঘোড়েল লোক, সে বেড়ানোর নাম করে বিদেশের মাটিতে ছেলেমেয়ের সঙ্গে দেখাও করে এসেছে। এর মধ্যে একদিন বাড়ির কলপাড়ে গ্রামের এক চেনাজানা ছেলে পানি খেতে এসে জানায় যে, আলেয়া বেগমের ভিটেবাড়ির মাটিও পাশের জমির মতোই মাটি ফেলে উঁচু করবে লায়েক আলি, ‘আপনি মরার পরদিনই কাজ ধরবে।’ সেই থেকে আলেয়া বেগমের হৃদয়ে তুমুল ঝড় ওঠে, সেই ঝড় রাত-অন্ধকারের প্রকৃতির ঝড়ের সঙ্গে মিলেমিশে ওর জীবনকে তছনছ করে দেয়। তিনটি সন্তানকে জন্ম দিতে গিয়ে যে কী পরিমাণ ব্যথা সইতে হয়েছে! তা ওরা কীভাবে অনুধাবন করবে! বড় ছেলে জন্মের সময় তো পনেরো দিন হাসপাতালে যমের সঙ্গে লড়াই পর্যন্ত করে এসেছে। তীব্র অভিমানে আর বিষাদ যন্ত্রণায় আলেয়া বেগম অনেকগুলো ঘুমের বড়ি খেয়ে অচেতন হয়ে পড়ে। অবশ্য সে ঝড়ের রাতেই ওর ঘরে এসে উপস্থিত হয় লায়েক আলির পাঠানো আততায়ী গোয়ার।

আমরা গল্পটা পড়া শেষ হতেই বিমূঢ় বিষাদগ্রস্ত এক নগরযন্ত্রণার আত্মক্লেদের মুখোমুখি হই। নিজেদের দিকে লজ্জিত চোখে তাকাই। তবে গল্প বর্ণনায় চন্দন আনোয়ার সরলপথে হাঁটেন না। জটিলতাক্রান্ত। চলতি ঘটনা প্রবাহ বর্ণনার ভেতরে এত বেশি স্মৃতিকাতরতার উপস্থিতি যে, পড়তে পড়তে মাঝে মধ্যেই গল্পের ধারাবাহিকতা নিয়ে বিভ্রম হয়। ভাষাগত দিক থেকে যদিও সে সাহিত্য-শুদ্ধাচারী অর্থাৎ পত্রিকার যারা রিপোর্ট লেখে, তাদের ভাষা থেকে ভিন্ন, আলংকারিক ভাষা, কিন্তু হঠাৎই কোনো কোনো শব্দমুখে থমকে ভাবতে হয়, এটা কি কোনো অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত-যুগের গল্প কি না। যেমন একেবারে প্রথম বাক্যটিই যদি উল্লেখ করি, ‘কৃষ্ণপক্ষের নিশুতিরাত।’ এই নিশুতি শব্দটা না থাকলেও পারত। অথবা নতুন কোনো আমেজ নিয়ে পরিবেশের বর্ণনাটা আসতে পারত। যেমন শব্দঘর এই একই সংখ্যায় বুলবুল চৌধুরীর কালাকান্দুর ভোর গল্পে যেমন এসেছে, সেও একেবারে প্রথম বাক্যেই, ‘রাত আন্ধাইর।’ নতুনতর উপস্থাপনা। অথচ আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহারে গল্পটি চরিত্র এবং সে-অঞ্চলকে শুরু থেকেই পাঠকের মনে সেধিয়ে দেয়।

হাসান আজিজুল হক-পরবর্তী প্রজন্মের ছোটগল্পকারগণ অনেকেই হাসান স্যার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। সবাই সিরিয়াস টাইপের সব গল্প লিখতেন। একটুও হাসা যাবে না, নড়াচড়া করা যাবে না, শক্ত কাঠ হয়ে বসে থাকার মতো অবস্থা আর কি। সন্দেহ নাই যে, অনেক কারণের ভেতর এ একটি কারণেও পাঠক ছোটগল্প থেকে মুখ ফিরিয়েছে। যেমন আর্টফিল্ম দেখার জন্য সিনেমা হলে এক সময় দর্শক পাওয়া যেত না। অথচ সত্যজিতের সিনেমাগুলোও কিন্তু দারিদ্র্য নিয়ে দুর্ভিক্ষ নিয়ে, পথের পাঁচালীতে অতগুলো মৃত্যুদৃশ্যের পরও ছবিটা দেখে নান্দনিক আনন্দ পাওয়া যায়, কঠিন বাস্তবতার রূপকার ঋত্বিকের সিনেমা দেখেও মন হাহাকারের ভেতরও কোথায় যেন একটা প্রবাহনের ছোঁয়া পায়। আমাদের ছোটগল্পে যেন এই রিলিফটা নেই। আরে বাবা, পাঠককে যদি মাঝে মধ্যে একটু শ্বাস ফেলার অবসর না দাও, ওর তো দমবন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার অবস্থা হবে। ও বার বার মরতে তোমার ছোটগল্প পড়তে আসবে কেন ? ফলে, ছোটগল্প কি মারা যাচ্ছে বলতে বলতে তোমারই অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা! এসবের পরও নির্মোহভাবে কারও ভাবার অবকাশ মেলেনি, কেন ছোটগল্পের এ দুর্দশা হলো। পাঠক যদি তোমার গল্প পড়ে সামান্য একটুও রিলিফ পায়, তবেই না, খুঁজে খুঁজে ছোটগল্পের বই সংগ্রহে তৎপর হবে।

পরবর্তীকালে অবশ্য ছোটগল্প এ-ধরনের কোষ্ঠকাঠিন্যতা থেকে অনেকটাই মুক্ত হয়েছে। জীবনে যে দারিদ্র্য, হতাশা, দুঃখ-কষ্টের মাঝেও আরও কিছু আছে, সেই সত্য যেন ধীরে ধীরে আমাদের গল্পকারগণ অনুধাবন করতে পেরেছেন। এবং ছোটগল্পে তার সার্থক প্রয়োগও ঘটছে।

মঈন শেখ-এর ‘লবঙ্গলতা’ পড়েই এত কথা বলতে ইচ্ছে করল। এক কথায় লবঙ্গলতা চমৎকার একটি তরতাজা টাটকা গল্প। লেখক জানেন, কীভাবে রসিয়ে রসিয়ে গল্প বলতে হয়! প্রবল হিউমার সেন্সের পাশাপাশি তার রয়েছে চরিত্র পরিস্ফুটনের অসাধারণ দক্ষতা।

মূলত তিনটি চরিত্রকে ঘিরেই এগিয়েছে গল্প। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে শাকিলা, ওর স্বামী নেকবর, যার আছে তিনটি পানের বরজ আর অন্য চরিত্রটি হলো রূপেযৌবনে ঝাকানাকা এক নারী লবঙ্গ, লবঙ্গলতা! তবে ছোট পরিসরের হলেও লবঙ্গের স্বামী অধীর চরিত্রেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে গল্পে। বাংলা সাহিত্যে বোধহয় এমন পেশার চরিত্র আর আসেনি, যে ছেঁড়াফাটা পুরনো টাকা সংগ্রহ করে নতুন টাকার জোগানি দেয় মানুষকে, মাঝখান থেকে নিজের লাভটা বের করে নেয়। গল্পে তার চরিত্রের গুরুত্ব আছে বলছি কেন, তার ঔদার্যের কারণেই তো লবঙ্গলতা যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে পারে, আর সেই সুযোগে দেহের যৌবনের হিল্লোল দেখিয়ে লক্ষ পুরুষের বুকে ছুরি বসিয়ে যায়। যে জখমের শিকার শাকিলার স্বামী নেকবরও। বেচারা নেকবরের লবঙ্গলতা আসক্তি শাকিলার জীবনকেও কীভাবে নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেল, তা যেমন পাঠকের কাছে দারুণ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে, তেমনি এমন যন্ত্রণায় যে আধুনিক জীবনের অনেক নারী-পুরুষই ক্লান্ত-বিধ্বস্ত, সে যুগ-যন্ত্রণাও ফুটে উঠেছে। এ যেন চার্লি চ্যাপলিনের একটি ভাষাহীন ছোট্ট ফিল্মের মতোই হাসিঠাট্টার আড়ালে জীবনের গভীর বেদনাকেও উন্মোচন করে। যদিও মঈন শেখের গল্পের ভাষা সংবাদপত্রের রিপোর্টাজ ভাষার কাছাকাছি, তবু মাঝে মধ্যে শিল্পিত ঝলক উপস্থিত হয়ে তার অমিত সম্ভাবনাকে স্পষ্ট করে, ‘তাদের সংসার মাচা হলে, অধীর নিশ্চয়ই তার খুঁটি, লবঙ্গলতা তবে সেই খুঁটি পেঁচিয়ে মাচাতে ওঠা সার্থক গুল্ম। খুঁটিতে ঘুণ ধরুক আর মচকে বা ভেঙে যাক, এই গুল্ম ঠিক তাকে দাঁড় করিয়ে রাখে।’ চরিত্র, গল্পের ঘটনাস্থলের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে লেখক বেশকিছু অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করে গল্পের ভাষাকে ভিন্ন ব্যঞ্জনা দিয়েছেন, যেমন―খোঁটরায়, গুম্ফু, পৈথান।

জয়দীপ দে সরল ঢংয়ে গল্প বলেন। ওর লেখায় ইতিহাস চেতনা এবং ভিন্নতর অবলোকন খুঁজে পাওয়া যায়। আগামীর ইশতেহারও তার ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাসের একটি যুগসন্ধিক্ষণকে তুলে ধরেছে ওর গল্পে। ওয়ালেদা শহরের লাহোর ফোর্টে মুসলিম লীগ আহূত একটি জনসভাকে ঘিরে গল্পটি আবর্তিত। যেখানে এক মঞ্চে ভাষণ দিতে উঠেছেন কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। গল্পটি পড়েই কেন যেন মনে হলো যে, এটা নিছক গল্প নয়, গল্পের আড়ালে আরও অনেক গল্পের শাখাপ্রশাখা নিজের ভেতরে ধরে রেখেছে। বৃহৎ এক পটভূমির আভাস পেলাম। ছোটগল্পের স্বভাব অনুযায়ী চরিত্রগুলোর মধ্যে যেভাবে চড়াই উতরাই থাকার কথা, সেভাবে ঠিক চরিত্রগুলো আসেনি, সুদূরের দিকে গড়িয়ে পড়বার যেন একটা লক্ষ্য রয়েছে। জয়দীপ দে’র সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেল, আমার অনুমানই সত্যি। ওকে অগ্রিম অভিনন্দন জানিয়ে রাখছি যে, সে দেশভাগের পটভূমিকে ধরে, ভারত থেকে পাকিস্তান, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিশাল প্রেক্ষাপট নিয়ে উপন্যাস লেখায় ব্যস্ত রয়েছে। পরিশ্রমলব্ধ কাজটির মাধ্যমে ও ইতিহাসের অনেক অনুল্লেখ্য ঘটনা যেমন তুলে আনবে, তেমনি অনেক অনালোকিত দিগন্তকে আলোয় আনার চেষ্টা করবে। ওর প্রয়াস সার্থক হোক। তবে যারা ছোটগল্পের তিয়াসি পাঠক, তারা আগামীর ইশতেহার পড়ে খুব একটা হতাশ হবেন না, গল্পের ঝাঁঝটা ঠিকই অনুধাবন করা যাবে।

ইশরাত তানিয়ার গল্প ‘ঝিঁঝিঁপোকারা যা বলে থাকে’-র মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম এবং আধুনিক জীবনের নাগরিক সংকট তীব্রভাবে উন্মোচিত হয়েছে। গল্পটি শুধু ভাষা, উপস্থাপনা, আবহ নির্মাণের দিক থেকেই ঝরঝরে স্মার্ট নয়, একই সঙ্গে দার্শনিক উপলব্ধিতেও যেন খানিকটা পৌঁছে দেয়। আধুনিক ভোগবিলাসের করপোরেট জীবন আসলে একজন ব্যক্তি মানুষকে কতটুকু সুখী করে ? কতটা জীবনকে অর্থময়তা দেয় ? ৩৪ বছরের আনীলা আর ৫৪ বছরের মোরশেদ প্রতিবছর দুতিনবার শহরের বাইরের কোনো রিসোর্টে গিয়ে যে শুধু শরীরী সুখই খুঁজে পায় তা না, সেখানে যেন ওদের প্রকৃতির কাছে দুদণ্ড ঠাঁই পেয়ে জীবনের মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলারও অবকাশ জোটে। বিস্তৃত করে তুলে না ধরলেও ইশরাত তানিয়া কলমের সূক্ষè আঁচড়ে দেখায় তানিয়ার স্বামী রিয়াদ ওর কাছে লম্পট ছাড়া আর কিছু নয়, স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসার অভাব বোধ থেকেই সে মোরশেদের কাছে ছুটে আসে শূন্যতা বোধ পূরণে। কিন্তু সেই মোরশেদও কি বিশ্বস্ত ? কারও পাঠানো স্কিনশটে সে দেখেছিল মোরশেদের উত্থিত গোপন অঙ্গ। মদের আবেগে নেশাগ্রস্ত বিভ্রমে স্মিত হাসি ঠোঁটে নিয়ে যেন মোরশেদের উদ্দেশে ওর স্বগতোক্তি, নাজিয়াকে তুমি চেন ? তবে কোনো কোনো পাঠক হয়তো লেখিকার উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পারে, স্বামী লাম্পট্য করে বেড়াবে বলে কি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য স্ত্রীকেও সে-পথে নামতে হবে ? কেউ হয়তো বলবেন, স্বামী বেপথে গেলে স্ত্রীও বেপথে যেতেই পারে। তাই তো হচ্ছে সমাজে। লেখকের কাজ সমাজে কী ঘটছে তার চিত্র তুলে ধরা। ইশরাত তানিয়া এই সময়ের ছবি তুলে ধরেছেন মাত্র তার গল্পে। স্বামী-স্ত্রীর এই একই ধরনের সংকট নিয়ে এ-সংকলনে আরেকটি গল্প রয়েছে মঈনুল হাসানের কাঞ্চনজঙ্ঘা। আমাকে যেহেতু তার গল্পটি নিয়ে আলোচনা করতে বলা হয়নি, গল্পটি শুধু ভালো লেগেছে বলেই এখানে ক্ষান্ত হলাম। তবে দুটি গল্পই সুলিখিত।  

গল্পে অনেক রকম অলংকার থাকে। তার মধ্যে একটি হলো সাংকেতিকতা। অর্থাৎ গল্পে প্রবেশের আগেই গল্পকার গল্পে কী বলতে চাচ্ছেন আভাসে ইঙ্গিতে পাঠককে তা বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছেন বা গল্পের মেজাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পাঠককে ধীরে ধীরে তৈরি করে যাচ্ছেন। এতে পাঠকের ইনভলমেন্ট বাড়ছে। পাঠক গল্পটির সঙ্গে একাত্ম হতে পারছে। একটি মহৎ কিংবা ভালো গল্পে এই সাংকেতিকতা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এসে পড়ে, অনেকটা লেখকের অজান্তে। গল্পের শেষাবধিও থাকতে পারে এর সূক্ষè উপস্থিতি। রবীন্দ্রনাথের অনেক গল্পে এমন সাংকেতিকতার উপস্থিতি এবং প্রাচুর্য লক্ষ করা যায়। স্মৃতি ভদ্র’র ‘শেষ ভোর’ গল্পের প্রথম লাইনেই সেই সাংকেতিকতাকে পেয়ে যাই। ‘তিনি জানালা বন্ধ করে দিলেন। বুঝতে পারলেন ভোর ফুরিয়ে আসছে। কারণ কার্নিশে বসা চড়ুই মিহি গলায় কিচির মিচির করছে থেমে থেমে।’ একদিকে যেমন গল্পের সময়কাল পরিবেশ ফুটে উঠল বর্ণনায়, তেমনি এই যে জানালাটা, এই জানালাটা যে গল্পে এক সময় কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, এর বন্ধ করা এবং খোলা―সেটা আমরা গল্পের ভেতরে যত ঢুকব, অনুভব করতে পারব। একটা ভয় আর বিবমিষার জগতে হারিয়ে যেতে থাকব। গল্পকার সেই আভাসটুকুই দিয়ে রেখেছেন এবং গল্পটার সেই মেজাজ তৈরি করছেন, ‘ভোর ফুরিয়ে আসছে!’ অর্থাৎ আমাদেরকে প্রবেশ করতে হবে একটা ঘোর দুঃসময়ের ভেতর।

স্মৃতি ভদ্র হয়ত গল্পটি লেখার সময় এতকিছু ভাবেননি, তিনি একটি ঘোর দুঃসময়ে বসে সেই জীবনেরই এক টুকরো খণ্ডাংশ অনুবাদ করেছেন মাত্র। হ্যাঁ, এ বড় দুঃসহকালই তো সৃজনশীল লেখকলেখিকাদের জন্য, যারা পিছিয়ে থাকা সমাজটাকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখেন, চান সুসভ্যতার প্রস্ফুটন; মৌলবাদীর অদৃশ্য চাপাতি সব সময়ই তার কাঁধের পেছনে ঘুরছে, দূর থেকে ছেনিয়ে উঠছে, ঝলসে উঠছে, চকচক করছে। ‘শেষ ভোর’ গল্পের অধ্যাপকও ক্ষণে ক্ষণেই সেই ভয়ে শিউরে উঠছেন, গুটিয়ে যাচ্ছেন, দুঃস্বপ্নের ট্রমায় ভুগছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়া এই অধ্যাপকের যে বর্ণনা লেখক দিচ্ছেন, যদিও লেখক অঞ্চলের কথা বলেননি, কিন্তু আমাদের চোখের সামনে উত্তর বঙ্গের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসই ভেসে ওঠে। মৌলবাদীর চাপাতির আঘাতে নিহত হয়েছেন সেখানে একাধিক খ্যাতনামা অধ্যাপক।

নিঃসঙ্গ এ-অসহায় অধ্যাপক। বিভিন্নভাবে সেই কালো শক্তির কাছ থেকে লুমকিও পেয়েছেন, পাচ্ছেন, তার স্ত্রী নিরাপদ জীবনের সন্ধানে তাকে ছেড়ে চলে গেছে আমেরিকায় ছেলের কাছে। এর মধ্যেই সে এক ঘোর থেকেই জানালা দিয়ে দেখতে পান, অধ্যাপক মতিন সাহেবকে খোলা মাঠে একদল মানুষ চাপাতি দিয়ে কোপাচ্ছে। তিনি জানালা বন্ধ করে দেন। একটু পরই রক্তাক্ত পাঞ্জাবি পরে মতিন সাহেব উপস্থিত হন। এবং বিলম্বে দরোজা খোলার জন্য এবং জানালা বন্ধ করার জন্য অধ্যাপককে তিরস্কার করেন। এসবই অবসেশন। বাস্তব-অবাস্তবতার এক জগৎ, কিন্তু এটা চরম বাস্তব যে, লালনগীতির গায়ক মজনু শাহকে সকালে কারা যেন মাঠে কুপিয়ে লাশ ফেলে গেছে। মতিন সাহেবই জানিয়ে গিয়েছেন খবরটা। অধ্যাপক নিজের অজান্তেই এসব হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে লেখা প্রতিবাদ পত্রখানা ছিঁড়ে ফেলছেন এবং প্রেমের কবিতা লিখতে সচেষ্ট হলেন। তার স্ত্রী যা তাকে লিখতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। স্মৃতি ভদ্র’র ‘শেষ ভোর’ গল্পটি যেন সাম্প্রতিক সময়ের সৃজনশীলতার জগতের এক ছাপচিত্র। তিনি শক্তিশালী গল্পকার।

রাবেয়া রব্বানীর ‘মেনি’ একেবারে চেনা-জানা মেজাজ আর ভঙ্গির বাইরের একটি গল্প। বেশ আগে কাজী নজরুল ইসলামের বর্ধমান বাগদী ভাষার রাক্ষুসী গল্প পড়েও এমনই অভিভূত হয়েছি। রাক্ষুসী আমার কাছে এখনও মনে হয় বাংলা সাহিত্যের এক সেরা গল্প। আমাদের সমালোচকগণ কাজী নজরুল ইসলামের গল্পের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনি। অনেকদিন পর সেই বর্ধমানের ভাষার গল্প পড়ার স্বাদ এনে দিলেন রাবেয়া রব্বানী। শুধু কি ভাষাতেই ভিন্নতা ? গল্পের উপস্থাপনায়ও। একদল মেনির কথোপকথনের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে গল্প। মেনি মানে তো বিড়াল, বুঝতেই পারছেন। সেই বিড়ালদের কথোপকথন আর মুভমেন্টের ভেতর দিয়ে একটা যুগছবি ভেসে উঠছে চোখের সামনে। কোন সে যুগ ? ইংরেজ আমলেরও আগে। যখন পর্তুগিজ জলদস্যুরা আসা শুরু করেছে  ভারতবর্ষে। তখনও হুগলি নামটা হয়নি, সেখানেই একদিন ভগীরথি নদীর তীরে ছোট্ট গ্রামে ম্লেছদের আসার সংবাদ শুনে ঘাটে ম্লেছদের দেখতে যাচ্ছে কালো মেনি আর রাঙ্গা মেনি। যেতে যেতেই তাদের দুজনের আলাপের ভেতর দিয়ে আমরা জানতে পারছি সে-সময়ের গাঁও-গেরামের চিত্র ও মানুষের কথা। ‘সূর্য চুইয়ে চুইয়ে পৃথিবীতে পড়ছে বলেই হয়তো পথে লোকজন কম। রাঙ্গা মেনি একটু থেমে থেমে শেয়ালের মতো একদিকে তাকিয়ে বলল, কালি দি, নড়েনের গেরস্ত দেক! গাই, ছাগ, হাঁসী কি নেই! পুকুরের মাঁচও আছে ম্যালা। কালো মেনি : হলে কি হবে, কেপনের কেপন। ধানের খোসাটুকুও চিড়ে চেলে খায়। গিয়ে দেক না, ঝেঙ্গিয়ে বিদেয় করে দিবে।’

আবার যেমন আরেক জায়গায়, ‘কালো মেনি : হ্যারে শুনেছি কানাই রাম ঠগী। মাঝ নদীতে লৌকা থামিয়ে ডাকাতি করে। মা চণ্ডি কালীর পুজো করে তারপর ডাকাতি কত্তে যায়। রাঙ্গা মেনি : সত্যি কতা কইচ গা। তাই বুঝি চেহারাটা এমন অসুরের মতো হয়েচে।’ এভাবেই কথা বলতে বলতে ওরা ঘাটে যায়। তারপর রাতের বেলা এই কানাই রামের বাড়িতেই পর্তুগিজরা আসে, আগুন লাগে। সে কত গল্প। একটা দারুণ গল্পও এসেছে সে কাল-সময়ের। মুগ্ধ হয়ে পড়তে হয়।

যদিও এখন শিল্প বিপ্লবের ধুয়ো ও ধুলোয় বাংলাদেশের আকাশ ঢেকে গেছে, লোহালক্কড় আর যানবাহনের শব্দে নির্জনতার গায়ে লেগেছে শ্যাওলা। তবু আজও মফস্সল শহরকে ঘিরে একটা মায়ামুখ ভেসে ওঠে আমাদের চোখের সামনে। বিশেষ করে আমরা যারা সাহিত্যমনা, কবিতা পাঠ করি, ছবি দেখে চোখ জুড়াই, তাদেরর মগজ কোষে মফস্সল শহর মানে একটা কবিতার ইজেল। গা ছমছমে মৌন সন্ধ্যা। ধূপের গন্ধ। ধোঁয়াশে প্রান্তর। কুয়াশায় মগ্ন অনুভব।

সেই মায়াটুকুকেই যেন ধরতে চেয়েছেন পিয়াস মজিদ তার ‘মায়া-মফস্সলের ছেলেমেয়ে’ গল্পে। আসলে কি এটা গল্প! আমার কাছে তো দীর্ঘ এক কবিতার মতোই মনে হয়েছে। কবিতায় যা যা থাকে সবই আছে এই হৃদয়-আখ্যানে। মাঝে মধ্যে পিয়াসের কাব্যশক্তির অনন্য প্রকাশ ঘটেছে। ‘থাকত সে মাটিতে। প্রুফ দেখত মেঘেদের। নিজের ভেতর জমাট কান্নার কারেকশন করতে করতে সে প্রায়ই রাস্তায় হোঁচট খেত।’ কোনো কোনো পাঠক ভ্রু কুঁচকে হয়তো আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন, মায়া-মফস্সল সংবাদে কোনো গল্পই নেই ? হ্যাঁ আছে। নিশ্চয়ই আছে। মূলত অভিনুর গল্প, ঠিক অভিনুর নয়। অভিনুর একটুকু অনুভবের গল্প। ঋভা নামের এক মেয়েকে ভালোবাসত ও। যার উমেদার ছিল কত হবু চিকিৎসক, উদীয়মান ইঞ্জিনিয়ার, প্রবীণ সাংস্কৃতিক ফড়িয়া, নবিস আবৃত্তিকার। তাই অভিনু যখন ওরিয়ানা ফালাচির হাত বাড়িয়ে দাও বইটি ঋভাকে উপহার দিল, স্বভাবতই ওর প্রত্যাখ্যান, আমার দিকে হাতটাত বাড়িয়ে দিতে এস না। হ্যাঁ, এটা গল্প, এ যুগের বাস্তবতার গল্প, নির্দয়তার গল্প, যেখানে কবিতার মতো একটি মেয়ে ক্ষমতা আর বিত্তবানদের পছন্দ করে, সৌন্দর্য পিয়াসী কবিদের নয় মায়া মফস্বলের সংবাদ সেই নির্দয়তারও গল্প। যেন মফস্সল শহরের সে মায়াটুকু মর্মমূলসুদ্ধ ধ্বংসস্তূপে যেতে বসেছে। সেই বাস্তবতার গল্পটুকুই উঠে এসেছে কাব্যে মাতাল অনুভবে, বিমূর্ত অনুভবের ব্যঞ্জনায়, আসেনি শুধু গল্পের চরিত্রের মতো হৃদয় খোঁড়া স্বভাবে। ওটুকুই যা দুর্বলতা।

না, বড় কোনো দৈব-দুর্বিপাকের ঘটনা ঘটেনি খালিদ মারুফের বৃষ্টি; না পুরুষ, না নারী গল্পের উত্তম পুরুষের জীবনে, কিংবা জীবনসংশয়ী কোনো দুর্ঘটনারও শিকার সে নয় বা তার পরিবার, তবু আধুনিক অভ্যস্ত নাগরিক জীবনে সে যে সংকটে পড়েছে, সেটাও তুচ্ছ করার মতোও নয়। মাত্র ছ-মাস আগে বরাদ্দ পাওয়া করপোরেশনের ঘরটি তাকে ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ হয়েছে! উত্তম পুরুষের চরিত্রটি জানে না, কী অপরাধ বা ভুল, কেন তাদেরকে এমন টেনশনগ্রস্ত জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হলো। সে এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে একদিন দুঃস্বপ্নের মতোই দৌড়াতে দৌড়াতে তার আধিকারিক বা পরিচালকের কাছে রওনা হলো। তাকে এমন হন্তদন্ত হয়ে দৌড়াতে হচ্ছে, যেহেতু পার্টি শুরু হওয়ার আগেই আধিকারিকের কাছে পৌঁছাতে হবে। পার্টি শুরু হলে আর সে তার সমস্যার কথা বলতে পারবে না। এভাবে শুরু হয় খালিদ মারুফের গল্প। আর পড়তে পড়তে যেন ফেলেনির সেলুলয়েডের ফিতার চক্করে পড়তে হয়। ফেলেনির সিনেমার মতো বিভিন্ন দৃশ্যপট ভেসে ওঠে চোখের সামনে এমনকি সেই ব্যঙ্গ বা উইটময় মিউজিকসমেত। যেখানে ভাঁড় আর দালালদের ভিড়, অসহ্য পলিটিশিয়ানদের দৌরাত্ম্য। খালিদ মারুফ যেন পুরোই এক প্রতীকায়নে এই নগরের আধুনিক সংকটকে চিহ্নিত করতে থাকেন গল্পের পর্বে পর্বে, দৃশ্যান্তরে, যেখানে একজন নাগরিককে সব সময়ই দুঃস্বপ্নের প্রহরের মতো দৌড়াতে হয়, তাকে তাড়া করে বেড়ায় ভূতগ্রস্ত অতীত, অথচ পার্টিতে পৌঁছেও আধিকারিককে তার সমস্যার কথা বলার অবকাশ জোটে না, কেননা ততক্ষণে পার্টি শুরু হয়ে গেছে আর মদের মাহফিল এমনই তীব্রভাবে জমে উঠেছে যে, সমস্যার কথা বলা তো দূরের কথা, আকণ্ঠ মদপান করে সে গন্ধ নিয়ে সমস্যায় বিধ্বস্ত স্ত্রীর সামনে কীভাবে ফিরবে কোনো সমাধানের উপায় বের না করেই, সেও এক নতুন সমস্যা হয়ে ওঠে। চমৎকার সব দৃশ্যনির্মাণ করে পার্টি শেষে যখন উত্তম পুরুষের চরিত্র না পুরুষ না নারী কয়েকটি চরিত্রের সঙ্গে আধিকারিকের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন, বাইরে তখন বজ্রপাতসহ বৃষ্টি। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সেই না পুরুষ না নারীদের অনুরোধ ও প্রেরণাতেই বৃষ্টির মধ্যেই পথে নেমে আসেন উত্তম পুরুষ চরিত্র, যেতে যেতে ওদের একজন পার্টির পাতানো ভব্যতা ছেড়ে স্বরূপে আবির্ভূত হয়ে জানতে চায়, ‘বলুন তো বৃষ্টির সুবিধা কী ?’ ওরাই জানিয়ে দেয়, ‘এখন আমরা মূত্রত্যাগ করব। যেভাবে যে পোশাকে এখন দাঁড়িয়ে আছি, সেভাবেই। কেউ এটা দেখবে না, টের পাবে না। এমনকি আমাদের কোনো আড়াল খুঁজবার প্রয়োজন হবে না।’ বলেই ফেলেনির নারী-পুরুষের মতো ওরা চোখ বন্ধ করে মুখটা ওপরের দিকে তোলে, প্রসারিত করে দুই হাত।

এক কথায়, জাস্ট ব্রিলিয়ান্ট এক গল্প খালিদ মারুফের ‘বৃষ্টি; না পুরুষ না নারী’, আধুনিক শহুরে অর্থহীন বন্ধ্যা-জীবনকে কী তীব্র চোখে দেখা, কী অসম্ভব উইট সহযোগে! ব্রেভো!

‘তবিবুর রহমানের বাবা শফিকুর রহমান রোজা রেখেছেন। রমজান মাসের রোজা নয়, ধর্মীয় বিশেষ কোনো দিবসের রোজা নয়।’ এই যে রোজা রাখার ব্যাপারটা, এটা এখন আমাদের মুসলিম সমাজে খুব চলছে। কেউ কেউ তো সপ্তাহে অন্তত দুটি দিন নিয়মিত রোজা রাখেন। একটি রোজা অবশ্যই সোমবার, আরেকটি বৃহস্পতিবার বা অন্য যে কোনো দিন।

মাসউদ আহমাদ সমাজের এই চলতি হাওয়ার ব্যাপারটা ধরতে পেরেছেন। তিনি সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে, গতিপ্রকৃতি ভালোই পরখ করতে জানেন, গল্পের বুননও গাঁথেন ভালো। তবে শফিকুর রহমান এ রোজাটি রেখেছেন অন্য একটি বিশেষ কারণে, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিবস উপলক্ষে। কথাটি এমনি এমনি আসেনি ওর ‘আষাঢ়ের এক সকালে’ নামের গল্পটিতে। এই করোনা সময়েই একদিন রমনা পার্কে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ পায়ের ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরে এসে সাতসকালেই অসময়ে ড্রয়িং রুমে তন্দ্রার কোলে ঢলে পড়েন তবিবুর রহমান। আধো-জাগরণে দেয়ালের ক্যালেন্ডারে বঙ্গবন্ধুর ছবিটি চোখে পড়ে। মুজিব-শতবর্ষ উপলক্ষে এ-বছরের অনেক ক্যালেন্ডারেই বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহৃত হয়েছে। তারপর ঘুমিয়ে যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে স্বপ্নেও দেখতে পান। বঙ্গবন্ধু জসীমউদদীনের নকশি কাঁথার মাঠ বইয়ের কবিতা পড়ছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তবিবুর রহমানের কথোপকথন ধরে গল্প এগোয়। গভীর কৌতূহলের সঙ্গে অপেক্ষা করি যে গল্পটি মাসউদ আহমদ কীভাবে শেষ করেন, তা বোঝার জন্য। তারপর ঠিকই ও বেশ স্মার্টলি গল্পটি এমনভাবে শেষ করতে সফল হয়, সেটি একটি শক্ত অবকাঠামো পেয়ে যায়।

মোজাফফ্র হোসেনের ‘মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ’ গল্পটি ভালোভাবেই পড়তে শুরু করেছিলাম। ওর স্মার্ট গদ্য ও চমৎকার বর্ণনাভঙ্গি আমাকে বেশ টেনেও নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই অসুস্থতা বোধ করি। তখনকার মতো গল্পটি রেখে দিই। পরে আরও একদিন পড়তে যাই, পারি না―মনে পড়ে, শৈশব থেকেই আমি রক্ত দেখলে ভয় পাই, লাশ দেখতে অক্ষম, সিনেমার হত্যাদৃশ্য এলে চোখ বন্ধ করে ফেলি, আজ পর্যন্ত একটিও হরর মুভি দেখিনি। আজ থেকে চৌদ্দ পনেরো বছর আগে ইতালির কোন্ পরিচালক যেন তার একটি সিনেমায় মানুষের মাংস খাওয়ার দৃশ্য এলে, দ্রুত সিনেমাটি অফ করে দিয়েছিলাম। দুঃখিত সম্পাদক মোহিত কামাল, আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করতে ব্যর্থ হলাম, দুঃখিত গল্পকার মোজাফফ্র হোসেন, আমার এ-সীমাবদ্ধতার জন্য। আমি আপনার লেখা হাতে পেলেই পড়ি, গল্প নিয়ে অনেক রকমের কাজ করে চলেছেন আপনি। আশা করি, বাংলা গল্প আপনার হাতে আরও পরিপূর্ণতা খুঁজে পাবে।

নিপুণ শিল্পীর মতো আশান উজ জামান তার গল্পের ক্যানভাসে বিক্ষিপ্তভাবে ভাষার রঙ ছিটিয়ে  গিয়েছেন, ধূসর রঙ, হতাশার রঙ, দুঃস্বপ্নের রঙ, অমাবস্যার কালো রঙ, সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে দৃশ্যের পর দৃশ্য পরম্পরা, আপু নেই কোথাও, আকাশজুড়ে লাল সাপ, সকালের ক্লেদ রোদ, শিকড় হয়ে উঠোন কামড়ে পড়ে থাকা মা, তাকে ছায়া দিতে গাছ হয়ে যাওয়া বাবা, কদিন আগেই এলাকার ক্ষমতা নেওয়া লাবু মিয়ার সংবর্ধনার মঞ্চ, লেলিয়ে দেয়া গুণ্ডাবাহিনীর তাণ্ডবে বনভূমিতে জ্বলছে আগুন, পেট্রোল বোমা ছুড়ছে গুণ্ডা, এইসব পরম্পরার ছবি তুলতে গিয়ে গল্পের উত্তম পুরুষ চরিত্র জুটেছে সাংবাদিকের টেবিলে, জুটেছে থানায়, পুলিশ -সাংবাদিক-গুণ্ডা-অসৎ রাজনীতিবিদ মিলেমিশে অদ্ভুত এক কালো সময়ের ছবি এঁকেছেন ভাষাচিত্রে আশান উজ জামান। তার নায়ক যেন কাফকার দি ট্রায়ালের নায়কের মতো অন্ধকার টানেলে মাথা খুঁড়ে মরছে, যেখানে বাঁচার জন্য একটুকু খড়কুটো হাতড়ে ধরার অবকাশটুকুও নেই! আশ্চর্য নিপুণ বর্ণনায় তিনি এই প্রকৃতিকে ছিঁড়ে খাওয়া, এই প্রকৃতিকে ঘিরে অভ্যস্ত বেঁচে থাকা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়ার চিত্র এঁকেছেন। তার ‘মাস্টারপিস’ গল্পটি সত্যিই একটি শিল্পসফল প্রযোজনা।

এই যে প্রকৃতির ওপর মানুষের থাবা―মানুষ গাছ কাটছে, পাহাড় কাটছে, নদী বিনষ্ট করছে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টে মেতেছে―আমি তো মনে করি, কবি-লেখকদের এসবের বিরুদ্ধে একযোগে বলিষ্ঠকণ্ঠে সোচ্চার হওয়ার সময়ে অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তাদের সব লেখাই এখন উৎসর্গিত হওয়া উচিত এই সুন্দর পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্য।

আশার কথা যে, আশান উজ জামানের পর হামিম কামালের ‘অপদেবতার জন্ম’ গল্পেও দেখি প্রকৃতির প্রতি সেই অমোঘ টান! হামিম কামালও গল্প বলছে উত্তম পুরুষে। আমরা খুব সহজেই সে বর্ণনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠি, সে-ভাষার ভেতর নিজেদের দুঃসহ অভিজ্ঞতাকে অনুভব করি, ‘অনেকদিন পর আমি আমার পুরনো জায়গায় ফিরি, টিনের চালা রেখে গিয়েছিলাম। দেখি টিনবাসীরা ক্ষেপে উঠেছে, ইটের ছাদ তুলছে সবাই। তারপর দেখি গাছপালার ওপর ওরা মহাক্ষ্যাপা। সব কেটে দিয়েছে।’ এরপর একের পর এক গাছগুলোর আত্মসত্তার উন্মোচন, ‘একটা বেল গাছ ছিল সালেহ ভাইয়ের বাসার সামনে। বাক-প্রতিবন্ধী সালেহ ভাই কেবল সেই গাছটার সঙ্গেই নিশ্চিত ভাব বিনিময় করতে পারতেন। কোনো মানুষের সঙ্গে নয়। হিমুদের বাড়ির পেছনে বখাটেদের প্রিয় আমগাছটাও হাওয়া। নেই সালমাদের জ্বিন নামানো সেই বরই গাছও।

তাহলে কি আছে ?

হামিম কামাল তাও জানিয়ে দেন, আছে অসংখ্য মানুষ। আছে বিচিত্র এক সুখ। মানুষ হয়ে মানুষের সমাজে কেবল মানুষ দেখার সুখ।

এইভাবে মনা নিজের শৈশবের কাছে নিজের গাঁয়ে ফিরে এসে দেখে সবকিছুই বদলে গিয়েছে। প্রকৃতি, মানুষ, এমনকি তপু ভাই, যার কাছ থেকে সে বইপড়া শিখেছে। হয়তো তার শিষ্যত্ব লাভের কারণেই ও পেয়েছে লেখক-মানস। আজ সে উপন্যাস লিখছে, গল্প লিখছে। সেই তপু ভাই, বন্ধু ভৈরবের কাছেই শুনল, সেই অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় তপু ভাই এখন ইয়াবার চালান দেয়, টাকা-পয়সার নাড়াচাড়া করে। তপু ভাই বহু ছেলেরে খারাপ করতেছে। বিরাট গ্রুপ তার। এমন সত্য আবিষ্কারের পর আমাদের লেখক বা মনার নিঃশ্বাস তো আটকে আসারই কথা, আমার আনন্দের জ্বলজ্বলে রত্নটা কেউ ঢেকে দিল। শীতল আচ্ছাদনের নিচে মরে গেল আলোটা, কোনোদিন জাগবে না আর। বুকে তপু ভাইয়ের ছোট্ট নিঃশেষিত বুকের খাঁচাটা বাঁধতে থাকল। ভৈরবের সঙ্গে না হলেই ভালো হতো দেখাটা!’

গল্পটা পড়ে বেশ কিছুক্ষণ স্থবির হয়ে থাকি। তারপর সচল হতেই উপলব্ধি হয়, হামিম কামাল কি শুধু স্বরূপনগরের কথাই বলেছে ? পুরো দেশটার মফস্সল শহর বা গ্রামের স্বরূপটাও কি এমনই নয় ? প্রত্যেকটি প্রান্তেই কি জন্ম নেয়নি তপু ভাইয়ের মতো এমন সব অপদেবতা ? পরিবর্তিত সময়, সময়ের অবক্ষয় তপু ভাই চরিত্রের প্রতীকায়নে ওঠে এসেছে। তবে প্রথম থেকে গল্পটি যে মেজাজ নিয়ে, যে আবহ তৈরি করে এগোচ্ছিল, একটা পর্যায়ে এসে গতিটা যেন খানিকটা শ্লথ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, তপু ভাইয়ের সঙ্গে মনার দেখা হওয়ার পর থেকে! তপু ভাইয়ের এই বদলে যাওয়ার অবকাঠামোগত দিকটা যেন আরও খানিকটা তলিয়ে দেখার সুযোগ ছিল। তবে হামিম কামালেরও হয়ত আমার এ সাজেশন খণ্ডানোর যুক্তি থাকতে পারে। একটি গল্প যদি ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনা দেয়, তাহলে সেটাকেই সার্থকতা হিসেবে ধরে নিতে হবে। হামিম কামালের গল্পভাষা সরল, কিন্তু অগভীর নয়। স্বচ্ছন্দে এগোয়, কিন্তু চিন্তার বাঁক খাওয়ায়।

জিল্লুর রহমান সোহাগের ‘বায়েজিদ’ গল্পটির সঙ্গে আমি ঠিক সম্পৃক্ত হতে পারিনি, তবে তাকে সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে। হারুন পাশা ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই আরও ভালো গল্প উপহার দেবে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পলায়নের গল্প, পরাজয়ের গল্প পড়তে ভালো লাগে না। কিন্তু এটাও তো সত্য মুক্তিযোদ্ধারাও অনেকেই ধরা পড়েছিল, টর্চারডও হয়েছিল। হলেও, সে গল্পে যদি থাকে সাহসের পরাকাষ্ঠা, দেশপ্রেমের জন্য মহান হৃদয়ের উৎসর্গের ছবি, সে গল্পও প্রিয় হয়ে ওঠে; যেমন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রেইনকোট। সেই একই কারণে বাশিরুল আমিনের ‘পদশোভা সু-স্টোর’ গল্পটি পড়েও এক ধরনের ভালো লাগায় মন আচ্ছন্ন হলো। ‘পদশোভা সু-স্টোর’ ঠিক মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের গল্প নয়, পরবর্তী সময়ের গল্প। যে সময়ে রাজাকাররা ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দর্পিত জীবন যাপন করছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে ডান পা হারানো ওসমান বয়াতির অবশ্য এসব নিয়ে খেদ নেই। সে গান গেয়ে, সাধারণভাবে জীবন যাপন করে দিন গুজরান করছে। কিন্তু একদিন মফস্সল শহরে গজিয়ে ওঠা গর্জিয়াস এক নতুন জুতার দোকানে গিয়ে যখন শুনল, এটা রাজাকার সাদত লন্ডনির নাতির দোকান, এবং রাজাকার সাদত লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এখন সিলেটেই অবস্থান করছে, তখন সে গো ধরে একজোড়া জুতা না কিনে একটি জুতা কিনবে। দোকানি তা দেবে কেন ? অবশেষে ওসমান বয়াতির জেদ এবং লোকজনের অনুরোধে এক জুতা বিক্রি করতে রাজি হলো রাজাকারের নাতি। ওসমান বয়াতি বিদায় নেওয়ার সময় দোকানিকে আশ্বস্ত করল, চিন্তা করো না, ও জুতার ব্যবস্থাও আমি করে দেব। এর তিন দিন বাদেই বাড়ি থেকে খবর আসে, কারা যেন দাদু সাদত লন্ডনির একটা পা কেটে ফেলেছে। ওর মনে ঘুরপাক খেতে লাগল, দাদার কোন পা-টা কেটে ফেলেছে ? কেন কেটে ফেলেছে ? চমৎকার একটা প্রতিশোধের চিত্র এঁকেছেন গল্পকার বাশিরুল আমিন।

সম্পাদক মোহিত কামালকে ধন্যবাদ যে, প্রতিটি গল্পসংখ্যাতেই তিনি নতুন নতুন প্রতিভাবান গল্পকারদের তুলে ধরেন, উপস্থাপন করেন, এ সংখ্যার মাধ্যমে আমি মঈন শেখ, আশান উজ জামান, রাবেয়া রব্বানী, বাশিরুল আমিনের লেখা প্রথমবারের মতো পড়ার সুযোগ পেলাম এবং বাংলা গল্পের ভবিষ্যত নিয়ে নতুনভাবে আশাবাদী হলাম। একজন সম্পাদকের সার্থকতাই তো এটা, নতুন যুগ সময়ের নতুন যুগসন্ধিক্ষণের লেখককে আবিষ্কার করা। গল্প সংকলনটির প্রতিটি গল্পই পড়েছি, পড়ছি এবং পড়ব, শুধু যাদের গল্প লেখার জন্য দায়িত্ব পেয়েছি, তাদের কথাই লিখলাম। আমাদের গল্প লেখা অন্তহীন চলতে থাকুক, চলতে থাকুক গল্প নিয়ে এমনই গল্প বলা নিত্যদিন।

[ বিশ্লেষক লেখক পরিচিতি]

হামিদ কায়সার-এর জন্ম ১৪ নভেম্বর ১৯৬৬ সালে। আশির দশক থেকে বাংলাদেশের প্রধানতম জাতীয় পত্রপত্রিকা এবং লিটল ম্যাগাজিনে গল্প লিখে আসছেন। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ কলকব্জার মানুষ (১৯৯৭), খেলা দেখে যান বাবু (২০০৭), উপন্যাস লিখেছেন দুটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares