বই : হোসেন আবদুল মান্নান

বিশেষ প্রবন্ধ : বিশ্ব বই দিবস ২০২১

প্রতি বছর ২৩ এপ্রিল বিশ্ব বই দিবস (World book day) উদ্যাপিত হয়। বাংলাদেশেও কোনও কোনও স্থানে এর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালের ২৩ এপ্রিল UNESCO কর্তৃক বিশ্বব্যাপী এ দিবস চালু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার ফুলার রোডের ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ কাউন্সিলের সম্মুখে রক্ষিত একটি প্ল্যাকার্ড থেকে বই দিবস বিষয়টি আমার নজরে আসে।

আমাদের দেশে প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও দিবস পালিত হয় বা হচ্ছে। ‘বই দিবস’ আরও গুরুত্বের সঙ্গে জাতীয়ভাবে পালন করা যায়। কেননা, এ দিবস হতে পারে সবচেয়ে সর্বজনীন ও জনবান্ধব। এতে কারও কোনও আপত্তি, অনুযোগ, মান-অভিমান বা সংকোচ-সংশয়ের অবকাশ থাকবে না। সবাই এতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অংশ নিতে পারবেন। কারণ বই ভালো-মন্দ বিনীত-দুর্বিনীত সবার। পৃথিবীতে মনে হয় একটি মাত্র বস্তুই আছে যার কোনও শত্রু নেই, তা হলো বই। কত প্রয়োজনেই না মানুষ বই পড়ে। বই জ্ঞান অর্জনের জন্য, পরীক্ষা পাসের জন্য, চাকরির আশায় সার্টিফিকেট প্রাপ্তির জন্য, আনন্দ পাওয়ার জন্য, একাকিত্ব দূর করার জন্য, নতুন বই লেখার জন্য, তথ্য সংগ্রহের জন্য, এমনকি সুখকর একটি নিদ্রার উপাদেয় হিসেবেও এ বস্তুর উপযোগিতা কম নয়।

বইয়ের উপকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রেসক্রিপশন দেওয়ার কোনও বাসনা বা ক্ষমতা আমার নেই।

কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বই পড়া শুধু পড়া নয়, এর ভেতরে আনন্দ খুঁজে পেতে হয়’। শরৎচন্দ্র বলেছেন, ‘বই পড়াকে যে যথার্থভাবে সঙ্গী করে নিতে পারে তার জীবনের দুঃখ-কষ্টের বোঝা অনেকটা কমে যায়।’

প্রমথ চৌধুরী তো বই পড়া নিয়ে প্রায় একটি বই-ই লিখেছেন। আমরা জানি, সৈয়দ মুজতবা আলী বই সম্পর্কে ওমর খৈয়ামের বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে বলেছেন, ‘রুটি, মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে কিন্তু বইটি অনন্ত-যৌবনা।’

জাতীয় অধ্যাপক ও আমাদের অনেক শিক্ষকের শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘বই পড়া ব্যাপারটি হলো এমন, আপনি একটি বই পড়ছেন তারপর নিজেকে প্রশ্ন করেন, আপনি একই বিষয়ে আবার আরেকটি বই আপনার ভাষায় লিখতে পারবেন কি-না ? তবেই বইটি পড়া হলো।’

আমাদের সব্যসাচী লেখক প্রয়াত সৈয়দ হক বেশ ক’বছর তো টিভির পর্দায় বই হাতে নিয়ে দর্শকদের বলেছেন, ‘অন্তত পাঁচ মিনিট কোথাও যাবেন না, একদম নড়বেন না। বইয়ের কথা শুনুন।’ তাঁর সেই জাদুকরী উপস্থাপনায় তিনি ঠিকই আমাদের পাঁচ মিনিটের জন্য হাত-পা বেঁধে টিভি সেটের সামনে বসিয়ে রাখতে পারতেন।

আমার শিক্ষক প্রয়াত দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম, তাঁর চিরায়ত জীবন কোষ প্লেটোর রিপাবলিক বইয়ের অনুবাদ করেন। বইটার একটি সংস্করণের মুখবন্ধে বলেছেন, ‘একজন মানুষের যেমন জীবনকাল থাকে, একখানি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থেরও তেমনি জীবনকাল থাকে। ব্যক্তির জীবনের সঙ্গে গ্রন্থের জীবনের একটি পার্থক্য এই যে, ব্যক্তির মৃত্যু অনিবার্য হলেও একখানি মূল্যবান গ্রন্থের জীবনকালের কোনও অবসান ঘটে না।’

বই সংগ্রহেরও একটি নেশা থাকে মানুষের, যা উচ্চ শিক্ষিত মহাজ্ঞানী থেকে শুরু করে অর্ধশিক্ষিত পাঠকের মাঝেও কমবেশি থাকে। বই সংগ্রহের নামে অনেকের নানা বদভ্যাসও গড়ে ওঠে। এমন অনেক গল্প আমরা জানি। পড়ার চেয়ে ঘরের সেলফে নানা শ্রেণির বই সাজিয়ে রাখার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই আছে। সাধারণ মানুষ তো আছেই, দু-একজন বড় মাপের শিক্ষক বা মনীষীর জীবনেও বই চুরির জন্য নেমে এসেছে কালো অধ্যায়। তিনি হয়তো লক্ষ টাকায় হাত দিতেন না কিন্তু কাক্সিক্ষত বইটি কোনোক্রমেই হাতছাড়া করেননি। জীবনের সরকারি চাকরিকেও তুচ্ছজ্ঞান করেছেন কেবল একটি বই সঙ্গোপনে হাতিয়ে নেওয়ার অপরাধে।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বনামখ্যাত অধ্যাপককে জানি, বিদেশ থেকে পিএইচডি করে ফিরে আসার সময় আর্থিক যা সঞ্চয় ছিল তার প্রায় পুরোটাই তিনি ব্যয় করেছিলেন বই কিনে। তার ক্রয়কৃত সেসব অমূল্য বই জাহাজে করে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন।

আজকাল অবশ্য একধরনের শৌখিনতার অংশ হিসেবে কোনো কোনো বিত্তবান বই ক্রয় করে থাকেন। তার অফিস বা বাসার কাচের ঝলমলে আলমিরায় বই সংরক্ষণ করে রাখেন। তারা বই ভালো চেনেন না বা পড়েনও না। তারা শুধু প্রদর্শনের জন্যই এ কাজ করে থাকেন। বইয়ের লেখকের নামও তারা জানেন না বা জানার প্রয়োজনীয়তা বা আগ্রহবোধ করেন না। এ শ্রেণির মানুষের বই পড়ার তেমন কোনো সময় থাকে না। তারা ব্যস্ত থাকেন বৈষয়িক নানা কাজে।

বই কতটা আপন, কতটা সঙ্গদানকারী তা সবচেয়ে ভালো উপলব্ধি করতে পারেন জেলখানার একজন শিক্ষিত কয়েদি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা পণ্ডিত নেহেরু জেলজীবনকে আশীর্বাদ বলেছিলেন, জেল থেকে তার প্রিয়দর্শিনী মেয়ে ইন্দিরাকে লেখা কালজয়ী চিঠিগুলোই তো  Glimpses of World History। পৃথিবী পেয়েছে এক অনবদ্য দলিলচিত্র। আমাদের দেশেরও অসংখ্য বীর সেনানী, রাজনীতিবিদ, স্বাধীনতাকামী যোদ্ধা, আপসহীন নিঃস্বার্থ বিপ্লবী বা কমরেড জেলে থেকেই উচ্চ শিক্ষিত হয়েছেন। কারাগারে লেখাপড়া করে তারা কিংবদন্তি হয়েছেন। এখানে আমি অন্তত ৫০ জনের নাম উল্লেখ করতে পারব। তথাপি বলি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মানিক মিয়া, সত্যেন সেন, সরদার ফজলুল করিম প্রমুখ। তাদের মহৎ জীবন এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

অথচ এমন একদিন ছিল শিক্ষিত মানুষ মাত্রই বই পড়ার সঙ্গে থাকত। বাইয়ের নাম বলত, বইয়ের গল্প করত । গল্প, উপন্যাস, নাটক বা কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও পাঠ্যপুস্তক বিষয়ে মুখস্থ বলে দিতে পারত। স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন্ ক্লাসের জন্য কোন্ লেখকের বই সবচেয়ে উপযোগী তাও অবলীলায় বলে দিতেন। বাংলা ‘ব্যাকরণ’ বা ইংরেজি ‘গ্রামার’ কোন্ লেখক ভালো লিখেছেন তা তো আমরা ওপরের ক্লাসের বড় ভাই বা শিক্ষিত আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে জেনেছি। এমনকি একই বই শ্রেণি পরম্পরা ভাইবোন মিলে পড়ে যেতাম। বইটি মলিন হয়ে যেত, তার গায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যেত অনেক ঝড়, তবু বইটি কোনও প্রতিবাদ করত না। সে যেন চিরসহিষ্ণু, চিরবহা, চিরসহা মা। বরং বইটি পরম বন্ধুর মতো বলে, না না আমার কোনও অসুবিধা নেই, তুমি আমাকে বহন করো, তবে কিছু গ্রহণ করো।

এখন এসব কিছু নেই। বই আছে, পড়া নেই। অথবা পড়া আছে তবে সেটি বইয়ে নয়। অন্যত্রে গভীর মনোনিবেশ। সার্বক্ষণিক তাকিয়ে থাকা আছে। এ প্রজন্মের প্রায় সবার হাতেই খুব সহজে বহনযোগ্য একটি জিনিস আছে। এটি ‘স্মার্টফোন’। এদের দু’চোখের মণি এটি। কোথাও সরে যায় না, পড়েও যায় না। চোখের সামনেই স্থির ধরা থাকে। যেন প্রার্থনায় রত। এদের মস্তক অবনত। এতে নাকি পড়াও হয়। জানি না আসলে কী হয়? বা কী হবে!

তবে বই কখনও কোনো প্রতিবাদ করবে বলে মনে হয় না। কারণ সে তো চিরঞ্জীব। তার কোনও আফসোস নেই। অভিমান তো নেই-ই। বরং বই চিরসহিষ্ণু, জ্ঞানের আধার, চির অপেক্ষমাণ। সভ্যতার প্রয়োজনে তাকে স্পর্শ করতেই হবে। এখানেই তার সার্থকতা।

  লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares