শততম মুদ্রণে মা কিছু কথা, কিছু স্মৃতি : ফরিদ আহমেদ

বিশ্ব বই দিবস ২০২১-এর ‘মর্যাদাপূর্ণ বই’ আনিসুল হকের উপন্যাস মা

মা  একটি উপন্যাস, একজন মমতাময়ী মাকে নিয়ে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে। এখানে মুক্তিযুদ্ধের আগের ঘটনাপ্রবাহের কথা বলা হয়েছে। বর্ণনা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঘটনা, মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ এবং কষ্টের কাহিনি। মুক্তিযোদ্ধা আজাদের মা কেমনভাবে তাঁর ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে যাবার অনুমতি দিলেন এবং ছেলের যুদ্ধকালীন বন্ধুদের কীভাবে সহযোগিতা করেছেন। ছেলে এক সময় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হলেন। আর ফিরে এলেন না। মা অপেক্ষায় থাকলেন ছেলের জন্যে। ছেলে ফিরে আসবে। বন্দি থাকা অবস্থায় ছেলে ভাত খেতে চেয়েছিল। মা ভাত নিয়ে থানায় গিয়ে ছেলেকে পাননি। সেদিন থেকে ছেলেকে তিনি খুঁজে ফিরছেন এবং নিজেও ভাত খাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। বিছানায় না শুয়ে মেঝেতে শুয়েছেন ছেলের কষ্টের সঙ্গে সমব্যথী হয়ে। স্বাধীনতার পর ছেলের জন্যে এভাবেই তাঁর জীবনের পনেরোটি বছর পার হয়েছে ভাত না খেয়ে এবং মেঝেতে শয্যা পেতে। নিজের পরিচয় দিয়েছেন আজাদের মা হিসেবে এবং বলে গেছেন মৃত্যুর পর তাঁর কবরে লেখা থাকবে ‘শহিদ আজাদের মা’। এ কথা বলার মাধ্যমে তিনি জানিয়ে গেছেন যে, তিনি জানেন আজাদ শহিদ হয়েছে আর ফিরে আসবে না।এই কথাগুলো লেখক আনিসুল হক তাঁর মা উপন্যাসে লিখেছেন। এটি একটি উপন্যাস। অনেকে বলেন, এখানে সত্য ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এটি একটি বর্ণনামূলক গ্রন্থ। এখানেই লেখক আনিসুল হকের মুন্সিয়ানা। তিনি সত্য ঘটনাকে উপন্যাসে রূপ দিয়েছেন এবং গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন।

এ কাজটি হয়তো খুব সহজ ছিল না। অনেক তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করতে হয়েছে লেখককে। লিখেও ফেলেছেন এবং প্রথম আলোর একটি বিশেষ সংখ্যায় তা ছাপা হয়েছে। তারপরও লেখক এবং তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের মনে সংশয় ছিল পাঠক কীভাবে গ্রহণ করবেন এই লেখা। আদৌ পড়বেন তো ? লেখকের বন্ধু, সহকর্মী প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ একদিন আমাকে ফোন করলেন। অনেক উচ্ছ্বাস তাঁর কণ্ঠে, জানালেন আনিসুল হক একটি দারুণ উপন্যাস লিখেছে এবং এটি বই আকারে প্রকাশ করতে হবে আমাকে সময় প্রকাশন থেকে। তাঁর সংশয়ের কথাও জানালেন, বললেন, ‘বইটা চলবে না বেশি। প্রকাশকের হয়তো আর্থিক ক্ষতি হবে কিন্তু সুনাম ও মর্যাদা আসবে।’ একই রকম কথা আনিসুল হকও আমাকে বললেন, ‘ফরিদ ভাই, ভালো উপন্যাস লিখেছি। বইটা বেশি চলবে না, আপনার লস হবে কিন্তু প্রশংসা পাবেন।’ এত কিছু বলার পেছনে কিছু কারণ তো ছিলই। আনিসুল হকের বই প্রকাশ করছি ১৯৯৬/৯৭ সাল থেকে। ফাঁদ, হৃদিতার মতো ব্যবসা সফল বই আমরা প্রকাশ করেছি। চিয়ারি বা বুদু ওরাঁও কেন দেশত্যাগ করেছিল এবং বীর প্রতীকের খোঁজে-র মতো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইও প্রকাশ হয়েছে সময় প্রকাশন থেকে তখন পর্যন্ত। শেষের দু’টি বইয়ের কম বিক্রি হয়তোবা লেখকের মনে এই আশঙ্কা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু বই প্রকাশে নয়। বন্ধুত্ব বা তারও কিছু বেশিতে গড়িয়েছিল। কাজের মাঝেও কিছুটা সময় বের করে নিয়ে দু’জনে গল্প করতাম। সকালে আজিমপুর নিজ বাসা থেকে বের হয়ে চলে আসি এলিফেন্ট রোডে আনিসুল হকের বাসায়। এ সময় তিনি কিছুটা ফ্রি থাকেন। সকালে স্ত্রী অফিসে যায়, কন্যা স্কুলে। তাদের পৌঁছে দিয়ে এসে নিজে অফিসে যাবার আগ পর্যন্ত বাসাতেই থাকেন। মাঝে মধ্যেই আমি যাই, গল্প করি। কখনও আনিস বলেন, ‘চলেন পদ্যকে স্কুল থেকে নিয়ে আসি।’ আবার কখনও ওর সঙ্গে বের হয়ে প্রথম আলো অফিসে যাই। অন্যদের সঙ্গেও আড্ডা দিই। এ রকম একটি সম্পর্কের মধ্যে কোন বই ব্যবসা-সফল হবে, কোন বই হবে নাএটা মোটেও বিবেচ্য ছিল না।

বইয়ের কাজে হাত দিলাম এবং ফেব্রুয়ারি ২০০৩ বইমেলায় মা বই আকারে প্রকাশ পেল। বইটা কীভাবে পাঠকের হাতে পৌঁছানো যায়শুরু থেকেই লেখকের চেষ্টা ছিল। যদিও ইতোমধ্যে তাঁর অনেক বই বের হয়েছে কিন্তু এই বইয়ের প্রতি বিশেষ যত্ন। আমিও তখন অনেক বই প্রকাশ করে ফেলেছি। তারও এক যুগ আগে থেকে প্রকাশনা ব্যবসা করছি। তখনকার কিংবদন্তিতুল্য জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে এক যুগেরও বেশি সময়ের প্রকাশনা-যাত্রায় তাঁর অনেক ব্যবসা-সফল বই প্রকাশ করেছি। বইয়ের বাণিজ্যিকীকরণ বা জনপ্রিয় বইয়ের বাজারজাতকরণ সম্পর্কে বেশ ভালোই জ্ঞান ছিল। সেই জ্ঞান কাজে লাগাতে লাগলাম। কিন্তু আনিসুল হকের মানসিকতায় বাণিজ্যের বিষয় যেমন ছিল তেমনি প্রকট ইচ্ছা ছিল অনেক পাঠক বইটা পড়ুক। তখন বাংলাদেশের প্রকাশনা ক্ষেত্রে ইন্টারনেট প্রযুক্তি তেমন ব্যবহার হতো না। কিন্তু সময় প্রকাশন-এর নিজস্ব ওয়েবসাইট অনেক আগে থেকেই ছিল এবং লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের পরামর্শে ওই ওয়েবসাইটে নতুন বই আপলোড করা হতো। টাকার বিনিময়ে নয় ফ্রি ডাউনলোড করে যেন একজন পাঠক বইটা পড়তে পারে এবং তার বন্ধুদের পড়াতে পারে সেই ব্যবস্থা ছিল। প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল মুহম্মদ জাফর ইকবালের নতুন বই দিয়েই। এবার মা বইটির হার্ড কপি, প্রকাশের মাসে, বইমেলা চলাকালে সময় প্রকাশন’র ওয়েবসাইটে সফট্ কপি আপলোড করে দেওয়া হল। এবং তা উদ্বোধন করলেন মুহম্মদ জাফর ইকবালএটা ছিল অধিক পাঠকের কাছে মা বইটি পৌঁছে দেওয়ার একটা পদক্ষেপ।

তবে লেখকের আন্তরিকতা ছিল আরও বেশি কিছু। তিনি সব সময় বইটার প্রতি অতিরিক্ত যত্ন নিতেন। নতুন কোনো তথ্য পেলে পরবর্তী মুদ্রণে তা সংযোজন করার কথা বলতেন। আমিও ঐতিহাসিক বইয়ের গুরুত্ব এবং সততা বজায় রাখার জন্য এ কাজটা বিনা বাক্য ব্যয়ে করতাম। বইটার কাজে লেখকের সঙ্গে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপে সঙ্গ দিয়েছি। বই লেখার সময় সংগ্রহ করা আজাদের এবং মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্মারক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে জমা দেওয়া হয়েছে। আজাদের খালাত ভাই জায়েদ যে অনেক তথ্য সরবরাহ করেছেন লেখককেতাঁর সঙ্গে একাধিকবার আমাদের দেখা ও কথা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির কাছে মা বইয়ের কপি নিয়ে আমরা গিয়েছি। তাঁদের হাতে বই তুলে দিয়েছি। এভাবেই চলছিল। খুব বড় কিছু স্বপ্ন দেখছিলাম তা কিন্তু নয়। কিন্তু কয়েক বছর পর একটা বিষয় আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বইটা চলমান। থেমে নেই এবং একটা নির্দিষ্ট গতিতে এগিয়ে চলছে। বহুল বিক্রীত যেসব বই ইতোমধ্যে আমি প্রকাশ করেছিলাম সেগুলোর সঙ্গে এই বইয়ের গতি-প্রকৃতি মিলছিল না। একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে এই বইটা স্বতস্ত্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করছিল। প্রতিবছর একাধিকবার ছাপতে হচ্ছিল বইটি। পুরোনো বইয়ের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে এমনটি ঘটে না। তাতে বোঝা যাচ্ছিল এই বই পুরোনো হচ্ছে না। প্রতি ফেব্রুয়ারি বইমেলায় আনিসুল হকের নতুন বইয়ের পাশাপাশি একই গতিতে বিক্রি হতো মা। তখন আমার মনে একটা আশার সঞ্চার হলো। আর একটু বেশি যত্নবান হলাম। কিছু করপোরেশন হাউজ আগ্রহ দেখাল। বেশি পরিমাণ বই কিনে তাদের শুভানুধ্যায়ীদের উপহার হিসেবে দিল। এভাবেই মা ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

বই প্রকাশের পূর্বে লেখকের মনে যে আশঙ্কা ছিল তা দূর হয়ে আমাদের মনে আশার সঞ্চার হলোভালো কিছু একটা হবে। সেই ভালোর দিকে আমাদের আরও এগিয়ে দিলেন শ্রদ্ধেয় আনিসুজ্জামান স্যার, সরদার ফজলুল করিম স্যারের মতো বুদ্ধিজীবীগণ। মা নিয়ে তাঁদের উচ্ছ্বাস ও বক্তব্য এই উপন্যাসটিকে একটা মর্যাদার আসনে স্থান করে দিল। পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটাও ভালোভাবে এগোতে লাগল এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পঞ্চাশতম মুদ্রণ প্রকাশিত হলো। দশ বছর অনেক সময়। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হওয়ার দশ বছর পর অনেক বইয়ের অস্তিত্ব পাঠকের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায় এমনকি নাম পর্যন্ত হারিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এই বইটা ব্যতিক্রম। এভাবেই পরবর্তী সাত বছরের শেষে এসে আরও পঞ্চাশটি মুদ্রণ সম্পন্ন হলো। প্রথম প্রকাশের আঠরো বছরে এসে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে মা বইটা ১০০তম মুদ্রণের মাইলফলক স্পর্শ করল। এই ঘটনা একজন লেখক এবং বইটার প্রকাশকের জন্য অনেক বড় পাওনা। আর আমাদের পাঠক যারা শততম মুদ্রণে বইটাকে পৌঁছে দিয়েছেনতারা সবচেয়ে বেশি প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখেন। বাংলাদেশের পাঠক যে খুবই রুচিবান এবং সচেতন তার প্রমাণ পাই আমরা বার বার।

প্রথম মুদ্রণে বইটার যে গেটআপ-মেকাপ ছিল ৫০তম মুদ্রণ পর্যন্ত সেরকমই ছিল। যদিও এরমধ্যে দু’বার সংস্করণ হয়েছে। ২০১৩ সালে ৫০তম মুদ্রণের সময় নতুনভাবে কম্পোজ করে মেকাপ-গেটআপে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়, পরিবর্তন করা হয় প্রচ্ছদ। মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ২০১৮ সালে আরেকবার প্রচ্ছদ পরিবর্তনসহ বইয়ের মেকাপে পরিবর্তন আনা হয়। মূল্য আরও কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ১০০তম মুদ্রণে পরিবর্তন হয়ে যায় বইয়ের আকার। নতুন করে কম্পোজ ও সম্পাদনা করা হয়। বইয়ের বাঁধাইয়েও পরিবর্তন আনা হয়। এই মুদ্রণটিকে স্মারক হিসেবে সংগ্রহের উদ্দেশে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয় পাঠক-ক্রেতাদের জন্য। নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়। আমার ইচ্ছাএই আঙ্গিকে বইটা পরবর্তীকালে আর ছাপা হবে না। আবার ৯৯তম মুদ্রণের আঙ্গিকে ফিরে যাওয়া হবে। যদিও শততম মুদ্রণ পাঠকের এত ভালোবাসা পাচ্ছে তাতে পূর্বের আঙ্গিকে ফিরে যাওয়া যাবে কি-না তা বুঝতে পারছি না। প্রতিটি মুদ্রণের প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। আর এই দীর্ঘ যাত্রাপথে দেশ-বিদেশ থেকে বইটা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে নতুন নতুন প্রচ্ছদে প্রকাশিত হয়েছে। সময় প্রকাশনের ওয়েবসাইট থেকে বাংলা ভাষার মা বইটা ডাউনলোড করে পেরু থেকে এক বাংলাদেশি ছাত্র অনুবাদ করেছিলেন স্পেনিস ভাষায়। খধধ গধফৎব নামে যা সেখানকার এক প্রকাশকের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশন। ভারতের উড়িয়া ভাষার বিখ্যাত লেখক সরজিনি সাহু বইটা পড়েছিলেন ওয়েবসাইট থেকে। তাঁর আগ্রহে উড়িয়া ভাষায় বইটা অনুদিত হয়। প্রকাশ করেন ওডিশার একজন প্রকাশক। দিল্লি থেকে বইটার হিন্দি এবং ইংরেজি অনুবাদ গড়ঃযবৎ ড়ভ ঋৎববফড়স প্রকাশিত হয়েছে। ওডিশা এবং দিল্লিতে বইটার উড়িয়া এবং ইংরেজি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে লেখক আনিসুল হক উপস্থিত ছিলেন। বাংলা, ইংরেজি এবং স্পেনিস ভাষার বইয়ের জন্য প্রচ্ছদ তৈরি করেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। সুইডিশ ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশের অপেক্ষায় আছে বইটা। আমাজান থেকেও প্রকাশের প্রক্রিয়ায় আছে।

 লেখক : প্রকাশক, প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares