চূড়ান্ত যুদ্ধ ও বিজয় : মেজর জেনারেল (অব.) ইমাম-উজ-জামান বীর বিক্রম

বিশেষ প্রবন্ধ : স্বাধীনতা দিবস ২০২১

[মেজর জেনারেল (অব.) ইমাম-উজ-জামান, বীরবিক্রমের জন্ম ২৪ মার্চ ১৯৫১ সালে। তার গ্রামের বাড়ি সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানার উজানঢাকী গ্রামে। বাবা ডা. মোছাদ্দের আলী চৌধুরী এবং মা মাহমুদুন্নেসা বেগম। বাবা-মা দুজনেই সিলেটের বিয়ানীবাজার থানার অধিবাসী। লেখকের বাবা চট্টগ্রাম ‘বার্মা অয়েল কোম্পানি’র চিকিৎসক ছিলেন। পিতার কর্মস্থলের সূত্র ধরে ইমাম-উজ-জামানের শৈশব কেটেছে চট্টগ্রামে। ১৯৬৩ সালে তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কালেজে ভর্তি হন। ১৯৬৯ সালে সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে চলে যান পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে। ‘২৪ ওয়ার কোর্স’ থেকে ১৯৭০ সালে কমিশন লাভের পর একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে ইমাম-উজ-জামানের সেনা জীবন শুরু হয়। ১৯৭১ সালে তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের গোলন্দাজ ইউনিটে কর্মরত ছিলেন।

একাত্তরের ৩০ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টমেন্টে কর্মরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের প্ররম্ভে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অন্য বাঙালি সেনা অফিসারদের সাথে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ইমাম-উজ-জামানকেও বন্দি করে হত্যার চেষ্টা চালায়। শরীরে তিনটি বুলেট বিদ্ধ হলেও অলৌকিকভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। পরে কৌশলে ক্যান্টলমেন্টে থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পার্শ্ববর্তী গ্রামে চিকিৎসা নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে চলে যান ভারতের মতিনগর বিএসএফ ক্যাম্পে। পরে তিনি কুমিল্লা অঞ্চলে ২নং সেক্টর এবং  ‘কে ফোর্স’ এর অধীনে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বসূচক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীরবিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বীরযোদ্ধা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেন। ১৯৮০ সালে তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীর স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি লাভ  করেন। পরবর্তী দুই বছরের জন্য স্টাফ কলেজের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১৯৯৫ সালে তিনি ‘মেজর জেনারেল’ পদে উন্নীত হন এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের ‘মহাপরিচালক’ হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে নবম পদাতিক ডিভিশনের ‘জিওসি’ থাকাকালীন একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন। ১৯৯৮-২০০০ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত তিনি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পিএসও’র দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।

বগুড়া ক্যান্টনমেন্টের জিওসি থাকাকালীন ২০০০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইমাম-উজ-জামানের চাকরির মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মেজর জেনারেল (অব.) ইমাম-উজ-জামান বিসিআইসি’র (বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থা) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্ত্রী ইশরাত ইমাম, দুই মেয়ে (নেহলিন ও তনয়া) এবং ছেলে নাহিয়ানকে নিয়ে বর্তমানে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসর জীবনযাপন করছেন।]

ডিসেম্বর ৬, ১৯৭১। চূড়ান্ত যুদ্ধের ঘোষণার পরপরই সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমরা ব্রিগেডিয়ার আনন্দ স্বরূপের নেতৃত্বে প্রায় ছয় হাজার সৈন্যের পদাতিক ব্রিগেড হেঁটে ফেনীর দিকে রওনা হই। আমরা পৌঁছার আগেই সকল পাকিস্তানি সেনা কোনও রূপ প্রতিরোধে না-গিয়ে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলা-বারুদ ফেলে ফেনী কলেজ ক্যাম্প থেকে পালিয়ে লাকসামের দিকে চলে যায়। ফলে সেদিন দুপুর ১২টার দিকে আমরা ‘কিলো ফোর্স’ নির্বিঘ্নে প্রবেশ করি ফেনী শহরে। শহরটি স্বাধীন হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার ফেনীবাসী দীর্ঘ নয় মাসের অবরুদ্ধ জীবন শেষে বাধাহীনভাবে নানা স্লোগান দিতে দিতে পথে নেমে আসে। সকল বয়সের নারী, পুরুষ রাস্তার দুই ধারে, বাড়ির ছাদে বা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে আমাদের স্বাগত জানায়। কেউ কেউ দৌড়ে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরে। আনন্দে অনেকের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। এর বর্ণনা করার সাধ্য আমার নেই। কবির ভাষায় বলতে পারি, ‘আমরা বাংলাদেশিরা সবাই এতগুলো মাস মনপ্রাণ দিয়ে ঠিক এই দিনটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, ত্যাগ স্বীকার করেছি অকাতরে। শুধুই তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা।’

বিজয়ের পাশাপাশি  এ দিনের একটি হৃদয়বিদায়ক ঘটনা আমাদের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। আমরা ফেনী দখল করার পর বিকেলের দিকে একটি ট্রাক দিয়ে আমার কোম্পানির হাবিলদার মেজর হাবিবুর রহমানকে পাঠিয়ে দেয়া হয় আমাদের পেছনে পরশুরাম- বিলোনিয়ায় ফেলে আসা ভারী জিনিসপত্রগুলো ফেনীতে নিয়ে আসার জন্য। এই সেই হাবিলদার মেজর হাবিবুর রহমান যিনি আমাদের ব্যাটালিয়নের ‘বাচ্চা গেরিলা সেকশন’টির একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা, প্রশিক্ষক এবং অধিনায়ক হিসেবে আটজন ৮/১০ বছরের শিশুকে নিয়ে অনেক দুঃসাহসিক অভিযান সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছিলেন।

প্রধান সড়ক দিয়ে বেলোনিয়া- পরশুরামের দিকে যাওয়ার পথে তারা ট্রাকটি পাকিস্তানিদের পুঁতে রাখা এন্টিট্যাঙ্ক মাইনের ওপর পড়ে যাওয়ায় এর বিস্ফোরণে তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদাতবরণ করেন। পরে গ্রামবাসীর সহায়তায় এই বীরযোদ্ধাকে সমাধিস্থ করা হয় বিলোনিয়ার লিচু বাগানে। দুঃখজনক হলো, এই একই পথ দিয়ে আমরা কয়েক হাজার সৈন্য পায়ে হেঁটে ফেনীতে প্রবেশ করি। অথচ তখন কোনও দুর্ঘটনাই ঘটেনি। অবশ্য হয়তো এর কারণও আছে। ২৫০ পাউন্ডের বেশি চাপ না পড়লে এন্টিট্যাঙ্ক মাইন বিস্ফোরিত হয় না। বিশাল ট্রাকের ওজনের কারণে পরে সেটি বিস্ফোরিত হয়েছিল। দোয়া করি হাবিলদার মেজর হাবিবুর রহমানসহ সকল শহিদ মুক্তিযোদ্ধাকে মহান আল্লাহ বেহেস্ত নসিব করেন।

এ দিকে ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক মেজর জাফর ইমাম আমাকে আমার বাহিনী ( ‘এ’ কোম্পানি) নিয়ে মাইজদী কোর্টের দিকে অগ্রসর হয়ে উপকূলীয় এলাকা পর্যন্ত শত্রুমুক্ত করার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী আমি ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের অগ্রগামী কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবে আমার ১৮০ জনের মুক্তিযোদ্ধার দলটি নিয়ে ৬ ডিসেম্বর দুপুরে ফেনী থেকে ৮ মাইল দূরে দাগনভূয়া দখল করে নিই বাধাহীনভাবে। এরপর পুরো বাহিনী নিয়ে দাগনভূয়া থেকে ১২ মাইল দূরে চৌমুহনীর দিকে অগ্রসর হই। এ দিকে পরিস্থিতি খারাপ দেখে রাজাকারদের এলাকার দায়িত্ব দিয়ে অত্র এলাকার পাকিস্তানি বাহিনীর সব সৈন্য কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের দিকে দ্রুততার সঙ্গে পালিয়ে যায়। চৌমুহনীতে প্রবেশের পর প্রথম বাধা আসে রাজাকারদের দিক থেকে। ওরা ডেল্টা জুটমিলের ভেতর থেকে আমাদের ওপর আক্রমণ চালায়। আমরাও মিলের বিভিন্ন রুমের ভেতরে প্রবেশ করে ওদের প্রতিহত করতে থাকি। কিন্তু রাজাকাররা মিলের বিভিন্ন রুমের ভেতর লুকিয়ে থেকে সঙ্ঘবদ্ধভাবে আমাদের ওপর অনবরত গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এ দিকে আমাদের  আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের ‘সি’ কোম্পানির অধিনায়ক সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট দিদার তার ১৫০ জনের পুরো কোম্পানি  নিয়ে ডেল্টা জুটমিলের ভেতরে এসে আমার সঙ্গে যোগ দেন। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা প্রচণ্ড সম্মুখযুদ্ধের পর আমাদের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে প্রায় ৮০ জনের রাজাকার বাহিনীর দলটি বাধ্য হয় সদলবলে  অস্ত্রশস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করতে। এই টানা সম্মুখযুদ্ধে তিনজন রাজাকার মারা যায় এবং অনেকে আহত হয়। অন্যদিকে আমাদের পক্ষের দুই/তিনজন যোদ্ধা আহত হন।

পরদিন ৭ ডিসেম্বর সকালে ‘এ’ এবং ‘সি’ কোম্পানি আমার এবং সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট দিদারের নেতৃত্বে রওনা হয় চৌমুহনী থেকে ২০ মাইল দূরে নোয়াখালী জেলা সদর মাইজদী কোর্ট দখলের উদ্দেশ্যে। সৌভাগ্যক্রমে চৌমুহনীতে আমরা পাকিস্তানি সৈন্যদের পরিত্যক্ত একটি জিপ পেয়ে যাই। আমার কোম্পানির একজন সৈনিক গাড়ি চালাতে জানত বলে জিপটা চালিয়ে যাওয়াও সেই মুহূর্তে আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। সকাল ১০টার দিকে মাইজদী কোর্টে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে পিটিআই বিল্ডিংয়ের সামনে আমরা বাধার সম্মুখীন হই। এখানেও রাজাকারদের একটি বাহিনী মুষলধারে গুলিবর্ষণ করে আমাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা চালায়। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও এর প্রতিউত্তর দিই। আমি এবং সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট দিদার মিলে টু ইঞ্চি মর্টার দিয়ে ব্যাপকভাবে কাউন্টার অ্যাটাক করি। আমাদের এই প্রচণ্ড আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে রাজাকার বাহিনী পিটিআই বিল্ডিং ছেড়ে পেছন দিক দিয়ে সদলবলে পালিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে আর কোনও ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী জেলা সদর মাইজদী কোর্ট আমরা দখল করে নিই। অয়্যারলেসের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সুসংবাদটা জানিয়ে দিই ফেনীতে অবস্থানরত আমাদের অধিনায়ককে।

খবর পেয়ে দুপুরের দিকে তিনি জিপে করে মাইজদী কোর্টে হাজির হন। উনার সঙ্গে ছিলেন আমাদের অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাও। পরে মুক্তিবাহিনী, জনসাধারণ ও সিভিল প্রশাসনের উপস্থিতিতে ডিসি অফিসের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক মেজর জাফর ইমাম। এরপর মাইজদী থেকে আরও দক্ষিণে উপকূলীয় এলাকার দিকে অগ্রসর হয়ে আমরা নিশ্চিত হই যে, ওই পর্যন্ত এলাকা এরই মধ্যে সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হয়ে গেছে। এ কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক ১০ ডিসেম্বর মাইজদীকে সিভিল প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করে আমরা ফেনী শহরে ফিরে আসি।

ওদিকে কলকাতায় অবস্থিত যৌথবাহিনীর কমান্ড থেকে ‘কিলো ফোর্স’কে নির্দেশ দেয়া হয় ফেনী থেকে সদলবলে চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হতে। সেই মোতাবেক চট্টগ্রাম দখলের উদ্দেশ্যে ১১ ডিসেম্বর ফেনী থেকে ১০ মাইল দক্ষিণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের সাহায্যে ‘কিলো ফোর্স’ অগ্রসর হয় শুভপুরের দিকে। পূর্বেই বলেছি, ৪র্থ ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গল এবং দুইটি ভারতীয় ব্যাটালিয়ন (৩১ জাট ও ৩২ মাহার) নিয়ে গঠিত কিলো ফোর্সের প্রায় ছয় হাজার সৈন্যের এই বিশাল বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার আনন্দ স্বরূপ।

বলাবাহুল্য, ২১ নভেম্বর নিজস্ব যানবাহন সহকারে ভারতীয় সুসজ্জিত সেনাবাহিনী বিলোনিয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ভারতীয় বাহিনী এ দেশের ভেতরে চলাচলের সময় তারা নিজস্ব যানবাহনই ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে আমাদের সহযোগিতা করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন প্রায় ৫০টির মতো স্থানীয় পাবলিক বাসের ড্রাইভার। তাদেরই গাড়িতে করে আমরা চট্টগ্রামের দিকে রওনা হই। চট্টগ্রামের দিকে যাওয়ার পথে শুভপুর ব্রিজের কাছে এসে আমরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে যেতে বাধ্য হই। কারণ পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটার সময় নিজেদের সুবিধার্থে বোমা দিয়ে ব্রিজটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। এ অবস্থা দেখে পেশাদার ও সুসজ্জিত ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা ছোট ছোট নৌকা দিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে নদীর ওপরে একটি ভাসমান ব্রিজ তৈরি করে ফেলে। সেই ব্রিজ দিয়ে আমরা অতি সহজেই নদী পার হই। ভারতীয় সৈন্যরাও তাদের সব যানবাহন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পার করে নেয়।

বিধ্বস্ত শুভপুর ব্রিজের নিচে দিয়ে তৈরি ওই ভাসমান ব্রিজ দিয়ে পার হয়ে ওপারে গিয়ে দেখি বেশ অনেকগুলো পাবলিক বাস আমাদের জন্য অপেক্ষা করেছে। এই কাজের জন্য বাসের ড্রাইভারদের কেউ জোর বা অনুরোধ করেনি। বরং তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আনন্দের সঙ্গে আমাদের সে সময় পরিবহনে সহায়তা করছিলেন। ভারতীয় সৈন্যরা তাদের নিজস্ব যানবাহনের সাহায্যে এবং আমরা আমাদের দেশের পাবলিক বাসে করে দুপুরের দিকে শুভপুর ব্রিজ থেকে ৪ মাইল দূরে জোরারগঞ্জে নিরাপদে গিয়ে পৌঁছাই। এর আগেই ফেনী-চট্টগ্রাম অক্ষ থেকে পাকিস্তানি বাহিনী পশ্চাদপসরণ করে সীতাকুণ্ড-কুমিরা এলাকায় গিয়ে সমবেত হয়ে আমাদের প্রতিহত করার জন্য বাঙ্কার খনন করে শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান নেয়। ১২ ডিসেম্বর আমরা সদলবলে জোরারগঞ্জ থেকে মিরেরসরাই হয়ে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত অগ্রসর হই। সীতাকুণ্ডে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলে দিনব্যাপী আমাদের উভয়পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড সম্মুখযুদ্ধ হয়। এতে পুরো এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হলে আশপাশের মানুষজন জীবন বাঁচাতে বাড়িঘর ফেলে যে যেভাবে পারে পালিয়ে যেতে থাকে। আমাদের শক্তিশালী বিশাল বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের কাছে টিকতে না পেরে এবং হতাহতের পরিমাণ বাড়তে থাকায় শত্রুরা একসময়  বাঙ্কার ছেড়ে পশ্চাদপসরণ করে। তারা সৈন্য-সামন্ত নিয়ে কুমিরার দিকে গিয়ে আমাদের প্রতিহত করার শেষ চেষ্টা হিসেবে আবারও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলে। অন্যদিকে আমরাও পরিকল্পনা মোতাবেক ধীরে ধীরে চারদিক থেকে এগিয়ে যেতে থাকি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর চট্টগ্রাম দখল করতে।

সীতাকুণ্ড দখলের পর ১০ম ইস্ট বেঙ্গলকে নির্দেশ দেয়া হয় বাড়বকুণ্ড থেকে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে হাটহাজারী দখলের জন্য। একইসঙ্গে ব্রিগেডিয়ার আনন্দ স্বরূপ ভারতীয় দুই ব্যাটালিয়ন নিয়ে প্রস্তুতি নেন কুমিরায় অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর বড় ধরনের আক্রমণের জন্য। নির্দেশনা অনুযায়ী অধিনায়কের নেতৃত্বে ১৩ ডিসেম্বর আমরা ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের প্রায় সাড়ে সাতশ মুক্তিযোদ্ধা রওনা হই অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে দুইদিন ও দুইরাত অবিরাম হেঁটে হাটহাজারী পৌঁছাই ১৫ ডিসেম্বর রাতে। কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে আমরা বিভিন্ন পাহাড়ে অবস্থান নিই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য। আমরা সহজেই পাহাড়ের ওপরের অবস্থান থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কে নির্বিঘ্নে অনেক গাড়ি চলাচল করছে। ১৬ ডিসেম্বর সকালে আমার বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসের মধ্যবর্তী স্থানে একটি সড়কে প্রতিবন্ধক স্থাপন করার জন্য। উক্ত অপারেশনে যাওয়ার আগে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে যখন আমার গ্রুপকে ব্রিফিং করছিলাম, ঠিক সেই সময় পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করে উল্লসিত কণ্ঠে আমাদের অধিনায়ক জানালেন, অপারেশনে যাওয়ার আর প্রয়োজন নেই। কারণ কিছুক্ষণ আগেই পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করেছে। এই সংবাদ শুনে আমরা সবাই যে কী পরিমাণ আনন্দিত হলাম তা বলার ভাষা আমার নেই। এটা এমনই একটি সংবাদ যা শোনার জন্য আমরা মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘ নয়টা মাস অপেক্ষা করছিলাম। এ সময় আমাকে নির্দেশ দেওয়া হলো, আমি যেন বাহিনী নিয়ে রাতটা হাটহাজারী পাহাড়েই কাটিয়ে পরদিন সকালে সদলবলে চলে যাই চট্টগ্রাম শহরে। হঠাৎ রাতে দেখি সম্ভবত রাঙ্গামাটি থেকে বেশ কিছু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লরি ও জিপ হাটহাজারীর রাস্তা দিয়ে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাচ্ছে। ক্যান্টনমেন্টকেই ওরা নিজেদের জন্য নিরাপদ স্থান ভাবছিল হয়তো। এটা দেখে নিষেধ থাকা সত্ত্বেও অতি উচ্ছ্বাসে আমরা সবাই মিলে সেই দূরের পাহাড় থেকেই বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করি।

১৭ ডিসেম্বর সকালে আমার কোম্পানি নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে এসে হাটহাজারী থানার দিকে অগ্রসর হই। থানাটি ছিল বাজারের ভেতরে। সকাল তখন ১০টা হবে, হঠাৎ থানার ভেতর থেকে পুলিশ সদস্যরা আমাদের ওপর অতর্কিত গুলিবর্ষণ করতে থাকে। তবে আমরা কোনো ধরনের কাউন্টার অ্যাটাকে না গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেরা নিরাপদ এলাকায় সরে এসে ভিন্ন রণকৌশল অবলম্বন করলাম। কারণ উভয়পক্ষের গোলাগুলির মাঝে পড়ে বাজারে উপস্থিত সাধারণ জনতার হতাহতের ভয় ছিল। বরং আমরা আস্তে আস্তে চারদিক থেকে পুরো থানাটি ঘিরে ফেলে মাইকিং করে তাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করাই। আসলে বাংলাদেশ যে আগের দিনই স্বাধীন হয়ে গেছে তা এই থানার লোকজন জানতই না। এ কারণেই ওরা তখনও পাকিস্তান সরকারের আনুগত্যে থেকে কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিল। থানাটিতে ছিল ৩৫ জনের মতো বাঙালি পুলিশ। থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) সাহেবের বাড়ি ছিল সিলেট জেলায়। আত্মসমর্পণের পর তাদের সবাইকে থানার ভেতরের মাঠে পেছন দিকে করে লাইন ধরে দাঁড় করালাম । মৃত্যু ভয়ে সবাই তখন কাঁপছিল থরথর করে। তাদের  একজনকে দিয়ে থানায় স্ট্যান্ড থেকে পাকিস্তানি পতাকাটি নামিয়ে কেরোসিন ঢেলে ওটা আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেললাম।

এদিকে রেডিওতে দেশ স্বাধীন হওয়ার খবর পেয়ে বাজারের বিভিন্ন দর্জির দোকানে তখন হিড়িক লেগে গেছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তৈরি করার। বাজার থেকে তেমন একটি পতাকা এনে আমি নিজ হাতে হাটহাজারী থানায় উত্তোলন করি। এত দীর্ঘ ও কঠিন যুদ্ধের পর বিজয় পেয়ে নিজ হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন আমার জীবনের অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে। টেরই পেলাম না মনের অজান্তেই কখন যেন দুচোখ বেয়ে নেমে এসেছে অশ্রুধারা। পরে সব পুলিশ সদস্যের কাঁধ থেকে ইপিপি (ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ) লেখা ব্যাজগুলো খুলে ফেলে একজনকে দিয়ে ফিরিয়ে দিয়ে মাটিতে গর্ত করে ওগুলো পুঁতে ফেলি। এরপর সবার নিজ নিজ অস্ত্র ফিরিয়ে দিয়ে নির্দেশনা দিই। এখন থেকে বাংলাদেশ সরকারের অধীনে কাজ করার জন্য। এ কথা শুনে এবং নতুন জীবন পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওসিসহ সব পুলিশ সদস্য আমাদের জড়িয়ে ধরে। ওসি সাহেব সঙ্গে সঙ্গে তার পুলিশদের নির্দেশ দেয়, বাজার থেকে মিষ্টি ও শিঙাড়া এনে ক্যাপ্টেন সাহেবসহ উপস্থিত সবাইকে আপ্যায়ন করার জন্য।

সবাই মিলে মিষ্টি খেয়ে দুপুর ১২টার দিকে আমরা বাহিনী নিয়ে কয়েকটা পাবলিক বাসে করে চট্টগ্রামের দিকে আগ্রসর হই। দুপুরের দিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে পৌঁছালে বিজয়ে উল্লসিত জনতা আমাদের বিপুল সংবর্ধনা জানায়। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য। এ অনুভূতির কথা খুব সহজে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম দখলের জন্য নিচে বর্ণিত মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর দলগুলো ১৬ থেকে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন দিক দিয়ে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করেÑ

১. ব্রিগেডিয়ার সুন্দর নেতৃত্বে ভারতীয় ৮৩তম মাউন্টেন ব্রিগেড চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে কুমিরা-ভাটিয়ারী- ফৌজদারহাট-পাহাড়তলী হয়ে।

২. ব্রিগেডিয়ার আনন্দ স্বরূপের নেতৃত্বে ‘কিলো ফোর্স’ প্রবেশ করে হাটহাজারী-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের পার্শ্ববর্তী সড়ক দিয়ে।

৩. ভারতীয় স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল সুজন সিং উবানের নেতৃত্বে বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স; ‘মুজিব বাহিনী’ হিসেবে সমধিক পরিচিত) এবং তিব্বতিয়ান বাহিনী প্রবেশ করে মিজোরাম-রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই হয়ে।

৪. মেজর রফিকের নেতৃত্বে ১ নম্বর সেক্টরের সৈন্যরা প্রবেশ করে ভাটিয়ারী-ফৌজদারহাট-পাহাড়তলী হয়ে।

৫. ভারতীয় সেনাবাহিনীর রোমিও ফোর্স সমুদ্রপথে কক্সবাজারে নেমে চট্টগ্রামে প্রবেশ করে সড়কপথ দিয়ে।

১৭ ডিসেম্বর দুপুরে সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে নাগরিক সংবর্ধনা শেষে বিকেলে আমার কয়েকজন সৈন্যকে সঙ্গে নিয়ে পাবলিক বাসে করে রওনা হই পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় আমাদের প্রিয় বাড়িটির উদ্দেশ্যে। বাবা-মা, ভাইবোনদের কতদিন ধরে দেখি না। উনাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় নয় মাস আগে সেই ২৫ মার্চ থেকেই। যুদ্ধ শুরু হবার পর উনারা জানতেন না তাদের ছেলের ভাগ্যে কী জুটেছে? তবে যুদ্ধ চলার তিন কী চার মাস পর মেঝো বোন রেখার মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হই। রেখা আপা তখন কানাডায় থাকতেন। আমি ভারত থেকে তার কাছে চিঠি লিখতাম। সেই খবর তিনি চট্টগ্রামে পাঠাতেন। এ ছাড়া আপার দেবরও মুক্তিযুদ্ধে এসেছিলেন। তিনি হলেন বিমান পাইলট ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দীন, বীর উত্তম। উনার মাধ্যমেও যোগাযোগ হতো। তবে যুদ্ধের তাণ্ডবে পরিবারের খোঁজখবর নেয়ার সময় পেতাম না খুব একটা।

১৭ ডিসেম্বর  বিকেলে বাড়ির সামনে এসে মনটা ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি আমার বাবার হাতে গড়া আমাদের প্রিয় বাড়িটি আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে আছে। বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, আমারই কারণে বাড়িটির এই দশা করেছে পাকিস্তানি সেনারা। হঠাৎ অজানা আতঙ্কে বুকটা কেঁপে উঠল, ‘তাহলে বাড়ির সবার ভাগ্যে কি ঘটেছে!’

আস্তে আস্তে গেট খুলে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম। আমাদের জুতার আওয়াজ পেয়ে পোড়া ঘরের ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে এলেন, পরিচয় দিলেন ‘এই বাড়ির কেয়ারটেকার’ বলে। আমিও নিজের পরিচয় দিলাম ‘আর্মিতে চাকরি করা এই বাড়ির ছোট ছেলে’ বলে, জানতে চাইলাম,‘বাড়ির সবাই কোথায়? উনার উত্তর শুনে মনে স্বস্তি ফিরে এল, আল্লাহর রহমতে সবাই বেঁচে আছেন। তিনি জানালেন, পাঁচলাইশ থানার পাশের এক বাসায় উনারা সবাই নিরাপদে আছেন। কেয়ারটেকারকে সঙ্গে নিয়ে সেই বাসায় উপস্থিত হবার পর যে হৃদয়গ্রাহী দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল তা বর্ণনাতীত। আমাকে দেখতে পেয়ে বাবা, মা, পরিবার-পরিজন সবার আনন্দের কান্না যেন শেষ হচ্ছিল না। স্বাধীনতার পর এমন দৃশ্যই দেখা গেছে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে পরিবার-পরিজনের মাঝে সুস্থভাবে ফিরে আসতে পারায় আমরা সবাই মিলে দু’হাত তুলে মহান আল্লাহ-তায়ালার দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।

প্রসঙ্গক্রমে বলি, আমাদের আত্মীয় ড. শাহদীন মালিক সে সময় চট্টগ্রামেই থাকতেন। আমার ফেরার খবর পেয়ে ছুটে আসেন আমার মুখ থেকে যুদ্ধের কথা বিস্তারিত জানার জন্য। ৩০ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ঘটে যাওয়া সেই লোমহর্ষক কাহিনি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা ঘটনা শুনে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। পরদিন চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় পত্রিকায় আমার মুখ থেকে শোনা সেই লোমহর্ষক কাহিনি তিনি লেখেন। লেখাটি সারা চট্টগ্রামে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল সে সময়।

এ দিকে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে। কিলো ফোর্সের ৪র্থ ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গল ক্যাম্প করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমরা ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সুসংগঠিত হয়ে ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে দৈনন্দিন কার্যক্রম  শুরু করি।

সত্যি কথা বললে একটা বিষয় স্বীকার করতেই হয় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সবার অংশগ্রহণ থাকলেও বাংলাদেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে অস্ত্র হাতে নিজের এবং পরিবারের জীবন বাজি রেখে যারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তারা শতকরা ৯০ ভাগ লোকই ছিলেন অতি সাধারণ এবং দরিদ্র ঘরের। উনারাই আগে লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন কার আগে কে দেশের জন্য রক্ত দেবেন সেই প্রতিযোগিতায়। এসব নির্লোভ মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলেন বড় কোনো পদ বা ক্ষমতার জন্য নয়। তারা কোনও বিনিময় মূল্যও আশা করেননি। শুধুমাত্র বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন বলেই তারা যুদ্ধে গিয়েছেন। তাদের অনেকেই পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত, নিগৃহীত হয়েছেন। যুদ্ধে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অথবা শহিদ হয়েছেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তাদের অনেকেই আজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা ইংরেজিতে কথা বলা তো দূরের কথা বাংলাও শুদ্ধভাবে বলতে পারেন না। সমাজের বড় বড় লোকদের ভিড়ে পারেন না নিজের অধিকার আদায় করে নিতে। অশিক্ষিত-দরিদ্র বলে পারেন না দেশের তথাকথিত জ্ঞানী-গুণীদের সঙ্গে সামাজিক কোনও অনুষ্ঠানে এক কাতারে বসতে। বিগত চার দশকে এ ধরনের হাজারো সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা বুকের ভেতর বোবাকান্না নিয়ে আমাদের সবার বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। এখনও সময় আছে, আমাদের উচিত মুক্তিযুদ্ধের নাম না জানা এসব সাধারণ, অশিক্ষিত ও গরিব মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের কথা দেশবাসীকে জানান। এতে কিছুটা হলেও উনাদের অবদানের মূল্যায়ন হবে, আর যাদের আমরা এরই মধ্যে হারিয়েছি তাদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে।

মাতৃভূমির মহান বীরদের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাদের কীর্তিকথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। জীবিত, পঙ্গু ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধা এবং সভ্রম হারানো মা-বোনদের প্রতি সম্মান দেখালে এর মধ্য দিয়ে আপনি, আমি, বাংলাদেশের সবাই সম্মানিত হবেন। স্বার্থপর বা বোকার মতো ভুলে গেলে চলবে না, আজ আমরা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে নিজস্ব পতাকা নিয়ে সারাবিশ্বে ঢেউ তুলতে পারছি একমাত্র আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের জন্যই।

(সংক্ষেপ করা হয়েছে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares