‘ছোটগল্পকে “ছোট এবং গল্প” হতে হবে’ : সালমা আক্তার

প্রচ্ছদ রচনা : শব্দঘর ২০২০ গল্পসংখ্যায় প্রকাশিত গল্পের বিশ্লেষণ

[মানবজীবন, সমাজজীবনের দর্পণ বা প্রতিচ্ছবির লিখিত রূপ সাহিত্য। বিখ্যাত সাহিত্য-সমালোচক শ্রীশচন্দ্র দাশ তাঁর সাহিত্য সন্দর্শন বইয়ে সাহিত্যের সংজ্ঞায় বলেছেন, ‘নিজের কথা, পরের কথা বা বাহ্য-জগতের কথা সাহিত্যিকের মনোবীণায় যে সুরে ঝংকৃত হয় তাহার শিল্পসংগত প্রকাশই সাহিত্য।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষায়, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ।’ সাহিত্যে ছোটগল্পের শাখা একদিকে যেমন নতুন, অপরদিকে তেমনি পুরোনো। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ অসম্বন্ধ ভাষায় গল্প-কাহিনি রচনা করত এবং শুনত। ইতালীয় সাহিত্যে এবংঃধ জড়সধহড়ৎঁস, ইড়পপধপপরড়-র উবপধসবৎড়হ, ইংরেজি সাহিত্যে বাইবেল, ঈযধঁপবৎ-এর গল্প, অবংড়ঢ়ং ঋধনষবং, সংস্কৃতে বিষ্ণুশর্মার হিতোপদেশ ও পঞ্চতন্ত্র, সোমদেবের কথাসরিৎসাগর, বৌদ্ধ সাহিত্যের জাতকের গল্প, দিব্যাবদান নামক গল্প-সাহিত্য ছোটগল্পের চিরন্তন আবেদনেরই সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, আধুনিক ছোটগল্প এক প্রকার নতুন রূপ সৃষ্টি।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর মতে, ‘ছোটগল্পকে “ছোট এবং গল্প” হতে হবে।’ গল্প আকৃতিতে ছোট হলেই তা ছোটগল্প হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে না। গল্পের আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিগত ও মর্মগত কতকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে যার আলোচনার মাধ্যমে ছোটগল্পের যথার্থ স্বরূপ সম্পর্কে অবহিত হওয়া যাবে। ভাবের একমুখিতা, বক্তব্যের অদ্বিতীয়তা, জীবনপ্রবাহের খণ্ডচিত্রের রূপায়ণ এসব কিছুর মধ্য দিয়ে লেখক সত্তার নির্ভুল প্রকাশই ছোটগল্পের সারকথা।

বাংলায় সমালোচনা সাহিত্যের বয়স শত বছরের সামান্য কিছু বেশি। এই শতাব্দীকালে সাহিত্যের নানা শাখায় বিস্ময়কর উন্নতি সাধিত হলেও এ কথা বলা অযৌক্তিক হবে না যে, তুলনামূলকভাবে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের ততটা সমৃদ্ধি ঘটেনি।

পাঁচ দশকের নিরবিচ্ছিন্ন সাধনায় বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় রস সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে এবং এর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে সমালোচনা সাহিত্য। এ সাহিত্য অন্যান্য শাখার তুলনায় কিছুটা অসংগঠিত থাকলেও বেশ কিছু শক্তিশালী লেখকের আবির্ভাব এই ক্ষেত্রে ঘটেছে। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন―সৈয়দ এমদাদ আলী, একরামুদ্দীন, হুমায়ুন কবির, আবুল ফজল, আব্দুল কাদির, মুজিবর রহমান খান। বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপনে এঁদের অবদানের কথা অনস্বীকার্য। মূলত পঞ্চাশের দশকের সাহিত্যিকদের প্রচেষ্টায় আমাদের সমালোচনা সাহিত্যের সূত্রপাত।

সাহিত্য সমালোচনা বা বিশ্লেষণও সাহিত্যের একটি অংশ। তাই চিন্তাশীল পাঠক মাত্রই সমালোচক। তিনি বোঝার তাগিদে পড়েন এবং যা পড়েন তা নিয়ে ভাবেন। লেখক কি নিত্যবৃত্তের বাইরে নতুন কোনো কথা বললেন ? তাঁর বোধের গভীরতা ও স্পষ্টতা কত, ভাষার মাধুর্যতা বা কারুকাজ কেমন ? একজন বোদ্ধা পাঠক এগুলো তলিয়ে দেখেন, রসজ্ঞ পাঠক এসব খুঁটিয়ে পরখ করেন। তিনি আনন্দের, জ্ঞানের বা বোধের জন্য পড়েন, সমালোচনার ইচ্ছেতে নয়। তবু সমালোচনা হয়ে যায় পাঠের সঙ্গে সঙ্গেই। আর এ পাঠকই প্রকৃত পাঠক এবং একই সঙ্গে সমালোচকও।

একজন সমালোচক মিথ্যার ধূম্রজালে লেখককে আচ্ছন্ন করেন না, বরং তাঁকে সত্য সন্ধানে সহায়তা করেন। বিশ্বাস-অবিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি বা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ধারণ করেন বলে কোনো লেখক সামাজিকভাবে অতি জনপ্রিয় বা অতি নিন্দিত হতে পারেন। সাহিত্যসমালোচক এসব নিন্দা বা প্রশংসাকে পাত্তা দেন না। তিনি সবসময় মনে রাখেন যে, তিনি লেখার বিচারক, লেখকের নন। প্রত্যেকটি লেখারই নিজস্ব প্রেক্ষাপট থাকে, যা সেই লেখাকে বিশিষ্ট করে তোলে। অন্যদিকে, বর্তমানের বাইরে সেই লেখার থাকে একটি সর্বকালীন মূল্য। সমালোচক একই সঙ্গে এ দুটি দিকই মূল্যায়ন করে থাকেন।

মূলত সমালোচক কালের কথাই বলেন, কিংবা কাল কথা বলে তাঁর কণ্ঠে চারিত হয়ে। যথার্থ সমালোচনা তাই সকল কালেই যথার্থ।

অতীত-বর্তমানের সাহিত্যকৃতির মূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমালোচকের দৃষ্টি আজকের সামান্য সৃষ্টি দেখে নতুন লেখকের আগামীর অসামান্য সম্ভাবনা আঁচ করতে পারে। তবে শুদ্ধ সমালোচনার ঘাটতির ফলে বহু প্রতিভাবান লেখককে আমরা জীবৎকালে লেখকস্বীকৃতি দিতে পারিনি, তাঁরা কালোত্তর লেখক বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন মৃত্যুর অনেক পরে। এমনকি তখনও সেই প্রতিষ্ঠার পেছনে কাজ করেছে সমালোচনা, বিলম্বিত সমালোচনা  যেমন : জীবনানন্দ  দাশ, এমিলি এলিজাবেথ ডিকিনসন।

আধুনিক গল্পলেখক বিষয়বস্তু, চরিত্র সৃষ্টি, কথোপকথন, পরিবেশ সৃষ্টি, আকৃতি, বাণীভঙ্গি প্রভৃতি প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে একান্তভাবে আত্মসচেতন। তবে তাঁরা অনেকটা অপ্রস্তুত থাকেন সমালোচনার ব্যাপারে। সাহিত্য সমালোচনায় শুধু প্রশংসা বা শুধু তির্যক রচনায় পূর্ণ হবে এমন নয়। এখানে লেখকের সৃষ্টিকর্মের প্রশংসা, ত্রুটি, তুলনা এ তিনটি বিষয় অবশ্যই থাকা উচিৎ। কিন্তু এটি মেনে নেওয়ার মানসিকতা তাদের মধ্যে খুব একটা তৈরি হয়নি। অনেকে মনে করেন, ঋণাত্মক সমালোচনা লেখকদের অনুৎসাহিত করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সমালোচকের ঋণাত্মক সমালোচনা প্রকৃত লেখকের বিকাশে বাধা নয় বরং তাকে সাহিত্য সাধনায় আরও বেশি নিমগ্ন করে। শিল্প-সাহিত্যের বিকাশে সমালোচনার গুরুত্ব আছে। সমালোচনা ছাড়া সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব নয়। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত যারা তাদের সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতাও থাকা উচিত।

গত আট বছর ধরে চলমান বহুল প্রচলিত ও সমৃদ্ধশীল মাসিক সাহিত্য পত্রিকা শব্দঘর প্রতিবারই বিশাল গল্পের ভাণ্ডার থেকে বাছাই করে কিছু মণিমুক্তা তুলে আনে। এক মলাটের ভেতর বিখ্যাত গল্পকারদের গল্প পাওয়া পাঠকের জন্য সত্যিই সৌভাগ্যের। বাংলা ভাষায় এমন সাহিত্য পত্রিকা খুব বেশি নেই। তাই শব্দঘর-এর সম্পাদক ও প্রকাশককে অসংখ্য ধন্যবাদ; আমাকে ২১টি গল্পের সমালোচনা বা বিশ্লেষণের সুযোগ দেওয়ার জন্য।]

হামিদ কায়সার

অরোরা আলোর হাত

ইতিহাসের গভীরে সন্ধানী আলো ফেলে লেখক প্রথম থেকেই তাঁর ‘অরোরা আলোর হাত’ গল্পটি শিল্পিত করার নানা শিল্প-উপকরণ তুলে ধরার চেষ্টায় অব্যাহত ছিলেন। ইতিহাসের উপাদান নিয়ে সার্থক লেখনী সৃষ্টি করতে হলে অনিবার্য হয়ে ওঠে ইতিহাস ও লেখনীর মধ্যে একটি গভীর ভারসাম্য স্থাপনের। ইতিহাসের আধারে তিনি সন্ধান করেছেন বর্তমানকে শিল্পিত করার শিল্প-উপকরণ।

ইতিহাস ও রচনা এ দুয়ের একটি যাতে আরেকটিকে অতিক্রম করে না যায় সেদিকে জরুরি হয়ে পড়ে লেখকের সতর্ক দৃষ্টির। লেখার বাস্তবতা ও ইতিহাসের বাস্তবতা দুইয়ের রাস টেনে না ধরলে ব্যাহত হতে পারে লেখার শিল্পগত সফলতা। অন্যদিকে নিকট-অতীতের ইতিহাসকে অবলম্বন করলে কখনও কখনও অসম্ভব হয়ে পড়ে লেখকের নিরাসক্তি অক্ষুণ্ন রাখা। যে-ঘটনা দ্বারা তিনি প্রত্যক্ষভাবে আলোড়িত ও ভাবাবেগতাড়িত, ইতিহাসের সেই বাস্তব কাহিনিকে আখ্যানে রূপান্তরিত করা রীতিমতো কঠিন। ইতিহাসের প্রকৃত ঘটনার মধ্যে থাকে যেসব ঘাত-প্রতিঘাত, হর্ষ-বিষাদ, নিষ্ঠুরতা ও মানবিকতার বিপরীতমুখী তরঙ্গমালা, সে-সবের মধ্য থেকে প্রকৃত সত্য উদ্্ঘাটিত করতে হলে লেখককে বজায় রাখতে হয় একটি সুনির্দিষ্ট দূরত্ব। এক্ষেত্রে তাঁর নিরাসক্তি আর নিরপেক্ষ মনোভাবনাই হয়ে উঠতে পারে সাফল্যমণ্ডিত।

‘অরোরা আলোর হাত’ গল্পটির মধ্যে বিদ্যমান ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট, ১৯৮১ সালের জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক ঘটনা এবং বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর সন্ধান পাওয়ার আবেগে জননেত্রীর উদ্বেলিত হওয়ার ঘটনাগুলো লেখক একই সূত্রে গেঁথে উপস্থাপন করেছেন।

‘অরোরা আলোর হাত’ গল্পের প্রথমেই ফুটে উঠেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ত্রিশ বছর পরে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গণহত্যার ঘটনা। ভয়ংকর এই গ্রেনেড হামলার আগের পাঁচ বছরে শতাধিক লোক বোমা হামলায় নিহত হয়। এমনকি বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপরও বোমা হামলা হয়েছিল। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল সে বছরে প্রথম থেকেই সারা দেশে ‘বোমা বিস্ফোরণ’ সিরিজের সর্বশেষ ঘটনা। এ ঘটনার কয়েক দিন আগে ৭ আগস্ট সিলেটে বোমা হামলায় নিহত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের একজন স্থানীয় নেতা। তারই প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে সন্ত্রাসবিরোধী সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ২১ আগস্ট।

২.

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় তিনশ’র বেশি নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হন; নিহত হন আওয়ামী মহিলা লীগের নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন। বিশ্বজুড়ে তোলপাড় করা গ্রেনেড হামলার সেই ঘটনার ভয়াবহতা আমাদের হতবাক করে দিয়েছিল। চারদিকে আর্তচিৎকারে যেন মনে হচ্ছিল কারবালার প্রান্তর। বিস্ফোরণের শব্দ, আহতদের চিৎকার-আহাজারি, রক্তাক্ত নেতাকর্মীদের ছুটোছুটিতে পুরো এলাকা বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে। আহতদের আর্তচিৎকার আর স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। আতঙ্ক আর অবিশ্বাস নিয়ে এদিক-ওদিক দিকভ্রান্ত মানুষের ছুটোছুটি। চারদিকে ছোপ ছোপ রক্ত আর মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ। বিচ্ছিন্নভাবে পড়েছিল পায়ের জুতা, সেগুলো ছিল রক্তে লাল। সেদিন আওয়ামী লীগের জনসভায় বোমা বিস্ফোরণের পর থেকেই পুরো ঢাকা হয়ে ওঠে এক আতঙ্কের নগরী। ঘটনার পর দেখা যাচ্ছিল, বঙ্গবন্ধু এভিনিউর ওপরটা ঢেকে ছিল কালো ধোঁয়ার আকাশ।

এমন নৃশংসতা কখনও হতে পারে তা কারও কল্পনাতেও ছিল না। শেখ হাসিনা মঞ্চেই ছিলেন। দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি আর ধাক্কায় চেয়ার থেকে নিচে পড়ে যান। উনার ওপরে পড়ে অনেকে। হঠাৎ ট্রাকের পাটাতনের ফাঁকে তাঁর চোখে পড়ল আস্ত গ্রেনেড। সেটি বিস্ফোরিত হলে কি হতো ভাবতেও শিউরে ওঠেন এখনও! শেখ হাসিনা কয়েক হাত দূরে। তাঁকে ঘিরে মানববর্ম তৈরি করেছেন তাঁর দলের নেতারা। গ্রেনেডের শব্দ শেষে শুরু হলো গুলির শব্দ। এক পর্যায়ে উঠে দাঁড়ান এবং গুলি থামলে ট্রাক থেকে নেমে আসেন। নামার পর যা দেখেন সেটা আরেক বিভীষিকা। চারদিকে আর্তনাদ, গোঙানি। রক্তাক্ত পড়ে আছে বহু নারী পুরুষ। কে জীবিত, কে মৃত বোঝা মুশকিল।

বাবার মতো দ্বিপ্ত ও বলিষ্ঠ শক্তির অধিকারী শেখ হাসিনা তিনি এত কিছুর মধ্যেও অন্যান্য নেতাকর্মী এবং আইভি রহমানের খোঁজ করছিলেন। মোহাম্মদ হানিফের ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিতে লেগে থাকা রক্তের দাগ দেখে উনি বিচলিত হয়ে পড়েন। শেখ হাসিনা নিজের কথা চিন্তা না করে তাঁর কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং খবর জানতে বিচলিত হয়ে পড়েন। এই দুঃসময়ে, দুর্যোগে তিনি তাঁর নেতাকর্মীদের ছাড়তে চাইছিলেন না। কর্মীদের রক্তাক্ত দেহ, বাঁচার আকুতি তাঁর মন কিছুতেই মার্সিডিজ বেঞ্জের দিকে এগিয়ে যেতে সায় দেয়নি। হঠাৎ করে গুলিবর্ষণ বেড়ে গেলে গাড়িকে টার্গেট করেও গুলি ছোড়া হলে আর কালক্ষেপণ না করে জননেত্রীকে নিয়ে গাড়ি সামনের দিকে অগ্রসর হয়।

কিন্তু মনের মাঝে একটা চিন্তার রেখা বা উৎকণ্ঠা থেকেই যায়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে যখন দেশে ফেরেন তখনই তিনি মৃত্যুকে কবুল করে নিয়েছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। কিন্তু নিজের ওপর আসা একের পর এক আঘাতকে রাজনৈতিকভাবে মেনে নিলেও ২১ আগস্টের ঘটনা তিনি কিছুতেই মানতে পারছেন না। কিছুতেই মানতে পারছেন না তাঁর নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক অত্যাচার, নির্মমতার দৃশ্য। তিনি যে কত বড় দেশপ্রেমিক, মানবিকতার প্রতীক, বলিষ্ঠ সত্তা ও নির্ভীক চিত্তের অধিকারী এবং দেশের জন্য একজন যোগ্য পাঞ্জেরি বা কর্ণধার এখানে তাঁর সেই রূপটি ফুটে উঠেছে!

তাঁর ওপর প্রথম হামলা হয়েছিল চট্টগ্রামের ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। তারপরে ৭ জন কর্মীর প্রাণ গেছে তাতে এবং তিন শতাধিক কর্মীও মারা গেছে। ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে স্পর্শ করতে না পারলেও বুলেট তাঁর পিছু ছাড়েনি। দেশে ফেরার পর পিতার মতো তাঁকেও প্রতি বছর কোনো না কোনোভাবে হত্যার চেষ্টা হয়েছে।

৩.

সব সময় কর্মীরাই শেখ হাসিনাকে আগলে রেখেছে এবং এগিয়ে নিয়ে গেছেন সব প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। আজ সেই নেতাকর্মীদের হারানোর ভয়ে তিনি হতাশ হয়ে গেছেন। আইভি রহমান, অন্যান্য নেতাকর্মী এবং মাহবুবের কথা তাঁর বারবার মনে হচ্ছিল। কয়েকদিন আগে তিনি মাহবুবের কাজে খুশি হয়ে তাকে একটা ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন। নেতার প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা আর গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকেই মাহবুব স্মৃতি হিসেবে আগলে রাখতে ঘড়িটা তার মায়ের কাছে দিয়ে এসেছিল। এসব কথা ভেবে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠেন।

বাড়িতে ফিরেই শেখ হাসিনা আর সবার থেকে নিজেকে আলাদা করে একা একা বসে ভাবতে থাকেন। তাঁর মনে পড়ে যায় এমন এক দুঃসময় তাঁর জীবনে আরেকবার এসেছিল যখন তিনি ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ১৫ আগস্টের প্রকৃত সত্য ও ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পারেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর বাবা, মা, ভাই, আত্মীয়-স্বজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্রনায়ককে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নিকট আত্মীয়সহ যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, এমন ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। একটি জাতির আদর্শকে, তার জাতীয় চেতনাকে, জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিলুপ্ত করার জন্যই ইতিহাসের নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সময় জাতির জনকের দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যান।

১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই শেখ হাসিনা তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীর কর্মস্থল জার্মানিতে যান।  ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সম্মানে এক নৈশভোজের আয়োজন করেন। এরপর তাঁরা ওই বাসাতেই রাত্রি যাপন করেন। পরদিন বেলজিয়াম থেকে তাদের প্যারিস যাবার কথা ছিল।

১৫ আগস্ট জার্মান সময় রাত ৩:৩০ মিনিটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী একজন সাংবাদিকের টেলিফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের কথা। ঘণ্টা খানেক তিনি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হন। ভোরে সানাউল হককে জানানো হলে তিনি নেত্রীদের বাসায় রাখতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অথচ তিনি নেত্রীদের অতিথি হিসেবে পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেছিলেন—এক রাতের ব্যবধানেই তিনি এবং তার স্ত্রী নেত্রীদের বাড়ি থেকে বিদায় করার জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন। হঠাৎ করেই তাদের মধ্যে থেকে স্নেহমাখা আন্তরিকতা নিমেষে উধাও হয়ে যায়। এমনকি ব্রাসেলস থেকে বন যাওয়ার জন্য জননেত্রীকে গাড়িটা পর্যন্ত ব্যবহার করতে দিতে চান নাই। তিনি তার জীবনে কোনো রকম ঝুঁকি নিতে চাননি তাই সেদিন  মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি সেদিন তাঁদের জীবনে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সব ধরনের সাহায্য করে দিল্লি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

ইতোমধ্যে ভারত সরকারের একজন যুগ্ম-সচিব শেখ হাসিনা এবং ওয়াজেদ মিয়াকে জানান যে, তাঁদের একটি বিশেষ বাসায় নেওয়া হবে গুরুত্বপূর্ণ এক সাক্ষাৎকারের জন্য। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওয়াজেদ মিয়া এবং শেখ হাসিনা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির বাসায় পৌঁছান। ইন্দিরা গান্ধি কক্ষে প্রবেশ করে শেখ হাসিনার পাশে বসেন। তিনি ওয়াজেদ মিয়ার কাছে জানতে চান, ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে তাঁরা পুরোপুরি অবগত রয়েছেন কিনা।  সেখানে উপস্থিত এক কর্মকর্তাকে ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য জানাতে বললে ঐ কর্মকর্তা জানান, শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের কেউ-ই বেঁচে নেই। এই সংবাদ শুনে শেখ হাসিনা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

শেখ হাসিনাকে সান্ত্বনা দেবার সময় ইন্দিরা গান্ধি বলেছিলেন ‘তুমি যা হারিয়েছ, তা আর কোনোভাবেই পূরণ করা যাবে না।  তোমার একটি শিশু ছেলে ও মেয়ে রয়েছে। এখন থেকে তোমার ছেলেকেই তোমার আব্বা এবং মেয়েকে তোমার মা হিসেবে ভাবতে হবে।’

‘এ ছাড়াও তোমার ছোট বোন ও তোমার স্বামী রয়েছে তোমার সঙ্গে। এখন তোমার ছেলেমেয়ে ও বোনকে মানুষ করার ভার তোমাকেই নিতে হবে। অতএব, এখন তোমার কোনো অবস্থাতেই ভেঙে পড়লে চলবে না।’

শেখ হাসিনার কষ্ট দেখে ইন্দিরা গান্ধি  প্রতিজ্ঞা করান এগুলো  ভেবে যেন ভেঙে না পড়েন। কিন্তু তিনি পারেননি। বর্বরতা যে এমন বীভৎস হতে পারে তা তাঁর জানা ছিল না। পৃথিবীর তাবৎ হিংস্রতার ইতিহাসকেও যেন হার মানায়। এমন বীভৎসতা তিনি কখনও স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। তাঁর মায়ের, ভাইয়ের এবং ভাইয়ের বৌদের কথা তিনি বারবার মনে করে। কিছুতেই শান্ত হতে পারছিলেন না।

৪.

অবশেষে তিন দিন পর অরোরা আলো ভরা সে মহার্ঘ রাত এলো। সেদিন তাঁর ঘুম আসছিল না হঠাৎ করে মনে হলো যে তিনি তাঁর মাথায় কারও হাতের স্পর্শ পেলেন। পুরো শরীর ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে অবিশ্বাস্য উত্তেজনায়। তিনি পাশ ফিরে তাকাতেই দেখতে পান : তাঁর বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, কাঁদতে নিষেধ করছেন। বঙ্গবন্ধু যেন উনাকে দেশে ফিরে যাওয়ার কথা বলেন। দেশ মহাদুর্দিনে আছে, এই দুর্দিনে তাঁর আসার অপেক্ষায় আছে দেশ ও দেশের আপামর জনগণ। এত কষ্ট করে স্বাধীনতা এনেছেন তার পরেও তিনি স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারেননি। তিনি নেত্রীকে অসাম্প্রদায়িক হয়ে দেশ পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। হঠাৎ কারও পায়ের আওয়াজে তিনি চলে গেলেন। নেত্রী তাঁর বাবাকে খুব বেশি ভালোবাসতেন বলে অবচেতন মনে বঙ্গবন্ধুর স্পর্শ অনুভব করেছিলেন। যতবার তিনি বিপদে পড়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন ততবারই বঙ্গবন্ধু তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। আজ ২১ আগস্টেও তিনি বাবার স্পর্শের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ভয়াবহতার তীব্রতা উনাকে এত বেশি উৎকণ্ঠিত করেছিল যে, সেদিন তিনি বঙ্গবন্ধুর স্পর্শ অনুভব করতে পারেননি।

২১ আগস্টের এই গ্রেনেড হামলার মূল উদ্দেশ্যই ছিল পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার ব্রত নিয়ে অগ্রসরমান তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। পঁচাত্তর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনের কিছু বিশেষ ঘটনার ওপর অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল ১৫ আগস্টে সপরিবারে জাতির জনককে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা। এ দু’টি ঘটনার ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়, ঘটনা-উত্তর পরিস্থিতি এবং হত্যাকাণ্ডের ফলে সুবিধাভোগী বা প্রত্যাশিত সুবিধাভোগীদের পরিচয়ের ওপর নজর দিলে বোঝা যায় ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যাকারীদের উদ্দেশ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না।

এছাড়াও দু’টি হত্যাকাণ্ডের ভেতরের মূল যোগসূত্র এক ও অভিন্ন। দু’টি ঘটনার প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি ও কিলিং মিশনে সরাসরি নিয়োজিত ব্যক্তিদের পরিচয় ভিন্ন হলেও আদর্শিক অবস্থান ছিল এক। ঘটনা বিশ্লেষণে আরও বোঝা যায় একেবারে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানের কারণে, ২১ আগস্টের কিলিং মিশনে অংশ নেয়া হত্যাকারীরা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভীক ছিল। যার কারণে তারা প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত পুলিশের উপস্থিতিতে ও হাজার হাজার মানুষের ভেতরে ঢুকে প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে মিস করলেও একের পর এক গ্রেনেড ছুড়ে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নিরাপদে চলে যেতে সক্ষম হয়। এই দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য কেবল একটাই, ১৯৭৫ সালে ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য সফল হলেও ২০০৪ সালে তা হয়নি। কিন্তু ২১ আগস্টের দোসররা আজও সক্রিয়। জাতির জনকের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার মহান ব্রত নিয়ে অগ্রসরমান তাঁর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এখনও ষড়যন্ত্রকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। তাই আরেকটি ২১ আগস্টের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

২১ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ কলঙ্কময় দিন। দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করার জঘন্য অপচেষ্টার দিন। বাঙালি জাতির জীবনে আরেক মর্মন্তুদ অধ্যায় রচনার দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে আজকের প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড ছুড়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে পাড়লেও মহিলা লীগের তৎকালীন সভাপতি আইভি রহমান, ব্যক্তিগত দেহরক্ষীসহ ২৪ জন নেতাকর্মী এই ভয়াবহ, নৃশংস, নিষ্ঠুর-নির্মম গ্রেনেড হামলায় মারা যান। আওয়ামী লীগের বহু শীর্ষস্থানীয় নেতা এখনও দেহে বোমার স্পিøন্টার বহন করছেন। স্পিøন্টারের যন্ত্রণার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতেই ঘটনার দেড় বছর পর মারা যান ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা অলৌকিকভাবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসলেও গ্রেনেডের বিকট শব্দে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর দুই কান ও চোখ। অপূরণীয় ক্ষতি হয় তাঁর শ্রবণশক্তির। ডাক্তার উনাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে বললেও তিনি রাজি হননি। তাঁর নেতাদের এবং জাতিকে এই দুর্দিনে রেখে তিনি স্বার্থপর হতে পারেননি।

৫.

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর আরেকটি রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত অধ্যায় সূচিত হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মধ্য দিয়ে। ওই দিন প্রকাশ্য দিবালোকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড ছুড়ে ও গুলি চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয় জাতির জনকের কন্যা ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে। যিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পর পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য আপ্রাণ সংগ্রাম করে চলেছেন।

তবুও মাঝে মাঝে নানা হতাশা-নিরাশার দুর্বিপাকের মধ্য দিয়ে তিনি অনেকটা নির্লিপ্ত হয়ে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছিলেন। নেতাকর্মীদের একের পর এক মৃত্যুযন্ত্রণা উনাকে হতাশায় নিমজ্জিত করে। ঠিক এমন এক বিকেলে তাঁর ফুফাতো ভাই এসে হাজির হয় বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী নিয়ে।

খাতা পেয়ে তিনি বিস্মিত এবং আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সেই চিরচেনা লেখাগুলোর অক্ষরগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে বাবার সত্তাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছিলেন। হঠাৎ করে অরোরা আলোয় সেদিন পুরো বাংলাদেশ যেন আলোকিত হয়ে উঠেছিল। তিনি বঙ্গবন্ধুর খাতাগুলো প্রায় হারাতে বসেছিলেন। ধানমন্ডির বাসার সবকিছু পাকিস্তান হানাদার বাহিনী লুটপাট করলেও ওদের কাছে এগুলোর কোনো মূল্য না থাকায় ওদের নজরে পড়েনি।

জননেত্রী ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে এলেও বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বাড়িতে তাঁদের ঢোকা নিষিদ্ধ ছিল এবং সিলগালা দেওয়া ছিল। তখন হঠাৎ করে বাসাটা খুলে দিলে প্রথমেই দেখেন খাতাগুলো কোথায় আছে, সেটাই তাঁর কাছে সব থেকে মূল্যবান ছিল। কিন্তু অসমাপ্ত আত্মজীবনীর লেখাগুলো খুঁজে পাননি। তবে অন্য যে ডায়েরিগুলো ছিল, যেমন—স্মৃতিকথা, চীন ভ্রমণসহ আরও কিছু লেখা—সেগুলো সংগ্রহ করে তার ওপর কাজ শুরু করেন।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার জীবনী গাথা আছে, পাশাপাশি তাঁর সংগ্রামের অনেক কথা আছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক তথ্য এখানে পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাওয়ার পরে শেখ রেহানাকে বাসায় ডাকেন। তখন তাঁর মনে হলো মাথার ওপর বঙ্গবন্ধুর হাত প্রসারিত হতে হতে অরোরা আলোর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। একটু একটু করে অরোরা আলোর স্পর্শে তাঁর জীবন থেকেও সমস্ত অন্ধকার-হতাশা-নৈরাশ্য কেটে যাচ্ছে এবং তিনি অরোরা আলোর আলোতে যেন নিজেকে খুঁজে পাচ্ছেন।

অরোরা হচ্ছে ঊষা বা ভোরের দেবী। রাতের শেষভাগে দেবী অরোরা নানা রঙের আলো নিয়ে আকাশে খেলা করে। তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে হেলিওস আর সেলেনকে নতুন দিনের আগমন সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়া।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেখ হাসিনার জন্য অরোরার মতো। স্বপ্নের রঙে রাঙা অনিন্দ্য সুন্দর অরোরা আলোর মতো নেত্রীর সমস্ত ইচ্ছা আর আকাক্সক্ষাগুলোকে রাঙিয়ে দিতেই বঙ্গবন্ধু সব সময় তাঁর অবচেতন মনে ধরা দিয়ে  নতুন দিনের আগমন বার্তা জানিয়ে দেন। নেত্রীর জীবন থেকে সমস্ত অন্ধকার, হতাশা, নৈরাশ্য, কষ্ট দূর করে নতুন আলো ছড়িয়ে দিতেই অবচেতন মনে তিনি বঙ্গবন্ধুর অদৃশ্য অরোরা আলোর হাতের স্পর্শ পেতেন। তাই গল্পের নামকরণের ক্ষেত্রেও ‘অরোরা আলোর হাত’ সার্থক।

স্বদেশ প্রেম, মাটি ও মানুষের প্রতি প্রগাঢ় দায়বদ্ধতা নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আরাধ্য সোনার বাংলা বাস্তবায়নে তাঁর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার বিপ্লব ও সংগ্রামের চিত্র গল্পে প্রস্ফুটিত।

‘অরোরা আলোর হাত’ লেখাটি মূলত একটি ইতিহাস ভিত্তিক রচনা হলেও শিল্পকৌশল, সৃজনশীলতা, শৈল্পিক নিজস্বতা ও ব্যক্তিস্বতন্ত্রতাতার যথেষ্ট ছাপ রয়েছে লেখাটিতে। খুব সহজ ও অতি প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা গল্পটা অসাধারণ!

উৎপল দত্ত

মোহর

গল্পটির শুরুতেই রয়েছে একটি চমক আর রহস্যাবৃত ঘটনাপঞ্জির সমাবেশ। আর সেই চমকের মাধ্যমেই রহমত চরিত্রটি উন্মোচিত হয়েছে। লেখক রহমতের মানসিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জীবন্ত করে তুলেছেন এবং একই সঙ্গে পাঠকমনও রহমতের সঙ্গে সঙ্গে রহস্য উদ্্ঘাটনের সঙ্গী হয়েছে। নামকরণে থাকে বিষয়বস্তুর ইঙ্গিত। গল্প শুরু হয় প্রথম পঙ্্ক্তি থেকেই। মোহর গল্পটিও এর ব্যতিক্রম নয়।

চিলে কান নিয়েছে গ্রামে এমন একটি গুজব ছড়িয়েছে। কারণ গুজব নির্ভুল খবরের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। ছেলেটি মোহর পেয়েছে। আর ছেলেটির নাম রহমত। কে বা কারা গুজব রটিয়েছে গল্পে তা উল্লেখ না থাকলেও পুরো গাঁয়ের এখন মূল আলোচ্য বিষয় রহমত এবং তার এক ঘড়া মোহর পাওয়া। গুজব ছড়ানোর প্রবণতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। গ্রামে এসে রহমত ভাবল যে, সে এখন গ্রামের সব থেকে আলোচ্য বিষয় কিন্তু সে বুঝতে পারে এর একটা চড়া মূল্য তাকে দিতে হবে। রহমত মনে মনে ভাবে, সে কী সত্যিই কোনো বাদশাহি আমলের ঘড়া পেয়েছে! নিজেই নিজের মনকে প্রশ্ন করতে থাকে আর ঘটনার গভীর তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করতে থাকে। গ্রামের কাছে বৈঁচিমালা নদী বাঁক বদল করেছে। বৈঁচিমালার জলে ভেজা জনপদ কেন যেন রহমতের কাছে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবন বহমান নদীর মতো। নদীর চলার পথে রয়েছে বিভিন্ন বাঁক-বদল। এমনকি মৃত্যুর ফাঁদও পাতা থাকে। মানুষের জীবনের বহমানতাও তেমনি বাধাহীন নয়। জীবনে রয়েছে নানা উত্থান-পতন। আর এগুলোই জীবনের বিচিত্র রঙের খেলা। রহমত বুঝতে পারে তার জীবনের বাঁকও পরিবর্তন হয়ে বাধা-বিপত্তিতে ভরে যাচ্ছে। তাই গুজবের বিষয়টা রহমতকে খুব বেশি চিন্তিত করে তোলে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আরও আধুনিক ও যৌক্তিক হওয়ার কথা থাকলেও তার প্রতিফলন কথায় ও কাজে দেখা যায় না। কোনো একটি সংবাদ বা তথ্যের যাচাই-বাছাই ছাড়াই মানুষ সেটাকে বিশ্বাস করে ফেলে। পরবর্তী সময়ে এই সংবাদ বা তথ্যটি মানুষ থেকে মানুষে স্থানান্তরিত হয়ে গ্রামে ব্যাপকতা লাভ করে। রহমতের মোহর পাওয়ার ঘটনায় যখন সারা গ্রাম আলোচনায় মুখরিত তেমনই এক পড়ন্ত বিকেলে অফুরন্ত অবকাশে দুই বেকার বন্ধু নদীর পাড়ে বসে সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় মশগুল। উভয়ে স্বপ্নচারী। স্বপ্ন ডানায় ভর দিয়ে তারাও মোহর পেতে চায়। গল্পের মধ্য দিয়ে মানুষের অন্তরের সুপ্ত আকাক্সক্ষার কথা বলা হয়েছে। ইন্দ্রিয়ের তাড়নায় ও বাসনায় মোহজালে আবদ্ধ হয়ে যা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। তাদের গল্পের মাঝেও তাই উঠে আসে এক ঘড়া মোহর। একজন কলেজপড়ুয়া বেকার। অন্যজন প্রাথমিক শ্রেণি থেকে ড্রপ-আউট।

তাদের গল্পের মাধ্যমে দেখা যায় কলেজ পড়ুয়া বেকার প্রাথমিক শ্রেণি থেকে ড্রপট আউট বেকারকে এক ঘড়া মোহরের তাৎপর্য, পরিমাণ, আসল-নকল, ক্যারেটসহ সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বোঝাতে ব্যতিব্যস্ত। আলোচনা করছিল পাঁচশত বছর ধরে মোহর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে এবং তাকে মোহরের ঘুমের বা শীত নিদ্রার সঙ্গে তুলনা করায় লেখকের আলাদা সত্তা, নিজস্বতা বা স্বতন্ত্রতা ফুটে উঠেছে। সত্য খবর মানুষকে আশান্বিত, আনন্দিত ও বেদনাহত করলেও মিথ্যা খবর বা গুজব মানুষের মধ্যে বিস্ময় ও বিতৃষ্ণার মতো তীব্র আবেগ তৈরি করে। শিক্ষিত যে সে তার বুকের মাঝেই কষ্ট চাপা রাখে কিন্তু ড্রপট আউট সে তার কষ্টটা চাপা রাখতে পারে না। তার মনের ভেতর থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। বেদনার বাহক নদী পানির মতো তাদের সেই দুঃখের দীর্ঘশ্বাস টেনে নিয়ে যেন সমস্ত বেদনার ভাগিদার হয়ে যায়।

নদীর তীরে মখমলি ঘন দীর্ঘ ঘাস কার্পেটের মতো বিছিয়ে আছে। এ উপমার মাধ্যমে নদীর পাড়ে ঘাসের সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। চৈত্রে নদীকে শুকিয়ে খণ্ড খণ্ড পুকুরের মতো দেখায়। শুকনো নদীতে খনন করে ট্রাকে বালু বোঝাই করে শহরায়ন গড়ে ওঠার চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে সেইসাথে রহমতের মোহর পাওয়ার ঘটনায় তাদের বুকেও যেন চড় জেগেছে। মোহরের লোভে তাদের মনের মাঝেও প্রতিনিয়ত খনন-পুনঃখননের চিত্র দৃশ্যমান। তাদের মনে শৈশবের স্মৃতি জেগে ওঠে। দিন আসে দিন যায় তাদের দুই বন্ধুর জীবনের স্মৃতির অ্যালবাম রুদ্ধ হতে থাকে। এক সময় তারা সকাল-বিকেল মাছ ধরত। সেই স্মৃতি তারা মন থেকে মুছে ফেলতে পারে না। বেকারত্বের অভিশপ্ত জীবনের গ্লানি মুছতে মাঝে মাঝে তারা অতীত জীবনের দিকে ফিরে তাকায়। ফেলে আসা বর্ণাঢ্য সুখস্মৃতি মানসপটে মায়াবী রূপে ধরা দেয়। সেদিনগুলো তাদের কাছে বড় সুন্দর, রঙ্গিন আর মধুময় ছিল। জীবন থেকে চলে যাওয়া সেই মাছ ধরার স্মৃতি আজও তাদের কাছে মোহরের মোহের মতোই মনে হয়।

২.

নিম্ন শ্রেণি হতে উচ্চশ্রেণির মানুষের মধ্যে মোহর পাওয়ার যে লোভ তার সূত্র ধরেই রহমত এখন দুজন নয় তিনজন লোকের মুখোমুখি। তাদের মধ্যে দুজন সৌম্যদর্শন এবং নির্বিকার চিত্তে সোফায় বসে আছে। আর একজন চেয়ারে বসে বড় একটা টেবিলে এ-ফোর সাইজের কাগজে মাথা গুঁজে খুব মনোযোগ সহকারে দ্রুত হাতে জরুরি কিছু লিখছে। রহমতকে লোকটি আন্দাজ-অনুমান করতে পারলেও অখণ্ড মনোযোগ তাকে তার দিকে ফিরে তাকানোর সেই সুযোগটি দেয়নি।

রহমত অনেক বিচক্ষণ। রুমে ঢুকেই সে টেবিল, ইশারা, লেখার গুরুত্বতা, চিঁ চিঁ আওয়াজ করে সিলিং ফ্যানের ঘোরা, পোড় খাওয়া কেরানির মুখ, কলিং বেল বাজালে একজন নারীর দরজার কাছে দাঁড়ানো এবং সোফায় বসে দুজনের হিস্ট্রি, মুঘল, পার্টিশন, কলোনিয়াল, কয়েন,আর্কিওলোজি নিয়ে আলোচনা এই সমস্ত ছোট ছোট সব বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণে রহমতের দৃষ্টি এবং কান কোনোটাই এড়িয়ে যায় না।

কিন্তু রহমতকে যে ঘরে ডেকে আনা হয়েছে সে ঘরের পরিবেশ বা পরিস্থিতি কোনোটাই তার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মনের মাঝে নানা ভাবনার অবতারণা হয়ে ভাবনাগুলো ডালপালা মেললেও কোনো কিছুই সে অনুমান করতে পারছে না। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছে এই সমস্ত কিছুর মূল কেন্দ্রবিন্দু  সে। আর লোকটি তাকে নিয়েই রিপোর্ট লিখছে।

এখানে আসার পরে রহমতের একটা ধাঁধা ছিল এটা কি অফিস ? নাকি বাড়ি ? তারপর অনেক কিছু চিন্তা-ভাবনা করে তাকে স্যার বলাতেই তার সমস্ত চিন্তার অবসান ঘটে এবং বোঝে এটা অফিস। রিপোর্টার লেখা শেষ করে সেটা কেরানির হাত দিয়ে টাইপ করতে পাঠায় এবং খুব ভালোভাবে এর গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। রিপোর্টের মূল বিষয় ‘এক ঘড়া মোহর’।

লোকটির কথায় চেয়ারে বসার মুহূর্তে তার মনে হলো এই লোকটির মধ্যে ব্যস্ততা বা তাড়াহুড়ো থাকলেও সোফায় বসা দুজনের মধ্যে কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, তাড়াহুড়া বা ব্যস্ততা কিছুই নেই। যেন তারা অলস দুপুরে খোশগল্প করছে। তাদের দুজনের নির্লিপ্ততা বা উদাসীনতায় বোঝা যাচ্ছে যে, লেখক লোকটি রহমত এবং এক ঘড়া মোহরকে গুরুত্ব দিলেও তারা সে বিষয়টি খুব হালকাভাবেই দেখছে।

দুজনের মাঝে একজন চলে যেতে চাইলে রিপোর্টার তাকে থাকার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, এটা তার কাছে রিউমার ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না। ফিল্ড রিপোর্ট থেকে যাই আসুক না কেন এসব স্ববিরোধী তথ্য। তাদের কথোপকথনে উঠে আসা কেস, ট্রায়াল এগুলোর কিছুই রহমত বুঝতে পারছে না। সে কি তাহলে মামলায় ফেঁসে যাচ্ছে!

রহমতের পিঠ চাপরে দিয়ে অন্য ভদ্রলোকটি জিজ্ঞেস করেন ঘড়াটি কোন আমলের ? কলোনিয়াল পিরিয়ডের, গ্রেট মুঘলস নাকি তারও আগে অ্যারিয়ান—বলে প্রাণ খুলে হাসতে লাগলেন। সেও হাসতে চেয়েছিল কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতা আর অজানা আশঙ্কা তাকে হাসতে দেয়নি। রহমত আর্কিওলোজির ছাত্র। ভদ্রলোকটি তাকে একটু সমাজবিজ্ঞান পড়ার কথাও বলেন। কারণ যদি সত্যিই রহমত মোহর পেয়ে থাকে তাহলে সেগুলো যে সমাজ তথা দেশের সম্পদ আর তা নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখা যায় না, তা বোঝাতে চেয়েছেন।

তিনি বেরিয়ে যাওয়ার সময় রিপোর্টার ভদ্রলোককে রিপোর্টে আরও অন্তত দুটি শব্দ যোগ করতে বললেন প্রোপাগান্ডা আর কালচারাল অ্যাক্টিভিটিস। এটি একটি গুজব ছাড়া কিছুই নয়, রহমত ভিক্টিম, জীবন বিপদাপন্ন, তাই তার সিকিউরিটির ব্যবস্থা করতে বলেন। ভদ্রলোকও তাকে আশ্বাস দেন যারা গুজব ছড়াচ্ছে এবং তাদের উদ্দেশ্য কী এই সমস্ত কিছুই তারা খুঁজে বের করবেন।

৩.

ভার্সিটিতে রহমতের ‘প্রতিস্বর’ নামক সংগঠন সম্পর্কে রিপোর্টার ভদ্রলোক আগে থেকে জানলেও কথার কথায় তার কাছ থেকে আবার বিস্তারিত জানতে চান। ‘প্রতিস্বর’ মুক্তির গান গাই। মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক মুক্তি এসব আদর্শ তাদের। সেদিন ‘সিকিউরিটি’ আর ‘ভিক্টিম’ শব্দ দুটি মাথায় নিয়ে রহমত বাড়িতে ফিরেছিল। ভিক্টিম এবং সিকিউরিটি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। রহমত রাতে মায়ের হাতে টেংরা মাছের ঝোল আর বেগুন ভাজা খেতে খেতে অদৃষ্টের কথা চিন্তা করে হেসে উঠেছিল।

বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই তাদের পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই আছে। যদি এক ঘড়া স্বর্ণের মোহর পেত তাহলে সে সেই টাকা দিয়ে বিদেশে পড়তে যেত। এখন স্কলারশিপ তার একমাত্র ভরসা। ভার্সিটিতে তার সংগঠন ‘প্রতিস্বর’ খুব জনপ্রিয়। অন্ধত্ব থেকে মুক্তির গান গাই, মানুষের মুক্তির গান।

তবে এক ঘড়া মোহর আর সেই রহস্যময় অফিসে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রহমত মোটেই প্রস্তুত ছিল না। মোহর সম্পর্কে মায়ের মনের প্রশ্নের ভাষা বুঝতে পারে সে। এতক্ষণ দুজনের মনেই এক ঘড়া মোহর ছিল। তারা দুজন তার বাবার কবরের কাছে এলে সে সারাদিন যা দেখেনি বা বোঝেনি তা দেখতে পায়। সে বুঝতে পারে তাকে কেউ ফাঁসাচ্ছে। অফিস ঘরের কথোপকথন, রিপোর্ট, এক ঘড়া মোহরের গুজব, ভিক্টিম, সিকিউরিটি এগুলো তার মনের মাঝে ঘুরপাক খায়। মাত্র দু’দিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছে রহমত। এর মধ্যে জল এতটা গড়িয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। তার সংগঠনের অনেক তরুণ ছেলেমেয়ে আছে যারা সবাই মুক্তি ও মুঠো খুলে আলোর গান গেয়ে সমাজকে আলোকিত করতে চায়। অন্ধকারেই যেন তার কাছে অধরা দৃশ্যগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে তার সংগঠন ‘প্রতিস্বর’ সবাইকে যে মুক্তির আলোর সন্ধান দিচ্ছে এ কারণেই তাকে ফাঁসানোর অপচেষ্টা করে সংগঠটি বন্ধ করার জন্যই গুজব ছড়ানো হয়েছে।  ভুল সিদ্ধান্ত বা গুজব ছড়িয়ে পড়াতে সেখান থেকে ফিরে যাওয়ার আর কোনো পথ বা উপায়ান্তর সে খুঁজে পাচ্ছে না।

রহমতের বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করেছে। সে কোনো অন্যায়, অবিচার, অনিয়মকে মেনে নিতে পারে না বলেই ভার্সিটিতে মুক্তির গানের একটি সংগঠন ‘প্রতিস্বর’ গড়ে তুলেছিল। মুক্তিযোদ্ধা বাবার রক্ত তার শরীরেও যে বইছে। বাবার কবরে চোখ রেখে গর্ব যেন আরও শতগুণ শক্তিশালী হয়।

 বাবার কবরের পাশে ঘাস দেখিয়ে মাকে বলে ওখানে এক ঘড়া মোহর আছে। আজ না থাকলেও কাল আছে। গুজবের নেতিবাচক প্রভাব খুব তাড়াতাড়িই রহমতকে কোনো না কোনোভাবে বহন করতে হবে তা সে বোঝে। সে এও বোঝে তার মৃত্যু আসন্ন। কারণ এই সমাজ বা রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।

প্রত্যেক মানুষের স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা আছে। মানুষের কোনও  বিষয়ের বিচার ও বিশ্লেষণ করার সক্ষমতাও আছে। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, মানুষ ততই নিজের ব্যক্তিসত্তার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে কোনো না কোনো গোষ্ঠী, দল, দর্শন, নীতি ও আদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছে। এতে করে মানুষের যৌক্তিক চিন্তা ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক ধারণা ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। এ সময়ে এসে মানুষ একে অন্যকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছে। মানুষে মানুষে বিশ্বাসের জায়গায় অবিশ্বাস জায়গা করে নিচ্ছে। মানুষ বাস্তবতার চেয়ে তার আবেগ দ্বারা বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। মানুষ তার নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্য আরেকটি প্রভাবক শক্তির কাল্পনিক ধারণা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ফলে মানুষ কোনো বিষয় বা ঘটনা মিথ্যা ও গুজব হিসেবে জানলেও সেটি তার বলয়ের স্বার্থ রক্ষায় সত্য বলে প্রচার করছে। যেমনটা গল্পে রহমতের সঙ্গে ঘটে।

৪.

ময়নাতদন্ত শেষে দুই দিন পরেই রহমতকে মাটির বিছানায় ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বাবার পাশেই তার গর্বের মোহর বা মোহররূপী রহমত ঘুমিয়ে ছিল। লেখক মোহর চরিত্রটিকে এখানে রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। এ যেন শুধু এক ঘড়া মোহর নয় একটি দেশ, একটি রাষ্ট্র, একটি মানচিত্র, একজন রহমত, সেইসঙ্গে নকল মুদ্রা। বাড়ির পাশের জঙ্গলে ভোরবেলা তার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। বুকে বড় আঘাতের চিহ্ন ছিল। মৃত্যুর সময় তার হাতে দেশীয় উপকরণে তৈরি নকল মুদ্রা ছিল। অথচ মোহর বা নকল মুদ্রা কোনোটাই তার কাছে থাকার কথা নয়। একটা রাষ্ট্রের অধঃপতনের দলিল ‘মোহর’ গল্পটি। তার হত্যা পরিকল্পিত। তাঁর মৃত্যু নিয়ে যেন কোনো রহস্য ঘনীভূত না হয় এবং সবার ধারণা সত্যি করার জন্য এই নাটকের অবতারণা করা হয়েছিল। ‘মোহর’ গল্পটি পড়ার সময় একজন বোদ্ধা পাঠক হিসেবে প্রথম থেকেই মোহরের মতো মোহময় লাগছিল গল্পের কাহিনি। মোহরের মোহের মতোই চুম্বকের আকর্ষণে কাহিনি তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক যেন রহমতের পাওয়া মোহরের মতো।

মোহরের প্রতি লোভ মানুষের আদিকালের। রহমত আর্কিওলোজি তথা প্রত্নতত্ত্বের ছাত্র ছিল। মাটি খনন-পুনর্খনন করে মাটির গহ্বর থেকে বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্ব জিনিস বের করাও তার সাবজেক্টের অংশ। এর আগেও বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্ববিদ মাটি খুঁড়ে বহু মূল্যবান জিনিস পেয়েছে। যা খুবই স্বাভাবিক এবং অহরহ হয়ে থাকে। রহমত একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ছিল। তাই লেখক গল্পে খুব সচেতনভাবেই তাকে অন্য কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়াননি। বরং মোহর পাওয়ার গুজবকে কেন্দ্র করে সিদ্ধহস্তে কাহিনির বাঁক পরিবর্তনে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।

হিস্ট্রি, মুঘল, পার্টিশন, কলোনিয়াল, কয়েন, আর্কিওলোজির মাধ্যমে সমাজব্যবস্থা তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থার দুর্দশার দৃশ্যপট লেখক নিপুণ হাতে এঁকেছেন ‘মোহর’ গল্পে। এটা যেন শুধু গল্প নয় একটি বাস্তব উপাখ্যান।

ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ শিল্প। জীবনের বিচিত্র ঘটনাবলি থেকে একটি বিশেষ খণ্ড মুহূর্তের কথা শিল্প নৈপুণ্যে গভীর তাৎপর্যময় করে তোলাই ছোটগল্পের ধর্ম। শুধু সংক্ষিপ্ততা, একমুখিতা ছোটগল্পের উদ্দেশ্য নয় বরং গভীর ভাবব্যঞ্জনা সৃষ্টি করা, খণ্ডের মধ্যে অখণ্ডের পরিচয়, সীমার মধ্যে অসীমের ইঙ্গিত, বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর দর্শনই সার্থক ছোটগল্পের প্রাণ। ‘মোহর’ গল্পটিও তেমনই একটি ছোটগল্প।

লেখক বরাবরের মতোই তাঁর লেখায় অসাধারণ মুন্সিয়ানায়  সমাজের রূঢ় বাস্তবতা ও অত্যন্ত মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন। তাই গল্পটি হয়ে উঠেছে অনন্য এবং অসাধারণ!

ধ্রুব এষ

নিরর্থক বোঝাপড়া

করোনা ভাইরাস মহামারি মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। ছোঁয়াচে ব্যাধির ব্যাপকতায় অস্পষ্ট জীবনযাত্রা। পৃথিবী আজ অসহায়, ব্যথিত। বিশেষ করে করোনা ঠেকাতে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ থাকায় এক প্রকার বন্দি জীবন-যাপন করতে হয়েছে প্রায় সকল বয়সের মানুষকে।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসা সবকিছু অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকায় শিশু, তরুণ এমনকি বয়স্করাও ঘরের ভেতরে তাদের সময় কাটাচ্ছেন। ইন্টারনেট, মোবাইল, কম্পিউটার বা ল্যাপটপ হয়ে উঠেছে তাদের সময় কাটানোর অন্যতম সঙ্গী। ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। সেই সঙ্গে পড়াশোনার বা কাজের চাপ না থাকায় অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরে, খবর শুনে, মুভি দেখে তাদের সময় কাটছে।

ধ্রুব এষের ‘নিরর্থক বোঝাপড়া’ গল্পের শুরুতে আমরা দুই বন্ধুর মাঝে করোনাকালীন অলস সময়ের নিরর্থক মেসেজ আদান-প্রদানের চিত্র দেখতে পাই। আসমারের মেসেজ আবু রসুল পড়ে আর হাসে। আবু রসুলের কাছে আসমার একজন আনডেড ব্যক্তি। আবার আসমারের কাছেও আবু রসুল একজন আনডেড ব্যক্তি। তারা শুধু দুজন নয় তারা নিজেদের আনডেড সম্প্রদায়ের মনে করে। তবে তারা জোম্বি নয় আনডেড।

জোম্বি শব্দটি শুনলেই ‘ডন অব দ্য ডেড’, ‘ডেড স্নো’, ‘ডেড এলাইভ’, ‘সিটি অব দ্য লিভিং ডেড’ আর ‘রেসিডেন্ট ইভিল’ এর মতো ভয় ধরানো সিনেমার কথা প্রথমেই মাথায় আসে। এসব সিনেমার বদৌলতে জোম্বি শব্দটির সঙ্গে মোটামুটি সবাই পরিচিত। জোম্বি হচ্ছে জীবন্ত ‘মৃত’। অর্থাৎ মৃত কোনো প্রাণী, সেটা মানুষ হোক কিংবা অন্য কোনো প্রাণী হোক, যখন কোনো ভাইরাস বা পরজীবীর আক্রমণে জীবিত হয়ে কুৎসিত, কদাকার চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়, সেটিই জোম্বি। কিন্তু বাস্তব জীবনে এই জোম্বির কোনো অস্তিত্ব নেই। নানারকম গুজব আর উপকথায় জোম্বিদের কথা শোনা গেলেও প্রমাণ পাওয়া যায়নি একটিরও। কিন্তু পৃথিবীর আনাচে কানাচে আনডেড সম্প্রদায়ের লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এই আনডেড শব্দটি নিয়ে আবু রসুলের মনের মধ্যে এক ধরনের নিরর্থক চিন্তা শুরু হয় এবং অবশেষে নিরর্থক বোঝাপাড়ারও অবসান হয়।

মহামারি করোনা সংকট মানুষের বোধের শিকড়ে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। বেঁচে থাকার অর্থই যেন পাল্টে দিয়েছে। আবু রসুল বুঝতে পারে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে ভীষণ বিপদে আছে সবাই। এ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারছে না কিছুতেই।

পৃথিবীতে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ আসে প্রতিশ্রুতিশীলতার অভাবে। যে কোনো দুর্যোগে ও মহামারিতে মানুষ বুঝতে পারে যে তাদের সামাজিক দূরত্ব ঋণাত্মক নাকি ধনাত্মক। তাই এই সময় নিজেকে প্রতিশ্রুতি আর আবেগে বেধে ফেলা খুব প্রয়োজন। এই বেঁধে ফেলার তাগিদেই ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়ে গেছে। আবু রসুল আসমারের মেসেজ ঝাঁসি কি রানি খ্যাত মৌমির কাছে পাঠায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইন্টারনেটের ব্যবহারে সামান্য ছোট ছোট বিষয়গুলো একজন আরেকজনের কাছে মেসেজ সেন্ড বা ফরওয়ার্ড করি সে বিষয়টি এখানে ফুটে উঠেছে।

২.

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। মোবাইল ফোন তথা মুঠোফোন পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। মানুষ এখন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মুহূর্তে যোগাযোগ করতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির এমনি এক আবিষ্কার ফেসবুক এবং মেসেঞ্জার। মানুষ এখানে ইচ্ছে স্বাধীন যার তার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে এবং তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।

করোনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও সামাজিক যে বিষয়টি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে তা হচ্ছে, করোনাকালীন প্রেম অর্থাৎ বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষের প্রেম, ভালোবাসা ও শারীরিক সম্পর্কের ওপর করোনার প্রভাব এবং এই প্রভাব থেকে সৃষ্ট সামাজিক সংকট। এছাড়াও এতে সমাজে অপরাধ প্রবণতা এবং পরকীয়া বেড়ে গেছে। গল্পে আবু রসুলের বন্ধু মুস্তফার চরিত্রের মধ্যেও ঠিক এমনটাই দেখতে পাই।

মুস্তফার ছেলে স্কুলে পড়ে। করোনাকালীন স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে অনলাইন ক্লাস হয়। নতুন মোবাইল কেনা তার পক্ষে সম্ভব নয় তাই নিজের মোবাইলটা ছেলেকে দিয়েছে। মাঝখানে আনতারা বিবির সঙ্গে চ্যাটিং বন্ধ হয়ে যাওয়াতে সে খুবই বিরক্ত।

কর্মহীন জীবনে করোনাকালীন কোনো কাজ না থাকায় আবু রসুল প্রথমে আসমারের সঙ্গে এবং পরে মৌমির সঙ্গে চ্যাটিং করেন। অবশেষে সময় কাটাতে সে ফোন দেয় তার বন্ধু মুস্তফাকে।

মুস্তফা তাকে খবর দেয় কুণ্ডু ব্রাদার্সের ঝিমলি করোনার মধ্যে ছাত্রনেতা বদরুলের সঙ্গে পালিয়েছে। বন্ধু খোকন মাস্টার এর বউয়ের আবার বাচ্চা হবে। তিন মেয়ে থাকলেও ঘরে বসে বিনোদনের ফসল। মূলত ছেলে না হওয়াতেই আবার বাচ্চা নিচ্ছে সে। মানুষ করোনাতে ঘরের মধ্যে বন্দি দশায় আছে। এতে দেশের জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে দেখা যায় বর্তমানে নিরর্থক কথাবার্তাও বেড়ে গেছে। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় সহিসালামতে আছে কি না। সে বলে বান্ধবী সালমা তাকে বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করে দিতে চেয়েছিল। বিনিময়ে সে টাকা চেয়েছিল। বর্তমানে বয়স্ক ভাতার মাঝেও দুর্নীতি  প্রবেশ করেছে। করোনা মহামারি এসে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে দুর্নীতি কত ধরনের হতে পারে। দুর্নীতিতে একটার পর একটা বিস্ময় অপেক্ষা করছে।

ফোন রেখে আবু রসুল চিন্তা করে রিজেন্টের সাহেদ একজন টকশো বোদ্ধা, ডা. সাবরিনা একজন কার্ডিয়াক সার্জন, দুই হাজার কোটি টাকা নিয়ে কানাডায় পালানো পি কে হালদার বুয়েট থেকে পাস করা একজন ইঞ্জিনিয়ার, রূপপুর বালিশ প্রকল্পের প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন একজন নির্বাহী প্রকৌশলী এই মানুষগুলো সবাই প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা। সবচেয়ে দুঃখজনক ও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই যে পয়সাকড়ি লোপাট হচ্ছে, বিভিন্ন জনের নামে অভিযোগ আসছে, কেউ কেউ গ্রেফতারও হচ্ছে, গণমাধ্যমে নিউজ হচ্ছে, আমরা হৈ চৈ করছি কিন্তু মূল ফলাফল কী ? এসব আবু রসুলের কাছে অবান্তর ও নিরর্থক চিন্তা মনে হয়। তাই এগুলো নিয়ে চিন্তা করতে চায় না। এর থেকে তার প্রাক্তন স্ত্রীকে নিয়ে চিন্তা করাই তার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে।

৩.

প্রাক্তন স্ত্রী পুষ্প এখন পিপল হাসানের বৌ। তার বন্ধু মুস্তফার দুই বৌ নাসিমা ও জাকিয়া মানিয়ে নিতে পারেনি। অনাদির একমাত্র বৌ মিত্রাও পারেনি। অনাদি ও আবু রসুল নিঃসন্তান। মুস্তফা আর নাসিমার ছেলে হোস্টেলে থাকে। সে ভাবে পুষ্প আর পিপল হাসানের বাচ্চা-কাচ্চার নাম নিশ্চয়ই ফলের নাম রাখবে। অলস মস্তিষ্ক নিরর্থক চিন্তার কারখানা। আবু রসুলের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। করোনাকালীন অবসরে সেইসব নিরর্থক চিন্তাই করে যাচ্ছেন।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে যে কেউ পাপ্পারাজ্জি হয়ে উঠছে এবং ভালো বা খারাপ উভয় এবং খুব সামান্য বিষয়ের ভিডিও খুব দ্রুত ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। পাপারাজ্জিরা অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে চুরি করে অনুপ্রবেশ করে তথ্য এবং জীবন ধারণের শৈলী উন্মুক্ত করে মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তোলে। মানুষটার ব্যক্তিগত জীবনের বারোটা বাজিয়ে দেয়। অনাদির বাসার তিন তলায় করোনার আগে এক শিক্ষার্থী স্বামী সন্তানসহ বাসা ভাড়া নেয়। অনাদির বন্ধু রাজিব সেই শিক্ষার্থীর দুই বাচ্চাসহ অনাদির ছাদে হাঁটার ভিডিও করে রেখেছে। এভাবেই মানুষের জীবনের ছোট ছোট অনাকাক্সিক্ষত বিষয়গুলোর ভালো-মন্দ, সত্য-অসত্যতা বিচার না করেই রাতারাতি ভাইরাল হওয়াতে মানুষের জীবন বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। সেই সূত্র ধরেই অনাদির নামেও কিছুদিন ধরে স্ক্যান্ডাল হচ্ছে।

প্রতিদিন করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সে অনাদির মাধ্যমে জানতে পারে তাদের বন্ধু কাওসারের করোনা পজিটিভ হয়েছে।

নানা চিন্তার ফুলঝুরি নিয়ে সিগারেট ধরাতে গিয়ে প্যাকেটে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ; ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ লেখাটা তার কাছে প্যারাডক্স মানে আপাত দৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী ও উদ্ভট মনে হলেও পরে এর মধ্যে একটি যুক্তিগ্রাহ্য অর্থ খুঁজে পায়।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের ফলে আজ অবরুদ্ধ পুরো পৃথিবী। চারিদিকে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। আর এই মৃত্যু হতে ফিরে আসার প্রার্থনা সবার। তাদের স্যারের ছেলে মারা গেছে। এই খবরটা অনাদি তাকে দিলেও এত মৃত্যুর খবর শুনতে শুনতে তার অনুভূতিও যেন শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে।

৪.

জীবনের চলার পথে এগিয়ে যেতে যেতে পেছনে ফিরে তাকাতে ভালো লাগে। ভালো লাগে অবসর সময়ে অতীতের ফেলে আসা দিনগুলোর আনন্দ বেদনাময় স্মৃতি রোমন্থন করতে। অসংখ্য অগণিত ছোট-বড় ঘটনা প্রবাহে কত না স্মৃতি জড়িয়ে আছে। অনেকগুলো আপনাআপনি মন থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কখনও অনেক সুখকর স্মৃতি উজ্জল হয়ে জেগে থাকে মনের মণিকোঠায়। জীবনের খুব দীর্ঘ পথ অতিক্রম না করলেও সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা মনের কোণে কম জমে ওঠেনি। সেসব স্মৃতি কখনও সুখের পরশে আনন্দ উজ্জ্বল হয়, কখনও বেদনার সংস্পর্শে সকরুণ হয়ে ওঠে।

ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মানুষের বারবার মনে পড়ে। গতিময় জীবনে সামনে ক্রমাগত এগিয়ে চলার সময় পেছনে ফিরে তাকাতে ভালো লাগে। ভালো লাগে অতীতের স্মৃতিচারণ করতে। স্মৃতিটুকু থাকে আনন্দের উৎস হয়ে। জীবনের অগ্রগমনে অনেক অভিজ্ঞতা এসে মনে স্থান করে নিয়েছে কিন্তু নির্মল আনন্দের সীমাহীন সম্ভার বলে ছাত্রজীবনের মায়াময় স্মৃতিগুলো কোনোদিনই নিঃশেষে মুছে যাবে না। ফেসবুকে বন্ধুর পুরোনো ছবি পোস্ট করা দেখে আবু রসুলের সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে পড়ে যায়।

আবু রসুল খবর শুনতে গিয়ে খবরের থেকে বিজ্ঞাপনের যে ছড়াছড়ি, অতি বাড়াবাড়ি সে বিষয়টা বিরক্তির সঙ্গে প্রকাশ করেছে।

মুস্তফা প্রভারানির ঘরে ঢুকেছিল এবং তার বোবা জামাই তাকে বঁটি হাতে তাড়িয়ে দিয়েছে। পতিতা পাড়ায় করোনা নেই। তারা চোলাই খায় এবং তাদের প্রটেকশন ক্ষমতা অনেক বেশি তাই তাদের করোনা হয় না। এসবই তার কল্পনার ফল। কল্পনা বা প্রজেকশন শেষে মুসিবত চলে যায়। কিন্তু এতে তার মানসিক স্বাস্থ্য পুরোপুরি বিকশিত হচ্ছে না। করোনার আর্থসামাজিক ইস্যুগুলোর মধ্যে এ বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ।

৫.

প্রাচীনতম এক কৃষ্ণগহ্বরের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাড়ে ৭০০ কোটি বছর আগে যখন এই কৃষ্ণগহ্বরটির জন্ম হয়েছিল,তখন ব্যাপক মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হয়েছিল। দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষে ওই তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল। কৃষ্ণগহ্বর দুটি জুড়ে গিয়ে ‘জিডাব্লিউ১৯০৫২১-এর জন্ম হয়। ‘বিগ ব্যাংয়ের পরে এত শক্তিশালী মহাজাগতিক বিস্ফোরণের ঘটনা জানা নেই।’ তবে কৃষ্ণগহ্বরটির আসল বিশেষত্ব হলো এর বিশালাকার। এমন বিশালাকৃতি কৃষ্ণগহ্বরের খোঁজ মিলল এই প্রথম। বৈজ্ঞানিক ভাষায় যাকে বলে ‘ইন্টারমিডিয়েট মাস ব্ল্যাক হোল’। ভার্চুয়াল জগতে আমরা সকলে নিত্য নতুন খবর পেলে একজন আরেক জনকে জানাই। তাই আবু রসুলও ৭০০ কোটি বছর আগের কৃষ্ণগহ্বরের খোঁজ আসমারকে জানায়।

গল্পটি খুব সুন্দর সাবলীল ভাষায় লেখা হয়েছে। গল্পটিতে লেখকের সক্রিয়তা বা নিজস্বতা এবং শৈল্পিক চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। গল্পের বিষয়বস্তুতে বতর্মান করোনা পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠলেও উপস্থাপন ভঙ্গিতে রয়েছে নতুনত্বের ছোঁয়া। হাস্যরসের ছোঁয়ায় গল্পটি অভিনবত্বের দাবিদার।

রাশেদ রহমান

সরস্বতী কিংবা সখিনার গল্প

সাহিত্য মানব মনের প্রতিচ্ছবি। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের কান্না হাসি এবং ফেলে আসা অতীতের স্মৃতি-ভরা অনুভূতি সাহিত্যে প্রতিবিম্বিত হয়। এজন্য সাহিত্য ব্যক্তি হৃদয়ের মতো জাতীয় জীবনেরও প্রতিচ্ছবি। আমাদের সাহিত্য জীবনে ব্যক্তি হৃদয়ের অনুভবপুঞ্জ প্রতিবিম্বিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় জীবনের অনুভবপুঞ্জও প্রতিবিম্বিত হয়েছে, প্রতিবিম্বিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ‘সরস্বতী কিংবা সখিনার গল্প’ নামক ছোটগল্পের একটি বিরাট অংশজুড়ে প্রতিফলিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন নারীর একা টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প। লেখক গল্পে জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি সর্বস্ব হারানো (সতীত্ব, জীবনীশক্তি) এক নারীর জীবনী তুলে ধরেছেন।

গল্পের শুরুতে দেখতে পাই, একজন বাকপ্রতিবন্ধী নারী মৃত্যু কামনা করে সকালে ভগবানকে তো বিকালে আল্লাহকে ডাকে। বেঁচে থাকার প্রতি তার অনীহা পরিস্ফুট। একটা মানুষের জীবন কতটা বিষিয়ে উঠলে বা জীবনের গভীরে প্রবেশ করতে পারলে এই ধরনের ইচ্ছা পোষণ করে। তার কাছে বেঁচে থাকাটা এখন বোঝা মনে হয়। ট্রেনের নিচে মাথা পেতে দিতে ইচ্ছে করে তার। বেঁচে থেকে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করার চেয়ে তার কাছে যেন মৃত্যুটাই শ্রেয়। এই পৃথিবীর কদর্যতা বা কুৎসিত রূপ ভালো লাগে না তার। নিজের মৃত্যু কামনার মধ্য দিয়েই তার অভিমান বা ক্ষোভ সমস্ত কিছু ঝরে পড়ে।

সে ঘারিন্দা রেল স্টেশনে এসেছে প্রায় ২০ বছর আগে। স্টেশনের এক কোণে কোনো রকম ইট আর পলিথিন দিয়ে নিজের জন্য থাকার একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছে। গ্রামে তার কেউ নেই কিন্তু তারপরও সে মাঝে মধ্যে শেকড়ের টান অনুভব করে। মানুষের কাছে সে এখন বদ্ধ পাগল। তাকে কেউ পাগল বলে তাড়িয়ে দেওয়ার ভয়ে সে গ্রামে যায় না।

স্টেশনে বসে সে মানুষের আসা যাওয়া দেখে, ভিক্ষাবৃত্তি করেই তার জীবন অতিবাহিত হয়। প্রথম দিকে তার ভিক্ষা করতে বা যাত্রীদের কাছে হাত পাততে খারাপ লাগলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষুধা নিবারণের জন্য বা অস্তিত্ব সংকট থেকে মুক্ত হতে সে ভিক্ষাবৃত্তিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেয়। এ ছাড়া এর ওর দোকানে গেলেই সবাই পাগল ভেবে খাবার দেয়। সে পাগল হতে শুরু করেছিল যাত্রীদের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার সুবিধার্থে। এটা ভিক্ষার একটা কৌশল ছিল মাত্র।

২.

ঘারিন্দা স্টেশনে আসার আগে অন্তত দশ বছর সে বিভিন্ন স্টেশনে ভাতের হোটেলে কাজ করত। হোটেলের বয়, বেয়াড়া, ম্যানেজার তার রূপে মুগ্ধ। এর মধ্যে সান্তাহারের ম্যানেজার আমির হামজা রীতিমতো বউ-বাচ্চা ছেড়ে তাকে বিয়ে করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। সে হোটেলের রান্না ঘরে থাকার সুযোগ পেয়েছিল। রাতের অন্ধকারে অনেকে তার রুমে টুকা দিলে বঁটির কোপের ভয়ে কেউ আর তার কাছে ঘেঁষার সাহস পেত না।

দেশে প্রতিদিন অসংখ্য নারীকে ধর্ষিত হতে হচ্ছে। এ ছাড়াও প্রতিনিয়ত শ্লীলতাহানি, লাঞ্ছিত আর ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে। আজ নারী কোথাও নিরাপদ নয়। না ঘরে না বাইরে। নারী এবং নিরাপত্তা শব্দ দুটি যেন আমাদের সমাজে ক্রমশ বিপরীতমুখী শব্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চলেছে। যেন নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি সমাজের কাছে বেশ অপাঙক্তেয়।

সে তখনও দেখেছে, এখনও দেখে কিছু মানুষ মেয়ে দেখলেই সে যে বয়সেরই হোক না কেন ভাদ্র মাসের কুকুর হয়ে ওঠে। এদের কোনও স্থান-কাল-পাত্র লাগে না। এরা সব জায়গাতেই তাদের কুপ্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত হয়। ঈশ্বরদীতে গেলেও সে একই সমস্যার সম্মুখীন হয়। কিন্তু তার কাছে আত্মরক্ষার জন্য বঁটি থাকাতে এবং একা একা পথ চলাতে সে আর ভয় পায় না।

কিছুদিন আগেও শ্রীপুরে হায়েনাদের হাত থেকে মেয়ের সম্ভ্রম বাঁচাতে না পেরে বাবা মেয়ে একসাথে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেয়। খবর পেয়ে মা ছুটে এলেও চোখের পানি ফেলা ছাড়া তার কিছুই করার থাকে না। কারণ ধর্ষক ফারুকের বাবার অনেক টাকা আছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিনিয়ত কোনো না কোনও নারী কোনো না কোনোভাবে পুরুষের নিগ্রহের শিকার ও প্রতারিত হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সেই নগ্নতার মুখ পুরুষের অবয়বে দেখতে পাওয়া যায়। আর তাদের হাতেই প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অবহেলিত ও নির্যাতিত আমাদের সমাজের বোকা নারীরা। কখনওবা বাইরে কখনওবা চার দেওয়ালের প্রকোষ্ঠে প্রকম্পিত ও প্রতিধ্বনিত হয় তাদের আর্তনাদ। নারীর ওপর পুরুষের নগ্নতাকে সর্বোচ্চ জঘন্যভাবে প্রয়োগ বা আঘাত করে এখানে। নিজের জঘন্য হীনতাকে চরিতার্থ করে খুব সহজেই নিয়ন আলোয় তাদের বীভৎস মুখগুলো লুকিয়ে মিশে যায় স্বাভাবিক জনস্রোতে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটি নারীকেই সবসময় পুরুষের লালসার লোলুপ দৃষ্টিতে নজরবন্দি হয়ে থাকতে হয়। তাই প্রতিটি নারীকেই বিবেকবর্জিত, পচনশীল সমাজে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়। কুকুরদের মাস পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষরূপী কুকুরদের কখনও ভাদ্র মাস শেষ হয় না। গল্পের প্রেক্ষাপট বর্তমান সময়ের সমাজ বাস্তবতা।

গল্পকথক ঘারিন্দা স্টেশনে যখন আসে তখন তার বয়স ৪০ ছিল। ভেবেছিল এ বয়সে তার আর কোনও সমস্যা হবে না। কিন্তু তার ভুল ভাঙে দু’দিন যেতে না যেতেই। নারীকে ভোগ্যপণ্য ভাবার ক্ষেত্রে যে কুৎসিত আনন্দ পাওয়া যায় তাই অনেকের স্বর্গসুখ সম মনে হয়। সমাজ জীবনের এমন একটি জায়গা পাওয়া যাবে না যেখানে নারী নিরাপদ, যেখানে নারীকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় না। একজন নারীকে জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত ভাবতে হয় তার নিরাপত্তার কথা। তাকে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। গল্পকথক তার চারপাশে কুলি সর্দার, স্টেশনমাস্টার, টিকিট কাউন্টারের পায়ের আওয়াজ পেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ত। কারণ তার কাছে আত্মরক্ষার একমাত্র হাতিয়ার ছিল না। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে আত্মরক্ষার তাগিদে বা অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য সে কাছে বঁটি রাখে। তখন থেকে সে সবার কাছে পাগল নামে পরিচিত হলেও এর অন্তরালের ঘটনা কেউ বোঝে না বা জানে না।

৩.

ঘারিন্দা স্টেশনের পাশের গ্রামে তার বাড়ি ছিল। ঘারিন্দা আর পাবনার চাটমোহরের দূরত্ব থাকলেও সেখানে তার পৌঁছানোর একটা ইতিহাস আছে। যুদ্ধের সময় তার বয়স ১৩/১৪ ছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে তার ধারণা না থাকলেও বাবা-চাচার কাছে শুনে তার ভয়াবহতা অনুভব করেছে।

গল্পকথকের আসল নাম মনিরা আক্তার। বাবা-মা তাকে ভালোবেসে মনু বলেই ডাকে। কিন্তু ঘাতকের কালো থাবায় সে তার নাম, বাবা-মায়ের নাম, গ্রামের নাম এমনকি সে হিন্দু কী মুসলমান সেটাও ভুলে যায়।

 হানাদাররা গ্রামে এলে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ পালিয়ে গেলেও তাদের মতন গরিব সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ছিল। মনুর বাবা ভেবেছিল পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের কিছু বলবে না। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদাররা যে মনুষ্যজাতির কেউ না, তারা জানোয়ার গোত্রের জীব সেটা তারা জানত না। মনুর বাবা-মা,পাঁচ বছরের ভাইসহ সমস্ত আত্মীয়-স্বজনকে এক লাইনে দাঁড় করে গুলি করে মেরে ফেলে। কিন্তু গুলি করার আগ মুহূর্তে তার উপর এক হানাদারের দৃষ্টি পড়ায় সে প্রাণে বেঁচে যায়।

আপনা মাংসে হরিণা বৈরীর মতো রূপই তার সর্বনাশ ডেকে আনে। যুদ্ধের সময় নারীর গণধর্ষণের ঘটনা, নারীর দেহে অমানুষিক নির্যাতনের বর্ণনা, ধর্ষণের পর গণকবরে পুঁতে ফেলা, আবার কাউকে ধরে সেনা ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হতো সাধারণ সেনাদের সম্ভোগের জন্য। যা ছিল মর্মবিদারক। আবার কোনো কোনো নারী বারবার ধর্ষিত হয়েছেন। তেমনই এক নারী মনিরা।

সে ক্যাপ্টেন সাবেত খানের সার্কিট হাউসে চার মাস ছিল এবং সে তার ওপর অমানবিক অত্যাচার করত। সে পালানোর অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি। লোকটিকে হয়তো পাবনা, কুষ্টিয়া বা যশোরের কোথাও বদলি করা হয়েছিল তাই তাকে জিপে তুলে নিয়ে এসেছিল এবং বাতিল মাল বলে রাস্তার ধারে ফেলে গিয়েছিল।

পৃথিবীতে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের যে পরিচয় নির্ধারিত হয় তা ঠিক নয়। অনুভব-উপলব্ধি সব মানুষের এক ও অভিন্ন। জাতিভেদ, ধর্মভেদ মানুষকে মানুষ থেকে দূরে ঠেলে দেয়। সাম্প্রদায়িকতা মানুষের মাঝে তৈরি করে হিংসা-বিদ্বেষ ভাব। একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ মানুষের মাঝে শান্তি এনে দিতে পারে। জগতের সব কিছুর ঊর্ধ্বে হলো মানুষ। সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদ বিদ্যমান। এক জ্যোৎস্না রাতে ধলপুরের গোসাই-দম্পতি গ্রাম ছেড়ে পালাতে পাবনা যশোর পাকা সড়ক পার হওয়ার সময় রমিলা হঠাৎ করে রাস্তার ওপরে মনিরাকে দেখতে পায়। কিন্তু হিন্দুয়ানি রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে সে সুবল গোসাইকে ছুঁতে নিষেধ করে। সুবল ধর্মীয় ভেদাভেদ মানে না। মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো হলো ধর্ম।  শরৎবাবু বলে গেছেন শ্রীকান্ত উপন্যাসে ‘মড়ার আবার জাত কিরে… ?’ তারা নিঃসন্তান তাই সবকিছু ভগবানের ওপর ছেড়ে দিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে তারা বাড়িতে ফিরে যায়।

মা-বাবা তার নাম রেখেছিল সরস্বতী। দুজনের একজনও তাকে সরস্বতী নামে না ডেকে সতী নামেই ডাকত। কিন্তু সতী নাম শুনেই তার মনের গহিন থেকে এক ধরনের তাচ্ছিল্যের হাসি বের হতো। কারণ সে জানে ক্যাপ্টেন সাবেত খান কীভাবে তার সতীত্ব কুরে কুরে খেয়েছে। হয়তো যুদ্ধ এক সময় শেষ হয়ে যাবে কিন্তু বীরাঙ্গনাদের মনে আজীবন হৃদয়ের রক্তক্ষরণ থেকেই যাবে। পকিস্তানি সেনাদের দ্বারা নির্যাতন ও গর্ভধারণের পর সরস্বতীর মতো নারীরা সমাজের কাছে পুরোপুরি অস্পৃশ্য হয়ে যায়। নির্যাতিত ওই নারীদের আমাদের সমাজ সহজভাবে নিতে পারে না। অথচ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বীভৎসতা তারাই বহন করছে। অনেক সময় সেই বিভৎস বা দুঃসহ স্মৃতির চিহ্ন ধারণ করতে হয় তাদের গর্ভে। গল্পে সরস্বতীর পেটেও শূকরছানা বেড়ে চলেছে। তার মা বাবাকে দিয়ে কিছু শেকড়-বাকড় এনে তাকে খাইয়ে দেয়। সারারাত তীর বেঁধা হরিণের মতো চিৎকার করেছিল; সকালবেলায় তার জরায়ু ছিঁড়ে এক শূকরছানা বেরিয়েছিল। বয়স কমের কারণে সে হয়তো শূকরছানা থেকে মুক্ত হতে পেরেছিল কিন্তু অনেকে তাও পারেনি।

৪.

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসে এক মহান অর্জন, সুখ ও শোকে মেশানো এক গৌরবময় বিজয়ের গাথা। যে বিজয় বাঙালি জাতিকে উপহার দিয়েছে একটি রক্তাক্ত মানচিত্র। যার প্রতিটি বালুকণা, ঘাস, ফুল, গাছ, লতাপাতা, নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার ভালোই দিনকাল কাটছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে এসে স্নান সেরে তুলসী তলায় পূজা দেয়। তার পূজা-অর্চনা দেখে কেউ বুঝবে না যে তার মুসলমান ঘরে জন্ম হয়েছিল। মায়ের মনে হয়তো বিশ্বাস জন্মেছে যে, সে কোনো ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তান ছিল। সেও হিন্দু ঘরের মেয়ে সরস্বতীকে মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছিল।

প্রতিদিন সকালে সে রাস্তার ধারে বকুল তলায় দাঁড়িয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে যাওয়া দেখে। একদিন সকালে দুজন বয়স্ক লোক তাকে দেখে বলে, যুদ্ধের সময় হানাদাররা অনেককে বাড়ি থেকে তুলে এনে চেটেপুটে খেয়ে রাস্তার ধারে ফেলে রাখত। সেখানে কেউ কেউ মারা যেত। তাদের দু’চারজন ভগবানের কৃপায় বেঁচে গেলে কেউ কেউ দয়াপরবশ হয়ে তাদের বাড়িতে আশ্রয় দিত। সেও হবে হয়তো সেরকম। তাকে প্রথম দেখে তার মা যেমন জাতপাতের প্রশ্ন তুলেছিল। তখন তার মনে হলো হিন্দুরা কেউ জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। মানুষের আর্থসামাজিক জীবনে ধর্মের প্রভাব পরিলক্ষিত। মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদাভেদ এক দিনে শেকড় গেড়ে বসেনি। শুধু হিন্দু-মুসলমান বিভক্তিই নয়, প্রত্যেক ধর্মের ভেতরে শাখা-প্রশাখার মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য মানুষের সামাজিক জীবনে যে প্রভাব বিস্তার করেছে তা মানুষের প্রজন্মগত। ধর্মীয় ভেদাভেদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ব্যবহারের ফলেই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প আজকের সমাজে বিরাজমান। সেই বিষবাষ্প এই লোক দুটির মতো রমলার মাঝেও আছে।

লোক দুটোর কথা শোনার পর থেকে  নিজেকে তার নিঃসঙ্গ আকাশের তারার মতো মনে হয়।

দেশের পরিস্থিতি ভালো না। যাঁর কথায় দেশের মানুষ খালি হাতে যুদ্ধে নেমেছিল, দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করল; সে মানুষটাকেই নাকি পরিবারসুদ্ধ মেরে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। একের পর এক ক্ষমতার পালাবদল হচ্ছে তাই মতিগতি বোঝা ভার। দেশের ভবিষ্যৎ কী বলা যাচ্ছে না। হিন্দুদের নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে হানাদার বাহিনীরা যেমন হিন্দুদের উপর গুলিবর্ষণ করে মেরেছে; তাদের বাড়িতে আগে আগুন দিয়েছে, পরিস্থিতি এখন সেরকমই হয়ে যাচ্ছে। তাই সবকিছু বিবেচনা করে তার বাবা-মা তাকে বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পাঠাতে চায়।

সরস্বতীকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসে। পছন্দও করে কিন্তু পরে জানাবে বললেও আর জানায় না। কারণ যারা মুক্তিযুদ্ধকে গণ্ডগোল বলে তাদের সঙ্গেই বর পক্ষের দেখা হলে তার জন্ম সংক্রান্ত সব সত্য বলে দেয়। বারবার তার বিয়ে ভেঙে যাওয়াতে তার বাবা-মা কষ্ট পাচ্ছিল। এটা দেখে সরস্বতীর খুব খারাপ লাগলে সে মনস্থির করে গলায় কলসি বেঁধে নদীতে ঝাঁপ দেবে। কিন্তু যে রাতে সে বের হবে ভেবেছিল সে রাতে বাড়িতে ডাকাত পড়ে। রাস্তায় একদিন তাকে যে লোকগুলো জাতপাতের কথা বলছিল তারাই রাতের আঁধারে সুবল গোসাইকে মেরে তাকে তুলে নিয়ে যায়। নারীর শরীরের ক্ষেত্রে তখন আর জাত-পাতের বিষয় আসে না।

৫.

ডাকাতরা তাকে খাবলে খেয়ে বিলের ধারে ফেলে চলে গিয়েছিল। পরদিন সকালে নলপুরের নুরুল্লাহ মাছ ধরতে গিয়ে তাকে পায় এবং বাড়িতে নিয়ে আসে।

তার মনে পড়ে না যে সে কোনও দিন সরস্বতী বা মনিরা ছিল। জ্ঞান ফেরার পর থেকে সে কিছুটা সুস্থ হলে তার মা-বাবা পরিচয় না পেয়ে সখিনা নামে নুরু মোল্লা আর সোনাভানের মেয়ে হয়ে বেঁচে ছিল। তার ষোলো বছর বয়স হলে তাকে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করে। কিন্তু সে কথা বলতে পারে না এটা নিয়ে তারা চিন্তিত ছিল। কখনও মনিরা থেকে সরস্বতী, সরস্বতী থেকে সখিনা, কখনও ক্যাপ্টেন সাবেত খানের জিপে কখনও ডাকাতের নৌকায় এতটা পথ পাড়ি দিলেও সে কখনও কেঁদেছে কিনা মনে পড়ে না। তার নারী জন্ম নানা বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে শত কষ্ট বুকে চাপা রেখে এভাবেই দিন যাপন করে। এর মাঝেই হঠাৎ করে তার একদিন বিয়ে হয়ে গেল। বর পক্ষকে কিছুই লুকোয়নি। তার রূপে পাগল হয়ে সিরাজ তাকে বিয়ে করে। সিরাজ ঘরামি ছিল। সে পাবনা শহরে ঘর ভাড়া করে তাকে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের সুখের ঘর বাঁধে।

৬.

পাবনায় আসার পর একটা নতুন জগতের স্বপ্ন দেখে সে। মানুষ রাতে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে সে তখন দিনে জেগে জেগে একটা ফুটফুটে বাচ্চার স্বপ্ন দেখত।

পরাশ্রয়ী স্বর্ণলতার মতো তার স্বামীকে অবলম্বন করে আর একবার সে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু সে তার স্বামীর আসল রূপ দেখে ভূলুণ্ঠিত হয়। পর পুরুষকে ঘরে আনলে হাতের কাছে বঁটি দিয়ে সিরাজকে সে এলোপাথারি কোপাতে শুরু করলে তা দেখে কাদের মিয়া দৌড়ে পালিয়ে যায়। সিরাজ মারা গেছিল, না বেঁচে ছিল তার জানা নেই। তার আশ্রয়ের শিকড় উপড়ে গিয়ে সে হয়ে ওঠে বাতাসে উড়ে চলা শুকনো পাতা।

তারপর চাটমোহর-সান্তাহার-ঈশ্বরদী একটা বঁটিকেই আশ্রয় করে সে বেঁচে ছিল। যেদিন ঘারিন্দা রেলস্টেশনের কথা জানতে পারে কীভাবে যেন তার একটা পুনর্জনম ঘটে গেল। মনে পড়ে গেল অতীতের সব কিছু। একদিন চেপে বসল সুন্দরবন এক্সপ্রেসে। মানুষ যখন অস্তিত্ব সংকটে পড়ে তখন সে অনেক কিছু থেকেই মুক্তি পেতে চায়। সেও হয়তো মুক্তি পেতে চেয়েছিল।

গল্পটিতে সমাজ বাস্তবতা এবং চারিত্রিক সক্রিয়তা বিদ্যমান। সেইসঙ্গে গল্পে জৈবিক প্যাটার্ন বিধিত। ব্যঞ্জনা সমৃদ্ধ ভাষা ও ভঙ্গি অবলম্বন করে লেখক জীবনের এই মৌলিক সত্যকে তুলে ধরেছেন। সভ্যতার অন্ধকার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। বলতে চেয়েছেন আধুনিক সভ্যতার আলোকের মাঝেও বর্বর যুগের আদিম অন্ধকার এখনও ধারাবাহিকতায় মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে চলেছে। গল্পের মধ্যে ঘটনা ও চরিত্রের অগ্রগতিতে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই।

মনি হায়দার

যখন ঘুচে যায় অন্ধকার

নারী-পুরুষের সম্পর্কের বহুমুখী রূপায়ণ আদিকাল থেকেই অব্যাহত। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মতো নারী-পুরুষের সম্পর্কে অনুসন্ধান নিঃসন্দেহে অত্যন্ত জটিল ও বহুমুখী কাজ। সমাজ পরিবর্তনের ধারায় এ সম্পর্ক জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। নারী-পুরুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই মূলত সাহিত্যের সকল আয়োজন। বাস্তবের অনুষঙ্গ রক্ষা করে মনি হায়দার জীবনের বিচিত্র তলকে শিল্পে রূপদান করেছেন। বাস্তবতার নিরিখে ‘যখন ঘুচে যায় অন্ধকার’ গল্পে নারী-পুরুষের সম্পর্কের তেমনই এক মনস্তাত্ত্বিক জটিলতর দিক উন্মোচিত হয়েছে।

মানুষের মন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এই অস্তিত্ব অবস্থান করে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরন কোষে এবং কোনো এক অজানা কোয়ান্টাম-যান্ত্রিক-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আমাদের অস্তিত্বে কাজ করে। এই মন নামক মানবিক উপাদানটি সহজাত প্রবৃত্তির তাড়না, বিরোধ, অবদমন ইত্যাদির মতো কিছু ইচ্ছামূলক ক্রিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের যে ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি, যার জন্য সে অতৃপ্ত, সেই অবদমিত অতৃপ্তি ও ইচ্ছাগুলোই অচেতন স্তর থেকে বেরিয়ে বাস্তবে রূপ লাভ করতে চায়। এ ব্যক্ত-রূপের প্রেক্ষাপটে অচেতনের অবদমিত ইচ্ছার যে প্রতীকী অব্যক্ত বক্তব্য থাকে, তার সহজ ও সরল অর্থ আমাদের জানা থাকে না। অচেতন মন হলো অবদমিত কামনা-বাসনার নিবাস। গল্পের আনিসুর রহমান তেমনই একজন মানুষ।

গল্পের প্রথমেই আমরা দেখতে পাই, সুন্দরী মেয়ে সিলভিয়া আনিসুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে চায়। এ কথা শুনেই আনিসুর রহমানের মনের মাঝে সেই অবদমিত কামনা-বাসনা চরিতার্থতার তাগিদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কামজ ভাবনার অতলে ডুবতে থাকেন। তাই সিলভিয়া ডাকা মাত্রই তিনি তার অফিসের সমস্ত কাজ বাদ দিয়ে ধানমন্ডির ধানসিঁড়ি রেস্তোরাঁর উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ান। নিজস্ব অফিস হওয়াতে পরে এসে কাজ দেখবেন বলে খুব সহজেই অফিস থেকে বের হয়ে যান।

পুরুষেরা বেশিরভাগ সময় এবং শক্তিকে কামজ ভাবনার মধ্যেই ব্যয় করে। পুরুষের ক্ষেত্রে যেকোনো নারীর প্রতি যৌনতা বা কামজ ভাবনা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তাদের কাছে এটা কোনো অদ্ভুত ব্যাপার বা অস্বাভাবিক বিষয় নয়। যেন পৃথিবীর যেকোনো নারীর প্রতি তারা যৌনতার অধিকার রাখে এবং তাদের সঙ্গে কামুক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে।

২.

আনিসুর রহমান স্বাস্থ্য সচেতন এবং সুঠাম দেহের অধিকারী হওয়ায় এবং পোশাক-আশাকে রুচিশীলতার পরিচয় দেওয়াতে তার বয়স ঠিকমত বোঝা যায় না। আনিসুর রহমান দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। কর্মজীবনের প্রথমে তিনি একজন ব্যাংকার ছিলেন। ব্যাংকে চাকরি করার সুবাদে তিনি বুঝতে পারেন জীবনে বড় হতে হলে ব্যবসার প্রয়োজন। তাই তিনি জাপান থেকে ফটোকপিয়ার মেশিনের টোনার আনতে শুরু করলেন এবং শুরুতেই তার ভাগ্য খুলে গেল। ব্যবসার কাজে একবার ব্রিটেনে যাওয়ার সময় বিমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু জুনায়েদ রব্বানির সঙ্গে তার বিশ-বাইশ বছর পরে দেখা হয়। জুনায়েদ রব্বানির সঙ্গে তার অন্য বন্ধুদের দেখা হলেও আনিসুর রহমানের সঙ্গে তার এর আগে কখনও দেখা হয়নি।

আনিসুর রহমানের স্ত্রীর নাম জুলেখা। তাদের বিয়েটা ছিল প্রেমের। জুলেখার বাবা হাসিব আহমেদ সরকারি চাকরি করতেন। পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয়ে বন্ধুরা তাকে সে সময় সাহায্য করেনি। কিন্তু বিয়ের পরেই খুব সহজে জুলেখার বাবা আনিসুর রহমানকে মেনে নেন। তাদের কথোপকথনের মাধ্যমে জানা যায়, আনিসুর রহমানের তিন ছেলেমেয়ে। বড় দুইটা ছেলে আর তারপর ছোট মেয়ে। এদিকে জুনায়েদ রব্বানিরও তিন ছেলেমেয়ে। প্রথম মেয়ে তারপর দুই ছেলে। মেয়ের নাম সিলভিয়া ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ডাক্তারি পড়ার জন্য পরীক্ষা দিয়েছে। এর মধ্যেই দুই বন্ধুর স্ত্রীর মধ্যেও একটা বন্ধুত্বের এবং পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

দুজনেই কর্মব্যস্ত হয়ে উঠলে বহুদিন জুনায়েদ রব্বানির সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। একবার আনিসুর রহমান টঙ্গি ফেরার পথে উত্তরায় জুনায়েদ রব্বানির বাসায় যান। জুনায়েদ রব্বানির স্ত্রীর নাম রাখি। রাখি আট-দশটা নারীর মতোই অতি সাধারণ, অসীম জীবনানুরাগী ও একজন সুন্দরী মহিলা। বিত্তের মাঝে থেকেও রাখি আটপৌরে। বন্ধুর স্ত্রীর সৌন্দর্য তাকে এতটাই মুগ্ধ করল যে সে তার প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল এবং তার ভিতর কামনা বাসনার সুপ্ত বীজ ক্রমশই জাগ্রত হচ্ছিল। একজন পুরুষের মনে বিমূর্ত আভায় সবসময় এক নারীর অস্তিত্ব অবস্থান করে। আর এ কারণেই যেকোনো বাস্তব কিংবা বিমূর্ত প্রকাশের প্রেক্ষাপটে থাকে নারী বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা। যা আনিসুর রহমানের মাঝেও পরিস্ফুট। তাই গোপন অভিসারী দৃষ্টিতে সে বারবার রাখিকে দেখছিল।

৩.

আধুনিক সভ্যতার বিশিষ্ট স্তরে দাম্পত্য জীবনের সংকট ও অন্তর্জটিলতা কত তীব্র এবং মানব সম্পর্কের বিচিত্র রূপের বহুমাত্রিক জটিলতা কতখানি সুবিস্তৃত গল্পে সেটা খুব সূক্ষ্মভাবে রূপায়িত হয়েছে। উচ্চবিত্ত পরিবারের দাম্পত্য জীবনের দ্বন্দ্ব ও প্রেমের অসঙ্গতিকে লেখক তুলে ধরেছেন। জুনায়েদ ও রাখির সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল শুষ্ক মরুভূমির মতো অসাড়।

মেয়েদের পড়াশোনা করার ইচ্ছা, আশা-আকাক্সক্ষা এবং মর্যাদা তথা আত্মপ্রতিষ্ঠার কোনো সুবিধা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তার স্বামী অনুমোদন করে না। রাখির স্বামীর ক্ষেত্রেও তাই দেখি। রাখি এসএসসির পরে পড়াশোনা করতে চাইলে তার স্বামী তাকে বাধা দেয়। অথচ দেখা যায় এই পড়াশোনা নিয়েই সে আবার রাখিকে খোঁটা দেয়। নারীর ভেতরে একটি হীনমন্যতা বোধ সৃষ্টি ও আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিবেশ পুরুষ সৃষ্টি করে নানানভাবে। ঘরে-বাইরে, নারীকে পুরুষ উত্যক্ত করে পরিহাসমূলক কথার মাধ্যমে, ইঙ্গিতময় তথাকথিত ঠাট্টার দ্বারা, তাদের শক্তিকে অবজ্ঞা করে এবং তাদের দুর্বলতাকে আঘাতের কেন্দ্র করে, কথার মাধ্যমে তাদের প্রতিনিয়ত খাটো করে। উচ্চকিত স্বরে তাদের বলা হয় যে, নারী বুদ্ধি-বিবেচনাহীন, তাদের কাজ মূল্যহীন, তারা দুর্বল ও সদা ক্রন্দসী। এ অসম্মানের ভার নারী বহন করে প্রতিক্ষেত্রে, প্রতিনিয়ত। রাখির প্রতি জুনায়েদের মনোভাবনা ঠিক এমনই।

জীবনধারায় নারী সবসময় পুরুষকে পরিপূরক হিসেবে দেখে, কিন্তু পুরুষ নারীকে দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। পুরুষের সমস্যা হচ্ছে : সে মনে করে যে, সে সর্ববিষয়ে নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর এবং তার অসাধ্য কিছু নেই। অন্যদিকে নারী জানে কোথায় তার শক্তি, কোথায় তার দুর্বলতা। নারীর দুর্বলতা পুরুষের পরিহাসের বিষয়, আর তার শক্তি পুরুষের অস্বস্তির কারণ। সুতরাং সম্পূরক হতে পুরুষের প্রবল আপত্তি।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে দেখা হয় পুরুষের ভোগ্যপণ্য হিসেবে। ভোগের পণ্যকে নিয়ন্ত্রণে রেখে তার মালিকানা নিশ্চিত করতে হলে, তাকে শাসনে রাখতে হয়। অবাধ্যতা নির্মূল করার জন্য তাকে আটকে রাখতে হয়। ড্রইংরুমে কামরূপ চরিতার্থতা সদৃশ আলোকচিত্র রাখাতে রাখির খারাপ লাগলেও জুনায়েদ তা পাত্তা না দিয়ে পুরুষের গোপন কামরূপের মুখোশ উন্মোচনের দিকে আলোকপাত করেন। পুরুষ ব্যক্তিগতভাবে যতই অকেজো-অপদার্থ বা দুশ্চরিত্র হোক না কেন প্রচলিত প্রথার দ্বারা মেয়েদের শাসন করে আটকে রাখে নিজের স্বরূপ ঢেকে রাখার জন্যই। পুরুষ প্রতিনিয়ত নারীকে শাসন করে অনবরত ভোগদখল করতে চায়। অন্তর্নিহিতভাবেই পুরুষের দেহজ গঠন, মন-মানসিকতা, অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক ক্রমধারার কারণেই পুরুষ নারীর প্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক ও নির্যাতক হয়ে ওঠে।

বিয়ে একটি ধর্মীয় ও সামাজিক চুক্তি মাত্র। তবে বিয়ের পর প্রত্যেক মানুষের দাম্পত্য জীবনের নকশা হতে পারে শিল্পের ন্যায়, যা একমাত্র ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে থাকলেই সম্ভব। আবার কোনও কোনও অতৃপ্ত ও অসুখী মানুষের কাছে পরিস্থিতির জটিলতায় বৈবাহিক সম্পর্ক একটা খাঁচায় বন্দি জীবন হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ধর্ম ও সমাজ যতই অসুখী বৈবাহিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করুক না কেন, তাতে ব্যর্থ হয়। সময়ের ফলশ্রুতিতে মানুষ তার জৈবিক প্রয়োজনে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে জীবনকে উপলব্ধির অন্যমাত্রায় নিতে অনেক বেশি তৎপর হয়ে ওঠে। সমাজ নিয়ত পরিবর্তনশীল হওয়ার কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তার জীবন যাপনের অভিরুচির রূপান্তর ঘটায়। মানবের এ জীবন যেন স্রোতে ভেসে চলা এক কাব্য-গাঁথা। সেই স্রোতে ভেসে থাকার জন্য মানব তার ভালোলাগার মানুষকেই একান্তে কাছে রাখার আকুতি অনুভব করে। এটাই মানবের জৈবিক নিয়তি। কিন্তু সবার ভাগ্যে ভালোবাসাময় সংসার গড়ে তোলা সম্ভব হয় না। ভালোবাসাহীনতায় থেকে মানব তার নশ্বর জীবনকে সমাজ ও ধর্মের ভয়ে টেনে-হিঁচড়ে অনেকটুকু পথ নিতে পারে হয়তো; তবে সেটাকে বেঁচে থাকা বলে না। তাই মানব যেখানে ভালোবাসার মর্মর ধ্বনি শুনতে পায় সেদিকেই ধেয়ে যায়। প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে-নীরবে-নিভৃতে সে সেই মানুষের কাছেই নিরন্তর ছুটে চলে। ভালোবাসাই জীবন, ভালোবাসা অন্ধ। ভালোবাসা এক স্বর্গীয় দীপ্তি। রাখিও ঠিক এই কারণেই আনিসুর রহমানের প্রতি আকৃষ্ট হন।

অনাকাক্সিক্ষতভাবেই রাখি আর জুনায়েদের সুখের সংসারে কালো মেঘ জমে। আনিস তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে দুজনের সম্পর্কের মাঝে প্রবেশ করে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের দুর্বলতার কোনও এক ফাঁকে এই অবাঞ্ছিত সম্পর্কের বীজ বপিত হয়।

স্বামী অন্য নারীতে আসক্ত হয়ে পড়ায় জীবনের অচরিতার্থতা, নিষ্ফলতা নিষ্ঠুর মানসিক পীড়নে সে দিনপাত করত ও যৌনাবেগ থেকে বঞ্চিত ছিল। স্বামীর অবহেলায় রাখি হয়ে পড়ে অসহায় ও আশাহত আবেগ অনুভূতি শূন্য। রাখি চরিত্রের আদর্শিক বোধ ভেঙে পড়ে। নারী ব্যক্তিত্বে, স্বাতন্ত্র্যে, মর্যাদায় পুরুষের অধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সে শৃঙ্খল মুক্ত হতে চেয়েছেন। তাই সে আনিসুর রহমানের মুখে তার প্রশংসা স্তুতি শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে তাকে বার বার প্রশ্ন করে, সে তার কাছে কেমন ? রাখির লেখা কবিতা আনিসের কণ্ঠে আবৃত্তি এবং তার প্রশংসাসূচক স্তুতিবাক্য আচ্ছন্ন করে রাখে তাকে। তাই রাখিও হৃদয় গহিনে আনিসকে নিয়ে গভীর উপলব্ধির জগৎ তৈরি করে ফেলে। আনিসুরের প্রতি তার আকর্ষণ শুধু দৈহিক নয় মানসিক ও দর্শনগতও। অবহেলা ও প্রবৃত্তির তাড়নায় সে আনিসের দিকে ধাবিত হয়।  হৃদয়ে নতুন প্রত্যাশার জাগরণ ঘটে। আনিসের প্রতি রাখির ভালোলাগা সৃষ্টি হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও আনিসুর রহমানের রাখির প্রতি ভালোলাগাটা লোলুপ দৃষ্টি আর তার জন্মগত পুরুষসুলভ মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

৪.

হয়তো আটপৌরে দীর্ঘ বিবাহিত জীবন কারও কারও কাছে ক্লান্তিকর ও একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে। দাম্পত্য সম্পর্কে অতৃপ্তি আসতে পারে। রোগ-ব্যাধি-রুচি-শিক্ষা-আর্থিক দৈন্যসহ বিভিন্ন কারণে শারীরিক ও মানসিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। কোনো কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক কলহের বেড়াজালে আটকে যেতে পারে। এ ছাড়াও বাহ্যিকভাবে আপাত সুখে নিমজ্জিত মনে হলেও অন্তরালে কেউ কেউ শারীরিক ও মানসিকভাবে তৃষ্ণা অনুভব করতে পারে। মানব মন বড় বিচিত্র। গোপন চাওয়ার পরিধি এবং তার ধাবমানতা কখন যে কার দিকে এগিয়ে যায়, সেটা হয়তো সে ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারে না। হয়তো তার চারপাশে জলে টইটুম্বুর; তারপরও তিনি থাকেন তৃষ্ণার্ত। তাই তো জুনায়েদকে নিয়ে দেখা ছোট ছোট স্বপ্নগুলো, এমনকি বৃষ্টিতে জুনায়েদকে আলিঙ্গন করার যে আকাক্সক্ষার বীজ তার মাঝে সুপ্ত ছিল তা রাখি এখন আনিসুর রহমানের সঙ্গে বাস্তবে রূপ দিতে চায়। ফলশ্রুতিতে জুনায়েদের মতো রাখিও আনিসুর রহমানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন স্বতঃস্ফূর্ত নিষিদ্ধ ভালোবাসায়।

সিলভিয়া নিজের মাঝে আত্মস্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনা গড়ে তুলেছিল। মায়ের পরকীয়ায় সিলভিয়া সব সময় সায় দিয়েছে। সুযোগ করে দিয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে চেয়েছে। সিলভিয়া চরিত্রে পুরুষতন্ত্রের প্রতি কঠোর বিরোধী মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে।

রাখি কোলন ক্যান্সারে মারা গেলে আনিস কন্যার বয়সী সিলভিয়ার প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দেয়। রাখি মারা যাওয়াতে আনিসুরের পথের কাঁটা দূর হওয়ায় মনে মনে খুশি হয়। মায়ের পরে মেয়েকে কামনার দৃষ্টিতে দেখা এবং তার জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠা এতে আনিসুর রহমানের বিকৃত রুচির পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রেস্তোরাঁয় আনিসুরের ভেতরকার উপবাসী জীবটা অন্ধকারে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। পুরুষ দেহবলে বলীয়ান হলেও নারী মনোবলে বলীয়ান। দেহবলে বলীয়ান পুরুষ প্রতিনিয়তই তার পেশিশক্তি ব্যবহার করে। দেহবল পুরুষকে উন্মত্ত করে, যুক্তি-বিবর্জিত করে, সংঘাতের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

আনিসুর রহমান সিলভিয়াকে নিজের লোলুপতা এবং লালসার মাঝে রেখে ভোগ করতে চেয়েছিল। সিলভিয়া এই নিপীড়নের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আনিসুরের মেয়েকে জানিয়ে দিবে এই কথাটির মধ্য দিয়ে সিলভিয়া নিপীড়ন থেকে মুক্ত হওয়ার একটা পথ পেয়ে যায় । যেন হঠাৎ এক টুকরো আলোর সন্ধান পায় সে। তাই ‘যখন ঘুচে যায় অন্ধকার’ নামটি সার্থকতার দাবিদার। অনিবার্যভাবেই সুন্দরী, তেজস্বী আর অভিজাত রুচির সিলভিয়া প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। এখানেই সিলভিয়া চরিত্রের স্বতন্ত্রতা পরিলক্ষিত।

সাহিত্যের যেকোনো শিল্পের নামকরণ বিশেষ এক আর্ট। নামকরণ কেবল নাম নয়। শিশিরবিন্দুতে সূর্য প্রতিবিম্বিত হওয়ার মতো নামের মধ্য দিয়ে গল্পের মৌল উপজীব্য ফুটে ওঠে। তাই লেখক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সচেতনভাবে তাঁর রচনার নামকরণ করেন। গল্পকারের মানস যে বাণীতে সমর্পিত সে বাণীর মূলসুর নামেই ধ্বনিত বা ব্যঞ্জিত হয়। তাই গল্পের নাম হতে হয় ব্যঞ্জনাধর্মী। সে দিক বিবেচনায় ‘যখন ঘুচে যায় অন্ধকার’ গল্পের নামকরণ অনন্য, অসাধারণ এবং সার্থক।

গল্পের গঠনরীতি ও ভাষা ব্যবহার উভয় ক্ষেত্রেই মনি হায়দার সহজ, স্বচ্ছন্দ ও অনাড়ম্বর। ভাবের সঙ্গে ভাষার এক নিগূঢ় সম্পর্ক আছে। মনি হায়দারের চিন্তা ও অনুভূতি সহজ অকৃত্রিম অথচ সুগভীর। তাঁর ভাষাও তেমনি একান্ত সরল হয়েও গভীর ব্যঞ্জনায় মর্মস্পর্শী ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে ‘যখন ঘুচে যায় অন্ধকার’ নামক গল্পে।

বাদল সৈয়দ

বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন

সাহিত্য সমাজের দর্পণ স্বরূপ। সাহিত্যের সঙ্গে জীবন তথা সমাজের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সাহিত্যে জীবনের যে প্রতিবিম্ব গঠিত হয় তা সমাজ-বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। লেখক যেহেতু সমাজেরই একজন তাই তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মে জীবনের বাস্তব দিকগুলোকে প্রাধান্য দেন এবং তাকে নিপুণভাবে উপস্থাপন করে সমাজ-বাস্তবতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে। সমাজজীবন থেকে সাহিত্য রসদ সংগ্রহ করে তাই সমাজবাস্তবতাই সাহিত্যের উৎকর্ষ কিংবা অপকর্ষ নির্ণয়ের মাপকাঠি অর্থাৎ সাহিত্য সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি। সাহিত্যের গতিধারার সঙ্গে জাতীয় জীবনের পরিবর্তনের সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ। জাতীয় জীবনে নানা লক্ষণীয় ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই সাহিত্যের গতিধারার পরিবর্তন ঘটে। বাদল সৈয়দের ‘বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন’ সমাজ-বাস্তবতার নিরিখে লেখা একটি গল্প।

শতাব্দীর সবচেয়ে ঘৃণ্য জাতিগত হামলার শিকার হয় রোহিঙ্গারা। নিজভূমে নির্যাতিত, পরভূমে আশা-নিরাশার দোলাচলে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের কুতুবপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। এই রোহিঙ্গা বিষয়ক ইস্যুকে কেন্দ্র করে পলিন এমারসন একটি আন্তর্জাতিক চ্যারিটিতে অ্যাম্বাসেডরের প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশে আসবেন। তিনি আমেরিকার একজন বিখ্যাত টিভি অ্যাংকর। সেইসঙ্গে তাকে নানা অস্কার অনুষ্ঠান পরিচালনায়ও দেখা যায়। তিনি হলিউডের নায়িকা কিন্তু তার ছবি তেমন হিট না করলে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে তিনি চ্যারিটিতে যোগ দেন। তার সৌন্দর্য আজও মানুষকে মুগ্ধতার আবেশে আবিষ্ট করে রেখেছে। সব মিলিয়ে তিনি একজন বিখ্যাত মানুষ। তিনি আসবেন শুনে প্রবল উত্তেজনায় সৈয়দের ঘুম ভাঙলেও কফি ঢালতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেলেন। অফিস তাকে কো-অর্ডিনেটেরের দায়িত্ব দিলে গত কয়েক মাস ধরে সে তার সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সে যোগাযোগ করেন এবং এভাবেই তারা বন্ধুত্বের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

অনাদিকাল থেকে অনন্তের পথে আপন বেগে ছুটে চলেছে সময়। সময়ের ছুটে চলার মধ্যে কোনো বাধা নেই, নেই কোনো অলসতা। মানুষের আয়ুষ্কাল সীমিত অথচ তার সম্মুখে বিশাল কর্মক্ষেত্র। কাজেই এই সীমিত সময়ের মধ্যে তাকে সব কাজ শেষ করতে হয়। কর্মহীন ও কর্মবিমুখ জীবন অসার ও নিরর্থক। জীবনের লক্ষ্য স্থির করে কর্তব্য অনুযায়ী সময়কে ভাগ করে তবেই জীবনে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। এমিরেটস ফ্লাইটও খুব সময় সচেতন। তার স্লোগান হচ্ছে ‘জাস্ট অন টাইম’। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। ঠিক সময়ে তার ফ্লাইট ঢাকার মাটি স্পর্শ করে।

মানব সভ্যতার কোনও এক মাহেন্দ্রক্ষণে বিজ্ঞানের যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল সে অগ্রযাত্রা আজ চরম সার্থকতার ছোঁয়া পেয়েছে। শুরু থেকে অদ্যাবধি বিজ্ঞান মানুষকে যা কিছু দিয়েছে তার মধ্যে বিস্ময়কর উপহার ইন্টারনেট। ইন্টারনেট এক প্রান্তের মানুষের সঙ্গে অন্য প্রান্তের মানুষের যোগাযোগ সহজ করে দিয়েছে; বলতে গেলে গোটা বিশ্বকে একটি পরিবারে পরিণত করেছে। এই ইন্টারনেটের বদৌলতে আগের মতো অপরিচিত কারও জন্য এখন আর প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। পলিনকে দূর থেকেই তার কাছে মনে হলো অসম্ভব সুন্দর একটা ফুল হেঁটে আসছে। বাঙালিরা স্বভাবগতভাবেই নম্র-ভদ্র, সহজ-সরল, মার্জিত এবং সেইসাথে লাজুক প্রকৃতির হয়ে থাকে। পলিন সোজা এসে তাকে জড়িয়ে ধরলে সে কিছুটা অপ্রস্তুত বা অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

২.

পলিন স্পষ্টভাষী। তাই সে নির্দ্বিধায় সৈয়দকে প্রথম দেখায় বলেছে সে হ্যান্ডসাম নয়। এ কথার মাঝে সৈয়দ সরলতা খুঁজে পেয়েছে। পলিনের স্পষ্টবাদিতা তাকে আকৃষ্ট করেছে। মানুষ স্বভাবতই বন্ধুপ্রিয়। বন্ধুর অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য ও সহযোগিতা প্রায় প্রতিটি মানুষেরই কাম্য। একজন স্পষ্টভাষী বন্ধুর প্রীতিময় সান্নিধ্য বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। সে দিক বিবেচনায় পলিনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব না হওয়ার কোনো কারণ নেই।

কর্মক্লান্ত জীবনের অবসরে মানুষ পরিচ্ছন্ন মনের খোরাক জোগাতে কখনও কখনও প্রকৃতির মাঝে অপার শান্তি খুঁজে নিতে চায়। প্রকৃতি তার রূপ আর ঐশ্বর্যের হাত বাড়িয়ে দেয় মানুষের দিকে। প্রকৃতিও মানুষের ভালোবাসার সঙ্গে একাত্ম হয়ে সেতুবন্ধ রচনা করে। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এদেশে রয়েছে উঁচু-নিচু পাহাড়, সুনীল সাগর, অবারিত মাঠ, রৌদ্রকরোজ্জ্বল সুনীল আকাশ; যা এক অপূর্ব চিত্তহারী সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে এসে থাকার জন্য পলিন ঠিক এমন ধরনের জায়গা চেয়েছিল। সৈয়দ তাকে সমুদ্রের তীরে চমৎকার বাগান আর বুনো অরণ্যে চারপাশ ঘেরা একটি মাঝারি সাইজের ডুপ্লেক্স বাংলোতে নিয়ে যায়। এর সৌন্দর্যে পলিন মুগ্ধ ও অভিভূত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের কক্সবাজারে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। এর একদিকে পাহাড় অন্যদিকে সমুদ্রের নীল জলরাশি মনে জাগায় এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। সেই সঙ্গে ভেসে আসে সমুদ্রের উত্তাল গর্জনে অব্যক্ত ভাষার ছন্দময়তা। সেই রোমাঞ্চকর অনুভূতি ও সমুদ্রের উত্তাল গর্জনের ছন্দময়তা পলিনকে ভীষণভাবে টানে। সেটা সে উপেক্ষা করতে না পেরে এদেশের কালচার অনুযায়ী যথেষ্ট ভদ্র সুইমিং স্যুট পড়ে সমুদ্রের অববাহিকায় নিজেকে ভাসিয়ে দেয়।

পলিনের প্ল্যান অনুযায়ী সে সব মেগা ক্যাম্পে গিয়ে রোহিঙ্গাদের, স্থানীয় প্রশাসনের এবং বাইরে থেকে যেসব সংস্থা কাজ করছে তাদের সবার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তার মূল উদ্দেশ্য শিশুদের শিক্ষা নিয়ে। শিক্ষা মানব জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষ জীবনকে উপলব্ধি করতে শেখে। মনের গতি প্রকৃতি সম্বন্ধে বুঝতে পারে। বিচিত্র কল্পনা ও অনুভূতির সম্মিলন ঘটিয়ে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। শিক্ষার উদ্দেশ্য বহুমুখী জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে জীবনের সার্বিক বিকাশ সাধন করে তা বাস্তবজীবনে প্রয়োগ ঘটিয়ে নিজেকে যোগ্য করে গোড়ে তোলা। অন্ধকার দূর করে সমাজে আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দেওয়া। তাই এখন থেকেই শিশুদের শিক্ষা না দিলে যে অন্ধ প্রজন্ম তৈরি হবে তা শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো পৃথিবীর জন্য ভয়ঙ্কর বিষয়। তার প্ল্যানের কথা শুনে সৈয়দ লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে মেইল করে তার ব্যারিকেডের ব্যবস্থা করে রাখে। যেন কোনো হামলা বা অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হতে না হয়।

৩.

পলিনের বাম হাতের অনামিকায় একটা সুন্দর ডায়মন্ডের রিং দেখে ভদ্রতা করে সে কিছু জিজ্ঞেস করে না। কিন্তুু তাকে অবাক হয়ে আংটির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে পলিন বলে জেফরির সঙ্গে তার এনগেজমেন্ট হয়েছে। সাংবাদিকরাও নিশ্চয়ই এর মধ্যে জেনে গিয়ে ফ্রন্টলাইন নিউজ করবে। অথচ এখানে পাঁচ মাইল দূরে যে রোহিঙ্গা বাচ্চারা মারা যাচ্ছে তার হেডলাইন হয় না। এ কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে আবেগ ও বেদনা ছড়িয়ে পড়ে।

এটা বুঝতে পেরে সৈয়দ প্রসঙ্গ বদলিয়ে তাকে অভিনন্দন জানায় এবং তার মন ভালো করতে বলে বিয়ে না করলে সেও এ বিষয়টি নিয়ে জেলাস হতো। এমনিতে সৈয়দ বেশ লাজুক প্রকৃতির। সে নিজেকে কোনও ভাবেই প্রকাশ করতে পারে না। অনেকটা অন্তর্মুখী ধরনের। তাই বাঙালি স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে কথাটা বলেই সে লজ্জা পায়। পলিন বুঝতে পেরে বলে এশিয়ানরা অনেক লাজুক, সহজ হতে পারে না। কিন্তু পশ্চিমারা বন্ধুত্ব ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নেয়।

পৃথিবীতে এমন মানুষ খুব কম আছে যার একটাও মুদ্রাদোষ নেই। অনেক সময় এই দোষ অনেকের পছন্দের কারণ হয়। আবার অনেক সময় মারাত্মক অপছন্দের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজিতে এটাকে বলা যেতে পারে গধহহবৎরংস বা ঢ়বপঁষরধৎ যধনরঃ। পলিনেরও একটা মুদ্রাদোষ সে কিছুক্ষণ পরপরই লিপস্টিক লাগায়। সৈয়দের মনে হয়, পাঁচ হাজার বছর আগে সুমেরীয় রানি পুরবির আবিষ্কার করা এই জিনিসটি পলিনের জন্যই তৈরি হয়েছিল। ইরাকের ‘উর’ শহরে বসে অসাধারণ রূপসী এ রানি ভেবে রেখেছিলেন কয়েক হাজার বছর পরে তার কাছাকাছি সুন্দরী এক টেক্সান রমণীর ঠোঁট রাঙানোর জন্য এটি দরকার হবে। আবার বনি ডাইনিং এর ‘পিকিউলিয়ার বিউটি’ নামে একটি বইতে পড়েছিল কোনও কোনও মহিলা বিশ্বাস করেন ঠোঁটে লিপস্টিক দিলে মুখ দিয়ে আত্মা শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। মনে হয় পলিন সে দলের একজন।

ছোটবেলায় তার মা শুধু ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে দিতেন। তার ধারণা ছিল এটা দিলে তার কন্যাকে পরির মতো লাগে। তারপর তার নিজের মনের মধ্যে এক ধরনের অবসেশন তৈরি হয়। এটা এক ধরনের মর্মপীড়াদায়ক চিন্তা, ছবি অথবা তাড়না, যা মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাথায় আসে। এই চিন্তাভাবনাগুলো বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয় এবং কোনো যুক্তির ধার ধারে না। এক অস্কার অনুষ্ঠানে সে লিপস্টিক খুঁজে পাচ্ছিল না বলে তার অনুষ্ঠান শুরু হতে ১৫ মিনিট দেরি হয়েছিল এবং আয়োজকরা অনেক বেশি রেগে গিয়েছিল।

সৈয়দ সারা দিনের কাজ শেষে রাতে বাংলোতে ফিরে পলিনকে দেখতে না পেয়ে বিচে গিয়ে দেখে শুক্লপক্ষের দুর্বল চাঁদের আলোয় সে পানিতে ভাসছে। তার সৌন্দর্য যে কোনো পুরুষকে মুগ্ধ করতে পারে। হয়তো তার সৌন্দর্য দিয়ে পলিন সৈয়দকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন।

পলিন ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চা। তার কাস্টাডি পাওয়ার জন্য তার মাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এই ধরনের পরিবারে বাচ্চাদের মধ্যে এক ধরনের ড্যামেজিং সাইকোলজি কাজ করে। সৈয়দ কথা ঘোরানোর জন্য তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করে। সৈয়দ ঘুমাতে গেলেও পলিন সারারাত সমুদ্রের তীরে বসে থেকে সকালে সূর্যোদয় দেখে।

৪.

সারাদিন পলিন কোথায় যাবে, কার সঙ্গে কি কথা বলবে, কোড অফ কন্ডাক্ট সব নিয়ে আলোচনা করা হয়। আগে থেকে ঠিক করা থাকলেও সবাই পলিনের সামনে নিজেকে তুলে ধরতেই আবার নতুন করে এগুলো নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠে। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা সত্যিকার অর্থে নিজেদের আত্মপ্রচার করতে পছন্দ করে। নিজের ঢাক নিজে পিটিয়ে বড় হতে চায়। সাধারণত যাদের কর্মের ভাণ্ডার শূন্য, নিষ্ঠা ও সাধনায় শ্রমবিমুখ তারাই আত্মপ্রচার করে থাকে।

পলিনের শর্ত একটা সে প্রতিটা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সঙ্গে কিছুক্ষণ একা কথা বলবে। প্রশাসনের তীব্র প্রতিবাদে হঠাৎ করে তার চেহারায় বুনো কাঠিন্য ফুটে উঠে। সে চলে যাওয়ার জন্য সৈয়দকে ইমারজেন্সি হেলিকপ্টার ডাকতে বলে। দুনিয়ার কোথাও শরণার্থীরা আশ্রয়দাতাদের সামনে সবকিছু বলে না। তাদের একান্ত কিছু কথা থাকে যা অন্যদের সামনে বলার সাহস থাকে। তাই সে একাকী তাদের কথা শুনতে চায়। এটা সে আগেই বলে রেখেছিল এবং সে ফিরে গেলে তার সঙ্গে মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব ফিরে যাবে। ডলারের কথা শুনে স্থানীয়রা আর আপত্তি করেনি। অনেক মানুষ নিজ ধ্যান-জ্ঞানের দোর্দণ্ড প্রতাপে ধরাকে সরা জ্ঞান করে জানান দেয় বাহাদুরির। সে আত্মতুষ্টিতে সমাজ, সংসার ও অন্য মানুষদের জীবন রসাতলে গেলেও তারা থাকবে তোয়াক্কাহীন। তোয়াক্কাহীন এসব মানুষ চেনে শুধু নিজেকে, নিজ স্বার্থ, নিজ গোষ্ঠীকে। ক্ষমতার দাপট দেখাতেই তারা পলিনের সঙ্গে এমন আচরণ করেছিল।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা বরাবরই উপেক্ষিত। তাদের চলার পথ কণ্টকাকীর্ণ। বর্তমান সময়ে নারীর স্বতন্ত্র সত্তা সর্বজনস্বীকৃত। অতীতে নারীর অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি সময়ের ব্যবধানে এখন অনেকটাই বদলে গেছে। তবু মেয়েরা একটু টাফ না হলে দুনিয়ার কোথাও কাজ করে শান্তি পায় না।

উত্তম চরিত্র মানুষকে মান-মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলে। সততা, সত্যনিষ্ঠা,  প্রেম, শিষ্টাচার, পরোপকারিতা, দায়িত্ব বোধ অধ্যবসায় ও কর্তব্য এগুলো একটা মানুষের চরিত্রকে বিকশিত করে তোলে। সৈয়দের চারিত্রিক দৃঢ়তা সম্পর্কে পলিনের একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। তাই সে বলে,‘সবাই রাতে নির্জনতাই একটি মেয়ের সঙ্গে সাঁতার না কাটার মতো ব্রহ্মচারী নয়।’

চট্টগ্রামের ভাষার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ভাষার মিল থাকায় সৈয়দ অনুবাদকের কাজ করে। পলিন ব্যাগভর্তি চকলেট নিয়ে যাওয়ায় বাচ্চারা তাদের পিছু পিছু ঘুরছে এবং রোগ-শোকের বিষয়গুলোতে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে পলিন তাদের কোলে নেয়। প্রত্যেকটি ক্যাম্পেই দেশান্তরি নির্লিপ্ততায় এদের চোখের ভাষা হারিয়ে গেছে। পলিন সব জায়গায় নেতাদের সঙ্গে একা মিটিং করেছে। বাচ্চাদের নিয়ে ‘ওল্ড ম্যাকডোনাল্ড হ্যাড আ ফার্ম, ইয়া ইয়া ও’ গেয়ে আনন্দ করেছে আবার ফিরে আসার সময় গাড়িতে তার চোখে তীব্র বিষণ্নতা ছিল। সে চোখে বঙ্গোপসাগরের ঝড় খেলা করছে। তাদের জন্য লুকিয়ে কান্নাও করতে দেখা যায় তাকে। এমনকি বাংলোতে ফিরেও দেশান্তরি রোহিঙ্গাদের বেদনা বুকে ধারণ করে তার কণ্ঠে গান শুনে সৈয়দের মনে হলো গাওয়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত গান হয় না।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এর মাঝেও পলিন লিপস্টিক বের করে ঠোঁটে দিচ্ছে। হঠাৎ লিপস্টিকটি পড়তে গেলে সৈয়দ ছুটে তা মাটিতে পড়ার আগেই হাত বাড়িয়ে তুলে নেয়। এরপর ইচ্ছে করেই কয়েকবার ক্যাচ ধরে তাকে ফেরত দেয়। এতক্ষণ ধরে সৈয়দের যে স্বভাব আমরা দেখতে পেয়েছি তাতে এমন হালকা রসবোধ তার মাঝে থাকার কথা না। পলিন যে লিপস্টিক ব্যবহার করে তা নরমাল একটি লিপস্টিকের তুলনায় অনেক বেশি ভারি। দুনিয়ার কোনো কোম্পানি এত ওজনের লিপস্টিক বানায় না। তাই শিওর হওয়ার জন্য তিনবার ওপরে ছুড়ে মেরেছিল। লিপস্টিকের রং ছাড়া আরও কিছু আছে। সেটা পরীক্ষা করার জন্য সে শরীর খারাপের অজুহাতে পলিনের সঙ্গে যায় না। রুমে ঢুকে সমস্ত কসমেটিকস পরীক্ষা করে ১১টি লিপস্টিকে ১১টি শক্তিশালী ক্যামেরা দেখতে পায়।

চলে যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় তারা খোলা বিচে বসে এবং সমুদ্রের কাছে হঠাৎ সে বনি এম এর বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলনের গানের বদলে গাইছে ডরিস বে এর গান। ভেসে-যাওয়া সমুদ্রের তীরে একটি মেয়ে আকুল কণ্ঠে শতাব্দীর সেরা একটি প্রেমের গান গাইছে।

নাগরিকত্ব বা নিরাপত্তার প্রশ্নসহ দাবি-দফার মীমাংসা ছাড়া রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি নয়, এর পিছনে দেশি-বিদেশি কিছু এনজিও’র হাত রয়েছে এবং এসব এনজিও সেখানে রাজনীতি করছে বলে বাংলাদেশ সরকার মনে করছে। দেশি-বিদেশি কিছু এনজিও ওদের ইন্ধন জোগাচ্ছে। তারা প্ররোচনা দিচ্ছে যে, তাদের না যাওয়া উচিত। যখন সবকিছুর হিসেবে গরমিল হতে শুরু করে, ক্ষমতাধারীরা প্রতিশ্রুতি দেন পরিস্থিতি ঠিক করে দেবার। কিন্তু তারা সেটা না করে বাংলাদেশের বিপক্ষে উসকে দিচ্ছে। তারা টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন ভঙ্গ করছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমরা শান্তিতে নেই, অনেকগুলো দেশি-বিদেশি চক্র এটা নিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।

সৈয়দের বুঝতে এতটুকুও বাকি থাকে না যে পলিন এমনই এক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সে পলিনের ভীষণ অনুরাগী ছিল। কিন্তু হতাশ হয়ে বলে, আমাদের ছোট্ট দেশে এত বড় শরণার্থী দলকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। সেটা কি আমাদের অপরাধ। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যেন সব দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশের একার। তোমরা কেন তাদের দিয়ে আমাদের মাতৃভূমিকে খণ্ড খণ্ড করে আলাদা আরাকান রাষ্ট্র বানাতে চাও। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের যে অবস্থান, তাতে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি খুব বেশি কঠোর হতে পারবে না দু’টো কারণে। এর একটা মানবিক দিক আছে, এটি মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা। আর এটা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে কোনোভাবেই ইতিবাচক দেখাবে না।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কবর তিন মিলিয়ন মানুষের। কবরকে কেন তোমরা গণকবর বানাতে চাও। বনি এম-এর গাওয়া তোমার প্রিয় গানে বর্ণিত ব্যাবিলন শহর যেমন পবিত্র তেমনি এ বাংলাদেশ আমাদের কাছে অতি পবিত্র।

এই বিশাল পৃথিবীর যে ভূখণ্ডে মানুষ জন্ম নেয় সে দেশের আলো-বাতাস, ধূলিকণায় তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, যে রাষ্ট্রের ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতিতে তার একাত্ম হওয়ার আকুতি সেই দেশই হলো তার স্বদেশ। আর সেই দেশের প্রতি মমত্ববোধ হলো তার স্বদেশ প্রেম। স্বদেশের প্রতি তার দায়িত্বটা অনিবার্য। রয়েছে শেকড়ের বন্ধন, গড়ে ওঠে মা, মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষার প্রতি তার ভালোবাসা। এই ভালোবাসা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রকৃতিগতভাবে মানুষের হৃদয়ে আপনাআপনি সৃষ্টি হয় দেশের প্রতি ভালোবাসা। সৈয়দের মাঝে এমন দেশ প্রেমিক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়।

এজেন্টরা রিমোট কন্ট্রোলে চললেও বুকের চাপা কষ্টকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পলিন নিজের ইচ্ছেই নয়, সে এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছিল। তাই সে ভীষণ লজ্জিত ও অনুতপ্ত। হঠাৎ সে হাত নিয়ে এল সৈয়দের ঠোঁটের দিকে। তারপর তার নিজের দিকে টেনে নিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনামিকায় পরা আংটি নিজের ঠোঁট দিয়ে চুষতে লাগল, মাত্র কয়েক সেকেন্ড, তারপর মাটিতে পড়ে গেল। ধরা পড়ার পরে আত্মহত্যা অতি প্রাচীন পদ্ধতি। সৈয়দের সততা, দায়িত্বশীলতা, দেশপ্রেম, বন্ধুসুলভ আচরণ সবকিছু পলিনকে মুগ্ধ করেছিল। তাই সুযোগ পেয়েও সে তাকে না মেরে নিজেই মারা যায়।

পুরো গল্প জুড়ে রোহিঙ্গা সমস্যা, বিভিন্ন এনজিওর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের লেলিয়ে দিতে তাদের উদ্বুদ্ধ করা; সৈয়দের দেশপ্রেম, সততা দায়িত্বশীলতা, পলিনের এনজিওর হয়ে কাজ করার চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত শহরের নাম ব্যাবিলন। যার ধ্বংসাবশেষ আজও রয়েছে আধুনিক ইরাকে। ব্যাবিলননগরী অবস্থিত ছিল ইউফ্রেটিস নদীর তীরে। ইউফ্রেটিস নদীর সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে যেমন ব্যাবিলন শহর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল তেমনি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে এদেশকে ধ্বংস করতে কিছু এনজিও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। আমরা চায়না বাংলাদেশেও বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলনের পুনরাবৃত্তি ঘটুক। এই বিষয়গুলো লেখক খুব চমৎকার ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে গল্পের মাঝে তুলে ধরেছেন। গল্পটি বাস্তবতার নিরিখে লেখা। ভাষার প্রাঞ্জলতা, সরলতা, সব মিলিয়ে লেখকের শৈল্পিক সত্তার প্রকাশ ঘটেছে।

সুমন্ত আসলাম

চোখ

লেখক জীবনকে দেখেছেন রূঢ় বাস্তবতায়। তাঁর দেখানো জীবনের মুখে কোনো মুখোশ নেই। তাঁর শিল্পের জীবন প্রতিদিনের রূঢ় বাস্তবতায় সমৃদ্ধ। তিনি ‘চোখ’ গল্পে মানব জীবনকে দেখেছেন নির্মোহ দৃষ্টিতে।

প্রতিটি গ্রামে এখনও গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু আছে। গ্রাম বাংলার বিরোধ মীমাংসার এটি একটি প্রাচীনতম পদ্ধতি। সামাজিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ যে কোনো নাগরিক ও সামাজিক প্রয়োজনে পঞ্চায়েত হয়ে থাকে। তবে পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম নেই। যে কোনো সময় যেকোনো বিষয়ে পঞ্চায়েত হতে পারে।

অনেকদিন পর গ্রাম্য পঞ্চায়েতে একত্রিত হয়েছে সদানন্দপুর প্রাথমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তোফাজ্জল মুন্সি, স্থানীয় মসজিদ কমিটির সভাপতি ফয়জুল মাহমুদ এবং পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান হারেস ব্যাপারি। স্থান সদানন্দপুর নামক এক গ্রাম। সময় বাদ জুমা। বিচারকর্মের শুরুতে অভিযোগ উত্থাপন করে শিক্ষক। অভিযোগ খুবই গুরুতর ও ঘোরতর অন্যায়―মহিসুর কাফনের কাপড় চুরি করেছে।

একই গ্রামের মহিসুর আসামির কাঠগড়ায়। অপরাধ, সে কাফনের কাপড় চুরি করেছে। এর আগেও সে দুইবার কাফনের কাপড় চুরি করে ধরা পড়েছে এবং তাকে মাফ করে দেওয়া হয়েছে। এবার দিয়ে সে তিনবার কাফনের কাপড় চুরি করেছে। আগে দুইবার তাকে মাফ করা হয়েছে কিন্তু এবার এক নারীর কাফনের কাপড় চুরি করাই নারীর প্রতি যথাযথ সম্মান দেখায়নি সে। ক্ষোভে ফেটে পরেছে পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যরা। তাই পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ অপরাধের জন্য মহিসুরের দুই চোখই তুলে ফেলা হবে।

অভাবের কারণে বা প্রয়োজনে নিরুপায় হয়ে কেউ চোর হয়েছে বলে চুরি করাটাকে গ্রামের অধিপতি সম্প্রদায় করুণার দৃষ্টিতে দেখতে খুব একটা রাজি ছিলেন না। চুরি মোটেও সমর্থনযোগ্য কাজ নয়। ফলে শাসক সম্প্রদায় চোরকে করুণার দৃষ্টিতে দূরে থাক, কেন তারা চুরি করতে নামে, তার কারণ খতিয়ে দেখতেও রাজি ছিল না। তাই তারা কেউ মহিসুরের বাবার কথা শুনলো না। চোরের বাবার কিছু বলার অধিকার নেই। তার প্রশ্রয়েই আজ তার ছেলে চুরি করে। সিদ্ধান্ত হলো আজকে জুমাবার নামাজ শেষে তারা কাফন চোরের একটি নয়, দুটি চোখই তুলে ফেলবেন।

২.

কাফন চোর ছেলেটার নাম মহিসুর। গ্রামের কেউ কেউ তাকে ডাকে মহিষ বলে। গরিবের ছেলেদের কোনো নির্দিষ্ট নাম থাকতে নেই। তাদের যে কেউ যা খুশি নামে ডাকতে পারে। এখানে যে নামেই ডাকা হোক না কেন গল্পকার তাকে মফিজ বলেই সম্বোধন করতে চান। গোবেচারা মানুষকে মফিজ বললেও যে ছেলেটা গভীর রাতে কাফনের কাপড় চুরি করতে পারে সে তো গোবেচারা টাইপের হতে পারে না। এ কথায় সমাজের প্রতি লেখকের মনের শ্লেষ উগরে দেন। চৌর্যবৃত্তির পথে যে কেউ শখে আসে না বরং আসে অসহায়ত্বের বশে। সমকালীন সমাজের এই রূঢ় বাস্তবতা লেখক গল্পে তুলে ধরেছেন।  সে যে কাফন চুরি করে তার একটা মর্মস্পর্শী কারণ এবং এর পেছনে জোরাল যুক্তিও রয়েছে।

৩.

সিমেন্টের লাইটপোস্টের সঙ্গে বাঁধা হয় মফিজকে। মফিজ কেন কাফনের কাপড় চুরি করে তার মা জানতে চাইলেও সে কোনো উত্তর দেয় না।

মফিজের বয়স মাত্র ১৭ বছর। কিন্তু এই বয়সে পৃথিবীর কদর্য রূপটি দেখা হয়ে যায় তার। একবেলা খেয়ে না খেয়ে অনাহারে থাকাটা তার সহ্য হলেও কাপড়ের অভাবে মায়ের বিবস্ত্র হয়ে থাকাটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। পৃথিবীর কোনো সন্তানই মায়ের বিবস্ত্র শরীর দেখতে পারে না। মফিজও পারেনি। তাই সে কাফনের কাপড় চুরি করে তা বিক্রি করে মায়ের শাড়ি কিনে দেয়। নির্দয় এই পৃথিবীর কদর্য রূপ দেখার চেয়ে অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকাটা শ্রেয় মনে হয়েছিল তার। জীবিত মানুষ কাপড় পায় না মৃত মানুষ কাপড় পড়ে কী করবে এই কথার মাধ্যমে মহিসুরের পৃথিবীর প্রতি রাগ, ঘৃণা, বিদ্বেষ, ক্ষোভ প্রকাশ পায়। তাই চোখ তুলে ফেলার সিদ্ধান্তে তার বাবা-মা ভীত হলেও তাকে একটুও ভীত হতে দেখা যায়নি।

৪.

জুমার নামাজ শেষে পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান হারেস ব্যাপারি প্রথমে আসে। সামাদ জোয়ার্দারকে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার অবজ্ঞার চাহনিটা যেন আরও বেশি অবজ্ঞাময় হয়ে ওঠে। মনে মনে অবজ্ঞার হাসি হাসেন হারেস ব্যাপারি। চুরি করে প্রায় সবাই। বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন কারণে করে। প্রয়োজনে করে, অপ্রয়োজনেও করে। অভাবে করে, স্বভাবেও করে। কিন্তু অভাবী চোরের শাস্তি হলেও স্বভাবী চোরের কোনো শাস্তি হয় না। দরিদ্রের বিচার ব্যবস্থায় অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা ও বৈষম্যের চিত্রটি ফুটে উঠেছে গল্পে। পঞ্চায়েত সদস্যদের দুষ্কর্ম, ক্ষমতার অপব্যবহারের আড়ালে বিচারের নামে ব্যক্তিগত মুনাফা লোটার চেষ্টাই হারেস ব্যাপারি এ ধরনের পঞ্চায়েত কমিটি ডেকেছিল। তিনি সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে গ্রামীণ জীবনে নিজের প্রভাব বিস্তারেই রত ছিল।

সামাদ জোয়ার্দারের সম্পত্তির প্রতি বহুদিন ধরেই একটা লোভ ছিল তার। কিন্তু জোয়ার্দার ঠিক করেছে সেই জমিতে সে তার ছেলেকে একটা দোকান করে দিবে। সামাদ জোয়ার্দার খব ভালো করেই বোঝে হারেস  ব্যাপারিকে খেপিয়ে লাভ নেই। তাই জমির বদলে ছেলের দুই চোখ ফিরে পাওয়ার আকুতি করে জোয়ার্দার। কিন্তু জমির বিনিময়ে চোখ রক্ষার মুচলেকা হওয়ার আগেই স্থানীয় মসজিদ কমিটির সভাপতি ফয়জুল মাহমুদ চলে আসেন।

ফয়জুল মাহমুদ মসজিদের সাধারণ সম্পাদকের ছেলের চল্লিশ বছর বয়সে বিয়ে নিয়ে অতি উৎসাহ দেখালে হারেস ব্যাপরি তার দিকে তীর ছুড়লে তিনি বিব্রত ও অপ্রস্তুত হয়ে ওঠেন।

৫.

সকালের দিকে খবরটা অনেকে না জানলেও এখন অনেকেই জেনেছেন। আশেপাশের অনেক গ্রামে যেন দাবানলের  মতো ছড়িয়ে পড়েছে খবরটা। আগে কেউ কখনও চোখ তোলা দেখেনি। তাই বিচারের সময় সদানন্দপুর প্রাথমিক উচ্চ বিদ্যালয় উপচে পড়ে মানুষের ভিড়ে। এখানে মানুষের নির্লিপ্ততা, অমানবিকতা আর নির্বিকার চিত্তের পরিচয় পাওয়া যায়।

যুগে যুগে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পঞ্চায়েত পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। সমাজের নানা অসঙ্গতি, অন্যায়-অবিচার দূর করতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক বিচার ব্যবস্থা মানুষকে অনেক শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপদ করেছে। আর এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে সমাজহিতৈষী কিছু পঞ্চায়েত ব্যক্তিদের জন্য। স্বেচ্ছাসেবামূলক এসব কাজে নিজের দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে পঞ্চায়েতরা নিজেদের গৌরবান্বিত মনে করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের মানসিকতারও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এখন পঞ্চায়েত বৈঠকে বসার আগে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। ন্যায় নীতিকে অবজ্ঞা করে পক্ষপাতদুষ্টে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এতে ব্যক্তি সাময়িক উপকৃত হলেও বিচারের বাণী যেন নিভৃতে কাঁদে। হারেস ব্যাপারি সামাদ জোয়ার্দারের জমি না পেয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে মহিসুরের দুই চোখ উপড়ে ফেলার সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হলেন। হারেস ব্যাপারি বিবেক বিবেচনা বিবর্জিত হয়ে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে অতীতের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ঝেড়ে বিষোদগার করছেন।

মহিসুর নিজের চোখ নিজেই তুলবে না। ওর চোখ তুলে দিবে ওর ব্যর্থ জন্মদাতা বাবা সমাদ জোয়ার্দার। উপায় না দেখে মহিসুরের বাবা উঁচুস্বরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার কান্নাকাটিতে প্রকৃতি কেঁপে উঠলেও সেখানে জমায়েত থাকা একটা মানুষের মনও কেঁপে উঠল না।

৬.

যদি কোনো কারণে জোয়ার্দার তার ছেলের চোখ তুলতে না পারে তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে তার চোখও তুলে নেওয়া হবে। নির্বাচিত গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্যরা বিচারে বসেছেন। তাদের রায় না মেনে উপায় নেই। তাই সামাদ জোয়ার্দার সামনের দিকে এগোতে থাকলেন। ছেলের চোখ তুলতে না পেরে সে নিজেই নিজের চোখ তুলে ফেললেন। গ্রামের সমস্ত মানুষ এই ঘটনার নির্বাক সাক্ষী হয়ে রইল। মহিসুরের প্রকম্পিত চিৎকার এবং গালি গালাজে সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। কিন্তু কেউ কিছু মুখ ফুটে বলতে পারল না।

রাতের অন্ধকারে গ্রামবাসীর চারিদিকে চোখ দেখতে পাওয়ার মধ্য দিয়ে যাদের চোখ আছে তাদের প্রতি লেখক তীব্র কষাঘাত করেছেন। জোয়ার্দারের চোখ অন্ধ হওয়ার পরে গ্রামের সবার অন্তর্দৃষ্টি খুলেছে। জীবনে ভুলের অনুশোচনা ও অনুতাপের মধ্য দিয়েই মানুষ ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারলে তবেই শুদ্ধ হয়ে ওঠে।

সুমন্ত আসলাম ‘চোখ’ গল্পে জোয়ার্দারের অন্ধত্বের মধ্য দিয়ে দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের অন্ধত্বকে তুলে ধরেছেন। মানুষের চাক্ষুষ দৃষ্টি থাকলেও ভেতরে ভেতরে মানুষ লোভ, স্বার্থপরতা, আধিপত্য নানা কারণেই অন্ধ হয়ে ওঠে। তাই তো গ্রামের সবাই সদানন্দপুর প্রাথমিক উচ্চ বিদ্যালয় স্কুল মাঠে অসংখ্য চোখের ছুটোছুটি, লাফালাফি এবং পাখির মতো উড়ে বেড়ানো দেখলেও স্কুলের বাংলা শিক্ষক তোফাজ্জল মুন্সি, স্থানীয় মসজিদ কমিটির সভাপতি ফয়জুল মাহমুদ আর পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান হারেস ব্যাপারি কিছুই দেখতে পেলেন না।

বাহ্যিক অন্ধত্বের চেয়ে অন্তর্দৃষ্টি অন্ধ হলে মানবজীবন পতিত হয়। আমরা নিজেদের স্বার্থের বিষয়টি কেবল দেখতে পাই কিন্তু নিজের ত্রুটি বিচ্যুতি কেউ দেখতে পায় না। সে দিক দিয়ে আমরা সবাই অন্ধ। তাই তো পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যরা মৃত নারীর কাপড় খোলার অপরাধ দেখতে পেলেও জীবিত বিবস্ত্র নারী তাদের চোখে পড়ে না।

৭.

বিচার ব্যবস্থার বৈষম্য, জীবিত মানুষ পোশাক পায় না, অথচ মৃত মানুষের পোশাক নেওয়ায় তীব্র প্রতিবাদ, অনেক দিনের জমানো ক্ষোভ এবং নিরীহ চোরের ওপর চড়াও হয়ে ওঠার বিষয়গুলো গল্পে দেখানো হয়েছে।

গল্পে নিদারুণ দারিদ্র্য, গ্রাম সমাজের সংকীর্ণতা, মানুষের একান্ত মানবিক ঈর্ষা, বিদ্বেষ, অমানবিক ক্রুর প্রথা, নীরব শান্ত নিষ্ঠুরতার চিত্র বিদ্যমান। কিন্তু তাঁর শিল্পে স্পষ্ট যে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের সামান্য উপকরণই যথেষ্ট। দারিদ্র্য মানুষের হীনতা প্রাণকে কিছুতেই আটকে রাখতে পারে না।

এই গল্পের ভাব-ভাষা, কাহিনি আমাদের আবেগের জায়গায় তীব্র আঘাত করেছে। লেখক তাঁর অসাধারণ লেখনী শক্তির মাধ্যমে অনিয়ম-অবিচার-বঞ্চনার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন।

সাহিত্য মানবমনের শিল্পভাষ্য। এই শিল্পভাষ্যে মানবমনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রতিবিম্বিত হয়। সাহিত্যের নামকরণ একটি শিল্প। নামকরণের সাফল্য শিল্পসাফল্যের একটি বিশেষ দিক। বিষয়বস্তু, ভাবসম্ভার, অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, চরিত্র ও লেখকের জীবনোপলব্ধির বাহক হিসেবে সাহিত্য শিল্পের নামকরণ হয়ে থাকে। সুমন্ত আসলামের ‘চোখ’ নামক গল্পটির মূল উপজীব্য বিষয় সংক্ষিপ্ত নামটির মধ্য দিয়ে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। গ্রামীণ আবহে রচিত ‘চোখ’ গল্পটিতে মহিসুর নামক এক কাফন চোরের জীবনের বৃত্তি, অতি সামান্য চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখসহ সর্বৈব জীবনবোধ ও জীবনদর্শন উচ্চারিত হয়েছে।

রেজা ঘটক

তেইল্যা বোয়াল!

দেহের আছে সুস্থতা, আছে অসুস্থতাও। মনেরও তেমনি রয়েছে নানা ধরনের সুখ, অসুখ। দেহ অসুস্থ হলে দেহের কলকব্জায় ওলট-পালট কিছু ঘটলেই আমরা উদ্বিগ্ন হই, ছুটে যাই চিকিৎসকদের কাছে। আর মন যখন বিগড়ে যায়, তখন নানারকম উদ্বিগ্নতা, অসংলগ্নতা এবং হতাশায় আক্রান্ত হই। তখনই আমরা পাগল উপাধিতে ভূষিত হই। পাগল নামক তিন অক্ষরের এ শব্দের অভিব্যক্তি বহু বিচিত্র। এটি ব্যক্তির মানবিক অস্তিত্বের এক বিপর্যস্ত অবস্থাকে নির্দেশ করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অপমানজনক গালি হিসেবেও এর ব্যবহার হয়ে থাকে। রেজা ঘটকের ‘তেইল্যা বোয়াল’ নামক গল্পে খালেক মাতবরও হঠাৎ করেই শুধু বোয়াল মাছের কারণেই পাগল হয়ে যায়। যদিও হঠাৎ পাগল হওয়ার বিষয়ে বহুমত পরিলক্ষিত। কেউ মনে করেন স্রেফ বোয়াল মাছের কারণেই খালেক মাতবর পাগল হয়েছে। কেউবা মনে করেন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণেই খালেক মাতবর পাগল হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন খালেক মাতবরের পাগলামির পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। সেই কারণের অন্তরালের কারণ-অকারণের ব্যাকরণ সংমিশ্রণে শরীরের হেডকোয়ার্টারের সার্কিটে স্রেফ ভারসাম্য হারিয়েই খালেক মাতবর ধীরে ধীরে পাগল হয়ে গেছে।

যেসব মানুষ নিজেকে বুদ্ধিমান আর অন্যকে বোকা ভাবতে পছন্দ করে, তারা স্বভাবে হয় একচোখা ও একরোখা। গল্পের খালেক মাতবরও একরোখা ধরনের মানুষ। নিজেকে অনেক জ্ঞানী মনে করেন। তাই সামান্য বিষয়ের মাঝেও অসামান্যতা খোঁজার চেষ্টা করে। সে নিজেকে জাহির করতে ভালোবাসে। শিষ্টাচার, সভ্যতার তোয়াক্কা না করে নিজেকে জাহির অবশ্যই আত্মম্ভরিতা। অন্যকে ছোট ভেবে অসম্মান করে নিজেকে বড় প্রমাণের চেষ্টা কৌতুককর। তাই অনেকেই তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে শ্লেষের মাধ্যমে নিউটন এবং আইনস্টাইনের সঙ্গে তুলনা করেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কারণেই খালেক মাতবর নাকি বিজ্ঞানী না হয়ে শৌখিন মাছচাষি থেকেই পাগল হয়ে গেছে। তবে একটু খতিয়ে দেখলে খালেক মাতবরের পাগল হওয়ার পেছনে অন্য ঘটনারও সন্ধান পাওয়া যাবে।

২.

প্রতিযোগিতা স্বার্থপরতায় আবদ্ধ করে, পারস্পরিক বিরোধ-দ্রোহে উদ্বুদ্ধ করে। বাঁচার জন্য প্রতিযোগিতা, অর্থলাভের প্রতিযোগিতা; ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তির জন্য প্রতিযোগিতা; সম্মান, সুনাম ও গৌরবের জন্য প্রতিযোগিতা; যেভাবে হোক এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। সর্বোপরি সবক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে আমাদের। প্রতিযোগিতার কী নিদারুণ তীব্রতা! মাছ নিয়ে তালেব চেয়ারম্যানের সঙ্গে খালেক মাতবরের মাঝেও তেমনি এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখতে পাই।

একবার কোজাগরী পূর্ণিমায় জেলেরা অনেক শৈল এবং বোয়াল মাছ পেয়েছিল। খাসেরহাটের বাজারে সবচেয়ে বড় মাছ ছিল কদম আলি জাইলার পাওয়া তেইল্যা বোয়াল। মাছ নিয়ে বাঙালির আদিখ্যেতার শেষ নেই। এই মাছের প্রতি ভালোবাসাটা আবার সবার যে আসত এমনও না। কারণ মাছের দামও ছিল বেশ আকাশছোঁয়া। সে মাছের প্রতি পাট ব্যবসায়ী খালেক মাতবরের মতো তালিব চেয়ারম্যানেরও একটা লালসা তৈরি হয়েছিল। তাই তারা দুজন মাছ নিয়ে বাজিও ধরেছিল। দুই-একজন চেলাচামুণ্ডার পরামর্শে তালিব চেয়ারম্যান চার হাজার টাকা দিয়ে তেইল্যা বোয়ালটা কিনলেন। আম-ছালা দুটোই হারানোর ভয়ে খালেক মাতবর তখন বাজিতে ইস্তফা দিলেন। কিছু পাওয়ার প্রতিযোগিতা বা চিন্তাভাবনাই আমাদের মন-মানসিকতাকে বিকৃত করে দেয়। তখন আমাদের মননে-মগজে প্রতিযোগিতার তীব্রতা আরও প্রকট হয়। তাই মনের কষ্ট ভোলার জন্য খালেক মাতবর পরের বছর পাটের ব্যবসা গুটিয়ে শৌখিন মাছচাষি হয়ে গেলেন।

৩.

তালিব চেয়ারম্যান পঁয়ত্রিশ বছর ধরে চেয়ারম্যানি করছেন। তাই মাতবরকে পাত্তা না দিয়ে তাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি সাড়ে এগার কেজি ওজনের বোয়াল মাছ বেশি টাকায় কিনেছিলেন। যদিও সে রাতে তালিব চেয়ারম্যান নিজের বাড়িতে খালেক মাতবরকে দাওয়াত দিয়ে তেইল্যা বোয়ালের ঝোল খাইয়ে ছিলেন। এই ঘটনার পর খালেক মাতবর পাটের ব্যবসা বাদ দিয়ে বাড়ির দক্ষিণ পাশে একটা মস্ত বড় পুকুর কাটলেন। এ দেখে গ্রামের কারও আর বুঝতে বাকি থাকল না যে পরের বছর চেয়ারম্যানি ইলেকশনে দাঁড়ানোর জন্যই খাসেরহাট বাজারে তালিব চেয়ারম্যানকে ভোটের আগে একবার হারানোর চিন্তা ছিল তার। খালেক মাতবরের পুকুর কাটা দেখে চেয়ারম্যান এসে তাকে কটাক্ষ করে। কিন্তু কারও কথা না শুনে সাড়ে চার হাজার মাছের পোনা ছাড়লেন। কোনো কিছু পাওয়ার লিপ্সা, উদগ্র আকাক্সক্ষা, লক্ষ্যে পৌঁছার অদম্য স্পৃহা ও প্রত্যাশা পূরণে তীব্র ক্ষুধা মানুষকে উন্মত্ত, ব্যগ্র ও অধীর করে তোলে। পাওয়ার ইচ্ছা, প্রত্যাশা ও লক্ষ্য পূরণ অবশ্যই ভালো। কিন্তু অন্তঃসারশূন্য আগ্রহ ও উদ্দীপনা বিকৃত মস্তিষ্ক তৈরি করে। খালেক মাতবরও অন্তঃসারশূন্য হয়ে কারও কথা না শুনে পুকুরে মাছের পোনা ছাড়লেন।

৪.

প্রতিযোগিতার চরম অসুস্থ চর্চা চলছে। সর্বোপরি যেন সবক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার জন্যই বেঁচে থাকতে হচ্ছে আমাদের। স্বার্থ, আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনাই আমাদের মন-মানসিকতাকে বিকৃত করে দিচ্ছে। নিজেকে কেন্দ্র করে ব্যতিব্যস্ত থাকার ফলে আমরা অন্যের ব্যাপারগুলোকে আমলে নেই না। নিজের অহংবোধ কথিত ব্যক্তিত্ব অন্যের মধ্যে জাহির করতে প্রতিযোগিতা করি। মাছ নিয়ে তালেব চেয়ারম্যানের সঙ্গে খালেক মাতবরের মাঝেও তেমনি এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখতে পাই।

বোয়াল মাছ বড় হলেও রেকর্ড না করা পর্যন্ত খালেক মাতবর পিছু হাঁটবেন না। পূর্ণিমার জোগায় পদ্মায় তখন ভরা জোয়ার। বন্যার একটা আভাস পেয়ে খালেক মাতবর চিন্তিত হয়ে বাঁশের মাচা বানিয়ে পুকুরের চারপাশে খুব ভালো করে বেড়া দিলেন। খালেক মাতবরের ১০০ টাকার কামলা ছিল সোনা মিঞার ছেলে আউয়াল। সে পুকুরের চারপাশে বাঁশের মাচা পোতার সময় কিছুদূর পর পর খুব কৌশলে মাচার নিচে কিছু ফুটো রেখে দিয়েছিল। গোপনে গোপনে সেদিন আউয়াল কার ইশারায় অপকম্মটি করেছিল তা আর কেউ এখন বলতে পারে না।

অবশ্য আউয়ালের শয়তানি এক্ষেত্রে কোনো কাজেই আসত না। আকস্মিক বন্যায় ভেসে যায় পদ্মাপারের বাইশটি গ্রাম। তলিয়ে যায় পুকুরের সমস্ত মাছ এবং পুকুরের অবকাঠামো মিলিয়ে যায়। বন্যায় মাছ ভেসে যাওয়ায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় খালেক মাতবর। সর্বস্ব হারিয়ে খালেক মাতবর পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েন। গল্পে বন্যাকবলিত অসহায় মানুষদের স্বপ্নভঙ্গের চিত্র ফুটে উঠেছে। বন্যার আগ মুহূর্তে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে যদি সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হতো তাহলেও এই ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হতো।

৫.

রাতুল এবং শান্ত দুই বন্ধু বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে বহু চেষ্টার পর একটা বড় বোয়াল মাছ পায়। রাতুল তার বাড়িতে শান্তকে দাওয়াত দেয়। শান্ত সেখানে গিয়ে দেখে খালেক মাতবরের উপস্থিতিতে খুব বড় ধরনের একটা ঝগড়া বেধে গেছে। একটা তুচ্ছ ও ঠুনকো ব্যাপারেই সঙ্ঘাত, দ্বন্দ্ব-কলহ ও বাদানুবাদ সৃষ্টি হচ্ছে।

খালেক মাতবরের ধারণা তারা যেই বড় বোয়াল মাছ পেয়েছে সেটা তারই পুকুরের। তাই খালেক মাতবর কারও কোনো কথা না শুনে শেষ পর্যন্ত রাতুলের মায়ের রান্না করা বোয়াল মাছ নিজের বাড়িতে নিয়ে চলে গেলেন। সেই রাতেই বন্যায় খালেক মাতবরের বাঁশের মাচা ভেঙে যায়। সেখানে পুকুরে মাছের ওপরে প্রতিরক্ষা হিসেবে জাল দিয়ে যে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল সবকিছুর নাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। খালেক মাতবরের বসতবাড়ির টিনের ঘর তখন বন্যায় ভেসে যায়। পুকুরের পানি শুকানোর আগেই তিনি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলেন। খালেক মাতবর তালিব চেয়ারম্যানের কাছে হারার পর থেকে ছোট ছোট বিষয় তার মনের মধ্যে বাসা বাঁধতে থাকে। সেই ক্ষত ধীরে ধীরে ফুলে-ফেঁপে ওঠে, প্রকট আকার ধারণ করে। তীব্র এবং জটিল মানসিক সংকটের সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গে পারিপার্শ্বিকতার কটাক্ষ, টিটকারি তো আছেই। উপেক্ষিত হয় মনের চাওয়া।

সাহিত্যের মধ্যে আনন্দ-বেদনা, আশা-নিরাশা, পাওয়া না পাওয়া, সুখ- দুঃখ, ভালোবাসা-ঘৃণা, সফলতা-ব্যর্থতা প্রভৃতি জীবনের যে প্রতিবিম্ব গঠিত হয় তা সমাজ-বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। সুতরাং সাহিত্যের সঙ্গে জীবন তথা সমাজের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। লেখক একদিকে যেমন তাঁর সৃষ্টিকর্মে জীবনের সুকোমল দিকগুলোকে প্রাধান্য দেন, অন্যদিকে জীবনে যে দুঃখ-বেদনা, কান্না-হাসি, দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকে; তাকেও নিপুণভাবে উপস্থাপন করে সমাজ বাস্তবতার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে। লেখক রেজা ঘটকের ‘তেইল্যা বোয়াল’ গল্পটি তেমনই এক সমাজ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বের সকল সৃষ্টির মধ্যে বিশেষত্ব, স্বাতন্ত্র্য রক্ষার্থে এবং এক জাতীয় বহুর মধ্যে বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্য নামের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সাহিত্যের নাম অনেকটা দর্পণের মতো এবং সেইসঙ্গে তাৎপর্যমণ্ডিত এবং গুরুত্ববহ। গল্পটির অন্তর্নিহিত বিষয়ভাবনার উপর ভিত্তি করে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘তেইল্যা বোয়াল’। কাহিনি বিন্যাসে গতানুগতিক  ধারা অব্যাহত। অসুস্থ প্রতিযোগিতা, স্বার্থপরতা, পারস্পরিক বিরোধ এবং এর ভয়াবহ পরিণতির চিত্র গল্পে প্রকটিত। সেই সঙ্গে ভাষা সহজ সরল ও প্রাঞ্জল, যা পাঠকের সহজেই বোধগম্য হয়।

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

হৃদয় এখন

হোক প্রেম বা বন্ধুত্ব যে কোনো বিরহ বিচ্ছেদই আমাদের বেশ কষ্ট দেয়। মন হয় দুঃখে ভারাক্রান্ত। প্রেমে প্রতারণা, দুটি মানুষের দূরে চলে যাওয়া বা বিচ্ছেদ বড়ই কষ্টের। দুজন মানুষ যে একসঙ্গেও ঠিক ততটাই ভালো থাকবে এমনটা সব সময় হয় না। কারণ সব মানুষেরই চাহিদা, ইচ্ছা, ভালো বা মন্দ লাগা আলাদা হয়। আবার তাল-মিলটাও এক সময় ঠিক মতন থাকে না। তাই ‘বিচ্ছেদ’ নামক শব্দটা আমাদের কাছে বেশ পরিচিত। মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যের ‘হৃদয় এখন’ গল্পের সূচনায় আমরা তেমনই এক হৃদয় ভাঙার বা বিচ্ছেদের কাহিনির মধ্য দিয়ে গল্পে প্রবেশ করি।

জীবনের প্রথম প্রেমে থাকে প্রবল আবেগ আর কৌতূহল। সেই প্রেম যদি হয় না-পাওয়ার, সেই প্রেম যদি হয় অচরিতার্থ প্রেম! তবে তাকে খুব সহজে ভুলতে পারা যায় না। সে-প্রেমের স্মৃতি একটা মানুষের মনোচৈতন্যে প্রভাব ফেলে, সে একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। ‘হৃদয় এখন’ গল্পে যোজনগন্ধা গল্পকথককে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করার পরে গল্পকথকও একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। ঠিক সেই সময়ে যোজনগন্ধার ফোন আসে তার কাছে। যোজনগন্ধা তার সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পারে যে, তার বিয়ে হওয়াতে সে ব্যথিত। তার জন্য কেঁদেই তার গলাটা ভারী করে ফেলেছে। গল্পকথক কথাটা এড়িয়ে যাবার জন্য বলে আইসক্রিম খেয়ে তার এই অবস্থা। কিন্তু অনেক দিনের সম্পর্কের কারণে অভ্যাসবশত যোজনগন্ধা ঠিকই বুঝতে পারে। তার জীবন থেকে চলে গেলেও যোজনগন্ধার অভিভাবকসুলভ স্বভাবটা এখনও যায়নি বলেই সে তাকে ডাক্তার দেখাতে বলে। বিয়ে হয়ে গেলেও গল্পকথকের প্রতি যোজনগন্ধার অধিকার সত্তার বহিঃপ্রকাশ এখানে দেখতে পাওয়া যায়। যোজনগন্ধার ফোন করার মূল উদ্দেশ্যই ছিল বন্ধু-বান্ধব এবং তার সঙ্গে দেখা করতে চাওয়া। সেই সঙ্গে তার নতুন জীবনের কথা তাদের সঙ্গে শেয়ার করা। আগেকার দিনের মানুষ নিজের সংসারের কথা মনের গহিনে রাখলেও বর্তমান প্রজন্ম শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

যোজনগন্ধার বিয়ে এক সপ্তাহ হয়ে গেলেও তার মনের মাঝে আজও বেদনার সুর বেজেই চলেছে। এমনকি যোজনগন্ধার শুভদৃষ্টির সময় বিয়ের পিঁড়িও তাকে ধরতে হয়েছে।  বন্ধুরা মজা করে ছবি তুলে সেই ছবি ফেসবুকে আপলোডও দিয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যে কোনো কিছুকেই খুব সহজে ভাইরাল করে দিতে পছন্দ করে। তারাও এর ব্যতিক্রম নয়। যোজনগন্ধা দেখা করার জন্য ডাকলে সে ফিরে যায় তার অতীতে। প্রিয় যখন দূরে থাকে প্রিয়াকে সব সময় মনে হয়। যেমনটা তারও খুব দেখতে ইচ্ছে করে সিঁদুর মাখা যোজনগন্ধাকে। কিন্তু সে তার আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

২.

যোজনগন্ধা তার ব্যক্তিগত কথাগুলো ফোনে বলতে চায় না। যোজনগন্ধার স্বামী তার বাবার সঙ্গে বাংলাদেশের নাটক দেখতে যাবে। এই সুযোগে সে তার বান্ধবী এবং গল্পকথকের সঙ্গে কথা বলতে চায়। লেখকের বাংলাদেশের নাটকপ্রীতির চিত্র ফুটে ওঠে। যোজনগন্ধার কথায় তার মনে নানা অবান্তর চিন্তারা খেলা করে।

প্রেমের জন্য জগৎ। আর জীবন প্রেমময়। এই প্রেমকে সার্থক করার জন্য প্রিয়র আপ্রাণ প্রচেষ্টা থাকে। তবু কখনও কখনও প্রেম অধরা থেকে যায়। কখনও বাস্তবতার বিরহ-অনলে প্রেমিক পোড়ে। কিন্তু সব সময় প্রিয়র শুভ কামনা করে। এমনকি নিজের জীবনের বিনিময়ও যদি প্রিয়ার মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারে, তার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে খাঁটি প্রেমিক কখনও পিছপা হয় না। সব কিছু দিয়ে দাতা প্রেমিক প্রিয়াকে ধনী করে। দীনহীন হয়ে শুধু প্রেমকে পাথেয় করে জীবন কটিয়ে দেয় একজন খাঁটি প্রেমিক। যদিও গল্পে এ যুগের প্রেমিক যুগল এতটা নিবিড়ভাবে ভালোবাসতে পারে না।

প্রায় দুই বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল যোজনগন্ধা আর তার। কিন্তু হুট করেই যেন ছন্দপতন, বাস্তবতার নানা সমীকরণ মেলাতে না পেরে দুজনের সম্পর্কচ্ছেদ। মনকে মানিয়ে প্রেমের সম্পর্ক শেষে দুজন দুদিকে চলার চেষ্টা করে।

প্রেমের কিছুদিন পরে ছেলে বা মেয়েটা ভাবতে শুরু করে, আমি ওর থেকে ভালো কাউকে ডিজার্ভ করি। এই সম্পর্ক রাখব না, ভালো কাউকে চাই আমার। টিকল না প্রেমটা। সবশেষে একদিন হুট করে বিয়েও ঠিক হয়ে যায়। যোজনগন্ধার ক্ষেত্রেও তাই দেখতে পাই।

৩.

মানব মনে কখন প্রেম আসে তা মানুষ জানে না। আর জানে না বলেই শাশ্বত প্রেমের পসরা সাজিয়ে তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করে প্রেমের জন্য। কখন প্রেমের ফুল ফুটবে এবং সেই ফুলের সুবাসে সুবাসিত হবে মন। যুগ যুগ ধরে অপেক্ষার পর কাক্সিক্ষত প্রেমের স্বর্গ থেকে কেনো এক মানবীর মাধ্যমে ধরা দেয়। প্রেমের নানা কেলি-ছলা-কলা, মান-অভিমান সুখের স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু মানসী যদি দূরে চলে যায়। শাশ্বত প্রেম তখন আরও গভীর ও খাঁটি হয়। জগতে যা কিছু সুন্দর তা খুবই ক্ষণস্থায়ী। পৃথিবীতে যত বড় বড় প্রেম দেখা গেছে তাদের কারও মিলন হয়নি। বিরহ বড় প্রেমের পরিণতি। বিরহ ব্যথা শুধু খাঁটি প্রেমিককে ব্যথা দেয় না প্রেমকে আরও গভীর ও দৃঢ় করে। প্রেমকে গভীরতা দান করে। যে প্রেম একবার আসে তা কখনও যায় না—দিন দিন তা আরও গভীর হয়। এমন কি প্রেমিকা যদি দূরেও সরে যায়। তবু প্রেমের সেই জিয়ন কাঠির স্পর্শে প্রেম আরও উজ্জ্বলতা ধারণ করে। যা দূরের প্রেমিকা নাও জানতে পারে। এই অমোঘ সত্যটি আগের দিনে প্রেমে দেখা যেত। বিরহ বেদনা প্রেমকে খাঁটি করে। সেই বেদনার মধ্যেও প্রেমিক তার হারানো প্রিয়াকে খোঁজে। প্রিয়াকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়।  বুকে আশা রাখে তার প্রিয়া এই অন্ধকার ভেদ করে একদিন সোনালি সকালে প্রেমের ডালি সাজিয়ে আসবে। যদিও প্রেমিকাকে ছেড়ে অন্য কাউকে ঘরনি করতে হয়। তখন খুন করতে হয় প্রেমিক সত্তাকে। একদিকে প্রেমিক সত্তার মৃত্যুর বেদনা অপর দিকে নতুন করে সংসার করার জন্য বিয়ের উৎসব শুরু হয়। অথবা এ জগতে প্রেমকে সার্থক করতে না পারলেও পরকালের আশায় থাকত।

বর্তমানে এমন প্রেম বিরল। তাই তো যোজনগন্ধার বিয়ে হয়ে গেলে গল্পকথকের বান্ধবীরা তাকে নিয়ে মজা করে। তার আগের যুগে জন্ম হলে ভালো হতো। বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না দূরেও ঠেলে দেয়। বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রেম মানে শুধু সময় কাটানো আর শূন্যের কোটা পূরণ। এ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই তারা তাকে বারবার স্বাভাবিক হওয়ার জন্য বলে।

গল্পকথক ভোজন রসিক। বান্ধবীরা তাকে হৃদয় ভাঙার কষ্ট ভুলে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং খাওয়ার জন্য জোর দেয়। আগেকার যুগে প্রেমে ব্যর্থ হলে বন্ধু বান্ধবীরা সান্ত্বনা দিত। আর বর্তমানে তারা আরও সেগুলো নিয়ে মজা করে। হৃদয় ভাঙাটাকে তারা খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখে না।

মহাভারতের সত্যবতীকে যোজনগন্ধা বলা হতো। যোজন দূর থেকে তার গায়ের সুগন্ধ পাওয়া গেলেও বর্তমানে যোজনগন্ধার গায়ে পারফিউমের গন্ধ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। বর্তমানের যোজনগন্ধার কিছুটা বাতিকও রয়েছে। সবসময় হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যাগের মধ্যে রাখে।

সেলফি তোলা মানুষের এক ধরনের ম্যানিয়াতে পরিণত হয়েছে। ইদানীং সেলফি তোলার কিছুটা রং-ঢংও পাল্টেছে। সেলফি তোলার সময় ঠোঁট বেঁকিয়ে পাউট করে ছবি তোলাটাও বর্তমানে একটা ট্র্যাডিশন। যোজনগন্ধার বিয়েতে জিনা, শায়েরী আরা আহেলিও এ রকম পাউট করে ছবি তোলে। তাদের কথা হচ্ছে এটা স্মার্টফোন, স্মার্টকার্ড এবং স্মার্টটিভির যুগ। তাই বোকা নয় চালাক হতে হয়।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাস্ট চিল করে পথ চলাতে বর্তমান প্রজন্ম অভ্যস্ত। তারা যেকোনও দুঃখ-কষ্টকে খুব সহজে জয় করে হাসিমুখে ভুলে যেতে পারদর্শী। তারা কোনও কিছুকে স্থায়ীভাবে না নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে সদাপ্রস্তুত। কয়েকদিন আগে শায়েরির সম্পর্ক ভেঙে গেছে কিন্তু তারপরও সে হাসিখুশি। কিন্তু গল্পকথক শরৎচন্দ্রের দেবদাসের মতো আচরণ করছে। সে একটা ঘোরের মাঝে আছে এটা বান্ধবীরা বুঝে তাকে অনেক জ্ঞান দিলে সে তাদের উপর রাগ করে একুশটা কেশর কুলফি খেয়ে ফেলে। প্রিয়ার দেওয়া বেদনা প্রেমিকের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। তবুও তারা প্রেমিকার অমঙ্গল কামনা করতে পারে না বর্তমান যুগে কিছু হলেই তারা একে অপরকে অভিশাপ দিতেও কুণ্ঠিত বোধ করে না। সেদিন বাড়ি গিয়ে খুব খারাপ লাগায় গল্পকথক ঠাকুরের কাছে চেয়েছিল একদিন যেন জুজুও তার মতো চোখের পানি ফেলে।

৪.

জুজুর বাড়িতে গেলে তাকে দেখে তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়। সেই আগের মতো হাসি, চোখের তারার ঝলকানি এগুলো আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। কেমন যেন অন্যমনষ্ক হয়ে গেছে। যোজনগন্ধার সঙ্গে তার দুই বছরের সম্পর্ক ছিল। তাই সে বুঝতে পারে ছোটখাটো নয় অনেক বড় কোনো বিষয়ে যোজনগন্ধা অনেক বেশি চিন্তিত।

যোজনগন্ধার শ্বশুর বাড়ির সবাই অনেক বেশি নোংরা তারা শব্দ করে নাক ঝাড়ে, রেলিং, কার্নিশ, রাস্তা সব জায়গাতেই। এমনকি তারা নাক ঝেড়ে হাত পর্যন্ত ধোয় না। খাবার টেবিলের পাশেই ওয়াশ বেসিন। শ্বশুরের খাওয়া হয়ে গেলে তিনি ওখানে উঠে হাত ধুয়ে জোরে আওয়াজ করে কুলকুচি করে এবং নাক ঝেড়ে চলে যায়। তার স্বামীও বেসিনের সামনে হাত ধুতে গেলে হাত ধোয়ার পানি ছিটকে এসে তার গায়ে লাগে এমনকি মাছের কাঁটা অবধি এসে পড়ে তার গায়ে। এগুলো ভাবতেই তার নাড়িভুঁড়ি গুলিয়ে আসে। নতুন বৌ হওয়া সত্ত্বেও শাশুড়িকে এ কথা জানালে তাকে মানিয়ে নিতে বলে। যোজনগন্ধা বাতিকগ্রস্ত তাই সেগুলো সে কিছুতেই টলারেট করতে পারছে না।

তার কথাগুলো শুনে গল্পকথক মনে মনে ভীষণ খুশি হয়েছে। সে ভাবতে পারেনি তার দেওয়া অভিশাপ এত তাড়াতাড়ি কাজে লাগবে। সে তার দুঃখে দুঃখিত নয় বরং মনে মনে আনন্দিত হয় হয়। সেটা চেপে যোজনগন্ধাকে নাম পরিবর্তন করে মৎস্যগন্ধা রাখতে বলে। মহাভারতের সত্যবতীর আরেক নাম মৎস্যগন্ধা ছিল। এদিকে সে যোজনগন্ধাকে সান্ত্বনা না দিয়ে সে যে আজীবন একটা প্যারার মধ্যে পড়েছে আর সারাজীবন তাকে পারফিউম আর স্যানিটাইজার ব্যবহার করেই জীবন কাটাতে হবে এগুলো বলে সে যেন কাটা ঘায়ে আরেকটু নুনের ছিটা দিয়ে দিল।

বর্তমান প্রজন্ম অতীতের কথা ভেবে হতাশা বা কষ্টে জর্জরিত হয় না। তারা অতীতের গোলকধাঁধায় নিজেকে আটকে না রেখে আবার নতুন করে, নতুন রূপে নিজেকে আবিষ্কার করে। সম্পর্কের সমীকরণ ভেঙে গেলেও তারা ইতিবাচক ও সৃজনশীল ভাবনায় নিজেদের ব্যস্ত রাখে। নিজের অতীতকে ছাপিয়ে নতুন করে পৃথিবীর কাছে নিজের পরিচিতি তৈরি করতে চায়। তারা একজনকে আঁকড়ে ধরে আজীবন বেঁচে থাকাতে বিশ্বাসী নয়। জীবন থেকে কেউ চলে গেলে তার জন্য জীবনের সমস্ত কিছু জলাঞ্জলি দিতেও রাজি নয়। তারা শূন্যতা পছন্দ করে না বা শূন্যতায় শূন্য বা নিঃস্ব হতে চায় না। যোজনগন্ধা তাকে সব কিছু মানিয়ে নিয়ে ভালো একটা মেয়ে দেখে প্রেম করতে বললে সে শায়েরিকে নতুন করে, নতুন রূপে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। শায়েরিও তার বয় ফ্রেন্ড চলে গেলে সে যোজনগন্ধার প্রাক্তন প্রেমিকের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। এ কথা শুনে যোজনগন্ধার ভেতর ভেতরে খারাপ লাগলেও মুখে ভালো থাকার জন্য শুভ কামনা জানাই। কিন্তু তার কথাগুলো শুনতে অনেকটা অনুভূতি শূন্য উপলব্ধিহীন বুলির মতো শোনাচ্ছিল।

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যের ‘হৃদয় এখন’ গল্পের চরিত্র গুলোতে আধুনিক প্রেমমুক্তি আর চিত্তমুক্তির সুর ধ্বনিত হয়েছে। গল্পের চরিত্রগুলো বর্তমানের প্রেক্ষিতে নতুনরূপে আবর্তিত হয়েছে লেখকের স্বকীয় প্রতিভার স্পর্শে। গল্পটি ভীষণ যুগোপযোগী আর হাস্যরস সমৃদ্ধ সরস গল্প।

মৃগাঙ্ক ভট্টাচর্যের ‘হৃদয় এখন’ গল্পের নাম ঠিক তেমনই ব্যঞ্জনাধর্মী। নামের মধ্য দিয়েই বর্তমান প্রজন্মের হৃদয়ঘটিত অনুভূতির সঙ্গে আগের প্রজন্মের হৃদয়ঘটিত অনুভূতির পার্থক্য বিদ্যমান। সে দিক দিয়ে বলতে গেলে মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যের ‘হৃদয় এখন’ গল্পের নামকরণটি যথার্থ হয়েছে। সেইসাথে ভাষা সহজ-সরল, অনাড়ম্বর। শব্দ যোজনায় নিপুণ পরিবেশনে মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যের ‘হৃদয় এখন’ গল্পটি সমৃদ্ধ।

আহমেদ মাওলা

কান্নাতে যত সুখ

জীবনের সৌন্দর্য, পঙ্কিলতা ও আবিলতা আহমেদ মাওলা দেখেছেন তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ শক্তির মাধ্যমে। অজানা অনাবিষ্কৃত জীবনের জৈবিক প্রবৃত্তিকে তিনি তাঁর গল্পের মধ্যে রূপায়িত করে যা অনুভব করেছেন তার কিছু অংশ আমাদের চৈতন্যে তুলে ধরেছেন ‘কান্নাতে যত সুখ’ গল্পের আবিদ চরিত্রের মাধ্যমে। মূলত এই গল্পে তিনি বাস্তব সত্যের আলোকে মানব জীবনের জৈবিক চেতনার নিগূঢ়তম মূর্তিটি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।

আহমেদ মাওলার ‘কান্নাতে যত সুখ’ গল্পের প্রেক্ষাপট মূলত বারবণিতাদের অপ্রকাশিত নিগূঢ়তম জীবনের ঘটনা। গল্পের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই দেবরামপুর গ্রামের ওয়াহিদ মাস্টারের ছেলে আবিদ লিবিডো চেতনায় তাড়িত হয়ে বারবণিতাদের পল্লিতে যায়। সেখানে তার পরিতৃপ্ততাকে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে খালি পায়ে হাঁটার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শীতল হাওয়ায় শরীরে  যে আরাম বোধ হয় আবিদের ঠিক সেই রকমই অনুভূতি হচ্ছে। বর্তমান সভ্যতার অসামান্য বিকাশের মধ্যেও মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তি একটুও অবদমিত হয়নি। নারীসঙ্গ কামনা আবিদকে উন্মনা করে তুলে। নারীসঙ্গহীন নিরুৎসব জীবন তার আর ভালো লাগে না। বন্ধুদের মুখে সে অনেকবার বারবণিতাদের কথা শুনেছে। এর আগে কখনওই সে পতিতা পল্লিতে আসেনি। আজই প্রথম তাদের কাছে যাওয়ার সুযোগ হলো। বর্বর যুগের আদিম অন্ধকার এখনও প্রকৃতিগত ধারাবাহিকতায় মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। তখন মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সমাজ, সংসার, প্রতিপত্তি সবকিছু তুচ্ছ মনে হয় তখন। আবিদও শুধু জৈবিক তাড়নায় এই সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে পতিতাপল্লিতে যায়।

অতীত-বর্তমানের পতিতা ও পতিতাবৃত্তির ইতিহাস হাজার বছরের এক পুরাতন ব্যবসার নাম পতিতাবৃত্তি। এই যৌনকর্মীদের মধ্যে যাদের চেহারা সুরত এবং শরীর স্বাস্থ্য তুলনামূলক অন্যদের চেয়ে কিছুটা ভালো; তাদের খদ্দেরের অভাব এই যৌনপ্রণয় নিষিদ্ধ সমাজে খুব একটা বেশি পোহাতে হয় না। তারা খদ্দেরদের নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করার তাগিদে বিভিন্ন রকম আবেদনময়ী ভঙ্গিতে কাপড়-চোপড় পড়ে, মুখের মধ্যে নানা ধরনের সস্তা মেকআপ লাগায়। যৌন উস্কানীমূলক কথাবার্তা বলে, খদ্দেরদের প্যান্ট-শার্ট, লুঙ্গি টেনে ধরে। প্রথম আসা খদ্দেরদের অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের আবেগপ্রবণ কথাবার্তা বলে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসে। অনেক সময় কাতর স্বরে তাদের সস্তা রেট এবং আতিথেয়তার কথা ঘোষণা করতে দেখা যায়। তখন তাদের চোখে মুখে ফুটে থাকে এক ধরনের করুণ ছাপ। যৌনকর্মবৃত্তি এবং ভিক্ষাবৃত্তি যেন তাদের চোখেমুখে মিলেমিশে অবস্থান করতে থাকে। খদ্দেরটিকে তার নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন ধরনের আবেদনময়ী মুখভঙ্গি করে বা শারীরিক ভাষায় শুরু করে দেয় যৌন আহ্বান। গল্পে আবিদও যখন গলিতে প্রবেশ করে তখন তাকে কেউ শিস দিয়ে বা বিভিন্ন ধরনের আবেদনময়ী মুখভঙ্গি করে ও শারীরিক ভাষায় তাকে আহ্বান জানাই। কিন্তু আবিদ সেদিকে না তাকিয়ে তার মনের অদমিত আড়ষ্টতা, ভয়কে লুকিয়ে অভিজ্ঞদের মতো অঙ্গ-ভঙ্গি করে সামনের দিকে হেঁটে চলে। আবিদ এখানে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং অন্তর্দ্বন্দ্বে দ্বিধান্বিত।

২.

নিজস্ব পরিমণ্ডলে যমুনা আকর্ষণীয়। হৃদয়ে ভিখারিনী হলেও সে শক্তিরূপিণী এবং বিজয়িনী। দেহের রূপ-যৌবন, বাসনা কামনার নির্বন্ধন বুদ্ধির দীপ্তি ও ক্ষমতা তার পাথেয়। গলির মোড়ে তার সঙ্গে চোখাচোখি হওয়াতে আবিদেরও চোখ মুগ্ধতায় আটকে যায়। সে তার অভিজ্ঞ চোখ দিয়েই বুঝতে পারে আবিদ এখানে নতুন এসেছে। যমুনার উষ্ণ-কোমল হাত ধরেই সে অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়।

যমুনার চোখের মতো তার হাসিও মুগ্ধতা ছড়ায়। আবিদের মনে হয়েছে যমুনার শুধু চোখ নয় তার হাসিও অনেক বেশি আকর্ষণীয় এবং তার মধ্যে এক ধরনের মাদকতা রয়েছে। পোড়খাওয়া জীবনে দীর্ঘশ্বাসেই যমুনার বেদনা উচ্চকিত। ভালোবাসায় গলে যাওয়ার মত ধাতুতে নির্মিত। সে তার সমস্ত বেদনা চামড়ার নিচে জমা রেখে মধুর হাসি হেসেছে। যে হাসির এমন মাধুর্য কম নারীতেই মেলে।

পতিতালয়ে বসবাসকারী যৌনকর্মীরা পুরোপুরি পেশাদার। কারণ তাদের জীবন জীবিকা সম্পূর্ণভাবেই যৌনকর্মের উপর নির্ভর করে। তাদের সব দিক দিয়েই দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়, এতে খদ্দের বাড়ে। কোন খদ্দেরের কী কী লাগবে তা আগে থেকেই এনে রাখে। এমনকি তাদের খাওয়া-দাওয়ার দিকেও নজর রাখতে হয়। আবিদকে যমুনা খাবারের কথা বললে আবিদের মনে হয় যমুনার সঙ্গে তার বহু দিনের একটা মায়াবী সম্পর্ক রয়েছে। যমুনার সেবা-যত্ন আবিদকে বিস্মিত ও প্রশংসামুখর করেছে। যমুনা বিয়ে করা বউয়ের মতো তার খাওয়া-দাওয়ার খোঁজ নেয়। বউ যেখানে স্বামীর সঙ্গে ঝাঁঝাল কণ্ঠে কথা বলে সেখানে যমুনার সোহাগি আমন্ত্রণ আবিদকে ক্ষণিকের জন্য হলেও সুখের ছোঁয়া এনে দেয়। হয়তোবা লেখক তাঁর শৈল্পিক ভাবনা থেকে আবিদের অনুভূতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পতিতাকে স্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু একজন বোদ্ধা পাঠক হিসেবে আমি লেখকের এই ভাবনার সঙ্গে সহমত নই। মনে হয়েছে তিনি ঘরের স্ত্রীকে পতিতার সঙ্গে তুলনা করে স্ত্রী-সত্তা খর্ব করেছেন বা সে সম্পর্ককে অবমাননা করেছেন। পতিতারা টাকার বিনিময়ে তার কাস্টমারকে খুশি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তারা কাস্টমারের সঙ্গে যত আবেগী ও সোহাগপূর্ণ মায়াবী কণ্ঠে কথা বলবে ততই তাদের খদ্দের বাড়বে। এটা তাদের পেশা, পেশার একটা কৌশল মাত্র। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক মধুর এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। একজন পতিতা একরাতে একজন পুরুষ মানুষকে যা দেয় একজন নারী তার স্বামীকে শারীরিক-মানসিক সবদিক থেকে তার থেকে হাজারগুণ বেশি দেয়। যেখানে ভালোবাসা আছে সেখানে অধিকার, আবদার, মান, অভিমান, ঝগড়া, বিবাদ থাকবেই।

প্রকৃতি মানুষকে কয়েকটি সাধারণ জিনিস দিয়েছে যেমন ক্ষুধা, ঘুম, লোভ, দয়া, জৈবিক তাড়না ইত্যাদি। তার মধ্যে সবচেয়ে জোরালো জিনিস হচ্ছে ক্ষুধা ও জৈবিক তাড়না। আবিদের পেটের ক্ষুধা নিবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গেই জৈবিক ক্ষুধা জেগে ওঠে। অবরুদ্ধ জৈবিক ক্ষুধার উত্তেজনায় সে অসহিষ্ণু হয়ে যমুনার দিকে হাত বাড়ায়।

শরীরেও যে একটা নিজস্ব ভাষা আছে। কীভাবে শরীর শরীরকে জাগায় আবিদ তা যমুনার কাছ থেকে শেখে। জৈবিক তাড়না কীভাবে মানুষকে পশুতে নামিয়ে নিয়ে আসে এ বিষয়গুলো এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে এসেছে।

৩.

যমুনা তার আসল নাম নয়। আসল নাম কী তা সে ভুলে গেছে। শুধু এতটুকু মনে আছে পদ্মার চরে তার বাড়ি ছিল, জমি-বাড়ি সবকিছুই পদ্মার পানিতে তলিয়ে গেছে। মা-বাবার চেহারা মনে পড়ে না তার বন্যায় ভেসে গেছে মা-বাবা। একজন সাদাসিধে নারী যমুনার পতিতা হওয়ার পেছনেও রয়েছে এক দুর্বিষহ কাহিনি। আদিমতম কাল থেকেই মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে সংগ্রামরত। জীবনের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন বসবাস, নিরাপদ জীবন-যাপন, সভ্য জীবনের আশা, এগুলো কিছুই যমুনা তার জীবনে পায়নি।

কোনো মেয়েই পতিতা হয়ে জন্মায় না। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা, পক্ষপাতদুষ্ট সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব ইত্যাদি পরিস্থিতির স্বীকার হয়েই একটা মেয়ে বেছে নিতে বাধ্য হয় এই ঘৃণিত পতিতার জীবন। একটা মেয়ের পতিতা হয়ে ওঠার পেছনের কাহিনি যাই হোক এটা ঠিক যে কোন মেয়েই স্বেচ্ছায় পতিতার জীবন বেছে নেয় না। ১২-১৩ বছর বয়সে  যমুনাকে গ্রামের একজন ঢাকা শহরে কাজে দিয়ে গিয়েছিল। সে বাসায় কাজ করেছে চার-পাঁচ বছর। একটু বড় হলেই প্রথম তার সতীত্ব হরণ হয় সে বাড়ির মালিকের ছেলের হাতে। এ কথা বলেই সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। আবিদ যমুনাকে বাধা দিল না। কারণ এই কান্নার ভিতরও এক ধরনের সুখ আছে। কান্না করে হালকা হওয়ার বা কষ্ট কমানোর সুখ। কিন্তু প্রায় সব সময়ই যে বা যারা এই মেয়েটিকে অন্ধকার পতিতার জীবনে ঠেলে দিচ্ছে তারা রহস্যময়ভাবে থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

দুঃখ-বেদনা চিরকালই অন্যের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়। আবিদ যমুনার দুঃখে দুঃখী ও শোকাহত হয়। যমুনার দুঃখের কথা ফুরায় না। এক বাসা থেকে আরেক বাসা, এভাবে বাসার দারোয়ান, ড্রাইভার, বাসার কাজের ছেলের হাতে প্রতিনিয়ত সে তার সম্ভ্রম হারিয়েছে। যমুনার বুকে যেন তার পাহাড় সমান দুঃখ। শেষে যে বাসায় কাজ করত সে বাসার দারোয়ান তাকে বিয়ে করে। সংসার জীবনে শাশ্বত নারীর চাওয়া-পাওয়ায় যমুনা সমৃদ্ধ সুখী রমণী হয়ে উঠেছিল। দেহসৌন্দর্য, অর্থোপার্জন, নিরাপদ আশ্রয় যমুনাকে নিশ্চিত সুখ-আনন্দ নিরাপত্তা ও নির্ভরশীলতা এনে তাকে সুখী ও পরিতৃপ্ত করে তুলেছিল। দুই বছর সে দারোয়ানের সঙ্গে সংসার করে। সন্তানসম্ভবা অবস্থায় সিঁড়ি থেকে পড়ে তার সন্তান নষ্ট হয়ে গেলে দারোয়ান সোবহান তাকে বের করে দেয়। সে সমাজ পরিত্যক্তা, রক্ষা পাবার সকল অধিকার বঞ্চিতা। সম্পূর্ণ অসহায় একজন নারীর কোথাও যাওয়ার জায়গা না দেখে, কোনও উপায়ান্তর খুঁজে না পেয়ে এক রিকশাওয়ালার ঘরে গিয়ে ওঠে। ছয়-সাত মাস তার ঘরে ছিল। কিন্তু রোজ রাতেই তাকে কারও না কারও মনোরঞ্জন করতে হতো। একসময় সে রিকশাচালক বশিরের বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। রোজার ঈদের সময় গাউছিয়া মার্কেটে কাপড় কিনতে গিয়ে নিষিদ্ধ পাড়ার সর্দারনি মর্জিনার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সে তাকে কাজ দেবে বলে নিয়ে আসে। সে ভেবেছিল এইবার হয়তোবা সে তার জীবনকে আবার নতুনভাবে সাজাতে পারবে। কিন্তু সে জানত না তাকে আবার পতিতাবৃত্তি করেই খেতে হবে। সমাজের ভেতরে পতিতাদের যেমন কোনও ধরনের অবস্থান নেই তেমনি যৌনকর্মী বাদে তাদের আর কোনো পরিচয়ও থাকে না। এদের নিজস্বতা বলতেও কিছুই নেই। তাদের শরীরের মালিক ঐ সর্দারনি, সে তাদের শরীরকে খদ্দেরদের কাছে ভাড়া খাটায়। এখন সে প্রতি রাতে তার শরীর বেচে খায়। এ পথ হতে আর ফেরা যায় না! এভাবেই যমুনা ধীরে ধীরে যৌনকর্মীর খাতায় অনিচ্ছাতেই নিজের নাম লিখিয়ে ধীরে ধীরে পেশাদার যৌনকর্মী হয়ে সমাজ সংসার থেকে ধীরে চ্যুত হয়ে পড়ে। যমুনা চরিত্রটির মাঝে রক্ত মাংসের বাস্তব সত্তা বিদ্যমান। যমুনার চোখের জলের স্রোতে আবিদও যেন মরা লাশের মতো ভাসতে থাকে। এখানে যমুনা এবং আবিদ দুজনের মাঝেই চরম অস্তিত্ব সংকট দেখা যায়। যমুনার অন্ধকারময় জীবনের গল্প আমাদের বেদনায় মথিত করে। তার দীর্ঘশ্বাস আর কান্না আমাদেরও মর্মাহত করে। এখানেই চরিত্রটির বিশেষ সাফল্য।

এই গল্পের চরিত্রের কোনও পিছুটান নেই। গল্পের চরিত্র দুটোতে চরম অস্তিত্বের সংকট বিদ্যমান। লেখকের ঐকান্তিক চেতনার বৃন্তেই গল্পের জৈবনিক প্যাটার্ন বিধৃত। গল্পের মধ্যে ঘটনা, চরিত্রের টানাপোড়েন এবং অগ্রগতিতে কোথাও অস্বাভাবিকতা নেই। গল্পটিতে বাস্তবতা ও চারিত্রিক সক্রিয়তা বিদ্যমান। প্রতীকধর্মী ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ ভাষা ও ভঙ্গি অবলম্বন করে লেখক জীবনের এই মৌলিক সত্যকে তুলে ধরেছেন।

রাজকুমার শেখ

হাবু গান ও পিঠে একটি কালো দাগ

 লেখক রাজকুমার শেখ ‘হাবু গান ও পিঠে একটি কালো দাগ’ গল্পে হাবু গানের শিল্পীদের প্রতি গভীর সহানুভূতি পোষণ করেছেন। তাদের ব্যথা-বেদনা তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। তিনি দুঃখ, দারিদ্র্য ও ক্লিষ্টতার প্রতিচ্ছবি ‘হাবু গান ও পিঠে একটি কালো দাগ’ গল্পে তুলে ধরেছেন। লেখক গভীর মমত্বে ও আশ্চর্য দরদে তাদের জীবনের ছবি এঁকেছেন এ গল্পে।

এ দেশের পরতে পরতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হাজার রকমের লোকগান। তার মাঝে একটি হলো হাবু গান। অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এই গান বিভিন্ন নামে পরিচিত। অঞ্চলভেদে এটি ‘হাপু’, ‘হাবু’ অথবা ‘হাফু’ নামে পরিচিত। হাবু গানের লিরিকে গ্রামবাংলার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কাঠামোর প্রেক্ষাপট বা সমাজ জীবনের চিত্র পাওয়া যায় এসব গানের মাঝে। সাধারণভাবে হাবু গানকে দুঃখ-বেদনার ও হাহাকারের গান বলা হলেও গভীরভাবে শুনলে বোঝা যায় হাবু গানে যে মূল সুরটি ধ্বনিত হয় তা প্রতিবাদী সুর।

সাধারণত ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার প্রাচীন লোকগানগুলোর মধ্যে হাবু গান অন্যতম। যারা হাবু গেয়ে থাকেন তাদের পূর্ব পুরুষদের আদি বাসভূমি ছিল পশ্চিমবঙ্গের দামোদর ও অজয়সহ বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকায়। জমি, জঙ্গল ও জলাধারের অধিকার থেকে উৎখাত হওয়ার বেদনা থেকেই হাবু গানের সৃষ্টি বলে অনেকে মনে করেন। অর্থাৎ প্রাকৃতিক সম্পদচ্যূত মানুষ গান গেয়ে নিজেদের হাহাকার বা কষ্ট পূরণ করত।

‘হাবু গান ও পিঠে একটি কালো দাগ’ গল্পে রাজকুমার শেখ দারিদ্র্যের বীভৎস চিত্র তুলে ধরেছেন। দারিদ্র্য মানুষের জীবনে একটি বড় অভিশাপ। এটা ব্যক্তিজীবন বিকাশের পথে যেমন বাধা হয়ে দাঁড়ায় তেমনি জাতীয় সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দারিদ্র্যের দৃশ্যমান প্রতীক হচ্ছে অপুষ্টি, ভগ্নস্বাস্থ্য, জীর্ণ বাসস্থান, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা ও সর্বোপরি বেকারত্বে নিপতিত রুগ্ন-দুর্বল মানুষ ও ক্ষুধা। বহু সাহিত্যিকের লেখায় আমরা বিভিন্ন যুগের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য পীড়িত মানুষ সম্বন্ধে জানতে পারি।

২.

গল্পটির কাহিনি গড়ে উঠেছে জগি পাড়ায়। চরিত্র চিত্রিত হয়েছে এ পাড়ায় বসবাসকারী নিম্নশ্রেণির মানুষের। অভাব আর দৈন্যের পটভূমি একটি দরিদ্র পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পরিবারটিতে রয়েছে চারজন সদস্য। বুঝতে বাকি থাকে না যে তাদের দারিদ্র্য ও কঠোর শ্রম। এর কারণে রোগে-শোকে বিনা চিকিৎসায় পড়ে থাকে জগু। সে অসুস্থ, বিছানাগত। গল্পের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই জগুর মনস্তাত্ত্বিক পীড়নের চিত্র। বেশ কয়েক মাস ধরেই সে পেটের অসুখে বিছানাগত। বুকের কাছে অভাব ভাবটা চিনচিনে ধরায়। বাচ্চা দুটো যখন ক্ষুধার তাড়নায় কান্না করে তখন আর সে স্থির থাকতে পারে না। উঠে দাঁড়াতে চায় কিন্তু সে অপারগ। সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে চাওয়ায় তার পিতৃত্বের অস্তিত্ব এখানে প্রকট; মনস্তাত্ত্বিক পীড়নে মর্মাহত। সমস্ত সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সে। কিন্তু তার অসুস্থতার কারণে এখন সংসারের পুরো হাল ধরেছে তার স্ত্রী সাগু। সে পরের বাড়ি কাজ করে সেখান থেকে যা পায় তা দিয়ে কোনো রকমে তাদের সংসার চলে কিন্তু চিকিৎসা নয়। কষ্টে জগুর চোখ দিয়ে পানি পড়লে সাগু তা মুছে দিয়ে ঘর হাতড়ে যা পায় নিজে না খেয়ে তাই জগু এবং বাচ্চাদের খাইয়ে দিয়ে চলে যায়। পরিবারের প্রতি সাগুর দায়িত্ববোধ, ত্যাগ, মমতা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ প্রস্ফুটিত। কর্তামা যে খাবার দেন তাই দিয়ে কোনও রকমে দিন গুজরান হয় তাদের। জীবন মানেই যুদ্ধ। যন্ত্রণাময় এই জীবন সংসারে জীবিকার তাগিদে তারা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে।

নিজের অপারগতা জগুকে কুরে কুরে খায়। অন্তর্দ্বন্দ্বে প্রতিনিয়ত দগ্ধিভূত হয়। সাগু কাজে চলে গেলে জগু তার পঙ্গু হৃদয় নিয়ে অতীতের স্মৃতি হাতড়ে বাপ-দাদার পুরোনো লাঠির দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে এবং নস্টালজিক হয়ে যায়। ওই লাঠি দিয়েই জগুর বাবা হাবু গান গাইতো। মুখে শব্দ করাসহ পিঠে লাঠির আঘাত করে এই গান গাওয়ার রীতি। তারা শরীরের নানা জায়গায় আঘাত করে বিচিত্র শব্দ তুলে বা অঙ্গভঙ্গি করে গান পরিবেশন করতেন। গোটা গ্রাম ঘুরে যা আয় হতো তা দিয়েই তাদের সংসার চলত। কিন্তু রাত্রে পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলে তার মা সেঁক দিয়ে দিত। দিনে কখনও বাড়িতে থাকলে গোসল করার সময় তার বাবার পিঠে কালশিটে দাগ দেখে জগুর ভিতরটা কেমন আঁৎকে উঠত।

লেখক এই গল্পে দারিদ্র্যের প্রতিটি রেখাকে যেন কলমের ডগায় সুস্পষ্ট করে তুলেছেন। গল্পে দারিদ্র্যের ভয়াল রূপ পাঠকদের এতটুকু স্বস্তিতে থাকতে দেয় নি। যেন বাস্তবতার বাস্তব চেহারা নিয়ে সমূলে আঘাত করতে থাকে পাঠকের বিবেকে। মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। যেদিন জগুর বাবা গ্রামে যেতে পারত না সেদিন তাদের সংসারে অভাব-অনটন দেখা দিত। ক্ষুধা নিবারণের জন্য জগুর মাকে পাশের বাড়ি চাল ধার করতে যেতে দেখা যায়।

মানুষকে আনন্দ দিয়ে নিজের দুঃখকে আড়াল করে দুই পয়সা রোজগার করার জন্য হাবু গানের শিল্পীরা নিজেদের শরীরে লাঠির আঘাত করত এবং গান গাইত। এই লাঠির আঘাতে শরীর থেকে রক্ত না ঝরলেও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঠিকই হতো। জগুর মনে হতো বাবার শরীর থেকে ঘাম নয় যেন রক্ত ঝরছে। বাবার কষ্ট তাকে ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত করে দিত। জগু ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে পরিচিত।

দরিদ্র ব্যক্তি, পারিবারিক এবং জাতীয় জীবনে দুঃসহ অবস্থার সৃষ্টি করে। দারিদ্র্যের কারণে যে ক্ষুধাতুর মানুষ মৃত্যুপথের যাত্রী হয়-এ কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এই গল্পে আমরা দারিদ্র্যের দুঃসহতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারি। জগুর সন্তানদের কান্না তাকে কাতর করে। ওদের মুখে খাবার তুলে দিতে চায়। কিন্তু যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। প্রথম প্রথম ওষুধ খেয়ে সে সুস্থ হয়েছিল কিন্তু পয়সার অভাবে আর ওষুধ কিনে খেতে পারেনি। তারপর থেকেই সে বিছানাগত।

৩.

শুয়ে থাকতে থাকতে জগু নস্টালজিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুখস্মৃতিতেও ভাসতে থাকে। সে তার আনন্দময় দাম্পত্যে সুখের স্মৃতিচারণ করছে। মনের সুখটা জগু পেয়েছিল সাগুর ভালোবাসার স্পর্শে। রাতে শরীরের উষ্ণতা সারা দিনের ক্লান্তি দূর করে দিত। সারাদিন কাজ শেষে রাতে বাড়ি ফিরে তারা ভালোবাসার অতল গহিনে ডুব দিত। স্বামীর ভালোবাসায় সাগুরও নারীজীবন কানায় কানায় ভরে উঠত। পরস্পরের আদরে আর ভালোবাসায় তাদের দেহ মন ছেয়ে যেত। অসীম সিন্ধুতে বিন্দুর মতো মিশে যেত আর তৃষ্ণার্ত ক্ষুধিত হৃদয় প্রেমপূর্ণ হয়ে উঠত। বিশ্বগ্রাসী ভালোবাসায় সোহাগে-কোমলতায় সারা বিশ্বের সুখ অন্তরে সারারাত জুড়ে খেলা করত। প্রেমপূর্ণ ভালোবাসায় তাদের সকল আকাক্সক্ষা, চাওয়া-পাওয়া একাকার হয়ে মিশে যেত। এভাবেই তারা নিবিড় ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকত। পরম উষ্ণতায় একে অপরকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ রাখত। তাদের কাছে ভালোবাসা মানে এমনই ছিল। কিন্তু জগুর সুখের সংসারে শান্তি বেশিদিন রইল না। দারিদ্র্যের কশাঘাতে আনন্দের সানাই ধ্বনি মুহূর্তে বিরহে করুণ হয়ে ওঠে। অসুস্থ হয়ে সে বিছানাগত হয়ে পড়ে।

জগু অসুস্থ হওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব এসে সাগুর কাঁধে পড়ে। এ কারণে সে দিন রাত খাটে কিন্তু তাতে বোঝা হালকা হয় না উপরন্তু সাগুর ক্লান্তিও কমে না। সারাদিনের কাজ শেষ করে ছেলে দুটোকে খাইয়ে দিয়ে সে বিছানায় ঢলে পড়ে। ইদানীং সাগু মুখ ফুটে কিছু না বললেও জগু ঠিকই সাগুর কষ্ট অনুভব করতে পারে। সাগু যেন মস্ত একটা খাড়া পাহাড়ের গড়ানে খাদ বেয়ে চলেছে। মাথায় তার বিপুল বোঝা, একটু থামলেই বোঝা সমেত হুড়মুড় করে পড়বে কোনো অন্ধকার এক গর্তে। জগু চিন্তা করে সাগু না থাকলে তার কী হতো। মেহনতি সাগুর চরিত্রটি ‘হাবু গান ও পিঠে একটি কালো দাগ’ গল্পের অভিনব বাস্তব সমীক্ষার একটি সার্থক অবদান। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে, কল্পনার সূক্ষ্ম বর্ণজালে এবং বস্তুগ্রাহ্য চিত্রকল্প রচনায় সাগু চরিত্রটির গুরুত্ব অনেকখানি। তার বয়স কম কিন্তু সহানুভূতি ও দায়িত্বজ্ঞানে বিচক্ষণ।

জগু অসুস্থ হলেও ভবিষ্যৎ স্বপ্নে বিভোর থাকত। স্বপ্ন যেন কখনো থেমে থাকেনি। স্বপ্ন দেখেন সন্তানদের অদূর ভবিষ্যতের, স্বপ্ন দেখেন সন্তানদের লেখাপড়া করানোর। তার স্বপ্নই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং নতুন জীবনের বাঁচার আশা সঞ্চার করেছে। সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জগুর চোখ পানিতে ছল ছল করে উঠলেও এ কথাগুলো ভেবে সে মনে সুখ পায়।

মানুষের মন যখন প্রফুল্লতায় ভরে থাকে তখন আশপাশের সব কিছুই তার কাছে ভালো লাগে। অখাদ্যও তখন সুস্বাদু খাবারে পরিণত হয়। সুখ চিন্তায় বিভোর তাই তার কাছে নোনতা মুড়িটাও মিষ্টি লাগে। মনের ভেতর যেন স্বপ্নের ডালপালা শাখা-প্রশাখা মেলে। তার জীবনে এবার নতুন দিন আসবেই।

দারিদ্র্য কারও কাম্য নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বিশ্বের অসংখ্য মানুষকে নানাবিধ কারণে বিশেষ করে শোষণ-বঞ্চনার দরুণ দারিদ্র্যের শিকার হতে হয়। বিশ্বের সব দেশেই যেমন অসংখ্য বিত্তশালী মানুষ রয়েছে, তেমনি রয়েছে অগণিত দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ। তারা বেঁচে থাকার উপকরণ সংগ্রহ করার এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে পারে না। সে কারণেই তাদের অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটত। গল্পে তেমনই দারিদ্র্যের চিত্র সুস্পষ্ট।

সে কখনও কোনোদিন পেট ভরে ভাত পাইনি। দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের জন্য হাহাকারের চিত্র দেখতে পাই। ক্ষুধার জন্য ছটফট করত। বাবার বাজারের ব্যাগে স্বপ্ন জমা রাখত। বাবার পিঠে ক্ষতের কালো চিহ্ন থাকত। যত বেশি দাগ তত বেশি টাকা। ওদের দুঃখগুলো ভাগ করে নেওয়ার কোনও মানুষ নেই। হয়তোবা এভাবেই তাদের জীবনের ইতিহাস এক সময় বিলীন হয়ে যাবে। কেউ জানবে না যে এমন মানুষ ছিল যারা কখনও দুবেলা পেট ভরে খেতে পায়নি। এসব মানুষ না খেয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে একদিন এদের ব্যথার কথা কেউ জানবে না, কেউ শুনবে না।

৪.

বাজিকর, মাল, বাইতি, কাকমারা, বেদে, পটুয়া সম্প্রদায়ভুক্তরা হাবু গান গাইতেন। যা এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদের মানুষগুলোর মাঝেও এখন এসেছে রুচির বিবর্তন। ‘বারো মাসে তের পার্বণ’ উপলক্ষ্যে হিন্দু-মুসলমান সবার ঘরেই বা মাঠে-ঘাটে সমাজবদ্ধ হয়ে একসময় যে উৎসব আয়োজন লেগে থাকত তা এখন ঠাঁই নিয়েছে মুঠোফোনের স্ক্রিনে। সময় সুযোগ মতো তারা এখন সেখানেই দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিচ্ছেন। জগু ভাবে এক সময় অনেক কিছুর মতো হাবু গানও হয়তো হারিয়ে যাবে চিরতরে।

স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীরও কাজ না করে উপায় নেই। জগুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার সহযোদ্ধা হয়ে পাশে ছিলেন সাগু। কর্তামার ছেলে এসেছে বলে সাগু সকাল সকাল কাজে বের হয়। সাগু নীতি সচেতন কিন্তু রক্ষণশীল। তার হৃদয় স্নেহে-উদারতায়, অনিন্দ্যসুন্দর মুখ কান্তির সার্থক প্রতিচ্ছায়ায় সতত উদ্ভাসিত। জগুর কষ্ট সে আর চোখে দেখতে পারে না, তার খুব কষ্ট হয়। দারিদ্র্যপীড়িতদের প্রতি সরকারও যেন মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। সাহায্যের হাত প্রসারিত করতেও সরকার যেন অনিচ্ছুক বা অনীহ।

চারিদিকে মানুষের লোভাতুর দৃষ্টিতে পদস্খলনের দুর্গম গহ্বরে প্রতি মুহূর্তেই পতনের সম্ভাবনা থেকে সে নিজেকে অতি সন্তর্পণে,  কৌশলে বাঁচিয়ে রেখেছে। কর্তামার ছেলের চোখে এক ধরনের আকর্ষণ আছে। এতে সে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং সে দুর্বলতা তার হৃদয়বৃত্তিকে হরণ করতে পারে। সাগুর মনে পাপ বোধ জাগে। তাই সে কর্তামার ছেলের চোখের সামনে থেকে সরে যায়। যতটা পারা যায় নিজেকে আড়ালে রাখে। এখানে সাগুর চরিত্রে পতিপরায়ণ ও সতী নারীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। কখনও ইন্দ্রিয়াসক্ত কর্তামার ছেলের বাসনার ইঙ্গিতে, কখনও কামলোলুপ অভ্যাগত অতিথি প্রতিবেশীর ভোগাকাক্সক্ষার হাতছানিতে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিষ্পেষিত। এখন সে পরিবারের এক মাত্র ব্যক্তি যে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব হাসিমুখে পালন করে যাচ্ছে।

কর্তামা তাকে যখন যা পারে দিয়ে সহযোগিতা করে। মায়ের আদর দিয়ে তাকে খাওয়ায়। কর্তামাকে ঘিরেই এখন সাগুর স্বপ্ন। কিন্তু কর্তামার হঠাৎ অসুস্থতার কথা শুনে সাগুর বুকে পুঞ্জীভূত বেদনার গিঁট পড়েছে। যা খুলবার নয়। দুঃখ যেন কিছুতেই তাদের পিছু ছাড়ছে না।

৫.

দারিদ্র্য নির্মম-নিষ্ঠুর। জীবনের বহুল সম্ভাবনা সে নষ্ট করে দেয়। এর অভিশাপে নামে বন্যা, আসে প্লাবন, মহামারি, মন্বন্তর, ধ্বংস ও মৃত্যু। লেখক দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবন সত্যের নগ্নরূপ দেখেছেন অন্তরের অন্তর্দৃষ্টি ভেদ করে এবং সর্বজনীন অভিজ্ঞতা আহরণ করেছেন এর বাস্তবতা থেকে।

বাচ্চাদের কান্না সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত পূর্বপুরুষের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল লাঠিটা নিয়ে জগু বেরিয়ে পড়ে। সাগুর নিষেধ সত্ত্বেও সে বের হয়ে যায় পাগলের মতো মানুষজনকে ডাকতে থাকে। আর হারিয়ে যাওয়া হাবু গান গাইতে থাকে। একসময় অনেক মানুষ জড়ো হয়ে চারিদিকে তাকে ঘিরে ধরে। জগু গান শুরু করে মুখে শব্দ করে আর পিঠে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। কেউ কেউ কয়েন ছুড়ে মারে আর হাততালি দেয়। জগুর দুর্বল পিঠে দাগ পড়তে থাকে। একসময় সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। জমায়েত মানুষ তখনও হাততালি দেয়। আর তার ওপর কয়েন আছড়ে পড়ে। যেন মনে হচ্ছে ঈশ্বর আকাশ থেকে অন্ন দানা ফেলছে। এই কথাটির মধ্য দিয়ে লেখক পক্ষপাত দৃষ্ট সৃষ্টিকর্তার প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন।

জগু অভাব-অনটনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে জগু আর সুস্থ হতে পারেনি। মুক্তি পায় সে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। অভাব ও ক্ষুধার জ্বালায় বিনা চিকিৎসায় সে মৃত্যুবরণ করে। গল্পের মৌল উপজীব্য বিষয় দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, আর ক্ষুধার কারণেই মৃত্যু।

এ গল্পে হাবু গানের শিল্পীদের অভাবগ্রস্ত জীবনের পরিচয় রয়েছে। গল্পের বিষয় চেতনা জীবনবোধের ভিন্ন সুরে আমাদের ভাবায়। সমকাল চেতনায় জনজীবনে অনিশ্চয়তা ও নৈরাশ্যবোধ তীব্রতর হয়। অর্থনৈতিক বিপর্যয় চরমে রূপ নেয়, এরই প্রেক্ষাপটে রচিত হয় এ গল্পটি। এ গল্পের কাহিনিতে দারিদ্র্য, অভাব ক্ষুধা আর তারই কারণে মৃত্যুর অনিবার্যতা প্রকটিত হয়েছে। তাদের আশা-আকাক্সক্ষা, নৈরাশ্য ও বেদনার চিত্র লেখক নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন এ গল্পে।  পেটের ক্ষুধা মানুষকে কীভাবে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় তা এ গল্পের এক বিশেষ দিক। চিরবঞ্চিত নিচু পর্যায়ের দরিদ্র মানুষ যাদের ভাগ্যে শোষণ-বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। সে মানুষগুলোর জীবনপ্রবাহ লেখকের এ গল্পের বিশেষ লক্ষ্য ও বিষয়। সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে তারা যেন এগিয়ে চলে এটাই কাম্য।

‘হাবু গান ও পিঠে একটি কালো দাগ’ গল্পটি পড়ে জগুর অস্তিত্বের সংকট, মনস্তাত্ত্বিক পীড়ন, পূর্বপুরুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামী জীবন, স্বামী এবং পিতা হিসেবে অপারগতা-ব্যর্থতার চিত্র, অভাবে থাকলেও স্বামী-স্ত্রীর প্রেম এবং ভালোবাসার সম্পর্ক, নারীর একা পথ চলায় হায়েনাদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে নিজেকে প্রতিনিয়ত রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা, দারিদ্র্যপীড়িত জীবন এবং শেষ পর্যন্ত অভাবের তাড়নায় মৃত্যু; একজন বোদ্ধা পাঠক হিসেবে এই বিষয়গুলোই দেখতে পাই।

সাহিত্যের নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বাস্তব পৃথিবীতে প্রত্যেকটি বস্তুর নাম রয়েছে এবং এগুলো নির্দিষ্ট বস্তুসমূহের সার্বিক পরিচায়ক। সাহিত্যের বিষয় বাস্তবতা থেকে আহৃত হয়। একটি সুন্দর ও যোগ্য নাম একটি বস্তু বা কর্মকে মহীয়ান করে তুলতে পারে। অর্থবহ করে তুলতে পারে। তাই সাহিত্যের নামকরণের ক্ষেত্রে খুবই যত্নশীল হতে হয়। যাতে নামটি হয়ে ওঠে রচনার প্রতিনিধি যার মধ্য দিয়ে পাঠক রচনা-পাঠের স্পৃহা লাভ করবে। বলা চলে শিরোনাম হচ্ছে সাহিত্য রচনার প্রবেশদ্বার। তা শিল্পসত্তার নৈপুণ্যের পরিচায়ক। রাজ কুমার শেখের ‘হাবু গান ও পিঠে একটি কালো দাগ’ গল্পটির নামকরণটি সে বিবেচনায় আমার কাছে যথার্থ মনে হয়েছে।

আফসানা বেগম

ঊনমানুষ

‘ঊনমানুষ’ গল্পটি রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের সংজ্ঞানুযায়ী নিতান্ত সহজ সরল নয়। দুঃখ, কষ্ট, আর্তচিৎকার, অস্তিত্বের সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এই সবকিছুর বহিঃপ্রকাশ খুবই তীব্র। সেই সঙ্গে ঘটে গল্পের বেদনাদায়ক পরিসমাপ্তি।

মহাকালের স্রোতে বিস্তীর্ণ পরিসরে ব্যাপক জীবনের প্রবাহে সম্মিলিত ধারায় আগামীর পথ ধাবমান। তারই ফাঁকে, বাঁকে বাঁকে জীবনের অংশ-ভগ্নাংশ, ক্ষুদ্রাংশ কিংবা অখণ্ড জীবন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ইচ্ছায় অথবা অবহেলায়।- আর সেসবের ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো নিয়েই নির্মিত হয় গল্প।’

লেখক ‘ঊনমানুষ’ গল্পে বাস্তব সত্যের আলোকে মানবজীবনের জৈবিক চেতনার নিগূঢ়তম মূর্তিটি প্রত্যক্ষগোচর করেছেন দক্ষ শিল্পীর সহজ নৈপুণ্যে। মানুষের রক্তের মধ্যে যে আদিম প্রাগৈতিহাসিকতা লুকায়িত তার অনুপুঙ্খ প্রকাশ ঘটেছে গল্পটিতে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঊর্মি। লেখক নিস্পৃহ দৃষ্টিতে আবেগময় ভাষায় এই চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। যা মানবসভ্যতার ইতিহাসের চেতনার সঙ্গে অপরিচিত নয়। মানবসভ্যতার বিকাশ ও বিবর্তন বিবেকের অনুশীলনে উজ্জ্বল। কিন্তু এ গল্পে পুরুষের চরিত্রের কদর্যতা ও তার স্বভাবের নীচতা মানুষের বিবেকের ইতিহাসের অন্তর্গত নয়। তা কোনও এক আদিম অন্ধকারের প্রবৃত্তির শেকলে বাঁধা।

‘ঊনমানুষ’-এর অর্থ ‘অসম্পূর্ণ বা দুর্বল মানুষ’। পৃথিবীতে কোনো মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; হওয়া সম্ভবও নয়। কোথাও না-কোথাও, কোনো না কোনো জায়গায় সে কমজোর। এটাই শাশ্বত। আর এই বাস্তবতাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে আফসানা বেগমের ‘ঊনমানুষ’ গল্পের প্রেক্ষাপট। গল্পের চরিত্রগুলো কোথায় যেন সীমান্তের কাছাকাছি গিয়েও স্পর্শ করতে পারে না সীমান্তরেখা। ঠিক যেন ঊনআশি, ঊনচল্লিশ, ঊননব্বই ঊনত্রিশের মতো। নামের শেষে পূর্ণ সংখ্যার উল্লেখ থাকলেও সেই সংখ্যার সমান নয়; একটু কম হয়ে থাকা। তবে গল্পের কেবল চরিত্রের বিশ্লেষণই নয়; সেইসঙ্গে আছে সমাজবাস্তবতা। আছে ব্যক্তি মানুষের ভেতরকার ষড়রিপুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া; প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথা। ধরা-অধরা আর স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ যেন জীবনের পথে হাত ধরাধরি করে হাঁটে এইসব ঊনমানুষেরা। গল্পটি নিরীক্ষাধর্মী ও গতানুগতিকের বাইরে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা। যেন আমাদের আশেপাশের চেনা-জানা মানুষেরই আখ্যান।

২.

গল্পের শুরুতে আমরা দেখতে পাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এমন এক মেয়েকে যার নিজের নামই মনে ছিল না। একটা ডায়েরি পেয়ে তার উপর নাম লেখা দেখে সে বুঝেছে তার নাম কি। কতটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত ও হৃদয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় রক্তক্ষরণ হলে সে নিজের নাম পর্যন্ত ভুলে যায় সেটাই ফুটে উঠেছে।

অনেক কষ্টে সে মনে করতে পারে তার নাম ঊর্মি। মানে ঢেউ বা তরঙ্গ। তার জীবনে এমন অনেক ছোট বড় ঢেউ এসেছে। প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তার হৃদয়। নিজের নামের শব্দের মধ্য দিয়ে সে ঊর্মির ‘ঊ’ থেকে ঊরু শব্দটার দিকে ধাবিত হয়। এর কারণ তার হৃদয়ের যে গভীর রক্তক্ষরণ তা এই ঊরুকে কেন্দ্র করেই। ঊরুর দাগটা যেন দিনে দিনে আরও চওড়া হচ্ছে। তার মনের গহিনে ক্ষতরা আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়। এসব কথা মনে হতেই তা ভুলতে সে নানা ধরনের অসম্পূর্ণ সংখ্যা গুনতে শুরু করে।

ঊর্মির মনের অবস্থা দেখে তার ছোট বোন তরী তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইলে সে কিছুতেই রাজি হয় না। ডাক্তারকে তার মনের গভীর ক্ষতের কথা সে বলতে চায় না। বলে কী লাভ। এমন ঘটনা কারও না কারও সঙ্গে প্রতিনিয়ত ঘটছে। সমস্ত নারীর অবমাননার কষ্ট একই।

তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার অনেক কিছু তরীকে বললেও সব কিছু বলে না। যদি সে ভয় পায় তাই। যেহেতু  নির্মম-নিষ্ঠুর ভয়ংকর এ পৃথিবীতে তরীকে বেড়ে উঠতে হবে। সে তাকে সবসময় এভাবেই আগলে রাখতে চায়। সে চায়নি তার মতোই তরীর জীবনটা নষ্ট হয়ে বা বিভীষিকাময় হয়ে যাক। সে অন্যমনস্ক হলেই অসম্পূর্ণ সংখ্যাগুলো বলতে থাকে। তার নিজেকেও সেই অসম্পূর্ণ সংখ্যার মতোই অসম্পূর্ণ বা অপাঙ্ক্তেয় মনে হয়।

তার খুব ইচ্ছে করে মনের গহিনে লুকায়িত গভীর ক্ষতের কথা কাউকে বলতে। সে অবচেতনভাবেই নিজের ভেতরে কয়েকটি চরিত্রের সৃষ্টি করে। তাদের সঙ্গেই সে তার সমস্ত কথা শেয়ার করে। একটি মেয়ের জীবনে ধর্ষণ শুধুই একটা শারীরিক আঘাত নয়। এটা এক মনোদৈহিক সন্ত্রাস যা তার মনে চরম হতাশা এবং বিভীষিকার জন্ম দেয়। ফলে শারীরিক এ সন্ত্রাসের পরে স্বল্পমেয়াদে বা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। মেডিকেল পরিভাষায় একে বলে ‘রেপ ট্রমা সিনড্রোম।’ ট্রিটমেন্ট করলে ধীরে ধীরে লক্ষণগুলো কমে আসতে থাকে এবং ধর্ষিতা আবার মোটামুটিভাবে তার স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারে। আর ঠিকমতো ট্রিটমেন্ট না করলে তা স্থায়ী মানসিক বিকৃতির কারণ হতে পারে। গল্পের ঊর্মিও সেই ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই নিজের অবচেতনে মনের মাঝে নিজের পছন্দসই কিছু কল্পিত চরিত্র স্থাপন করে তাদের সঙ্গে মনের সমস্ত কথা বলে সে হালকা হয়। তার ভেতরকার চরিত্র দুটোর নাম পপি এবং টুম্পা।

প্রত্যেক মানুষের অবচেতন মনের মাঝে দুটি সত্তা বিরাজমান। একটি কোমল বা ভীতু সত্তা, আরেকটি রুদ্র বা প্রতিবাদী সত্তা। এখানে পপি হচ্ছে তার ভেতরের ভীতু সত্তা এবং টুম্পা হচ্ছে প্রতিবাদী সত্তা। পপি নাম দেওয়ার কারণ ফুলের মতো কোমলতা বোঝাতে। সে একটা সময় ফুল ছিল। যে ফুল ঝড়ের কবলে পড়ার আগে ঝলমল করত। কিন্তু তার জীবনে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটায় সেই অযাচিত ফুল তার উজ্জ্বলতা হারিয়ে অবশেষে মলিন বেশে ঝরে গেছে।

৩.

অবচেতন মনের পপি চরিত্রটি তার মনের গভীর ক্ষতের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার মা এবং সে অনেক সরল প্রকৃতির ছিল। একবার তাদের বাসায় শরিফুল নামে তার বাবার এক বন্ধু বেড়াতে এসে দুই মাস ছিলেন। অনেকদিন পর ছোটবেলার বন্ধুকে কাছে পেয়ে সারাদিন তাদের বাসায় গল্পগুজব আর আড্ডায় এক আনন্দ মুখরিত পরিবেশ বিরাজ করত।

তার দশ বছর পরে ছোট বোন তরী হওয়ায় সে সময় তার মায়ের ব্যস্ততা ছিল প্রচুর। শরিফুল চাচা তার ঘরে ঘুমাত। আড্ডা চলাকালীন সে তার নিজের রুমে বসে পড়ত। মাঝে মাঝে শরিফুল চাচা তার রুমে নানা অজুহাতে ঢুকে তার স্পর্শকাতর জায়গাই হাত দিয়ে চলে যেত। সে বুঝে উঠতে পারত না তার সঙ্গে কি হচ্ছে। তবে সে ভয়ে কুঁকড়ে যেত। মাকে বলতে পারেনি যদি বিশ্বাস না করে এই দোটানায় সে কথা অনেকবার বলতে গিয়েও সে তার মাকে বলতে পারেনি।

বয়স কম থাকায় অনেক সময় সে তার স্বপ্ন আর বাস্তবতাকে মেলাতে পারত না। এ কারণে কখনও স্বপ্নের কথা কখনও বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে মা তার কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারত না। কিছু বললেও বিশ্বাস করত না। তবে সে তরীকে বলেছিল কথাগুলো। যেন সে আগে থেকেই সতর্ক থাকতে পারে। একদিন তরীর জ্বর হলে মা-বাবা তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যায়। সে সুযোগে শরিফুল নারীসঙ্গ লিপ্সায় যৌন জৈবিক ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করার অদম্য কামনায় পপিকে আক্রমণ করে। দুর্দমনীয় শক্তি প্রদর্শন করে প্রমাণ করতে চেয়েছে যোগ্যতমের বেঁচে থাকার জন্যই এ পৃথিবী। কাম লিপ্সাকে চরিতার্থ করতে গিয়ে মানুষ অসভ্যতম জীবনের চর্চা আজও করে থাকে। তবুও এই প্রাগৈতিহাসিক চেতনা। লেখক এই চেতনার প্রকাশই করেছেন চরিত্র-চিত্রণ ঘটনা বিন্যাস ও পরিবেশনের মাধ্যমে। যে বয়সে পপির শিক্ষা-দীক্ষা এবং হাসি-উচ্ছলতায় চেনাজানা মানুষদের সঙ্গে সময় পার করার কথা; জীবন সম্পর্কে মাত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের মুখে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে নিজেকে উপযুক্ত করে তোলার প্রচেষ্টায় সময় অতিবাহিত করার কথা; সে বয়সেই সে তার বাবার বন্ধুর দ্বারা এমন একটি দৈহিক আক্রমণের শিকার হয়েছে। বাবার বন্ধু হওয়াতে সে না পারে কাউকে কিছু বলতে; না পারে মুখ বুজে তা সহ্য করতে। তারপরও সে তার মা ফিরে এলে তাকে রক্তমাখা প্যান্ট দেখালে মা মানসম্মান, সমাজ এবং লোকচক্ষুর ভয়ে তাকে চুপ করে থাকতে বলেন। এমনকি তার ঊরুতে ক্ষত দেখেও কিছু বলেনি। ধর্ষিতার কাছের মানুষদের উচিৎ এমন এক মানসিক অস্থিরতা এবং ভেঙে পড়ার সময়ে তাকে সর্বোতভাবে সহায়তা করা, তার মনোবল ধরে রাখতে সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজন হলে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। কোনো অবস্থাতেই তাকে দায়ী বা অবহেলা করে তার মনোযাতনা বাড়ানো উচিত নয়। সে কী চাই তা বুঝতে হবে। তাকে বিশ্বাস করতে হবে। সর্বোপরি তাকে একাকী করে দিয়ে মানসিক পীড়া দেওয়া উচিত নয়। যেটা পপির মা করেছে।  সেক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিকে পরিবারে আর ঢুকতে না দেওয়া এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে কাল বিলম্ব না করা; তা ঐ ব্যক্তি পরিবারের কাছে যতই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে থাকুন না কেন। কঠোর হওয়ার কিন্তু এখানে বিকল্প নেই। সেদিন মায়ের নির্লিপ্ততা তাকে আরও বেশি ক্ষতবিক্ষত, মর্মাহত করে এবং মায়ের ওপর প্রচণ্ড অভিমান জন্মায়।

যে কোনো অপরাধের প্রতিবাদ ও প্রতিকার হওয়া জরুরি। অন্যায়ের প্রতিকার না পেলে মানুষের মনে যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তা সারাজীবন তাকে কষ্ট দেয় যার যন্ত্রণা শুধু সেই জানে। অন্যায়ের প্রতিকার না পেলে বা প্রতিবাদ করতে না পারলে তা মানুষের মনের ওপরে চাপ ফেলে, মানুষ নিজেকে অপমানিত বোধ করে, ওই কষ্টকর বা অসম্মানজনক অবস্থার কথা ভুলতে পারে না। ফলে স্বাভাবিক ও আনন্দময় জীবন ব্যাহত হয়। নিকটজনদের তার প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার করতে না পারার অপরাধে কখনও ক্ষমা করতে পারে না। আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক শক্তি, ক্ষমতা বা সৃজনশীলতা, কাজ করার স্পৃহা, জীবনে কিছু করার বা হওয়ার স্বপ্ন, স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার আনন্দ এগুলো চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। কেউ কেউ অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। কেউ না মরে জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকে। গল্পের ঊর্মিও জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে ছিল। সে কি করবে তখন আর বুঝতে পারে না। অস্তিত্বের সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে সে জর্জরিত হতে থাকে। আর নিজেকে স্বভাবিক বলে তার মনে হয় না। এক সময় কাঁদতে কাঁদতে পপি খেয়াল করে সে টুম্পা হয়ে গেছে। সব কিছু মানিয়ে নিতে শিখেছে। সে এখন আর আগের মতো কাঁদে না, সে সবকিছু ভুলে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।

৪.

তার কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগত না। সব সময় সে নিজের মধ্যেই থাকত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষত একসময় শুকিয়ে যায়। কষ্টকে ধামাচাপা দিতে শিখে যায়। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে টুম্পা তার ভেতরে পপির লাশ বয়ে বেড়াত আর এক সময় লাশের ভার বহন করেই সে তরীকে ফেলে পড়াশোনার জন্য অন্য শহরে চলে যায়।

মনের ভিতরে জমানো অভিমান এবং ক্ষোভ থেকেই সে তার মায়ের সঙ্গে কোনো রকম কথা বলে না। এমনকি পরিবারের সাথেও যোগাযোগ করে না। শুধু টাকার প্রয়োজন হলে সে কল দিত। একবার ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে দেখে তাদের বাসায় শরিফুল চাচা এসেছেন। তার কাছে ঘেঁষতেই তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। শরিফুল তার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি পপি মরে গিয়ে টুম্পার জন্ম হয়েছে। শরিফুলের হাত থেকে তরীকে বাঁচাতে সে বাবা-মা কাউকে কিছু না বলে তাকে নিজের কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু আজ তরীর রক্তাক্ত দেহ তাকেও যেন কুরে কুরে খাচ্ছে। ঊর্মি এবং তার ভেতরের পপি, টুম্পার কান্না সে যেন একাই কাঁদছে।

তারা দুই বোন একটা ছোট বাসাতে নিজেদের মত সংসার পেতে ছিল। একদিন টুম্পা অফিস থেকে ঘরে ফিরে তরীর লাশ দেখতে পায়। টুম্পার কথা অনুযায়ী তরী ভালোভাবে না দেখে এবং পরিচিত ছাড়া দরজা খোলে না। তরী তাই করেছিল। কিন্তু তার অবুঝ মনও জানে এই পৃথিবীতে অধিকাংশ ধর্ষণই হয় কাছের মানুষ দ্বারা। কিন্তু এই পরিচিত মানুষটি এমনই একজন যার নাম বলে কষ্ট দিতে চায় না। হয়তো তরীর খবর পত্রিকায় বের হবে কিন্তু তার বোনের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের খবর কেউ দেখতে পাবে না। তরী এক সময় চাইত ঊর্মি প্রেম করে সে তার মনের সব কষ্ট ভুলে যাক। তরী তার জীবনের প্রাণ ভোমরা, সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

রাশেদ একসময় তাদের বাসায় আসা যাওয়া শুরু করলে টুম্পা অনেক দিন ভেতরের পপির সঙ্গে কথা বলত না। রাশেদকে ভালোবেসে ভুলে গিয়েছিল। টুম্পা একদিন রাশেদকে তরীর কাধে হাত দিতে দেখে। কিন্তু সে রাশেদকে কিছু বলেনি। সে দিন হয়তো তাকে হারানোর ভয়ে এমন করেছে। ভালোবাসা এবং অস্তিত্ব-সঙ্কটের কারণে মায়ের মতন সেও একই কাজ করেছে। প্রতিবাদ না করায় এ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। মাকে বিশ্বাস না করলেও রাশেদকে ঠিকই বিশ্বাস করেছিল।

ধর্ষণের পর যাদের মেরে ফেলা হয়, তারা আসলেই বেঁচে যান। কিন্তু যারা ধর্ষিত হওয়ার পর বেঁচে যায়, তারা জীবনভর প্রতিনিয়ত মরেন। সড়ক দুর্ঘটনায় একটা পা হারিয়ে গেলেও মানুষ সে কষ্ট ভুলে যেতে পারে। কিন্তু ধর্ষণের গ্লানি, বেদনা তাকে বয়ে বেড়াতে হয় জীবনভর। ধর্ষণে বেঁচে যাওয়ার পর তাকে প্রতিদিন মানসিকভাবে ধর্ষিত হতে হয়। সেদিক বিবেচনা করলে বলতে হয় তরীও মারা গিয়ে বেঁচে গেছে। না হলে তার অবস্থাও আজকের ঊর্মির মতো হতো।

৫.

তরী মারা যাওয়ার পর রাশেদ ফোন ধরে না। ঊর্মি রাশেদকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য মনের মাঝে একের পর এক যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। টুম্পার প্রতিবাদী সত্তা পপির কাছে হেরে গেছে। তীব্র আর্তনাদে ভেঙে পড়ে সে। তীব্র আঘাত আর অন্তক্ষরা ছিল সেই আর্তনাদে। সমাজের পদে-পদে একজন মেয়ের সংগ্রাম করে এমন বৈরিতার সমাজে টিকে থাকার অদম্য গল্প ‘ঊনমানুষ’। এই গল্পটি প্রতিটি নারীর অব্যক্ত বোবাকান্নার সেলুলয়েড যন্ত্রণা এবং হাহাকারের প্রতিধ্বনি। এদিকে রাশেদের কাছে পুলিশ ফোন করলে রাশেদ তাদের সঙ্গে পরিচয়ের কথা অস্বীকার করে।

জীবনের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন বসবাস, নিরাপদ জীবন যাপন, জীবনের আশা এ সবকিছু শরিফুল ও রাশেদের মতো পুরুষেরা আকৃষ্ট করতে পারে না। আদিম প্রবৃত্তির মধ্যেই তাদের প্রকট হতে দেখা গিয়েছে। বর্বর যুগের আদিম অন্ধকার এখনও প্রকৃতিগত ধারাবাহিকতায় মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করেই চলেছে। নারীত্বের অবমাননার এমন এক আদিমযুগীয় পন্থাকে প্রতিরোধকল্পে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

নামকরণ একটি শিল্প। নামকরণের মাধ্যমে বিষয়ের পরিচয় বহন করার পাশাপাশি গল্পের ভাবগত তাৎপর্যকে আভাসিত করে তুললে সাহিত্যের নামকরণ সার্থক হয়। বিষয়বস্তু, ভাবসম্ভার, অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও লেখকের জীবনোপলব্ধির বাহক হিসেবে সাহিত্য-শিল্পের নামকরণ হয়ে থাকে। কখনও বা প্রধান বা কেন্দ্রীয় চরিত্রের নামে নামকরণ করা হয়। তবে সংক্ষিপ্ত অথচ শ্রুতিমধুর নামটির মধ্যে পুরো রচনাটির প্রতিফলন থাকলেই নামকরণ সার্থক হয়। ‘ঊনমানুষ’ গল্পের মধ্য দিয়ে লেখক এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ভাবকে উপস্থাপন করেছেন। প্রতীকী এক মানবজীবনবাদী তত্ত্বকে প্রকাশ করেছেন।

প্রতিটি গল্পকারই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার গল্পকে নতুনভাবে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে চান। গল্পকার আফসানা বেগম তাঁর গল্পের প্রচলিত ফর্মের বাইরে গিয়েও গল্প সাজিয়েছেন। কখনও কখনও ফর্ম ভেঙেছেন, কখনও রক্ষা করেছেন। লাগসই কাহিনি নির্মাণের প্রচেষ্টা আছে লেখকের এই গল্পে। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুধু বুনন কাঠামো ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে বানানো রীতিতেও এসেছে।

মাহবুব আজীজ

নদীর পাড়ে বসে থাকি শুধু

সাম্প্রতিক সময়ে তথা আধুনিকতা থেকে উত্তর আধুনিকতার উত্তরণ পর্বে বাংলা ছোটগল্প পরিবর্তিত হয়েছে। গল্পের ভাব-ভাষা ও আঙ্গিকে আমূল পরিবর্তন এসেছে। পরাবাস্তববাদ, মনোবিকলন ও বিকৃত ভাবনা ছোটগল্পে এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। লেখক তাঁর মনের ভাব গভীর ব্যঞ্জনার সহযোগে সাহিত্যের রূপ দান করেন। বর্তমান সময়ের প্রায় সব লেখকই বাস্তববাদী ও সমাজ সচেতন। বর্তমান সময়ের গল্পকারদের মধ্যে মাহাবুব আজীজও একজন।

মাহবুব আজীজের ‘নদীর পাড়ে বসে থাকি শুধু’ এই গল্পটি মূলত সমাজ বাস্তবতার নিরিখে এবং উত্তম পুরুষে লেখা। সমাজের অরাজকতা, ধর্ষণ, খুন, হানাহানি, দলাদলি ও প্রভাবশালীদের প্রতিপত্তি, প্রশাসন ব্যবস্থাপনায় অতৎপরতা, নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অপচেষ্টা, লোমহর্ষক ঘটনার বীভৎসতা, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, অন্তর্দ্বন্দ্ব এই বিষয়গুলোই মূলত ফুটে উঠেছে।

‘নদীর পাড়ে বসে থাকি শুধু’ গল্পে প্রথমেই আমরা দেখতে পাই প্রতিদিনের মতো একদিন কয়েক বন্ধু মিলে নদীর পাড়ে বসে আড্ডা দেওয়ার সময় চিৎকার শুনতে পায়। এক তরুণী পানিতে লাফ দিয়েছে। তরুণীকে বাঁচাতে সঙ্গে থাকা লোকটি লাফ দিলে কয়েকজন যুবকও ঝাঁপ দিয়ে তাদের দুজনকেই পাড়ে তুলে আনে। এর মধ্যেই তাদের মাঝে নেতৃত্ব দিতে বন্ধু রতন চলে আসে। তারা মেয়েটি এবং তার সঙ্গে থাকা ছেলেটিকে নিয়ে একটি গেস্ট হাউসে যায়। এখানে গ্রাম্য মানুষের পরোপকারী ভাব ও আন্তরিকতার চিত্র ফুটে উঠলেও রতন নিজের কুৎসিত মনো প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যই মূলত মেয়েটিকে অতিথি ভবনে নিয়ে যায়।

পানিতে লাফ দেওয়া ছেলেটির নাম এমদাদ। মেয়েটির নাম মনিকা। তারা ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছে, দুজনের মাঝে মনোমালিন্য হলে মেয়েটি পানিতে ঝাঁপ দেয়।

ফুলবাড়িয়াতে এই অতিথি ভবনের আলাদা খ্যাতি থাকলেও সেখানে সকলের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। কিন্তু রতনের জনসংযোগ থাকাতে সে ম্যানেজারকে বলে অতিথি ভবনের নিচ তলায় একটি কক্ষ জোগাড় করে দুজনের জন্য। অতিথি ভবনে যাওয়ার পরে মেয়েটির সৌন্দর্য দেখে রতন মনে মনে তাকে পাওয়ার আকাক্সক্ষা পোষণ করে। এই অতিথি ভবনে বাইরের মানুষ ভেতর প্রবেশ করতে পারে না। তাই এটুকু বুঝতে আর বাকি থাকে না যে সে মেয়েটির অবস্থা স্বাভাবিক হলেও তার সম্ভ্রমহানি করার জন্য রতন কৌশলে গল্পকথক এবং মিঠুকে ডাক্তার আনতে জোর করে পাঠিয়ে দেয়।

রতন এবং গল্পকথক দুজনে স্কুলের বন্ধু হলেও বড় ক্লাসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই রতনের আচরণে পরিবর্তন আসে। তার থেকে বড় বয়সিদের সঙ্গে মিশতে শুরু করে। কলেজে উঠে রাজনীতিতে জড়ায় এবং নানারকম টেন্ডারবাজির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় সে রাইস মিলের ব্যবসা শুরু করে। একবার তাকে আহ্বান করেছিল রতনের সঙ্গে মিশে কাজ শেখার জন্য। সে তখন দেখেছে নিজের লাভ ছাড়া রতন কিছুই বোঝে না। সে খুব অবাক হয় এ কারণে যে, যে রতন নিজের লাভ ছাড়া কিছুই বোঝে না সেই রতন একটা অপরিচিত মেয়েকে পানি থেকে তুলে তার জন্য অতিথি ভবনে থাকার ব্যবস্থা করে এবং তার চিকিৎসার জন্য তাদেরকে ডাক্তার আনতে পাঠিয়েছে!

২.

অতিথি ভবনের সামনে গিয়ে তারা দেখতে পায় গেটের সামনে লোক জড়ো হয়ে গেছে এবং তারা ফিসফাস করছে। কোনো মেয়ে নাকি আকাম করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। কৌতূহল উদ্দীপক রসালো শোনা কথা বাতাসের আগেই ছড়িয়ে পড়ে। তারা ডাক্তার নিয়ে অতিথিশালায় গেলে রতনের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। রতন মানুষের ভিড় সামলাতে মিঠুর নেতৃত্বে কয়েকজনকে মূল গেটে পাহারায় রাখে।

যে রতন ডাক্তার আনার জন্য এত তোড়জোড় করছিল সেই রতন ডাক্তারকে এনে টিভি রুমে বসিয়ে রাখে। সে খেয়াল করে তারা এমদাদ এবং মনিকাকে যে কক্ষে এনে রেখেছিল সেই কক্ষে তালা মারা। সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। কেন যেন তার গা ছমছম করছিল। চারদিকের পরিবেশ তার কাছে অচেনা অপরিচিত মনে হচ্ছিল। তার ভেতর একটা মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে থাকে। গল্পের ঘটনা এতক্ষণ আর দশটা গল্পের মতো স্বাভাবিক গতিতে আগালেও গল্পের মূল ঘটনা ঘটতে থাকে মূলত এখান থেকেই।

ক্ষমতায় থাকা একটা দলের কেউ যখন খুন বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করে, তারপরও দল লজ্জিত হয় না। কোনো অনুতাপও দেখা যায় না। দলে যেন এ ধরনের দুর্বৃত্তরা স্থান না পায়, সে ব্যাপারে সতর্কতা ও কঠোর অঙ্গীকারও দেখা যায় না। আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটাই পচে গেছে। রাজনীতি মানুষকে স্বপ্ন দেখাবে, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, মানুষের পাশে থাকবে। অথচ তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন দুর্বৃত্ত হয়ে উঠছে। খুন-ধর্ষণ-চাঁদাবাজির মতো অপরাধ করছে। অপরাধীদের প্ল্যাটফরম হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন। আজ আদর্শিক চর্চা নেই বলেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত দুর্বৃত্তরা একের পর এক ধর্ষণ ঘটাচ্ছে। তারাই আবার বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রভাবে রাজনৈতিকভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে। গল্পে রতনকে বাবু ভাই অভয় দেওয়াতে সে বিষয়টা সুস্পষ্ট। রতন এমদাদকে একটা রুমে আটকে রেখে মনিকাকে ধর্ষণ করেছে এবং তার অবস্থা একটু খারাপের দিকে গেলে সে বাবু ভাইকে মোবাইল করে ডেকে আনে। সুযোগ সন্ধানী সবাই। বাবু ভাইও সুযোগ খুঁজছিল মনিকার ঘরে তার কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার।

রতন নিজে বাঁচতে বাবু ভাই আসার আগে পুলিশকে কল দিয়েছিল। বাবু ভাই পুলিশকে ফোন দিয়ে আসতে নিষেধ করে। নেতা দ্বারা প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের চিত্রটি আমরা এখানে দেখতে পাই।

৩.

এমদাদের কক্ষের চাবি রতনের কাছেই ছিল। রতন ডাকলে সে তার সঙ্গে কক্ষের অভ্যন্তরে যায়। এমদাদ মান-সম্মানের ভয়ে রতনকে টাকা দিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে চায়। কিন্তু রতন তার কাছে কর্কশ স্বরে মনিকার বাবার মোবাইল নাম্বার চায়। দিতে না পারায় রতন আরও কঠিন হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে মনিকাকে ধর্ষণ করেছে কে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকায় এমদাদ! সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। নির্বাক হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে সে।

মেম্বার সহযোগীসহ কক্ষের ভেতরে এসে রতনকে নিয়ে যায়। গল্পকথক ঘরে ঢুকে এমদাদের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে সে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। এমদাদের এটুকু বুঝতে বাকি থাকে না যে তারা মনিকার সঙ্গে কি করেছে এবং তার দায় যে তার ওপর চাপাতে চাচ্ছে সেটাও সে বোঝে। তাই সে সংসার, বাচ্চাকাচ্চার কথা বলে চলে যেতে চাইছে। বিপদে পড়ে ফেঁসে যাওয়ার এবং জীবননাশের ভয়ে এমদাদ একা একটা মেয়েকে হায়েনাদের কাছে রেখে পালিয়ে যেতে চায়। তাকে ছেড়ে দিয়ে মেয়েটির সঙ্গে যা খুশি তাই করেন এই কথার মধ্য দিয়ে তার কাপুরুষতার চিত্র ফুটে ওঠে। তাদের কান্নাকাটির মধ্যেই মেম্বার রতন আর বাবু ভাই ঘরে ঢোকে। সে বুঝতে পারে রিলে রেস এর মতো মনিকার ভাগ্য এখন বাবুর ভাইয়ের হাত থেকে জলিল মেম্বারের হাতে চলে গেছে। আর তার মতো কতিপয় বিদূষক কখনও রতনের কখনও বাবু ভাইয়ের আবার কখনও জলিল মেম্বারের পিছু পিছু চক্রাকারে ঘুরছে। আর এর মধ্যে একের পর এক বাটন যার হাতে যাচ্ছে মনিকার ঘরে ফিরে আসছে আহত মেয়েটিকে আরও রক্তাক্ত করে। সমাজ বলতে এখন আর কিছু নেই। দলীয়ভিত্তিতে সমাজ এখন খণ্ড খণ্ড হয়ে আছে। যেখানে সমাজ নেই, মানুষের মর্যাদা নেই, স্থানীয় জন প্রতিনিধিরা কেউ না, দলীয় নেতার পালা গুণ্ডারা রাজত্ব করে—সেখানে বিদূষক হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সমাজ এখন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে আছে, সমাজের তৃণমূলে কোনো মর্যাদাবান লোকদের নেতৃত্ব অবশিষ্ট নেই। আর এর প্রধান কারণ হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে দলীয় রাজনীতিকে সংযুক্ত করা। আর যতদিন ভালো লোকেরা সমাজের নেতৃত্বে আসবে না, ততদিন এটাই চলবে।

পুরো বিষয়টি গল্পকথকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে থাকে। নিজের দোষ ঢাকার জন্য মেম্বার গর্জন করতে থাকে এমদাদের সঙ্গে। এতক্ষণ মরিয়া হয়ে নিজেকে বাঁচাতে সমাজ পরিবারের কথা বলে সমঝোতা ও পরিত্রাণ পেতে চাইলেও এবার সত্যিই মরিয়া হয়ে ওঠে এমদাদ। বুঝতে পারে এখান থেকে তার আর নিস্তার পাওয়ার কোনো উপায় নেই। তাকে আরও বড় ধরনের কোনো ঝামেলার মধ্যে তারা ফাঁসাতে চাচ্ছে। তখন এমদাদ বলে আপনারা কি মনে করেছেন মনিকার সঙ্গে আপনারা কি করছেন আমি কিছু বুঝি না। জলিল মেম্বার তখন রেগে ওঠে এবং তার কথায় তার সাঙ্গোপাঙ্গরা আচ্ছা মতন এমদাদকে মারধর করে। নারী আজ রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, এমনকি পুলিশের অসহযোগিতার কারণেই নিরাপত্তাহীন! বর্তমানে নেতা মেম্বারদের কথাতেই প্রশাসন চলে।

মনিকা মারা গেলে তার কক্ষে ডাক্তারকে নেওয়া হয়। ডাক্তারও যে নেতাদের হাতে জিম্মি সেই বিষয়টি গল্পে ফুটে উঠেছে। সে বুঝতে পারে তার অলক্ষ্যে অনেক অঘটন ঘটে গেছে। দোতলায় মিঠুকে নিয়ে মনিকার রুমে যেতে চাইলে মিঠু যে অশ্লীল হাসি এবং ইঙ্গিত দেয় সেটা তার পছন্দ হয় না। এদিকে রতন, বাবু ভাই এবং জলিল মেম্বার তিনজন মিলে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত। তারা একে অপরকে দোষারোপ করছে। রতনের প্রধান সহায়তাকারী যুব নেতা বাবু এবং জলিল মেম্বার। তারা যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে রতনের বিচার করত, পুলিশকে জানাত এবং নিজেরাও মনিকাকে ধর্ষণ না করত তাহলে মনিকা বেঁচে থাকত। কিন্তু তারা সেটা না করে দুজনেই মনিকাকে দফায় দফায় ধর্ষণ করে।

৪.

মনিকা মারা যাওয়ায় পরিস্থিতি বিগড়ে গেলে জলিল মেম্বার বাবু ভাইকে রতনকে সামলাতে বলে। যখনই কারও অপরাধের খবর ফাঁস হয়ে হয়ে যায়, তখন বলা হয়, সে আমাদের দলের কেউ নয় অথবা অনুপ্রবেশকারী। এটা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। বাবু ভাই গম্ভীর কণ্ঠে বলে এভাবে কাদা ছোড়াছুড়ি করলে একসময় এর মাধ্যমে সবাই খবরটা জেনে যাবে। তার থেকে এখন মাথা গরম না করে কি করা যায় সেটাই চিন্তা করতে হবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে, অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে, সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে যাদের রুখে দাঁড়ানোর কথা, প্রতিবাদ করার কথা, সেই রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাই এই ধর্ষণের পিছনে নিজেরাই ধর্ষক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন, কখনও আড়ালে আবডালে আবার কখনও প্রকাশ্যে!

অবশেষে প্রশাসনের কাছেও খবর চলে যায়। তৎপর হয় থানা পুলিশ। আমাদের থানা, পুলিশ, আইন, তদন্ত, বিচার প্রক্রিয়া কোনো কিছুই নারীর প্রতি সংবেদনশীল নয়। বরং তা অনেকটাই ধর্ষকবান্ধব। ধর্ষণের এ ব্যাপকতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, সামাজিক মূল্যবোধের অবনতি আর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দাপটের প্রভাবে অপরাধীর শাস্তি না হওয়া এ জন্য দায়ী। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততাও এ জন্য দায়ী। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় নির্যাতনকারীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়। ক্ষমতাশীলদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই এই ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারছে। গল্পেও তেমটা দেখা যায়। বানাড় নদীতে যেখান থেকে মনিকাকে উদ্ধার করা হয়েছিল সেখানেই মনিকার লাশ পাওয়া গেছে। কিন্তু রাত বারোটার আগে মনিকা সেখানে কীভাবে পৌঁছাল এটা অনেকেই জানে না। বা জানলেও না জানার ভান করে। আসলে ঘটনা কী ঘটেছিল ? নাকি তারা নদীর পারে শুধু বসেই থেকেছিল। এই গল্পে সমাজের রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক নেতা এবং মেম্বার, প্রশাসনের অপতৎপরতার চিত্র ফুটে উঠেছে।

সন্ত্রাস অথবা রাজনীতির বাহুবল যখন চতুর্পাশ গ্রাস করে সম্মুখে শেষ করে দেয় একটি জীবন্ত স্বপ্নের পৃথিবী তখন আর আইন কানুন কথা বলতে পারে না। পারে না ফিরিয়ে দিতে বিশ্বাসের থলে। শুধু আশ্বাসের ধ্বনি কাঁধে নিয়ে বেঁচে থাকাটাই বাস্তবতা। এ রকম অযাচিত ঘটনা অহরহ প্রাত্যহিক কাজের মতো সমাজের আনাচে কানাচে ঘটেই চলেছে। এসব নিস্তার না হলেও লেখক নিজের দায়ভার আদায় করতে সচেষ্ট ছিলেন সমাজের আয়নায় তুলে ধরতে।

একজন গল্পকার সমাজের মাঝে বসবাস করা জীবও বটে। পঞ্চ-ইন্দ্রিয় অনুভূত প্রাণী বলে তাকে সমাজের যাপিত ঘটনার নীরব সাক্ষ্য বহন করতেই হয়। আর সে ঘটনাগুলোর ভেতর নির্যাস অনুধাবনক্রিয়ার তরীতে বহন করে প্রজন্মের কাছে জানান দিতে জানার নামই একটি শিল্প। এ গল্পের কাহিনির গতিশীলতা, চরিত্র চিত্রণ, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব-পীড়নের চিত্র প্রকট।

গার্গী রায়চৌধুরী

ছবি

‘ছবি’ গল্পের উপকরণ জীবন কাঠামো থেকে গৃহীত হলেও বিষয় ভাবনায় জীবন চৈতন্যের মর্মমূলস্পর্শী। গল্পটির প্রথমে আমরা দেখতে পাই গল্পকথক তার বন্ধু সুজয়ের গল্প বলছে। মানুষ জন্মগত বা স্বভাবসুলভ আশাবাদী। আগামী দিনের ঝলমলে সূর্য ওঠার অপেক্ষায় রাতের আঁধার হাসিমুখে বরণ করে। কখনও সে নিজের অজান্তেই প্রচণ্ড আশাবাদী হয়ে ওঠে। গল্পের সুজয় এবং গল্পকথক দুজনেই ছিল আশাবাদী।

সামাজিক অবস্থা এবং চারিত্রিক গঠনগত মিলের কারণেই সুজয়ের সঙ্গে তার হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। একটু বড় হওয়ার পর দুজনেই বুঝতে পারল যে একটা মোটামুটি ভালো সরকারি চাকরি জোগাড় করে ফেলাটাই তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। সে সময় রাত জেগে একে অপরের বাড়িতে পড়াশোনা করত কিন্তু এত কাছাকাছি হলেও তাদের মধ্যে ভালোবাসাটা তেমন দানা বাঁধে নি। চাকরি পেয়ে গিয়েছিল তারা, তারপর থেকে যে যার জায়গায়। এমনকি হৃদয়ের বন্ধন দৃঢ় না হওয়াতে এ ভার্চুয়াল যুগে মোবাইলেও তাদের কখনও কথা হয়নি। মোবাইলের নাম্বারটা জোগাড় করার তাগিদও অনুভব করেনি।

অন্য বন্ধুদের মাধ্যমে গল্পকথক জানতে পারে সুজয় তার মত বিয়ে করে স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে ভালো আছে। কাজের চাপে গ্রামে যোগাযোগ করতে পারে না। একবার সে একটা কাজের জন্য গ্রামে যায়। চায়ের দোকান হচ্ছে সমস্ত খবরাখবরের সংযোগস্থল। বিবিসির মতো রাজ্যের সমস্ত খবর সেখানেই পাওয়া যায়। সেখান থেকেই জানতে পারে সুজয় কিছুদিন আগে মারা গেছে। কেউ বলে এক্সিডেন্ট করেছে, কেউ বলে বউয়ের সঙ্গে বনিবনা ছিল না তাই মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। নানাজনের কাছ থেকে মৃত্যু নিয়ে নানা ধরনের কথা শোনায় সুজয়ের মৃত্যু তাকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। তাই তার কোনোটাই বিশ্বাস হচ্ছিল না। ভেতরে ভেতরে খবরটা তাকে খুব বেশি আহত, মর্মাহত এবং ভীত করে তুলল। ভেতরের তাগিদ থেকেই সে সুজয়ের বউয়ের ফোন নম্বর জোগাড় করে এক রবিবারে দেখা করতে যায়।

২.

তার সঙ্গে সুজয়ের স্ত্রী আন্তরিক ব্যবহার করে। সুজয়ের স্ত্রী সুজয়ের মৃত্যু সম্পর্কে কোন্ কথা বলছে না দেখে সে সুজয়ের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে নিজের পরিচয় দেয়। এতে কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে বলে সুজয় মারা গেছে। তবে ওটা নিছক একটা এক্সিডেন্ট ছিল। সুজয়ের একটা অদ্ভুত অসুখ হয়েছিল। শেষের দিকে তার মধ্যে একটা আমূল পরিবর্তন আসে এবং একটা ছবির জন্য ও শেষ হয়ে গেল।

সরকারি চাকরিজীবীরা উপরি টাকা পায়। এই সুবাদে একদিন ওর পরিচিত একজন বেশ বড় একটা প্যাকেট দিয়ে যায়। সুজয় বাড়িতে এসে খুলে দেখে তার একটা বড় আর খুব সুন্দর আঁকা ছবি। শিল্পী একেবারেই জীবন্ত সুজয়ের ভেতরকার শুভ্র পরিশীলিত ব্যক্তিত্বকে অদ্ভুত সুন্দর করে তুলে ধরেছিল। তাদের মাঝে ঐ ছবিকে কেন্দ্র করে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়।

হয়তো বা সব দিক থেকে নিজেকে সেরা দেখতে চাওয়াই একসময় তার মূল লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে নিজেকে শ্রেষ্ঠ দেখতে চাওয়ার এই প্রতিযোগিতায় পরাজিত সুজয়ের মাঝে তৈরি হয়েছিল এক ধরনের হতাশা এবং একাকিত্ব। অকারণে নিজেকে ছোট ভাবতে শুরু করে। এক সময় চরম হীনমন্যতায় ভুগে আত্মবিশ্বাস এসে দাঁড়ায় শূন্যের কোটায়।

বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষ সামাজিক ও পারিপার্শিক চাপে ক্রমেই যেন হয়ে যাচ্ছে এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আধুনিক জীবনে আনন্দ বিনোদনের অভাব, পারিবারিক ভাঙন, অর্থনৈতিক দৈন্য, প্রেমহীনতা মানুষের মাঝে তৈরি করে দিচ্ছে একাকিত্বতা। ভেঙে যাচ্ছে পরিবার, গড়ে উঠছে একক জগৎ। সুজয়ও নিজের মাঝে একটি জগৎ তৈরি করে নিয়েছিল। তাই সে সারাদিন ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ছবির মাঝে আত্মবিশ্বাসী এবং সফল এক সুজয়কে খুঁজে ফিরত।

এই ছবি নিয়েই ধীরে ধীরে সংসারের সমস্ত বিষয় থেকে সুজয় দূরে সরে গেল। ঘরের কোন্ দেয়ালে লাগাবে, সে দেয়ালের রং কী করবে তা নিয়ে পরিকল্পনা করায় ছিল তার একমাত্র কাজ।

ছবিটা নিয়ে এত মাতামাতি তার স্ত্রীর মোটেই ভালো লাগত না। সব সময় ব্যস্ত ভাব দেখানো ও স্ত্রীকে অবহেলা করার স্বভাব যার রয়েছে, সেই স্বামীর প্রতি বিরক্ত না হয়ে উপায় নেই। এক সময় তাদের বিরক্তি চরমে যেতে যেতে আরও খারাপের দিকে যেতে থাকে।

৩.

বাড়িতে রং মিস্ত্রি লাগলে সে সময় সুজয় এক সপ্তাহের জন্য অফিসের কাজে বইরে গিয়েছিল। নির্ধারিত দিনের দুদিন আগেই ফিরে আসে। ওর ঘরটা রং করা শেষ হয়েছে। সাদা আলগা চুনের প্রলেপে ছবিটা ঢেকে গিয়েছিল। এই কাজ তার স্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবেই করেছিল। কারণ সে আগেই বলেছে তার সুজয়ের ওই ছবিটা অসহ্য লাগত। তার প্রতি অবহেলা তৈরি হয়েছিল এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। সুজয়ের ছবিটা নিয়ে এত আদিখ্যেতার কারণ হচ্ছে সে জীবনে ছবির সুজয়ের মতো হতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। স্ত্রীকে অপবাদ দেয় সে নাকি সুজয়কে সহ্য করতে পারছে না। সুজয়ের থেকে তার রেজাল্ট ভালো। সুযোগ পেলে সে সুজয়ের থেকে ভালো চাকরি পেত। সাধারণত নারীর স্বাধীনতা অর্জনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো স্বাবলম্বিতা অর্জন বা নিজের পায়ে দাঁড়ানো। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর স্বাবলম্বী বা আত্মনির্ভরশীল হওয়া মানে এক কঠিন সংগ্রাম ও সাধনার ব্যাপার। নারী এ পথে পা বাড়ালে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। হয়তোবা চাকরির ইচ্ছে থাকলেও সুজয় তার স্ত্রীকে করতে দেয়নি। সেই না পাওয়ার ব্যর্থতা সুজয়ের স্ত্রীর মনের মধ্যে এক ধরনের ঈর্ষা বা ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।

শোবার ঘরে দেয়ালজুড়ে সুজয় ছবিটা টাঙ্গিয়ে ছিল। বাড়িতে যেই আসত তাকে কোনো না কোনোভাবে সে ছবিটা দেখাত। ঘরে একাই থাকত এবং সারাদিন ওই ছবির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। একদিন ওই দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই ছবি টা খুলে পড়ে গিয়েছিল সুজয়ের ওপর। মাটিতে শুয়ে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়ে মারা যায়। হুক ছবির ওজন ধরে রাখতে পারেনি হয়তোবা।

তাদের আলাপনের মাঝে সুজয়ের ছোট মেয়ে জলখাবার নিয়ে এসে বলে, সুজয়ের জন্মদিনের দিনেই সে মারা যায়। তার বাবা অফিসে চলে গেলে মা দরজা বন্ধ করে ওই ঘরটা পরিষ্কার করেছিল। বিছানার চাদর এবং পর্দা পরিবর্তন করে ছবিটা মুছে একেবারে ঝকঝকে করেছিল।

গল্পকথক বুঝতে পারে তার শরীরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি শুরু হয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন শুরু হয়। সুজয় যে আত্মহত্যা করেনি এবং তার হত্যাকারী শনাক্তকরণের পরে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। বাচ্চাটা চলে যাওয়ার পরে সে স্বাভাবিক গলায় বলে আপনি যখন ছবিটা মুছেছেন হুকটা হালকা হওয়ার কারণে পড়ে যায় নি তো। সুজয়ের স্ত্রী অপ্রস্তুত হয়ে তাকে চলে যেতে বলেন এবং বন্ধুর ছবিটা দেখে যেতে বলে ওর আত্মার শান্তির জন্য।

হত্যাকাণ্ড নিয়ে তার চিন্তার পারম্পর্য রক্ষিত হয় নি। অকারণে একটি প্রাণের পতন তাকে স্পন্দিত ও প্রহৃত করে। হত্যার ঘটনাকে স্মরণ করে ব্যক্তিকে ঘটনার অভ্যন্তরে নিক্ষেপ করে তার মনোজাগতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নির্মিত হয়েছে।

ততক্ষণে এক ঝাঁক ভাবনা কালো মেঘের মতো তার মাথার ভেতরটা ছেয়ে ছিল। তার বুঝতে একটুকু বাকি থাকে না যে সুজয়ের স্ত্রী ঈর্ষান্বিত এবং তার প্রতি অবহেলা, অবজ্ঞা করার কারণেই সে ইচ্ছাকৃতভাবে সুজয়কে মেরে ফেলেছে। সুজয়ের হত্যার ঘটনাটি ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত। হত্যার ঘটনাটি তাকে বিচলিত করে এবং বিষয়টি নিয়ে তার চিন্তা চেতনা আবর্তিত। তার চিন্তার সামান্যই বাইরে প্রকাশ পেয়েছে, ঘটনাটি নিয়ে চিন্তার সিংহভাগই তার চিন্তার চৈতন্যের নিয়ন্ত্রক প্রবাহ চলেছে।

সে বাড়ি ফিরে সুজয়ের মতোই তার একটা বড় ও খুব সুন্দর নিখুঁত ছবি দেখতে পায়। ছবিটা এতটাই সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর যে চোখ ফেরানো যায় না ছবিটা থেকে। ছবিটাকে উপেক্ষা করে  সে রুম থেকে চলে যায়। সে চায় না তার সংসার জীবনেও সুজয়ের মতো অশান্তি নেমে আসুক বা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক। অকল্পনীয় ঘটনা তার অস্তিত্বকে প্রবলভাবে প্রকম্পিত করে। ঘটনার আকস্মিকতায় ও বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণায় দগ্ধিভূত হওয়ার আশঙ্কায় এক আতঙ্কগ্রস্ত সত্তায় পরিণত হয়। তাই সুজয়ের মতো তার ভাগ্য যেন এমন না হয় সেজন্য সে ছবিটি ফেরত দিতে চায়।

গল্পের চরিত্র কম হলেও আকর্ষণীয় ছিল। বিভিন্ন চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো শৈল্পিকতার আশ্রয়ে নিখুঁতভাবে বর্ণিত হয়েছে। শৈল্পিক শব্দ ও সহজ সরল অনাড়ম্বর বাক্য প্রয়োগে চরিত্র চিত্রণে একজন বোদ্ধা পাঠক হিসেবে মুগ্ধ হয়েছি। এ গল্পের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক গুণাবলির অধিকারী চরিত্রগুলো আমাদের সবার পরিচিত। কাহিনির ধারাবাহিকতায় কোনো ছন্দপতন নেই, নেই অতি নাটকীয়তা।

মহি মুহাম্মদ

নতুন ভোর

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘ঈশ্বরে ভক্তি ভিন্ন দেশপ্রীতি সর্বাপেক্ষা গুরুতর ধর্ম’। সংস্কৃত শ্লোকে আছে ‘জননী জন্মভূমিশ্চঃ স্বর্গাদপি গরীয়সী’। নিজের দেশকে ভালোবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। হৃদয়ের গভীর থেকে অকৃত্রিম অনুরাগে নিজের দেশ, দেশের মাটি এবং দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মহি মুহাম্মদের ‘নতুন ভোর’ গল্পের তালাত চরিত্রে। এ ছাড়াও ‘নতুন ভোর’ গল্পটি কিছুটা গোয়েন্দা কাহিনি ও রোমাঞ্চ নিয়ে লেখা ভিন্ন রকম এক ভালোবাসার গল্প। মূলত পেশাগত দায়িত্বপালন করতে গিয়ে সমাজের বিভিন্ন দিক, প্রেম, ভালোবাসা ও বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে গল্পটিতে।

বৃষ্টিস্নাত একটি দিনে তালাত মাহমুদ তার নিজ জন্মভূমি বাংলাদেশে আসলে রিসিভ করার জন্য কাউকে না পেয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে সে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

মানুষ স্বদেশের মাটি, জল, আকাশ, বাতাস, পরিবেশ, কৃষ্টি—এসব কিছুর মধ্যে শিশুকাল থেকেই মায়ের আদরে পুষ্ট হতে থাকে। স্বদেশের সঙ্গেই গড়ে ওঠে তার নাড়ির সম্পর্ক। তার দেহ-মন, বিশ্বাস-আদর্শ সবকিছুই স্বদেশের বিভিন্ন উপাদান দ্বারা পুষ্ট। স্বদেশে ভোরের আলো গায়ে মাখাতে তালাতের ভেতরটা প্রশান্তিতে ছেয়ে যায়। বহুদিন পরে বিদেশ থেকে সে ছুটে এসেছে দেশের টানে। বাবা-মা বহুদিন আগে গত হয়েছে। ভাইবোনদের সাথেও তার কোনো যোগাযোগ নেই। মূলত গ্রামে একটা উন্নতমানের হাসপাতাল করার জন্যই সে গ্রামে ফিরে আসে। তার আত্মোপলব্ধিতে ধরা দিয়েছে দেশের কাজে টাকা ব্যয় করতে না পারলে টাকা দিয়ে কি হবে।

কনসালটেন্সি ফার্ম কাউবয় মার্কা একটি মেয়েকে তার নিরাপত্তার জন্য রেখেছে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আজীবন পুরুষেরা মেয়েদের নিরাপত্তা দিয়ে এসেছে কিন্তু যখন তালাত জানতে পারল একটি মেয়ে তাকে নিরাপত্তার বেষ্টনীতে আবদ্ধ রাখার জন্য নিযুক্ত তখন তার পুরুষতান্ত্রিক ইগোতে লাগে। গল্পে নারীকে পুরুষের বডিগার্ড হিসেবে দেখানোতে লেখক নতুনত্ব দেখিয়েছেন। সে মনে মনে ভাবে পরে এ বিষয়ে কথা বলে নিবে। তারা গাড়ির দিকে এগোলে মেয়েটি তাকে ইশারায় কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু সে বুঝে উঠতে পারে না। প্রথম তাকানোতেই মেয়েটির প্রতি তার এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়।

তালাত কখনও ভাবেনি যে সে বিপদে পড়বে। অন্য প্রতিষ্ঠানের রেষারেষিতে ড্রাইভারকে হাত করে তাকে অপহরণ করে একটা রুমের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। তালাত ভাবে হয়তোবা মেয়েটি এর সঙ্গে যুক্ত আছে। এরপরে মনিকাকে সেখানে নিয়ে এলে সে তাকে আশ্বাস দেয় কিন্তু তালাত যেহেতু এই জায়গায় নতুন কিছুই বুঝে উঠতে পারে না তাই সে সবকিছু সময়ের ওপর ছেড়ে দেয়। তাদের দাবি টাকা এদেশে ইনভেস্ট করতে হলে আগে তাদের দিতে হবে। যেন মামার বাড়ির আবদার এর মতো এই টাকাতে তাদেরও ভাগ আছে। তালাত জায়গা নির্বাচন করতে এসেছে, তার কাছে টাকা নেই। কথাটা তাদের বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। রাতে তাদের খাবার দিতে এলে খাটের নিচে লুকানো রড দিয়ে মাথায় বারি মেরে তারা পালিয়ে যায়। পালানোর সময় ওদের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে আসে মনিকা। মনিকার বুদ্ধিমত্তা দেখে তালাত মনে মনে অনেক খুশি হয়। কনসালটেন্সি তাদের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।

২.

দিন আসে, দিন যায়। মানুষের জীবনের স্মৃতির অ্যালবাম ঋদ্ধ হতে থাকে। কিছু স্মৃতি মন থেকে মুছা যায় না বা আবার কিছু স্মৃতি কখনও ভোলা যায় না। মাঝে মাঝে জীবনের অতীত পানে যখন ফিরে তাকায় তখন ফেলে আসা বর্ণাঢ্য সুখস্মৃতি মানুষ চোখে মায়াবী রূপে ধরা দেয়। সেই দিনগুলো ছিল বড় সুন্দর বড় রঙিন বড় মধুময়। জীবন থেকে চলে যাওয়ার শৈশব-কৈশোরের সেই দিনগুলো আজও ভুলতে পারে না তালাত। সেদিনগুলোর কথা মনে হলেই কত রঙিন ঘটনা কত উল্লাস মনের পর্দায় ভেসে ওঠে।

তাই বহু বছর পর গ্রামে গিয়ে তালাত অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। তার স্মৃতি ভরা শৈশবের কথা মনে পড়ে। মাটি, গাছপালা সবকিছু দেখে সে আবেগে আপ্লুত হয়। গ্রামের অনেকেই তাকে চিনতে পারে না। আবার অনেকেই তাকে চিনেও না চেনার ভান করে। তার জন্মের সময় তার মা মারা যায়। দাইমা অনেক চেষ্টা করেও তার মাকে বাঁচাতে পারেনি। কৃতজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে সে গ্রামে গিয়ে প্রথমেই দাই মা’র বাড়িতে যায়। সেখানে সে দাইমার মৃত্যুর খবর শোনে।

ছোটবেলা থেকে সে শুনে এবং দেখে এসেছে মানুষ রোজগারের জন্য বিদেশে যায়। সবার কাছ থেকে সে বিদেশে আনন্দের গল্প শুনত। কখনও কারও কাছ থেকে কোন দুঃখের কথা শোনেনি। তখন বুঝতে না পারলেও এখন ঠিক বোঝে হয়তোবা সবাই প্রিয়জনকে আনন্দের কথা বলতেই ভালোবাসে। প্রিয়জন উৎকণ্ঠিত, উদ্বিগ্ন হবে এজন্য তাদের কখনওই নিজেদের আভ্যন্তরীণ দুঃখের কথা বলত না। ছোটবেলা থেকেই তার পরিবারের অভাব অনটন তার মনে প্রবলভাবে দাগ কেটেছিল। তার বাবা অন্য জায়গায় বিয়ে করে তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তাই সে বিদেশে গিয়ে অনেক টাকা-পয়সা নিয়ে দাদি এবং বাবাকে ভালো রাখতে চাই। ‘মা’ নামক ছোট্ট এই শব্দটার মধ্যে লুকিয়ে আছে অকৃপণ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অসীম ও আশ্চর্য রকমের এক ক্ষমতা। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আজ থেকে নয়, এটা অনন্তকাল থেকে প্রবহমান। তাই প্রত্যেক সন্তানের তার মাকে ঘিরে কল্পনার অন্ত নেই। তালাত জন্ম থেকে তার মাকে দেখেনি তাই মাঝে মাঝে কল্পনায় সে মায়ের সঙ্গে খুনসুটি করে।

রহমত এক সময় বিদেশে থাকলেও এখন তার ছেলেরা থাকে। তিনটি বাড়ি এবং জমির মালিক হয়েছে। তাই বিদেশ যাওয়ার জন্য সে রহমত মিয়াকে অনুরোধ করে। তার দাদি মারা গেলে তার কি হবে এটা ভেবে সে চিন্তিত হয়ে পড়ে। তাকে পরামর্শ দেয় জমিজমা চাষাবাদ করতে এবং পরে বিয়ে শাদি করে এখানেই থাকতে। কিন্তু মায়ের জন্য সে হাসপাতাল বানাতে চায়।

গ্রামের মানুষ দারিদ্র্যের পঙ্কিল আবর্তে নিমজ্জিত। অন্ধকারে নিমজ্জিত পল্লিতে টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে এ জাতি। তার মাও তাকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। সে চায় না আর কোনো মা এভাবে মারা যাক। এ কথা শুনে রহমত মিয়ার চোখ ছল ছল করে ওঠে এবং হৃদয় স্পর্শ করে। স্বদেশের প্রতি তার যে ভালোবাসা সৃষ্টি হয় তা অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ এবং কর্তব্য ও দায়িত্বের অনিবার্য দায়বদ্ধতা। স্বদেশের ভাষা-সাহিত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সমাজ-সংস্কৃতি এবং জীবন ও পরিবেশের সঙ্গে একজন মানুষের যেমন শেকড়ের বন্ধন গড়ে ওঠে, তেমনই মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি সৃষ্টি হয় তার চিরায়ত ভালোবাসা।

৩.

মনিকা হাসপাতালের জায়গা পছন্দ করেছিল তবে সেটা তারও পছন্দ হয়। পাশেই নদী, তার ইচ্ছে নদীতে একটা বাঁধ দিয়ে দেওয়ার। কিন্তু কিছু মানুষ তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কয়েকজন প্রভাবশালী গোপনে নিজেদের মধ্যে আঁতাত করছে। যেন সে কখনও জমি না পায় এবং পাওয়ার জন্য যেন তাদের শরণাপন্ন হতে হয়। এখানে গ্রাম্য ভিলেজ পলিটিক্স দেখা যায়। তারা এই সুযোগে কামাই করতে চায়। সুযোগের অপেক্ষায় আছে কিছু ক্ষমতা বা প্রভাবশালীরা।

১২/১৩ বছর বয়সে তার দাদি মারা যায়। তখন সে মন খারাপ করে ঘুরে বেড়াত। চেহারায় কেবলই হতাশা, দুঃখ, অস্তিত্বের সংকট ও নিরানন্দের ছায়া লক্ষ করা যায়। অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে বিদেশে যেতে চাই। এ জন্য রহমত তার জমিজমা ভিটেমাটির পরিবর্তে তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়।

ভালোবাসা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মনিকার সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে তালাত মনিকাকে ভালোবেসে ফেলে। কিন্তু তার সহকর্মী তাকে পছন্দ করে একথা শুনে মন খারাপ হলেও তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই একথা শুনে তার মনে আশার আলো জাগে। ভালোবাসার বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকে।

বিদেশে গিয়েও দেশের কথা এবং মায়ের কল্পিত মুখের কথা সে কখনওই ভুলতে পারেনি। দেশের কারও সঙ্গে দেখা হলে সে আবেগে বিহ্বল হয়ে উঠত। সেখানে বাহাত নামের এক ভাইয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বিদেশে যায়। দেশ থেকে মানুষ বিদেশ যায় দেশের মানুষগুলোকে ভালো ও আনন্দে রাখার জন্য। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের ভূমিকা কম নয়। তার স্বপ্ন বাবা-মা এবং স্ত্রীকে ঘিরে। তার একটা সন্তান হয়েছিল কিন্তু সে দেশে ফেরার আগেই সে সন্তান মারা যায়। বাহাতের একটা সময় ঋণ শোধ হলো। আর অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকল। ঠিক এ সময়েই সিদ্ধান্ত নেয়, অনেক হয়েছে, দেশে ফিরে যাবে। নতুন করে সেখানেই কিছু করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আবার সে দেশে না থেকে রুক্ষ মরুর দেশে চলে আসে। কারণ দেশে কিছু করতে গেলেই সে বাধার সম্মুখীন হবে। তবে সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। ফসল এবং সবজির খামার দেওয়ার।

এক পূর্ণিমার রাতে নৌকোয় বসে মনিকা তালাতের মনের দুঃখের কথা শোনে। তাবরাজ তাদের পাহারা দেয়। কিন্তু হঠাৎ করে দুজন তাদেরকে আক্রমণ করলে মনিকা পড়ে যায়। তাবরাজ বুঝতে পারে না কি করবে। তারা তাকে নিয়ে নৌকায় করে চলে যায়। বহু দূরে যাওয়ার পরে মনিকা নৌকার একপাশে ঘাপটি মেরে থাকে। গন্তব্যস্থলে নামতে গেলে সেখানে চণ্ডালিকার রূপ ধারণ করে তাকে বাঁচায়। চণ্ডালিকা রূপ ধারণের মাধ্যমে নারীর রুদ্র মূর্তি এবং শক্তিমত্তার চিত্র ফুটে উঠেছে। জন্মভূমির জন্য একটা মানুষ কিছু করতে যাচ্ছে এজন্য তাকে সাহায্য করতে চায়। তাকে বাঁচাতে গিয়ে তাবরাজের বুকে গুলি লাগে। তাবরাজ মারা যায়। তালাত লাঠির আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরের দিন ভোরে মনিকা তার হাতটি ধরে থাকে এবং বলে তাবরাজ তাকে তার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে গেছে। তখন তার মনে হল তার জীবনে নতুন এক ভোর এসেছে। যে ভোরের অপেক্ষায় এতদিন সে ছিল।

কাহিনি বিন্যাস এবং চরিত্র চিত্রণে লেখক চাইলে এটাকে আরও একটু বিস্তৃত করতে পারতেন। চরিত্রগুলোকে দিতে পারতেন আরেকটু সময়। মনিকা তার পেশাদারিত্বের খাতিরে কিডন্যাপের বিষয়ে অবগত হলেও সেখানে তার বুঝে ওঠার কোনো আভাস সুস্পষ্ট নয়। গল্পের এক জায়গায় লেখা আছে তালাতের বাবা-মা গত হয়েছেন। কিন্তু অন্য জায়গায় লেখা তার বাবা নিরুদ্দেশ। অনেকের ধারণা অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে চলে গেছে। গল্পের এই জায়গায়গুলো তেমন সুস্পষ্ট নয়। একজন বোদ্ধা পাঠক হিসেবে লেখকের কাছ থেকে ভবিষ্যতে এর থেকেও ভালো লেখা পাব বলে আশা করছি। এছাড়া গল্পের ভাষা সুন্দর, প্রাঞ্জল ও সাবলীল। গল্পের পটভূমিতে ফুটে উঠেছে দেশপ্রম, রোমান্টিকতা এবং সেই সঙ্গে রয়েছে কিছুটা নাটকীয়তা।

মিলটন রহমান

পরি বৃত্তান্ত

আমাদের দৈনিন্দন জীবনের অতি সহজ কথা বা কাজ কর্মের মধ্যে অতীন্দ্রিয় অতিপ্রাকৃত জগতের মায়াজাল বিস্তার করে। আকস্মিক একটা সাময়িক মনোবিকার ঘটিয়ে তাকেই অবলম্বন করে বিশেষ কলাকৌশলে রহস্য নিবিড় বর্ণনাভঙ্গিতে অপরূপ কল্পনার ঐশ্বর্য ছড়িয়ে সমস্ত আখ্যানটি রসে রহস্যে আবৃত করে ভয়ার্ত ও কৌতূহলী করে অতিপ্রাকৃত ছোটগল্পের প্রেক্ষাপট।

শতাব্দীর পর শতাব্দী পরি নিয়ে ভাবনার জগতে মানুষ নানা আল্পনা এঁকেছে। পরি অনিন্দ্যসুন্দরী একটি মেয়ে। রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে সে শুভ্র আলোয় উদ্ভাসিত হয়। তার পিঠে রয়েছে একজোড়া পেখমযুক্ত ডানা। কেউ কেউ বলেছে, তার হাতে জাদুর কাঠি আছে। পরিকে মানুষ শুভ, অশুভ দুটি বিশেষণই দিয়েছে। পরি মেঘের ওপারে বাস করে। রাতের অন্ধকারে তারা পৃথিবীতে আসে। তারা নাচে ও গানে পারদর্শী। পরি নিয়ে এমন নানা গল্পের শেষ নেই।

পরির ধারণাটি এসেছে পাগানদের কাছ থেকে। পাগানরা তাদের নিজস্ব দেবীকে পরির আদলে কল্পনা করে প্রচার করেছিল। পাগানরা বিশ্বাস করত, পরিদের জাদুকরি ক্ষমতা রয়েছে। তারা গহিন বনে বিচরণ করে। আকাশ কী সমুদ্রতল সর্বত্র তারা অবলীলায় পৌঁছে যেতে সক্ষম। তবে বিভিন্ন প্রাচীন বিশ্বাস প্রমাণ দেয়, পরিরা অবিকল মানুষের মতো। অনেক নৃজাতিগোষ্ঠী পরি বিশ্বাস জিইয়ে রেখেছে। বেশিরভাগের ধারণা, পরি আকারে খুব ছোট।

পরির অস্তিত্ব পুরোটাই গল্পনির্ভর। রূপকথা সাজাতে যত যা আয়োজন তার কোনোটিরও কমতি নেই পরির বেলাতে। অবশ্য পরির অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক কিছু কিছু রহস্য উন্মোচিত না হলেও ক্ষতি নেই। মিলটন রহমানের ‘পরি বৃত্তান্ত’ গল্পে আমরা তেমনি পরির দেখা পাই।

রাতে চারিদিকে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে সেইসঙ্গে কুইক্কাচড়ি ডাকলে গল্পকথকের দাদি ভয়ে দোয়া ইউনুস পড়ে নিম গাছের দিকে ঢিল ছুঁড়ে। ট্রেন, রেলগাড়ি, মালগাড়ি আস্তে আস্তে সব কিছুর শব্দ শেষ হলে শুরু হয় মুরালি কান্না। রাত যত গভীর হয়, চারিদিকে যখন নিস্তব্ধতা বিরাজ করে শুধুমাত্র তখনই মুরালি কান্না শুনতে পাওয়া যায়। কে যেন প্রতিদিন বাঁশি বাজায়। তবে তখন আর গল্পকথকের ভয় করে না মনের মাঝে এক ধরনের সুখানুভূতি কাজ করে।

লেদুবুর কাছ থেকে জানতে পেরেছে বংশীবাদকের নাম ভাষানি। তার দাদা এবং বাবাও নাকি বংশীবাদক ছিলেন। তারা নাকি রাতের আঁধারে পরি নামিয়ে আনত। কিন্তু পরি অস্থির হওয়ার আগে বংশীবাদকের দম ফুরিয়ে গেলে সর্বনাশ  হতো। পরিরা কণ্ঠনালিতে বাঁশি ঢুকিয়ে দিত। অনেকবার এভাবে মরতে মরতে তারা প্রাণে বেঁচে গেছে। আবার তারা বিরতিহীন বাঁশি বাজালে পরিরা পায়ে ধরে ক্ষমা চাইত ছেড়ে দেওয়ার জন্য।

২.

প্রযুক্তি এগিয়েছে। সেই সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে আমাদের সামাজিক ধ্যান ধারণাতেও। যদিও জীবন চলার পথে এখনও কিছু কিছু কুসংস্কার আমাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর মাঝে কিছু কুসংস্কার যেমন বেশ মজার, তেমনি কিছু কিছু কুসংস্কার আবার আমাদের ঠেলে দেয় অজানা বিপত্তির দিকেও। এসব কুসংস্কারের পেছনের কারণটা সবসময় পরিষ্কার না হলেও যুগ যুগ ধরে সমাজবদ্ধ মানুষ আগলে রাখে কুসংস্কার বিশ্বাসকে।

একবার ভাষানির দাদা আব্দুল বাঁশি বাজিয়ে এক মেয়েকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল। গ্রামের সবাই তা জানে। তাকে গ্রাম ছাড়া করা হলে বাঁশিপ্রেমীদের অনুরোধে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকে সবাই দরজা জানালা বন্ধ করে বাঁশি শুনত। একবার বাঁশিপ্রেমী রেজান মিয়া বাঁশির সুর শুনে আন্ধারমানিক এর কাছে গিয়ে দেখে আব্দুল্লাহর মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে এবং পরিরা চারিদিকে নাচছে। পরে তাকে পানি খাইয়ে সুস্থ করে। চলার পথে এ রকম হাজারো কুসংস্কারে বাঁধা আমাদের জীবন। আমরা জ্ঞান বিজ্ঞানে যতই উন্নত হই না কেন, আমাদের সমাজে এখনও অনেক কুসংস্কার টিকে আছে। যা অনেকে মজ্জাগত করে নেন। অনেকে সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নানা ধরনের গল্পের ফাঁদ পেতে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন গ্রাম্য মানুষের ধারণাকে আরও বেশি জোরাল করার চেষ্টা চালাত।

ছোটবেলা থেকেই তারা এমন নানা গল্প শুনে শুনেই বড় হয়েছে। তাই বাঁশি এবং ভাষানি দুটির প্রতিই তার আগ্রহ বেশি। কিন্তু ভাষানিকে দেখলে মনে হয় না সে বাঁশি বাজাতে পারে। গল্প শুরু করলে বলতেই থাকে। গল্পের মাঝেও অলৌকিকতা টেনে আনে। একবার ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে ঘুড়ির সুতা ছোট থাকা সত্ত্বেও অনেকদূর পর্যন্ত উড়ে। কিছুক্ষণ পরে তাল গাছে আটকে গেলে তালগাছ থেকে ঘুড়ি নামাতে চাইলে কে নাকি তাকে লাথি দিতে চায়। কিন্তু সে কাউকে দেখতে পায় না। তার চোখে মুখে তীক্ষè আলো মিশ্রিত শঙ্কা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

রহস্য আরও ঘনীভূত করার এবং মানুষের মনে কৌতূহল বাড়ানোর জন্য কোনো কথা না বলে সে পাহাড়ের দিকে হাঁটতে থাকে। এমনকি তার কাছে পরিদের গল্প জানতে চাইলে সে এড়িয়ে যায়। সাধারণ বাঙালি জীবনের সঙ্গে অতিপ্রাকৃতের সংযোগ সাধন একদিক দিয়ে বিশেষ সহজ, অপরদিকে বিশেষ আয়াসসাধ্য। সহজ এজন্য যে, আমাদের মধ্যে এখনও কতগুলো বিশ্বাস ও সংস্কার সজীবভাবে বর্তমান, যাদের অতিপ্রাকৃতের প্রতি একটা স্বাভাবিক প্রবণতা আছে। আবার অন্যদিকে আমাদের সাধারণ জীবন এতই বিশেষত্বহীন ও ঘটনা-বিরল যে, এর মধ্যে মনোবিজ্ঞানসম্মত উপায়ের দ্বারা অতিপ্রাকৃতের অবতারণা নিতান্ত দুরূহ।

৩.

প্রতিবছরই ভাষানি একবার করে পাগল হয়ে যায়। যদি বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে যাই তাই তাকে বেঁধে রাখতে হয়। হুজুর বলত বাঁশি বাজানোর জন্য এমন হয়েছে। প্রতিবছর কোথা থেকে যেন এক বৈদ্য এসে ভাষানিকে জিজ্ঞেস করত জুতা নিয়ে যাবে, নাকি ঝাটা। ভাষানি জুতা নিয়ে দক্ষিণের বিলের আলে গিয়ে কাত হয়ে পড়ে যেত। আর তাঁর মুখ দিয়ে ফেনা বের হতো। মানুষ বুঝত না এর রহস্য কী। মানুষকে বোকা বানানোর জন্য, মনে ভীতি জন্মানোর জন্য সে কল্পিত ও অলৌকিক ঘটনার অবতারণা করে। কিন্তু তারপরও ভাষানির বাঁশি থামেনি। গল্পকথকের খুব ইচ্ছে হতো রাতে বংশীবাদককে দেখার। কিন্তু লেদুবু বলেছে গেলে পরিরা নিয়ে যাবে বা মেরে ফেলতে পারে। অনেকে নাকি রাতে বংশীবাদকের কাছে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। আবার অনেকের লাশ চিতার পাশে ধানক্ষেতে পাওয়া যেত। তবে বিজ্ঞানের এই যুগে কুসংস্কারে বিশ্বাসী হওয়াটা খুব একটা মানানসই নয়। লোকের কৌতূহল দেখায় ধরা পড়ার ভয়ে এমন কয়েকটি ঘটনার পর ভাষানি কয়েকদিন বাঁশি বাজানো বাদ দিয়েছিল।

পরে আবার ভাষানি বাঁশি বাজানো শুরু করলে তার মন পুলকিত হয়। কারণ বাঁশির সুরের প্রতি টান তার এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রতি রাতে বাঁশি শুনে সেইসাথে পরিদের পায়ের ঘুঙুরের আওয়াজও শোনে। পায়ের শব্দ তার কাছে পরিচিত মনে হলেও ঘুঙুরের শব্দ অপরিচিত। অনেকটা জেলের কয়েদিদের পায়ের শেকলের মতো। সে মনে মনে ভেবে নিজেই একটা হিসাব মিলাতে থাকে নিশ্চয়ই পরিদের পায়ের আওয়াজ এমনই হয়। সেইসঙ্গে ভারী কিছুর আওয়াজ হতো। লোকদের ভয় দেখানোর জন্য এমনটা করা হতো।

গল্পকথক কয়েকদিন ভাষানিকে দেখতে না পেলে অন্যদের কাছ থেকে জানতে পারে ভাষানি দিনে বের হয় না। পরিরা তাকে খাবার-দাবার দিয়ে যায় এবং সে এখন ঘরে না পাহাড়ের এক টং ঘরে থাকে।

একদিন রাতে ভাষানির বাঁশি বেজে ওঠার সঙ্গে পুলিশ সাইরেন বাজাতে শুরু করলে কয়েকজন লোক রেল লাইনের দিকে অন্ধকারে দৌড়ে পালিয়ে যায়। ভাষানিকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। এটা সুস্পষ্ট যে সেখানে ভাষানি একা ছিল না। তার সঙ্গে আরও লোকজন ছিল যারা পুলিশ দেখে পালিয়েছে। আর গ্রামের অন্যদের মতো পরি এদের রাতের আঁধারে মেরে ফেলেনি। গল্পের এখানেই পাঠকের মনে রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে।

অনেক দিন পর আবার একদিন ভাষানির বাঁশির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। ভাষানিকে নিয়ে গ্রামে একটা খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ভাষানিকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল মূলত তার বাঁশির সুরে নামানো পরিরা নাকি মানুষের মাঠের ফসল থেকে শুরু করে লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট করে। অবস্থা এমন হয়েছে যে সাধারণ মানুষের মনে এখন এ ধারণা স্থির হতে যাচ্ছে যে রাতে ভাষানির বাঁশির সুরে পরিরা নেমে আসে তারাই অন্যের মালামাল লুট করে নেই।

৪.

পরি নিয়ে মাতামাতি সম্পূর্ণ কুসংস্কার। আর মানুষ কুসংস্কারকে ভালোবাসে। জীবন প্রণালীর পরিবর্তন, সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা, মনোবল বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সচ্ছলতাই পারে এসব ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে। আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ও সাহিত্যে ব্যবহৃত, লোকাচারে অহরহ উচ্চারিত বিভিন্ন অশরীরী চরিত্রের একটি হলো পরি। পরি নিয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে অনেক ভীতিকর কাহিনি প্রচলিত আছে।

গ্রামের মানুষ সহজ সরল এবং বোকা আর তারা এসব অলৌকিক ঘটনা বিশ্বাস করে তাই তাদের বোকা বানানোর জন্যই আড়ালে ভাষানি একটা চক্র গড়ে তুলেছিল। যারা মানুষের ফসল মালামাল লুট করে নিয়ে যেত। কিন্তু গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করে এই কাজ পরিরা করে। পুলিশ তাদের ধাওয়া করলে তারা ভাষানির নাম বলে চলে যায়। চলে যাওয়ার কারণ ওরা পরি নয়, মানুষ। তাই ভাষানি বাঁশি বাজাতে শুরু করলে গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। একদিন ভাষানি কিছুক্ষণ বাঁশি বাজানোর পর তা থেমে যায়। একটা চিৎকার অন্ধকারকে যেন গলা টিপে ধরে।

সকালে সবাই বলতে থাকে ভাষানিকে খুন করা হয়েছে। এক বৃদ্ধ বলে বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ভাষানি পুলিশকে খবর দেওয়ায় ডাকাতদল তাকে খুন করেছে। আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না যে ভাষানি মূলত বংশীবাদক নয়। সে ডাকাত চক্রের একজন সক্রিয় সদস্য। আর তার পূর্বপুরুষরাই ডাকাতির সুবিধার্থে নানা অলৌকিক ঘটনার অবতারণা করে। মানুষের মনের ভিতর ভীতি সৃষ্টি করে তারা তাদের কাজ বিনা বাধায় সম্পাদন করতে চেয়েছিল।

বাস্তব জীবনের সঙ্গে অতিপ্রাকৃতের সমন্বয় সাধন অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবে সে যে সুরধর্ম, যে কল্পনার ঐশ্বর্য ‘পরি বৃত্তান্ত’ গল্পে প্রোথিত, অতিপ্রাকৃত রহস্যাবৃত গল্প সেই সুরধর্ম, সেই কল্পনার ঐশ্বর্যই বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ‘পরি বৃত্তান্ত’ গল্পের প্লট বলতে সমস্ত কাহিনিতে আখ্যান ছড়িয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে রহস্যাবৃত ঘটনার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। প্রথমদিকে এটি অতিপ্রাকৃতের আদলে লেখা একটি গল্প মনে হলেও শেষ দিকে রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।

উপাদান বিশ্লেষণ করে গল্পটিকে বিশেষ পর্যায়ে ফেলা যায়। আমাদের প্রতিদিনের বাস্তব জীবনের মধ্যে অতীন্দ্রিয়, অতিপ্রাকৃত ও ভৌতিক রহস্যের আবির্ভাব ও অভিব্যক্তিই সেই উপাদান। যে প্রাকৃতিক দৃশ্যের মধ্যে লেখককে এই অনৈসর্গিকের অবতারণা করতে হয়েছে তাতেও অজ্ঞাত অপরিচিতের সুদূর রহস্য মাখানো।

সুকৌশল ঘটনা সন্নিবেশে গল্পটির সমগ্র আখ্যানভাগ স্বরূপে দানা বেঁধেছে। বিশেষ করে ভাষানির মৃত্যু ট্র্যাজেডির রূপটি। ‘পরি বৃত্তান্ত’ গল্পে একটা অলৌকিকতা আছে যা একটা মানসিক বিষয় গল্প শেষে আমাদের আচ্ছন্ন করে থাকে। অতিপ্রাকৃতের স্পর্শ আমাদের চিত্তে অনুভূত হয়। ‘পরি বৃত্তান্ত’ গল্পের গল্পভাষা লেখকের সুদূর কল্পনার ঐশ্বর্য গল্পটিকে অতুলনীয় রহস্যময়তায় রূপদান করেছে। অতিপ্রাকৃতের শিহরণ একটা চূড়ায় এসে উঠেছে, অতীন্দ্রিয় অনুভূতিতে উচ্চ পর্যায়ে চড়েছে, সেখানেই কল্পনার মুক্তগতি ও সহজ সুরধর্মের পরিচয় মেলে যখন ভাষানির লাশ পাওয়া যায়। পাঠক রহস্যাবৃত হয় এবং চিত্রকল্প ভরিয়ে তোলে। মূলত গল্পটি কিছুটা অতিপ্রাকৃতের আদলে তৈরি করা হলেও এর মধ্যে রহস্যের আড়ালে আবডালে অন্য কাহিনি ঘনীভূত হয়ে এগিয়ে গেছে।

গৌতম বিশ্বাস

রাসু চোর

ছোটগল্প মানব মনের অপরিহার্য অনুভূতির এক সুললিত বহিঃপ্রকাশ। গৌতম বিশ্বাস তাঁর ‘রাসু চোর’ গল্পে মানবজীবনকে দেখেছেন নির্মোহ দৃষ্টিতে। জীবনের সৌন্দর্য, পঙ্কিলতা উভয় উপাদানে সৃষ্ট চরিত্র ‘রাসু’। গ্রামীণ আবহে রচিত চোর গল্পটিতে রাসু নামক এক চোরের জীবনের বৃত্তি, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ সর্বৈব জীবনবোধ ও জীবন-দর্শন উচ্চারিত হয়েছে। পেশায় সে চোর। চোর হিসেবে তার একটা খ্যাতিও আছে।

ভালো বা খারাপ কাজের সমাহারে মানুষের চারপাশের জীবন নিয়ত আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু জীবনের সার্থক বিকাশের জন্য প্রয়োজন কেবল ভালো কাজ, খারাপ কাজগুলো মানুষকে সচেতনভাবে পরিহার করে চলতে হয়। চুরি করাও একটা খারাপ বা গর্হিত কাজ। তাই নিতাই মাস্টার গল্পের শুরুতেই রাসু চোরকে চোর্যবৃত্তি থেকে সৎ পেশায় ফিরে সৎভাবে জীবনযাপনের জন্য উৎসাহিত করেন। কিন্তু নিতাই মাস্টারের কথা শুনে রাসু হেসে ফেলে। হাসির কারণ জানতে চাইলে সে বলে, হাসলে মন ভালো থাকে, মন দিয়ে কাজ করতে পারা যায়। হোক সে চুরি কিন্তু এ কথায় কাজের প্রতি তার একাগ্রতা বা একনিষ্ঠতা ফুটে ওঠে।

লেখক এমনই এক চোরকে গল্পে উপস্থাপন করেছেন যে কি না উত্তরাধিকার সূত্রে চোর। যেহেতু চুরি করাটা তার বংশপরম্পরা থেকেই চলে আসছে, তাই সে বাপ-দাদার পেশা শত ইচ্ছাতেও ছাড়তে পারে না। সে চেষ্টা অবশ্য সে কখনও করেইনি। চুরিবিদ্যা তার রক্তে মিশে আছে। তাই সন্ধ্যা হলেই মন যেন উচাটান হয়। অনেক সামাজিক বৈষম্য, অবিচার, স্বার্থপরতার নগ্ন বাস্তবতায় জীবনের কাছ থেকে পলায়নপর হয়ে ওঠে। এ ছাড়াও এ কাজের প্রতি তার এক ধরনের মায়া বা ভালোবাসা জন্মে গেছে। পেশাটাকে সে গভীরভাবে ভালোবেসে হৃদয়ে ধারণ করেছে। কেউ বোঝাতে বা বলতে এলেই সে বলে, কেউ বলতে পারবে না যে সে জীবনে চুরি করেনি। সে হোক বাবার পকেট বা মায়ের আঁচল থেকে। চুরি চুরিই। যুক্তি দিয়ে তার কাজকে সে নিজেই স্বীকৃতি দেয়।

এমনকি ছেলে মেয়েরা বড় হয়েছে রাস্তায় বেরোলে সবাই তাদের চোরের সন্তান বলবে এ কথা বলেও তাকে চুরি থেকে ফেরানো যায়নি। কারণ সে জীবনে ঐ একটা কাজই শিখেছে। এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধনে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে। সেখান থেকে ফিরে অন্য কোনও কাজ করার ইচ্ছে তার নেই। ছোট বেলাতে এমন মুহূর্ত তার জীবনেও এসেছিল। স্কুলে সবাই তাকে চোরের ছেলে বলে খ্যাপাত। সে অনেকটা দৃঢ়তার সঙ্গেই তার বাবার চুরির কথা অকপটে স্বীকার করত। কারণ তার ছোট অবুঝ মন তখনও বোঝেনি চুরি করা ভালো না খারাপ। তাই প্রথম দিকে পাত্তা না দিলেও তার ভীষণ খারাপ লাগে। বাবাকে জানালে স্কুল বাদ দিয়ে তার কাছে চুরি বিদ্যা শিখতে বলে। মায়ের নিষেধ থাকলেও তা শোনা হয়ে ওঠেনি। তখন সে জেনেছে চুরিও এক ধরনের শিল্প। সে বিদ্যা শিখতে অনেক সাধনার প্রয়োজন। বাবা-মা মারা গেলেও বাবার অমোঘ বাণী আজও মনে আছে। ‘বাপ রে, দুনিয়ায় চুরি সবাই করে। জেবনে কোনও দিন চুরি করে নাই, এমন মানুষ তুই এ সোংসারে পাবি নে। তাই মানষে যতই  ‘চোর’ কইয়ে দুয়ো দিক তাতে নিজেরে ছোট ভাববি নে। বরং নিজির পেশাডারে ভালোবাসিস। দেহিস তাতেই তোর উন্নতি হবে।’

তাই সবাই তাকে চোর বললেও তার খারাপ লাগে না। চোর হিসেবে তাকে যে পাহাড় সমান অপবাদ সহ্য করতে হয়—সব কিছু সে হাসি দিয়ে উড়িয়ে দেয়। কোনও অপমান সূচক বাক্যও তার গায়ে লাগে না। রাসু মন থেকে চুরির সঙ্গে জড়িত। রাসুর মনের মধ্যে বসবাস করে এক প্রকট দার্শনিকতা। জগতের সবাই চুরি করে। কেউ করে আইন বাঁচিয়ে, কেউ করে আইন ভেঙে। জগতে সবচাইতে বড় পেশা হলো চুরি। যে যত চুরি করতে পারবে সে তত বড় হবে। কারণ দুনিয়াটা চোরেরাই চালায়। রাসুর যুক্তির কাছে সবাই হার মানে। কেবল সে একাই চোর নয়, জগতের সবাই চোর। এ তৃপ্তিই তার পুঁতিগন্ধময় জীবনের সব কিছুকে নিঃশেষে মুছে নেওয়ায় সে হয়ে উঠেছে বিশুদ্ধ। তার জীবন হয়ে উঠেছে তাৎপর্যময়। এখানে রাসু চরিত্রের বিশেষ মাত্রা সংযোজিত হয়েছে।

২.

নিজের পেশা নিয়ে তার গর্ব হয়। যেন এর চেয়ে ভাল কাজ পৃথিবীতে আর একটাও নেই। চুরি করতে গেলে তার জগৎ সংসারের কিছুই বা কারওর কথা মনে থাকে না। তখন সে অন্য জগতের মানুষ হয়ে যায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে যেন একা-নিঃসঙ্গ অনিকেত। জীবনের এমন অনেক সত্যের সন্ধান সে পেয়েছে যা তাকে কবির মতো ভাবুক বা গভীর চিন্তাশীল করে তোলে।

তার কাছে চুরি একটা সাধনা। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে সনাতনের দোকানে চা খেতে খেতে মনে মনে চুরির একটা খসড়া করে ফেলে। কোন্ গ্রামে যাবে তারও একটা ছক এঁকে ফেলে। চোরেরা জীবনে বড় একা। ওদের আপন কেউ নেই। কবির মতো, ভাবুকের মতো, নিজের মনের মধ্যে ওরা লুকিয়ে বাস করে। যে স্তরের অনুভূতিই ওদের থাক, সে রুক্ষ শ্রীহীন সীমানার মধ্যে ওদের কল্পনা সীমাবদ্ধ হোক, ওদের অনুভূতি, ওদের কল্পনা ক্ষণে ক্ষণে বিচিত্র, পরিবর্তনশীল। অনেক ভদ্রলোকের চেয়ে ওরা বেশি চিন্তাশীল। জীবনের এমন অনেক সত্যের সন্ধান ওরা পায়, বহু শিক্ষিত সুমার্জিত মনের দিগন্তে যার আভাস নেই। তার ভাবুক মন দেখে অনেকেই তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা-তামাশায় মেতে ওঠে। অনেকে তাকে নিত্য নতুন মানুষ নিয়ে কাজের জন্য হিংসাও করে। রাসু চুরি করাটাকে অন্যায়ের চোখে দেখে না। তবে রাসু চোর হলেও তার ভেতরে একটা নীতিবোধ আছে।  সে কখনও নিজের গ্রামে চুরি করে না।

তাই কেউবা বলে চোরের পুরস্কার দেওয়া হলে সে পুরস্কারটা রাসু তার সততার জন্য পেত। সে চোর হলেও সৎ এবং নীতিবান সে চিত্রই ফুটে ওঠে। সামাজিক অস্থিরতা সমাজকে চরম নীতি বিবর্জিত ও দুর্নীতি পরায়ণ করে তোলে। সমাজের সব মূল্যবোধ ক্রমে ক্রমে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এমন একটি মূল্যবোধ বিবর্জিত দুর্নীতিপরায়ণ সমাজের চিহ্ন ক্রমেই সুস্পষ্ট হচ্ছে চলমান সমাজে। প্রত্যক্ষে হোক বা পরোক্ষে হোক এই সমাজের পরতে পরতে দুর্নীতি ও হননবৃত্তি অনুপ্রবেশ করছে বিরতিহীনভাবে।  সেই দুর্নীতি ও হননবৃত্তি মানুষকে চরম অমানবিক করে তুলেছে। আবার এরাই দেশ চালাচ্ছে। শুধু রাসু নয়, সমগ্র সংসার জীবনে চুরি চলছে নিরন্তর। চুরি উপজীব্য হয়ে উঠেছে। ফলে গল্পটি কেবল দু-চারটি চুরির প্রসঙ্গেই সীমিত নয়, বরং মানসে চৌর্যবৃত্তির অনুষঙ্গে যে স্বভাবটি প্রকটিত তা মাত্রই চোর। এই গভীর তত্ত্ব দর্শনটি ‘রাসু চোর’ নামক গল্পে উচ্চারিত।

রাসুর কাছে চুরি তার অস্তিত্বের অভিজ্ঞান। চুরির জন্য সে গভীর রাতের অপেক্ষায় থাকে। গ্রামের আর সবার বাড়িতে কারেন্ট থাকলেও তার বাড়িতে না থাকার কারণ শুধু অভাব নয়। তার থেকেও অভাবী মানুষ গ্রামে আছে কিন্তু অন্ধকার নিয়েই যেহেতু তার কাজ, অন্ধকার জগতে যেহেতু তার বিচরণ, তাই অন্ধকারের মাঝে থেকে সে তার চোখকে আরও উজ্জ্বল আর শানিত করে নেয়। যখন সবাই ঘুমিয়ে যায় সে সময় সে চুরির জন্য বের হয়। তার মতো রাতে আরেকজন জেগে থাকে। রাখোহরি হালদারের বাবা। সে তার বাবাকে দেখে না বলে রাসু মনে মনে তাকে গালি দিয়ে শান্তি পায়। বাবার চিকিৎসা করাতে পারে না কিন্তু অন্যের বিধবা বউকে অনেক কিছুই কিনে দেয়। তার চারিত্রিক শঠতা প্রকাশ পায়। আর এদিকে রাসু চোর হলেও তার মাঝে মানবিকতা বা মনুষ্যবোধ জাগ্রত। একবার এক বস্তা ধান নিয়ে তাকে চুরির বদনাম দিয়েছিল এই রাখোহরি। নিতাই মাস্টার তাকে বাঁচিয়ে ছিল সেবার। রাসু নিজে চোর সেজন্য সে অন্যের গোপন চাঞ্চল্য, চাপা উত্তেজনাকে আবিষ্কার করতে পারে। রাখোহরি হালদারের ভাবভঙ্গিতে সে তা বুঝতে পেরেছে।

তার চোখ মুখ দেখেই কোনো এক গোপন অভিসন্ধি অনুমান করার মত ধীশক্তি রাসু চোরের আছে। তাই মিথ্যা অপবাদে তার মধ্যে এক ধরনের বিক্ষুব্ধতা কাজ করে। অপবাদ সত্যি করার ইচ্ছাও মনের মাঝে প্রবল হয়। তার মনের মধ্যে এক ধরনের জেদ চেপে যায়। সে বাড়িতে চুরি করার ইচ্ছা পোষণ করে। কিন্তু সাহস পায় না যদি ধরা পড়ে যায়। মূলত অস্তিত্ব সংকটের কথা চিন্তা করে সে আর সাহস পায়নি।

৩.

প্রকৃতি ও মানুষ মিলে বিশ্বের সৃষ্টি সৌন্দর্য সম্পূর্ণ হয়েছে। বাস্তবকে প্রকৃতির সঙ্গে জীবনে মিশিয়ে নিবিড়ভাবে চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন লেখক। সীমাবদ্ধ জীবনের আস্বাদ পাওয়া যায় প্রকৃতির সংস্পর্শে এসে। প্রকৃতিকে আমরা দেখি তাকে আমরা স্পর্শ করি, তার গন্ধ পাই কিন্তু তার স্বরূপটি আমরা ঠিক বুঝি না। তার রহস্য উদঘাটন করতে পারি না। তার অসীমতায় আমরা অভিভূত হই। বুদ্ধির দ্বারা যাকে সম্পূর্ণরূপে আপনার করতে পারি না লেখক ‘রাসু চোর’ গল্পে প্রকৃতির সঙ্গে মানব মনের যে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে সেটি দেখিয়েছেন। প্রকৃতি আমাদের জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে নিরন্তর থাকে তা নয়, তার সঙ্গে আমাদের হৃদয়ের সংযোগ আছে। প্রকৃতি আর আমাদের কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে।

রাসু নিকষ কালো আঁধার রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাজার তারার  রূপমাধুরী দেখছে। রাতের সৌন্দর্য দেখে সে স্থির থাকতে পারছে না। নিবিড়ভাবে অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে চায় সে। কিন্তু সময়ের স্বল্পতায় তা হয়ে ওঠে না। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতি প্রেম, রাতের আকাশ, তারা মুগ্ধ করে রাসুকে। রাতেরও আলাদা একটা সৌন্দর্য বা মুগ্ধতা আছে। যা তাকে আকৃষ্ট করে। রাসু চোর হলেও তার যে একটা শৈল্পিক মন আছে তা সুস্পষ্ট। প্রতিদিন একই রাস্তা দিয়ে সে চুরি করতে যায়। এ কারণে এ পথটা এবং এর অন্ধকার তার চোখে সয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ করে তার সামনে অন্ধকার যেন নড়ে উঠল। গাছের আড়ালে থেকে দৌড়ে সামনে আঁধারে মিশে পালিয়ে গেল। তাকে দেখেও কেউ ভয় পায় এটা ভাবতেই তার ভালো লাগে। তার মতোই হবে হয়তোবা কোনও একটা চোর। রাতের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে। অন্য গ্রহের প্রাণীদের সম্পর্কে এবং গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে ভাবতে ভাবতে আকাশের পানে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে সে হুমড়ি খেয়ে এক পাটের বস্তার ওপরে পড়ে। রাসু চোর বলেই চুরির বিষয়ে ভাগ্যের প্রসন্নতা-অপ্রসন্নতায় তার গভীর বিশ্বাস। তাই ভাগ্য সুপ্রসন্ন ভেবে লোভে পড়ে সে অন্যের ফেলে রাখা বস্তা নিয়ে এক অনির্বচনীয় আনন্দের সঙ্গে বাড়ি ফেরে। স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে বস্তা খুললে বস্তার ভিতরে একটি বাচ্চার হাত-পা বাঁধা লাশ দেখে আঁৎকে ওঠে। সে বুঝতে পারে না এমনটা কীভাবে হলো। এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। অস্তিত্ব সংকট থেকে বাঁচার জন্যই সে বস্তাটি পুকুরে ফেলতে নিয়ে যায়। চিরায়ত অভ্যস্ততা রাসুর চিন্তাকে ভেঙে দেয়। শেষ পর্যন্ত অভ্যাসের কাছে পরাজিত হয়। তার হৃদয়ে এক গভীর দর্শন দানা বাঁধে—জগতে চোর নয় কে? সবাই চুরি করে।

৪.

মূলত গল্পটির মূল উপজীব্য এই যে, জগতের সমস্ত মানুষই কোনও না কোনওভাবে চোর। ভদ্রতার আবরণের অন্তরালে প্রত্যেকেই চুরি করে তার প্রত্যাশিত অভাব মেটাচ্ছে। কোনওটা বা লোক চক্ষুর সামনে কোনওটা বা লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটছে। গল্পের প্রধান চরিত্র রাসু। একজন চোরের জীবন বৃত্তান্ত, তার চাওয়া-পাওয়া, সততা, পাপ-পুণ্য, ক্ষোভ-বিক্ষোভ গল্পের জমিনে উচ্চারিত হয়েছে। তার জীবন ও জীবিকা পরিচালিত হয় চুরি করা অর্থে।

সাহিত্য মানবমনের শিল্পভাষ্য। এই শিল্পভাষ্যে মানবমনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রতিবিম্বিত হয়। বিষয়বস্তু, ভাবসম্ভার, অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, চরিত্র ও লেখকের জীবনোপলব্ধি বাহক হিসেবে সাহিত্য শিল্পের নামকরণ হয়ে থাকে। গৌতম বিশ্বাসের ‘রাসু চোর’ নামক গল্পটির মৌল উপজীব্য বিষয় সংক্ষিপ্ত নামটির মধ্য দিয়ে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন।

গৌতম বিশ্বাসের লেখনী প্রাঞ্জল, সহজপাঠ্য। যা পাঠককে রাসু চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হতে আরও সহায়তা করে। রাসু চরিত্রে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে লেখক তার মাঝে অসাধারণ গভীরতা বা দার্শনিক চিন্তার বীজ বপন করে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েছেন।

‘রাসু চোর’ গল্পটি পড়তে গিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চোর’ নামক ছোটগল্পের কথা মনে পড়ে গেছে। গৌতম বিশ্বাসের ‘রাসু চোর’ এর সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চোর’ উভয়ের গল্পের মূল বিষয় চৌর্যবৃত্তি কেন্দ্রিক হলেও তাদের মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য বিদ্যমান। তারপরও মনে হয়েছে লেখক ‘চোর’ গল্পটি পড়েই এই গল্পের কাহিনি নির্মাণ করেছেন। কিছুটা নিজস্বতা ও শৈল্পিকতায় লেখাটি সৃজনশীলতার দাবি রাখে। লেখকের লেখার ধরন, বর্ণনা, গল্প বলার ভঙ্গি, গল্পের প্লট, সবকিছুই ভালো লেগেছে। চেষ্টা করলে এবং লেগে থাকলে ভবিষ্যতে লেখকের কাছে আরও ভালো কিছু লেখা পাবো এই আশাই করি।

নাহার তৃণা

অন্ধ সময়ের গল্প এবং একজন আহাদ সাহেব

সাহিত্যের বিষয়বস্তু উদ্ভূত হয় চরিত্রের সূত্রে। আবর্তিত হয় চরিত্রকে কেন্দ্র করে এবং পরিণতি পায় চরিত্রের ক্রিয়াকলাপে। সাহিত্যকর্মই সুষ্ঠু চরিত্রায়ণ ব্যতীত সার্থকতা লাভ করতে পারে না। কারণ চরিত্র হলো বাস্তবজগতের মানুষের প্রতিনিধি এবং পর্যবেক্ষক। সাহিত্যিক তাকে নিয়েই আখ্যান সৃষ্টি করে শিল্পসুষমায় প্রকাশ করেন। ফলে চরিত্রই হয়ে ওঠে কোনও কোনও ক্ষেত্রে সভ্যতার ধারক, মানবতার মডেল। আবার কখনও কখনও পাঠকের অনুকম্পায় সহানুভূতি কিংবা ঘৃণাদ্বেষ আদায় করে পাঠকচিত্তকে নাড়া দিয়ে যায়। বস্তুতই চরিত্র সাহিত্যের অন্যতম প্রভাব সৃষ্টির উপাদান। কোনও সাহিত্যকর্ম কতটুকু শিল্পসফল তা নির্ভর করে লেখক কীভাবে তাঁর চরিত্রটিকে রূপায়িত করছেন এবং চরিত্রটির সক্রিয়তা কী এসব বিষয়ের উপর। নাহার তৃণার ‘অন্ধ সময়ের গল্প এবং একজন আহাদ সাহেব’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ধর্মভীরু আহাদ সাহেব।

গল্পটিতে লেখক নিজস্ব চিন্তাচেতনার প্রকাশ্যে স্যাটায়ারের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতির মাত্রিকতা ও অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি অভক্তি দেখিয়ে লেখক এখানে ধর্ম নিয়ে মানুষের ধর্মান্ধতা দেখিয়েছেন। এ ছাড়াও এ গল্পটিতে লেখক হিন্দু-মুসলিমের দাঙ্গার ঘটনাটিও তুলে ধরেছেন। বাংলার বুকে ব্রিটিশ যখন গেড়ে বসে নানা অত্যাচারে ভারতবাসীর জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে, তখন ভারতবর্ষের মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে না তুলে ধর্মের আচার-আচরণ ও বাহ্যিক বিষয় নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের সংঘাত-সংঘর্ষে লাখ লাখ ভারতবাসীর জীবন বিপন্ন হয়। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে তারা একে-অপরে সংঘাত-সংঘর্ষে মেতে ওঠে। তার প্রভাব আপামর জনগণের ওপর কীভাবে পড়েছিল; সম্পর্কের চিড় ধরেছিল এবং হিন্দু-মুসলিমের বৈষম্য তৈরি হয়েছিল এগুলো তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে গল্পটিতে মানব ধর্মের জয় দেখানো হয়েছে বা লেখকের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।

আহাদ সাহেব বেশ খুঁতখুঁতে এবং ধর্মপ্রবণ মানুষ। অনেকটা রক্ষণশীল এবং গোড়া মুসলিম তিনি। আমেরিকায় ছেলের কাছে ঘুরতে গেলে সেখানে রুমের বাইরে তাকালে সকাল, বিকাল, রাত সবসময় তার চোখে খ্রিস্টানদের ক্রুশ পড়লে মনে মনে তিনি ক্ষুব্ধ হন। এ কারণে অসংখ্যবার আস্তাগফিরুল্লাহ পড়েন। আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ঘণ্টায় ঘণ্টায় চার্চের ঘড়িটার ঢং ঢং আওয়াজেও তার বিরক্তি যেন দ্বিগুণ হয়ে ওঠে।

যার নিজের ধর্মে বিশ্বাস আছে, যে নিজের ধর্মকে চিনেছে সে কখনও অন্যের ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না। অন্যের ধর্মকে ছোট করে দেখার মধ্যে কোনও কৃতিত্ব নেই। নিজের ধর্মকে যদি যথাযথভাবে বুঝতে পারা যায় এবং নিজের ধর্মকে যদি ভালোভাবে অনুধাবন করা যায় তাহলে অন্য ধর্মের প্রতি আর কোনো ঘৃণা বোধ থাকে না। এসব দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় আহাদ সাহেব একজন ধর্মান্ধ মানুষ ছিলেন। তাই অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি তার এত বিদ্বেষ।

আহাদ সাহেবের ছেলে শাহেদ বাবার এমন আচরণ দেখে হাসে। আহাদ সাহেব অনেকটা কাঠমোল্লা হলেও শাহেদ কিন্তু মানব ধর্মে বিশ্বাসী। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একাকিত্বের বেড়াজাল কাটাতে তিনি প্রতিবছর একবার করে ছেলের কাছে আসেন। এ ছাড়া নাতনির প্রতি মায়া যেন তাকে বহুদূর থেকে আহ্বান করে নিয়ে আসে। দেশে প্রতি ওয়াক্ত মসজিদে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও এখানে শুধু শুক্রবার ছাড়া সে সুযোগ নেই। সব মিলে ইহুদিদের দেশে তার মন যেন টেকে না।

২.

এবার এক বিশেষ কারণে সে আমেরিকা এসেছেন। তাদের মনসাতলার পুরোনো এক প্রতিবেশী মন্ট্রিলে থাকেন। ভদ্রলোকের এক আত্মীয় ছেলের সঙ্গে শাহেদ চাকরি করে সেই সূত্রে তাদের মাধ্যমে খোঁজ পাওয়া। ভদ্রলোক বিশেষভাবে তাকে অনুরোধ করেন একদিনের জন্য হলেও যেন সে মন্ট্রিলে এসে তার সঙ্গে দেখা করে যায়। তার মায়ের কিছু জিনিস তার কাছে গচ্ছিত আছে। মায়ের জিনিসের কথা শুনেই শুধু আহাদ সাহেব আগ্রহ দেখান। মায়ের প্রতি ভালোবাসায় তাকে টেনে নিয়ে যায় মন্ট্রিলে।

মানুষ-ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্কই সবচেয়ে বড় সত্য; আত্মিক বন্ধন বা সম্প্রীতিই বড় ধর্ম। ধর্মীয় বিভেদ মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধনের প্রধান অন্তরায়। মানুষের মনুষত্ববোধ জাগ্রত হলেই ধর্মের সত্য উন্মোচিত হবে। মানুষকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান করা মানব ধর্মের মূলমন্ত্র। সমাজে মানব ধর্ম প্রতিষ্ঠা হলে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত হবে। সাম্প্রদায়িক বিভেদ দূর হবে। গল্পের শাহেদ তার বাবার মতো সাম্প্রদায়িক নয় অসাম্প্রদায়িক এবং মানব ধর্মে বিশ্বাসী। সে তার দাদির মতো হয়েছে। আহাদ সাহেবের মা মিশুক হলেও তার বাবা ছিলেন গম্ভীর। তবে তার সঙ্গে বাবা-মা কারও চেহারা এবং আচরণে কোনওটাতেই মিল নেই।

ছোটবেলা থেকেই বাবা-মার প্রতি আহাদ সাহেবের ক্ষোভ ছিল। ক্ষোভের কারণ ছিল স্বদেশ ছেড়ে যখন তারা গেছে তখন পাকিস্তান রেখে হিন্দু-অধ্যুষিত ভারত কেন বেছে নিয়েছিল; অনেকবার সে প্রশ্ন করেও উত্তর পায়নি। পৃথিবীতে সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে যে ধর্মটি সবচেয়ে বড় সেটি হলো মানবধর্ম। যেখানে কোন হিংসা-বিভেদ থাকতে নেই। আত্মার সঙ্গে আত্মার মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রাণের মিলনেই লুকিয়ে আছে আদত সত্য। এই সত্য উপলব্ধি করতে পারলে প্রাণের মিলন ঘটাতে পারলে ধর্মের বৈষম্য কখনও হিংসার ভাব আনে না। অথচ এ মহান সত্যটিকেই আহাদ সাহেব স্বীকার করতে চান না।

নিজের দেশের আত্মীয়তার শেকড় উপড়ে ফেলে অন্য দেশে যে কী সুখ পেয়েছিল সেটা তার জানা হয়নি। জন্মের অধিকারে ভারত নামের উপর কিছু অধিকার জন্মালেও এ ছাড়া আর কোনো টানই বোধ করেননি। পাকিস্তান নামে দেশের প্রতি বরং তিনি একটা মমত্ব অনুভব করেন। শেকড়ের সন্ধান আজও তাকে পিছু টানে। নিজের দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি এক ধরনের বন্ধন ও আকর্ষণ অনুভব করে। তার দেহ-মন বিশ্বাস-আদর্শ সবকিছুই স্বদেশের জন্য টানে। মা, মাতৃভূমির প্রতি তার চিরায়ত এ ভালোবাসার কথা মনে হতেই সে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে।

তার মায়ের জিনিস ভিন্ন দেশের মানুষের কাছে আছে কি করে তার হিসাব মিলাতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুশান্ত রায়চৌধুরীর সঙ্গে তিনি দেখা করবেন।

৩.

আহাদ সাহেবের বর্তমান বয়স ৭৩ হলেও প্রতিদিন নিয়মিত ঘণ্টাখানিক হাঁটাহাঁটি, খাওয়া-দাওয়াতে অত্যন্ত সচেতন এবং নিয়মনিষ্ঠা মতো নামাজ কায়েম করাতেই তার শরীর হয়তো এখনও ফিট আছে। এখন পর্যন্ত তার কোনও শারীরিক অসুস্থতা দেখা যায় নি। প্রতিবছরই তিনি বিভিন্ন ইসলামি সম্মেলনগুলোতে হাজির হন। এ ছাড়াও চিল্লা ও ইজতেমায় যান। হজ পালন করেছেন কয়েকবার। ইহুদি-নাসারার দেশে কিছুতেই তিনি মরতে চান না। এখানে কবরে শুয়ে তিনি এক বেলার জন্য আজান শুনতে পাবেন না; কোনও নামাজি তার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে হাত তুলে দোয়াও করবে না। এসব কথা চিন্তা করেই তিনি নিজ বাসভূমে মৃত্যু কামনা করেন। এ কথায় দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার ধর্মান্ধতাও প্রকাশ পায়।

সমস্ত কৌতূহল ছাড়িয়ে অবশেষে সে ছেলেকে নিয়ে সুশান্ত রায়চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে কানাডায় উপস্থিত হন। আহাদ সাহেব অত্যন্ত ধর্মভীরু এবং ধর্মান্ধ মানুষ। তার ওপর তিনি এক বিধর্মী মানুষের বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকতে চান না। কিন্তু সুশান্ত রায়চৌধুরী তাকে এ শর্ত দেন যে, পুরো কাহিনি শোনার পর তার মায়ের গচ্ছিত জিনিসটি পাবেন। এ কথা শুনে তিনি চরম ক্ষুব্ধ হলেন। আহাদ সাহেব নিজ ধর্ম সম্বন্ধে অন্ধভাবে বিশ্বাসী হলেও অন্য ধর্মে বিদ্বেষী ছিলেন। সামাজে যে সব মানুষ নিজ ধর্ম সম্বন্ধে উগ্র ও চরমপন্থি এবং অন্যের ধর্ম বিষয়ে বিদ্বেষমূলক মনোভাবাপন্ন তাদের ধর্মান্ধ বলে চিহ্নিত করা হয়। তার দৃষ্টিভঙ্গি অন্য ধর্মের অনুসারীদের রীতিমত মনুষ্য পদমর্যাদা দিতেও অস্বীকার করে। বিধর্মীদের নিয়ে তার মনে বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে আছে। কোনও উপায়ান্তর না দেখে অগ্যতা তাদের ঘটনা শুনতে হলো।

৪.

কাঞ্চনপুরের রায়চৌধুরীদের এক সময় অনেক নামডাক ছিল। সেই রায় পরিবারের চার ছেলেমেয়ের সবচেয়ে ছোট ছিল সুশান্ত। তাদের পরিবারের মেয়েদের মত ছেলেরাও অত্যন্ত সুন্দর ছিল। আশালতার সঙ্গে তার বয়স কাছাকাছি হওয়াতে দুই ভাই-বোনের মাঝে প্রচণ্ড ভাব ছিল। তখনকার সময়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাবে প্রকাশ্যে রূঢ়তা দেখেনি কেউ। মুন্সিবাড়ির সঙ্গে চৌধুরি বাড়ির সম্পর্কটা ছিল নিবিড়। মুন্সি বাড়ির ছোট ছেলে আর রায়চৌধুরীদের বড় ছেলে প্রশান্তের বন্ধুত্ব ছিল হরিহর আত্মা। বিভিন্ন পালাপার্বণে একে অপরের উৎসবে অংশগ্রহণ করত। এমনকি বেলালদের কোনও বোন না থাকায় তার মা আশা এবং চারুকে নিজের মেয়ের মত ভালোবাসত। মুন্সিচাচার মতন ভালো মানুষ কাঞ্চনপুরে ছিল না। গ্রামের মানুষগুলোও সহজ সরল ছিল। অথচ রাজনীতির বিষ এক সময় এই সহজ সরল মানুষগুলোর মনে বাসা বাঁধে।

১৯৪০-এর দশকে ভারতের গণপরিষদের দুটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ছিল মুসলিম লীগ ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন ভারতীয় নেতৃবর্গের হাতে ব্রিটিশ ভারতের শাসনভার তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রাখে। এই প্রস্তাবে একটি নতুন ভারত অধিরাজ্য ও তার সরকার গঠনেরও প্রস্তাব জানানো হয়। এর অব্যবহিত পরে, একটি বিকল্প প্রস্তাবে হিন্দুপ্রধান ভারত ও মুসলমানপ্রধান পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কংগ্রেস বিকল্প প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। এই প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে এবং একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে মুসলিম লীগ ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট একটি সাধারণ ধর্মঘটের (হরতাল) ডাক দেয়।

এই প্রতিবাদ আন্দোলন থেকেই কলকাতায় এক ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম হয়। যখন কলকাতায় দাঙ্গা চলতে থাকে তখনও কাঞ্চনপুরে কোনো সহিংসতা হয়নি। যদিও তখন থেকেই আবহাওয়া গরম হতে শুরু করে। গ্রামে মুসলিমরা উত্তেজিত অবস্থায় আছে এবং গ্রামের মুসলিমেরা হিন্দু বিদ্বেষ ছড়ানোর পাশাপাশি মসজিদগুলোতে জাতিবিদ্বেষ- মূলক বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা শুরু করে। মুসলিমদের সব থেকে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-ফিতরের দিন থেকেই মানুষের মনে আশঙ্কা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। পরিকল্পিতভাবে নানা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হলেও দুই পরিবারের আত্মীয়তার ওপর কোনও প্রভাব না ফেললেও গ্রামের মানুষগুলো ভেতরে ভেতরে বদলে যেতে থাকে।

৫.

এমন এক সময়ে সুশান্তের বড় মামা কলকাতা থেকে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর কয়েক দিন আগে এসে কাঞ্চনপুরে উপস্থিত হলেন। অনেকের অগোচরে এপারে ছেড়ে ওপারে চলে যাওয়া তার পরিচিত একটি ব্যবসায়ী পরিবারের কাছ থেকে তিনি খবর পেয়েছেন খুব শীঘ্রই কাঞ্চনপুরের অবস্থাও খারাপ হতে যাচ্ছে। তাই তিনি তার একমাত্র বোন এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকায় তাদের কলকাতায় নিয়ে যেতে চান। তাই তার বড়মামা মা, ঠাকুমা, মীরামাসি ও বড়দিকে নিয়ে কলকাতায় চলে যান। আশালতাকে ছেড়ে সুশান্তও যেতে চায়নি। লক্ষ্মী পূজার পরের দিন বাড়ির চাবি মুন্সি চাচার হাতে তুলে দিয়ে ওরা রওনা দিবে এমন পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু হঠাৎ করে সাহাপুর বাজারে আগুন যেন রায়চৌধুরীর বাড়ির দিকে ধেয়ে আসে। বাড়িতে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। এক দল লোক আল্লাহু আকবার বলে অসহ্য এক আক্রোশ নিয়ে হাতে ধারালো অস্ত্র সহ উপস্থিত হয়। তারা পুজোমণ্ডপে আগুন ধরিয়ে দিলে আতঙ্কে সুশান্তের ছোট কাকা তাকে নিয়ে পুকুর পাড়ে গিয়ে লুকায়। তাকে রেখে খবর আনতে গেলে ফিরে এসে জানায় সবাই মারা গেছে।

সুশান্তের জীবনের স্মৃতির অ্যালবাম রুদ্ধ হতে থাকে। সে সেই হৃদয়বিদারক অতীতে ফিরে যায়। যে স্মৃতি সে কখনওই ভুলতে পারবে না। প্রিয়জন হারানোর বেদনা যে কত নির্মম ও বেদনাময় সে তা অনুভব করে। সে নস্টালজিক হয়ে পড়ে।

তিন দিনের মাথায় আশালতার খোঁজ পাওয়া যায়। ততক্ষণে তাকে শুধু শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়নি বরং তাকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষার কাজটা করা হয়ে গেছে। আশালতার খোঁজ পাওয়ার পরপরই ছোটকা আর দেরি করেনি। তাকে নিয়ে কলকাতায় রওনা দিতে উদ্যত হলে আশালতা যাবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে ছোটকা একটা কথাই বলেছিল, ‘শান্ত, মনে কর বাকিদের মতো আশাও মরে গেছে।’

কারণ একজন ধর্ষিত এবং ধর্মান্তরিত নারীর বাড়ি ফিরে যাওয়ার কোনো অধিকার বা উপায় ছিল না। সমাজ তাদের গ্রহণ করত না।

জীবনে যতই খারাপ মুহূর্ত আসুক না কেন ভাই-বোনের সম্পর্ক অবিনশ্বর। এ সম্পর্ক কখনওই ভাঙে না। ঋতু পরিবর্তনের মতো এক সময় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়ে যায়; আকাশের নীল বর্ণও কখনও কখনও কালো মেঘে ছেয়ে যায়। কিন্তু ভাই-বোনের সম্পর্ক সে তো হৃদয়ঘটিত। সে সম্পর্ক কখনও ভুলে থাকা যায় না। তাই ঘটনার তিন বছরের মাথায় কাউকে কিছু না বলে একদিন দিদির খোঁজে পূর্ববঙ্গে চলে গিয়েছিল সে। জানতে পারে গ্রামের মানষের জোর আপত্তির কারণে বেলাল আশালতাকে নিয়ে ভারতে চলে যায়। তাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিল সে যেন কোনওদিন তার বড় মামা বা অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করে। পরে বাধ্য হয়ে বেলাল তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওঠে। কারণ তখন আশা গর্ভবতী ছিল। স্বামী-স্ত্রী পরিচয় না দিলে তারা হয়তো বা আশ্রয়ের ওই জায়গাটুকু হারাত। আশালতা সবার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করলেও নিজের সন্তানকে কিছুতেই সহ্য করতে পারত না। সন্তানের দিকে তাকালেই তার ওই বীভৎস দিনগুলো মনে পড়ে যেত। তার অবস্থা খারাপ হলে বেলাল নিঃসন্তান আত্মীয়কে ছেলেকে বড় করার ভার দেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে বন্ধন তা ধর্মের মাপকাঠিতে নির্ধারিত নয়। স্নেহ -মায়া- মমতা এবং ভালোবাসায় মানুষে মানুষে সম্পর্কের মূলভিত্তি। তাই নিজের বোন না থাকলেও সে প্রশান্তের বোনকে নিজের বোনের মতনই ভালোবাসে এবং তাকে আগলে রেখে বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করে।

৬.

বেলাল চরিত্রটিকে একটি মাত্র শব্দের দ্বারা ব্যঞ্জিত বা বাঙময় করা যায়―মনুষ্যত্ব বা মানবিকতা। এ ছাড়াও প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয় দিতে গিয়ে সে নিজের জীবন পযর্ন্ত বন্ধুর বোনের দায়িত্ব পালনে ব্যয় করেছে। হয়তো দাঙ্গার দিন রায়চৌধুরী পরিবারের পাশে থাকতে না পারাতে সেই অনুশোচনায় দগ্ধীভূত হয়ে সে আজীবন নিজেকে জ্বলে পুড়ে নির্বাপিত হতে দিয়েছে।

দশ বছর হয়ে গেল আশা আর বেলাল মারা গেছে। সবার অগোচরে দুটো জীবন নষ্ট হল কিন্তু সে সাক্ষী হয়েও কিছুই করতে পারেনি। সে বয়সে তার কিছুই করার ছিল না। আর যেহেতু বেলালকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিল তাই আশার সঙ্গে দেখা করতে যেয়ে সে বেলালকে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের অপরাধী করতে চাইনি। কাহিনি শেষে সে আহাদ সাহেবকে আদেশের ভঙ্গিতে বাক্সটা খুলতে বললে আহাদ সাহেব যেন বাক্সটা খোলার কোনো আগ্রহই দেখাচ্ছিল না। সে মনে মনে চিন্তা করছে তার দুই ওয়াক্ত নামাজ কাজা হয়ে গেছে। তাছাড়া এ বাড়ির পরিবেশে তিনি মোটেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। এখানে আসা অবধি তিনি অসংখ্যবার আস্তাগফিরুল্লাহ পড়েছেন। বাড়িতে পূজার ঘণ্টার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আর এক মুহূর্ত এ বাড়িতে থাকতে চাচ্ছেন না। তাই তাড়াতাড়ি নকশাদার বাক্স এবং তার ভেতরে ছোট বাক্স খুলে বেশকিছু গহনা দেখে থমকে যান তিনি। যেন কোনও পাজল মিলানো খেলা চলছে দু-একটা টুকরো জুড়ে দিলে এই পাজলটা একটা গোটা জীবনকে সামনে এনে দাঁড় করাবে। আহাদ সাহেবের আপাতত অন্যের জীবন নিয়ে কোনও আগ্রহ নেই। গহনার নিচে কী আছে দেখার জন্য সে বাক্সটা খুলে থমকে যান। তার মধ্যে থাকা ১৭/১৮ বছরের এক অপরূপ সুন্দরী নারীর বাদামী হয়ে আসা একটি পুরোনো সাদাকালো ছবি পরম মমতায় তুলে আনেন। ছবিটির দিকে তাকিয়ে শাহেদের মুখটা খুব চেনা মনে হয়। অনেকটা তার বাবার মুখের মতই। ছবির পিছনে নাম লেখা—আশালতা রায়চৌধুরী। তাদের বুঝতে এতটুকুও বাকি থাকে না এই আশালতাই আহাদ সাহেবের জন্মদাত্রী মা। আহাদ সাহেব ধর্মান্ধ ছিলেন। অন্য ধর্মের মানুষদের সে অস্পৃশ্য মনে করত অথচ আজ সে তাদেরই সন্তান।

সাহিত্যের নামকরণ বিশেষ ধরনের আর্ট। সাহিত্যের নাম তার বিষয় বাস্তবতা হতে আহূত হয়। নামের মধ্য দিয়ে দর্পণের মতো সাহিত্যের মৌল উপজীব্য বিষয় প্রতিভাত হয়। যাতে নামটি হয়ে ওঠে রচনার প্রতিনিধি―যার মধ্য দিয়ে পাঠক রচনা পাঠের স্পৃহা লাভ করে। নাহার তৃণার ‘অন্ধ সময়ের গল্প এবং একজন আহাদ সাহেব’ নামটি যথার্থতার দাবিদার। কারণ এই গল্পটিতে ফুটে উঠেছে দুটি প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে নানাবিধ কলহ এবং কলহসমূহের মধ্যে ধর্মীয় কলহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধর্মীয় কলহই ১৯৪৬ সালে চরম দাঙ্গায় রূপ নিয়েছিল। গল্পটি বাস্তব ঘটনার নিরিখে লেখা। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে লেখক গল্পে কিছু হিংস্র মানুষের নগ্ন ছবি তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে উদার মানবিকতার চিত্রটিও তুলে ধরেছেন বিশেষ পারঙ্গমতায়।

মঈনুল হাসান

কাঞ্চনজঙ্ঘা

লেখক তাঁর দৃষ্টিতে অপূর্ব সুগভীর সহানুভূতি ও সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আমাদের জীবনের এক নিভৃত গোপন প্রবাহটি আবিষ্কার করে তাকে আপন ভাব ও কল্পনায়, রূপ ও রসে গল্পের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের জটিল সূত্রগুলোকে গভীর মনস্তত্ত্বসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুমিত ও মণিকা পরস্পরের প্রতি প্রত্যাশিত। কিন্তু আজ তারা যেন মনের দিক থেকে দু’জগতের বাসিন্দা। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ কিছু মুহূর্ত, কিছু বিষয় তাদের মন ও হৃদয়কে বিচিত্র ভাব ও অনুভূতিতে ব্যঞ্জিত করে তাদের অন্তরে নানা রূপে ও রসে চিত্রিত হয়েছে; হয়েছে নানা বর্ণে ও গন্ধে নন্দিত। জীবনের কিছু দুর্লভ গোচর দিক ও ঘটনার মধ্য দিয়েই এ গল্পের কাহিনি আবর্তিত।

যে কখনও চোখে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেননি, তার জন্য প্রথমবার কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখাটা যেন অনেকটা জীবনে প্রথম প্রেমে পড়ার মত। সে এক স্বর্গীয় অনুভূতি! সারাদিন তাকিয়ে থাকলেও চোখ ক্লান্ত হয় না। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলে দর্শকের চোখ জুড়িয়ে রাখে বহুরূপী কাঞ্চনজঙ্ঘা। ঊষালগ্নে মনে হয় যেন কাঞ্চনজঙ্ঘার শাদা বরফ কাঁচা সোনায় ছেয়ে গেছে। বেলা বাড়লে কাঁচা সোনা শরতের মেঘের বসন নেয়। দিনের মধ্যভাগে মনে হয় যেন এক খণ্ড প্রকাণ্ড মেঘ উত্তরের আকাশটা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে। সারাদিনে কোনও নড়চড় নেই। বিকেলে যেন বরফ লজ্জায় রাঙ্গা হতে শুরু করে। আর গোধূলি বেলায় পুরো কাঞ্চনজঙ্ঘা আবীর খেলায় মেতে ওঠে চপল কিশোরীর  মতো। রাতেও দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ। জোছনা রাতে যখন চারদিক উদ্ভাসিত হয়, তখন শাদা বরফ থেকে চাঁদের মৃদু আলো প্রতিফলিত হয় বরফ থেকে দর্শনার্থীর হৃদয় পর্যন্ত। জোছনা রাতে কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র বরফে প্রতিফলিত রূপালি চাঁদের আলোর স্বর্গীয় শোভা দেখে হয়ত এখনকার সৌন্দর্য পিপাসীরা মুগ্ধ হয়ে যায়! সুমিত ও মণিকাও নিজেদের সময় দিতে কাঞ্চনজঙ্ঘাতে যায়। পাহাড়ের খাঁজে সার সার দাঁড়িয়ে হোটেলগুলো। ঠিক যেন দাঁড়িয়ে নয় দোলনার মতো ঝুলে আছে। আর তার বারান্দাগুলো পায়রার খোপের মতো। ব্যালকনি রাস্তার দিকে মুখ করে আছে। ঠিক তেমনি এক হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সুমিত প্রকৃতির রূপ লাবণ্য দেখে মুগ্ধ, বিমোহিত হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে স্মৃতিতে ভাসতে থাকে।

নতুন জায়গায় এসে সুমিতের রাতে ঘুম হয় না। ছুটিতে এলে শরীরে আলসেমি কোনো বিলাসিতা নয় এ যেন ভ্রমণেরই একটা অংশ। কিন্তু ক্লান্তির কাছে নিজেকে পূর্ণ সমর্থন করতে সুমিতের অন্যরকম লাগে। শরীর সায় দিলেও মন সে ভাবে প্রস্তুত নয়। সুমিতের মনের গহিনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ক্ষত যা ঠিকমতো ঘুমোতে দিচ্ছে না। বার বার তাকে আঘাত করছে আর এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা মানব জীবনের এক মৌলিক ও প্রবল অনুভূতি। ভালোবাসার মহিমান্বিত স্পর্শে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়। আবার বেদনা মানুষকে রিক্ততার অতলান্ততায় নিক্ষেপ করে। ভালোবাসা একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি হলেও সমাজসত্তার দ্বারা ব্যক্তি-অনুভূতি প্রভাবিত ও রূপায়িত। ভালোবাসা আছে, মিলনের নিবিড় আনন্দ আর বিরহের মর্মচ্ছেদী অতলান্ত যন্ত্রণাও আছে।

সুমিত কখনও এখানে না এলেও তার মনে এই শহরের জীবনযাত্রার শুদ্ধতম ছবি খোদাই করে রেখেছিল। সত্যজিৎ রায়ের কাঞ্চনজঙ্ঘার কিছু ডকুমেন্টারি আগেই দেখে রেখেছিল। এখানকার মানুষ প্রকৃতি সবকিছুই যেন বড় নির্মল ও পরিশুদ্ধ। কিন্তু তার হোটেল পছন্দ হয়নি। সে আরেকটু ভালো এবং অভিজাত হোটেলে থাকতে চেয়েছিল। হোটেল বুকিং থেকে শুরু করে সব কাজ ছিল মণিকার ওপরে। মণিকার উপর পূর্ণ আস্থা ছিল। অবচেতন মনের ভাবনায় সুমিত ভাবতে থাকে। তবে এটাও বুঝতে পারে মণিকা ইচ্ছে করেই এমন একটা হোটেল পছন্দ করেছে। হয়তো সে আর স্মৃতির পাতা উল্টে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায়নি।

২.

হোটেল ম্যানেজারের কাছে চাবি দিয়ে তারা বিকেলবেলায় বেরিয়ে পড়ে। অনুভব করে ভিন্ন শহরে নিজেদের আবিষ্কারের বদলে তাদের দূরত্ব যেন আরও বেড়ে গিয়েছে। অনেক দেশ ঘুরলেও এখানে আসার ইচ্ছে সুমিতের অনেক আগেই ছিল। কিন্তু গতবার মণিকার ইভানের সঙ্গে ঘুরে যাওয়ার জন্যই এই জায়গাটি তাকে আরও বেশি করে টেনেছে।

স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেও তারা দুজন স্বাভাবিক হতে পারছিল না। যেন দুজনের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল বিরাজ করছিল। এই শহরটি মণিকার অল্প-স্বল্প চেনা। কারণ নিজের মতো করে কয়েকদিন আগে সে ইভানের সঙ্গে কাটিয়ে গিয়েছিল। হয়তো এই শহরের আলো-জল-হাওয়ায় লুকিয়ে আছে মণিকার নিঃশ্বাস। রাস্তার আঁকাবাঁকা পথের ঢালে, পাথুরে ইট-খোয়ায় ওর জোড়া পদচিহ্ন আঁকা আছে। ওর স্পর্শ, শরীরের গন্ধও মিশে আছে কোথাও। এই সব চিন্তা সুমিতকে আরও বেশি একা করে দিচ্ছিল।

এই ঘটনায় মণিকার অন্তরাত্মা নিশ্চয় একটু হলেও কেঁপেছিল। মণিকার কল্পনাতেও হয়তো মানসিক জড়তা। তাই সে এত চুপচাপ হয়ে আছে। সম্পর্কের অনাকাক্সিক্ষত জটিল সমীকরণ সে আর মেলাতে চায় না। ঘণ্টার আওয়াজ শুনে তার মনেস্ট্রিতে যেতে ইচ্ছে করে, তার বিক্ষিপ্ত মন ঠিক করার জন্য।

সুমিতের ভাবনায় কখনও একদল অস্থির পাখি পাখা ঝাপটায়। ভোরের মেঘ ঘন কুয়াশা কেটে কাঞ্চনজঙ্ঘায় উড়ে চলে যায়। পায়রাগুলোর গতিবিধি সুমিতের চোখে। তার মনে হয় ওরা কি ফিরবে তার নিজের ডেরায়, তারা তো সুমিতের মতো আগন্তুক নয়।

রোদ উঠেছে অথচ সুমিতের পৃথিবীতে কত ওলট-পালট ঘটনা ঘটে গেল। অজানা আশঙ্কায় তার মন অস্থির হয়ে ওঠে। বিশ্বাসের বিষ শ্বাসে একটু একটু করে তারা দুজন হাঁপিয়ে উঠেছিল বলেই তারা হাওয়া বদল করতে দার্জিলিং ঘুরতে এসেছিল। কিন্তু অকারণ ঝড়ের মতো অপ্রত্যাশিত তার গতিবিধি, তাতেই যেন ছিন্ন হতে চায় সম্পর্কের সুতো। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ঘাত-প্রতিঘাতেও জীবন এগিয়ে চলে। জীবনের প্রতিটি আনন্দে খুব নির্জনে জেগে থাকে বেদনার সুর, নৈঃশব্দ্যের নিনাদ। সুষমামণ্ডিত সেই নৈঃশব্দ্য সবসময় প্রতিধ্বনিময়, অনুভবে গতিময়, শাব্দিক আলোড়নে তোলপাড়। পার্থিব জীবনের চিরচেনা নিক্তিতে অনুভূতির সূক্ষ্মতা পরিমাপ করা দুষ্কর। সুমিতের বুকের ভেতরে ঢেউয়ের তোলপাড় হয়, স্মৃতিকাতর করে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ গল্পটি দাম্পত্য সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে লেখা। এমন জটিলতা অহরহ চোখে পড়ে কিংবা জটিলতার সুতো মুড়েই থাকে। সুখ এবং সঙ্কট দাম্পত্যের দুই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সুখ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে আনন্দ। কিন্তু সে তার ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্কট সহজে মণিকাকে মুখ ফুটে বলতে পারে না। আমরা বুঝে উঠতে পারি না কি হচ্ছে, কেন এমন হচ্ছে। বাস্তবতার নিরিখে নির্মিত এই গল্পটি বেশ পরিণত।

সুমিতের ইচ্ছে ছিল পর্বত আর মণিকার ইচ্ছে ছিল সমুদ্রে যাওয়ার। পরে তারা নিজেদের সময় দেওয়ার জন্য কাঞ্চনজঙ্ঘাতে আসে। তবে শুধু প্রকৃতির প্রেমে মুগ্ধ হতেই সুমিত কাঞ্চনজঙ্ঘা আসেনি। সে নিজেকে হিমালয়ের মতো মনে করে। হিমালয় যেমন অসংখ্য মানুষের পদচিহ্ন বুকে ধারণ করে কষ্ট সহ্য করতে পারে সুমিতের হৃদয়েও হিমালয়ের সমান দুঃখ-কষ্ট। সেটা অনুভব করতেই সে কাঞ্চনজঙ্ঘা যায়।

৩.

ইভানের সঙ্গে মণিকার পরিচয় গানের অনুষ্ঠানে। সুমিত অফিসের কাজে দেশের বাইরে ছিল। হয়তো অফিসের কাজে সুমিত বেশি ব্যস্ত থাকত বা তাকে বাইরে যেতে হত বলেই তাদের মাঝে ভেতরে ভেতরে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তাই এর মাঝেই ইভানের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে।

ঘটনার সূত্র ধরে সে একবার একা অফিসের কাজে দার্জিলিং এ যেতে চাইলে তার সঙ্গে মণিকার ঝগড়া হয়। কারণ অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল তাদের একসঙ্গে যাওয়ার। মণিকা সুমিতকে উপেক্ষা করে তাকে বোকা বানিয়ে চলে যায়। সেখানে গিয়ে সে ইভানের সঙ্গে ভাব কল্পনার অপার দিগন্তে ভেসে বেরিয়েছে। সব কিছুকে তুচ্ছ করে ইভানের জন্য নিজেকে নিবেদন করাটাকেই শ্রেয় মনে করেছে।

প্রায় তিন মাস পরে সুমিত জানতে পারে মণিকার অফিসের প্রোগ্রাম ক্যানসেল হয়ে ছিল আগেই।হোটেল বুকিং এর সুযোগ তারা নিয়েছিল। মাল রোডের কাছেই এক অভিজাত হোটেলে তারা উঠেছিল। সুমিত যখন জানতে পারে মণিকা ইভানের সঙ্গে দার্জিলিংয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘায় গিয়েছিল তখন তার হৃদয়ে বেদনার ফাটল ধরে। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়ে সে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে থাকে। রাতের আকাশের তারার মতো তার নিজেকে তখন বড় একা মনে হয়। তার সকল ভাবনা অন্তহীন শূন্যতাও কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়। বেদনার স্মৃতিটুকুতেই ডুবে কেবল তার মালা গাঁথা। আগের মণিকাকে সে জীবনে কখনও ফিরে পাবে না অথচ সেই মণিকাকে নিয়েই আবার নতুন করে তার মালা গাঁথা, বিরহ ভোগ করা। আর বিরহের অতলান্তে হারিয়ে যাওয়া। হয়তো মাল রোডে হোটেল ভাড়া করলে মণিকার ইভানের কথা মনে পড়ে যেত। এজন্য মণিকা এবার মালরোডে হোটেলের ভাড়া না নিয়ে সামান্য একটা হোটেল ভাড়া করেছিল। এটা বুঝতে তার বাকি থাকে না।

জন্মলগ্ন থেকেই মানুষ প্রেমের মায়াজালে আবদ্ধ। কারণ, প্রেমের স্বরূপ চিরন্তন। প্রেম নায়ক-নায়িকার জীবনে কখনও অমৃতের স্বাদ এনে দেয়, আবার কখনও প্রেমের অগ্নিকণাই তাদের জীবনকে বিষের জ্বালায় জর্জরিত করে তোলে, দু’য়ে মিলেই প্রেমের সার্থকতা। আবার দাম্পত্য জীবনেও প্রেমের একটা ভিন্ন স্বাদ রয়েছে। আদর্শ পুরুষরা যেমন স্ত্রীকে কখনও ঠকান না তেমনি আদর্শ নারীরাও না। এক্ষেত্রে নারীদের সতীত্ব রক্ষার ব্যাপারটা সংসার জীবনে একটা বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গল্পে মণিকা এর ঠিক উল্টো।

তাদের সম্পর্কের কথা সুমিত জানতে পারে ইভানের ফোনের মাধ্যমে। এমন একটা ঘটনা সুমিতের দিক থেকে প্রতিক্রিয়া ওঠাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সুমিত কিছুই বলেনি। বরং দুজনের মাঝখানে অনুপস্থিত এক প্রতিপক্ষকে বর্তমান রেখে তারা দিন কাটাতে চেয়েছে। সময়ের সমীকরণ মিলিয়েছে, জীবনের পরিসীমাকে ছেড়ে দিয়েছে ভবিতব্যের কাছে। অবশেষে মণিকা আবার ফিরেও এলো। কিন্তু সে ফিরে আসায় প্রাবল্য ও স্থায়িত্ব কতখানি এসব ভাবলে সুমিতের বুকে আস্ত পাহাড় এসে বসবাস শুরু করে। সুমিত-মণিকার জীবনের টানাপোড়েন, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা আর ভাবনার লাগামহীনতা মিশিয়েই তৈরি গল্পটি। সুমিতকে মণিকা পড়তে পারেনি। অথচ তার ভেতরকার শুদ্ধতা কেড়ে নিয়েছিল সে। তার দুঃখগুলো ছুঁয়ে দেখতে পারেনি মণিকা। বেঁচে থাকার পথে এসব টানাপোড়ন, সম্পর্কের মধ্যকার সংঘাত আর মনের যত ওলটপালট ভাবনার উপাখ্যান হলো ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’।

জীবনের কঠিন বাস্তবতায় অতঃপর সুমিতের সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে। সুমিতের হৃদয়ে লালিত বিশ্বাসগুলো ভেঙে যাওয়ায় সে মর্মাহত হয়েছে। তার যেন আজ মণিকার প্রতি কোনো অধিকার নেই। দূরত্ব বেড়ে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে হৃদয়ের সমস্ত লেনাদেনা। হৃদয়ের বিচিত্র প্রেমানুভূতির অর্ঘ্য অপ্রত্যক্ষ হৃদয়বাসিনীকে নিভৃতে সঙ্গোপনে প্রদান করে। সে প্রেমের সর্বৈব আনন্দ ভোগ করে বিরহের মধ্যে। তাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে গেছে, নতুনভাবে আবার পথচলা শুরু করতে চায়। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ গল্পে একদিকে মণিকা-ইভানের বিষামৃত প্রেমদ্বন্দ্ব ও অন্যদিকে সামাজিক কারণে বিবাহিত সম্পর্ক বজায় রাখার মতো ঘটনা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এই উভয় ঘটনাকে অবলম্বন করে কাহিনি দ্বিমুখী বিপরীত দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক।

৪.

কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখে সুমিত ভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার শরীরটা যদি একবার ছিঁড়ে দেখা যেত তাহলে নিশ্চয়ই তার ভেতরেও তার মতো ক্ষত দেখা যেত। সুমিত যেন সেই কাঞ্চনজঙ্ঘারই প্রতিরূপ। একদিন হয়তো আবিষ্কার করা যাবে কোনো ক্ষত দগদগে হয়ে উঠল কিনা। সুমিত নিজেকে প্রস্তুত করছে। তার অনুভূতিশূন্য মুখের দিকে তাকিয়ে মণিকা বুঝতে পারে। অন্তঃসারশূন্য অনুভূতির নেট বন্ধ করে হেঁটে চলে দুজন। চারিদিকে যেন এক অপরিসীম গোলকধাঁধা মনের গুপ্ত রহস্যের মতো। দার্জিলিংয়ে বেড়াতে এসে তারা দুজন যেন আরও অপরিচিত হয়ে উঠেছে। মণিকা নিজেও কোনো এক অজানা অপরাধবোধে ভুগছে কিনা তা সুমিত আবিষ্কার করতে পারে না।

সকাল থেকে জমাট মেঘের মত আটকে আছে শহরের বুকে। মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে কেউ দলবেঁধে আবার দল ছাড়া হয়ে হয়ে। সুমিত শিহরিত হয় দেখে। টাইগার পয়েন্ট এসে তারা পুরোপুরি হতাশ। কেউ কোনওদিন বলবে না এদিকে একদিন বিশালদর্শন সৌম্যকান্তি পর্বতের কখনও দেখা মেলে।

সুমিত জানে কুয়াশা গভীর রহস্য এনে দেয়। আড়াল করে বেদনা। কাঞ্চনজঙ্ঘা তার ব্যথা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গায়। কিছু বলার ভাষা নেই। বোবা পাথরের ফাঁকে ফাঁকে শুধু নিঃশব্দ আর্তনাদ। বেদনার মুখরতা ঝরনা হয়ে যায় নিঃশব্দে অচেনা দুঃখবোধ নিয়ে কখনও আবার কুয়াশা আর বেদনা টেনে আনে ভাসিয়ে নেয় এখান থেকে ওখানে। সে ভাষা বোঝার অনুভূতি বা সামর্থ্য সবার মধ্যে থাকে না, মণিকার মধ্যেও নেই।

সুমিত তার কাছে অচল বাস্তবতা হয়ে গেছে এতদিন। এর বেশি কিছু নয়। ইচ্ছাপূরণের কথা ভেবে সকালে একবার উঁকি দিয়েছিল প্রিয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। দেখেছিল পাহাড়ের মতো আটকে থাকা ভাসমান নির্দল। এসব দেখে সুমিতের ভালো লাগে। ভেতরে নিজেকে অন্তত কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিরূপ মনে হয় তার। নিজের ভেতর জমা হওয়া হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছিল সে। এখন কেমন হালকা লাগছে নিজেকে। এক শহরের তাড়িত বেদনা বুকে চেপে হিমশৈল তার সম্পূর্ণ। অন্তত বিশাল পাহাড়ের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে সমস্ত ক্লেদ গ্লানি দীর্ঘশ্বাস উগরে দিতে পারত। যাপনের ক্লান্তি রেখে দিতে পারত ওর পায়ের কাছে, সে সুযোগটা হাতছাড়া করল আজ।

সে অনেকদিন পর বুঝতে পারে সম্পর্ক আর সম্পর্কহীনতার পার্থক্য যৎ সামান্যই, স্মৃতি বাড়িয়ে লাভ নেই। ফিরে যেতে হবে আস্ত পাহাড় বুকে নিয়ে। নিজের মতো আজ অনেকদিন পর এমনটাই চাই সুমিত। একটু মুক্ত জল বিশুদ্ধ করতে পারে। সেখানে আর কেউ থাকবে না না মণিকা না অন্য কেউ। হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সুমিত অদ্ভুত উদ্দেশ্যহীনতায়। শহরের অচেনা গলি, পদ্ধতির সুবিধা আছে। কেবল হাঁটছে, বিকেল সন্ধ্যা হয়ে যায়, সন্ধ্যা থেকে রাত। ভালোবাসার বিচিত্র গতি, কিছুটা উত্তাপ ছড়ানোর সীমাহীন আনুগত্য শুনতে পাওয়া যায়।

সুমিতের মন-মনন-মেজাজ- মানসিকতার টানাপোড়েন উদঘাটনে লেখক একটা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। সুমিতের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে মণিকাকে নিয়ে একটা বড় জায়গাজুড়ে রয়েছে তার মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব। মণিকা বদলে যাওয়ায় তার হৃদয় দুঃখের যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত হয়। সুমিতের হৃদয় চৌচির। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল ধরেছে, আজ মণিকা যেন তার কাছে অধরা। বিমূঢ় নদীর বাঁধ ভাঙার মতো এখন বেদনায় সুমিতের বুক ভাঙছে। তার চোখে নীরব বেদনা। সন্ধ্যার মুহূর্তকে ফুলদানিতে রাখা বিশীর্ণ রজনীগন্ধার মতো সে একা এবং অনিকেত।

স্বল্প পরিসরের মধ্যে খর্ব আকৃতির একমুখী কাহিনিতে গভীর বেদনার ছবি চিত্রিত হয় ছোটগল্পে। যেখানে জীবন বিস্তৃত নয়, বরং দু’চারটে ঘটনাকে অনাতিশয্য বর্ণনায় তীর্যক করে তোলে। কোনো গভীর তত্ত্ব বা উপদেশ নয় বরং উপলব্ধি সৃষ্টি করাই ছোটগল্পের দায়িত্ব। তবে পাঠকের উৎসাহে ভাটা পড়তে না পড়তেই শেষ না হয়েও শেষ হবে আকস্মিকভাবে। অতৃপ্ত অন্তরে পাঠক বিমূঢ় বিস্ময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার সূক্ষ্মতাকে ধরতে প্রয়াস পাবে। আয়তন নিয়ে ছোটগল্পের ধরা বাঁধা নিয়ম নেই, তবে জীবনের খণ্ডাংশ নিয়ে রচিত এবং নাটকীয় পরিসমাপ্তিতে ছোটগল্প ব্যঞ্জিত হয়ে ওঠে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ গল্পটি তেমনই একটি ছোট গল্প।

একটি বিশেষ অভিব্যক্তিকে বা বাস্তবানুভূতিকে দু’একটি ঘটনার আবর্তে ভাব ও কল্পনার দ্বন্দ্বে আন্দোলিত করে তাকে স্বাভাবিক পরিণতি দান করা, বস্তুর কোনও একটি বিশেষ পরিচয়কে রূপায়িত করে তোলা যদি ছোটগল্পের কলাকৃতি হয়, তবে সে দিক বিবেচনায় ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ অনবদ্য।

সাঈদ আজাদ

বিশ হাজার টাকার হাসি

‘বিশ হাজার টাকার হাসি’ গল্পটি মনস্তাত্ত্বিক। মনস্তাত্ত্বিক গল্পে সাধারণত পাত্র পাত্রীর মানসিক বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় প্রধান হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পোস্টমাস্টার, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রামের সুমতি মনস্তাত্ত্বিক গল্পের উল্লেখযোগ্য চরিত্র। মানুষের জীবনে টানাপোড়েন, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা আর ভাবনার লাগামহীনতা মিশিয়ে তৈরি হয়েছে গল্পের একেকটা চরিত্র।

বস্তিবাসী বলতে শহরে বসবাসরত নিম্নবিত্ত মানুষ, দরিদ্র বা হতদরিদ্রদের কথা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জীবন যাদের মোটামুটিভাবে গতর খাঁটুনির ওপর দিয়ে চলে। ঘিঞ্জি এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করে এ মানুষগুলো। শহরে থাকলেও আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা আজীবন বঞ্চিতই থেকে যায়। চিকিৎসা, শিক্ষা থেকে শুরু করে মৌলিক মানবাধিকার সবকিছুতেই তাদের পিছিয়ে পড়ার গল্পটা আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে। এক সময় মানুষ গ্রাম থেকে শহরে এসেছিল নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে সুখের নীড় গড়ার জন্য। অথচ আজ এই হতদরিদ্র মানুষগুলো করোনা মহামারির ছোবলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এটুকুও আশ্রয় হারিয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। অস্তিত্বের সংকটে জর্জরিত, ক্ষত-বিক্ষত তাদের হৃদয়।

একে একে সবার মত রাজিয়ারাও বস্তি ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে সাফিয়ার কখনও সখ্য না থাকলেও তার চলে যাওয়াতে আজ কষ্ট লাগছে। সাফিয়া ভাবে তাদেরও এক সময় চলে যেতে হবে। করোনা ভাইরাসের মহামারিতে অন্যদের মত বস্তিবাসীরা সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে। লকডাউনের শুরুতেই অনেকেই তাদের কাজ হারিয়েছেন। যারা কাজ করছেন তারা আগে তিনটি বা চারটি কাজ করলেও এখন করছেন মাত্র একটি। যার প্রভাব পড়েছে তাদের খাদ্যাভ্যাসসহ অন্যান্য জীবনযাত্রায়। করোনার কারণে গল্পের সাফিয়ারও দুই বাসার কাজ চলে গেছে। স্বামী কাজে যেতে পারে না। গ্রামে তার কিছু নেই, কেউ নেই। এসব ভাবতেই কষ্টে বুকের পাঁজর ভেঙে খানখান হয়ে যায়। অস্তিত্বের সংকট ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে জর্জরিত হয়ে যায়।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের ফলে আজ অবরুদ্ধ পুরো পৃথিবী। পৃথিবীতে মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ আসে প্রতিশ্রুতিশীলতার অভাবে। যে কোনও দুর্যোগে মানুষ বুঝতে পারে যে তাদের সামাজিক দৃঢ়তা ঋণাত্মক নাকি ধনাত্মক। করোনার আঘাতে জনশূন্য পৃথিবীর বড় বড় শহর আজ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। একটি ভাইরাস মানুষের সমস্ত দম্ভ চূর্ণ করে মানুষের জীবনকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। বেঁচে থাকার অর্থ যেন পাল্টে দিয়েছে। জমায়েত এড়িয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে এখন ব্যস্ত মানুষ। থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থা। আগে ফুটপাত দিয়ে কত লোক যাতায়াত করত আর এখন করোনার কারণে কেউ চলাফেরা করে না। সবাই ঘরের মধ্যে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে।

শেষবারের মতো রাজিয়া তাদের ঘর নামক ঝুপড়ি দেখে কষ্ট অনুভব করে। গ্রাম থেকে আসতে যেমন কষ্ট হয়েছিল আজ ঠিক তেমনই শহর ছেড়ে গ্রামে যেতেও একি কষ্ট হচ্ছে তার। রাজিয়া সাফিয়ার কাছে মাফ চাই। তাদের সঙ্গে কত ঝগড়া হতো অথচ আজ তাদের বিয়োগ ব্যথায় সে মর্মাহত। মনের অজান্তেই যেন তাদের সঙ্গে কত নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

২.

সমাজে পতিতাদের সামাজিক অবস্থান অনেক নিচে। যার কারণে ওদের মধ্যে সেই ধরনের উচ্চাশা নেই যে, তাদের  ভালো জায়গায় থাকতে হবে ফলে ওরা বস্তিতেই সুখী। গল্পের তেমনি এক নারী চরিত্র নূপুর। অন্যদিন সে রাতে বের হলেও আজ সকাল সকাল সেজেগুজে বের হয়েছে। নূপুর খারাপ কাজ করে বলে বস্তির আর মানুষদের সঙ্গে সঙ্গে সাফিয়াও তাকে দেখতে পারে না। অবশ্য সাফিয়ার নূপুরকে দেখতে না পারার আরও একটা বিশেষ কারণ আছে। সে সাফিয়াকে কুপ্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সাফিয়া তার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। স্বামী, বাচ্চা নিয়ে তার চলতে কষ্ট হলেও সে তার নিজের সতীত্ব অন্যের কাছে বিলিয়ে দিবে না।

আজ সেই নূপুরই হঠাৎ করে তার পায়ের কাছে বসে পড়ে টাকা ধার চাওয়াতে সে ভীষণ অবাক হয়ে গেল। সবাই জানে বস্তিতে আর কারও কাছে থাক বা না থাক অন্তত নূপুরের কাছে টাকা ঠিকই থাকে। সেও কতবার ভেবেছে তার কাছ থেকে টাকা চাবে। অথচ সেই আজ তার কাছে টাকা চাওয়াতে সে প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। করোনা মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনেছে, চলার পথের বাঁক পরিবর্তন করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে পতিতাদের ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গেছে। করোনার ভয়ে কেউ কাছে আসে না, কম করে রেট বললেও আসে না। ওদের সবকিছুই হচ্ছে উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। আজ সকালে বের হওয়ার কারণ দুপুরে একজনের কাছে গেলে কিছু টাকা পাবে।

অতীত-বর্তমানের পতিতা ও পতিতাবৃত্তির ইতিহাস হাজার বছরের এক পুরাতন ব্যবসার নাম পতিতাবৃত্তি। বিচিত্র এই দোকানিরাই আমাদের সমাজে পতিতা, গণিকা, রক্ষিতা নানাভাবে নানা নামে পরিগণিত হয়। তবে সভ্যতার বিবেচনায় একে অন্ধকার গলি বলা হয়ে থাকে। হয়তো অন্ধকার গলি বলেই আলোর মানুষেরা চেনে না এ গলি, জানে না এ জগৎ কেমন; কেমন বিচিত্র এ জগৎ। কৃষ্ণ গহ্বরের মতো অস্তিত্বমান এই অন্ধকার গলি। খুব সুনির্দিষ্ট করে হয়তো বা বলা মুশকিল পৃথিবীর ইতিহাসে কবে কখন কীভাবে উৎপত্তি ঘটেছে বিচিত্র এ ব্যবসার। তবে যতদূর জানা যায় মধ্যযুগীয় বর্বরতার গর্ভে অর্থাৎ সামন্তীয় সমাজের পাপের ফসল এই পতিতাবৃত্তি। পতিতারা সেই সকল নারী যারা পুরুষকে যৌন সুখ ভোগ করতে নিজেদের দেহ দিয়ে আপন জীবিকা উপার্জন করে। একজন নারী খুব অসহায় না হলে এ পথ বেছে নিয়ে নিজের সতীত্ব বিলিয়ে দেয় না। এত সুন্দর মেয়েটা পরিস্থিতির কারণে পেটের দায়ে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই মূলত এ পথে নেমেছে। এটা বুঝতে পেরে নূপুরের প্রতি তার সমস্ত রাগ নিমিষেই উবে যায়। বৃষ্টির মধ্যে মেয়েটা হেঁটে যাচ্ছে দেখে এই প্রথম তার খারাপ লাগলো। অথচ তার আগে কখনও তার সঙ্গে তার কথা হয়নি। কখনও জানতে চাইনি কেন সে এ কাজ করে। নূপুর পেটের দায়ে অন্য পুরুষের কাছে যাচ্ছে কিন্তু তার তো কাকের ঘরে কোকিলের বাচ্চা বড় হচ্ছে। তার জীবনের আড়ালে আবডালে অন্তরালেও রয়েছে ঘটনার ঘনঘটা। আর অস্বস্তিবোধ ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন শুরু হয় তার মনের ভেতরে।

৩.

এক সময়ের অভাবের কারণে ভালোবাসার জন্য পরিবারের সবার অমতে সাফিয়া জয়নালের হাত ধরে শহরে এসেছিল। জয়নাল রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্টে তার পা কেটে যায়। পরে জুতার কারখানায় কাজ শুরু করে কিন্তু করোনার কারণে কারখানার চাকরিটাও চলে যায় তার। পায়ে পচন ধরে শরীরে প্রচণ্ড জ্বর আসে তার। বিপদ যখন আসে তখন চারিদিক থেকেই আসে।

করোনার জোরে এখন সতর্কতায় ঢেকে ফেলার প্রয়াসে পা বাড়িয়েছে সকলে। তাই জয়নালের জ্বর এবং কাশি দেখে সাফিয়া সর্তকতা অবলম্বন করে মাস্ক পরে। মনে মনে ভাবে মানুষ আপন হলেও রোগ আপন নয়। করোনা বদলে দিয়েছে মানুষের বোধের জায়গা। মানুষের ভাবনাতে এনেছে আমূল পরিবর্তন। অনেকটা স্বার্থপরের চাদরে নিজেকে আবৃত করে রেখেছে।

সাফিয়ার পেটে খাবার জোটে না বলেই তার মেয়েও ঠিকমতো বুকের দুধ না পেয়ে অনবরত কান্না করতে থাকে। কান্নারত মেয়ের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করে বাঁচলে আবার মেয়ে পাওয়া যাবে। বলেই সে আনমনা হয়ে যায়। কারণ একমাত্র সেই জানে এই মেয়েকে পেতে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সতীত্ব হারিয়েছে সে। এ কথা জানলে জয়নালকে বাঁচানো যাবে না। তাই সে বলেনি। সতীত্ব পরাজিত হয়েছে মাতৃত্বের স্বাদের কাছে।

নিজের সংসার স্বপ্ন কিন্তু তার বুকের মাঝে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এই মেয়ে তার আর নাজিমের, জয়নালের না। নাজিমের বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে তিন মাস আগে। বৃষ্টিমুখর এক দিনে যাকে সে পরম আদরে স্বামী মনে করে জড়িয়ে ধরেছিল সে জয়নাল না, নাজিম। প্রথমে সে রাজি না হলেও পরে মাতৃত্বের স্বাদের জন্য সে রাজি হয়। সাফিয়ার হৃদয় বরাবরই একটি ক্ষুদ্র প্রাণের জন্য ব্যাকুল ছিল। এ ব্যাকুলতার উৎস অপত্য প্রেম। প্রাণের প্রতি স্নেহ প্রেম মানুষের স্বভাবজাত হৃদয় ধর্ম, নিত্য সত্য ধর্ম। নাজিম তার স্বার্থ ও মনের কু-প্রবৃত্তি চরিতার্থতার জন্য সেদিন সাফিয়ার সন্তান কামনাকে কাজে লাগিয়েছিল। মেয়ে নিয়ে  ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নাজিম তার দিকে চেয়ে হাসে। এই হাসির কারণ সেও জানে, বাচ্চাটা তার।

পরের বাড়ি কাজ করে যে টাকা পায় তা দিয়ে তার মাস চলে না। হয়তোবা এক দিন শুনবে তার কাজটাও গেছে। আফরোজার চাচাতো বোন নিঃসন্তান। তার জন্য একটা সাদা ফুটফুটে বাচ্চা চেয়েছিল এবং বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে সাফিয়া নিজের বাচ্চাকে দিতে চায়। বাচ্চা বিক্রির অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। এ ছাড়াও তার সন্তান ভালো থাকবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। কিন্তু সাফিয়া বাচ্চা নিয়ে গেলে আফরোজা না করে দেয়। নিজের অবস্থা এবং টাকার জন্য অস্তিত্ব সংকটে পড়ে বাচ্চা বিক্রি করতে এসে সাফিয়া কান্না জুড়ে দেয়।

৪.

আধুনিক বিশ্ব যতই সভ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষ ততই যেন স্বার্থপর হয়ে উঠছে। এ দৃষ্টান্ত মোটেই সুখকর নয়। বরং মানুষের কল্যাণে নিঃস্বার্থ ত্যাগ এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু পৃথিবী প্রতিনিয়ত নানা প্রচার-প্রচারণায় যেন স্বার্থপরতাকেই প্রাধান্য দেয়। মানুষের জন্ম শুধু নিজে আরাম-আয়েশকে লক্ষ্য করেই নয়; তাকে ভাবতে হবে গরিব-দুঃখী মানুষের কথা, পরোপকারের কথা, সমাজের হিত সাধনের কথা। তবেই তো সার্থক হবে তার মানবজন্ম। কিন্তু বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মানুষ নিজের সুখের জন্য এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে পরার্থে যে সত্যিকারের সুখ খুঁজে পাওয়া যায় তা অনুভব করতে পারে না। একমাত্র নিজের সুখের জন্য এ শ্রেণির মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতা অক্টোপাসের মতো চারিদিক থেকে বন্দি করে রেখেছে। তাই তো আফরোজা করোনাকালীন নিজের পরিবারের কথা চিন্তা করে বাড়তি বাজার করলেও তার বাড়ির গৃহকর্মীর বেতনটা দিতে কুণ্ঠিত বোধ করে। একবারও ভেবে দেখে না সাফিয়ার কীভাবে চলবে। শুধু রাতের খাবার দিয়েই সে দায়মুক্ত হতে চেয়েছে।

সাফিয়া মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে যেন নামতে পারছিল না। সে যেন সামনে কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। সাফিয়ার হৃদয় সীমাহীন বিরাট শূন্য হয়ে উঠেছে। অস্তিত্বের সংকট, মেয়ের ভবিষ্যৎ এসব চিন্তাই সে নির্বিকারত্ব। তার জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ, প্রাণহীন মর্মর মন্দির। বিশ হাজার টাকা দিয়ে সে তার অস্তিত্বের সংকট ঘোচাতে ও মেয়ের জীবনের নিরাপত্তা কিনতে চেয়েছিল। সেদিক বিবেচনায় গল্পটির নামকরণ সার্থক।

সাঈদ আজাদের এ গল্পটির মধ্য দিয়ে বাংলার নিম্নবিত্ত নারীদের চরিত্রের সক্রিয়তার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। গল্পে পুরুষ অপেক্ষা নারী চরিত্রগুলো সমধিক উজ্জ্বল। তবে তারা বাংলা সাহিত্যে পূর্বোক্ত চরিত্রদের থেকে স্বতন্ত্র জাতের মানুষ। ইতিহাসের পুরাণে তাদের উল্লেখ নেই, সাহিত্যের পাকা বুনিয়াদ তাদের জন্য নয়। তারা সংসারের নাম-গোত্রহীনদের দলে। তবে তারা লেখকের মনগড়া চরিত্র নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতার সূত্রে প্রাপ্ত। এসব মানুষের সুখ-দুঃখ প্রকাশেই লেখকের শ্রেষ্ঠ আত্মরতি।

স্বকৃত নোমান

বাঙাল-২

‘বাঙাল-২’ গল্পে সমকালীন জীবনের বাস্তবতাকে সরাসরি না বলে স্বকৃত নোমান হাস্যরসের মাধ্যমে সমাজ ও জীবনের বিচিত্র অসঙ্গতি উন্মোচন করেছেন। সংযম, স্নিগ্ধ রসিকতা ও বুদ্ধিদীপ্ততা তাঁর গল্পের মূল বিশেষত্ব। মানুষ যত শিক্ষিত হবে, তত তার বর্তমানের সঙ্গে বিরোধ বাঁধবে এবং সেই বিরোধ ভাঙতে ভাঙতেই সমাজকে এগিয়ে যেতে হবে। লেখকের হাতে সেই ভাঙার হাতিয়ার ব্যঙ্গ।

মহামারি করোনা ভাইরাসে স্তব্ধ পুরো পৃথিবী। বর্তমান বিশ্বে সব থেকে বড় আতঙ্ক করোনা ভাইরাস। ভয়ংকর এ মারণ রোগ কবে পৃথিবী থেকে যাবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯-এর ভয়াল থাবার দ্বারপ্রান্তে এখন বাংলাদেশও। মানুষ আতঙ্কিত এবং ভীত এই ভাইরাসের ভয়ে। কিন্তু উল্টো চিত্রও দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষই মানছে না কোনও ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা। জনগণের অজ্ঞতার কারণে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপও ব্যর্থ হচ্ছে। চায়ের দোকান, রাস্তায়, বাজারে অকারণে বেশি ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষ। রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় নানান ক্ষেত্রে এ নিয়ে নানান মতামতের ছড়াছড়ি। গল্পের শুরুতে আমরা দেখতে পাই শরাখালিতে হাটবারে মানুষ দোকানপাটে বসে টিভি দেখছে এবং গল্পগুজব করছে। মুখোরোচক এ গল্পগুজবে যার কিছু একেবারেই অদরকারি, কিছু সত্যিকার অর্থেই দরকারি। বর্তমানে তাদের একমাত্র আলোচ্য বিষয় চীনের উহানের তাণ্ডব চালিয়ে করোনা ভাইরাস ইতালি, ইরান, স্পেন দাপাচ্ছে। বাংলাদেশেও চৌদ্দগ্রাম আক্রান্ত।

স্কুল-কলেজ বন্ধ হওয়ার পর মানুষ ঘুরতে গেছে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়, কেউ গেছে গ্রামে। আর যারা ঢাকায় আছে তারাও দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়। আবার প্রবাসীরাও নানান দেশ থেকে আসছে। তাদের শরীরে রোগের উপসর্গ ধরতে এয়ারপোর্টে বসানো হয়েছে স্ক্যানার। যাদের শরীরে রোগের উপসর্গ ধরা পড়ছে তাদের রাখা হচ্ছে কোয়ারেন্টিন সেন্টারে। সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টিতে এবং করোনা মোকাবেলায় সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপের চিত্র ফুটে উঠেছে। কিন্তু কোয়ারেন্টিন সম্পর্কে অনেকের তেমন ধারণা না থাকায় এবং স্বাস্থ্যখাতের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার জন্য অনেকেই সেখান থেকে পালিয়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। গল্পে পলায়নকারীদের মধ্যে লালমোহনের একজন প্রবাসীও আছে।

বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থার আরেকটি অন্যতম কারণ ধর্মীয় গোঁড়ামি। করোনার হাত থেকে হয়তো আমরা মুক্তি পেতেও পারি, কিন্তু এদেশের উগ্রবাদী তথাকথিত ধার্মিকদের হাত থেকে আমাদের মুক্তি আদৌ সম্ভব নয়। সরকার দেশে করোনা পরিস্থিতির জন্য সব ধরনের গণজমায়েত নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু এদেশের মানুষের ধর্মান্ধতার সুযোগ নিচ্ছে ধর্মীয় নেতারা। তারা মসজিদে ইসলামের ভুলভাল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। করোনা-মুক্তির-দোয়ার নামে হাজার হাজার মানুষের গণজমায়েত করছে; মসজিদে মুসল্লিদের ভিড় বাড়ছে, ইমামগণ মুসল্লিদের বিভ্রান্ত করছে আরও বেশি। হুজুরদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে করা বিভিন্ন আজগুবি কথা বিশ্বাস করে সাধারণ মানুষ মানছে না সরকারি বিধিনিষেধও।

যখন চীনে প্রথম করোনা তাণ্ডবলীলা শুরু হয় তখন এদেশের ধর্মগুরুরা ফতোয়া দেয়। তাদের মাঝে একজন হলো মুফতি সেরাজুদ্দিন। বাবুরহাটের বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে বলেন, করোনা আল্লাহর সৈনিক ইহুদি-নাসারদের শায়েস্তা করার জন্যই আল্লাহ এই সৈনিক পাঠিয়েছেন। চীন মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালিয়েছিল তাই তারা আজ আল্লাহর প্রতিশোধে করোনায় আক্রান্ত। হুজুরদের ওয়াজ, মসজিদে ইমামদের খুতবায় এ কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। এ ছাড়াও তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর করোনা মোকাবেলায় নেওয়া পদক্ষেপেরও তীব্র সমালোচনা করেন।

এই চিত্র দেশের প্রত্যেকটি এলাকার। আর এই ধর্মীয় কুসংস্কার আর গোঁড়ামির জন্যই আজও দেশের মানুষ করোনা নিয়ে সতর্ক না। এ ছাড়াও করোনা নিয়ে তৈরি গুজবেরও কিন্তু শেষ নেই। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েছেন, যারা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে করোনা তাদের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারবে না; কিয়ামতের আগে দাজ্জাল যেমন ঈমানদারদের দেখে দৌড়ে পালাবে ঠিক তেমনি করোনা ঈমানদারদের দেখে পালাবে। আর এইসব গুজবই চারিদিকে ছড়িয়ে যেতে লাগলো। এই কথা শুনে যারা আগে মসজিদে যেত না এখন তারাও নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত না হলেও তিন ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে পড়ে।

২.

গ্রামের অন্য মানুষদের মতো মনসুর শরাখালি হাটের এক চায়ের দোকানে বসে খবর দেখছে। সে লালমোহন সরকারি কলেজের ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের মেধাবী ছাত্র। কলেজ বন্ধ হওয়াতে নানাবাড়িতে বেড়াতে আসে। মনসুর দুনিয়ার খবরাখবর রাখে এবং ফেসবুকেও সে কিছুটা লেখালেখি করে। টিভির খবরে করোনা নিয়ে কথা হলেও গ্রামের মানুষের সেদিকে খেয়াল নেই। কচুখালির কোন্দিকে নৌকা ডুবেছে, তিনজন জেলে মারা গেছে তাদের লাশ পাওয়া যায়নি এগুলোই তাদের আলোচনার বিষয়। এ দিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে লালমোহনের নুরালম কোয়ারেন্টাইন সেন্টার থেকে পালিয়েছে, ফেসবুকে তাকে নিয়ে নানা ট্রল চলছে, আজানের লাইন পরিবর্তন করে ঘরে বসে নামাজ পড়ার কথা বলছে; পৃথিবীতে এই মহামারি রোগে মানুষ মারা যাচ্ছে লাখের পর লাখ সেদিকে তাদের খেয়াল নেই। যেন করোনা কোনও রোগ নয় বা এটা নিয়ে ভাবার কোনও প্রয়োজনই নেই! কারণ তারা মুসলিম, করোনা ধরবে বেধর্মীদের। এই বদ্ধ ভ্রান্ত ধারণা তারা মনের মাঝে বপন করেছে। তাদের এই মনোভাবের জন্য দায়ী অসচেতনতা এবং তাদের ধর্মীয় কুসংস্কার।

ইতালির অবস্থা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালগুলোতেও রোগীকে ঠাঁই দিতে পারছে না। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে পুরো পৃথিবী। স্পেন, ভারত লকডাউন করে দিচ্ছে। হয়তো অল্প কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশও লকডাউন করে দিবে; মনসুর এই কথাগুলোই ভাবছিল। যেখানে চারিদিকে মানুষের লাশের স্তূপ গড়ে উঠেছে সেখানে আমরা এখনও উদাসীন। কেউ ভাবতে পারছে না এর ভয়াবহতা কী। এমনকি লকডাউন বিষয়টি সম্পর্কেও তাদের ন্যূনতম ধারণা নেই।

করোনাই যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই মনসুর তার বাবাকে ফোন দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে রাখতে বলে সে মাছ-বাজারে যায়। সেখানে মানুষের জটলা দেখে, ভিড়ের মধ্যে বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ দেখতে পেয়ে তার ছবি তুলে ‘বিরল প্রজাতির মাছ’ লিখে ফেসবুকে পোস্ট করল মনসুর। বর্তমানে মানুষ ভাইরাল হতে পছন্দ করে। এখন মানুষ নিজে এবং যেকোনও কিছু ভাইরাল করতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মনসুরও তার ব্যতিক্রম নয়। সামনে এক লোকের পোশাক-আশাক দেখে তাকে বিদেশফেরত মনে হয়। বিদেশফেরত লোকটার বয়স ৪৫ এর কাছাকাছি হবে। হয়তোবা চাকরির ছুটিতে এসেছে। এর মাঝেই মনসুর স্বভাববশত ফেসবুকে দেখে নেয় তার ছবিতে কয়টা লাইক পড়েছে। হঠাৎ করে তার মনে হলো এই লোকটিকে সে কোথায় যেন দেখেছে।

ফেসবুক ঘেঁটে বুঝতে পারল ইনি কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে পলাতক নুরালম। মনসুর তাকে অনুসরণ করতে যেয়ে মুদির দোকানে গিয়ে তার সঙ্গে একটু আলাপচারিতা করে। তখন সে বলে আপনি সেই না যে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার থেকে পালিয়ে এসেছেন। নুরালম অস্বীকার করলে মনসুর তাকে ফেসবুকের ছবিটা দেখান। তখন সে এদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরে বলে এয়ারপোর্টে যে করোনা স্ক্যানার বসানো হয়েছে তাতে সুস্থ মানুষকেও অসুস্থ বানিয়ে দেয়। মনসুর তাকে সচেতন করে বলে আপনার এখন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা অথচ আপনি এখানে হাট-বাজারে ঘোরাফেরা করছেন!

মনসুরের সঙ্গে নুরালম ক্ষিপ্ত হয়ে কথা বলাতে দোকানির চেহারায় আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। সে নুরালমের কাছে সদাইপাতি বিক্রি করতে অসম্মতি জানালে নুরালম তার উপরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তখন আরও কয়েকজন দোকানে জড়ো হলে তাকে পুলিশে দেওয়ার কথা বললে নুরালম ঘাবড়ে যায়। সেখান থেকে চলে যেতে চাইলে অন্য লোকেরা পিছু ধাওয়া করে। নুরালম দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রিকশায় ওঠে। কিন্তু রিকশাওয়ালা তাকে নামিয়ে দিলে নুরালম পিছনে তাকিয়ে মানুষজনকে দেখে রাস্তা ছেড়ে জমিনের দিকে নেমে পড়ে। অন্য লোকেরা ধর ধর বলে চিৎকার দিয়ে উঠলে রিকশাওয়ালা তাকে চোর ভেবে দৌড় দেয়। তার দেখাদেখি মুকতাকেন ও ক্যানভাসর একিনও দৌড় দিয়ে নুরালমের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করে। অনেক কাঠ-খড় পোড়ানোর পাশাপাশি নাটকীয় স্টাইলে আটক করা হয়েছে পালিয়ে যাওয়া করোনা রোগী নুরালমকে। আটকের পর তাকে পাকুড়তলায় একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা হয়।

৩.

গোটা বাজারের মানুষজন পাকুড়তলায় গিয়ে চিড়িয়াখানার জন্তুর মতো তাকে অবাক চোখে দেখছে। যেন এর আগে তারা কখনও কোনো দিন কোনো করোনা রোগীকে দেখেনি। তাই একটু পরপর এসে হাত দিয়ে চিমটি কেটেও যাচ্ছে। মানুষ কতটা অজ্ঞ, অসচেতন আর বেকুব হলে এমনটা করতে পারে। যেখানে সারা বিশ্ব লকডাউন করে অবরুদ্ধ করে দিচ্ছে, সোস্যাল ডিসটেন্স মেনটেইন করছে, অথচ এরা করোনা রোগীকে ধরতে পেরে আনন্দে মেতে উঠেছে।

পুলিশে সোপর্দ করার কথা বলতেই এরমধ্যে নদীর ঘাটে পুলিশ এসে বলেন, সর্বনাশ! এতক্ষণ ধরে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে গেছে। তারা কিছু না বুঝে বলে ওটা যাতে না হয় এজন্যই তাকে ধরে রাখা হয়েছে। জয়নাল দারোগা তাকে শেরেবাংলা মেডিকেলে নেওয়ার জন্য নিয়ে গেলেন। এদিকে গ্রামের সবাই হৈ হৈ করে তাদের কাঁধে তুলে নিয়ে উত্তরবাজারের দিকে ছুটতে থাকে। যেন তারা কোনো মহৎ কাজ করেছে।

করোনা মহামারি মানুষ চোখে দেখতে না পারলেও তার প্রভাবটা খুব ভালো করেই চোখে দেখা যাচ্ছে। মানুষকে ভয়ংকর প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে করোনা।

করোনায় এদেশে নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এই তিন শ্রেণিকেই সংকটে ফেলেছে। মনসুর কল্পনাও করতে পারেনি বিষয়টা এতদূর গড়াবে। গ্রামের সাধারণ মানুষ এর ভয়াবহতা অনুধাবন করতে না পারলেও সে ঠিকই অনুধাবন করে। সাধারণ জনগণ ঘটনার উপরিভাগ দেখলেও মনসুর দেখে উপরিভাগের নিচের ঘটনা, অন্তরালের ঘটনা। করোনা বিস্তৃত হওয়ার ঘটনা। তার নিজেই নিজেকে মারতে ইচ্ছে করছে। এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করছে।

এখন আক্রান্তের সংখ্যা অনেক তাই মসজিদ, মন্দির, গির্জা সবকিছু বন্ধ। পৃথিবী অচল হয়ে গেছে। সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে আছে। একটা মাস বাড়িতেই ছিল মনসুর খুব একটা বেরোয়নি। বেরোনোর পরে শুনতে পায় যে গতকালই লালমোহন হাসপাতালে একিন মারা গেছে। যে নুরালম বাঁচার তাগিদে ইতালি থেকে চলে এসেছিল সেও মারা যায়। এভাবেই আমাদের অগোচরে করোনা একজন থেকে বহুজনের মাঝে সংক্রমিত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি দিনে দিনে আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে।

কভিড-১৯-কে কেন্দ্র করে পৃথিবী এখন মস্তবড় সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কবে এর অবসান হবে কেউ জানে না। তবে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে বিশ্বের সর্বত্র মানুষকে আরও দীর্ঘদিন বসবাস যেমন করতে হবে, তেমনি অস্তিত্বের সংকট নিরসন করেই টিকে থাকতে হবে। পৃথিবীব্যাপী করোনা ভাইরাসের কারণে নতুন এক ব্যবস্থায় মানুষকে অভ্যস্ত হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

খুব সুন্দর একটা গল্প। স্বকৃত নোমানের লেখনী প্রাঞ্জল, সহজপাঠ্য। রসবোধ তীক্ষè ও নির্লিপ্ত। যা পাঠককে গল্পের মূল কাহিনির প্লট এবং বার্তা বুঝে তার সঙ্গে একাত্ম হতে সহায়তা করে। গল্পটি চরিত্র নয়, কাহিনি প্রধান। গল্পে লেখক হাস্যরসের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সচেতনতা-অসচেতনতার মাধ্যমে দুই ধরনের বাঙালির চিত্র তুলে ধরেছেন। তাই গল্পের নামকরণ নিঃসন্দেহে সার্থক ও মননসঞ্জাত।

  লেখক : প্রভাষক (বাংলা বিভাগ), এমফিল গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যবিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares