গল্পের স্রোতে শিল্পের ভেলায় : জাকিয়া রহমান

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর ২০২০ গল্পসংখ্যায় প্রকাশিত গল্পের বিশ্লেষণ

[শিল্প বা আর্টে সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সৌন্দর্যের বিষয়টি সম্পর্কিত। নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে শিল্পের সৌন্দর্যকে সকল সৌন্দর্য-চেতনার বলয় থেকে পৃথক দৃষ্টিতে বিচার করা হয়। বাস্তব জীবনের কুৎসিত কদাকার বিষয়ও শিল্পের চেতনায় নান্দনিক হয়ে ওঠে। কালের বিবর্তনে শুধুই নান্দনিকতা বা সৌন্দর্যচেতনা নয়, শিল্প-বিচারে প্রযুক্ত হয় পাশ্চাত্যের অনুরূপ সাহিত্য-বিচারের বিভিন্ন দর্শন। সাহিত্য-কলার গদ্য শাখার অন্তর্গত ছোটগল্পের আখ্যানে সমকালের গতিশীলতা বা প্রবহমানতা ক্রিয়াশীল তা অজানা নয়। অর্থাৎ ছোটগল্প মূলত জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তের পরিপূর্ণ আখ্যান। ছোট ছোট মুহূর্তের বিশেষ রূপ বর্ণনায় লেখকের সার্থকতা মূলত তাঁর সৃষ্টিকর্মের শিল্পসার্থকতার নামান্তর। ঔপনিবেশিকতা, আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা―সকল পর্যায়ের নির্মাণ-বিনির্মাণে গল্পের আখ্যান হয়ে ওঠে জীবনঘনিষ্ঠ। জীবনের সার্বিক সমস্যা ও জটিলতাকে কখনও প্রতীকায়ন বা রূপকের অন্তরালে আবার কখনও সরল বুনোট কাহিনির ভাঁজে লেখক উপস্থাপন করেন। জীবন-জটিলতার গভীরতা  উপলব্ধিতে, উপস্থাপনে ও চরিত্র নির্মাণে লেখকের ব্যক্তি-চেতনার উপলব্ধিজাত বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। নির্বাচিত বিষয় ও ভাব প্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং বৈচিত্র্যে সঙ্গত কারণেই সাহিত্যের উৎকর্ষ-অপকর্ষের প্রশ্নে সমালোচনা শব্দটির সংযুক্তি ঘটেছে। সমালোচনার মাধ্যমে শিল্পের চতুরঙ্গ বিশ্লেষিত হয়ে অন্তর্নিহিত ভাব-সত্যের উন্মোচন ঘটায়। যথার্থ শিল্পী তার সৃজন নৈপুণ্যে সমাজসংস্কারসহ সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাকে উপস্থাপন করে যেন বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটান। জীবনের জটিলতা থেকে উত্তরণের পথ নির্দেশ করেন। কালের স্রোতে গল্পের বিষয় ভাবনা, শিল্পবোধ, রচনাশৈলী, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং ভাষার নিয়ত পরিবর্তন ঘটেছে। বহু রূপান্তরের ক্রমবিবর্তন বাংলা সাহিত্যের গদ্যের শাখায় যে নবরূপের প্রকাশ ঘটায় তা মূলত সমকালীন বিষয় ও ক্রমোন্নত শিল্পবোধ সংবলিত। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহিত্য পত্রিকা শব্দঘর অক্টোবর-নভেম্বর ২০২০ সংখ্যায় প্রকাশিত অগ্রজ ও তরুণ কথাশিল্পীদের নতুন গল্পের ডালির সূচিপত্র-১ এর আঠারোটি গল্পের বিষয়কেন্দ্রিক বিশ্লেষণে গল্পগুলোকে কয়েকটি শ্রেণিতে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। মূল বিষয়ানুসারে শ্রেণিবদ্ধ করলেও প্রায় সকল গল্পেই সংযোজিত হয়েছে যাপিত জীবনের বহুমাত্রিক সমকালীন সমস্যা এবং চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। গল্পে লেখক কর্তৃক প্রযুক্ত রচনাশৈলীর মাত্রাবোধ সমালোচনায় বিবেচ্য। বিষয় বিশ্লেষণে ‘যে লাশ নিখোঁজ হয়ে যায়’, ‘করোনার জলছবি’, ‘বন্ধুর বন্ধু’, ‘ক্রীড়নক’কে করোনাকালীন গল্পের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। ‘বিস্মরণ’ গল্পে করোনাভাইরাসের আগমনে লেখকের ভাইরাস সম্পর্কিত নব উদ্বেগ ধ্বনিত হওয়ায় এ গল্পকেও করোনাকালীন রচনার অন্তর্ভুক্ত করা যায়। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক গল্পের মধ্যে রয়েছে―‘মুক্তিযোদ্ধা আকবরের সেই গল্পটা’ এবং ‘আলোক কন্যা’। ‘দেউলিয়া’ গল্পটি পৌরাণিক কাহিনি-নির্ভর। ‘রহিম চাচার ডেরা’ অলৌকিক গল্প। সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবহুল গল্পের অন্তর্গত হয় ‘ঘর-সংসার’, ‘বিনিময় নয় বিচার চাই’, ‘ক্ষমতা’, ‘কুকুর কাব্য’, ‘জিন ও জিনগিরি সমাচার’, ‘কানা ব্যাওড়া’, ‘উত্তম কুমার’, ‘সাদার্ন ভিউ’ নামক গল্প। ‘কালাকান্দুর ভোর’ গল্পটিকে নিম্ন শ্রেণির মানুষের জীবিকা নিয়ে রচিত গল্পের শ্রেণিভুক্ত করা যায়।]

হোসেনউদ্দিন হোসেন

ঘর সংসার

গল্পটির কাহিনি বর্ণিত হয়েছে আত্মকথন স্টাইলে অর্থাৎ উত্তম পুরুষে। গল্প কথক নিজের পরিচয় দিয়েছেন মুর্তজা আহমেদের বাল্যবন্ধু হিসেবে। গল্পকথকের আত্মজীবনী বর্ণনায় হাহাকার ও শূন্যতার কৃষ্ণগহ্বর পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপনের প্রয়োজনে বন্ধু মুর্তজা আহমেদ এবং স্ত্রী উষসীর কাহিনিতে আগমন ঘটেছে। উষসী গল্পকথকের স্ত্রী হওয়ায় ‘ঘর সংসার’ গল্পের মূল অধীশ্বরী হিসেবে কেন্দ্রীভূত চরিত্র। কাহিনি বিশ্লেষণে তিনটি মূল বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, প্রতিটি মানুষ তার চেনা পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে লালিত হয়। সঙ্গত কারণেই চেনা সংস্কার ও সংস্কৃতি শরীরের চামড়ার মতো তার চেতনা ও মননের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। অস্তিত্ব ও ভাবকল্পনা সকলকে অধিকার করে থাকে। একটি দেশের সভ্যতা অন্যদেশ বা সংস্কৃতিতে অসভ্য বলে বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। দ্বিতীয়ত, গল্পকথকের ঘর সংসার পরিকল্পনায় অর্থাৎ সে জীবনসঙ্গী নির্বাচনে ভুল করেছে। তাদের সংসারে পারস্পরিক বিজাতীয় সংস্কৃতির বিপরীতধর্মীচর্চা প্রবাহিত হওয়ায় দূরত্ব বেড়েছে, ক্ষণে ক্ষণে ঝলসে উঠেছে গল্পকথকের জীবন। ছোট ছোট পোড়া ক্ষতে বৃদ্ধ বয়সে পচন ধরেছে। অসহ্য বোধ হওয়ায় তাকে ফিরতে হয়েছে নিজের মাটির টানে নিজস্ব সংস্কৃতির কাছে। তৃতীয়ত, সহপাঠী বন্ধু মুর্তজা আহমেদের দেশকে, দেশের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকার মধ্য দিয়ে সুখী জীবন ও শান্তিময় ঘর-সংসার বর্ণনা করা হয়েছে। ‘ঘর-সংসার’ গল্পে দেশীয় এবং বিজাতীয় সংস্কৃতির সংস্পর্শে দুই বন্ধুর দাম্পত্য জীবনে প্রাপ্তির তুলনা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

‘ঘর সংসার’ গল্পের সূচনায় লেখক গল্পকথক ও মুর্তজা বশীরের স্কুল জীবনে তাঁদের বন্ধুত্বের গাঢ় বন্ধনকে বর্ণনা করেছেন। মুর্তজা বশীর তার কর্তব্য পালনে ও সততায় এক অনন্য নাম। পেশাগত জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে দুই বন্ধুর দূরত্ব বেড়েছে। মুর্তজা গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার হয় এবং কথা রাখতে কৃতজ্ঞতাবশত অরণিকে বিয়ে করে ঘর সংসার জীবনে জড়িয়ে যায়। অন্যদিকে গল্পকথক বিদেশে দূতাবাসের কূটনৈতিক দায়িত্বে নিয়োজিত হয়। লন্ডনে অবস্থানকালে সেখানে বাঙালি কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুবাদে উষসীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, প্রেম, অবশেষে বিয়ে। স্বপ্নের সংসার গঠনকল্পে বিয়ে করলেও তা প্রকৃত ঘর-সংসার হয়ে ওঠেনি। উষসী বাংলাদেশি হলেও লন্ডনে বিশ বছর অতিবাহিত করে নিজেকে লন্ডনের সংস্কৃতির একজন করে তুলেছে। বাঙালি সংস্কৃতিকে সে লালন করে থাকে নি। উষসী পুরোদস্তুর নিজেকে পশ্চিমা সংস্কৃতির মেয়ে করে তুলেছে। শেকড়ের টানে ঘর-সংসার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বিয়ে করলেও গল্পকথক উষসীর চোখে আনকালচার্ড ও মূর্খ এবং মডার্ন লাইভ সম্পর্কে অজ্ঞ একজন মানুষ। দুটি বিপরীতমুখী সংস্কৃতি ও সভ্যতার সংঘর্ষে উষসী ও তার স্বামী কেউই সুখী হতে পারেনি। ‘ঘর সংসার’ গল্পের নামকরণটি বিষয়-সম্পৃক্ত বিধায় যথার্থ। গল্পে দুটি ভিন্ন জাতির ভিন্ন সংস্কৃতির একত্রে বসবাস এবং বিদেশি সংস্কৃতির বহেমিয়ানায় ভাসিয়ে দেওয়া উষসী ও গল্পকথকের সম্পর্কের তিক্ততার বর্ণনায় পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। একই কাহিনি তাদের চাওয়া পাওয়ার অমিল ও উষসীর উচ্ছৃঙ্খলতা বর্ণনায় লেখক দীর্ঘ কাহিনির অবতারণা করেছেন।

বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিষয়ে অনার্স কোর্স সম্পন্ন করা উচ্চশিক্ষিত উষসীর সঙ্গে কাহিনিতে বর্ণিত উষসী চরিত্র অনেকটাই বেমানান বোধ হয়েছে। কেননা লন্ডনের নাগরিক উচ্চশিক্ষিত নারীর আচার বা ঘর-সংসারে বাঙালি সংস্কার নাও থাকতে পারে কিন্তু তাঁর চিন্তা চেতনা ও ভাষাগত ব্যবহারে উচ্চশিক্ষার স্পষ্ট ছাপ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যা উষসী চরিত্রে অনুপস্থিত।

অনেকটা গ্রাম্য অশিক্ষিত মানুষের মুখের স্ল্যাং ভাষা লেখক প্রতিস্থাপন করেছেন উচ্চশিক্ষিত উষসীর মুখে। যা বেমানানই শুধু নয় অসামঞ্জস্যপূর্ণও। উষসীর স্বামীর প্রতি অভিযোগ ব্যাখ্যায় ও নিজস্ব মতামত প্রদানে বাংলা ইংরেজি মিশ্রিত ভাষা লেখক অনায়াসে ব্যবহার করলেও  বিষয় সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচ্য হতো। উষসীর মুখ থেকে অনবরত বের হওয়া ‘মাগী’ শব্দ যা অসঙ্গত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অশ্লীলও বটে। উষসীর মুখে ব্যবহৃত অশ্লীল ও অশিক্ষিত ভাষা চরিত্রটিকে তার সামাজিক অবস্থান থেকে টেনে নিম্নস্তরে নামিয়ে আনে। যথাযথ ভাব প্রকাশে পরিবেশ ও চরিত্র বিশেষে সাহিত্যে ভাষার ব্যবহার স্বীকৃত। চরিত্রের অবস্থান ও পরিবেশ অনুযায়ী ব্যবহৃত ভাষা অশ্লীলতা দোষে দুষ্ট হয় না। ‘ঘর সংসার’ কেন্দ্রিক গল্প রচনায় দাম্পত্য সম্পর্ক ব্যাখায়, স্বামীর প্রতি সন্দেহ প্রকাশে কাহিনির বিস্তারে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা সঙ্গত-সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা নিয়ে  সমালোচক মনে প্রশ্ন ওঠে। কাহিনিতে একই ঘটনা বা ভাবের পুনরাবৃত্তিতে অহেতুক কাহিনির দৈর্ঘ্য বাড়ানো হয়েছে।

উষসী লন্ডনের সংস্কৃতির মানুষ হলেও তার স্বামী গল্পকথক বাংলাদেশি। তিনি রক্ত, মাংসে, মজ্জায় বাঙালি সংস্কার ধারণ করেছেন। প্রথম পিতা হওয়ার আনন্দে তা প্রকাশ পেলেও বাঙালি পিতার দায়িত্ববোধ এ চরিত্রে অনুপস্থিত। উষসী প্রথম সন্তানকে লালন পালনের জন্য হোমে পাঠিয়ে দিলেও সেখানে পিতা নিশ্চুপ থেকেছে। স্ত্রীর বশীভূত  মেরুদণ্ডহীন পুরুষ চরিত্রের সমতুল্য গল্পকথক চরিত্রটি। কেননা প্রথম সন্তানকে হোমে পাঠিয়ে সে স্ত্রীর সঙ্গে স্বাভাবিক সুখী দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেছে। সন্তানকেন্দ্রিক দায়িত্বশীল স্নেহপরায়ণ বাঙালি পিতাকে আমরা গল্পকথক চরিত্রে পাই না। পরিবেশ-পরিস্থিতি ক্রীড়নক বলে যদি দাবি করা হয় তাহলে প্রশ্ন থাকে পিতা হিসেবে এ চরিত্রটি উষসীর সঙ্গে এ বিষয়ে কিঞ্চিৎ বাকযুদ্ধে লিপ্ত হলো না কেন ? এমন তো নয় তাদের দাম্পত্যে কখনও বাকযুদ্ধ হয়নি ? এ চরিত্র সন্তানকে হোমে পাঠানো নিয়ে মতাদর্শিক কোনো বিক্ষোভ প্রকাশ করে নি। এক্ষেত্রে চরিত্রটি বাঙালি পিতা হিসেবে পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে না।

গল্পকথক উষসীকে বিয়ে করে শেষ জীবনে মাত্র একবার তার ভুল স্বীকার করেছে। উষসীর উদ্ধত আচরণ, অশ্লীল উক্তি, সন্দেহ এবং বেপরোয়া ছেলে-বন্ধুদের সঙ্গে নিরুদ্দেশ হয়ে রাত্রিযাপন কোনো কিছুই বাঙালির সংস্কারবাদী পুরুষের মেনে নেওয়ার মতো নয়। সেক্ষেত্রে তাদের ঘর-সংসার প্রতিনিয়ত সাংঘর্ষিক পরিবেশে এতটা দীর্ঘসময় টিকে থাকার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। সঙ্গত কারণেই গল্পকথক পুরুষ চরিত্রটিকে তার সামাজিক অবস্থান ও চারিত্রিক গুণাবলির পারস্পরিক সংঘর্ষে অস্তিত্বহীন অসামঞ্জস্যপূর্ণ চরিত্র বলে মনে হয়। কেননা, বিদেশে দূতাবাসে কূটনৈতিক দায়িত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে এরূপ অস্তিত্বহীন, ব্যক্তিত্বহীন, দুর্বলচেতনার পরনির্ভরশীল পুরুষ কীভাবে চাকরির জন্য মনোনীত হয় ? অবশ্যই বিচক্ষণ, ব্যক্তিত্ববান ও কূটনৈতিক দূরদর্শি মানুষই এ কাজে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। ‘ঘর সংসার’ গল্পে এরূপ অযোগ্য চরিত্রকে উচ্চপদস্থ করা লেখকের নিছক কল্পনাপ্রবণতার প্রকাশ। চরিত্রটি বাস্তবসম্মত হয়েছে বলে মনে হয় না।

উষসীর ভাষায় শব্দের ব্যবহার এবং তার স্বামী গল্পকথকের বাঙালি সংস্কারে বড় হওয়া সত্ত্বেও চারিত্রিক শীতলতা; সর্বোপরি তাদের যোগ্যতা ও সামাজিক অবস্থানের সামগ্রিক বিচার এবং আচরণের অসামঞ্জস্যতায় বলা যায় গল্পের প্রধান দুটি চরিত্রই আরও জীবন্ত হয়ে উঠতে পারত।

গল্পকথককে নির্মল পরিবেশের সন্ধান দিয়ে কদর্যজীবন থেকে মুক্তি দিয়েছে বন্ধু মুর্তজা আহমেদ। শেষ সময়ে বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশে সকলের অগোচরে তার যাত্রা। প্রথমাবস্থায় বলেছে দশ দিনের জন্য যাবে। পরবর্তীকালে দেখা যায় সে সমুদয় সম্পদ স্ত্রী ও সন্তানদের নামে উইল করে বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশে সাধারণ যাত্রীবেশে ট্রেনে চেপে বসে। মনে হয় যেন চিরদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। গল্পকথক বৃদ্ধ বয়সে বন্ধুর বাড়িতে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে গিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবে এমন ঘটনাই বা কতটা বাস্তবতার দাবি রাখে ?

‘ঘর সংসার’ গল্পটি গল্পকথকের ব্যর্থ বিশ্বাস ও ভালোবাসাবিহীন ঘর-সংসারের গল্প হয়ে উঠেছে। চরিত্র নির্মাণে কিছুটা প্রশ্ন থাকলেও গল্পের বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নামকরণটি যথাযথ হয়েছে। গল্পে কাহিনির অন্তরালে লেখকের স্বদেশপ্রীতি তথা দেশের রীতি-আচার ও সংস্কারের প্রতি অকৃত্রিম মমতা ও ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে।

হরিপদ দত্ত

যে লাশ নিখোঁজ হয়ে যায়

গল্পের চরিত্র নির্মাণ ও বিষয় ভাবনায় বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। করোনাকালীন রচনা হলেও এ রচনায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, নৃশংস হত্যাকাণ্ড, প্রাণ বাঁচাতে বর্ডার পেরিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ব্রজগোপালের দুঃখেমোড়া জীবন-ইতিহাস। শরণার্থী শিবিরে তাদের হীন জীবনযাপনসহ স্বাধীনতা পরবর্তী যে শূন্যতার সূচনা তা বিলীন হয় ২০২০ সালের করোনা মহামারির মৃত্যুর মিছিলে। ব্রজগোপালের জীবনযুদ্ধের পরীক্ষার সূচনা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাঞ্জাবিদের গ্রাম আক্রমণের মধ্য দিয়ে। জীবন বাঁচাতে অবিরাম ছুটে চলা। ২০২০ সালেও যেন সে ছুটে চলার অবসান ঘটে না এমনই এক ভাগ্য বিড়ম্বনায় বিলম্বিত চরিত্র ব্রজগোপাল। জন্মস্থানের মায়া, জন্মদাতার মায়া, সকল মায়ার বিচ্ছিন্নতায় বীভৎস বিচ্ছিন্ন মানব জীবনের প্রতিচ্ছবি ব্রজগোপাল। ব্রজগোপালের পোড় খাওয়া জীবনের ছিঁড়ে যাওয়া সুতোকে জোড়া দেওয়ার নিরন্তর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় আদিম জীবনে পদার্পণ তবুও স্বস্তির দেখা মেলে না। ‘যে লাশ নিখোঁজ হয়ে যায়’ অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার গল্প। নৃশংসতার গল্প। ভূখণ্ডের বক্ষপিঞ্জরে স্থান হলো না এমনই এক ভাগ্যাহত পিতার সন্তান ও এমনই এক সন্তানের জন্মদাতা ব্রজগোপাল। কীটপতঙ্গসম জীবনদর্শনে লেখক বিদ্রোহী হয়েছেন। বারবার ঈশ্বরকে কটাক্ষ করেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে ঈশ্বরের পক্ষপাতিত্ব লেখকের নজর এড়িয়ে যায় না। প্রতিটি লেখকের নিজস্ব স্টাইল রয়েছে। হরিপদ দত্তের ‘যে লাশ নিখোঁজ হয়ে যায়’ গল্পটি লেখার স্টাইল ও জীবনের অতল ছুঁয়ে ইট, সুরকি, বালু উত্তোলনের দক্ষতায় অনেকটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা স্টাইলের দেখা মেলে। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে জেলে জীবনের অকৃত্রিম চিত্র, প্রাগৈতিহাসিকের ভিখুর দুর্মর জীবন সংগ্রামের মধ্যে ডুবে গিয়ে পাঠক যে উত্তেজনা অনুভব করে , ‘যে লাশ নিখোঁজ হয়ে যায়’ অনেকটা সে পথের অনুসারী রচনা।

পাঞ্জাবি অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ব্রজগোপালের কোমর বাঁকা, দৌড়ে পালাতে অক্ষম পিতাকেও মুক্তি দেয় না। অপরাধ তিনি ঘরে জয় বাংলার পতাকা রেখেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ব্রজগোপালের পিতার বাঁকা কোমর যেমন তাকে স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে দেয় না তেমনই পরাধীন শোষিত বাংলাও ঝলমলে স্বাধীন রূপে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। শাসকগোষ্ঠী শক্তি প্রয়োগে বাংলা মায়ের কোমর বাঁকা করে রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় জয় বাংলার সমর্থক ব্রজগোপালের পিতার বাঁকা কোমরে পরাধীন বাংলার অক্ষমতা ফুটে উঠেছে।

ইংরেজ জামানার চরসিন্দুর কটন মিলের নামোল্লেখে লেখক মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল থেকে গল্প রচনার সিদ্ধান্ত নিলেও জাতীয় জীবনে পরাধীনতার শেকল সন্ধানে আরও একবার পেছনে তাকিয়েছেন। ব্রিটিশ শাসনের কথাটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন‌। প্রকৃতপক্ষে বাঙালির পরাধীন জীবনের সূচনা ব্রিটিশ শাসনের সময়কাল থেকেই। মুক্তি সংগ্রামের সূচনা ১৯৭১ নয়, এ সংগ্রাম বাঙালির অবচেতন মনে রক্ষিত ছিল ব্রিটিশ শাসনের সময়কাল থেকে।

হরিপদ দত্তের ‘যে লাশ নিখোঁজ হয়ে যায়’ গল্পের বিষয়বস্তুতে সেকাল ও একাল বিলীন হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও করোনাযুদ্ধ দুই কালের সীমায় অবস্থান করে উভয় কালের সংযোগ সাধন করে। পাঠক সমালোচক অবলীলায় দুইকালেই পরিভ্রমণ করে। আকস্মিকভাবে মিলে যায় অনাকাক্সিক্ষত শত্রুর আক্রমণ ও অনিশ্চিত জীবন। গল্পের নামকরণে  মৃত্যুর বীভৎসতা ফুটে উঠেছে। এ মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু বা হত্যা নয়। নৃশংস শ্বাপদ প্রাণী দ্বারা সংঘটিত মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর। যে মৃত্যুতে দেহাবশেষ বা নিথর প্রাণহীন দেহের অনুসন্ধানও মেলে না। যুদ্ধের ডামাডোলে ব্রজগোপালের বাবার মৃত্যুর পরে সপরিবারে বর্ডার পাড়ি দিয়ে ভারত চলে যায় এবং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। ভারতে যাওয়ার পরেই তার ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা এবং হতাশার মাঝে ফুটে উঠেছে সমকালীন সময়ের চিত্র। প্রথমত, শরণার্থী শিবিরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। দ্বিতীয়ত, সেখানকার খাদ্যসংকটের ইঙ্গিত। খাদ্য সংকটেই নারীরা হয়তো গণিকাবৃত্তি বেছে নিয়েছিল, অথবা সেখানেও ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তৃতীয়ত, ব্রজগোপালের চোখে স্বাধীনতার স্বরূপ। চতুর্থত, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ব্রজগোপালের স্বপ্নকেন্দ্রিক আলোচনায় বাস্তবতর উন্মোচন ঘটে।

শরণার্থী শিবিরে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে ব্রজগোপালের মা, ভাই-বোন সকলেই মারা যায়। শরণার্থী শিবিরে কলেরার প্রকোপ প্রমাণ করে সেখানকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। অস্বাস্থ্যকর ঘিঞ্জি পরিবেশে মানুষগুলোর জীবনাচরণ চতুষ্পদ প্রাণীর সমপর্যায়ে নেমে আসে। মায়াবতীর পরিণতি প্রমাণ করে শরণার্থী শিবিরে নারীরা সে সময় পেটের ক্ষুধায় কখনও নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছে। কখনও আবার প্রতারিত হয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মায়াবতীর গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের ঘটনা এমন বীভৎস সত্যতার প্রমাণ দেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শরণার্থী শিবিরের সবাই দেশে ফিরে গেলেও ব্রজগোপাল শিবিরেই অবস্থান করে। অবশেষে শেষ আশ্রয়টুকুও তাকে ছাড়তে বাধ্য করা হয়। কাঁটাতারের সীমানায় দাঁড়িয়ে সে স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডের দিকে চেয়ে থাকে। তার অবচেতন মনে ভেসে ওঠে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নাজুক অবস্থা। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অবহেলায় অবাঞ্ছিত সর্বহারা জীবনে স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দে আত্মহারা হওয়ার পরিবর্তে যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্ষুধার্ত বাংলাদেশের কল্পনায় সে বেদনার্ত হয়ে ওঠে। দেশে ফিরে নতুন করে জীবন সাজানোর মনোবল সে হারিয়ে ফেলেছে। তার চোখে শুধু ক্ষুধা-দারিদ্র্য আশ্রয়হীনতা আর অনিশ্চয়তা।

ব্রজগোপাল হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশে অবস্থানকালে তার পূর্বপুরুষ হয়তো দেশভাগের সময়েও নির্যাতিত হয়েছিল। হয়তো লাগাতার সংখ্যালঘু নির্যাতনে দেশ ছাড়ার ইঙ্গিত থাকায় ব্রজগোপাল দেশের প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে থাকে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি রাজাকারদের আক্রোশসহ পাঞ্জাবিদের গুলিতে পিতার মৃত্যুর পরে জীবন রক্ষার্থে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ব্রজগোপাল আর দেশে ফিরে আসার টান অনুভব করেনি। যুদ্ধশেষে জীবনের সমাধান প্রত্যাশায় ভারতের মাটিতেই স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখে কিন্তু ভারতের মাটি শরণার্থী ব্রজগোপালকে আপন করে নেয় না। অনুমোদন করে না তার নাগরিকত্ব। দেয় না একটু ভোট দেওয়ার অধিকার। গ্লানি হতাশায় জর্জরিত ব্রজগোপাল আরেক শরণার্থী মায়াবতীর আহ্বানে ঈশ্বরকে ভুলে যেতে মনস্থির করে। শরণার্থী শিবিরে প্রিয়জন হারানোর ব্যথা বুকে চেপে রাখলেও শরণার্থী শিবির থেকে বিতাড়িত হওয়ার পথে বুকের সকল ব্যথা বাঁ কাঁধে আর ডান কাঁধে ভর করে আতঙ্ক। লেখক কর্তৃক ব্রজগোপালের জীবনের দুঃখের ভার ও অসহায় ক্লান্ত জীবনকে প্রকাশ করতে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে বুকের গহিনে গুমরে কাঁদা ভয় আতঙ্ক আর প্রিয়জন হারানোর শূন্যতাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। ভূখণ্ডের মাটি কাঁটাতারের বেড়ায় দ্বিখণ্ডিত হলেও মাথার ওপরে রয়েছে দুই দেশে বিলীন হয়ে যাওয়া একটি আকাশ। লেখক এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেশের সীমানা জাতিভেদ ধর্মভেদ বর্ণপ্রথা যা কিছু প্রচলিত সকলেই মনুষ্য সৃষ্টি অর্থাৎ এক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তা নীরব। মানুষ তাদের নিজেদের স্বার্থে অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূখণ্ডকে টুকরো টুকরো করেছে। অন্যদিকে  আকাশ সাধারণের নাগালের বাইরে হওয়ায় তা আজও অখণ্ডই রয়ে গেছে।

শরণার্থী শিবিরের মায়াবতী যুদ্ধের ভয়াবহতা ও অভাব দারিদ্র্যের কষাঘাতে অনুভূতিশূন্য প্রায় পাগল জীবনে ঈশ^র, ধর্ম, রীতি-নীতি সকল কিছুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। শরণার্থী শিবিরে নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে অথবা ধর্ষিত হওয়ার পরেও নির্দ্বিধায় ব্রজগোপালের সন্তানের মা হতেও নির্দ্বিধায় সম্মতি দিয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক গল্পের পঙ্গু ভিখুর নারীসঙ্গে রসময় আদিম জীবন উপভোগের আকাক্সক্ষায় পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত শরীরের অধিকারী পাচিকে পাবার সংঘর্ষে বশিরের বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়েছিল। পাচিকে কাঁধে নিয়েই  ভিখু অদম্য আদিম জীবনে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। সর্বহারা ব্রজগোপাল সকলকে হারিয়ে একটু মমতার স্পর্শ ও নারীসঙ্গ লাভের বাসনায় নোংরা কদাকার কুৎসিত পাগলি মায়াবতীকে ঘরে এনে তাকে সংসারের বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছে। ভিখু চরিত্রের বীভৎসতা ব্রজগোপাল চরিত্রে অনুপস্থিত এ কথা স্বীকার করে নিয়েও বলতে হয় ফ্রয়েডীয় লিবিডো তাড়নায় ভিখুর মতো ব্রজগোপালও নারীসঙ্গ কামনা করেছে। সঙ্গত কারণেই মায়াবতী কুৎসিত কদাকার নারী হলেও তাকে ঘরে স্থান দিয়েছে। ব্রজগোপালের ষোড়শী কন্যা কোনো এক ছেলের হাত ধরে পালিয়ে গেলেও সে নিশ্চুপ থেকেছে। বস্তির নিম্নশ্রেণির নোংরা পশুসম জীবন থেকে কন্যার সুখী হওয়ার বাসনায় পালিয়ে যাওয়াকে ব্রজগোপাল মুক্তি ভেবেছে। ব্রজগোপালের একমাত্র ছেলে মহারাজ। লেখকের ভাষায় বড় ভাবুক, বড় টেটন সে। বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন নিজের বাড়ি, ভোট দেওয়ার অধিকার, রেশন কার্ডসহ নাগরিকের সমূহ সুবিধা অধিকার করায় সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। জন্মের পর থেকে পিতার ক্লেদময় জীবন, না পাওয়ার যন্ত্রণা অর্থাৎ অপূর্ণ স্বপ্নের হাহাকার, ক্রমাগত বঞ্চিত হওয়া দেখে মহারাজ বড় হয়েছে। সঙ্গত কারণেই বস্তির অন্য ছেলেদের মতো বিজ্ঞানী ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্ব মতে শুধু শরীরের টানে বিয়ে করাকে সর্বস্ব জ্ঞান করেনি। পিতার ক্ষয়ে যাওয়া স্বপ্ন তথা না পাওয়ার পূর্ণতা দিতে সে বেশি টাকা পারিশ্রমিক পাওয়ার লোভে মুম্বাই যায়।

মহারাজের মুম্বাই থাকা অবস্থায় ভারত সরকার করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আকস্মিক লকডাউন জারি করেন। মহারাজ অসংখ্য মানুষ ও তাদের গায়ে জড়ানো কোটি কোটি করোনাভাইরাসের সূচালো কণিকার সঙ্গে এক ট্রেনে বাড়িতে ফিরে আসে। ট্রেনের মধ্যে জ্বর আসলেও সে কোভিড আশঙ্কায় শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষক পুলিশের চোখকে ধোঁকা দিয়ে পালায়। করোনা আতঙ্কে ভীতি জাগে হাসপাতাল মানেই মৃত্যু। শতকষ্ট, গ্লানি ও জন্তুসম জীবনেও মানুষের বেঁচে থাকার প্রবণতা এখানে ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ করোনাকালীন সময়ে এমন গুজব উঠেছে যে কোভিড আক্রান্ত রোগীকে জোরপূর্বক হত্যা করা হচ্ছে। যুক্তি, আক্রান্ত ব্যক্তি যেন ভাইরাস না ছড়াতে পারে। হয়তো সে আতঙ্কের দীর্ঘশ্বাস- ‘হাসপাতাল মানেই মৃত্যু!’

মহারাজের বাড়ি পৌঁছানোর পূর্বে পথিমধ্যে শারীরিক লক্ষণ দেখে মহল্লাবাসী বুঝে যায় সে কোভিড আক্রান্ত। পুলিশ তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। কিছুদিন পরেই তার মৃত্যুর সংবাদে ব্রজগোপাল ও মায়াবতী সন্তানের মুখটি একবার দেখার প্রত্যাশায় ছুটে যায় হাসপাতালে, শ্মশানে। অগণিত লাশের ভিড়ে মহারাজের লাশ হারিয়ে যায়। ব্রজগোপালের চোখে ভেসে ওঠে মুক্তিযুদ্ধে তার বাবার লাশ হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতি। ব্রজগোপালের অবচেতন মনে এই দুই মৃত্যু মিলেমিশে একাকার হয়েছে। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকা বিমর্ষ ব্রজগোপাল ও মায়াবতীর চোখের সামনে অবচেতন মনের কল্পনা বাস্তব রূপ ধারণ করেছে। অর্থাৎ দুটো লাশ এগিয়ে চলেছে। একটি ব্রজগোপালের বাবার এবং অন্যটি ছেলে মহারাজের হারিয়ে যাওয়া লাশ।

ব্রজগোপালের পূর্ব ও উত্তরপুরুষের লাশ একাত্ম হয়ে মিলিত হয়েছে দুটো কাল, দুটো ইতিহাস ও ঐতিহ্য। পাঠক সমালোচক সমকালে অবস্থান করেও অবলীলায় পৌঁছে গেছে যথাক্রমে ইংরেজ শাসন, মুক্তিযুদ্ধ এবং করোনা যুদ্ধের মঞ্চে। গল্পের দুইকাল মিলে একাকার হয়ে যাওয়া এবং চেতন-অবচেতন মনের চিন্তার একীভূত হয়ে যাওয়ায় ‘যে লাশ হারিয়ে যায়’ গল্পে সামাজিক জাদুবাস্তববাদ এবং পরাবাস্তববাদের প্রয়োগ লক্ষণীয়। গল্পকার হরিপদ দত্ত ধর্মশাস্ত্রের ফাঁকি নিয়েও মন্তব্য করেন। মৃত পিতার স্বর্গলাভের সকল ক্ষমতা শুধুমাত্র পুত্র হওয়ার দাবিতে পুত্রের হাতে ন্যস্ত হওয়ার মত ধর্মশাস্ত্রের অযৌক্তিকতাকে কটাক্ষ করেছেন। করোনা মহামারির দাপটে বন্ধ হয়েছে মন্দিরের কপাট। প্রগতিশীল লেখক স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন রেখেছেন ভাইরাসের শক্তি কি দেবতার চেয়েও বেশি? লেখক বিদ্রোহ করেছেন নিয়তির বিরুদ্ধে। বলেছেন চরমতম দার্শনিক সত্য কথা। নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় মানুষ ক্রীড়নক মাত্র। মহারাজের মুম্বাই অবস্থানকালে লেখকের উক্তিটি ভাগ্যের বিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকে। ‘বাঙাল পোলা, কোথায় ছিল তোর বাপ, কোথায় বা জন্ম দিল তোরে! পেটের দায়ে এলি বা কোথায় ?’

কাহিনি পরিকল্পনা, ভাষার ব্যবহার, চরিত্র সৃজনের দক্ষতা ও শিল্প নির্মাণে পাশ্চাত্য ফ্রয়েডীয় লিবিডো তত্ত্ব, সামাজিক জাদুবাস্তববাদ ও পরাবাস্তববাদের প্রয়োগে গল্পটি হয়ে উঠেছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এক অনন্য রচনা। এই গল্পের মুক্তিযুদ্ধ ও করোনাকালীন সময়ের মাঝখানে স্থাপিত হয়েছে ব্রজগোপালের তিন পুরুষ। দুই পুরুষ-কালের গর্ভে তাদের মৃতদেহসহ বিলীন হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী বিষণ্ন রক্তাক্ত বেদনার্ত হৃদয়ের অধিকারী চরিত্র ব্রজগোপাল। ব্রজগোপালের ট্র্যাজেডিময় শূন্য জীবনেই গল্পের সমাপ্তি।

সেলিনা হোসেন

করোনার জলছবি  

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট মহামারি ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন রচিত ‘করোনার জলছবি’ গল্পের নামকরণে সুস্পষ্ট হয় গল্পটি সমসাময়িক কালের সৃষ্টি। চীনের উহান শহরের মহামারি সৃষ্টিকারী এ ভাইরাস খুব দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশও সংক্রমণের শিকার হয়। করোনার সংক্রমণ রোধে বিশ্বের সকল দেশেই অকস্মাৎ অনির্দিষ্টকালব্যাপী লকডাউনে প্রথমাবস্থায় মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকট শুরু হয়েছিল। লকডাউনের অস্থির পরিবেশ, বন্দিজীবন, মৃত্যুর মিছিল, প্রতিনিয়ত মৃত্যুর হাতছানি, নিস্তব্ধ পরিবেশে মনস্তাত্ত্বিক সংকট নিত্য জীবন পরিচালনায় তীব্র প্রভাব ফেলেছে।

করোনার জলছবি গল্পে বিশাখা চরিত্রটি আকর্ষণীয়। সে কবিতা লেখে। প্রথম অবস্থায় বিশাখার মনস্তত্ত্ব অস্থিরতায় পর্যবসিত হলেও পরবর্তীকালে আত্মিক শক্তিতে সে উপলব্ধি করেছে মনের শক্তি করোনা প্রতিরোধসহ সার্বিক সুস্থতায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ। শুধু করোনাভাইরাস নয়, মনোবল ও আত্মবিশ্বাস মানুষকে সকল বিপদ মোকাবিলাতেও সহায়তা করে। বিশাখা উপলব্ধি করেছে বিমর্ষতা কাটিয়ে উঠতে মনোবল বাড়ানোর বিকল্প নেই।

করোনার জলছবি গল্পে বিশাখার মনস্তত্ত্বটি অত্যন্ত সুন্দর ও বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে। বন্দিজীবন কাক্সিক্ষত নয় বলেই মুক্ত বিচরণে আকস্মিক লকডাউন হয়েছে অস্বস্তিকর। বন্দি অবস্থাতেও মানবমন শৃঙ্খল না মেনে ছুটে চলে। শরীর চার দেয়ালে বন্দি হলেও মন বন্দি থাকে না। বিশাখার শরীর বন্দি হলেও মনের অবিরাম ছুটে চলায় তার অবচেতন মন জেগে উঠেছে, নির্দেশনা দিয়েছে। মনের চোখের দিব্য জ্যোতিতে সে প্রকৃতির নতুন আহ্বান অনুভব করেছে। প্রকৃতপক্ষে বিশাখার মনও প্রথম অবস্থায় লকডাউন নীরবে মেনে নিলেও পরবর্তীকালে তা যেন বিদ্রোহে রূপ নিয়েছে।

‘করোনার জলছবি’ গল্পটি করোনাকালীন সময়ের রচনা হলেও এ রচনাটি কিছুটা ব্যতিক্রম। করোনার সমকালীন অধিকাংশ রচনায় সমাজচিত্র ও রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্র মূল বিষয় হয়েছে। সেলিনা হোসেন রচিত এই গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের মনোশক্তি জাগরণের আহ্বান। মৃত্যু অনিবার্য সত্য হওয়ায় মৃত্যুকে এড়ানো যায় না। প্রকৃত মৃত্যু দুয়ারে কড়া নাড়ার অনেক পূর্বে দুর্বল মনোচেতনার মানুষ বহুবার মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করে। প্রকৃত মৃত্যুকে বরণ করার আগেই তারা অনেকবার মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এই মৃত্যু অনুভূতিকে মন থেকে দূর করার পক্ষপাতি। বিশাখার মন-ছবি মূলত সেলিনা হোসেনেরই আত্মানুভূতি। মনস্তাত্ত্বিক সংকট, প্রতিনিয়ত মৃত্যুভীতি, স্বাভাবিক জীবন চলায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। দুর্বল মনোচেতনাসম্পন্ন মানুষ পৃথিবীতে দীর্ঘদিন জীবিত থাকতে চায় কিন্তু মনোরোগে তাদের জীবনীশক্তি ক্ষয়ে যায়। শরীরে অসংখ্য রোগের প্রাদুর্ভাব ও বিস্তার ঘটে। বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানেও মেডিটেশনের মাধ্যমে মন নিয়ন্ত্রণ করে রোগ নিরাময়ে সফলতা এসেছে।

সেলিনা হোসেন গল্পটির মাধ্যমে বিশাখার আত্মোপলব্ধি, জাগরণ, মনোবল, বিদ্রোহ ও বিচক্ষণতা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন করোনায় আতঙ্কগ্রস্ত বাঙালি সমাজে। করোনার প্রতিষেধক না থাকায় প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। প্রতিরোধ ব্যবস্থায় শরীরকে শতভাগ কার্যকর রাখতে মানসিক শক্তির বিকল্প নাই। বিশাখার আত্মোপলব্ধিতে এই মানসিক শক্তির জোগান দিয়েছে প্রকৃতি। মনের জোড়ে বিশাখা করোনাকে নিয়ে খেলতে চেয়েছে। সেলিনা হোসেনের মতে এই পৃথিবী করোনার নয় এই পৃথিবী মানুষের। ক্ষণস্থায়ী করোনার প্রকোপে মৃত্যুর ভয়ে ভীত ও অস্বাভাবিক জীবন-যাপন নয়। স্বাভাবিক জীবন যাপনের মাধ্যমে  তিনি সুস্থ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশাখা শ্রীরাধিকার অন্যতম সখীর নাম। বিশাখার শঙ্কিত চেতনায় করোনার মৃত্যুর মিছিলে খোল-করতাল-ঢোল বাজার শব্দ এবং মানুষের কণ্ঠে গানের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হওয়ায় সাময়িক দৃষ্টিকোণে চরিত্রটিকে সনাতন ধর্মের অনুসারী বলে মনে হয়। পরবর্তীকালে বিশাখার মা আনজুম খাতুন এবং বাবা মোতাহার নাম উল্লেখে স্পষ্ট হয় চরিত্রটি সনাতন সম্প্রদায়ভুক্ত নয়। বিশাখা চরিত্রটি যুক্তিবাদী ও বাস্তববাদী। চারিত্রিক বিশেষ গুণের অধিকারী হওয়ায় সে মৃত্যুর মিছিলকে মৃত্যু উৎসব ভাবতে পেরেছে। মহামারীর অগণিত মৃত্যুকে মৃত্যুর বৈশাখী মেলা বলতে পেরেছে। মানসিক শক্তিসম্পন্ন হলেও বিশাখার অবচেতন মনেও প্রতিনিয়ত মানুষের মৃত্যু প্রভাব ফেলছে। সঙ্গত কারণেই তাকে বলতে শুনি-‘শোবার ঘর আর ড্রইংরুমে বসে থাকলে ওর মনে হয় উৎসবের মুখর আনন্দ ওর চারপাশে ধ্বনিত হচ্ছে। বেজে যাচ্ছে খোল করতাল ঢোলভেসে আসছে মানুষের কণ্ঠ থেকে গানের ধ্বনি।’

সনাতন ধর্মে শবদেহের সৎকার আয়োজনে কীর্তন সংগীত তথা হরিবোল ধ্বনির সঙ্গে খোল করতাল ও ঢোল বাজানো হয়। বিশাখার অবচেতন মনে বাদ্যযন্ত্র ও সংগীত সমন্বয়ে উৎসবের বিরতিহীন আওয়াজ অসংখ্য মৃত্যু নির্দেশ করে। অবচেতন মনকে শঙ্কামুক্ত করতে বিশাখা কানে ভেসে আসা আওয়াজের তালে হাতে তালি দেয়। অদম্য বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার মতো উৎসবে মেতে ওঠে করোনা-ভীতিকে মনোরাজ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। আতঙ্কিত বাবার মুখে ভীতি দূর করে হাসি ছড়িয়ে দেওয়ার আনন্দে বলে ফেলে বাবার মুখের হাসি আমার কবিতার শিল্প। করোনার বিরুদ্ধে জয়লাভ। প্রকৃতপক্ষে বিশাখা প্রকৃতির নীরব হাতছানিকে তীব্র অনুভূতিশীল সত্তা দ্বারা  উপলব্ধি করে। প্রকৃতির আহ্বান মন থেকে গ্রহণ করার ক্ষমতা সকলের থাকে না। বিশাখা হয়তো সে দৈবশক্তি অর্জন করেছে। তার বর্ণনায় পাওয়া পাঁচটি কক্ষের সজীবতা ও বর্ণময়তা হয়তো তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সতেজতা ও বর্ণময়তা নির্দেশ দেয়। বিশাখার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের প্রতিটা বর্ণময় ভুবন তৈরিতে অবদান রেখেছে মুক্ত প্রকৃতি ও  সাধারণ সুবিধা বঞ্চিত মানুষ।

বেড়িবাঁধের ওপরে বাস করা মানুষগুলো লকডাউনের প্রায় দশদিন পরে মাস্ক হাতে পায়। না পাওয়ার জীবনে ওরা মৃত্যুকে ভয় পায় না। প্রতিনিয়ত জীবনের অপূর্ণতায়  মৃত্যুভীতিকে জয় করেছে। পেটের ক্ষুধা ওদের নিত্যসঙ্গী তাই পান্তা ভাতের সঙ্গে করানোর মতো মহামারির মৃত্যুভীতিকে ওরা খেয়ে হজম করে ফেলেছে। পারিপার্শ্বিক সুবিধাবঞ্চিত হলেও এদের মনের শক্তি জাগ্রত। করোনা পরিস্থিতিতেও তাদের মনোবল অনেকটা রোগ প্রতিরোধের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশাখা চরিত্রটি লেখকের মানসকন্যা। করোনায় কর্মহীন হয়ে যাওয়া বেড়িবাঁধের মানুষের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার দায়িত্ববোধে তাদের কাছে ছুটে গিয়েছে। গল্পের এই অংশে বিশাখার ব্যক্তিসত্তার জাগরণ লক্ষণীয়। বিশাখা কর্মহীন মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেবার মানসে যেন এ মুহূর্তে অস্তিত্ববান হয়ে ওঠে। বিশাখার অস্তিত্ব চেতনার স্বরূপটি উদ্ভাসিত হয় তার আত্মচিন্তায়‘কিছু সিদ্ধান্ত ওর নিজের হওয়া দরকার। নিজেকে ঢালাওভাবে প্রকাশ করা যুক্তিহীন কাজ।’

করোনাকালীন সময়ে মৃত্যুভীতি ও আতঙ্কের নাম কোভিড-১৯ ভাইরাস হলেও ক্ষুধার্ত মানুষের আতঙ্কের একটিই নাম ক্ষুধা। করোনাকালে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দায় খাদ্য ও ওষুধ সংকট দেখা দেয়। বিশাখার বাবা মোতাহারের দীর্ঘ শ্বাস-‘হায় করোনাকাল। কতভাবে যে মানুষকে মারছে।’

বিশাখা মুসলিম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মৃতদেহের সৎকার চিন্তায় সনাতন ধর্মীয় প্রথা তার মনে অনুরণিত হওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণযোগ্য। গল্পের এ অংশে বাংলাদেশের পাড়া বা মহল্লা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের একত্রে বসবাসের বিষয়টি অর্থাৎ বাঙালি জাতি হিসেবে অসাম্প্রদায়িক এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়। হয়তো বিশাখাদের মহল্লায় হিন্দু পরিবারের সংখ্যা বেশি। এ কারণে অহরহ মৃত্যুর মিছিল কল্পনায় সনাতন সম্প্রদায়ের শ্মশান যাত্রার করুণ উৎসবটি তার কানে ধ্বনিত হতে থাকে।

কর্মহীন ক্ষুধার্ত মানুষের যন্ত্রণা ও সমূহ সমস্যার সমাধানে মানবতাবাদী কিছু মানুষ সকল বাধা অতিক্রম করে তাদের পাশে দাঁড়ায়। বিশাখা চরিত্র তাদের প্রতিনিধি। সঙ্গত কারণেই সচ্ছল পরিবারে নিশ্চিত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের লকডাউন পালনে সে করোনামুক্তির সংকেত পায় না । বেড়িবাঁধের কর্মহীন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে ভাতের জোগান দেওয়ায়; তাদের তৃপ্তি ও হাসির মাঝে সে করোনার জয় দেখতে পায়। বিশাখা করোনা প্রতিরোধের নিয়ম যথাযথ পালনের মাধ্যমে করোনার সঙ্গে খেলতে চেয়েছেন। তুচ্ছ করেছেন জীবাণুকে। করোনা বিধ্বংসী অস্ত্র মানুষই আবিষ্কার করবে এমন বিশ্বাসে সচেতনতার পথ ধরে লেখক স্বাভাবিক জীবনযাপনের ডাক দিয়েছেন বিশাখা চরিত্রের মাধ্যমে।

মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে স্থবির জীবনে ক্রমাগত ক্ষয় হয়ে যায় জীবনীশক্তি। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন করোনাকালীন ক্ষয়ে যাওয়া জীবনীশক্তি পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয়েছেন। ‘করোনার জলছবি’-নামক ছোটগল্পের মূলসুরে সে বিষয় বিশাখা চরিত্রের অন্তর্দহন, টানাপোড়েন, শঙ্কা এবং তা থেকে মুক্তির পথে বিচরণের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেলিনা হোসেনের শিল্প নির্মাণের দক্ষতা ও সমাজ সচেতনতায় সামাজিক সমস্যার  সূক্ষ্ম দিকটি গল্পে ফুটে উঠেছে। করোনাকালীন অসংখ্য রচনার মধ্যে গল্পটি স্বতন্ত্র ভাবনা নিয়ে উপস্থিত আত্মজাগরণ মূলক শিল্পসম্মত সার্থক ছোটগল্পের পর্যায়ভুক্ত।

বুলবুল চৌধুরী

কালা কান্দুর ভোর

এ গল্পে কালা কান্দু কেন্দ্রীয় চরিত্র। শরীরের রং ঘোর কালো হওয়ায় তার মা নাম দিয়েছিলেন কালা আর বাবা দিয়েছিলেন কান্দু। এরপর থেকেই তার নাম হয় কালা কান্দু। উত্তরাধিকার সূত্রে সে পিতার কাছ থেকে পেয়েছে চৌর্যবৃত্তির পেশা। কালা কান্দুর সিঁদ কেটে চুরি করার হাতেখড়িসহ দক্ষ চোর হয়ে ওঠার সবটুকু পেয়েছে তার পিতার সান্নিধ্যে থেকে। দক্ষ চোর কালা কান্দু এক সময় সিঁদকাঠি হাতে চুরি করার উদ্দেশ্যে তার পিতাকে অনুসরণ করেছে। সময়ের বিবর্তনে সে আজ পিতার ভূমিকায় আর সিঁদকাঠি কাঁধে নিয়ে পেছনে থাকে সাগরেদ জয়নাল। ঝড় বৃষ্টির মেঘলা রাতে কালা কান্দু ও জয়নালের গাজি বাড়িতে চুরির উদ্দেশে বহির্গমন এবং ভোর রাতের দিকে একটা সফল চুরির বর্ণনা স্থান পেয়েছে ‘কালা কান্দুর ভোর’ নামক গল্পে।

নিম্নশ্রেণির চোর, কাজের ঝি, মেসের বর্ডার নিয়ে সাহিত্য রচনায় মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জীবনের আখ্যান তথা এ শ্রেণির মানুষের দুঃখ-কষ্ট-হতাশা, তাদের জীবনের পাওয়া না পাওয়ার চিত্র অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জীবন্তভাবে সিদ্ধহস্তে তিনি উপস্থাপন করেছেন।

আর এ সময়ের কথাশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর ‘কালা কান্দুর ভোর’ গল্পে কালা কান্দুর সহযোগী জয়নাল চরিত্রটির মাঝেও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যায়। চরিত্রটি ব্যক্তিজীবনে চামড়ার ব্যবসা করে সৎপথে জীবিকা অর্জনে নিয়োজিত ছিল। কালা কান্দুর সংস্পর্শে চৌর্যবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করলেও সে চুরি করাকে মন থেকে সমর্থন করে না। সংগত কারণে সিঁদকাঠি তার কাছে অধিক ভারী মনে হয়। সারাক্ষণ মান সম্মানসহ প্রেমিকাকে চিরতরে হারানোর ভয় তাকে তাড়া করে ফেরে। জয়নালের প্রেমিকা চোর পরিচয়টি কখনওই মেনে নেবে না, যেমন কালা কান্দুর বউও মেনে নেয়নি। ভালো ও মন্দ কাজের অনুভূতি, ধরা পড়ার ভয় থাকা শর্তেও কালা কান্দুর সংস্পর্শে লোভের বশবর্তী জয়নাল সিঁদকাঠি হাতে এগিয়ে চলে।

‘কালা কান্দুর ভোর’ গল্পের শেষাংশে গাজি বাড়ির বৃদ্ধা গাজিমাতার অসুস্থতায় কালা কান্দুর নিজের দাদির কথা মনে হওয়া এবং মানবিকতাবোধে মনে দয়ার উদ্রেক হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সেবা করার বিষয়টি বেমানান হলেও অসহনীয় নয়। কিন্তু কার্যোদ্ধার বা চুরি সম্পন্ন হওয়ার পরেও চোরের ধরা পড়ার ভয় তার মনে ছিল না, এটা অস্বাভাবিক। ভোররাতে বৃদ্ধার মৃত্যুর পরে শুধু পাপের ভয়ে মাঝ উঠানে কালা কান্দুর মতো পেশাদার চোরের চিৎকার করে কথা বলা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা পাপের বোধ যার মধ্যে এত প্রবল সে কখনোই চৌর্যবৃত্তিকে পেশা করতে পারে না। চোরের মুখে পুণ্য কাজের মহৎ বাণী উচ্চারণ করিয়ে লেখক তার চরিত্র সৃজনের দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন কিনা পাঠক-সমালোচকের মনে প্রশ্ন জাগে। জয়নাল চরিত্রের ন্যায়-অন্যায়বোধে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন আরও ঘনীভূতরূপ পেলে চরিত্রটি পূর্ণাঙ্গ ও জীবন্ত হয়ে উঠত।

গাজিবাড়ির মেয়েদের চোর বলে চিৎকারে চোরের আত্মপরিচয় স্মরণ হওয়ার বিষয়টাও হাস্যকর। কেননা চৌর্যবৃত্তি কালা কান্দুর পৈতৃক পেশা। বাল্যকাল থেকেই সিঁদকাঠি  হাতে বাবাকে এ কাজে সহযোগিতা করে সে সিদ্ধহস্ত চোর হয়ে উঠেছে। চৌর্যবৃত্তি কালা কান্দুর রক্তে মিশে আছে। স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেলেও সে চুরির পেশা পরিবর্তন করেনি। সর্বোপরি পেশাদার চোরের আবেগ বিহ্বল হয়ে আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়া এবং ভোররাতে গাজিবাড়ির উঠোনে চিৎকার করে সবার ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়া তার চরিত্রের অস্বাভাবিকতা প্রমাণ করে।

আলী ঈদরিস

বিনিময় নয় বিচার চাই

গল্পে সমকালীন সামাজিক সমস্যার প্রতিচ্ছবি প্রতীয়মান হয়। সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমান বাংলাদেশের এক ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আশু পদক্ষেপ গ্রহণের বিড়ম্বনায় বা ধীর পদক্ষেপে হারিয়ে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। পরিবার হারাচ্ছে তাদের প্রিয়জন, উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অভিভাবক হারিয়ে সর্বস্বান্ত, নিঃস্ব হয়েছে অসংখ্য পরিবার। একইভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে-পড়া তরুণ প্রাণের সঙ্গে ঝরে-পড়ে তাদের পরিবার তথা একটি দেশ ও জাতির সমূহ সম্ভাবনার স্বপ্ন। ‘বিনিময় নয় বিচার চাই’ গল্পে সড়ক দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো মায়ের আবেদনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে কাহিনি নির্বাচন করা হয়েছে। পিতা-মাতার কাছে সন্তানের জীবন কি কখনও অর্থমূল্যে বিনিময় সম্ভব ? মালিকপক্ষ টাকার বিনিময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মাহত পরিবারকে আর্থিক অনুদানে বিনিময় করতে চায় তাদের প্রিয়জনের প্রাণ। কিছু টাকা জরিমানা দিয়ে তারা যেন পাপমুক্ত ও নির্মল হয়ে উঠতে চান। স্বস্তি খুঁজে পান। অভাব দারিদ্র্যের কশাঘাতে অনেক পরিবার হয়তো এই আর্থিক অনুদান গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু পৃথিবীর সমুদয় সম্পদের বিনিময় হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষটিকে ফেরত দিতে পারে না বা তার অভাব পূরণ করতে পারে না।

মালিকপক্ষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পরিবারের প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা অনুভব করতে পারে না। উপরোন্তু ঘাতক ড্রাইভারকে আইনি সহযোগিতার মাধ্যমে ছাড়িয়ে আনে। ড্রাইভার জেলে থাকলে তার যানবাহনের ট্রিপ বন্ধ থাকবে। আয়ের পথকে বিড়ম্বিত করতে চান না বলেই মালিকপক্ষ ঘাতক ড্রাইভারকে আইনের শাসন থেকে মুক্ত করার চেষ্টায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। নিজের লাভের অংশ বজায় রাখাই তাদের লক্ষ্য। সঙ্গত কারণেই সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে যোগ্য ও দক্ষ ড্রাইভারকে কাজে নিয়োজিত করার বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্ব হারায়। ঘাতক ড্রাইভার অপরাধ করেও শাস্তির সম্মুখীন হয় না বলেই মানুষের প্রাণ তাদের কাছে মূল্যহীন। নিয়ম লঙ্ঘনকারী লোভী বাস মালিক, ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ঘাতক ড্রাইভারদের আইনের আওতায় এনে যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করলে তবেই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

‘বিনিময় নয় বিচার চাই’ গল্পে শাওনের মায়ের দাবি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত একমাত্র সন্তান শাওনের মৃত্যুর বিচার। অভাবী দরিদ্র হলেও সে বাস মালিকের দেওয়া অনুদান গ্রহণ করেনি। বাস মালিক ভেবেছিলেন অর্থমূল্য বাড়িয়ে দিলে হয়তো তিনি টাকাটা নিবেন। পরবর্তীকালে দ্বিগুণ অর্থ অনুদানও শাওনের মা ফিরিয়ে দিয়েছে। সন্তানের জীবনের বিনিময় মূল্য হয় না। মায়ের কাছে সন্তান নিজের অস্তিত্ব নিজের প্রাণ। শাওনের মায়ের একমাত্র দাবিকে বাস মালিক গুরুত্ব না দিয়ে নিজ স্বার্থরক্ষায় ঘাতক ড্রাইভারের পক্ষে উকিল নিয়োগ করেছিলেন। শাওনের মায়ের দীর্ঘশ্বাস, সন্তান হারানোর হাহাকারযন্ত্রণা, সন্তানের হত্যার বিচারের প্রত্যাশা অভিশাপ হয়ে বাস মালিকের ওপর বর্ষিত হয়েছে।

ঘাতক বাসচালক কিছুদিন জেল খেটে ছাড়া পেয়ে আবার বাসটি চালাচ্ছে। দুই বছর পরে বাস মালিকের একমাত্র ছেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বাস মালিক এ অবস্থায় শাওনের মায়ের কষ্টকে মুহূর্তে অনুভব করেন। অনুশোচনায় ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্যে তার কাছে ছুটে যান। শাওনের মায়ের হাতে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ক্ষমা চান। গল্পের শেষপর্যায়ে শাওনের মায়ের শেষকথা ‘এই পাঁচ লাখ টাকা আমি আপনাকে দিলাম। এর বিনিময়ে আপনি পুত্রশোক ভুলতে পারবেন ?’ শাওনের মায়ের এমন ধারালো কথার বিষবাণ বুকে ধারণ করে অনুশোচনায় দগ্ধ বাস-মালিক গল্পের শেষে শাওন ও তার পুত্রের খুনি ঘাতক ড্রাইভারের বিচারে নিশ্চিত পদক্ষেপ হিসেবে হত্যা মামলা করেন।

নিজে বিপদের সম্মুখীন না হলে বিপদগ্রস্ত মানুষের বিপদ, দুঃখ ও হতাশা অনুভব করা যায় না। শূন্যতাকে অনুভব করতে নিজেকেও শূন্য হতে হয়। গল্পকার আলী ঈদ্রিস বাস মালিকের সত্তায় শাওনের মায়ের সন্তানহারা শূন্যতা ও হাহাকারকে অবিকৃতভাবে অনুভব করানোর প্রয়োজনে তার একমাত্র সন্তানের একইভাবে মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। এ অংশে লেখক বাস-মালিকদের অন্ধ চোখ খুলে সচেতনতা জাগানোর চেষ্টা করেছেন। কেননা তাদের সচেতনতার জাগরণ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অন্যতম সহায়ক পদক্ষেপ। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় বের না করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স পর্যবেক্ষণপূর্বক গাড়ির ড্রাইভার নিযুক্ত করা, একই ড্রাইভার দিয়ে দীর্ঘ সময় বাস না চালানো এবং ঘাতক  ড্রাইভারকে আইনের আওতায় যথাযথ বিচার নিশ্চিত করলে সড়ক দুর্ঘটনার সমস্যা অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব। গল্পে শাওনের মায়ের একমাত্র চাওয়া পুত্রের হত্যার বিচারটি প্রথমাবস্থায় মূল্যায়িত হয় না। বিধাতার বিচারে বাসমালিকের নিজের পুত্রের মৃত্যুর পরে ঘাতকদের বিচারের দাবিতে তিনিও একমত হয়েছেন। শাওনের পরিবারের আর্থিক দুর্গতির পেছনে নগরায়নের প্রয়োজনে তাদের অধিকাংশ জমি নামমাত্র মূল্যে হারানোর বিষয়টিও বাস্তবসম্মত। সমকালীন সামাজিক সমস্যাকে ‘বিনিময় নয় বিচার চাই’ গল্পের বিষয় করে গল্পকার ঈদ্রিস আলী যেন সত্যিই সামাজিক এ সমস্যার বিচার দাবি করেছেন। আখ্যান পর্যালোচনায় বলা যায় গল্পটি সার্থক ছোটগল্পের পর্যায়ভুক্ত।

মোহীত উল আলম

ক্রীড়নক

‘ক্রীড়নক’ শব্দের অর্থ খেলনা। আলোচ্য ‘ক্রীড়নক’ গল্পে প্রভাবশালীর প্রভাব এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বলের সে প্রভাবে পর্যুদস্ত হবার বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। শক্তিমানের ক্ষমতার দাপটে সংগঠিত ভয়ঙ্কর ঘৃণ্য অপরাধ এমনকি খুন পর্যন্ত তদন্ত রিপোর্টে স্থান পায় না। ভুক্তভোগী মানুষ তখন শুধু নিজের ভাগ্যের ক্রীড়নকে পরিণত হয় না, প্রভাবশালী ক্ষমতাবানের ক্ষমতার দাপটে তাদের হাতের খেলনা অর্থাৎ ক্রীড়নকে পরিণত হয়।

‘ক্রীড়নক’ গল্পটিকে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা কেন্দ্রিক রচনার তালিকাভুক্ত করা যায়। গল্পের রেহাল খান চরিত্রটি পেশায় সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি সরকারি চাকুরি ত্যাগ করে করপোরেট ব্যাংক তথা বেসরকারি ব্যাংকে যোগদান করেন। করপোরেট ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের পরিচালনা পর্ষদের একজন পরিচালক খুন হলে বিভাগীয় অফিস রেহাল খানকে খুনের তদন্তের রিপোর্ট প্রদানের দায়িত্ব দেন। তদন্তের দায়িত্ব ভার তার কাছে শতগুণ ভারী বোঝা হয়ে তার অস্তিত্বের হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন খুনটি পরিচালকদের মধ্যে অন্তঃকোন্দলের ফলে হয়েছে। কাজেই এই তদন্ত প্রতিবেদনটি অনেকটা শাঁখের করাতের মতো দুই পাশের ধারবিশিষ্ট রূপ নেয়। পরিচালনা পর্ষদের অন্তঃকোন্দল রিপোর্টে উল্লেখ করলে তার চাকুরিসহ প্রাণনাশের সম্ভাবনা রয়েছে। সত্য তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মাঝে মানসিক তৃপ্তি থাকলেও ক্ষমতার কাছে রেহাল খান নিরুপায় হয়। বাধ্য হয়ে প্রাণ ও চাকরি দুটোই রক্ষার্থে সত্যকে আড়াল করে মনগড়া তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। রিপোর্টে উল্লেখ করে পরিচালকদের অন্তঃকোন্দল নয়, খুন হওয়া পরিচালকের কোনো এক পার্টির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মনোমালিন্যের কারণে তিনি খুন হয়েছেন।

ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দোষমুক্ত রাখার সর্বাত্মক চেষ্টায় রেহাল খানের মনগড়া তদন্ত রিপোর্ট ভুল বলে প্রমাণিত হয় না। কেননা পুলিশি তদন্তের রিপোর্টের সঙ্গে রেহাল খানের তদন্ত রিপোর্টের সাদৃশ্য ছিল। অর্থাৎ খুনি অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের প্রভাব ক্ষমতা আধিপত্য ও টাকার কাছে বিক্রি হয়েছে প্রশাসন। টাকা ও ক্ষমতার কাছে প্রশাসনের বিক্রি হয়ে যাওয়ার এ চিত্র সমকালীন সময়ের এক কঠিন নির্মম সত্যচিত্র। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কোন্দলে খুনের বিষয় গোপন করে মিথ্যা তদন্ত রিপোর্ট জমা দিলেও রেহাল খানের চাকরি চলে যায়। শারীরিক অসুস্থতা তথা সাইটিকার ব্যথাকে অজুহাত করে রেহাল খানকে স্বেচ্ছায় চাকুরিচ্যুত হওয়ার জন্য অফিস কর্তৃপক্ষ চাপ প্রয়োগ করেছে। অসময়ে অবসর গ্রহণে রাজি হওয়ার সুবিধা হিসেবে রেহান খান পায় মোটাদাগের একটা বোনাস এবং ভ্রমণের কুপন। সবকিছু রেহাল খানের ইচ্ছার বিপরীতে ঘটে।

রেহাল খান চাকুরিতে বলবৎ থাকলে কখনও না কখনও  সত্য প্রকাশিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সঙ্গত কারণে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার অবসর গ্রহণে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে রেহাল খানের মানসিক সংকট গল্পের মুখ্য বিষয়। সত্য বললে জীবিকার উৎস চাকুরি ও তার প্রাণ সংশয় ঘটবে। সত্য লুকিয়ে মিথ্যে তদন্ত প্রকাশ করার পরেও তার চাকরি চলে গেল। রেহাল খান এখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। নিজের ইচ্ছা প্রকাশের কোনো সুযোগ নাই। অফিস কর্তৃক প্রদর্শিত যুক্তি রেহাল খানের চাকুরির মেয়াদও শেষের দিকে তাই স্বেচ্ছায় চাকুরিতে রিজাইন দিতে তার আপত্তি থাকার কথা নয়। এখানে শুধুমাত্র চাকুরি হারানোর বিষয় মুখ্য নয়। রেহাল খানের ব্যক্তি ইচ্ছা তথা স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মূল বিষয়। রেহান খান বর্তমান সমাজের সমাজপতি, নেতা, আমলা, করপোরেট ব্যক্তিদের কাছে সাধারণ মানুষের শৃঙ্খলিত সত্তার প্রতীক। নাগরিক বাক স্বাধীনতাসহ সার্বিক স্বাধীনতায় শৃঙ্খলিত হওয়ার প্রতীক। লেখক রেহাল খানের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও সংকটকে উপস্থাপন করে সামাজিক বিশৃঙ্খল পরিবেশ তথা প্রভাবশালীর ক্ষমতার দাপটে সাধারণ জনগণের পরাধীনতাকে চিহ্নিত করেছেন।

স্বাধীন দেশের সাধারণ জনগণ কতিপয় মানুষের ক্ষমতার দাপটে তাদের হাতের খেলনায় রূপান্তরিত হয়েছে। মুষ্টিমেয় দুর্বৃত্তশ্রেণির হাতে দেশের সাধারণ মানুষের খণ্ডিত স্বাধীনতায় যেন সমগ্রজাতি শৃঙ্খলিত হয়ে পড়ে। ‘ক্রীড়নক’ গল্পের মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে রেহাল খানের চাকুরিচ্যুত হওয়ার পরে করোনা মহামারির লকডাউন শুরু হয়েছে। পরাধীনতার যন্ত্রণা বর্ণনার সঙ্গে করোনার সমকাল উল্লেখে গল্পটি পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিশেষ মহামারির সমকালীন রচনার তালিকাভুক্ত হয়। রেহাল খানের করোনায় লকডাউনের ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন ঘটেছে। লকডাউন চলাকালীন প্রায় সকলেই এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। গতানুগতিক জীবনে হঠাৎ স্থবিরতাই এর মূলকারণ। রেহাল খানের পুত্রের বিয়ে সম্পর্কিত আলোচনায় দুইকাল তথা দুই যুগের ছেলেমেয়েদের পারস্পরিক সম্পর্ক গঠনে অভিভাবকদের মতামত ও প্রথার তুলনামূলক আলোচনা উঠে এসেছে।

পারিবারিক বন্ধন করোনাকালীন লকডাউনে বন্দি স্থবির জীবনের নিয়ম হীনতা, ছেলের বিয়ে সম্পর্কিত দুই কালের তুলনামূলক আলোচনা, সমকালীন সামাজিক নীতিহীনতায় মানুষের ইচ্ছাশক্তির পরাধীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। জাতির কাছে শৃঙ্খলিত ও অবদমিত মানবাত্মার অন্তর্দহনের বিষয়টি ‘ক্রীড়নক’ গল্পের কাহিনির পটভূমিতে স্থান পেয়েছে। ভাবপ্রকাশে ও ইচ্ছা পূরণে অসমর্থ রেহাল খান বাড়িতে ফিরে এসে স্ত্রীর গলা জড়িয়ে  কান্নায় ভেঙে পড়েছে। এ কান্না তার শৃঙ্খলিত সত্তার হাহাকার ও শূন্যতার বহিঃপ্রকাশ। গল্পটিতে কাহিনির উত্থান পতন, যথাযথ ভাষা ও শব্দের প্রয়োগ এবং চরিত্রের মনস্তাত্বিক সংকটের  শৈল্পিক প্রকাশ ঘটেছে।

হরিশংকর জলদাস

দেউলিয়া

‘দেউলিয়া’ গল্পটি হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে রচিত। প্রাচীন পৌরাণিক তত্ত্ব অনুসারে স্বর্গের দেবতাদের রাজা ইন্দ্র। ইন্দ্রের স্ত্রী ইন্দ্রানী পরমা সুন্দরী। এ ছাড়াও স্বর্গলোকের সুন্দরী অপ্সরাগণ সকলে ইন্দ্রের সখি। গল্পটিতে বর্ণিত ইন্দ্র ও ইন্দ্রের ছলা-কলাসহ পূর্ণাঙ্গ কাহিনি প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত। অনিন্দ্য সুন্দরী অহল্যা ঋষি গৌতমের স্ত্রী। পৌরাণিক কাহিনির মূল ধারা এক হলেও ‘দেউলিয়া’ গল্পে অহল্যা ও ইন্দ্রের সাক্ষাৎলাভ এবং তাদের রিরংসাবৃত্তি কাহিনিতে সামান্য বৈচিত্র্য নিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রাচীন পূর্ণাঙ্গ উপাখ্যান অনুসারে অহল্যা ছদ্মবেশী ইন্দ্রকে চিনতে পারলেও তার কামপ্রবৃত্তিতে তিনি দ্বিমত করেননি। এদিক থেকে অহল্যা অপরাধী হলেও পরবর্তীকালের কাহিনিতে অহল্যাকে নির্দোষ প্রমাণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বলা হয় তিনি ইন্দ্রের ধোঁকাবাজির শিকার হয়েছিলেন। ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে জানা যায় অহল্যাকে ইন্দ্র প্রলুব্ধ করেছিল। পরবর্তীকালে কৃত্তিবাসী রামায়ণের আদিকাণ্ডে স্পষ্টভাবে অহল্যার পরকীয়া সম্পর্কের তথ্য পাওয়া যায়।

পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে অহল্যাকে দোষী ও নির্দোষী কল্পনায় দুটি যুক্তি রয়েছে। দোষী অহল্যা সম্পর্কে বলা হয় অহল্যা স্বেচ্ছায় অর্থাৎ ইন্দ্রের পরিচয় জানা সত্ত্বেও তার কামার্ত আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। বিবাহিত নারীর ধর্মরক্ষা না করে পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়ার কারণে সে শাস্ত্র মতে দোষী। অন্যদিকে নির্দোষী দৃষ্টিভঙ্গিতে অহল্যা সম্পর্কে বলা হয়েছে ইন্দ্র গৌতমের রূপধারণ করে অহল্যাকে ধর্ষণ করেছে। এই অহল্যা সঙ্গত কারণেই নির্দোষ।

‘দেউলিয়া’ গল্পের কাহিনিতে নারীর চাওয়া, কামপ্রবৃত্তি তথা অস্তিত্ববাদী সত্তাকে প্রকাশ করতে চারিত্রিক দোষে দুষ্ট অহল্যাকে নির্বাচন করা হয়েছে। ইন্দ্রকে লোভী, কামুক, ভোগী এবং স্বেচ্ছাচারী লম্পট চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। তার রসনা বিলাসে রয়েছে নতুন নতুন অপূর্ব সুন্দরী নারী। গল্পের ইন্দ্র চরিত্র অনেকটা মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকের ‘জগতসিংহের’ অনুরূপ। জগৎসিংহ রাজ্যের কতগুলো ধুতুরা ভেরেণ্ডা ফুল ছাড়া সকল ফুলের মধুপান করেছে। সঙ্গত কারণেই তাকে রাজ্যের বাহিরে সুন্দরী নারী সংগ্রহে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হয়েছে। ইন্দ্রও নতুন নারীসঙ্গের সন্ধানে জঙ্গলকুটিরে ঋষি গৌতমের স্ত্রী অহল্যাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছে। ঋষি গৌতমের অনুপস্থিতিতে সে পিপাসার অজুহাতে অহল্যার কাছে জল চেয়েছে। ইন্দ্রের এই জল চাওয়ার মাঝে ভদ্র গৃহে প্রবেশের বড় একটা ভণ্ডামি ও কৌশল লুকিয়ে আছে। কেননা শবরী লৌহিতার গৃহেও সে তার পিপাসার কথা জানিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে কামুক ইন্দ্রের এ পিপাসা নিতান্তই জলপিপাসা নয়। ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্ব মতে সে তার স্বার্থ চরিতার্থে আদিম অদম্য পিপাসার সংকেত বুঝাতে জল পিপাসার অজুহাত দেখিয়ে কাক্সিক্ষত নারীর সামনে নিজেকে উপস্থাপন করে।

‘দেউলিয়া’ গল্পে ইন্দ্র কর্তৃক দুজন নারীর প্রতি তার কামনার বহিঃপ্রকাশের বিবরণ রয়েছে। একজন অহল্যা অন্যজন শবর পল্লীর বধূ লৌহিতা। অহল্যা পৌরাণিক চরিত্র হলেও লৌহিতা প্রাচীন বাংলার একমাত্র সাহিত্যিক নিদর্শন চর্যাপদ-এর অন্তর্ভুক্ত নিম্নশ্রেণির অস্পৃশ্য শবর তথা শিকারজীবী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। পৌরাণিক মহাকাব্যের অন্তর্ভুক্ত নারী চরিত্রের সঙ্গে প্রাচীন বাংলার নিম্নশ্রেণির নারী চরিত্রের তুলনাও গল্পের কাহিনিতে উঠে এসেছে। কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস ‘দেউলিয়া’ গল্পের সূচনায় দেবতার নাম উল্লেখ করলেও গল্পের কাহিনির ভিত্তিমূলে রয়েছে মানবিক আদিম আবেদন। বিজ্ঞানী ফ্রয়েড কর্তৃক প্রদত্ত লিবিডো চেতনার আধিপত্য। পাশাপাশি দুই সম্প্রদায়ের দুটি নারী চরিত্র সৃষ্টি করে লেখক এই দুই চরিত্রের কার্য-কারণের রহস্য উন্মোচন করেছেন। লৌহিতা নিম্নশ্রেণির শবরী পল্লীর বধূ হলেও সে তার স্বামীসঙ্গ লাভে পরিতৃপ্ত। জীবিকার প্রয়োজনে তার স্বামী শিকারে গেলেও তার মন পড়ে থাকে গৃহে লৌহিতার কাছে। অর্থাৎ তার স্বামী লৌহিতার প্রতি উদাসীন নয়। লৌহিতার রয়েছে মধুময় দাম্পত্য জীবন। অর্থাৎ লৌহিতা সম্পর্কের শুন্যতা বিহীন মানবিক প্রেমে পূর্ণ সংসারের বধূ। তার সকল চাওয়ার পূর্ণতা মিলেছে শবর পল্লীর ভল্লর সংসারে। স্বামীর প্রতি ভালোবাসায় একনিষ্ঠ লৌহিতা সঙ্গত কারণেই ইন্দ্রের কুপ্রস্তাবকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। একাকী গৃহে সতীত্ব রক্ষায় হাতে তীক্ষèমুখ কাটারি নিয়ে ইন্দ্রকে ধাওয়া করে গালি দিতেও কুণ্ঠিত হয়নি। নিম্নশ্রেণির দরিদ্র কুটিরেও রয়েছে লৌহিতার সতীত্বের বড়াই।

ঋষি গৌতম সাধক হাওয়ায় নারীসঙ্গ তথা স্ত্রীর প্রতি উদাসীন। অহল্যার মতে তিনি তেজোদ্দীপ্ত হলেও বীর্যবান নন। সাধারণ মানবিক চাওয়া স্বামীসঙ্গবিহীন নীরস জীবনে অহল্যা তৃপ্ত নয়। ফ্রয়েডীয় আদিমতম প্রবৃত্তির বশবর্তী অহল্যা ইন্দ্রের প্রতি কামাসক্ত হয়েছে এবং তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। অহল্যা তার নামের অর্থ বলেছে সকল প্রকার কদর্যতাশূন্য নারী। এমন বক্তব্যে সে ইন্দ্রের কাছে নিজেকে লোভনীয় করেও উপস্থাপন করেছে। দেবরাজ ইন্দ্রকে দেখা মাত্রই তাকে চেনার মাধ্যমে অহল্যা চরিত্রের বিচক্ষণতা ফুটে উঠেছে।

ঋষি গৌতম কুটিরে ফিরে সমস্ত দেখে লম্পট কামার্ত ইন্দ্রকে অভিশাপ দিলেন। স্ত্রীকে অভিশাপ দিয়ে সহস্র বছরের জন্য প্রস্তরখণ্ডে রূপান্তরিত করলেন। অহল্যা চরিত্রটি জীবনবাদী ও ভোগবাদী। গল্পের শেষে অহল্যা গৌতমের পৌরুষত্বকে আঘাত করে উচ্চস্বরে যে আকুতি জানায় তাতেই সাধক গৌতম দেউলিয়া অর্থাৎ নিঃস্ব-রিক্ত-সর্বশূন্য হয়ে যায়। কেননা সেই মুহূর্তে সে নিজের ভুল ও শূন্যতা অনুধাবন করে। সাধক-জীবনে ঈশ্বর প্রাপ্তিতে অধিক মনোযোগী হওয়া এবং স্ত্রীর প্রতি উদাসীনতাই অহল্যার নারীত্ব বিসর্জন দিয়ে এতটা বিদ্রোহী হয়ে ওঠার জন্য দায়ী।

হরিশংকর জলদাস দেবদেবী বা সাধক মহাপুরুষদের গুণকীর্তনের জন্য পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে ‘দেউলিয়া’ গল্প রচনায় মনোনিবেশ করেননি। রামায়ণ থেকে কাহিনি নিলেও তিনি ঋষি গৌতমের দম্ভ, অহমিকাকে চূর্ণ করে তাকে দেউলিয়া বানিয়েছেন।  দেবত্ববাদ নয় মানবিকতা এ গল্পের মুখ্যবিষয়। অন্যদিকে নগরের বাহিরে পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী নিম্নশ্রেণির অস্পৃশ্য ব্যাধ ভল্লকে মানসিকভাবে ঐশ্বর্যশালী ও সুখী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। দেবতার ব্রত পালনে সৃষ্ট সাধকজীবনকে তুচ্ছ করে পৃথিবীর মানবীয় প্রেমপূর্ণ সংসার ও শরীরবৃত্তীয় মানবিক আবেদনকে বড় করে দেখিয়ে এ গল্পে মানবতার জয় ঘোষণা করেছেন। লেখকের কাহিনি নির্মাণ ও চরিত্র সৃজনের দক্ষতায় গল্পটি হয়েছে  শিল্পসম্মত ও সুখপাঠ্য। 

মঞ্জু সরকার

মুক্তিযোদ্ধা আকবরের সেই গল্পটা

এ গল্পের অন্তঃস্তলে লুকিয়ে রয়েছে আরেকটি গল্প। দেশ স্বাধীন হওয়ার পঁচিশ বছর অতিক্রান্ত হলেও যে গল্পের স্বীকৃতি মেলেনি। অনেকটা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতার গল্পগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের অবহেলিত ইতিহাসের বন্ধ দুয়ার খুলে আলোর পথে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ ও সময়কে কেন্দ্র করে মঞ্জু সরকার ‘মুক্তিযোদ্ধা আকবরের সেই গল্পটা’ নামক গল্পের কাহিনির গাঁথুনি নির্মাণ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক গল্প হওয়ায় প্রাসঙ্গিকভাবে রাজনৈতিক বিষয়টি সম্পৃক্ত। লেখক সচেতনভাবে দেশের রাজনৈতিক আবহ সঙ্কেতের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উৎসব অর্থাৎ পঁচিশ বছর পূর্তি উৎসব। স্বাধীনতার পঁচিশ বছর পূর্তি উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলোচনার আবশ্যিকতা রয়েছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর  রহমান। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। অভিভাবকহীন দেশের ক্ষমতায় সামরিক শাসন বলবৎ থাকে। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের অবসান ঘটলে রাজনৈতিক ক্ষমতা চলে যায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (ইঘচ) সরকারের হাতে। ১৯৯৬ এর পুনঃনির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। গল্পে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে যে উৎসব বর্ণিত হয়েছে তা মূলত ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময়কালকে নির্দেশ করে। গল্পের কাহিনিতে কোনো রাজনৈতিক দলের নামের উল্লেখ নেই। লেখক যথাক্রমে ক খ ও গ প্রতীকে রাজনৈতিক দলকে চিহ্নিত করেছেন। ক খ ও গ নামে দলের নামকরণ করলেও প্রচ্ছন্নভাবে তিনি দলের পরিচয় দিয়েছেন যথাক্রমে দলীয় প্রতীক নৌকা, ধানের শীষ ও লাঙ্গল নামের প্রতীক উল্লেখের মাধ্যমে।

মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষশক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানের দিকে দৃষ্টিপাত করেছিলেন। গল্পে বর্ণিত ‘ক’ দল সরকার গঠনের পূর্বে মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত জীবন যাপন করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে পরবর্তী প্রজন্মকে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছে। বিনিময়ে তারা একটু সম্মানও পায়নি। তাদের ভাগ্যে জোটেনি ন্যূনতম সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা। স্বাধীনতার পঁচিশ বছর অতিক্রান্ত হলেও কোনো সরকার তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেয়নি। এমনই অবহেলায় মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য অজানা ইতিহাস বিলুপ্তির মুখে পতিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা আকবর মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে অস্ত্র ধরেছিলেন। যুদ্ধে অস্ত্রসহ কোমরে গ্রেনেড বেঁধে অংশগ্রহণ করে অদম্য সাহসিকতার পরিচয় রেখেছেন। তারপরেও স্বাধীন দেশের কাছে তার কোনো দাবি নেই। জীবিকার প্রয়োজনে আকবর রিকশা চালিয়েছে, পরের মাটিতে পরের দয়ায় চার ফুট বাই পাঁচ ফুট পানের দোকান চালিয়ে তার পরিচয় হয়েছে রিকশাওয়ালা আকবর অথবা পানের দোকানদার আকবর। এই পরিচয়ের মাঝে ঢাকা পড়েছে তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়। খ ও গ দলের নেতাকর্মী ও মাস্তানদের কাছে তাকে সবসময় বিনয় প্রকাশ করে ভয়ে ভয়ে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা আকবর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতীক। আকবরের হীন জীবনযাপন ও প্রভাবশালীকে নিরন্তর খুশি রাখার প্রচেষ্টায় সকল দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের হীন, জীর্ণ-শীর্ণ, পরাধীন, পরাশ্রিত জীবনযাপনকে নির্দেশ করেছেন কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকার।

মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করলেও স্বাধীনতার অপশক্তির কালোছায়ায় তারা পরাধীন। তাদের মূল্যায়ন করা, সম্মানিত করা হয়নি বলেই বর্তমান প্রজন্মের গড়ে ওঠা উঠতি তরুণ মাস্তানরা আকবরের ছোট দোকানে প্রভাব খাটায়। বাকিতে জিনিস নেওয়ার নাম করে লুট চালায়। আকবর আজ তাদের কাছে জিম্মি। শত অত্যাচার অনাচার সহ্য করে ভাই-ভাতিজা বলে তাদের সম্বোধনের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করেন। এসব বাকি খাওয়া মাস্তানদের মাত্র ২২৯ টাকা ঋণের বোঝা আকবরের মাথায় পাহাড়সম ভারী বোঝা হয়েছে। আকবরের এহেন দরিদ্র হীন জীবন ও জীবিকা রাষ্ট্র কর্তৃক অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ জীবন ইতিহাসকে উপস্থাপন করে। কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকারের শিল্পসৃজনের দক্ষ হাতে বিষয়টি ‘মুক্তিযোদ্ধা আকবরের সেই গল্পটা’ নামক গল্পে শিল্পসম্মতভাবেই পরিবেশিত হয়েছে।

স্বাধীনতার প্রজ্বলিত মশালটি পঁচিশ বছর পরে হলেও স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি এ মশাল জ্বালাতে সক্ষম হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী মশাল সারাদেশ পরিভ্রমণ করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমগ্র জাতিকে একাগ্র করার প্রয়াস চালানো হয়েছে। এ মশাল প্রজ্জ্বলনে সময়ের জাঁতাকলে আত্মবিস্মৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জাগরণের প্রয়াস রয়েছে। স্থানীয় ক দলের নেতা মোবারক শাহ সেই অনুষ্ঠানে আকবরকে ‘জয় বাংলা’ বলার গল্পটা উপস্থাপনের জন্য আহ্বান জানায়। মুক্তিযোদ্ধা আকবর উর্দু ভাষা না জানায় পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি অবস্থায় তাদের অকথ্য অত্যাচার ও সব প্রশ্নের উত্তরেই বলেছে ‘জয় বাংলা’। অবর্ণনীয় অত্যাচারের মুখে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ দেশের প্রতি আকবরের অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। প্রকৃতপক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ‘জয় বাংলা’ ধ্বনির আহ্বানে বাংলার  ভূমিমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করে জয়লাভের প্রত্যাশাই ছিল বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের একমাত্র লক্ষ্য।

যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করায় মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যক্তিস্বার্থ ছিল না। মুক্তিযোদ্ধা আকবর চরিত্রে দেখা যায় জীবিকার প্রয়োজনে পরিবারের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেওয়াতেই তার স্বস্তি। তারা টেলিভিশনে দেখানো সেলিব্রেটি নেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখে না। মুক্তিযোদ্ধারা বিন্দুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে যুদ্ধ করেননি। সঙ্গত কারণেই পঁচিশ বছর পরেও আকবরের মতো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সুযোগ পেলেও কখনও লোভী হয়ে উঠেন না। গল্পে বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

প্রতিপক্ষ দলের নেতা জামাল ভূঁইয়ার মাটিতে আকবরের দোকান হওয়ায় তার কাছে সে অনেকটা জিম্মি। জামাল ভূঁইয়ার ‘জয় বাংলা’র গল্প বলার লাভ-ক্ষতি সম্পর্কিত প্রশ্ন আকবরের ব্যক্তিত্বে আঘাত হানে কেননা লাভ ক্ষতির হিসাব করে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। প্রতিপক্ষের কটাক্ষে মনোবিরোধে আকবর মশাল প্রজ্জ্বলনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করে দোকানের উন্নতিকল্পে তার ছোট বোনজামাইর কাছে পুঁজির জোগান নিতে যায়। ফিরে এসে দেখে তার চৌপায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা পানের দোকানটি দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে। মুহূর্তে আকবরের সাহসী সত্তা জেগে ওঠে। নিরীহ অসহায় দরিদ্র আকবরের সকলের মন রক্ষা করে চলার প্রবণতা শুধুমাত্র তার বিনয় ভীরুতা নয়। ঘটে যাওয়া অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধা আকবরও বিদ্রোহ করতে পিছিয়ে পড়ে না। মুক্তিযোদ্ধারা ভীরু নয়, লোভী নয়। তাদের বিনয়কে দুর্বলতা ভেবে অস্তিত্বে আঘাত করলে তারা জেগে ওঠে। আকবরও বুক ফুলিয়ে চিৎকার করে প্রতিবাদ করে বলেছে ‘কোন শুয়োরের বাচ্চা আমার দোকান লুট করছে ? কোন হালার পো আমারে মুক্তহাট থাইকা উচ্ছেদ কইরবার চায় ? সাহস থাকলে আয়, খাড়া মুক্তিযোদ্ধা আকবরের সামনে, আয় হারামজাদা…’। গল্পটি এক অনন্য শিল্পসম্ভার বুকে নিয়ে সাহিত্যে আসন করে নেয়।

ওয়াসি আহমেদ

জিন ও জিনগিরি সমাচার

সমকালীন সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকেন্দ্রিক রচনা হিসেবে ‘জিন ও জিনগিরি সমাচার’ গল্পটিকে মূল্যায়ন করা যায়। গল্পটির সূচনা এবং কাহিনির গতিশীলতায় অনেকটা পথ পেরিয়ে একে লোককথা ও ফ্যান্টাসি বা অলীক কল্পনায় রচিত জিন-পরিকেন্দ্রিক রচনা বলেই মনে হয়। একে ভধরৎু ঃধষবং বা ষবমবহফ ভেবে সমালোচকের অনুসন্ধানী মন পথপরিক্রমায় হঠাৎ বাঁক পরিবর্তন করে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রহমতের বোধোদয়ের পথ ধরে বোদ্ধা পাঠক সমালোচকও পৌঁছে যায় নিটোল কাহিনির অন্তঃস্তলে। লোককথা ও ফ্যান্টাসির ফানুস কাগজে মোড়ানো অর্ধ আবৃত্ত কাহিনির সূক্ষ্ম ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সমসাময়িক সামাজিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার চিত্রটি একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একথা স্বীকার্য যে সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক সামাজিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে গল্পটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ। অবলীলায় ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক বিষয়টিও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।

মানুষের মুখে মুখে বলা কাল্পনিক জিন, পরি, দৈত্য-দানব, ডাইনি, মৎস্যকন্যা ইত্যাদি কেন্দ্রিক রচিত গল্পগুলোই রূপকথার গল্প। গ্রামবাংলায় রূপকথার গল্পের প্রচলিত জিন, পরি, ভূত বা প্রেতাত্মার উৎপাত জনমানুষের ধ্যান-ধারণায় অনেকটা স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। মানুষের মানবিক সত্তার জাগরণের অভাবে তথা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অভাবে সেখানে ভূত-জিনকেন্দ্রিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন চিন্তার আগ্রাসন চলে। লেখক তার সৃজনশীলতায় শিল্পিতভাবে প্রশ্ন রেখেছেন জিন-পরি মানুষকে উধাও করে দেওয়াতে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখে? এমনতর প্রশ্নবাণে তিনি বোধোদয়ের প্রয়াসে দেখিয়েছেন প্রকৃতপক্ষে জিন-পরির চাইতে মানুষ অধিক নৃশংস। মূল্যবোধহীন মানুষ নিজের হিংস্রতা, পশুবৃত্তি ও অপকর্মকে আড়াল করতে জিন পরির নামে মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে দেয়। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে দিনের পর দিন অপকর্ম চালায়। সকল দোষ একচ্ছত্রভাবে অদৃশ্য অস্তিত্বহীন জিন-পরি বা কোনো অশরীরী আত্মার কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে আইনের হাত থেকে রক্ষা করে।

গল্পকার ওয়াসি আহমেদ রহমতের মনোকথনে অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রশ্ন রেখেছেন কাদায় ডুবিয়ে মানুষ হত্যা করায় জিনের কী প্রকারের আনন্দ ও স্বার্থ থাকতে পারে ? পূর্বকালে জিন কর্তৃক মানুষকে কাঁদায় চুবিয়ে হত্যা করার যে গ্রাম্য বিশ্বাস ছিল এই গল্পটি সেই ভিত্তিহীন বিশ্বাসের মূলে আঘাত করে। সেই সকল হত্যা কি জিন কর্তৃক সংঘটিত হওয়া সম্ভব ছিল ? কতিপয় ব্যক্তি গ্রাম্য গল্পের আসরে কাল্পনিক জিনের গল্প বলে মনুষ্যসমাজে তাদের পরিচিতি পর্বে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। রহমত তাদের একজন। প্রকৃতিতে জিনের অস্তিত্ব অদৃশ্যভাবে আছে কি না তা জানা সম্ভব নয়। দৃশ্যমান সমাজে জিনের দেখা পাওয়া যায় না। সঙ্গত কারণেই দৃশ্যমান সমাজের দৃশ্যমান অপকর্ম, হত্যা, অপহরণ জিন কর্তৃক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা অবাস্তব ও অলীক কল্পনা হওয়াই যুক্তিযুক্ত।

‘জিন ও জিনগিরি সমাচার’ গল্পে রহমত অঘ্রাণের শীতের শেষ কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে পেয়ারা গাছের বাদুড় তাড়ানোর জন্য ঘরের বাহিরে বের হলে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় গায়ে ঠান্ডা বাতাস লাগে। রহমত ঘরের বাহিরে বের হওয়া মাত্রই ঠান্ডা বাতাসে তার শরীরে কাঁটা দিয়ে ভুতুড়ে অনুভূতি সৃষ্টি করেছে। সেই মুহূর্তে পেয়ারা গাছের দিকে তাকালে বাদুড়ের মতো এক বিশাল ডানাওয়ালা প্রাণীকে উড়ে যেতে দেখে। প্রকৃতপক্ষে মাঝরাতে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় তার মনে যে ভয় সৃষ্টি হয়েছে সে ভয়ের কাল্পনিক রূপই বাদুড়ের মতো ডানাওয়ালা বিশাল প্রাণী। ইংরেজিতে যাকে বলে হ্যালুসিনেশন। রহমতের মনে হয়েছে সে জিন দেখেছে। পরদিন সকালে এক জনের মৃতদেহ কাঁদায় পুঁতে রাখতে দেখা গেল। রহমত প্রচার করল এ জিনেরই কাজ। এ দোষ রহমতের একার নয়। যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় চলে আসা জিন-ভূতের হিংস্র কার্যকলাপের প্রতি বিশ্বাস রহমতকে গ্রাস করেছে। যদিও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নাই। যারা জীন-ভূত কর্তৃক সংঘটিত ঘটনার বর্ণনা করে তারা সকলেই কারও না কারও মুখে ঘটনাটি শুনেছে মাত্র।

গ্রামে অপহরণের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অপহৃতদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে আসে। তবে ফিরে আসার সংখ্যা খুব কম। গল্পে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা সকল মানুষই নির্বাক হয়ে যায় এবং বেশিদিন বাঁচে না। পারস্পরিক শত্রুতা ছাড়া যারা বেশি কথা বলে যেমন আলেকজানের  মতো পাগল যে কিনা রাজনীতি নিয়ে কথা বলার অপরাধে হত্যার শিকার হয়েছে। গল্পে আকস্মিকভাবে মানুষের নিরুদ্দেশ হওয়া ও হত্যা কাহিনির কুয়াশার ঘোর অনেকটা লাঘব হয়ে ওঠে আলেকজানের হত্যা বর্ণনার শুরু ও শেষ লাইনে। অর্থাৎ শুরুতে তার সম্পর্কে বলা হয় সে বেশি কথা বলে। শেষ লাইন—‘তুই কি মেম্বারের ইলেকশন করবি!’ অর্থাৎ অবশ্যই আলেকজান মেম্বারদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কথা বলেছে বলেই তাদের রোষের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া হিন্দু ব্যবসায়ী সুনীল, বদরুলসহ সকলের অপহরণ ও হত্যার বিষয়টিও এ ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে ওঠে। স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ সকল খুন ও অপহরণ কোনো জিন পরির কাজ নয়। এগুলো মানবতাহীন স্বার্থান্বেষী হিংস্র মানুষরূপী পশু কর্তৃক সংঘটিত। অপহরণের পরে অসহনীয় নির্মম নির্যাতন করে অর্ধমৃত অবস্থায় ফিরিয়ে দেয় বলে তারা বেশি দিন বাঁচে না। অবশ্যই লুণ্ঠনকারী হয়তো শর্তসাপেক্ষে প্রাণভিক্ষা দিয়ে মুক্তি দেয়। তাই সকল কিছু চাপা রেখে জিনের গায়ে দোষ চাপাতে ভুক্তভোগীও নিশ্চুপ থাকে। সীমাহীন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে তারা জীবনীশক্তি হারিয়ে নিশ্চুপ অবস্থাতেই ইহলোক ত্যাগ করে। এভাবেই দুষ্কৃতির চিহ্ন নিশ্চিহ্ন হয় পৃথিবী থেকে।

ক্রমাগত অপহরণ ও হত্যা করে ডোবায় লাশ ফেলায় রহমত প্রামাণিক আত্মচিন্তায় নিমগ্ন হয়েছে। অসংখ্য হিসাব কষে উদ্ধার করেছে এ জিনের কাজ নয়। গ্রামময় এরূপ কর্মকাণ্ডে জিনের পরিচিতি ও লোকবিশ্বাসের প্রসারের জন্য রহমতই দায়ী। নিজের অজান্তেই কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের হ্যালুসিনেশনকে সে প্রতিষ্ঠিত করছে। বোধোদয় রহমতের অনুভূতিতে নব প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই অপহরণ ও খুন কে করে ? রহমতের মনঃপ্রশ্নের অনুসন্ধানে পাঠক সমালোচক পৌঁছে যায় নিশ্চিত নির্ভুল সমাধানে। জিন-পরি নয় এরূপ ঘৃণ্য কাজ মানুষই করে। একবিংশ শতকের বাংলাদেশের জনমনেও এ আতঙ্ক বিরজমান ছিলো। এমন কি প্রশাসনিক পরিচয়ে পর্যন্ত অপহরণ, গুম ও খুনের খবর সংবাদপত্রে আলোড়ণ সৃষ্টি করেছিলো। বাস্তব ঘটনার আলোকে রচিত গল্পটি লেখকের চমকপ্রদ ও শিল্পসম্মত এক সৃষ্টি।  

সমসাময়িক সময়ের অস্থির সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনজীবন বিপর্যস্ত। রাজনীতি থেকে ধর্মীয় নীতি সকল ক্ষেত্রেই সামান্য মতবিরোধে ঘটছে অহরহ অপহরণ, খুন-জখম ও লুটতরাজ। সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার অন্যতম শিল্পসম্মত দলিল বলা যায় ‘জিন ও জিনগিরি সমাচার’ নামক গল্পটিকে। লেখক গল্পটিকে রূপকথার মিশেলে কাহিনি-প্রধান আধুনিক ছোটগল্পের কাঠামোয় উপস্থাপন করেছেন।

ইমদাদুল হক মিলন

আলোককন্যা

‘আলোককন্যা’ গল্পটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক রচনা। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিরণবালার নাম অনুসারে গল্পের নামকরণ করা হয়েছে ‘আলোককন্যা’। কিরণ শব্দের অর্থ আলোক এবং বালা শব্দের অর্থ কন্যা। কিরণবালা তথা আলোককন্যাদের সীমাহীন আত্মত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীন ভূখণ্ড। গল্পের কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে তারা বিরতিহীন ধর্ষণ-নির্যাতনে পর্যুদস্ত হয়েও আর্মি ক্যাম্পে বন্দি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। বন্দি মুক্তিযোদ্ধার গোপন খবর লুকিয়ে তাদের সঙ্গীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। জাতীয় জীবনের এক শোকাবহ অধ্যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। একাধারে তা গৌরবেরও কেননা পাকবাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে বাঙালি পেয়েছিল বিশ্ব মানচিত্রের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

গল্পের মুখ্য চরিত্র তিনটি। একজন গল্প কথক রবি, অন্য দুজন নারী চরিত্র। গল্পে মারিয়া সক্রিয় নারী চরিত্র। অপর নারী চরিত্রটির দেখা মেলে গল্পের শেষাংশে। কিরণবালা সশরীরে গল্পের শেষে হাজির হলেও এই নারী চরিত্রই গল্পের প্রাণ। কিরণবালা চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে গল্পের কাহিনি সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। চরিত্রটি লেখকের কাল্পনিক কোনো মানবী নয়। কিরণবালা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক বীরাঙ্গনা নারী চরিত্র। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহে আগ্রহী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক সুরমা জাহিদ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্য রচনা ও গবেষণায় বীরাঙ্গনাদের বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। সুরমা জাহিদের বীরাঙ্গনাদের নিয়ে গবেষণামূলক কাজটি বীরাঙ্গনা সমগ্র নামে যথাক্রমে চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়। কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ‘আলোককন্যা’ গল্পের শেষে সুরমা জাহিদের বীরাঙ্গনা সমগ্র-১ গ্রন্থটির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন। বীরাঙ্গনা সমগ্র-১ খণ্ডে সংগৃহীত বীরাঙ্গনা কিরণবালার বয়ান বা বিবৃতিটুকু মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বর্ণনায় এ গল্পে স্থান দেওয়া হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অক্ষতভাবে উপস্থাপনের প্রয়োজনে কিরণবালার বিবৃতিটুকু অবিকৃতভাবে গল্পকথক রবির মুখ দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। অবিকৃত বয়ানকে গল্প কাহিনিতে স্থান দেওয়া হলেও লেখকের কাহিনি নির্মাণের সূক্ষ্ম শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তা শিল্পসম্মত রূপ পেয়েছে। একাধারে গল্প মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী হাওয়ায় জাতীয় জীবন ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এ এক অনন্য সংযোজন।

গল্প কাহিনির প্রারম্ভে গল্পকথক রবি ও তার প্রবাসী বন্ধু জিল্লুর কথোপকথন পাঠে সাময়িক বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। কেননা এ অংশে প্রকৃত বক্তাকে চিহ্নিত করায় বিভ্রান্তি অনুভূত হয় অর্থাৎ এক্ষেত্রে বক্তব্য বিষয়টি কে বলছে তা অনেকটাই অস্পষ্ট। পাঠোদ্ধারের প্রয়োজনে পাঠককে পুনঃপাঠ পন্থা অবলম্বন করতে হয় যা অপ্রীতিকর। লেখকের সৃজনশীলতার সামান্য কৌশলগত পরিবর্তন এবং সচেতনতায় এরূপ দূষণ পরিহার করা সম্ভব।

মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, পাকিস্তানি সেনার বর্বরোচিত কার্যকলাপ এবং নির্যাতিত বীরাঙ্গনার গর্ভস্থ যুদ্ধশিশু ‘আলোককন্যা’ ছোটগল্পের বিষয়বস্তু হয়েছে। গতানুগতিক সমাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বীরাঙ্গনাদের অবহেলার দৃষ্টিতে দেখেছে। অধিকাংশ বীরাঙ্গনা নারী যুদ্ধপরবর্তী স্বাধীন দেশেও আত্মীয় পরিজনের অবহেলার শিকার হয়েছে। তাদের গর্ভস্থ যুদ্ধশিশুদের সেসময় বেশ কিছু দেশ যেমন সুইডেন, নরওয়ে, কানাডিয়ান দরদি নাগরিক দত্তক নিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে গল্পে বিদেশ থেকে আগত মারিয়া যুদ্ধশিশু। মাতৃহারা পরিচয়হীন এক অনিশ্চিত জীবনে সে বড় হয়েছে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই সে হাসতে ভুলে গেছে। নাড়ির টানে মায়ের প্রতি আকর্ষণ ও জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসায় মারিয়া বাংলাদেশে এসেছে। বীরাঙ্গনা কিরণবালার বাড়িতে প্রবেশ মুহূর্তে গাড়িতে জুতা রেখে খালি পায়ে হেঁটে শ্রদ্ধা প্রদর্শন পূর্বক কিরণবালার সামনে হাজির হয়েছে। বীরাঙ্গনা মাতা কিরণবালার প্রতি শ্রদ্ধায় মারিয়া না বসে দাঁড়িয়ে থেকেছে। তার বুকের মধ্যে ‘মা’ শব্দটি আজন্ম লালিত একটিমাত্র বাংলা শব্দ। কিরণবালাকে আলিঙ্গন করলে মারিয়ার হৃদয় গহিন থেকে গরম নিঃশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারিত হয়—মা, মা, মা। মারিয়া অসংখ্য অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধশিশুর প্রতীক। বাঙালি জাতির জাতীয় জীবনের করুণ ইতিহাসের প্রমাণ। মারিয়া যুদ্ধশিশু হলেও সে মানবিক। মমতাময়ী বাঙালি মায়ের গর্ভস্থ হওয়ায় তার ভেতরে বাঙালি নারীর নমনীয়তার একটি স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়। গাইড হিসেবে রবি চরিত্রের কার্যকারিতা এবং বন্ধুসুলভ বিনয়ী আচরণ এই চরিত্রটিকে পূর্ণতা দিয়েছে। তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা যায় ‘আলোককন্যা’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিল্পসম্মত প্রামাণ্য একটি রচনা।

মাহবুব আলী

ক্ষমতা

গল্পে প্রভাবশালীর ক্ষমতার দাপট এবং ক্ষমতাহীন মানুষের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যময় গ্লানিসর্বস্ব অসহায় জীবনচিত্র স্থান পেয়েছে। লেখক একই ব্যক্তির জীবনচিত্রের দুটি দিক উপস্থাপন করে মানুষকে সচেতন পথচলায় দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। গল্পের হাশিম চরিত্র একটি প্রতীকী চরিত্র হয়ে দিকনির্দেশনার সহায়ক হয়েছে। মাত্র ষোলো বছর বয়সে এ চরিত্র তার অপরিণত বয়সের অপরিকল্পিত ধ্বংসাত্মক পথচলায় বিকলাঙ্গ অবস্থায় যেন জীবস্মৃত পরিণতি পেয়েছে। আকস্মিক পিতৃহারা কিশোর হাশিমের জীবন সংগ্রামের উত্থান-পতনের চিত্রেই রয়েছে কাহিনির গতিশীলতা। মা ও বোনের প্রতি সার্বিক দায়িত্ব পালনের চেষ্টায় ঘটনার স্রোতে শেকড়হীন শ্যাওলার মতো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভেসে চলেছে তার জীবনের ভেলা। কিশোর বয়সেই সংসারের সকল দায় পূরণ করতে সে কখনও হয়েছে হকার, কখনও হোটেল বয়, আবার কখনও বা ককটেল বালক। অপরাধ না করেও জেল খেটেছে। কখনও বা পুলিশ মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে। কিশোর বয়সের অপরিণত মনে হঠাৎ পিতা হারানোর শোক ও মুহূর্তে পরিবারের দায়িত্বের বোঝা কাঁধে পড়ায় দিশাহীন হাশিম অর্থের প্রয়োজনেই রাজনীতির নীতিহীনতায় জড়িয়ে পড়েছে। মিছিলের একপাশে দুই-চারটি ককটেল ছুড়ে তার হাত পাকা হয়ে যায়। বেশ কয়েকবার জেল খেটে ফিরে এসে শুরু করে মাদক ব্যবসা। মাদক ব্যবসায়ে হাশিম কাঁচা টাকার মালিক হয়ে ওঠে। অপরিণত নিরীহ কিশোর অপরিণত বয়সেই কাঁচা টাকা আর সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারির  সংস্পর্শে হয়ে ওঠে এলাকার ক্ষমতাবান ডন। হাশিমের ক্ষমতার শেষ পরিণতি হয়েছে নির্মম ও হতাশাব্যঞ্জক। নির্মম কষ্টের তীব্রতায় হাশিম তার জন্মদাত্রী মা ও বাবার মৃত্যুর শোক ভুলে গেছে। কঠিন বাস্তবতার নিরিখে লেখকের দীর্ঘশ্বাস ধ্বনিত হয়েছে মায়ের মৃত্যুর শোক চৌদ্দ বছর আর বাবার মৃত্যুর শোক সাত বছর কথার মধ্য দিয়ে। হাশিমের পোড় খাওয়া লাঞ্ছিত সর্বহারা জীবন তাকে শোক পালনের অবসরটুকু দেয় না।

হাশিমের রূপান্তরিত জীবনপ্রবাহের সমতালে গল্পে স্থান পেয়েছে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যা, বন্যায় বিপর্যস্ত জনজীবন, সরকারি ত্রাণ ও সাহেবশ্রেণির মানুষ কর্তৃক খিচুড়ি বিলি করা এবং পানিবন্দি কর্মহীন মানুষের চরম দুর্ভোগের চিত্র। এ ছাড়াও কাহিনিতে বর্ণিত হয়েছে সমকালীন রাজনীতি অর্থাৎ এরশাদ সরকারের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতন, বিএনপি সরকারের উত্থান ও পরবর্তীকালে নৌকার সর্বময় জনপ্রিয়তার বিষয়টিও উঠে এসেছে। হাশিমের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় সঙ্গত কারণেই গল্পে পরিবেশিত হয়েছে তৎকালীন দেশের রাজনৈতিক আবহ।

ঘূর্ণিঝড়, মহামারি, বন্যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের চলমান জীবনে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে। ১৯৮৮ সালের বন্যার ভয়াবহতায় বাড়িঘর ভেঙে মানুষ আশ্রয় ও কর্মহীন হয়ে পড়ে। ক্রমাগত বৃষ্টিই বন্যার একমাত্র কারণ ছিল না। অন্যতম কারণ হিসেবে নথিভুক্ত হয় ভারত সরকার কর্তৃক ফারাক্কা বাঁধ উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়টি। বন্যা চলাকালীন গৃহ ও কর্মহীন অবস্থায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হাশিমের পিতার আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। বড় ভাই সংসারের দায়িত্ব অবহেলা করে চলে যায়। মা ও ছোটবোন মুন্নির সকল দায়িত্ব পড়ে হাশিমের কাঁধে। হাশিম বয়সে কিশোর হলেও ছোটবোন মুন্নির বাড়বাড়ন্ত শরীরের দিকে তার মাদক ব্যবসায়ী বন্ধুদের লোভাতুর দৃষ্টিকে বুঝতে ভুল করেনি। প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ না করে ক্ষোভে আক্রোশে সে পুলিশের কাছে তাদের গোপন মাদক ডেরার সন্ধান দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছে। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে প্রতিশোধ স্পৃহায় তারা হাশিমকে সশস্ত্র আক্রমণ করেছে। আহত হাশিম সুস্থ হয়ে ওঠার সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় তার জমানো সব টাকা শেষ হয়। তিনটি পেটের ক্ষুধা মেটাতে সে আবারও মিছিলে ককটেল ছোড়ার কাজে নিয়োজিত হয়। এরশাদ-হিরু-মার্শাল বেরুলে হাশিম তাদের শিকারে পরিণত হয়ে ডান হাত হারায়। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে প্রায় সাত-আট মাস পরে ডান হাতবিহীন পঙ্গু হাশিম রাস্তায় বেরিয়ে আসে। শুরু হয় দুর্বল বিকলাঙ্গ শরীরে তার ক্ষমতাহীন পথচলা। ক্ষমতাহীন পথচলার গ্লানি বর্ণনায় লেখকের ইঙ্গিত তার পরবর্তীকালের জীবনকে ব্যাখ্যা করে। পার্টির মিছিল মিটিংয়ে মুন্না নামের যে দুই বছরের জুনিয়র ছেলেটি তাকে বস বা স্যার ছাড়া কোনো দিন কথা বলেনি সে ক্ষমতাহীন অসার ডানহাতবিশিষ্ট পঙ্গু হাশিমকে উদ্দেশ করে বলে ‘কী রে হাশিম, কেমন আছিস ?’

নিরুপায় ক্ষমতাহীন হাশিম অর্থোপার্জনে লোকাল বাসে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত হয়েছে। হাসিমের মতো কর্মঠ  দায়িত্বশীল কিশোর সঠিক দিকনির্দেশনায় নিঃসন্দেহে তার স্বর্ণময় ভবিষ্যৎ রচনা করতে পারত। এতটা বখে যাওয়ার পিছনে হাশিমকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে পাঠানোর প্রক্রিয়াটি অনেকাংশে দায়ী। কেননা জেলে অবস্থানরত দাগি আসামিদের সংস্পর্শে হাশিমের কিশোর মন আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে। দেশের আইনের শাসনের দুর্বলতর দিক তথা ক্ষমতার অপব্যবহারও আলোচ্য ‘ক্ষমতা’ গল্পে ফুটে উঠেছে। ১৯৭৭ সালের শেষ সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও এই গল্পের হাশিমকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা ২০২০ সালের প্রেক্ষাপটেও বিরল নয়। হয়তো এভাবেই অপরাধীর সংস্পর্শে অপরাধে জড়িয়ে যায় নাম-না-জানা অসংখ্য কিশোর। লেখক দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ প্রশাসনের ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়েও সচেতনতার আহ্বান জানিয়েছেন।

মূলত ক্ষমতা জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পীত একটি গল্প হয়ে উঠেছে।

দিলওয়ার হাসান

কুকুর কাব্য

এ গল্পে লেখক দিলওয়ার হাসান মানুষের মানবিক সত্তা অর্থাৎ তার মনের নিঃস্বার্থ দয়া, মায়া ও প্রেমের জাগ্রত রূপ বর্ণনা করেছেন রিটা ডি রোজারিও নামক এক খ্রিস্টীয় নারী চরিত্রের মাধ্যমে। ‘কুকুর কাব্য’ গল্পের স্বল্পসংখ্যক চরিত্রের মধ্যে গল্পকথক অন্যতম। গল্পকথকের নাম একবার একমাত্র বন্ধু অনিমেষের মায়ের মুখে উচ্চারিত হয়েছে। অনিমেষের মায়ের মুখ থেকে জানা যায় গল্পকথকের নাম মহিবুর। মহিবুর বেকার জীবনে চাকরির সন্ধানে ঢাকা শহরের রাস্তায় পায়ে হেঁটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অ্যাপ্লিকেশন জমা দেয়। গল্পের প্রথমাংশে বর্ণিত মহিবুরের বেকার জীবন বর্ণনায় লেখক অত্যন্ত দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ঢাকা শহরের রাস্তায় লেখাপড়া শেষ করা মহিবুরের মতো অসংখ্য ক্ষুধার্ত বেকার ছুটে চলে শুধুমাত্র একটা চাকরির সন্ধানে।

‘কুকুর কাব্য’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তথা মূল আকর্ষণ রিটা নামের নারী চরিত্রটি। এ গল্পের রিটা ডি রোজারিওর নীরব নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, দয়া-মায়ায় পরিপূর্ণ সত্তার প্রতীক। ভরদুপুরে চাকরির সিভি জমা দিতে আসা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর মহিবুরের মুখের দিকে তাকিয়েই সে বিষয়টা অনুভব করেছিল। মহিবুরকে পাশের সোফায় বসতে বলে তার জন্য হালকা খাবারের ব্যবস্থা করে। কাজ শেষে মহিবুর ফিরে আসার মুহূর্তে নিজের কার্ড বের করে বলেছে এ দিকে এলে অবশ্যই দেখা করবেন। প্রকৃতপক্ষে রিটা মহিবুরের আর্থিক সঙ্গতি অনুধাবন ও ক্ষুধার কষ্ট বুঝতে পেরেই তাঁকে দেখা করতে বলে। প্রথমাবস্থায় চরিত্রটি রহস্য নিয়ে উপস্থাপিত হয়। মহিবুরের মনেও হাজার প্রশ্ন যে তার মুখ দেখে রিটা কীভাবে বুঝেছিল সে ক্ষুধার্ত? রিটার সঙ্গে মহিবুরের পরবর্তী সাক্ষাতে সে মহিবুরকে দাদা সম্বোধন করেছে।

কোনো একদিন রিটার সন্ধানে ক্ষুধার্ত মহিবুর তার অফিসে গেলে জানতে পারে রিটা ছুটিতে। মন খারাপ হয় কেননা পকেটে টাকা নেই। হয়তো সারাদিন আজ তাকে না খেয়েই থাকতে হবে। ক্ষুধার্ত শরীরের অস্বস্তি লাগলে ফিরে আসার পথে সে দেখতে পায় রাস্তার গাড়ি এক্সিডেন্টে পড়ে থাকা আহত কুকুরের দিকে একটি মেয়ে ছুটে যাচ্ছে। অসংখ্য গাড়ি, রিকশা অতিক্রম করে এক্সিডেন্টে অচল কুকুরটিকে কোলে নিয়ে একনিষ্ঠভাবে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে সে। মহিবুর খেয়াল করে মেয়েটি আর কেউ নয়, রিটা। আহত কুকুটাকে কোলে নিয়ে সামনে এগোতে থাকা রিটাকে দেখে গল্পকথকের মনে প্রশ্ন জাগে কী করবে সে ? হয়তো চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। নয়তো মৃত কুকুরের সৎকারের ব্যবস্থা করবে বলেই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তেই মহিবুরের সকল আত্মজিজ্ঞাসা তথা মনোপ্রশ্নের সমাধান সে পেয়ে যায়। রাস্তায় পড়ে থাকা নিকৃষ্ট প্রাণী রক্তাক্ত কুকুরের জন্য যার মনে এত মায়া, মানুষের জন্য তার মায়া থাকবে এমনটাই স্বাভাবিক।

২০১৯ সালে ঢাকা শহরে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় মানবতার জয় পতাকাবাহী নারীটি রাস্তার অপর প্রান্তে আহত রক্তাক্ত কুকুরটিকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে অসংখ্য গাড়ি ও রিকশাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। প্রথমে সামান্য কিছুক্ষণ মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করে। কেউ এগিয়ে না এলে সে তার হাতের ব্যাগটি পাশে থাকা অন্য এক নারীর হাতে দিয়ে কুকুরটাকে কোলে তুলে নিরাপদ স্থানে এনে সেবা করতে থাকেন। মায়াবতী নারীর পেছনে দৌড়ে আসে আহত কুকুরটার সঙ্গী। যে এতক্ষণ মাঝরাস্তায় নিজের বিপদ উপেক্ষা করে সঙ্গীর পাশে থেকে তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল। অবলা প্রাণীর নিজের সঙ্গীর প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় পেয়ে মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। সকল মানুষের চোখে ধরা দিয়েছিল নারী মনের অকৃত্রিম নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সেবাপরায়ণতার অনন্য নিদর্শনস্বরূপ এক স্নেহময়ী নারীর রূপ। বাস্তবিক আহত কুকুরের সেবায় এগিয়ে আসা নারীর মনে কুকুরের প্রতি এরূপ সহমর্মিতায় তার মানুষের সেবায় এগিয়ে আসার বিষয়টিও নিশ্চিত হয়। প্রকৃতপক্ষে দয়া-মায়া মমতার প্রতীক এই মানবী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিপদগ্রস্ত মানুষের মুখ দেখে তার ভেতরের ভাষা পড়ে ফেলতে সক্ষম হবেন এটাই স্বাভাবিক।

অভিনব এ সত্য ঘটনা লেখক দিলওয়ার হাসানের মনেও তীব্র আলোড়ন তুলেছে। সঙ্গত কারণেই মমতাময়ী এই নারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকে তিনি ‘কুকুর কাব্য’ গল্পের রিটা ডি রোজারিও নামক বিশেষ গুণসম্পন্ন নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। গল্পকাহিনির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মহৎ এই ঘটনাটি মানবপ্রেমের ইতিহাসে সংরক্ষিত থাকবে বলে মনে হয়।

বীথি চট্টোপাধ্যায়

রহিমচাচার ডেরা

গল্পের সূচনাতেই লেখক বীথি চট্টোপাধ্যায় কলকাতার রাস্তায় ভূতদের একচ্ছত্র আনাগোনার বিষয়টি উল্লেখ করে ভৌতিক ছোটগল্প রচনা শুরুর অভিপ্রায় উপস্থাপন করেছেন। গল্পের কাহিনিতে প্রবেশ করে পাঠক লেখকের ইঙ্গিতকৃত ভূতের স্বরূপ উদ্ঘাটনে সচেতন অনুসন্ধানী দৃষ্টি রাখে। গল্পের বাঁকহীন কাহিনি শান্ত নদীতে বয়ে চলা স্রোতের মতো অবলীলায় সামনে এগোতে থাকে। অনন্য এক ভাবালুতায় রোমাঞ্চিত কৌতূহলী পাঠকমন গল্পকথকের পদানুসরণ করে কলকাতা নিউমার্কেটে পৌঁছে যায়। লেখকের ইঙ্গিতকৃত ভূতের ভৌতিকতার সত্যতা নিয়ে মনোদ্বন্দ্ব ও সংকট অনুভূত হয়। প্রশ্ন জাগে এ ভূতের আড্ডা সত্যি কোন আত্মার উপস্থিতি না লেখকের কোনো প্রতীকী ইঙ্গিত? কাহিনির শেষপর্যায়ে রহিমচাচা সম্পর্কে গল্পকথকের মনে জেগে ওঠা অসংখ্য প্রশ্নের জবাবে মুহূর্তে পাঠকের শরীর তীব্র ঝাঁকুনিতে কাঁটা দিয়ে ওঠে। অজানা আতঙ্ক ও বিস্ময়ে অলৌকিকতায় শিহরিত হয় পাঠকসত্তা।

প্লানচেট বা অশরীরী নিয়ে বাংলা সাহিত্যের মহীরূহ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কঙ্কাল, ক্ষুধিত পাষাণ, নিশীথের মতো চিত্তে শিহরণ বা ভয় উদ্রেককারী বেশকিছু গল্প রচনা করেছেন। প্লানচেট বা অতিলৌকিক রচনা পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। রবীন্দ্র পরবর্তীকালের গল্প লেখকরাও এই ভূত, প্রেত তথা অশরীরী আত্মা নিয়ে গল্প রচনায় মনোনিবেশ করেছেন। কোনো কোনো অতিপ্রাকৃত গল্পে অতিলৌকিকতার সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে মনস্তত্ত্ব। ‘রহিমচাচার ডেরা’ গল্পটিতেও অতিলৌকিকতার পাশাপাশি বর্ণিত হয়েছে কালের প্রবাহমানতা। জীবন-প্রবাহে কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি বিবর্তিত সময়ের ব্যবধানে গল্পে স্থান পেয়েছে। চিরসত্য দার্শনিক বিষয় লেখকের উপস্থাপন-নৈপুণ্যে গল্পটিতে নতুনত্ব এনেছে। প্রাসঙ্গিকভাবে  উঠে এসেছে ১৯৪৬ সালের অমানবিক সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও সংঘর্ষের ভয়াবহতা।

গল্পকথকের ছাত্রজীবনে নিউমার্কেটে কেনাকাটার প্রয়োজনে বা বেড়াতে যাওয়ার সুবাদে রহিমচাচার সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তার মুখ থেকে জানা যায় রহিমচাচা মাত্র আট বছর বয়সে ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতার সাক্ষী। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে তার পরিবারের সকলকে হারিয়ে অনাথ হয়েছেন। রহিমচাচার নিউমার্কেটের মাস্তান হয়ে ওঠা তার জীবনস্রোতের বৈপরীত্যকে নির্দেশ করে না বরঞ্চ যুক্তিসঙ্গত জীবন সংগ্রামকে নির্দেশ করে। মাত্র আট বছর বয়সের অনাথ আশ্রয়হীন অবস্থায় তিনি কুকুর বিড়ালের সঙ্গে রাস্তাতেই বড় হয়ে উঠেছেন। গল্পের কাহিনিতে বর্ণনাটি না থাকলেও গভীরতর বিশ্লেষণে এবং রহিমচাচার সঙ্গে থাকা চারটা কুকুর ও কোলের মধ্যে থাকা বিড়ালের উপস্থিতিতে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রতিনিয়ত সংগ্রামে নিয়োজিত রহিমচাচা পরিণত বয়সে নিউমার্কেটের মাস্তান হয়েছে। স্বার্থান্বেষী পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তে অস্তিত্ব রক্ষার অবিনাশী প্রতিযোগিতায় আট বছরের বালকের পথশিশু থেকে কুলি, কুলি থেকে মাস্তান এবং পরবর্তীকালে নিউমার্কেটের দুই তিনটা দোকানের মালিকানা অধিকার করে আধিপত্য বিস্তার করা অস্বাভাবিক নয়। রহিমচাচা ধৈর্য, মনোবল, সাহস, বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগে আধিপত্য বিস্তার করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। প্রভাব বিস্তারকারী মাস্তানশ্রেণির হয়েও রহিমচাচার ব্যক্তিসত্তায় মিশে আছে স্নেহপরায়ণ মন ও মানবসেবার বাসনা। তিনি নিউমার্কেটে আগত ক্রেতাদের সাহায্যার্থে প্রয়োজনীয় দোকান চিনিয়ে দিতেন। কখনও কখনও তার সহযোগীদের দিয়ে কাজটি করাতেন। একাজে অর্থপ্রাপ্তির প্রত্যাশা নয় মানবসেবাই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। দীর্ঘ বিরতি প্রায় বিশ বছর পর গল্পকথক নিউমার্কেটে তার প্রয়োজনীয় দোকান খুঁজে না পেলে দীর্ঘদিনের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া রহিমচাচার আকস্মিক আগমন ঘটেছে। প্রয়োজনীয় দোকানটি চিনিয়ে দেওয়ার কিছু সময় পর তিনি অদৃশ্য হয়ে যান।

বিশ বছরের ব্যবধানে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া রহিমচাচাকে করা গল্পকথকের প্রশ্নের জবাবটি ছিল রহস্যজনক। অর্থাৎ এতদিন কোথায় ছিলেন প্রশ্নের জবাবে রহিমচাচার উত্তরটি ছিল ‘রিস্তেদারের কাছে’ অর্থাৎ তার পরিবারের কাছে। প্রকৃতপক্ষে রহিমচাচার পরিবারের সকলেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিহত হয়েছিলেন। রহিমচাচার বলা শেষকথা―‘আপনি যান, কিনুন জিনিস। আমি এখানেই আছি। এখানেই থাকব।’ কথার ভাবার্থটিও গল্পের শেষ পর্যায়ে আর লুকানো থাকে না। প্রকৃতপক্ষে আত্মীয় পরিজনহীন রহিমচাচা কুলিগিরি থেকে মাস্তানির এক পর্যায়ে নিউমার্কেটেই তার আস্তানা বা ডেরা গড়ে তোলে। শিশু বয়সে অনাথ রহিমচাচার কাছে নিউমার্কেটই ছিল বাড়ি, আত্মীয় ও একমাত্র ঠিকানা। হয়তো আধিপত্য বিস্তারকারী মাস্তান রহিমচাচার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। সঙ্গত কারণেই মারা যাওয়ার পরেও তার আত্মা এই নিউমার্কেটে আসে। গল্পকথক রহিমচাচার প্রিয় মানুষদের একজন হওয়ার কারণেই হয়তো তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছেন। তার শেষ দাবি ‘এখানেই থাকবো’ জোরালোভাবে নিউমার্কেটেই তার আত্মার অবস্থান নিশ্চিত করে।

প্রবহমান সময়ের কাঁটার সঙ্গে পৃথিবীপৃষ্ঠের অনেক চিত্র বদলে যায়। কালের গহ্বরে হারিয়ে যায় অতীত ইতিহাস। সেখানে নতুনের আগমন ঘটে। ক্রমপরিবর্তিত হয় সময়ের চিত্র। মানুষের জীবনচক্রে যেমন ক্রমানুসারে শিশুকাল কৈশোর-যৌবন ও বৃদ্ধাবস্থার দেখা মেলে, তেমনি পারিপার্শ্বিক পরিবেশের  সাজসজ্জাও বদলে যায় কালের বিবর্তনে। সর্বগ্রাসী মহাকালের গ্রাসে হারিয়ে যায় অতি সাধারণ মানব অস্তিত্ব। রহিমচাচার নিরুদ্দেশ হওয়া অর্থাৎ তার মৃত্যুর পরে দোকানের মালিকানা ও ব্যবসার ধরন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত শিল্পিতভাবে চিরসত্য এ বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।

‘রহিমচাচার ডেরা’ গল্পের নামকরণও যথার্থ হয়েছে। গল্পটি যেন জাদুর থলে। স্বল্পদৈর্ঘ্যরে গল্প হলেও লেখকের শিল্পনির্মাণে দক্ষতার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। জাদুথলি অন্বেষণের মতোই গল্পের কাহিনি বিশ্লেষণে উঠে আসে গল্পকথকের অভিজ্ঞতা। সেদিক বিচারে গল্পটি উত্তম পুরুষে লেখা। অতিপ্রাকৃতের সঙ্গে বিশেষ পারঙ্গমতায় সংযোজিত হয়েছে ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, মহাকালের বিবর্তনে রূপান্তরিত হওয়া বাস্তবসম্মত চিরসত্য দার্শনিক অনুভূতি। লেখক বীথি চট্টোপাধ্যায় গল্পে বর্ণিত একটি দার্শনিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশের মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অন্তঃসারশূন্যতা তুলে ধরে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। রহিমচাচার অবর্তমানে সেই দোকানের মালিকানায় এক মাড়োয়ারি ভদ্রলোককে ভক্তিভরে মা লক্ষ্মী আর গণেশের ছবিতে মালা পরাতে দেখা যায়। অর্থাৎ রহিমচাচার নাম শুনে উপলব্ধি হয় তিনি মুসলিম ধর্মাবলম্বী ছিলেন, অন্যদিকে মাড়োয়ারি ভদ্রলোকটি সনাতন ধর্মীয়। তার কিছুদিন পরে মাড়োয়ারি ব্যক্তির মালিকানা বিউটি পার্লারের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। অর্থাৎ মানবজীবন ও এ জীবনে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব ক্ষণস্থায়ী। দয়া, প্রেম, পরোপকারিতা তথা মনুষ্যত্বই প্রধান। এখানে ধর্ম নিয়ে, মালিকানা নিয়ে হানাহানি সংঘর্ষ সবই নিরর্থক ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা। কালের বিবর্তনের সবই হারিয়ে যায়। লেখকের মানবিক সত্তার প্রকাশ বা মানবতাবাদী চেতনা গল্পের এই অংশে শিল্পিত সুষমায় ধরা দেয়। রহিমচাচার ডেরা গল্পটি সুখপাঠ্য, চিত্তাকর্ষক এবং অতিপ্রাকৃত ছোটগল্পের চমকবিশিষ্ট শিল্পসম্মত রচনা।

মঈন আহমেদ

কানা ব্যাওড়া

গল্পটি মূলত নিম্ন শ্রেণির মানুষের জীবন ও জীবিকা নিয়ে রচিত। কানা ব্যাওড়ার আসল নাম শরফুদ্দিন। সে এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। শরফুদ্দিন নামক উঠতি বয়সি দরিদ্র তরুণের দিনাতিপাত, বিনোদন ও বিবাহ এবং বিবাহপরবর্তী জীবন গল্পের কাহিনিতে স্থান পেয়েছে। তার নোংরা, নীতি বিবর্জিত, শিক্ষাদীক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের ভয়লেশহীন মাতাল অনাড়ম্বর পশু-সমতুল্য জীবন গল্পের মূল বিষয়। শরফুদ্দিনের বাংলাদেশে আগমনের কারণ ও তার কিছুটা পরিচয় উপস্থাপনের প্রয়োজনে গল্পের মাঝপথে তার ফুফু ও ফুফা আবু হেনার প্রসঙ্গ এসেছে। আবু হেনা নামের সঙ্গে ‘কানা ব্যাওড়া’ গল্পের কাহিনিতে স্বল্প পরিসরে সংযোজিত হয়েছে ১৯৪৭ এর দেশভাগ, বাংলাদেশের উদ্বাস্তু সংকট, তাদের আবাসনে এ দেশীয় দালালদের কার্যকলাপ, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের চিত্র। যুদ্ধ-পরবর্তীকালে আবু হেনা কর্তৃক হায়দ্রাবাদী বিহারি দম্পতি রেজা খান ও শাহনাজ পারভিনকে নিরাপদে নিজ বাড়িতে আশ্রয়দান ও বর্ডার পার করিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালির উদার মানবিকতার পরিচয় প্রকাশ পায়।

বাইশ-তেইশ বছরের শরফুদ্দিনের আদি নিবাস কলকাতায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে নিঃসন্তান আবু হেনা তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। আবু হেনা ও শরফুদ্দিন চরিত্র দুটি জীবন পথে সফলতা ও ব্যর্থতার প্রতীক। গল্পে বর্ণিত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আবু হেনার বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে। অর্থাৎ ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় উদ্বাস্তু আবু হেনা প্রায় শরফুদ্দিনের সমবয়সীই ছিল। একই বয়সী দুজন যুবক কালের বিবর্তনে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে শরফুদ্দিনের নিশ্চিত নির্ভরতার আশ্রয় ছিল আবু হেনাদের বাড়ি অর্থাৎ তার ফুফুর বাড়ি। অন্যদিকে আবু হেনার প্রেক্ষাপটে এ দেশে সে ছিল সম্পূর্ণ উদ্বাস্তু। এমনকি বাংলাদেশে প্রবেশের সময় সে একাও ছিল না। তার কাঁধে ছিল স্ত্রীর নিরাপত্তা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব। এ দুটি চরিত্রের পারস্পরিক তুলনার মধ্য দিয়ে মানবজীবনের সফলতা লাভের অত্যন্ত ফলপ্রসূ দিকটি উন্মোচিত হয়। আবু হেনার শুভচিন্তা, সুস্থ জীবনবোধ, সুচিন্তিত পরিকল্পনা, বিচক্ষণতা সর্বোপরি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা তাকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে। উদ্বাস্তু আবু হেনা তার নিজগুণ ও কর্মপ্রচেষ্টায় বাংলাদেশে দোতলা বাড়িসহ এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছে।

অন্যদিকে শরফুদ্দিন তার উচ্ছৃঙ্খল, ভোগী, কামুক, মাতাল জীবনের বাহিরে নিজের চিন্তা-চেতনাকে প্রতিস্থাপিত করতে পারেনি। সঙ্গত কারণেই এ চরিত্রটি সুখী-সমৃদ্ধ, সুস্থ মানুষ হিসেবে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। শরফুদ্দিনের নিশ্চিত প্রাপ্তির সম্ভাবনাটুকুও সে তার স্থূল মাতাল জীবন ও নির্বুদ্ধিতার জন্য হারিয়েছে। কেননা বাংলাদেশে আত্মীয়-পরিজনহীন নিঃসন্তান আবু হেনার সমুদয় সম্পত্তি সন্তানতুল্য শরফুদ্দিন নিজ গুণে অর্জন করতে পারত। সুস্থ জীবনবোধের অভাবে সে আবু হেনার আশ্রয় থেকে চিরতরে বিতাড়িত হয়েছে। ক্রমে ডুবে গেছে অধঃপতনের অতল গহ্বরে।

পরিশ্রম, প্রচেষ্টা এবং প্রার্থনার সমন্বিত প্রয়াসে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। লেখক মঈন আহমেদ ‘কানা  ব্যাওড়া’ গল্পের এ অংশে  আবু হেনা ও শরফুদ্দিন চরিত্র সৃজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রাথমিক পথটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন। শিক্ষণীয় এ বিষয়ের সঙ্গে পরিবেশিত হয়েছে দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার চিত্র। শরফুদ্দিন পরবর্তীকালে কানা ব্যাওড়া নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অধঃপতনের ঘূর্ণিচক্র তাকে ক্রমেই টেনে নিয়ে গেছে অতল থেকে গভীর অতলে। সময়ের বিবর্তনে স্বভাব দোষে সে নিজের আশ্রয়, আত্মীয়-পরিজন হারানোর পাশাপাশি নিজের নামটিও হারিয়েছে। শরফুদ্দিনের নীতিজ্ঞান বহির্ভূত আচরণ, নারী লোলুপতা ও নিম্নশ্রেণির বন্য জীবনের শাস্তিস্বরূপ এক চোখের স্বচ্ছমনি গরুর ভুড়ি ভাজা তেলে ভাজা হয়ে গেছে। পরিচয় পেয়েছে কানা আর মাতলামির স্বীকৃতি স্বরূপ তার নাম হয়েছে কানা ব্যাওড়া। সকল মানবীয় গুণাবলি বিবর্জিত পশু জীবনে গরম তেলে চোখ নষ্ট হওয়ার চেয়ে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যাওয়াও অস্বাভাবিক ছিল না।

দরিদ্র পরিবারের শরফুদ্দিন কলকাতায় অবস্থানকালে সিনেমার টিকিট ব্লাক করা টাকায় সিনেমা দেখাতে জীবনের সার্থকতা খুঁজেছে। এই চরিত্রটির সময়ের বিবর্তনে দুর্ঘটনায় একচোখ কানা হলেও মনে হয় যেন সে জন্মান্ধ। কেননা তার দুচোখ জীবনবোধের আলো বিবর্জিত। সঙ্গত কারণেই উন্নতি লাভের প্রত্যাশা নেই। কলকাতার চলচ্চিত্রে এবং বাংলাদেশে অবস্থানকালে কান্দুপট্টির নারীসঙ্গে বিনোদন খুঁজেছে। অর্থাভাবে দেহ বিলাসিনী নারীসঙ্গ লাভের প্রয়োজনে তাদের খদ্দের সংগ্রহের দালালে পরিণত হয়েছে। সুযোগ পেলে সে আকণ্ঠ মদ্যপান করে মাতাল থাকে। দরিদ্র অশিক্ষিত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চেতনায় একমাত্র বিনোদন নারীসঙ্গ হলেও স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণে মানুষ পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের জীবিকা অর্জনসহ ভাগ্য পরিবর্তনেরও চেষ্টা করে। শরফুদ্দিন তার ব্যতিক্রম। এ চরিত্রটি স্বাভাবিক মানবীয় গুণাবলিতে বিকশিত নয়। কেননা নিঃসন্তান ফুফুর সম্পত্তি প্রাপ্তির লোভ বা তা কৌশলে হস্তগত করার কূট চেষ্টাও এ চরিত্রে দেখা যায় না। নীরবে-নিভৃতে আকণ্ঠ মদ্যপান আর নারীসঙ্গ ব্যতীত এ চরিত্রের না-সূচক গতিবিধিরও আর কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।

শরফুদ্দিন তথা কানা ব্যাওড়ার স্ত্রী কুসুম স্বামীর অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, সর্বোপরি সাংসারিক অভাব-অনটনে বিপর্যস্ত। বিবাহিতা কুসুমের নারীসত্তার সকল চাওয়া ও স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা নেই উপরোন্তু কানা ব্যাওড়ার সঙ্গে পাঁচ বছরের সংসারেও সে মা হতে পারে নি। স্বামীর সঙ্গে নিত্য ঝগড়া ও সংঘর্ষ চরমতম পর্যায়ে পৌঁছালেও সে কানা ব্যাওড়াকে ত্যাগ করে না। ঝগড়া শেষে  মাতালের পাশেই শুয়ে রাত্রিযাপন করে। কাজের বাড়িতে একরাত থাকতে বললে সে কানা ব্যাওড়ার কথা ভেবে থাকতে রাজি হয় না। অর্থাৎ কানা ব্যাওড়ার তার প্রতি অধিকারবোধকে সে স্বীকার করে। কুসুমের এমনতর আচরণে চিরাচরিত বাঙালি বিবাহিতা নারীর বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। বাঙালি সমাজের বধূ হলেও কুসুমের নারীসত্তার অপূর্ণ কামনা-বাসনার জাঁতাকলে পিষ্ট ইচ্ছাশক্তির তীব্রতার কাছে সে হার মেনেছে। জামাল সাহেবের আবেদনে সাড়া দিতে বাধ্য হয়েছে। স্বামী কানা ব্যাওড়ার তার প্রতি উদাসীনতা ও পাঁচ বছরের সংসারের সার্বিক শূন্যতায় যেন কুসুম বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। জামাল সাহেবের উচ্চারিত তিনটি শব্দ ‘মুখ বন্ধ রাখবি’কে ধারণ করে তার নারীসত্তাকে বিপথে চালিত করেছে। কুসুমের শরীরে মাতৃত্বের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠলেও তা কানা ব্যাওড়ার নজরে আসে না। এই একটি ঘটনাই কানা ব্যাওড়ার স্ত্রীর প্রতি সীমাহীন অবহেলা ও উদাসীনতা প্রমাণ করে। সমাজ-স্বীকৃত বিবাহ নামক বন্ধন ব্যতিরেকে আর কোনো আত্মিক বন্ধন উভয়ের মধ্যে লক্ষণীয় নয়। সঙ্গত কারণেই জীবনবাদী কুসুম পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছে। প্রথমাবস্থায় ঢাকা শহরে সম্মানের সঙ্গে জীবিকার প্রয়োজনে সে কানা ব্যাওড়ার বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল। কাজেই কুসুম চরিত্রটি সচেতন প্রয়াসে কামুক বা দুশ্চরিত্র নয়। কুসুম সার্বিক পরিস্থিতির শিকার এক মানবী চরিত্র।

স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত ‘কানা ব্যাওড়া’ গল্পের সূচনায় স্বামী-স্ত্রীর সংঘর্ষের কারণ ছিল অভাব। গল্পেই উল্লেখ আছে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের মুখে ভাত তুলে দিতেই রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। এ ছাড়া  মেথরপট্টির খেটে খাওয়া ভাবি নামে পরিচিত নারীর পেটের দায়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত অভাব দারিদ্র্যে জর্জরিত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের চিত্র। যা লেখকের শিল্পিত প্রয়াসে ‘কানা ব্যাওড়া’ গল্পের কাহিনিতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

দীপেন ভট্টাচার্য

বিস্মরণ

গল্পটি করোনাভাইরাসের মহামারি চলাকালীন সময়ে রচিত হলেও গল্পের বিষয় করোনাভাইরাস নয় পৃথিবীতে অনাগত অজানা অন্য এক ভাইরাসের আগমনের পূর্বাভাস বা ভবিষ্যৎ বাণী প্রদান করেছেন লেখক। বিস্মরণ শব্দের অর্থ বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়া। মানুষের শরীর ভেদ করে দেহের অভ্যন্তরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকলাবস্থা তৈরি করে ভাইরাস বহুকালে বহু প্রাণনাশ করেছে। রোগ-শোক মহামারিকে অতিক্রম করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে মানুষ আবারও সভ্যতার ধারাবাহিকতায় অনন্য অবদান রেখেছে। শরীরভেদী ভাইরাসের কার্যক্ষমতাকে বিলীন করতে ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আপ্রাণ প্রচেষ্টা চলেছে। কালের বিবর্তনে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মাধ্যমে এসব ভাইরাসের আক্রমণ বা আগ্রাসী কার্যকলাপ অনেকাংশে থামানো সম্ভব হয়েছে। একবিংশ শতকের বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির ভ্যাকসিন ও একদিন বিশ্বব্যাপী সর্বস্তরের মানুষের হাতে পৌঁছে যাবে।

‘বিস্মরণ’ গল্পের উল্লিখিত ভাইরাস মানুষের স্মৃতিকে আক্রান্ত করেছে। খেয়ে ফেলেছে সকল স্মৃতি। অন্য সকল ভাইরাসের তুলনায় নিঃসন্দেহে এ ভাইরাসটার কার্যকারিতা ভয়াবহ। কেননা স্মৃতি ভুলে যাওয়া মানবজাতি অবশ্যই প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন তৈরির আবশ্যকতা সম্পর্কেও বিস্মৃত থাকবে। এমনকি বিস্মৃত মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে পারবে না। প্রতিরোধ বা প্রতিকার এবং ভুলে যাওয়ায় ফলাফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। শত কোটি বছরের মানব সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হওয়ার জন্য বিস্মৃত হওয়ার এই ভাইরাসের কার্যকারিতাই যথেষ্ট।

মানবসভ্যতায় ক্রমাগত প্রযুক্তির নব আবিষ্কার যেমন অসংখ্য সুবিধা এনে দিয়েছে তেমনি এর ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। বর্তমান সভ্যতার মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহারের ফলটিও সুখকর নয়। মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত কথা বলা ক্যান্সার, স্মৃতিভ্রম রোগসৃষ্টিসহ দৃষ্টিশক্তির ওপরেও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ‘বিস্মরণ’ গল্পটির মূল বিষয় একবিংশ শতকে ছড়িয়ে পড়া ভবিষ্যৎকালের তথা অনাগত শতকের ভয়ঙ্কর কাল্পনিক ভাইরাস।

গল্পকথক নাসার আন্তর্জাতিক মহাকাশ যানের এক নভচারী। পৃথিবীপৃষ্ঠের চারশত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকে নভোচারীরা পৃথিবীর রাতের আলোকমালা দেখতে পায়। নাড়ির টান অথবা আত্মীয়পরিজনের টানে রাতের পৃথিবীর আলোকসজ্জা তথা সর্বাধুনিক আলোকিত দেশ নিউইয়র্কের আলোকসজ্জা মহাকাশযানে বসেই তারা অবলোকন করে। এ অবস্থায় ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পৃথিবীপৃষ্ঠে সংঘটিত বিশৃঙ্খলার বিবরণ লেখক যুক্তিসহকারে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন। পাওয়ার স্টেশন চালানোর মতো কেউ না থাকায় একে একে হীরকখণ্ডের মতো দ্যুতিময় নিউইয়র্কের আলোকসজ্জা অন্ধকারে পরিণত হয়েছে। নাসার সঙ্গে মহাকাশযানের নভোচারীদের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণে বিস্মরণ ঘটায় হয়তো পাওয়ার স্টেশন কীভাবে পরিচালিত করতে হবে তা পাওয়ার স্টেশনের ইঞ্জিনিয়াররা ভুলে গেছেন। নাসার বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের প্রভাবে ভুলে গেছে মহাকাশে প্রেরিত মহাকাশযানের অস্তিত্বের বিষয়টি। উদ্ভূত ভয়াবহ পরিস্থিতি কল্পনায় মানবসভ্যতার পারস্পরিক সম্পর্কসহ সকল বিষয় হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। ভয়ঙ্কর এই ভাইরাস পৃথিবীর শত কোটি বছরের মানব সভ্যতা ধ্বংস করতে সক্ষম। গল্পে খামারবাড়ির মালিক জিম এবং মার্থার কথোপকথনে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিম টেলিভিশনের অস্তিত্বের কথা ভুলে গেছে। ভুলে গেছে মানুষের আকাশ জয়ের কথা। মার্থার স্মৃতিতে আবছায়া কিছুটা মনে পড়লেও তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে না।

বিস্মরণ গল্পের দুই নভোচারী আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত অবস্থায় আলোকোজ্জ্বল পৃথিবীপৃষ্ঠের আকস্মিক পরিবর্তনে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। স্ত্রী ও সন্তানদের সার্বিক খবর জানার আত্মিক টানে সয়ুজ যানে চেপে পৃথিবীতে অবতরণ করেছে। খামার বাড়িতে তালাবদ্ধ ঘরে পড়ে থাকা ছেড়া পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে তাদের মনোপ্রশ্নের সমাধান মিলেছে অর্থাৎ পৃথিবীর অস্বাভাবিকতার কারণ অনুসন্ধান সম্ভব হয়েছে। সেখানে লেখা রয়েছে-‘পৃথিবীর দুঃসময়, ভাইরাসে আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষ সেরে উঠছে, কিন্তু ইচ্ছেশক্তি হারাচ্ছে, ভাইরাসে মানুষের মানসিক মৃত্যু, ভাইরাসের বিস্মরণ।’

শক্তিশালী এ ভাইরাসের কারণে শুধুমাত্র জিম এবং মার্থাই আক্রান্ত নয় তাদের শেপার্ড কুকুরটিও আক্রান্ত হয়ে নিজের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত আচরণ করেছে। বিশ্বব্যাপী শুধুমাত্র মানুষই নয় সকল প্রাণী এ ভাইরাসের সংক্রমণে বিস্মৃত হয়েছে পূর্বোক্ত সকল বিষয়। অর্থাৎ মহামারি ভাইরাসে পশুপাখিও সংক্রমণের শিকার হয়।

জিম এবং মার্থার সংস্পর্শে কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার শাস্তিস্বরূপ গল্পকথক এবং নভোচারী রিটা ম্যাকিন্টায়ারও ছোঁয়াচে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। খামারবাড়ির তালাবদ্ধ ঘর থেকে পালিয়ে হিউস্টনের পথে যাত্রার কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে রিটা ম্যাকিন্টায়ারই প্রথম অনুভব করে ফোনের জিপিএস স্ক্রিনে ফুটে ওঠা সংখ্যার অর্থ সে বুঝতে পারছে না। সে এই ভেবে কিছুটা হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে যে বিস্মরণ ভাইরাস তাকে গ্রাস করেছে। ভয়াবহ সত্যটি আরও কঠিনরূপে সামনে উপস্থিত হয় যখন গল্পকথক ভুলে যায় তারা মরিয়া হয়ে হিউস্টনের উদ্দেশে কেন যাচ্ছে।

রিটা ম্যাকিন্টায়ার কিছুটা কম সংক্রমিত হওয়ায় সে উপলব্ধি করেছে হয়তো হিউস্টনের কেউ তাদের মনে রাখেনি। তারা সবাই একে অপরকে ভুলে গেছে। সেও সম্পূর্ণটা ভুলে যাওয়ার আগে যতটা সম্ভব হিউস্টনের পথে সামনে এগিয়ে যেতে চেয়েছে।

গল্পে বর্ণিত ভাইরাসের আগ্রাসী প্রভাবে মস্তিষ্কের স্মৃতিস্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান আকস্মিক করোনা মহামারির ক্রমাগত মৃত্যুর মিছিল আর লকডাউনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাসহ সার্বিক সমস্যায় মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত। যেকোনো মহামারি মানসিক শক্তিকে বিপর্যস্ত করে দিতে সক্ষম। সমসাময়িক কালের মহামারি সমস্যার কেন্দ্রীয় বিষয় মানুষের মানসিক অসুস্থতার বিষয়টাকে ‘বিস্মরণ’ গল্পের কাহিনিতে ভবিষ্যৎ ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণের ইঙ্গিত রূপকের অন্তরালে লেখক উপস্থাপন করেছেন যা উত্তম পুরুষে বর্ণিত চমকপ্রদ ছোটগল্পের পর্যায়ে উন্নীত।

ওমর কায়সার

উত্তম কুমার

গল্পকার ওমর কায়সার রচিত ‘উত্তম কুমার’ গল্পটিতে  সমকালীন সমাজের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ও মানুষের ব্যক্তি মূল্যায়নকেন্দ্রিক সমস্যায় নানা কৌণিক বিন্দু থেকে বিক্ষিপ্ত আলো ফেলা হয়েছে। আধুনিক সমাজের অসংখ্য সমস্যার অন্যতম কর্মসংস্থান সমস্যা।  জনসংখ্যাবহুল ছোট আয়তনের বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সংকট হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিষয়টাকে লেখক গল্পে অন্তর্ভুক্ত করে বেকার জীবনের দুঃসহ যন্ত্রণার ইঙ্গিত দিয়েছেন। স্বাভাবিক নিয়মে যোগ্যতার বিচারে চাকরির জন্য প্রার্থী নির্বাচিত হয়।  এও সত্যি মামা-চাচার পক্ষপাতিত্ব বা পরিচয়ের জোরে অনেকেরই দুর্ভিক্ষের পরিবেশেও চাকরি নিশ্চিত হয়ে যায়। বর্তমান সময়ে প্রচলিত লৌকিক মন্তব্য মামা-চাচার অনুরোধ ব্যতিরেকে চাকরি হয় না। উত্তম কুমার গল্পের কাহিনির প্রবহমানতায় লেখক দেখিয়েছেন চাকরি না হওয়ার বিষয় একপাক্ষিক নয়, দ্বিপাক্ষিক। আত্মীয়ের অনুরোধে চাকরির পরীক্ষায় প্রশাসনের সহমর্মিতা থাকলেও সেখানে অযোগ্য ব্যক্তি চাকরির জন্য কখনও বিবেচিত হন না। স্বজনপ্রীতি ও সহমর্মিতা চাকরি প্রার্থীর অযোগ্যতায় ফিকে হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে মামার অনুরোধেও প্রার্থীর চাকরি হয় না। নির্দ্বিধায় বলা যায় যথাযথ কর্মক্ষেত্র অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থী স্বজনপ্রীতি ব্যতিরেকে চাকরির জন্য মনোনীত হতে পারেন। সহমর্মিতা ও স্বজনপ্রীতির দোহাই সাপেক্ষে কখনও অযোগ্য ব্যক্তিকে পদস্থ করা হয় না।

‘উত্তম কুমার’ গল্পের মোহাইমেন শহরের একমাত্র সিনেপ্লেক্সের মালিকের সামনে ভাইভা পরীক্ষায় তার দিকে ছুড়ে দেওয়া অসংখ্য প্রশ্নের একটিরও উত্তর দিতে সক্ষম হয় না। মোহাইমেনের চাকরির জন্য বন্ধু শাহেদের আন্তরিক অনুরোধ রয়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্নকর্তা আহমদ সাহেব বারবার প্রশ্ন করে প্রার্থীকে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। অনেকটা এইরূপ যেন মোহাইমেন অন্তত একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। অনুরোধটুকু না থাকলে হয়তো মোহাইমেনের উত্তর না বলতে পারার জন্য আহমেদ সাহেব হতাশ হতেন না। চাকরিপ্রার্থী মোহাইমেন ভাঙাচোরা একটা উত্তর দিতে পারলেও হয়তো বন্ধুর অনুরোধ রক্ষা করে আহমেদ সাহেব স্বস্তি পেতেন। অন্যদিকে সাধারণ ডিগ্রি পাস মোহাইমেনের বোঝা উচিত ছিল প্রতিষ্ঠান বিশেষে চাকরির পরীক্ষায় বিষয় সংশ্লিষ্ট প্রশ্নই তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। সিনেপ্লেক্সের মালিকের অধীনে চাকরির মৌখিক প্রশ্ন সিনেমা এবং সিনেমার নায়ক সংক্রান্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। উপরোন্তু মোহাইমেনের চেহারায় মহানায়ক উত্তম কুমারের চেহারার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। চাকরির ভাইভা পরীক্ষায় মোহাইমেনের উত্তর দিতে না পারার ক্রমাগত ব্যর্থতার দায় প্রতিষ্ঠান বা প্রশ্নকর্তার একার নয়। এক্ষেত্রে মোহাইমেনের পরীক্ষার প্রশ্ন সংক্রান্ত বিচক্ষণতার অভাব অনেকটা দায়ী।

মোহাইমেনের চাকরির মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে উন্মোচিত হয় বর্তমান সময়ের মেকি-মুখোশধারী ও মেকআপের রং আবৃত মিথ্যাকে সত্য বলে স্বীকার করে নেওয়ার প্রবণতা। মুখের চেয়ে মুখোশ আপন হয়েছে। এ যেন বর্তমান সভ্যতার মানুষকে চেনার মানদণ্ড। উত্তম কুমারের সঙ্গে চেহারার সাদৃশ্যে মোহাইমেনের রয়েছে চাঁদের মতো কপাল, গোলাকার মুখ, চোখ ও নাক যা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। তবু আহমেদ সাহেব উভয়ের মধ্যে কোনো সাদৃশ্য দেখতে পেলেন না! কেননা তার ড্রেসআপ, মেকআপ ও উজ্জ্বলতা উত্তম কুমারের সমতুল্য নয়। লেখক অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মকভাবে বর্তমান সভ্যতায় মানুষ বিচারের মানদণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন আহমেদ সাহেবের হাস্যকর বিচক্ষণতার মাধ্যমে। আবেগহীন কাষ্ঠ সর্বস্ব হৃদয়ের মানুষগুলো মৃতের মতো। লেখক উত্তম কুমার গল্পে ক্রন্দনরত মোহাইমেনের মাঝে প্রকৃত উত্তম কুমার চরিত্রের সঙ্গে সাযুজ্য উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ আবেগ মানুষের প্রাণ। আবেগের বাহুল্য নয় পরিমিত আবেগ মানুষের ভেতরের মানুষটাকে জাগ্রত করে তোলে।

সাধারণ ডিগ্রি পাস অর্থাৎ গ্র্যাজুয়েট সার্টিফিকেট আধুনিক অসংখ্য ডিগ্রির শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেটের পাশে ম্লান হয়ে যায়। এক্ষেত্রে জীবিকার প্রয়োজনে চাকরিদাতার ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে প্রয়োজনে সঙও সাজতে হয়। মোহাইমেন উত্তম কুমারের বিভিন্ন চরিত্র সেজে সিনেপ্লেক্সের দর্শকদের মনোরঞ্জন করবে এমন চাকরিরই দায়িত্ব পায়। তবুও ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো না। কালচক্রে সামান্য কয়েক মাস পরে বিশ্বব্যাপী কারোনা মহামারির ভয়াল থাবায় থমকে যায় পৃথিবী। সর্বত্র লকডাউনে সিনেপ্লেক্স বন্ধ হয়ে গেলে মোহাইমেন চাকরি হারায়। প্রকৃতপক্ষে শুধু সিনেপ্লেক্স নয় করোনাকালীন লকডাউন চলাকালীন সময়ে গার্মেন্ট শিল্পকারখানাসহ সকল সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষিত হয়। বিনা অপরাধে অসংখ্য চাকরিজীবী মোহাইমেনের মতো সাময়িকভাবে বরখাস্ত হয়। এদের মাঝে অনেকেই হয়তো মোহাইমেনের মতো দীর্ঘ বেকারত্বের অভিশাপে ভগ্ন স্বপ্নের যন্ত্রণায় দীর্ঘকাল অতিবাহিত করে ভাগ্যক্রমে চাকরির সংস্থান করতে সক্ষম হয়েছিল। অনেকেই তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। করোনা মহামারির সময় অনির্দিষ্ট লকডাউনের প্রভাবে  বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্কুল-কলেজ তাদের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারেনি। চাকরি ক্ষেত্রে করোনাকালীন এ প্রভাব গল্পের কাহিনিতে সংযোজিত হওয়ায় গল্পটি করোনাকালীন সামাজিক সমস্যার বিষয় সম্পর্কিত ছোটগল্পের অন্তর্ভুক্ত হয়।

মোহিত কামাল

বন্ধুর বন্ধু

গল্পটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির সময়কালীন রচনার অন্তর্র্ভুক্ত। চীনের উহান শহরের কোভিড-১৯ এর ব্যাপক সংক্রমণ চলাকালে মৃত্যুর মিছিল, মৃত্যুর আতঙ্ক, হতাশা, লকডাউনের প্রভাব, দারিদ্র্য এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদীর মন জুড়ে সুযোগ বুঝে পুকুর চুরির পরিকল্পনাসহ সকল দুরভিসন্ধির খেলা চলে। বিশ্বব্যাপী সাময়িক চিত্রকে অবলম্বন করে লেখক তাঁর সৃষ্টিশীলতা অব্যাহত রাখে। সঙ্গত কারণেই ঐতিহাসিক অস্থির পরিস্থিতি, রোগশোক, যুদ্ধ-সংগ্রাম ও মহামারির অনুরূপ করোনা ভাইরাসও সমকালীন সাহিত্যে তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করেছে।

বাংলা সাহিত্যে করোনাকালীন অধিকাংশ রচনায় স্থান পেয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কিছু গল্পে সংযোজিত হয়েছে মনস্তত্ত্ব। কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল রচিত ‘বন্ধুর বন্ধু’ নামক গল্পটি করোনাকালীন রচনা হলেও ভিন্নতর ভাবধারা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল একটি শিল্পসম্মত রচনা। রোদ্দুর এ রচনার কেন্দ্রীয় চরিত্র। রোদ্দুর সমগ্র মানব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। রোদ্দুরের সঙ্গে বেগুনি ফুলের সমারোহে শুকনো ডাল বিশিষ্ট গাছের কথোপকথন গল্পের মূল কাহিনি। শুকনো ডালবিশিষ্ট গাছ প্রকৃতির প্রতীক। শুকনো গাছের ডালটি হঠাৎ বেগুনি ফুলের আচ্ছন্ন হওয়ায় রোদ্দুর বিস্মিত হয়েছে। রোদ্দুরের অবাক দৃষ্টিতে ধরা পড়ে গাছে প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে। নিজের জীবিত অবস্থার বর্ণনা দিয়ে গাছ প্রমাণ করেছে সে মৃত নয়। মানব সমাজ প্রকৃতিকে মৃত ভেবেছে। তাদের এ ভাবনার পেছনে রয়েছে সীমাহীন আত্মঅহমিকা। ক্ষমতার দাপটে তারা জীবিত প্রকৃতিকে স্বীকৃতি না দিয়ে মৃত ভেবে অসংখ্য অন্যায় অত্যাচার চালিয়েছে। সঙ্গত কারণেই গাছের মুখে আক্ষেপ ধ্বনিত হয়েছে—‘কী অত্যাচার তোমরা চালিয়েছ আমাদের ওপর’ প্রকৃতপক্ষে বিবেক-বুদ্ধির সূক্ষ্ম চালনায় মানব সম্প্রদায় প্রকৃতিতে জীবিত অন্য সকল প্রাণীকে তুচ্ছ জ্ঞান করে প্রভুত্ব বিস্তার করেছে। এই আগ্রাসী মনোভাবে তারা নিজেরাও ধ্বংস হয়েছে। আত্মঅহমিকা ও ক্ষমতার দাপটে পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে রক্তাক্ত হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষ, হত্যা ও লুটতরাজ। মানুষের নির্বিচারে প্রকৃতির প্রতি অন্যায় আচরণে রুষ্ট প্রকৃতি প্রতিশোধ স্পৃহায় মানবকুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণায় যেন করোনা ভাইরাসকে আপন করে নিয়েছে। মানুষের শত্রু সূক্ষ্ম ভাইরাস কণিকার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। লেখকের মতে করোনা ভাইরাস মানব সম্প্রদায়ের অকৃত্রিম প্রকৃতি-বন্ধুর বন্ধু হয়ে উঠেছে। সঙ্গত কারণেই তিনি গল্পের নাম দিয়েছেন ‘বন্ধুর বন্ধু’।

প্রকৃতির অঙ্গুলি সংকেতে বেগুনি রঙের কার্পেটের দিকে তাকিয়ে রোদ্দুর বিস্মিত হয়েছে। কেননা  করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুর মিছিল চলমান। রোদ্দুর ক্ষুদ্র এ ভাইরাস কণিকার দেহাবয়ব সম্পর্কে জানে। নিজের প্রাণসংশয় কল্পনায় ভয়ার্ত কণ্ঠে প্রকৃতির উদ্দেশ্যে বলেছে—‘ওরা কারা ?’ ওদেরকে রোদ্দুর চিনে না এমনটি নয়। নিজের মৃত্যুদূতকে দুর্বল ভাবা প্রকৃতির কোলে আয়েশ করতে দেখে নিশ্চিত হতে চেয়েছে সে যা দেখেছে তা সত্যি কি না। করোনা মহামারির বিষয়কেন্দ্রিক ‘বন্ধুর বন্ধু’ গল্পটি অন্তর্ভুক্ত হলেও এর অন্তর্নিহিত ভাবটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উজ্জীবিত করে। অন্যায়কারী, শোষক যত শক্তিশালীই হোক তার বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদের বিকল্প নেই।

প্রকৃতি মানব সমাজের প্রকৃত বন্ধু। প্রকৃতির অকৃত্রিম বন্ধুত্বকে আলিঙ্গন করেই মানবসভ্যতা রক্ষিত হবে। প্রকৃতির এ ক্রোধ ও প্রতিশোধ স্পৃহা সাময়িক। প্রকৃতির উদারতা কল্পনা করেই মানুষ আত্মবিশ্বাসী হয়ে করোনা জয়ের স্বপ্ন দেখে। উদার প্রকৃতি আবারও মানুষের বন্ধু হয়ে উঠবে। তবে প্রকৃতির আগ্রাসন মানব সমাজের অন্ধ চোখ খুলে ন্যায়ের পথে পথ চলার আহ্বান। এ কথা সত্য করোনা মহামারির মৃত্যুর মিছিল মানবমনকে ধর্মানুসারী করেছে। অন্যায়, অবিচার, অনাচার, অহমিকা ক্ষমতার দাপট থেকে মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষ শুদ্ধ পথ অবলম্বনের চেষ্টা করেছে।

প্রকৃতি ও মানব একে অন্যের পরিপূরক। যুগ যুগ ধরে মানুষ প্রকৃতির বুকে আশ্রয় নিয়েছে। একাত্ম হয়ে রোদ্দুরের চোখ বিদ্রোহ করে বলেছে, এ সবই তাকে কপালে তোলার ফল। চোখ যদি যথাযথ স্থানে থাকত তাহলে অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, ব্যভিচার ও অসৎকর্ম  থেকে মানুষ নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারত। রোদ্দুর নিজের চোখের কাছে প্রথম অপমানিত হয়। চোখ ঘৃণাভরে তাচ্ছিল্যের স্বরে রোদ্দুরের মনের চোখ খুলে দিতে বলে।

মানুষের লোভাতুর সীমাহীন চাহিদা মানুষকে করেছে আধুনিক। আধুনিকতার নামে মানুষ হারিয়েছে মনুষ্যত্ব। তারা ক্রমাগত প্রকৃতির ওপর নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে নিজের প্রয়োজনে। রুগ্ন, জীর্ণ, শীর্ণ প্রকৃতিতে হঠাৎ প্রাণের ছোঁয়ায় রোদ্দুর অবাক হয়েছে। শুকনো ডালে বেগুনি ফুলের সমারোহে মলিন প্রকৃতিতে প্রাণ ফিরে এসেছে। বেগুনি রং রাজকীয়, আভিজাত্যের প্রতীক।

এ গল্পে রোদ্দুরকে পুরো মানব সমাজের প্রতিনিধি করে প্রকৃতির সঙ্গে মনোকথনের সুযোগ দিয়েছেন লেখক। বিষিয়ে ওঠা মনে উদার প্রকৃতিও প্রতিশোধ নেয়। ছোট ছোট প্রতিশোধে প্রতিকার না পাওয়ায় হয়তো বর্তমান পৃথিবীজুড়ে করোনা সংকট প্রকৃতির প্রতিশোধের বৃহৎ পদক্ষেপ। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে প্রকৃতির প্রতিশোধের দেবীর পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রিক সাহিত্যের এই ঐশী প্রতিশোধের আত্মার নাম নেমেসিস। গ্রিক সাহিত্যের অনুরূপ বাংলা সাহিত্যে নেমেসিস ‘বন্ধুর বন্ধু’ গল্পে করোনার সুচালো কণিকা ভাইরাসের রূপে ধরা দিয়েছে।

আজ মৃত্যু ভয়ে ভীত মানুষ একা হয়েছে। ভেঙেছে তাদের সঙ্ঘবদ্ধ অন্যায়চক্র। আতঙ্কিত মানুষ ছয় ফুট দূরত্ব রাখে নিজেদের মধ্যে। প্রাণ বাঁচানোর প্রয়োজনে নিজেকে চার দেয়ালে বন্দি করেছে। অন্যদিকে করোনাকে সাদরে গ্রহণ করে প্রকৃতি হয়েছে সমৃদ্ধ, রাজকীয়। পাখিরা পেয়েছে মুক্ত আকাশ। স্থবির জীবনে প্রকৃতিতে ধোঁয়াহীন বিশুদ্ধ বাতাস ফিরে এসেছে। নদীর স্রোত আপন আনন্দে বয়ে চলেছে। করোনার দাপটে প্রকৃতি তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। একমাত্র প্রকৃতিই পারে সুচালো কণিকার মতো রঙিন ভাইরাস করোনার হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে। প্রকৃতিই তাদের শেষ আশ্রয়। এ গল্পের মাধ্যমে মানুষের মনের চোখকে জাগানোর চেষ্টা করেছেন লেখক। লোভ, হিংসা ক্রোধ ভুলে শুভ্র, সুন্দর ও সত্যের অনুসারী মানবকে তিনি প্রকৃতির মাধ্যমে প্রত্যাশা করেছেন। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির দাপট, প্রকৃতির প্রতিশোধে মানুষের অসহায় রূপ নিরূপণ, করোনাকে প্রতিরোধ করার পন্থা সকলি অতিসুন্দর ও শিল্পিতভাবে লেখক এ গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পের শেষে কালোমেঘে রোদ ঢেকে যাওয়ার প্রতীকী ব্যঞ্জনায় লেখক মানবজীবনের এক মহাবিপদ সংকেতেরও নির্দেশ করেছেন। রোদ্দুর করোনার সূক্ষ্ম কণিকাকে দমন করার উপায় জানে বলেই এরূপ আশার বাণী উচ্চারণ করেছে ‘আমাদের দেহের বাইরে ভাইরাস মৃত!’ গল্পের শেষে লেখক রোদ্দুরের মুখ দিয়ে করোনা ভাইরাস বিনাশের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। যথাযথ উপমা, রূপক এবং চিত্রকল্পের সার্থক প্রয়োগে ‘বন্ধুর বন্ধু’ গল্পটি করোনাকালীন রচনার অন্তর্ভুক্ত অসাধারণ এক শিল্পসার্থক ছোটগল্প।

মিলু শামস

সাদার্ন ভিউ

গল্পে সাদার্ন ভিউ বর্তমান সময়ের প্রথম সারির আবাসন কোম্পানি। এই প্রকল্পের সেলস উইং পদে কর্মরত ফাহিমের আত্মোপলব্ধি গল্পের মূল বিষয়। ফাহিমের প্রেমিকা নবনীও কোনো এক বহুজাত কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নিজের কর্মদক্ষতায় বিশ্বব্যাপী কোম্পানির সুনাম অর্জনের পুরস্কারস্বরূপ তার চেয়ারটি অতি দ্রুত উচ্চপদস্থ হয়েছে। স্বল্পদৈর্ঘ্যরে গল্প হলেও ‘সাদার্ন ভিউ’ গল্পে সমসাময়িক নাগরিক জীবন যন্ত্রণা, বিশৃঙ্খলতা ও ক্ষয়িষ্ণু মানবিকতার অন্ধকার দিকটি ফুটে উঠেছে। নগরায়নের স্রোতে গা ভাসিয়ে নিজেকে উচ্চপদস্থ করার লক্ষ্যে বর্তমানে মানুষ প্রতিনিয়ত তেলাপোকায় পরিণত হচ্ছে। তেলাপোকার লম্বা সুর আর সরু তারের মতো হাত-পা রয়েছে। তেলাপোকার সঙ্গে ফাহিম নিজের ব্যক্তিত্বের মিল পাওয়ার কারণ তেলাপোকা মেরুদণ্ডহীন সর্বভুক প্রাণী। কোম্পানিতে চাকরির প্রতিযোগিতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখার তথা ব্রিলিয়ান্ট প্রমাণ করার পরীক্ষায় ফাহিম অনুভব করে সে মানুষ থেকে  মেরুদণ্ডহীন তেলাপোকায় পরিণত হয়েছে। সর্বভুক তেলাপোকার মতো বসের সকল মতামত গিলে খাচ্ছে। নিজস্ব অভিমত, ন্যায় অন্যায়বোধ, মানবতা সর্বোপরি তার সার্বিক সত্তা বিলুপ্ত হয়েছে। শরীরকে মাটির সমান্তরালে নিয়ে গিরগিটির মতো রং পাল্টে তেলাপোকার মতো সামনে এগিয়ে প্রতিনিয়ত এক নিকৃষ্ট জীবন-যাপন করছে। ফাহিমের মনে হয় যেন দুই পায়ে ভর করে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতেই সে ভুলে গেছে।

ফাহিমের চেতনায় দাসত্ববৃত্তি ও মানবিকতা বিসর্জনের কাজটি সম্পূর্ণভাবে সমর্থিত নয় যতটা নবনী পেরেছে। নবনী আধুনিক সমাজের আধুনিক কালচারে নিজেকে যথার্থ তেলাপোকায় পরিণত করতে পেরেছে বলেই গল্পে তার আত্মগ্লানি অনুপস্থিত।

সাদার্ন ভিউ-আবাসন প্রকল্পের নির্ধারিত জমিতে যে সকল বাড়ি ছিল আর্থিক বিনিময়সহ বিভিন্ন কৌশলে তা কোম্পানি দখলে নিতে পেরেছে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ বিড়ম্বিত হবার কারণ তিন পরিবার। প্রকল্পের মাঝ বরাবর অবস্থানরত তাদের পৈতৃক নিবাস সাদার্ন ভিউ কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে তারা রাজি নয়। দ্বিগুণ-তিনগুণ বা ততোধিক আর্থিক বিনিময়েও প্রস্তাবটি নাকচ হওয়ায় কোম্পানি ভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কোম্পানির গোপন মিটিং কার্যকর হয় এক মাসের মধ্যেই। পিকনিক থেকে বাড়ি ফেরার পথে বালুবাহী দুইটি ট্রাকের ধাক্কায় ড্রাইভারসহ তিন পরিবারের নয়জন নিহত হয়।

সাদার্ন ভিউ কোম্পানির বৃহৎ পদক্ষেপে ব্যাঘাত ঘটায় অফিসে অনেকটাই ভাইরাল ছিল তিন পরিবার নামটি। ফাহিম তিন পরিবারের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার সংবাদে বুঝতে পারে তাদের হত্যা করা হয়েছে। এটি কোনো স্বাভাবিক রোডএক্সিডেন্ট নয়। সাদার্ন ভিউ কোম্পানি পথের কাঁটা দূর করে রাতে যে উৎসব আয়োজন করে সেখানে ফাহিমকে ডাকা হয়। ফাহিমের চোখে সব পরিষ্কার কিন্তু সে প্রতিবাদ করতে পারে না। সমূহ ঝামেলা এড়ানোসহ চাকরির প্রয়োজনে নিশ্চুপ থাকে। অনুভব করে ক্রমাগত তার মেরুদণ্ড ভেঙে সে পুরোপুরি তেলাপোকায় পরিণত হয়েছে। ওই মুহূর্তে সাদার্ন ভিউয়ের সঙ্গে জড়িত সকলকেই তাঁর তেলাপোকা মনে হয়। এক সময় সে নিজেও তেলাপোকাদের ভিড়ে মিশে যায়।

রাতে নবনী ফাহিমকে নিয়ে যাওয়ার সময় এমডির কাছে যে আবদার করে তাতে স্পষ্ট হয় হয়তো নবনীও সব জানে এবং সম্পূর্ণ তেলাপোকার পরিণত হওয়ার মাধ্যমেই সে চাকরিতে এত সুনাম ও উন্নতি দুই-ই অর্জন করেছে। নগরায়নের ঢেউ থাকলেও এই সভ্য সমাজেও চলছে দখলদারিত্ব। স্বাভাবিকভাবে মানুষ অন্যায় উপলব্ধি করেও ঝামেলা এড়াতে প্রভাবশালী দলের পক্ষে অবস্থান নেয়। দস্যু কলম্বাসের প্রকাশ্য দখল আর আক্রমণটি বর্তমানে খোলস পাল্টেছে মাত্র অর্থাৎ দখল করার পদ্ধতি বদলেছে। সাদার্ন ভিউ গল্পের প্রতিটি শব্দের ফাঁদে জড়িয়ে রয়েছে সমকালীন সময়ের নাম-না-জানা অসংখ্য তিন পরিবারের মরণচিৎকার, তাদের আর্তনাদ ও নিঃশেষ হওয়ার কাহিনি। ক্ষমতাশালীর উৎসবের সফট্ মিউজিক, হার্ড ড্রিইংস আর আলো-আঁধারির মাঝে হারিয়ে যায় তাজা প্রাণ। কথাসাহিত্যিক মিলু শামস ফাহিম চরিত্রের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে সমাজের এক ভয়ঙ্কর সত্যকে তুলে ধরেছেন। গল্পের বিষয় নির্বাচনে লেখকের সমাজমনস্ক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ‘সাদার্ন ভিউ’ উত্তম পুরুষে বর্ণিত সামাজিক সমস্যা কেন্দ্রীক সার্থক ছোটগল্প।

 লেখক : প্রভাষক (বাংলা বিভাগ), এমফিল গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যবিশ্লেষক                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                        

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares