পাঠ প্রতিক্রিয়া : সত্তরের প্রজন্মের এগারো জন কবি : স্বপন নাথ

সত্তরের প্রজন্মের এগারো জন কবি শিরোনামায় প্রবন্ধ লিখেছেন লেখক সরকার মাসুদ। এ প্রবন্ধ মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে মোহিত কামাল সম্পাদিত শব্দঘর ডিসেম্বর ২০২০ (৫০তম বিজয় দিবস) সংখ্যায়। আশা করি শব্দঘরের পাঠক এবং সাহিত্যবোদ্ধা সকলেই প্রবন্ধটি পাঠ করেছেন। এমন শিরোনামের লেখার প্রতি অনেকেরই দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। লেখার বিষয় ও পরিধি হলো সত্তরপ্রজন্ম। লেখক আরও একটু সীমাবদ্ধ করেছেন এগারো জন কবির আলোচনায়। এ লেখাটি নিয়ে জিজ্ঞাসার জন্ম হয় এ কারণে যে, সত্তর দশকের আলোচনা যদি হলো, তা হলে কেন নয় এ দশকের বিস্তৃত আলোচনা ? তবে আলোচনা করতে গেলে অবশ্যই এর পটভূমি আমাদের বিবেচনায় রাখতে হয়। কারণ সত্তরপ্রজন্ম লাফ দিয়ে তৈরি হয়নি। আবার এগারো জন বলে কি তিনি বিশেষ কয়েকজনকে প্রতিনিধিত্বশীল বলে নির্ধারণ করতে চেয়েছেন ? শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাব্যকৃতি আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। এ বিশ্লেষণে তা মনে হওয়া স্বাভাবিক। প্রবন্ধ লেখকের নির্বাচনে এগারো জনে আছেন : কবি ফারুক মাহমুদ, কবি ইকবাল আজিজ, কবি কামাল চৌধুরী, কবি আবিদ আজাদ, কবি জরিনা আখতার, কবি শিহাব সরকার, কবি মাহবুব বারী, কবি আবিদ আনোয়ার, কবি নাসিমা সুলতানা, কবি সৈয়দ হায়দার ও কবি ময়ূখ চৌধুরী। তাঁরা প্রত্যেকেই কবিতায় স্বীয় প্রবণতা, বৈশিষ্ট্য, প্রকরণে উজ্জ্বল এবং আলাদা বৈশিষ্ট্যে খ্যাত ও পরিচিত। এ প্রবন্ধে একইসঙ্গে প্রশংসা ও অস্বীকারবাচক মন্তব্য রয়েছে। প্রধান, অপ্রধান, মুখ্য, গৌণ এমন ভাগাভাগিও আছে। আসলে কবি বা কবিতা নিয়ে কি শেষ মন্তব্য করা যায় ? বা বলা সমীচীন কি না ? আমাদের পাঠাভিজ্ঞতা কি বলে ? যে কোনও কবির সারাজীবনে একটি বাক্য, একটি শব্দ অথবা এক বা একাধিক পঙ্ক্তি হয়ে উঠতে পারে চিরায়ত। যে কোনও কবির সব কবিতাই যে চিরকালীন হয়ে উঠবে এমন কোনও কথা নেই। আবার কবিতার তুলাদণ্ড হতে পারে সংশ্লিষ্ট কবির কবিতাই। আমরা বিখ্যাত কবিদের সব রচনা প্রশ্নহীন গ্রহণ করি না, এটাই সত্য। পাঠকের পছন্দের মাত্রাও মেনে নিতে হয়। বিশেষত কবিতার আলোচনায় কবিদের মধ্যে পরস্পরকে তুলনা করাও এক ধরনের সীমাবদ্ধতা। অবশ্যই স্বীকার করি যে, প্রত্যেকের স্বীয় বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলী নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কে বড় বা ছোট এমন আলোচনা অন্তত কবিতার ক্ষেত্রে না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এমন বিচার করতে গেলে স্কুল থেকে শুরু করে বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ের সিলেবাসে কবি ঈশ^রগুপ্ত, বিহারীলালসহ আরও অনেক কবির কবিতা রাখা হতো না। মূল কথা হলো আমাদের পড়া ও শোনায় ভালো লাগছে কি না। পুরোনো কথায় বলতে হয়―সাহিত্য পাঠে রসাস্বাদন।   

মনে রাখা জরুরি, অনেকক্ষেত্রে পঞ্চাশ ও ষাটের বিস্তৃতি, বিকাশ ঘটেছে সত্তরে। ফলে, সত্তর দশকের আলোচনা শুধু দশক সীমানায় আবদ্ধ করা যায় না। বিশেষ সময় কবি, কবিতা বোঝার জন্য এমন সীমারেখা আরোপ করা যেতে পারে। তবে সব সময় নয়। লেখক সরকার মাসুদ পরিসরকে আরও ছোট করে নিলেন এগারো জন বলে। গুরুত্বপূর্ণ সময় ও কবিদের সম্পর্কে লেখক আগ্রহী এবং আলোচনার জন্য নির্বাচন করেছেন, তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। সাহিত্যকর্মের বোধ বিবেচনায় কর্তব্য পালন করেছেন বলেই আমরা মনে করি। প্রবন্ধের শুরুতে তিনি ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। ক্রমেই আবার লেখক স্বীয় অভিমত থেকে বিচ্যুত হয়েছেন বলে মনে হলো। বস্তুত, তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ও অস্পষ্ট। তাঁর লেখা থেকে আংশিক এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।

(ক)  ‘সত্তর প্রজন্মের কবিতা সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্যই বেশি শোনা যায়। এটা কূপমণ্ডূকতাগ্রস্ত নিন্দুকের কাণ্ড। আমার দৃঢ় বিশ^াস, যারা ঢালাওভাবে নিন্দা করে চলেছেন তারা কেউই এই প্রজন্মের কবিতা নিবিষ্টভাবে পাঠ করেননি। ফলে সত্তরের প্রধান এবং গৌণ কবিদেরও সাহিত্যকৃতি তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। কবিতা অনেক রকমের। ভালো কবিতাও অনেক ধরনের। অসফল কবিরা কদাচিৎ তা বোঝেন এবং এরাই চিরকাল অন্য কবিদের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করে সান্ত্বনা পান।’

(খ) ‘আবিদ ছাড়াও দশ/বারো জন কবি আছেন যারা সৃজনশীলতার বিচিত্র বর্ণবিভা ছড়াতে সক্ষম হয়েছেন। কল্পনা-ভাবনায় নিজত্ব তারাও কম-বেশি দেখিয়েছেন। এবং খুঁটিয়ে পড়লে দেখা যায় গৌণ কবিদেরও অল্প কিছু কবিতা নিজ-নিজ বৈশিষ্ট্যে আলাদা, শুধু অন্যদের থেকে নয়, তাদের নিজেদের অসংখ্য দুর্বল কবিতা থেকে।’

এসব মন্তব্যের বাইরে আরও কিছু কথা তিনি বলেছেন, যা থেকে কোনও উপসংহার টানা যায় না। তিনি নিজের যুক্তির কাছেও স্থিত হতে পারেননি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে বিশ্লেষণ করেছেন, তা অংশত আমাদের মেনে নিতে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু তিনিও অবশেষে ঢালাও কথাই বলেছেন। বলা বাহুল্য যে, আমরা পাঠক হিসেবে সাহিত্যের ইতিহাস, মূল্যায়নের প্রথাগত রীতি, আলোচনা পাঠ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এদিক-ওদিক উলটে পালটে কিছু একরৈখিক মন্তব্য শিখে নিয়েছি। এমন ধরনের সমালোচনা কাঠামো থেকে আমরা বের হতে পারছি না। ফলত, সমালোচনা সাহিত্যের বিকল্প কোনও পথ আমাদের সামনে এখনও অনুপস্থিত। যাকে বলে গড়পড়তা আলোচনায় নিজেদের সীমাবদ্ধ করেছি। অবশ্য সরকার মাসুদ বলেছেন, এ লেখাটি একটি পূর্ণাঙ্গ লেখার অংশবিশেষ। হয়তো ওই সময় পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে এ প্রবন্ধ পাঠে আমাদের মনে সংশয় জেগেছে―লেখক তাঁর ধারণা ও আলোচনায় নৈর্ব্যক্তিক থাকতে পেরেছেন কি না ? যদি লেখক মনে করেন যে, এমন উপাদান এখানে দৃশ্যত লক্ষণীয়, তা হলে মূল লেখায় হয়তো এমন সংশয় আর থাকবে না। তবে তা একান্তই লেখকের নিজস্ব বিবেচনা। এখানে আমরা শুধু পাঠকের দৃষ্টি উত্থাপন করছি মাত্র। সরকার মাসুদের আলোচনায় দ্বিধা সংশয়ের কথা বলছি এ কারণে যে, কিছু মন্তব্য আমাদের দ্বিধায় ফেলে দেয়। তাঁর সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে―তা হলে সত্তরপ্রজন্মের কবিদের লেখা একেবারেই কি কবিতা হয়ে ওঠেনি। আমাদের স্বীকার করতে আপত্তি নেই, এক দশকে কোনও কবিতা লেখা নাও হতে পারে, বা কবিতা না হয়ে উঠতে পারে। যেহেতু কবিতাকেন্দ্রিক আলোচনা, সেহেতু টি এস এলিয়টের একটি কথা এখানে স্মরণ করি, ‘চড়বঃৎু রং হড়ঃ ধ ঃঁৎহরহম ষড়ড়ংব ড়ভ বসড়ঃরড়হ, নঁঃ ধহ বংপধঢ়ব ভৎড়স বসড়ঃরড়হ; রঃ রং হড়ঃ ঃযব বীঢ়ৎবংংরড়হ ড়ভ ঢ়বৎংড়হধষরঃু, নঁঃ ধহ বংপধঢ়ব ভৎড়স ঢ়বৎংড়হধষরঃু. ইঁঃ, ড়ভ পড়ঁৎংব ড়হষু ঃযড়ংব যিড় যধাব ঢ়বৎংড়হধষরঃু ধহফ বসড়ঃরড়হং শহড়ি যিধঃ রঃ সবধহং ধিহঃ ঃড় বংপধঢ়ব ভৎড়স ঃযবংব ঃযরহমং.’ ফলত, আবেগ ও নিরাবেগ বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে কবিতার ভূমি। সত্তর প্রজন্মের কবিদের কবিতায় আবেগের প্রকাশ যেমন রয়েছে, তেমন সংযমও লক্ষণীয়। তাঁরা মূলত সামষ্টিক অভিজ্ঞানকে কবিতায় রূপায়ণ করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁদের নৈর্ব্যক্তিক উপস্থাপন অবশ্যই স্বীকার করতে হয়। 

অতএব, একক ধরে কোনও কবির সমগ্র কৃতিকে মূল্যায়ন করা যায় না। যেমন, সরকার মাসুদের মন্তব্য : ‘সত্তরের প্রজন্মের প্রধান কবিদের একজন কামাল চৌধুরী। কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পরবর্তী পনের/বিশ বছরের ভেতর তিনি তেমন মুনশিআনার পরিচয় দিতে পারেননি। নব্বই-এর দশকে তাঁর কবিতা লক্ষণীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ মিছিলের সমান বয়সী এবং তার পরের আরও একাধিক বইয়ে তাঁর কবিতা ছিল অনেকটাই সরাসরি, কিছুটা উচ্চকণ্ঠী।’ এরপর আবার একটি কবিতাকে কেন্দ্র করে তাঁর কাব্যচিন্তার মূল্যায়ন করেছেন এবং বলেছেন, ‘…সুদীর্ঘকালের অনবচ্ছিন্ন চর্চা ও উত্তরপর্যায়ের সচেতনতা কবি কামাল চৌধুরীকে এ রকম জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। তবে এও ঠিক, ভাবের এ জাতীয় ঘনবদ্ধতা ও প্রতীকের এমন সার্থক প্রয়োগ তাঁর খুব বেশি কবিতায় নেই।’  এমন আলোচনা থেকে কী ধারণা পেতে পারে পাঠক। যেক্ষেত্রে কবিতা হয়ে ওঠার বিষয়। আগেই বলা হয়েছে সকল সময় রসগ্রাহী কবিতা লেখা নাও হতে পারে। কবিতা এভাবে বিবেচনা করা যায় না। উচ্চকণ্ঠ আর নিম্নকণ্ঠ যা-ই হোক, এসব কবিতা বাংলাভাষি পাঠকসমাজের চেতনাকে আন্দোলিত করছে। প্রসঙ্গত, কবি পাবলো নেরুদা, কবি নাজিম হিকমত, কবি মায়াকোভস্কি, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা হাল আমলের কবি সুবোধ সরকার তা হলে একই মানদণ্ডে বিবেচিত হতে পারেন। আরও কত যে নাম। মানুষের মন থেকে এসব নাম মুছে ফেলা যায় না। এ বড় কঠিন কাজ। অবশেষে মানুষের কাছে ভালোলাগার বিষয় থেকেই যায়। ‘মুনশিআনা’র অভাব প্রকাশে যে গ্রন্থটির উদাহরণ দিয়েছেন লেখক সরকার মাসুদ। এ গ্রন্থভুক্ত একটি কবিতার কয়েকটি চরণ আমরা পাঠ করি। 

‘তার ঘর ভিনদেশে, কোন্ গাঁয়ে ? তার নাম নিসর্গকুমারী

আমার পদ্যরা আজ সারি সারি পানসি ভাসাবে

বাক্যরা হরেক বৈঠা ভাটিয়ালি পাল

জলে ভিজে পলি পাবে, সোনারোদে বাসর সাজাবে।

সমুদ্র কাতর হোক, আমার পদ্য পড়ুক

উদার চরণ শুনে নৃত্য হোক জলের কিনারে

এ নিসর্গ আমি চাই―আমিই প্রাপক

সারি সারি পদ্য আমি তার নাম ছুড়ে দেব জলে।’ 

 [নিসর্গকুমারী, মিছিলের সমান বয়সী, কবিতাসমগ্র : ৩০] 

উদাহরণ দীর্ঘ না করে অনুভব করাই শ্রেয় বলে মনে করি। এ গ্রন্থভুক্ত টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে কবিতার মতো আর কেউ এমন কবিতা লিখেছেন বলে আমাদের জানা নেই। এ ছাড়াও রসবোধসম্পন্ন কবিতা অনেক রয়েছে। আমরা মনে রাখি কবি কামাল চৌধুরীর কাব্যচর্চার পর্বান্তর। তাঁর স্বতন্ত্র নির্মিতি সক্রিয় থাকে পাঠকের মনে, মননে। উল্লেখযোগ্য, টানাপোড়েনের দিন (১৯৯১), এই পথ এই কোলাহল (১৯৮৩), এসেছি নিজের ভোরে (১৯৯৫), ধূলি ও সাগর দৃশ্য (২০০০), রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল (২০০৩), হে মাটি পৃথিবীপুত্র (২০০৬), পান্থশালার ঘোড়া (২০০৯) ইত্যাদি। এখনও তিনি সক্রিয় ও সৃষ্টিতে নিরীক্ষাপ্রিয়। বস্তুত, একটি মন্তব্য দিয়ে কবি কামাল চৌধুরী ও তাঁর সমকালিক কবিদের অগ্রাহ্য করার কোনও অবকাশ নেই।   

যে উচ্চকণ্ঠী বৈশিষ্ট্যে আলোচকের কাছে অভিযুক্ত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। আমি পাঠক হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে এ উচ্চকণ্ঠের পক্ষাবলম্বন করি। তাঁর উপদ্রুত উপকূল (১৯৭৯), মানুষের মানচিত্র (১৯৮৪) ইত্যাদি পাঠককে নিশ্চিত ভাবায়, আপ্লুত করে। অপ্রিয় বাস্তবতায় কবির লিখিত উচ্চারণ : ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,/ আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,/ ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো তন্দ্রার ভেতরে―/ এ-দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময় ?’

[ বাতাসে লাশের গন্ধ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনাবলি ১ : ২১]

এ ছাড়াও সরকার মাসুদ কবি আবিদ আজাদ, কবি আবিদ আনোয়ারের কাব্যশৈলীর প্রশংসা করেছেন। পরক্ষণেই আবার তিনি নিজেই বলেন, তাঁরা প্রতিভাবান, মেধাবী হয়েও উৎকৃষ্ট কবিতা উপহার দেননি। যেক্ষেত্রে তিনি শনাক্ত করেছেন কবিদের পঠনপাঠনের সীমাবদ্ধতাকে। এর মানে কি বোঝায় যে তাঁদের সাহিত্যজ্ঞান বা এ বিষয়ক ধারণা ছিল না ? আবিদ আনোয়ার সম্পর্কে যেখানে লিখেছেন, ‘আবিদ প্রথম থেকেই সচেতন কবি এবং সতর্কভাবেই সিরিয়াস বিষয়-আশয়কে গ্রহণ করেছেন।’ এবং কবি জরিনা আখতার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘গ্রামীণ নিসর্গ থেকে নাগরিক নির্বেদ, ব্যক্তিক বিপন্নতা থেকে সামষ্টিক―সবকিছুই ধরা দিয়েছে তার সহমর্মী, সংবেদী কলমে।’ এমন শংসাবচনের পর তাঁর এ প্রবন্ধের উপসাংহারিক মন্তব্যের মাধ্যমে কী বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছায়। অর্থাৎ, তাঁর আগের মূল্যায়নও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর কোনো কবি বা কবিতা সম্পর্কে আলোচনার আর অবকাশ থাকে না। লক্ষণীয়, সরকার মাসুদের বিবেচনা :

‘সত্তরপ্রজন্মের প্রধান কবিরাও, তাদের কবিকৃতি মনে রেখেই বলছি, আধুনিক সাহিত্যের ধ্যান ধারণা ও কলাকৌশল ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করতে পারেননি। প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন অনেকেই। কিন্তু সেই প্রতিভাকে যথার্থভাবে লালন করতে পারেননি তারা। নিজেদের সৃষ্টিশীলতাকে এগিয়ে নেবার জন্য বিস্তৃত পড়াশোনাসহ আরও যা-যা প্রয়োজন সেসবের ঘাটতি ছিল এই কবিদের ভেতর। ফলে তাদের রচিত শিল্পতরুসমূহ যাবতীয় সম্ভাবনা নিয়েও শেষ পর্যন্ত বেঁটেই থেকে গেল; কাক্সিক্ষত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারল না।’ 

এমন সিদ্ধান্তের পর নিশ্চিত যে আগের শংসাসূচক কথাগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আমাদের ধারণা, তিনি তাঁর যুক্তি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন, ‘আধুনিক কবিতা তো আড়ালপ্রিয় শিল্প’ এ ধারণার আলোকে। আমরা এ বিষয় মেনে নিয়ে বলি কবিতা আসলে আড়ালের ভাষায়ই লেখা হয়। কখনও তা মূর্ত কখনও বিমূর্ত। ব্যক্তিভেদে এর ব্যঞ্জনাও  ভিন্ন। অন্যদিকে কালিক ও পারিপাশির্^ক বিবেচনা যে কোনও শিল্প-বিচারের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিবেচ্য। লেখক সরকার মাসুদের সঙ্গে আমরা পাঠক হিসেবে একমত হতে পারি না যে, ওই প্রজন্মের কবিরা সমসাময়িক পৃথিবী, ভূগোল, শিল্পচর্চা, রাজনীতি, সমাজ সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। অথবা সাহিত্য বিষয়ে তাঁদের পড়াশোনা, জানা-বোঝার অভাব ছিল। যেক্ষেত্রে তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন কবিরা মেধাবী ছিলেন। অবশ্য স্বীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে, স্বনির্মিত ক্যানভাসে তিনি মূল্যায়ন করেছেন। এ জন্য লেখক সরকার মাসুদকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। লেখক হয়তো নিজেও জানেন এমন খণ্ডিত আলোচনায় সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। ফলে নানা প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আমরা তাঁর সামগ্রিক আলোচনার অপেক্ষায় থাকলাম। সেখানে হয়তো আমাদের মনে জেগে ওঠা প্রশ্ন ও সংশয়ের সমাধান পাব বলে আমরা আশা করি।

 লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares