মনজুরে মওলার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য : কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়

শোকাঞ্জলি : মনজুরে মওলা

এক প্রথিতযশা প্রধান শিক্ষক জনাব কাজী আম্বার আলীর পুত্র কাজী মনজুরে মওলা শেষে আমাকে ‘গুরুমশাই’ ডাকতে শুরু করলেন। একেবারেই নাছোড়বান্দার কাজ। নিবৃত্ত করা যেত না।  যায়নি। নানা কারণে তাঁকে শিক্ষকতা পেশা থেকে সরে যেতে হয়েছিল। ঢাকা কলেজের ইংরেজি বিভাগে তাঁর শিক্ষকতা করার রেকর্ডস্ আমি নিজে দেখেছিতার পার্সোনাল ফাইলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন শুনেছি। খুব দ্রুতই হয়তো তিনি পাকিস্তান-রাষ্ট্রের জনপ্রশাসনের চাকরি নিয়ে চলে যান। তবে; জীবনে পড়াশোনা লেখালেখি, ইত্যাদি তার কখনওই বন্ধ হয়নি। কাছে থেকে দেখে আমি জানি যে জোর এক বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য তার মধ্যে শেষ পর্যন্তও বহমান ছিল। জনপ্রশাসকের পেশা হয়তো তাঁর বৃদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডকে কিছু বিশেষ চরিত্র এবং ঝোঁক জুগিয়েছিল। কিন্তু, তা যে তাতে একেবারেই কিছু যোগ করেনি, তা নয়। দক্ষতা, যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা তাকে কোনও-কোনও এলাকায় সাহায্য করেনি, তা নয়।

মনজুরে মওলা যখন সাভার গণপ্রশাসন একাডেমির রেক্টর, তখন বঙ্গবন্ধুর সূত্রে সেখানে গিয়ে শুনেছি রেক্টর মহোদয় এক দুরূহ গবেষণায় নিরত, তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠ সহকর্মী তাতে তাঁকে সাহায্য করেছিল। মনজুরে মওলাকে যারা সাহায্য করছিলেন, আমার বন্ধু আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া তাদের অন্যতম। টি এস এলিয়টের গুরুত্বপূর্ণ নাটক গঁৎফবৎ রহ ঃযব ঈধঃযরফৎধষ নিয়ে শুরু হয়েছিল গবেষণার উপকরণ সংগ্রহ এবং অন্যান্য প্রস্তুতি। সহকর্মীদের সহযোগে অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের খবরও পেয়েছি মনজুরে মওলার ক্ষেত্রে। যেমন শ্রাবণ নামের একটি সাহিত্যপত্র সম্পাদনা এবং প্রকাশনার খবর। আবেদীন কাদের যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে জনপ্রশাসকের শিল্পকলা একাডেমির কিংবা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পাওয়াও দুঃসংবাদ ছিল না। দেশে তখন সামরিক-বেসামরিক শাসনের পর্যায়, আমলা তথা বেসামরিক প্রশাসকদের সুদিন। খোদ সামরিক শাসনকেই যখন রোখা যাচ্ছিল না, ব্যক্তি বেসামরিক শাসকদের মধ্য থেকে বেছে নেওয়াটাই ছিল দেশবাসীর জন্য একমাত্র বিকল্প। তেমন বিকল্প হিসেবে কাজী মনজুরে মওলা ছিলেন দৃষ্টান্তস্থানীয়। বিশেষত বাংলা একাডেমিতে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে রয়েছে বলেই অনেকে বলেন। ঐতিহ্যবাহী বর্ধমান হাউজের  সংস্কার ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞার পরিচায়ক। মূল নকশাটি অপরিবর্তিত রেখে সংস্কার-সাধনের ধারণা অত্যন্ত আধুনিক প্রমাণিত হয়, শুদ্ধ ত্রকটি ইতিহাসবোধের প্রমাণ বাংলা একাডেমিতে মনজুরে মওলা আর একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিলেন সফলভাবেভাষাশহিদ গ্রন্থনা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ১০০টি মনোগ্রাফ। সেখানে শেষ বইটি ছিল আমার লেখা স্বপ্ন সম্পর্কে। স্বপ্ন বিষয়টি নিয়ে বাংলা ভাষায় ওর আগে কোনও পূর্ণাঙ্গ বই ছিল না। অধিকন্তু, স্বপ্ন বিষয়টি মূলত মনোবিদ্যার (ঢ়ংুপযড়ষড়মু) আওতাভুক্ত। সাহিত্যের ছাত্র হয়ে বিষয়টি আয়ত্ত করে বাংলাভাষার প্রথম বই লেখা বেশ দুঃসাধ্য ছিল। কিন্তু, আমার মনে আছে পাণ্ডুলিপি পড়ে একাডেমির মহাপরিচালক আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন। উপস্থিত হলে তিনি আমাকে সাধুবাদ জানান। সেদিনই তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। যার সমাপ্তি হলো গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০।

মধ্যখানে আমি নাট্যজন কামালুদ্দিন নীলুর প্রেরণায় হেনরিক ইবসেন-বিষয়ক কিছু লেখালেখি আর কর্মকাণ্ডে যুক্ত হই। নীলু ভাই’র সংগঠন সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার আয়োজিত সেমিনারে প্রবন্ধ পড়ি, কনফারেন্সে যোগ দিতে নরওয়ে যাই। সেসবে দেখছিলাম কাজী মনজুরে মওলাও যুক্ত। তিনি ইবসেনের বিখ্যাত নাটক ব্রান্ড অনুবাদ করলেন। অসলোগামীদের মধ্যেও ছিলেন তিনি। অসলোতে আমরা ক’দিন একই হোটেলে ছিলাম। ইবসেন মৃত্যুশতবর্ষ উদযাপনের শেষ অনুষ্ঠান ছিল নরওয়ের রাজার দেওয়া ব্যাঙ্কোয়েটমনজুরে মওলার নিবিড় তত্ত্বাবধানে আমরা ক’জন রাজকীয় ভোজন নিয়মকানুন মেনে খানাপিনা করলাম। লক্ষ করেছি খানাপিনায় তাঁর উদ্দাম আগ্রহ সক্ষমতা। ওঁর শুধু পায়ে কিছু বৈকল্য ছিল, হাঁটতে সমস্যা। অন্যসব কিছু ঠিক। তিনিই আমাদের মাতিয়ে জমিয়ে রেখেছিলেন। কাজী মনজুরে মওলার রসবোধ আর চুটকি বলার যোগ্যতা তো কিংবদন্তি! সোনিয়া নিশাত আমিন, আহসানুজ্জামান প্রমুখ ছিলেন আমাদের সফরসঙ্গী। আমরা সকলেই কাজী মনজুরে মওলার সহজ-সরস সাহচর্য উপভোগ করেছিলাম।

এমন সব যোগাযোগ-ওঠাবসার কোনো এক সময়ে কাজী মনজুরে মওলার এলিয়ট-গবেষণার প্রবন্ধটি পুনরুজ্জীবিত হয়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে কর্মরত থাকায় তিনি এ সম্পর্কে ভাবেন কি না আমি জানি না। তবে তা ছিল এ-সম্পর্কে তার সংগৃহীত তথ্য, ভাবনা, সিদ্ধান্তকে শুধু নিয়মানুগভাবে উপস্থিত করা। দরকার হয় নিবন্ধন, এবং তখন তিনি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেন। বিস্মিত হওয়ার মতোই। কিন্তু, তিনি ছিলেন সিরিয়াস। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেশ করে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলো। মনজুরে মওলার সঙ্গে আমার যোগাযোগ বেড়ে যায়। তিনি আমার শিক্ষকস্থানীয়। কিন্তু, তখন তিনি আমাকে গুরুমশাই ডাকা শুরু করেন। আমি চেষ্টা করেছি আমাদের বিভাগের এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের বই তুলে তুলে ওঁকে জোগান দিতে। কিন্তু, আগেই বলেছি, গবেষণার কাজ বহু আগেই ওর হয়েছিল এবং প্রায় শেষ। সুতরাং কাউকেই বেশি বেগ পেতে হয়নি। সব নিয়ম মেনে ভিন্ন সব কিছু করেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অফিস তাকে অনেক সহযোগিতা করে। রেজিস্ট্রার ভবনের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় নির্দিষ্ট কক্ষে তিনি যেতে পারতেন নাকর্মকর্তারা নিচে নেমে এসে কাজ করিয়ে নিয়েছেন। তারা সকলেই বিস্মিত এবং আপ্লুত ছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমিও খুবই সম্মানিত বোধ করেছি। জীবিকাসহ নানা বৈষয়িক তাগিদে ছাড়া বাংলাদেশে আমরা সাধারণত পড়ালেখা কিংবা গবেষণা করতে চাই না, যাই না। মনজুরে মওলার পিএইচডি গবেষণা ছিল ব্যতিক্রম। ডিগ্রি পাওয়ার পরও দেখেছি মনজুরে মওলার কোনও প্রচার-প্রকাশ নেই। ক্বচিৎ তিনি কোথাও কিছু বলেছেন, দাবি করেছেন। ঐ গবেষণার ফল অভিসন্দর্ভ থেকে নিয়ে টি এস এলিয়ট সম্পর্কে তাঁর তিন-তিনটি বই বেরোয়। কিন্তু লেখক ছিলেন প্রচারবিমুখ, নীরব। ইতোমধ্যে এল ২০১১, রবির জন্মের সার্ধশতবর্ষ। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে যাঁরা নিজেদের রবীন্দ্রগ্রাহী-রবীন্দ্রবেত্তা হিসেবে প্রমাণ করেছেন, কাজী মনজুরে মওলা তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা ছিল বিস্ময়কর। ২০১১ সালে একটা ব্যতিক্রম উদ্যোগ নেওয়া হয়একটি রবীন্দ্রগ্রন্থমালা প্রকাশের। কিছুটা বাংলা একাডেমির সেই ভাষাশহিদ গ্রন্থমালার মতোই। এ জন্যে একটা  উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়অধ্যাপক কবির চৌধুরী ছিলেন তার সভাপতি; আর সদস্য ছিলেন অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী এবং অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এই পরিষদ গ্রন্থমালা সম্পাদনার দায়িত্ব দেয় মনজুরে মওলাকে। আমি মনে করি; উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে একটা সুপাত্রে দানের ব্যাপার। যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার। এ গ্রন্থমালার সম্পাদনার ক্ষেত্রে আমিও ছিলাম, একজন ‘সম্পাদনা সহযোগী’ হিসেবে। এখানে একটি বইও আমি নিয়েছিলাম : রবীন্দনাথ : ধর্মভাবনা। রবীন্দ্রনাথ বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা রাখেন মনজুরে মওলার বেলায়। একই জীবনধারা তাঁদের দুজনার। আমি প্রথম-হাত-সাক্ষ্যে  জানি মনজুরে মওলা ইউনাইটেড হসপিটালের রোগশয্যায় শুয়েও কবিতা লিখেছেন, কবি সরকার আমিনকে তা পড়ে শুনিয়েছেন। এমন কর্মযোগী বিরল। রবীন্দ্রস্মারক গ্রন্থমালা প্রকাশ করেছিল মূর্ধণ্য প্রকাশনী, তার স্বত্বাধিকারী শ্রীমান সঞ্জয় মজুমদার আমাকে জানিয়েছেন কোভিড মহামারির সময়কালেও তিনি মনজুরে মওলার বাসস্থানে গিয়ে ওঁর সদ্যলিখিত কবিতা শুনেছেন। ওই সময়ে এমন জনসংযোগে কবির পরিবার অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ ছিলেন, তার প্রতিক্রিয়া দেখতে পেয়েছেন সঞ্জয়। টেলিফোন-সংলাপে আমিও তার আঁচ পেয়েছি। একাধিকবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ২০২০ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল মনজুরে মওলার কাব্যগ্রন্থ জোরে শ্বাস নাও। অল্পসময়ের ব্যবধানেই গোটা মানবজাতিকে এই চিকিৎসা নির্দেশনা গ্রহণ করতে হয়। করোনা তো মূলত ফুসফুসের রোগ।

মনজুরে মওলার এমন কিছু কাজের পাশাপাশি অন্যতম শেষ কিন্তু অতিবৃহৎ কৃতি হচ্ছে মনজুরে মওলা সম্পাদিত বাংলাদেশের কবিতা ১৯৪৭-২০১৭ অর্থপূর্ণভাবেই যা উৎসর্গিত একাত্তরে শহিদ কবি মেহেরুন্নেসাকে। ৭৯ পৃষ্ঠার দীর্ঘ এক ভূমিকাসহ-এ-বইয়ের মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ৯৪৯। আমি কৃতজ্ঞ যে এ-বইয়ে আমার ৪টি কবিতা স্থান পেয়েছে এবং সম্পাদক যে একুশজনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখযোগ্য যে, এ সংকলনের ২৭৮ জন কবির ৭৮০টি কবিতা স্থান পেয়েছে, এখানে অন্তর্ভুক্ত সর্বজ্যেষ্ঠ কবির জন্ম ১৮৯৩ সালে, সর্বকনিষ্ঠ কবির, ১৯৯৩ সালে। সময়ের ব্যবধান একশ’ বছরের।

এই অতিসংক্ষিপ্ত লেখাটিতে আমি মনজুরে মওলার প্রতি আমার সশ্রদ্ধতার ভগ্নাংশও প্রকাশ করতে পারিনি। আমার  গুরুমশাই এবং পাঠকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

 লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares