বইকথা : বাংলাদেশের বাউল-ফকিরি সাহিত্যের আকর গ্রন্থ : সঞ্জয় কুমার নাথ

বাউল-ফকিরদের রচিত গান বাঙালির প্রাণ-ভোমরা। বাংলাদেশের গ্রামীণ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাউল-ফকিরদের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মধ্যযুগের খুব বেশি আগে বাউল-ফকিরদের পরিচিতি বা গানের নিদর্শন আমাদের সামনে নেই। তবে সপ্তদশ শতকের পর থেকে এ পর্যন্ত বাউলদের গান বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে আমাদের আটপৌরে জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।

গ্রাম কিংবা নগরের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ বাউলদের গান হৃদয়ে ধারণ করেন―এমনটি ধারণা হলেও এই সময়ে বাঙালিমাত্রই বাউল-ফকিরদের প্রতি এক ধরনের টান অনুভব করেন। শুধু গান নয়, বাউলদের প্রতিও তাঁদের পরম মমতার পরশ পাওয়া যায়। তবে বাউল-ফকিরদের পরিচিতি, সাধন পদ্ধতি বা তাঁদের জীবনাচরণ  নিয়ে ব্যাপকভাবে কোনো কাজ মোটা দাগে আমাদের চোখে পড়েনি। এ অভাব দূর হয়েছে লোকগবেষক সুমনকুমার দাশের বাংলাদেশের বাউল-ফকির : পরিচিতি ও গান গ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

সোজাসাপটা বললে, এই বিশাল কর্ম দুই বাংলার মধ্যে প্রথমই বলা যায়। প্রথম এই জন্য যে, সপ্তদশ শতক থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সুপরিচিত কিংবা অপরিচিত হলেও অমূল্য ভাণ্ডার খ্যাত মরমিগানের বাউল রত্নকবিদের পরিচিতি ও প্রভাব নিয়ে গ্রন্থিত পরিপূর্ণ কোনো গ্রন্থ পাওয়া যায়নি। শুধু গান সংযোজন নয়, বরং গানের পরিপ্রেক্ষিত, দার্শনিক ভিত্তি ও তুলনামূলক বাউল তথ্যের বিশ্লেষণ তুলে এনেছেন সুমনকুমার দাশ। শুধু তাই নয়, জীবিত একেকজন বাউলের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও সাক্ষাতের পারিপার্শ্বিকতার বিবরণ দিয়েছেন সাল তারিখ ও কার্যকারণ সমেত। এসেছে প্রতিটি এলাকার বাউলদের ডেরায় ভ্রমণ বৃত্তান্তসহ আনুষঙ্গিকতা।

বাংলাদেশের বাউল-ফকির : পরিচিতি ও গান গ্রন্থটির বিশেষত্ব হচ্ছেÑ৫৩ জন গীতিকারের ২৫টি করে সর্বমোট ১ হাজার ৩২৫টি পদাবলি ও সংক্ষিপ্ত জীবনী সংযোজিত করা। বাউলদের জীবনীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সাল ও ঘটনা সংযোজিত করেছেন। সংকলিত ৫৩ জন বাউল হলেন―দীন ভবানন্দ (সপ্তদশ শতক), সৈয়দ শাহনূর (১৭৩০-১৮৫৫), লালন (১৭৭৪-১৮৯০), ফকির ইয়াছিন শাহ (১৮ শতকের শেষ দিকে-মৃত্যু ?), শিতালং শাহ (১৮০০-১৮৮৯), পাগলা কানাই (১৮০৯-১৮৮৯), কালা শাহ (১৮২০-১৯৬৯), রাধারমণ দত্ত (১৮৩৪-১৯১৬), কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৮৯৬), শাহ আবদুল লতিফ (১৮৪০-১৯৬০), মেছের শাহ (১৮৪০-১৯১৭), দুদ্দুু শাহ (১৮৪১-১৯১১), দ্বিজদাস (১৮৪৯- মৃত্যু ?), শেখ ভানু (১৮৪৯-১৯১৯), পাঞ্জু শাহ (১৮৫১-১৯১৪), দীনহীন (১৮৫৪-১৯২০), হাছন রাজা (১৮৫৪-১৯২২), আছিম শাহ (১৮৫৭-?), শাহ আজাহার (১৮৬৫-১৯৬০), আলেফ চান দেওয়ান (১৮৬৫-১৯৪৬), ইব্রাহীম তশ্না (১৮৭০-১৯৩০), মনমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯), আরকুম শাহ (১৮৭৭-১৯৪১), মুন্সি মনিরউদ্দিন (১৮৮০-১৯৬২), খন্দকার রমিজ উদ্দিন (১৮৮০-১৯৬৭), উকিল মুনশি (১৮৮৫-১৯৭৮), রশিদ উদ্দিন (১৮৮৯-১৯৬৪), দেওয়ান একলিমুর রাজা (১৮৮৯-১৯৬৪), জালাল উদ্দীন খাঁ (১৮৯৪-১৯৭২), ভবা পাগলা (১৮৯৭-১৯৮৪), কামাল উদ্দিন (১৯০০-১৯৮৫), রকিব শাহ (১৯০২-১৯৬৮), দীন শরৎ (১৯০৩-১৯৬৩), মহিন শাহ (১৯০৩-১৯৯৭), রজব আলী দেওয়ান (১৯০৬-?), আব্দুল খালেক দেওয়ান (১৯১০-?), মকরম শাহ (১৯১৫-), শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯), দুর্বিন শাহ (১৯২১-১৯৭৭), ছিদ্দিকুর রহমান (১৯২৬-২০০৫), খোদা বকশ শাহ (১৯২৮-১৯৯০), কফিলউদ্দিন সরকার (১৯৩২-২০১২), গিয়াসউদ্দিন আহমদ (১৯৩৫-২০০৫), শাহ রমিজ আলী (১৯৩৫-২০১৪), শেখ ওয়াহিদুর রহমান (১৯৩৯-২০১২), সামসুদ্দিন আহমদ এছাক (১৯৪১-২০০৫), ফকির সমছুল (১৯৪১), সামসু দেওয়ান (১৯৪২), ক্বারি আমির উদ্দিন আহমদ (১৯৪৩), মো. শফিকুনুর (১৯৪৩-১৯৯৬), বখত শাহ (?-?), পাগল বাচ্চু (?), মকদ্দস আলম উদাসী (১৯৪৭-)।

এক কথায় সপ্তদশ শতকের বাউল দীন ভবানন্দ থেকে ১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া মকদ্দস আলম উদাসী পর্যন্ত যে সকল বাউল-ফকির তাঁদের গান দিয়ে মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি যেতে পেরেছেন, তাঁদের গান ও জীবনকথা গ্রন্থকার নিজ সরলীকরণ-বয়ানে উপস্থাপন করেছেন। গ্রামে কিংবা নগরে যেখানেই বাঙালি বাস করেন না কেন, প্রাণের স্পন্দন পেতে গ্রামের মেঠোসুর, যে সুর শাশ্বত, সেই চিরায়ত গানের কাছে যেতে হয়। উল্লিখিত বাউলদের গানে এমন কিছু মন-উতাল করা পঙ্ক্তি রয়েছে, যা জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। সুমনকুমার দাশ লোককবিদের কথা বলতে গিয়ে সেসব বিষয় গল্পের ঢঙে সহজ ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি প্রাঞ্জল ভাষায় এসব সাধকের গানের বিশ্লেষণও করেছেন।

সুমনকুমার দাশের বাংলাদেশের বাউল-ফকির : পরিচিতি ও গান বইটি গভীর পাঠে মনে হয়েছে, বরাবরের মতোই তিনি সাদামাটা কথামালায় অসাধারণ প্রকাশময়তায় বাউল দর্শন তুলে ধরে গ্রন্থ প্রকাশের উদ্দেশ্য সফল করেছেন। যেমনÑরশিদ উদ্দিনের ‘এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া/এত যত্নে গড়িয়াছে সাঁই’ গানটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এর পরের লাইনগুলো আমাদের জানা ছিল না। এই দুই পঙ্ক্তিই আমাদের কাছে ছিল পূর্ণাঙ্গ গান। … পূর্ণাঙ্গ গান রপ্ত করার কোনো ইচ্ছেও আমাদের যে ছিল তাও নয়।’ তবে এই কিশোর সুমন যৌবনে এসে তারুণ্যের সময় ব্যয় করেছেন বাউলগানের গভীরতা আস্বাদনে।

অবশ্য গবেষক সুমনকুমার দাশের মুন্সিয়ানা অন্যখানে। তিনি গান সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব মতামত তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি, বরং গবেষণার সূত্র ধরে আরও গভীরে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। তাঁর কথাতেই শুনি, ‘… তখন হাইস্কুলে পড়ি। ঠিক এমন এক সময় একটি ক্যাসেট প্লেয়ারে আবদুল আলীমের কণ্ঠে ওই গানটি শুনি। মুহূর্তেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ভেসে ওঠে। মনে আবারও গুঞ্জরণ তোলে সেই গান। গুনগুন করে গানের পঙ্ক্তিগুলো আওড়াই।’ ঠিক এই জায়গায় সুমনকুমার তাঁর নির্মোহ গবেষক বোধে লক্ষ করেন, শিল্পী আবদুল আলীম এ গানটি গাওয়ার সময় বোধহয় কিছু পঙ্ক্তির ঈষৎ পরিবর্তন করে নিয়েছিলেন। তার চেয়ে বড় কথা, তিনি এ গানের গীতিকার রশিদ উদ্দিনের নাম ব্যবহার না করে ‘সংগ্রহ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। রশিদ উদ্দিন এতদিন অজ্ঞাতই ছিলেন। যখন তাঁকে স্বরূপে আবিষ্কার করা হলো, তখনও অজানা নানা বিষয় লুকায়িতই ছিল। সুমনকুমার দাশ দীর্ঘদিনের চেষ্টায় লোকসংস্কৃতির এই কৃতী পুরুষকে ভীষণ ও বিশালভাবে হাজির করিয়েছেন। 

মূলত বাউলের জীবন ও তাঁদের গানের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে এ রকম চমকপ্রদ নানা কঠিন সত্য উন্মোচন করেছেন গবেষক। সংকলিত বাউল-ফকিরদের ভিন্ন ভিন্ন জীবনাচরণে অনাবিল ভাবের গানের রচনার ইতিহাসও অভিনব। যা সুমনকুমার দাশ পরম মমতায় সময় নিয়ে বুনন করেছেন তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞানে। একেকজন বাউল কেবল গান লিখেই দায়িত্ব শেষ করেননি। বরং তাঁরা উদার-বিপ্লবী চেতনার যে জীবনবোধ লালন করতেন সেই নিরেট বাস্তবতার সম্মুখীনও করেছেন পাঠককে। একইভাবে লোকগবেষক ও লোকসংগ্রাহকদের মতামত ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন গুরুত্বসহকারে।

‘জলে গিয়েছিলাম সই’ এমন পদ শুনলেই সিলেটের ধামাইলের কথা চোখে ভাসে। চোখে ভাসে রাধারমণের নাম। লোক অনুষ্ঠানে রাধারমণের গান ছাড়া চলে না। প্রখ্যাত-অখ্যাত শিল্পীদের কণ্ঠে রাধারমণ আবশ্যক এক সাধকের নাম। রাধারমণের গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী চন্দ্রাবতী রায় বর্মণকে সুমনকুমার দাশ এ গ্রন্থে উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকতায়। ‘মানুষ থাকলে আল্লা আছে, মানুষ ভজো গিয়া’ শীর্ষক রচনাটি লিখিত হয়েছে সাঁইজি অর্থাৎ লালন শাহের শিষ্য ফকির দুর্লভ শাহকে নিয়ে। সুমনকুমার দাশ বাউলের সন্ধানে সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন, বেড়াচ্ছেন। এমনকি একই কাজে তিনি পশ্চিমবঙ্গেও গিয়েছেন। তাঁর গবেষণার সূত্র যেমন পাঠে, তেমনি মাঠে। তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধে হলো তিনি মুক্তগদ্যে লিখতে সিদ্ধহস্ত। বক্তব্যের ক্ষেত্রেও তাঁর মেদহীন সারগর্ভ বক্তব্য প্রাণিত করে। তাই গবেষণাধর্মী পাঠক ধরে রাখতে বা বৃদ্ধি করতে তিনি অতি পারঙ্গম। তাঁর সম্পর্কে এই সত্য প্রথিতযশা গবেষকদের মুখেও শোনা যায়। ফকির দুর্লভ শাহও এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর দুর্লভ সন্ধান।

‘মানুষ থুইয়া খোদা ভজো এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে’ শীর্ষক প্রবন্ধে নেত্রকোনার গীতিকার জালাল উদ্দীন খাঁকে নিয়ে সুমনকুমার আলোচনা করেছেন। তাঁর গানের কথায় মুগ্ধ হয়ে শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ জালালকে একাধিকবার পত্র দিয়েছেন। গ্রন্থকার এই চিঠিগুলো সযত্নে এ গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। বাউল-গবেষক সুধীর চক্রবর্তীও তাঁর সম্পাদিত জনপদাবলি বইয়ে জালালউদ্দীন খাঁকে আধুনিকতা মনস্ক, যুক্তিবাদী বলিষ্ঠ মতবাদের মানুষ বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক যতীন সরকারের মতও তাই। বাংলাদেশের বাউল-ফকির : পরিচিতি ও গান বইয়ে এসব বিষয় বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। বইটি পড়ে মনে হয়েছে, বাউলদের রচনারীতি বা পদাবলি আলাদা হলেও সৃষ্টিকর্তা, মানুষ বা মানবতা নিয়ে অভিন্ন এক সুর রয়েছে। সুমনকুমার দাশ তা উন্মেচন করতে পাঠকের মনন দৃষ্টিকে ক্ষুরধার করেছেন।

ফকির শামসুল শাহকে নিয়ে ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে’ এবং শিতালং শাহকে নিয়ে ‘নাগর রসিয়া নদীয়ার কূলে বসিয়া’, এভাবে সংকলিত ৫৩ জন পদকর্তা-মহাজনকে আলাদাভাবে জানার, বোঝার ও অনুধাবনের সুযোগ করে দিয়েছে গ্রন্থটি।

‘আপন চিনিলে দেখ খোদা চেনা যায়’, ‘আমি যাইমু রে যাইমু রে আল্লার সঙ্গে’, ‘একদিন তোর হইবে রে মরণ রে হাছন রাজা’, লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার’সহ এমন তুমুল জনপ্রিয় অসংখ্য গানের স্রষ্টা মরমিকবি হাছন রাজা। তাঁকে নিয়ে চলচ্চিত্রসহ নানা কাজ হয়েছে। তবু যেন হাছনকে চেনা যায় না। সুমনকুমার দাশ বিভিন্ন আঙ্গিকে বিভিন্ন গবেষকের বর্ণনা থেকে হাছন রাজাকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করেছেন গ্রন্থটিতে। ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে’ উকিল মুনশির এই গানটি নিয়ে সুমন বলেছেন, ‘গানটি এত জনপ্রিয় যে বর্ষা মৌসুমে হাওরের গ্রামগুলোতে অনুষ্ঠিত প্রায় বাউলগানের আসরে এটাই প্রথম গীত হয়। এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়েছে।’ একইভাবে চমকপ্রদ কিছু তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে এই গ্রন্থে। যেমন-গিয়াসউদ্দিন আহমদের ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানটি এত জনপ্রিয় যে কালজয়ী কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ গানটির নাম দিয়েছেন-‘মরণ সংগীত’। গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর ঠিক আগের রাতে সুমনকুমার দাশ পরিচিত হন তাঁর সঙ্গে। এ নিয়ে চমৎকার গল্পশোকগাঁথা লিখেছেন লেখক।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সুমনকুমার দাশের নেশা, সাধনা কিংবা ধ্যান যা-ই বলি না কেন, তা হচ্ছে লোকসংস্কৃতি এবং এই সংস্কৃতির মানুষজন নিয়ে। তাঁর গবেষণার ধরন হচ্ছে, দেখে-শুনে-বুঝে-অনুভব করে আধুনিক সংগ্রহ পদ্ধতিতে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। বাড়তি কিছু বলা বা নিজের মতকে চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা তাঁর নেই। তাই তাঁর গবেষণার বিষয় আমাদের কাছে বিশুদ্ধ মনে হয়। এ বইয়ে সুমনকুমার দাশ এমন কিছু নতুনত্ব এনেছেন, যা একাডেমিক বা ব্যবহারিক বাউল-গবেষণার নির্ভরতা হিসেবে গণ্য হবে।

সুমনকুমার দাশ প্রাকৃতজনদের অতি কাছের মানুষ। বাঙালির নানা আচার-কৃষ্টি সংস্কৃতির প্রতি তাঁর প্রবল টান ছোটবেলা থেকেই। এ বিষয়ে তিনি তাঁর প্রতিটি বইয়ের ভূমিকায় পরিষ্কার করে বলেছেন। গ্রামে-গঞ্জে, হাওরে-বাঁওরে, সাধকের আশ্রমে, বাউলের ডেরায় তাঁর গমন সর্বজনবিদিত। যেখানে লোকগান, পালাগান, লোকনাট্য, মেলা বা নিছক পাঁচালি পাঠের আসর, সেখানেই সুযোগ পেলে ছুটে যান তিনি। ব্রাত্যজনের আপনজন হয়ে উদ্যাপন করেন এসব অনুষ্ঠান, ভেতরের অর্থাৎ বাউলের হাঁড়ির খবর জানতে। সঙ্গে থাকে ক্যামেরা, রেকর্ডারসহ যাবতীয় সরঞ্জাম। তিনি রাতের পর রাত কাটিয়েছেন বাউলদের সঙ্গে তাঁদের নিগূঢ় তথ্য উদঘাটনে। তাঁর সংগ্রহে আছে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি লোকগান। লোকসংস্কৃতির নানা শাখায় সুমনকুমার অন্তত্বকরণে গবেষণায় হাত দিয়েছেন। আমাদের দেশের বেদে-বাইদ্যানীদের যে এক অপার সাহিত্য রয়েছে, তা তিনি তুলে এনেছেন, ভিক্ষুকদের সংগীত নিয়ে কাজ করেছেন। ধামাইলগান নিয়ে তাঁর রয়েছে বিশাল কাজ, যা ‘বাংলাদেশের ধামাইল গান’ নামে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া জারি-সারি-মর্সিয়া, পল্লিগীতি, মাজার সংগীত, ঢপযাত্রা থেকে শুরু করে প্রাচীন লোকসাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে তাঁর সহজিয়া বিচরণ রয়েছে। তবে বাউল-ফকিরদের নিয়ে তাঁর বিশাল কর্ম তাঁকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এত বড় আর গোছানো কাজ করতে তাঁকে বেশ কয়েক বছর ঘুরতে হয়েছে। অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

লোকমানস নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা জানেন সুমনকুমার দাশ হচ্ছেন প্রয়াত বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের প্রথম জীবনীকার। এছাড়া তাঁর সম্পাদিত শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ বাউল করিমকে নিয়ে প্রথম কোনো গ্রন্থ। গবেষক হিসেবে সুমনকুমার দাশকে খণ্ডিত করা অন্যায় হবে। তবু বলছি, বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করে তিনি একজন সুপ্রতিষ্ঠিত করিম-গবেষক। বাউল করিমকে জানতে দেশ-বিদেশ থেকে গবেষকরা ছুটে আসেন তাঁর কাছে। বিশেষ করে করিমপ্রেমীদের কাছে সুমনকুমার দাশ তাই খুবই পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য গবেষক ব্যক্তিত্ব। তবে শুধু বাউল করিম নন, সমগ্র বাউলদের একজন হয়ে তিনি যে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের বাউল-ফকির : পরিচিতি ও গান নামের বিশাল বইটিও তাঁকে দুই বাংলায় আরও সুনাম ও খ্যাতি এনে দিয়েছে। প্রত্যাশা থাকবে, বইটির যেখানে শেষ অর্থাৎ ১৯৪৭ পরবর্তী বাউল-ফকিরদের নিয়ে গবেষক সুমনকুমার দাশ শীঘ্রই উৎসুক পাঠকের সামনে প্রত্যাবর্তন করবেন।

লেখক : প্রবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares