প্রবন্ধ : মিনার মনসুর : প্রতিবাদী কবিতার প্রতিচ্ছবি : বঙ্গ রাখাল

কপালে বিশাল লাল টিপ।

আজ দেখি শালবন ভেসে যাচ্ছে লালের প্লাবনে;

শিমুলের পলাশের দুকূল ছাপিয়ে

বয়ে যাচ্ছে বদ্বীপের―বিহ্বল বঙ্গললনার ব্যগ্র শিরায় শিরায়।

(তনু ও ত্বকীর জন্যে শোকগাথা)

কবিতা আমার কাছে আনুভূতিক ব্যাপারমাত্র। এটা একান্তই আমার চিন্তা-চেতনার ফসল ধার করা কোনো মতবাদ কিংবা হাওয়ায় হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া বুলি নয়। যে কারণে কবিতা বুঝতে আমাকে বেগ পেতে হয় না। কয়েকদিন ধরে একটি বই আমাকে চিন্তার জগতে বসিয়ে কিছু বলাতে চায় আর সেই বলার যাতনা থেকে কবিতা নিয়ে যৎসামান্য বলার চেষ্টা। কবিতাকে কোনো ফ্রেমের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখার বিষয় নয়। কবিতাকে অন্তর দিয়ে অনুভব করতে হয়। একজন যোগ্য কবিকে আবিষ্কার করতে বেগ পেতে হয় না। কারণ যিনি যোগ্য তার কবিতার মধ্যে মেলে ইতিহাস চেতনা, রাষ্ট্রভাবনা, ইতিহাসের প্রতি সততা, নিষ্ঠা আর বড় গুণ তিনি সমকালকে ধারণ করে হয়ে ওঠেন বিচক্ষণ কবিসত্তার অধিকারী। আমি এসব বলছি একজন রাষ্ট্র বা সমাজ সচেতন―এক কথায় সমকাল যার কবিতায় রক্ত-মাংসের জীবন্ত মানুষের অবয়ব―তিনি আর কেউ নয় একজন প্রতিবাদী ও বিপ্লবী কবি মিনার মনসুর।

কবিতা কোনো জটিল-কঠিন বিষয় না, যা কোনো মানুষকে স্পর্শ করতে পারে না। কবিতা হয়ে ওঠে কোনো ঘটনা বা কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে বা যৎসামান্য বিষয় নিয়েও মুহূর্তে হয়ে যেতে পারে কবিতা। সামাজিক অবক্ষয় থেকে আমাদের রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। দিনে দিনে আমাদের ধাবিত হতে হচ্ছে বিপদের দিকে। ঘুমের মধ্যেও মানুষ জেগে জেগে চোখের সামনে দেখতে পায় নিজের ভূত-ভবিষ্যৎ। ২০১৯ সালে কথা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি মিনার মনসুরের আমার আজব ঘোড়া কাব্যগ্রন্থ। যা আমাদের ঘুমন্ত সত্তাকে জাগ্রত করে।  নির্ঘুম রাত যাপনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা আজ প্রতিবাদহীন হয়ে নিজেকে শামুকের মতো ঢুকিয়ে দিয়েছি কোনো এক খোড়লের মধ্যে। যেখান থেকে বের হতে পারি না বা নিজেকে সেখান থেকে বের করতে চাই না। কেননা আমরা নিজের লোভ-লালসাকে দমিয়ে রাখতে পারি না বলেই অন্যায়ের গলাগলি ধরে পথ চলতে চাই―কবি জেনে গেছেন এদেশে জন্ম নেওয়া মানে এক বিপদসংকুল জীবনের হাতে নিজেকে তুলে দিয়ে পথ চলা। এজন্যই কবি বলতে পারেন :

১. পা মানেই বিষফোঁড়া―পোড়া দেশে এই;

জন্মেই জেনেছে তারা―ভবিষ্যৎ নেই।

২. চনামনার ঠ্যাং নয়―মেলাজুড়ে সাজানো আছে দগ্ধ শিশু আর ধর্ষিত নারীদের হিমায়িত ঠ্যাং।

কবি মিনার মনসুর তাঁর কবিতায় আক্ষেপ করে নিজের মনের কোণে জমা দুঃখের কথা বর্ণনা করেছেন। সব কিছু নিজের সামনে ঘটে গেলেও আমরা কিছু করতে পারছি না। তবুও আমাদের বলার কিছু থাকে না। কিন্তু কবি সব সময়ই প্রতিবাদী এবং সংগ্রামী হয়েছেন তবু কবির কিছু করার থাকেনি। যে কারণেই তাকে বলতে হয়Ñ

জানি, তুমি রক্ত-হিম করা ঢাকের শব্দ শুনতে পাচ্ছো। শুনতে পাচ্ছো গুহামানবের বুভুক্ষু নক আর দাঁতের গর্জন। চোখের মনিটরে ভেসে উঠেছে বিচিত্র সব দানবের জান্তব উল্লাস।…তাদের লালাসিক্ত জিব ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে সূর্যের দিকে। 

ক্ষমতার পালা বদল হলেও― এদেশের মানুষের লোভ-লালসা দ্বিগুণ হারে বেড়ে যাচ্ছে। নিজেকে আরও লোভী এবং প্রত্যাশী করে তুলছে। তাদেরই কবি নতুন পথের দিশা দিতে চেয়েছেন তবু তাদের  এসব কথা আজ ভালো লাগে না। আমাদের প্রত্যাশা এখন অধিক―সেই সম্মিলিত কথা আজ সংকুচিত হয়ে এককে এসে মিশেছে। আমরা আজ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছি। অবশ্যই কবিকে আজ স্বীকার করতে বাধা নেই যে পোকায় কেটেছে মায়ের স্বপ্ন―নকশি কাঁথার মাঠ আজ ইঁদুরে ভরে গেছে। 

এই কবির কবিতা মানেই যেন সমাজের এক অবয়ব। প্রকৃতির লীলার হয়তো একটু অভাব আছে কিন্তু জীবনবাস্তবতার কোনো কমতি নেই। সমাজের অসঙ্গতি আমাদের সামনে বারংবার কবি নানা বিষয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করার প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি সরাসরি কিংবা নানা ব্যঙ্গাত্মকতার মাধ্যমে আমাদের জানান দিচ্ছেন। সমাজে একের পর এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যা আমাদের মনকেও হিম করে তোলে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা মানুষজাতি হয়েও পশুর চেয়ে গর্হিত কাজ করে থাকি। নিজেদের মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতেও ঘৃণা লাগে। নিজের অন্তরে প্রশ্ন জাগে আমি কি মানুষ?  এজন্যই বুঝি কবি বলতে পেরেছেন : 

১. তবে কি বিফলে যাবে সব ?

আবহমানের বক্ষ ফুঁড়ে

বয়ে যাবেÑ সব ভেঙেচুরে

শুধুই রক্তের কলরব ?

২. কালকেউটের ফণার নিচে ত্রস্ত ইঁদুরের মতো কম্পমান আমাদের দিনরাত্রি।      

গভীর বেদনাবোধ কবির কবিতাকে করে তোলে আরও শক্তিশালী। তিনি কবিতায় উন্মোচন করতে চান মুখ ও মুখোশের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা মানুষের আসল চেহারা। যা আমাদের এক ধরনের সাহস সঞ্চয়ে সাহায্য করে। তবে কবির কবিতায় লক্ষ্যণীয়―তীব্র শ্লেষ। এই শ্লেষই কবির প্রতিবাদের অন্যভাষা। যা আমরা কবির সাথেও উচ্চারণ করতে পারি :

একদিন সত্যি সত্যি উড়ে যাবো―কেউ

টেরও পাবে না। পায়ে তীব্র ব্যথা নিয়ে

নিরাশ্রয় চেয়ারটি নিশ্চিত থাকবে বসে একা।

গোলাপের পাপড়ির মতো অবিরাম বর্ষিত হচ্ছে কাটা মুণ্ডের অর্ঘ্য। কবি প্রেমিকার কাছে গোলাপ চেয়েছেন পেয়েছেন কি না সে প্রশ্ন এখন থাক। এখন উপস্থাপিত হোক আমাদের অবস্থা। স্বার্থচিন্তা আমাদের গোলাপের পরিবর্তে মানুষের মুণ্ডু ফেলতেও দ্বিধা করে না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে ক্ষয়ে―করে তোলে বীভৎস এক ক্ষোভ-ঘৃণা-দ্রোহের মন। আমরা নিজেদের একজন ভালো মানুষরূপে গড়ে তুলতে চাইলেও পারি না। এই সমাজ আমাদের চলার পথকে কণ্টাকীর্ণ করে রেখেছে। একটু ভালো থাকাই জীবনের অনেক মূল্যবান বিষয় হয়ে বিকশিত হতে পারে :

একদিন শব্দহীন নিজেকে উড়িয়ে দেবো; ভেতরে ভেতরে

যে বিস্ফোরণ বেড়াচ্ছি বয়ে খুলে দেব তার পিন।

সত্য বটে কাটিয়েছি অজস্র নির্ঘুম রাত এই ভেবেÑ

জীর্ণ মাটির পুতুল ভেঙে গেল বলে।

মিনার মনসুরের কবিতার জানালায় এসে বারংবার উঁকি দেয় প্রতিবাদ ও সংগ্রাম। অশুভের বিরুদ্ধে তার এই সংগ্রাম নিরন্তর। তিনি নিজের দায়বদ্ধতাকে অন্তরে ধারণ করেই কবিতায় সেই বিষয়কে উপস্থাপন করেন। যে কারণে কবির কবিতায় এক ধরনের অন্যায়ের প্রতি প্রতিবাদ প্রতিফলিত হয়। মানুষের লালায়িত স্বপ্ন শহরে এসে নিজের জীবনকে সাজিয়ে তোলে কিন্তু সবাই কি নিজের জীবনকে সাজিয়ে তুলতে পেরেছে ? কিন্তু মানুষের বাসনার তো শেষ নাই ? ঘোড়া নামের বেঢপ্পা ঘোড়ামানুষের জীবনকেই চিরতরে বিনাশ করে দেয়। চোখের সামনে কবি কত জনকেই নিজের জীবন থেকে চিরতরে বিদায় নিতে দেখেছেন। প্রমাণিত সত্য বলেই কবি বলতে পেরেছেন―

আরেকটি দিন। যথারীতি ঢাকা দাঁড়িয়ে আছে একপায়ে। ট্রয়ের সুবিশাল ঘোড়া। তার পেটের ভিতর বেমক্কা ঝুলে আছে জনৈক মিনার মনসুর। পিঠের পুরনো ব্যথা সঙ্গ দেয় তাকে। আমি উড়ে যাই।…হালাই এমন আজব শহর সারাক্ষণ মাথাডা সারাক্ষণ চক্কর খায় লাটিমের মতন।…কারে কারে ভালোবাসছ তুই ? মাগি, ঢাহা নামের এই বেঢপ ঘোড়া কি তোরেও করাইছে জাদু ?

আমরা সবসময় নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে সংগ্রাম সেমিনার করে থাকি। নারীকে সকল ক্ষমতার উৎস ভাবি। পুরুষের পাশাপাশি কিন্তু শেষাব্দি নারী নারীই থেকে যায়। নারীকে ভোগ্যবস্তু ভেবে তাকে ভোগ করার জন্য আমরা মরিয়া হয়ে উঠি। এই নারীই আবার মা, বোন। এইসব বাস্তবতায় যেন কবির কবিতাকে একটা অন্য মেজাজ দান করেছে।

১. যে নারীর স্তন্যরসে তুমি হৃষ্টপুষ্ট হয়েছো তার হাতপা বেঁধে তুমি তাকে ছুড়ে দিতে পার ক্ষুধার্ত সিংহের খাঁচায়। অথবা তাকে ফেলে আসতে পারো দুর্গম কোনো পর্বতশৃঙ্গে―শকুনেরা যেন খুবলে খেতে পারে তার মাংস-মজ্জা।

২. দুই নারীকে ঘিরেই আবর্তিত মানুষের যাবতীয় ভ্রমণের গল্প। একজন নিশ্চিন্ভাবে আমাদের জন্মদাত্রী। অন্যজনকে বলা যেত জীবনদাত্রী…

পুরুষনামের অসভ্য আর বর্বর হায়েনাদের চিত্র কবি তার কবিতার প্রতিটি লাইনে তুলে ধরেছেন। নিজেদের তুষ্টির জন্য তারা অন্যকে নিজের খাদ্যসামগ্রী ভেবে ভোগবিলাসে মেতে ওঠে। চশমার দেয়াল টপকে বেরিয়ে আসে তার ধূর্ত দাঁত আর লকলকে জিভ।…এসব যেন ছন্দের কথামালায় হয়ে উঠেছে সমাজ বা কু-রাজনীতির প্রতি তীব্র স্লোগান।

নিজেকে অনেকটা শৈশবের একজন সহজ-সরল মানুষ ভেবে কবি এই কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছেন। তিনি উইট হিসেবে অনেক কথা বলার চেষ্টা করেছেন, যা অতিসাধারণ কথা হলেও, আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া সত্যকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন এবং সেদিক থেকে তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। কবি মিনার মনসুরের কবিতা কোন দুর্বোধ্যতার দিকে ধাবিত হয়নি বরং এই কবিতা একটু প্রতিবাদের দিকে ধাবিত হলেও সরলতার মেজাজ পেয়েছে―যা পাঠকের বুঝতে বিন্দুমাত্রও কষ্ট হয় না।

মুখটি বড়ো চেনা মনে হয়। তবে কি পিকাসো এ ষাঁড়টির কথাই বলেছিলেন গুয়েরনিকার বিষন্ন সন্ধ্যায় ? ঘুমিয়ে পড়ার আগে তার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান ? শুনে গাবতলীর লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলি হাসে। বলে, এইডারে আপনে ষাঁড় কন! বেড়ার জঙ্গলে আচানক গরুর দঙ্গল দেইখ্যা আউলাইয়া গেছে বুঝি সব ?

মানুষের অন্তরের গহিন কোণে এমন কিছু কষ্ট জমা থাকে যা কখনও কাউকে বলা যায় না। আবার সহ্য করার মতো সামর্থ্যও অনেকের থাকে না। যে কারণে বুকফাটা চিৎকারে মানুষের অন্তর কেঁপে কেঁপে ওঠে। কবি মিনার মনসুরের অন্তরেও লুকিয়ে আছে কত অজানা দুঃখ। যে দুঃখ কবিকে পোড়ায়, কষ্ট দেয়, যাতনায় ব্যথিত করে প্রোথিত করে―মাটির নিচের বাসিন্দা করে। কে শুয়ে আছে আমার বিক্ষত পাঁজরের পাশে? নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার না হলে এভাবে কে-ই বা বলতে পারে। গিরিবাজ কবুতরের মতো সশব্দে বেজে ওঠে শৈশবের শত ডানা।…নারীর দ্রুত পরিবর্তনশীল স্বভাবের চেয়ে অদ্ভুত আমাদের এ বদ্বীপের চরিত্র। সবাই ক্ষমতার গদিতে নিজেকে আসীন করতে চাই। আর টিকেও থাকতে চাই তার এই ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষককে লেহন করে নতুবা টিকে থাকাটা তো অনেক কষ্টের। এ কথা কবি বুঝেছেন অনেক আগেই তবুও কিছু করার থাকে না। লালাসিক্ত জিবে লেহন করে ক্ষমতার কুষ্ঠান্তÍ কুঁজ। আমরা সবাই মানুষের মতো দেখতে হলেও আসলে কেউই মানুষ না। কুকুর রূপে এক মানুষের অবয়ব পেয়ে হয়েছি ভণ্ড আর ঠকবাজ বেহায়া প্রাণীর সাজ। মানুষ কুকুর। কোথায় মানুষ? তবু আমরা অন্যায়কে মেনে নিতে পারি না। আমরা প্রতিবাদ করবই। নিজেকে হাজার বিপদের মাঝেও জাগিয়ে রাখব। কোনোভাবেই নিজেকে টলে পড়তে দিব না। আমাদের ভিতরের বাঘ এখনও মরেনি। মরে নাই ভেতরের বাঘ। যুদ্ধ জারি আছে। থাকবেই।

কবি একজন প্রেমিক―যে আমাদের প্রতিবাদের সোচ্চার কণ্ঠে বিমোহিত করে রেখেছেন, সেই একই জন প্রিয়ার মলিনমুখ দেখে হতবাক হয়েছেন। প্রিয় মুখের জন্য তিনি গভীর বেদনায় বৈরাগী হতে চেয়েছেন এবং বিষণ্ন হয়ে ফিরেছেন মাঠে-ঘাটে-বাটে। তবুও বেদনাক্লিষ্টতায় নিজেকে করেননি উদাসীন। এই জীবন তো কাচের চেয়েও ভঙ্গুর, তাকে নিয়ে কবির সংশয়ের কোনো সীমা পরিসীমা নাই। এ জন্যই নিজেকে রক্তাক্ত করেন গ্লানির চাবুকে।

মানবতার নাজুক অবস্থা―বঞ্চিত মানুষের অধিকার অর্জনের শ্লথগতি কবি উপলব্ধি করেছেন অনেক আগেই। সেখানে প্রেয়সীর মুখও ঝলসানো মনে হয়। এই বিরহতাকে কবি কাটিয়ে উঠতে চেয়েছেন মানুষকে ভালোবেসে কিন্তু কি ঘটল ? তিনি এই চেনা জগতে দিনকে দিন অচেনা হতে শুরু করেছেন আর যারা ভণ্ড তারাই ক্ষমতার আসনে বসে লাশের প্লেট সাজান। এই জন্যই তো কবি আজ বসে থাকে শবাসনে―চারিদিকে আজ শবের শাসন। শুধু শবনৃত্য দেখেন কবি। এই পৃথিবী নামের কঠিন পরীক্ষাগারে মানুষকে পরীক্ষা দিয়েই বারবার টিকে থাকতে হয়। এখানে একটু পা পিছলে গেলেই পড়তে হয় গভীর বিপদে। কবির মা কবিকে ব্লেড দেখিয়ে বলেছিলেন : 

বুঝলি বাছা, এটা হলো ব্লেড। দুদিকেই ধার। তোকে তার ওপর দিয়েই হাঁটতে হবে আমৃত্যু। আর কবি মায়ের সেই কথারই আজ বাস্তবতাকে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।

একজন বিপ্লবী মানুষ না হলে কি করে একজন কবি বলতে পারেন―কাঁটা তারে ঝুলন্ত যে ঝলমলে কিশোরীকে দেখছো সে আমি। আমি শোকের শবধারী। আমাকে কেউ রোধ করতে পারবে না। নিঃসঙ্গতাকে তিনি মেনে নিয়ে নির্বাসিত জীবন-যাপন করতে চান না বলেই―মানুষের কথা ভাবেন আর যারা নিঃসঙ্গ হয়ে বাঁচতে চান তারা তো নিজের জীবন থেকেই পালিয়ে বাঁচতে চায়। কংক্রিটের নিচে চাপাপড়ে থাকা―জলে ভাসা―আগুনে পোড়া যে-আর্তনাদ হিম হয়ে আছে হিমালয়ে―মেরুতে মেরুতে―আমি সেই জীবন্ত ফসিল। আজ কবি যে এই দীপ্ত কণ্ঠেই বলছেন বা ব্যক্তিজীবনে তিনি আপস করে চলার লোক তা কিন্তু নয়। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে চলতে শেখেননি। আমরা জানি তিনি বিপদ নিজের দোরগোড়ায় জেনেও ১৯৭৯ সালের ভয়াবহ সময়ে সম্পাদনা করেছিলেন―শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিবাদ কবির রক্তে মিশে একাকার হয়ে গেছে যে কারণে নিজেকে একজন মৃত মানুষের চিত্র ধরেই বলেন―সে তো আমারই রক্তরেখা;―বর্শার ফলায়বিদ্ধ যে-করোটি দিয়ে মানচিত্র আঁকো সেও আমি। আমিই জোগান দেই স্বর্ণমুদ্রা, সিল্ক আর হেরেমের অন্ধকারে দিন।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares