লিটল ম্যাগ : বইমেলা ২০২০ ও লিটলম্যাগ : ধারাবাহিক বিশ্লেষণ (দুই) : আনোয়ার কামাল

প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে ভেঙে প্রথাগত ধারার বাইরে নতুনের কেতন ওড়ানোর মানসিক বিন্যাসে ছোটকাগজের জন্ম হয়ে থাকে। সেই ছোটকাগজটি কালের আবর্তনে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, আবার বেশিরভাগ কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়। এই টিকে থাকা আর হারিয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে ছোটকাগজ তার অমিত স্পর্ধার জানান দিয়ে যায়। ছোটকাগজ স্বনামে বেড়ে উঠলেও এখনকার ছোটকাগজগুলো কিন্তু আর আদৌও ছোট নয়। তার ব্যাপ্তি দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। আমি যদি বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষির কাগজের কথাই বলি, সেখানে দেখতে পাব আমাদের অগ্রজ-অনুজ-সমবয়সী বন্ধুরা পরবাসে বসেও বাংলা ভাষার কাজগগুলোকে বিশ্বায়নের এই যুগে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আবার সেই পুরোনো ধ্যান-ধারণা থেকে অনেকটা অগ্রসর হয়ে বছরের পর বছর পত্রিকাটি টিকিয়ে রাখছেন। বর্তমানে যেমন প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে লেখা সংগ্রহ ও সংরক্ষণেরও। এসব কারণে বেশ বড় বড় আকার আকৃতির ওজনদার পত্রিকাও বের হয়ে আসছে হরহামেশা।

সেই ছোটকাগজ বর্তমানে তার শরীরে মাংস বৃদ্ধির মতো ফুলে ফেঁপে ঢাউস আকারের অনেক কাগজ আমরা হাতে পাচ্ছি। বাণিজ্যিক কাগজের সাথে ছোটকাগজের রয়েছে যোজন যোজন দূরত্ব। বাণিজ্যিক কাগজের যেখানে রয়েছে মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা, সেখানে ছোটকাগজ অনেকটা বেপরোয়া। এই কারণেই বেপরোয়া লাগামহীন বলছি যে, তাকে আটকানোর, তার মত প্রকাশে বাধা দেওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিধিনিষেধ নেই; বা তার কোমরে দড়ি দিয়ে পিছনমুখে টেনে ধরে রাখবে এমনটি হবার নয়। আবার ছোটকাগজের সাহসী সম্পাদকরা এসবকে তোয়াক্কাও করে না। ফলত, লাগামহীন-বাধাহীন খাপখোলা তলোয়ারের মতো নতুন লিখিয়েদের কলমের খোঁচায় তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে ছোটকাগজগুলো।

ছোটকাগজ বা লিটল ম্যাগাজিনের আন্দোলন মূলত প্রচলিত ধ্যান ধারণার বাহক ‘প্রতিষ্ঠান’-এর পাঁচিলকে ভেঙে নতুনকে আহ্বান, নতুন সৃষ্টি, নতুনে অবগাহন। আবার নতুনকে ভেঙে আরেক নতুনে প্রত্যাগমন। লিটল ম্যাগাজিন সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে মতবিনিময়, চিন্তার আদান-প্রদান, প্রকাশনার সংকট ইত্যাদি নিয়ে এ মেলায় বিস্তর আলোচনার অবকাশ তৈরি করেছে বলে আয়োজকরা জানান। এছাড়া লিটল ম্যাগাজিনকর্মীরা মিলিত হতে চায় একটি পরিসরে, পরস্পরকে চেনাজানার জন্যে, এবং পাঠককে জানানোর জন্য যে, এই আমরাই গড়ে তুলেছি আজ এবং আগামীর সাহিত্যের নন্দন; আমরাই প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যের পাশাপাশি আমাদের বিকল্প সৃষ্টির আয়োজন মেলে ধরতে চাই। মেকি সাহিত্য-কারবারিদের ভিড়ে আমরা হারিয়ে যাইনি; আমরা আমাদের হট্টগোলকে ডুবতে দিইনি। এখানেই এ মেলার সার্থকতা রয়েছে। রয়েছে অনিবার্য স্বকীয়তা। মেলা সার্থক হয়েছে বলে অংশগ্রহণকারীরা জানান। এবার বই মেলায় বেরুনো ছোটকাগজগুলো নিয়ে কিছু আলোকপাত করবার চেষ্টা করব। প্রতি সংখ্যায় দুই থেকে তিনটি করে কাগজ নিয়ে ধারাবাহিক একটি লেখা হবে। যা পাঠককে নিশ্চয় একটি ছোটকাগজ নিয়ে কিছুটা হলেও চিন্তার খোরাক জোগাবে, ভাবনার জগৎকে প্রসারিত করবে, উসকে দেবে।

এবারই প্রথম বাংলা একাডেমির বহেরাতলা থেকে মূল মেলা প্রাঙ্গণের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লিটলম্যাগ চত্বরে নিয়ে আসা হয়েছে। যা ইতোপূর্বে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বহেরাতলায় ফিবছর স্টল বরাদ্দ দেওয়া হতো। এবার সর্বাধিক ১৫৬টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। গত অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো লিটলম্যাগ বেরিয়েছে। আবার কেউ কেউ মেলার আগেভাগেই বের করেছে। কেউবা মেলা চলাকালীন সময়ে বের করেছে। মেলা ঘুরে দেখা এবং সংগ্রহ করা ম্যাগাজিনগুলো হলো : বইকথা, শঙ্খদ্বীপ, মাটি ও বাংলা, শব্দকুঠি, ভ্রমণগদ্য, বুনন, উদ্যান, ঘুংঘুর, উজান, লেখমালা, হাইফেন, ছায়া, দৃষ্টি, ব্যাটিংজোন, রূপান্তর, পাতাদের সংসার, জীবনানন্দ, ৎ (খণ্ড ত), আবেগ, শিং, পালকি, চর্যাপদ, পরাগ, ঝিনুক, অনুরণন, শব্দ, অনুভূতি, দ্রষ্টব্য, লোক, জল, চিহ্ন, মগ্নপাঠ, কবিতাপত্র, ঈক্ষণ, নিসর্গ, এবং মানুষ, একবিংশ, মুক্তগদ্য, ভিন্নচোখ, বর্ণিল, বিরাঙ, চিহ্ন, হস্তাক্ষর, যমুনা প্রভৃতি। অপর দিকে দুটি সাহিত্য পত্রিকা সংগ্রহ করেছি তা হচ্ছে অনুপ্রাণন ও সরোবর।

কবিতাপত্র

সব্যসাচি লেখক কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা কবিতায় যুক্ত করেছিলেন পরাবাস্তববাদী দিগন্ত। তার উদ্ভাবনী শক্তি ও ব্যঞ্জনা সৃষ্টি তার ভাষাকে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী।… ফলত প্রায় পাঁচ দশকের কবিজীবনে তিনি বহুবার বাঁকবদল করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘কবিতায় আমি ভ্রাম্যমাণ। ফলে বছর পঞ্চাশ ধরে কবিতা যে লিখে গেছি, তার মধ্যে যে রূপান্তর তাকে আমি বাধা দিইনি। জোর করে কখনও কবিতা লিখিনি। আজও না। কবিতা আমি তখনই লিখি যখন কবিতা নিজে এসে আমার ওষ্ঠ চুম্বন করে।’ প্রতীক পরাবাস্তব থেকে সহজ-সাধারণ ধর্মীয় কবিতা; অক্ষরবৃত্ত-মাত্রাবৃত্ত থেকে সনেট ও টানাগদ্যÑপ্রায় সর্ববিধ আঙ্গিকে তিনি নিরীক্ষাধর্মী কবিতার স্বাক্ষর রেখেছেন।… আর্টস ফর আর্টের প্রবক্তা হিসেবে মান্নান সৈয়দ ষাটের সময়পর্বে নিজেকে প্রকাশ করেছেন তাঁর শিল্প-অন্বেষী চেতনায়। কবি হোসেন দেলওয়ার তাঁর সম্পাদকীয়তে কবিকে এভাবেই তুলে ধরেছেন। কবিতাপত্র ফেব্রুয়ারি ২০২০ সংখ্যাটি সব্যসাচি লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ’কে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে।

প্রথমেই আবদুল মান্নান সৈয়দকে তুলে ধরা হয়েছে : তাঁর কবিতাগ্রন্থের মধ্যেÑজন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭), জ্যোৎস্না রৌদ্রের চিকিৎসা (১৯৬৯), মাতাল মানচিত্রÑঅনুবাদ কবিতা (১৯৭০), ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ (১৯৭৪), নির্বাচিত কবিতা (১৯৭৫), কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৮২), পরাবাস্তব কবিতা (১৯৮২), পার্ক স্ট্রিটে একরাত্রি (১৯৮৩), মাছ সিরিজ (১৯৮৪), বিদেশি প্রেমের কবিতাÑঅনুবাদ কবিতা (১৯৮৪), পঞ্চশর (১৯৮৭), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৭), আমার সনেট (১৯৯০), সকল প্রশংসা তার (১৯৯৩ ও ২০০৪), নীরবতা গভীরতা দুই বোন বলে কথা (১৯৯৭), নির্বাচিত কবিতা (২০০১), কবিতা সমগ্র (২০০২), কবিতার বই (২০০৬), হে বন্ধুর বন্ধু হে প্রিয়তম (২০০৬), প্রেমের কবিতা (২০০৭), অঘ্রানের নীল দিন (২০০৮), এবং জনসাধারণ অসাধারণ (২০০৮)।

আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রথম কবিতাগ্রন্থ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭) ও প্রথম গল্পগ্রন্থ সত্যের মতো বদমাশ ১৯৬৮-তে প্রকাশিত হয়। তিনি জীবনের শুরুতেই প্রথম এ দুটি গ্রন্থ দিয়ে পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে আসেন। সত্যের মতো বদমাশ গল্পগ্রন্থটি প্রকাশ হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার অশ্লীলতার দায়ে এটি বাজেয়াপ্ত করে। তাঁর প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ শুদ্ধতম কবি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়। পরিচিতি পর্বে এখানে তাঁর ৪২টি কবিতা প্রকাশ করে কবিকে পাঠকের সামনে নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে। তরুণ পাঠককে উদ্বেলিত করবে তার কবিতায়।

এ সংখ্যায় কবিকে নিয়ে আলোকপাত করেছেনÑড. পাবলো শাহি, মোহাম্মদ নূরুল হক, মুক্তি মণ্ডল, পিয়াস মজিদ ও তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী।

‘শিল্পব্যাকরণের কবি : আবদুল মান্নান সৈয়দ’ শিরোনামে লিখেছেনÑড. পাবলো শাহি। তিনি তার মূল্যায়নে লিখেছেনÑ‘বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে ষাটের দশকে যিনি পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে বিশুদ্ধভাবে অনুসরণ করতে পেরেছিলেন তিনি আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০), আর সেক্ষেত্রে তিনিই সম্ভবত একমাত্র কবি, এই ধারার সূচনা করেছেন বাংলা কবিতায়। স্বজ্ঞনতা, কোলাজধর্মিতা, ফ্রয়েডীয়, মুগ্ধতা, নগ্নবাস্তবতা, অস্পষ্টতা, অনিশ্চয়তা, শিল্পপ্রমূর্তির প্রসারতা ইত্যাদি ব্যাখ্যা করা যায় আধুনিক শিল্পে; মান্নান সৈয়দ-এর কবিতায় এই সব ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়।…বাংলাদেশের কবিতায় আবদুর মান্নান সৈয়দ এর অবস্থান চিহ্নিত হতে পারে কলাকৈবল্যবাদী কবি হিসেবে। …আবদুল মান্নান সৈয়দ শিল্প সচেতন কবি, বিষয় সচেতন কবি নন। তাঁর কবিতা তাই বোধের বুদ্ধুদ, বহির্বিশে^র জানালা কিন্তু বৈশি^ক সংকট নেই। ষাটের অন্য কবিরা যেখানে সামাজিক সত্তাকে কবিতার প্রবল বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, সে ক্ষেত্রে অন্তর্জগৎই তাঁর কবিতার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়।’ এখানে পাবলো শাহি তার লেখার মধ্যে শওকত ওসমানের একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেনÑ‘মান্নান আঙ্গিকের দিক থেকে পুরোপুরি পরাবাস্তববাদী বা স্যুররিয়ালিস্ট। চিত্রকল্পের মাধ্যমেই তার ভাবজগৎ নির্মিত। মান্নানকে ভুল-বোঝাবুঝির তাই যথেষ্ট অবকাশ আছে। কিন্তু ইউরোপীয় কাব্যধারার সঙ্গে পরিচয় থাকলে, এমন হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা কম।’ বাংলাদেশের কবিতায় তিনি চিহ্নিত হয়ে থাকবেন শিল্পসচেতন কবি হিসেবে, ষাট দশকের উপমাময় কবি হিসেবে এবং বাংলাদেশের কবিতার প্রধান প্রবণতা রাজনীতি সচেতন ও উচ্চকিত স্বর থেকে দূরে এক স্বনির্বাসিত শিল্পব্যাকরণের কবি হিসাবে। আসলেই আবদুল মান্নান সৈয়দ শুদ্ধতম কবি হিসেবে কবিতার জগতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবেন। পাবলো শাহি তাঁকে যথার্থই মূল্যায়ন করেছেন।

মোহাম্মদ নূরুল হক ‘আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতা : সার্বভৌম উচ্চারণ’ শিরোনামে লিখেছেনÑ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ সার্বভৌম কবি; সম্পন্ন কণ্ঠস্বর। “জনপ্রিয়তার দুঃসহ সাধারণে” ভেসে যাওয়ার সামর্থ্যহীনতাকে হৃদয়ের ঔদার্যে বরণ করেও আবেগের সংহতি ও প্রজ্ঞার সম্মিলনে আলোড়নসম্ভব অভিঘাতে ঘুমন্ত মগজকে হৃদয়ের সামনে সমর্পণ করেন। “জন্মান্ধের” কবিতায় মানুষের আদিম ভয় “অভাব” দাঁড়িয়ে থাকে আড়চোখে। জিজ্ঞাসার মতো আরক্তিম কাতারে। এ উপলব্ধি কোনো জনপদে প্রভাবসঞ্চারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নয়। নয় নিছক সমাজকর্মী কিংবা সমাজচিন্তকেরও। …একাধারে  কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সমালোচক এই রকম আরও উপাধি তাঁর নামের আগে বসান যায়। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যে তিনি সফল পদচারণা করেননি। এই রকম বহুমাত্রিক লেখক খুব কমই জন্মায়। রবীন্দ্রপরবর্তী বাংলা সাহিত্যেও তেমন একটা দেখা যায়নি। …গদ্য কবিতার কথা আমরা শুনেছি কিন্তু তাঁর হাতের ছোঁয়ায় সেই গদ্যকবিতা হয়েছে অসাধারণ। “জন্মান্ধ” কবিতাগুচ্ছ পাঠ করলেই আশা করি পাঠকদের গদ্যছন্দের যে ভুল ধারণা আছে তা দূর হবে। …১৯৬৭ সালের আগেই কবি তাঁর কাব্যগ্রন্থে লিখে গেলেন গদ্যছন্দের সফল বাস্তবায়নে। গদ্য যদিও তার হাতেই প্রথম নয় কিন্তু তার গদ্যশৈলী অন্যমাত্রা পেয়েছে। গদ্য ও পদ্যের মেলবন্ধনের মাধ্যমে পাঠককে নতুন পাঠাভিজ্ঞতার সম্মুখীন করেছেন কবি। একটি কাব্যগ্রন্থ রচনার পর যদি কবি অন্যগ্রন্থ প্রকাশ নাও করতেন তবুও তিনি বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকতেন।’ এভাবেই মোহাম্মদ নূরুল হক সৈয়দ মান্নানকে মূল্যায়ন করেছেন।

‘আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতা : ব্যক্তির উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস’ শিরোনামে মুক্তি মণ্ডল লিখেছেনÑ‘তাঁর “জন্মান্ধ” কবিতাগুচ্ছ কবিতা যাপনের ধাপ নির্মাণ করে দিয়েছিল, এজন্য তাঁর পরবর্তী ব্যক্তি-মানস স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণে সক্ষম হয়ে উঠেছিল। “জন্মান্ধ” কবিতাগুচ্ছের ব্যক্তি-মানস ব্যক্তি-স্বাধীনতার পক্ষে নির্লজ্জভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের রীতিনীতির বাইরে এসে দাঁড়াতে চেয়েছে। সামাজিকীকরণের বাইরে ব্যক্তির বোধ ও অনুভূতিকে কেন্দ্র করে তৈরি করেছে অনন্য ফ্যান্টাসি। …পরাধীনতার ভেতরও জীবন যাপনের যে কবিতা, জীবন আনন্দের যে বাতিঘর, যে নদীর উত্তাল প্রতিবেশে বেড়ে উঠেছে যে সকল ব্যক্তিত্ব তাঁদের সেই ব্যক্তি সত্তা প্রকাশিত হওয়ায় আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতা ব্যক্তির কাছে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার মহিমা জড়ো করে। দৃষ্টি প্রসারিত করে মানুষের সৌম্য ও দ্রোহ প্রদর্শনের মেলায় হাজির হয়। আবদুল মান্নান সৈয়দ, তাঁর কবিতায় সমাজ-নির্মিত ব্যক্তির ভেতর থেকে বের হয়ে এসে, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতরকার মানুষের জীবন-যাপন পর্যবেক্ষণ করেছেন, এবং পর্যবেক্ষণকৃত দৃশ্যাবলি নিজের স্বাধীন সত্তার মতো কবিতার ভেতর চালান করেছেন। এই রকম আমার মনে হয়।’ মুক্তি মণ্ডলের পর্যবেক্ষণের সাথে দ্বিমত পোষণ করবার কোনো সুযোগ নেই। তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতরকার মানুষের যাপিত জীবনকে দেখেছেন আপন আয়নায়। ফলত, তাঁর কবিতায় ভিন্ন মাত্রিকতা পরিস্ফুটিত হয়েছে। ভিন্ন স্বরে পাঠক তাঁকে চিনে নিয়েছেন।

‘কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ : সংশ্লেষণ, বিশ্লেষণ ও আলাপন’ শিরোনামে লিখেছেনÑপিয়াস মজিদ। পিয়াস মজিদ তাঁর কবিতা নিয়ে প্রথমে লিখেছেন। অতঃপর তাঁর সাথে আলাপনের অংশ তুলে ধরেছেনÑ‘জন্মান্ধ’ কবিতাগুচ্ছের পরবর্তী বইগুলোয় আবদুল মান্নান সৈয়দ ধীরে খোলস পাল্টেছেন। জ্যোৎস্না রৌদ্রের চিকিৎসায় ফুরিয়ে আসে জলের পাষাণ। তারপর পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি, কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড বা মাছ সিরিজ। মাঝখানে তিনি ছিটকে পড়েন আমার সনেট আর সকল প্রশংসা তার-এর অমান্নানীয় গুহায়। তারপর আবার শুরু বন্দরে ফেরা। নীরবতা গভীরতা দুই বোন বলে কথা আর প্রেমের কবিতা, মাতাল কবিতায় মধ্যবর্তী একটি পরিখা তৈরি হলো। উল্লিখিত পর্বে হালকা চালে, মৃদু সাজে গঠিত হলো তার কবিতার কায়া। এমন কবিতারা অল্প আয়াসে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন তাতেই শেষ হয় না। এসব কবিতার রেশ কতদূর রয় ?।… ২০০৮ সালে পিয়াস মজিদ কবির একটি আলাপনধর্মী সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছেনÑ‘কবিতা এক সঙ্গে মন্ময় এবং হৃদয়-উৎসারিত। হৃদয়হীন কবিতা হরহামেশা মুদ্রিত হচ্ছে দেখতে পাই। নাম ক্রমাগত মুদ্রিত হচ্ছে অনেকের কিন্তু কবিতা হচ্ছে কি ?’… কবির জন্য কাব্যতত্ত্ব ভয়াবহ ব্যাপার। আমিও মাঝে মাঝে কবিতা সম্পর্কে তত্ত্বকথা বলি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেটা অতিক্রমের জন্য পাগল হয়ে যাই। কবিতায় কোনো হিসাব চলে না। …আমি চিরকাল অনুবাদ-কবিতার বিপক্ষে ছিলাম। আজও আছি। রবার্ট ফ্রস্টের মতো আমিও বিশ্বাস করি অনুবাদে যা বাদ পড়ে, সেটাই কবিতা। ফলে এখন আর কবিতা অনুবাদে উৎসাহ নেই। আগেও যা করেছি খেয়ালবশে। … আমি ২০০৭ সালে ক্রমে উপলব্ধি করেছি যে, আমি যদিবা এক সময় সুররিয়ালিস্ট ছিলাম, কিন্তু এখন সুররিয়ালিজমের চেয়ে মূল্য দিতে চাই এক্সিস্টেনসিয়ালিজমকে। এ দেশ-কাল-সমাজ-সাহিত্য জগৎ আমাকে সুররিয়ালিস্ট মান্নান সৈয়দকে এক্সিস্টেনসিয়ালিস্ট মান্নান সৈয়দে রূপান্তরিত করেছে। … কবিতা আমি তখনই লিখি, যখন কবিতা নিজে এসে আমার ওষ্ঠ চুম্বন করে। …আমি বিশ্বাস করি, কবিতা তারুণ্যনির্ভর। এ কথা বলেছিও অনেকবার। এখন মনে হয় হয়তো এ তারুণ্য পৃথিবীর বা শরীরের বা বয়সের ওপর নির্ভরশীল নয়।’ আসলেই মান্নান সৈয়দ তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধতায় ঋদ্ধ ছিলেন, তাইতো তিনি যথার্থই বলেছেনÑকবিতা তারুণ্যনির্ভর। কবি কখনও তার তারুণ্যতাকে খোয়ায় না। চির সবুজ হয়ে, চির জাগরূক হয়ে কবিতার ধ্যানে নিমগ্ন থাকেন।

তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেনÑ‘মান্নান সৈয়দ : সাহিত্যমগ্ন পরাবাস্তব কবি’ শিরোনামে। চির আধুনিক এ কবি কাব্যের অন্তর্লোকে গিয়ে বের করতেন কবিতার নির্যাস। বাংলা কবিতায় উপমার সুশৃঙ্খল প্রাচীনতাকে ভেঙে স্বপ্নের চেয়ে কল্পনা, বস্তুর চেয়ে বস্তুর অন্তর্ভেদী শক্তির ওপর জোর দেন পরাবাস্তব কবি মান্নান সৈয়দ। ‘পরাবাস্তব’ ধারণা ইউরোপে অনেক আগেই কবিতার অবয়বে যুক্ত হলেও মধ্যষাটের পূর্বে এদেশে শব্দটি ততটা প্রচলিত ছিল না। জীবনানন্দ দাশের কাব্য-আত্মায় পরাবাস্তবতার ছোঁয়া লোকজ ভঙ্গিতে উঁকি মারলেও মান্নান সৈয়দই এদেশে প্রথম স্পষ্টভাবে এই নতুন ধারার সূচনা করেন। শব্দ, উপমা, প্রতীক আর রূপকের ইন্দ্রজালের মোহন পর্দা দুলিয়ে পাঠককে মোহগ্রস্ত করে পরক্ষণেই তিনি উন্মোচন করেন কঠোর বাস্তব কোনো দৃশ্য। বিসদৃশ দৃশ্য রচনার মাধ্যমে মানুষের বোধে ঝাঁকুনি দিতে তিনি নিজের অবচেতন জগতের আলো-ছায়াকে নিয়ে আসেন কবিতায়। …যে হাতে তিনি লিখেছেন, সত্যের মতো বদমাশ আবার সে হাতেই তিনি লিখেছেন, সকল প্রশংসা তার। মান্নান সৈয়দের সাহিত্যভাবনার বিশাল বেলাভূমিতে নানামাত্রিক ঢেউ আছড়ে পড়লেও মনেপ্রাণে তিনি বিশুদ্ধ শিল্প নির্মাণে নিমগ্ন থাকতেই পছন্দ করতেন।’

এ সংখ্যায় গুচ্ছ কবিতা লিখেছেনÑসৌমনা দাশগুপ্ত ও অমিত চক্রবর্তী।

কবিতা লিখেছেনÑপাবলো শাহি, রেজা রাজা, মাসুদার রহমান, সোহেল হাসান গালিব, সোনালী চক্রবর্তী, পিয়াস মজিদ, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, নাহিদা আশরাফী, নভেরা হোসেন, নওশাদ জামিল, সেলিম মাহমুদ, অমলেন্দু বিশ^াস, শওকত হোসেন, সারাজাত সৌম, মোক্তার হোসেন, পলিয়ার ওয়াহিদ, নিলয় রফিক, দ্বিত্ব শুভ্রা, কবির মুকুল প্রদীপ, রাজকুমার শেখ, নৈরিৎ ইমু ও অর্ক অপু।

আমরা অনেকেই ষাটের দশকের এই শক্তিমান কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিককে স্মৃতির বিস্মৃতিতে রেখে দিয়েছি। সেক্ষেত্রে হোসেন দেলওয়ার অনিন্দ্য নান্দনিক একটি আয়োজনে আবারও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেনÑমান্নান সৈয়দের আবেদন এখনও রয়েছে। এখনও আমরা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। এমন একটি সংখ্যা আত্মপ্রকাশ করায় সম্পাদককে সাধুবাদ দিতেই হবে। কবিতার জয় হোক। ছোটকাগজ টিকে থাক মননের গহিন বনে।

রাঢ়বঙ্গ

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ও বাঙালির জীবনে অনিবার্য নাম, অবিস্মরণীয় এক ইতিহাস। হাজার বছরের পরাধীন বাঙালি জাতির স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনিই এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদানের পদ্ধতিগত রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে সাফল্য অর্জন করার কৃতিত্বও তাঁর। তাঁর সাহসী ও দৃঢ়চেতা ভূমিকার কারণেই বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ স্থান করে নেয়। অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ স্বাধীনের পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বিশ্বাসঘাতক একদল বাঙালির হাতেই নিজ বাড়িতে সপরিবারে তিনি নিহত হন। 

ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর, তাঁকে নিয়ে বাঙালি কবিরাই সম্ভবত সর্বাধিক লেখালেখি করেছেন। সেই তুলনায় কথাসাহিত্যিকরা তেমন করেননি, তাঁদের পক্ষে সেটা খুব একটা সম্ভবও ছিল না। কেননা, কবিতায় যতটা আবেগ-কল্পনার স্থান আছে, কথাসাহিত্যে সেই অর্থে সেই সুযোগ নেই; কথাশিল্পীকে সবসময়ই হাঁটতে হয় বাস্তবতার দেয়াল ঘেঁষে।

জাতির জনককে শ্রদ্ধা জানিয়ে জানুয়ারি ২০২০-এ তাঁর জন্ম শতবর্ষে সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা রাঢ়বঙ্গ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর জন্ম শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি সংখ্যাটি জানুয়ারি ২০২০-এ প্রকাশ করেছে। যা অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ পাঠকের হাতে এসে পৌঁছেছে।

মোট ১১জন ‘বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা ও তাঁকে নিয়ে লেখা গ্রন্থের’ আলোচনা করেছেন। তাঁরা হলেনÑরওশন জাহিদ, শামস্ আলদীন, অসীম কুমার সাহা, মেহেদী ধ্রুব, রহমান মুজিব, মিল্টন বিশ্বাস, মো. মেহেদী হাসান, বাবলু জোয়ারদার, শিবশঙ্কর পাল, অনুপম হাসান। এছাড়াও অসীম কুমার সাহা অনূদিতÑ‘তালপাতার পুঁথি : ঐতিহাসিক ঘটনাভিত্তিক উপন্যাস’ নিয়ে একটি লেখা রয়েছে।

রওশন জাহিদ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী : পাঠ-পুনর্পাঠ’ শিরোনামে লিখেছেনÑ‘দেশ বিভক্তির আগে বাংলা মুসলিম লীগের সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম। মুসলিম তরুণদের ওপর এই দুই রাজনৈতিক নেতৃত্বের অসামান্য প্রভাব থাকা সত্ত্বেও তাঁরা কেউ পাকিস্তানে এলেন না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের রক্ষার জন্য সেখানেই রয়ে গেলেন, আর পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার বিরোধী নেতা হলেন আবুল হাশিম। তাঁদের নেতৃত্বে মুসলিম লীগের যে প্রগতিশীল অংশ ছিল, তারা প্রকারান্তরে বিপদে পড়তে শুরু করল। কারণ ততদিনে মুসলিম লীগের উপদলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এ সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের করাচিতে যান।…১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়, এর প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। …অত্যাচারী পাকিস্তানি শাসকবাহিনীর কোপানলে, রাষ্ট্রীয় গুণ্ডা পুলিশ বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার নির্যাতন, শাসকদের ক্রীড়নক বিচার ব্যবস্থার কারণে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রায় তেইশ বছরের অর্ধেক সময় জেলখানায় কাটিয়েছেন। …শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সেবক ও সাধক ছিলেন। সাধারণ পল্লীগ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষ শেখ মুজিব জনসাধারণকে যেমন ভালোবাসতেন তেমনি তাদের সংস্কৃতির প্রতিও ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। বুকে দুধভরা ধানের সুবাস, বৃষ্টির পরে মাটি থেকে উঠে আসা সোঁদাগন্ধ, পাক-পাখালির ডাক প্রভৃতির সৌন্দর্যে তিনি ছিলেন উদ্বেলিত।’ রওশন জাহিদের বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে পাঠ-পুনর্পাঠ পাঠকদের নিশ্চয় ভালো লাগবে।

‘বঙ্গবন্ধু ও অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শিরোনামে লিখেছেন শামস্ আলদীনÑ‘তিনি স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়েছিলেন, তবে সেই আগ্রহ কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে আরও পরিপক্ব ও দৃঢ় হয়েছিল; একইসাথে তিনি এ সময় থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতিতে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। …ভাসানী সাহেবকে বঙ্গবন্ধু কখনও আদর্শ নেতা হিসেবে মানেননি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, মওলানার উদারতার অভাবকে। যে উদারতা তিনি হক এবং শহীদ সাহেবের মধ্যে দেখেছেন সেই একই উদারতা হয়তো মওলানার মধ্যেও প্রত্যাশা করেছিলেন।’ শামস্ আলদীনের আলোচনাটিও একটি সুখপাঠ্য আলোচনা হয়েছে।

অসীম কুমার সাহাÑ ‘কারাগারের রোজনামচা : সংগ্রামী নেতার আত্মকথন’ শিরোনামে লিখেছেনÑ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মবার্ষিকীতে ২০১৭ সালে গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর লেখা দিনপঞ্জির লেখাগুলো সম্পাদনার মাধ্যমে প্রকাশ হয়। …জেলখানার পাগলা গারদের কাছেরই সেলে বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ওয়ার্ডের নাম ছিল সিভিল ওয়ার্ড। তাঁর ওয়ার্ড থেকে ৪০ হাত দূরের পুরোনো ৪০নং সেলটি ছিল পাগলা গারদ। এই সেলে দিনে প্রায় ৭০ জন আর রাত্রে ৩৭ জন পাগল থাকত। পাগলদের চিৎকারের কারণে রাতের পর রাত তিনি ঘুমাতে পারতেন না। নিজের কষ্টের কথা না বলে বঙ্গবন্ধু সেই পাগলদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, তাদের আচার-আচরণ অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে রোজনামচায় তুলে ধরেছেন।’ …কারাগারের রোজনামচাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অমূল্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যায়। মূলত এটি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্বের [১৯৬৬-১৯৬৯] দিনলিপি। এই দিনলিপিকে গ্রন্থাগারে প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার যোগ্য উত্তরসূরির ভূমিকা পালন করছেন। শেখ হাসিনা নিজেই বইটির ভূমিকা লিখেছেন।

‘সেলিনা হোসেনের আগস্টের একরাত-এর ট্রমা’ শিরোনামে লিখেছেন মেহেদী ধ্রুব। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের আগস্টের একরাত শুধু একরাতের চিত্র নয়, বরং জাতির জনকের সামগ্রিক জীবনচিত্রের প্রতিভাস। উপন্যাসের ঘটনা-বিন্যাসকে মোটাদাগে দুটো ভাগে বিভক্ত করা যায়: একÑবঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষীদের জবানবন্দি সন্নিবেশিত করার মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ। দুইÑঔপন্যাসিকসহ জীবিত-মৃত ব্যক্তি ও প্রকৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণিত ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষীদের জবানবন্দির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জীবনচিত্রের সমন্বয়সূত্র নিরূপণ; অর্থাৎ একজন সংবেদনশীল শিল্পীর স্বপ্ন কল্পনা, ভালোবাসা ও আবেগের মিথস্ক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুর শৈশব থেকে মৃত্যু পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনার সূত্রায়ন করা। …বঙ্গবন্ধুর হার না-মানা মানসিকতার সঙ্গে কয়েকজন আত্মত্যাগী বিশ^াসী মানুষের চরিত্র লক্ষ করা যায় উপন্যাসের ঘটনাবর্তে। কর্নেল জামিল তাদের মধ্যে অন্যতম, যিনি ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে এসে প্রাণ দিয়েছেন; ঔপন্যাসিক কর্নেল জামিলের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা’র অসহায়ত্ব, উৎকণ্ঠা ও মর্মবেদনা, মন্ত্রী সেরনিয়াবত ও শেখ মণির বাড়িতে নিহত মানুষের হৃদয়স্পর্শী ঘটনা তুলে ধরেছেন।’ ইতিহাসের হৃদয়স্পর্শী নির্মম এ ঘটনাকে নিয়ে লেখা একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে পাঠকের কাছে প্রতিভাত হয়েছে।

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ঔপন্যাসিক মহিবুল আলমের মূল ইংরেজিতে লেখা উপন্যাসের রিভিউ করেছেন সুব্রত কুমার দাস। সেখান থেকে অসীম কুমার সাহা বাঙলায়ন করেছেন ‘তালপাতার পুঁথি : ঐতিহাসিক ঘটনাভিত্তিক উপন্যাস’ শিরোনামে। খুব সম্ভবত বাংলায় এটাই একমাত্র কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বের ওপর জীবনী-সংক্রান্ত উপন্যাস রচনার প্রয়াশ। আটশো পৃষ্ঠার অধিক এ উপন্যাস, যার পরিব্যাপ্তি মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা সময়কালের মধ্যে ব্যাপ্ত।

‘সেই কালো রাত : বাঙালির রক্তক্ষরণের ইতিহাস’ শিরোনামে লিখেছেন রহমান মুজিব। ঔপন্যাসিক আউয়াল চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ অধ্যায় অবলম্বনে প্রাণবন্ত উপন্যাস রচনা করেছেন সেই কালো রাত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের [১৯২০-১৯৭৫] সংগ্রামী জীবন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক গল্প, কবিতা, জীবনীগ্রন্থ লেখা হলেও উপন্যাস হয়েছে খুবই কম। আউয়াল চৌধুরীর সেই কালো রাত একটি ঐতিহাসিক দলিল বলে প্রতীয়মান হয়েছে আলোচক রহমান মুজিবের লেখা পাঠ করে। বহুমাত্রিক প্রতিভার কথাশিল্পী আউয়াল চৌধুরী তার সেই কালো রাত উপন্যাসে সাবলীল ভাষায় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করার পাশাপাশি তৎকালীন সমাজবাস্তবতা, ধর্মান্ধ বিশ^াস, পির-ফকিরদের দৌরাত্ম্য বর্ণনা করেছেন অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যে।

মিল্টন বিশ্বাস ‘ধানমন্ডি ৩২ নম্বর : মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিতে বঙ্গবন্ধু বয়ান’ শিরোনামে লিখেছেনÑ‘বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত হয়েছে ২৯টি উপন্যাস। …ঢাকার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বুলেটবিক্ষত বাসগৃহ আজ বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারকচিহ্ন। ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি নিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কবিতা রচিত হলেও এই প্রথম আমরা শামস সাইদের ধানমন্ডি ৩২ নম্বর শিরোনামে দুই খণ্ডে একটি মহাকাব্যিক ব্যাপ্তির উপন্যাস পেয়েছি। ৩২ নম্বর সড়ক ছিল বাঙালির সংগ্রামের সদর দপ্তর; যা এক সময় একটি জাতির ঠিকানায় পরিণত হয়েছিল। …ধানমন্ডি ৩২ নম্বর উপন্যাসটি ঐতিহাসিক, তবে তা রাজনৈতিক স্রোতে প্রবাহিত ইতিহাস। যে ইতিহাসের স্রোতধারা মিশেছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের সঙ্গে।’

আবদুল মান্নান সরকার বঙ্গবন্ধুর জীবনীর ঘটনাবলীকে নিয়ে জনক উপন্যাস লিখেছেন। ‘জনক : ইতিহাসের পুনর্পাঠ’ শিরোনামে মো. মেহেদী হাসান লিখেছেন : জনক উপন্যাস শুরু হচ্ছে ‘বাগদাদ নগরীর উপকণ্ঠে’ এক ‘পুণ্যাত্মা দরবেশ’ তাঁর প্রিয় শিষ্যকে নির্দেশ দিচ্ছেন ধর্ম প্রচারের জন্য ছড়িয়ে পড়তে। শিষ্য শেখ আওয়ালের বাংলাদেশে এভাবেই আগমন। এ উপন্যাসে কারাগারে বন্দি থেকেও বেগম মুজিবের কাছে তাঁর সন্তানদের যে খোঁজখবর নিয়েছেন তার বিশদ বর্ণনা আমরা দেখতে পাই।

ঔপন্যাসিক হুমায়ূন মালিকের মুজিব পুরাণ উপন্যাস নিয়ে বাবলু জোয়ারদার ‘মুজিব পুরাণ : ইতিহাসের আর্তনাদ’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘হুমায়ূন মালিকের মুজিব পুরাণ পাঠের মধ্য দিয়ে পাঠকের উপলব্ধিতে আসে যে, মেজর শরফুল হক ডালিমের স্ত্রী নিম্মির ছোট বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে তাকে রেডক্রসের বাংলাদেশ-প্রধান গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলে কর্তৃক হেনস্তা এবং তৎপরবর্তী ডালিম কর্তৃক গাজীর ছেলেকে ঘুসি মারা, পরে  গাজীর অনুসারীদের দ্বারা ডালিমকে অপহরণের চেষ্টা এবং ডালিমের ঘনিষ্ঠ মেজর নূর চৌধুরীর নেতৃত্বে কতিপয় সেনাসদস্যদের দ্বারা গাজীর বাড়িতে হামলা ও নূরসহ ২২ জন সেনাসদস্যের চাকুরিচ্যুতি ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ঘটানোর প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছে।’ …১৫ আগস্টের আগের দিন বিকেলে শেখ মণি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, সিআইএ-র সহযোগিতায় মোশতাক ক্যু’র  ষড়যন্ত্র করছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা বিশেষ আমলে নেননি। …বাঙালি জাতির প্রতি অগাধ বিশ^াস ও আস্থার জায়গা থেকে তিনি এমন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের কথাও আমলে নেননি কিংবা সতর্ক হননি। বঙ্গবন্ধু কখনও বিশ^াস করতেন না যে, কোনো বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে। কারণ তিনি গোটা জাতিকে বড় বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন।’ আসলেই তাই জাতিকে বড় বেশি ভালোবেসে ফেলার কারণেই তিনি বিশ^াসঘাতকদের কাছে হেরে গেলেন।

‘দাওয়াল : প্রান্তিক মজুরদের অধিকার আদায়ের ইতিহাস-চিত্র’ শিরোনামে শিবশঙ্কর পাল লিখেছেন : ‘শেখ মুজিব তখনও বঙ্গবন্ধু  বা জাতির পিতা বা রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেননি, পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনীতি করছেন মাত্র। তিনি এই সময়ের কিছু স্থানীয় নেতা ও দাওয়ালদের নিয়ে কর্ডন আইন বাতিল করতে সমর্থ হন। আর এই ঘটনাকে উপজীব্য করে কথাশিল্পী সমীর আহমেদ বাস্তবতা আর কল্পনার মিশেলে লিখেছেন তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস দাওয়াল। …দাওয়াল মূলত দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকাজে খেটে খাওয়া মজুরদের অধিকার বঞ্চিত মানুষের এবং তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবি আদায়ের উপন্যাস। উপন্যাসের ব্যাপ্তি ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ এই দুই/আড়াই বছর। সদ্য দেশ ভাগের পরপর  অখণ্ড স্বাধীন পাকিস্তানের পূর্বভাগ অর্থাৎ পূর্ব-পাকিস্তান সরকার কর্ডন প্রথা বা আইন জারি করে। যার অর্থ দাওয়াল অর্থাৎ যারা গৃহস্থের ধান কেটে গোলায় তুলে দেয়Ñতারা তার বিনিময়ে যে ধান পায়, সেই ধান নিজ বাড়িতে বা নিজ জেলায় (দাওয়ালরা বেশি ভাগই এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যায় ধান কাটতে) নিয়ে যেতে পারবে না। আর এতে প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দাওয়ালরা। …দাওয়াল দক্ষিণবঙ্গের ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও টুঙ্গিপাড়া অঞ্চলের পটভূমিতে লেখা।’ দাওয়াল উপন্যাসটির একটি রাজনৈতিক পটভূমি রয়েছে। যেখানে মুজিবের ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যাবে। 

অনুপম হাসান মাসরুর আরেফিনের উপন্যাস ‘আগস্ট আবছায়া : ইতিহাসের অন্ধকারে বিনির্মাণের আলো’ শিরোনামে লিখেছেন- ‘আগস্ট আবছায় উপন্যাসের বিষয়-বিন্যাস বয়নকৌশলের কারণেই রচনা অনন্য নভেল হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা, আমার জানামতে আগস্ট ট্রাজেডি [১৫ আগস্ট ১৯৭৫] নিয়ে এমন নভেল দ্বিতীয়টি বাংলা ভাষায় এখন পর্যন্ত লেখা হয়নি। মধ্য আগস্টের ট্র্যাজেডি বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক মাসরুর আরেফিন এ উপন্যাসে ইতিহাসের যে বিনির্মাণ করেছেন, অদ্যাবধি কোনো বাঙালি উপন্যাসিক ইতিহাসের প্রচলিত তথ্য-উপাত্তের সেই ধারা ভেঙে বিশেষ কিছু বলতে পারেননি।’ …আগস্ট আবছায়া উপন্যাসে মধ্য-আগস্ট ট্রাজেডি মূল কেন্দ্রে থাকলেও ঔপন্যাসিক মাসরুর আরেফিন কাহিনিকে আরও এগিয়ে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পরও। সেখানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পশ্চাৎপট এবং মুখোশের অন্তরালে থাকা স্বার্থপরতার নানান চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা যেমন সেখানে আছে, তেমনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী দেশ এবং পরাশক্তিসমূহের অব্যাহত ষড়যন্ত্র একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।’ আগস্ট আবছায়া আলোচনাটি পাঠ করে আমার কাছে মনে হয়েছে এটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাসের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে প্রকাশিত রাঢ়বঙ্গ  সংখ্যাটি অনিন্দ্য সুন্দর। বোদ্ধা পাঠক সমাজে সমাদৃত হবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। ঝকঝকে ছাপা, উন্নত বাঁধাই এবং সর্বোপরি সম্পাদনার মুন্সিয়ানা সবাইকে মুগ্ধ করবে। 

পালকি

একজন মানুষ সাহিত্যের জন্য কতটা নিবেদিতপ্রাণ হলে স্বজন-সংসার ছেড়ে জীবনের সবটুকু আয় দিয়ে লিটলম্যাগ বের করতে পারেন ? তার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ কবি, গল্পকার, সম্পাদক আন্ওয়ার আহমদ। তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, এমন লেখকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। ছোটকাগজ লেখক তৈরি করে, লেখককে লেখক হয়ে উঠবার জন্য সহায়তা করে। আন্ওয়ার আহমদ তার পত্রিকায় তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে লেখা প্রকাশ করেছেন। তরুণদের লেখা নিজ উদ্যোগে জাতীয় দৈনিকগুলোতে পাঠিয়ে ছাপানোর ব্যবস্থা করেছেন। অথচ জীবনের পড়ন্ত বিকেলে নিজের একমাত্র বাড়ি বিক্রি করেছেন তাঁর পত্রিকা দুটিকে টিকিয়ে রাখতে।

ছোটকাগজ পালকি তাঁকে নিয়ে নিবেদিত ছড়া, প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা আর স্মৃতিচারণ করায় সংখ্যাটি ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। আর এমন একজন বিরলপ্রজ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে একটি সংখ্যা করেছেন অরিন্দম মাহমুদ তরি পালকি পত্রিকায়। যা ২০২০-এর বইমেলায় প্রকাশিত অন্যরকম একটি ছোটকাগজ হিসেবে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আন্ওয়ার আহমদ ১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন, আর আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান ২৪ ডিসেম্বর ২০০৩। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ ১৫টি, গল্পগ্রন্থ ৪টি, সম্পাদনাগ্রন্থ ৩টি।

স্বীকৃতি বলতে পেয়েছেনÑলিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনায় ‘বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার (১৯৯৩)’, ‘জাতীয় সাহিত্য পদক (২০০৩), ‘লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র পুরুস্কার, কলকাতা (২০০৪) [মরণোত্তর]।

আন্ওয়ার আহমদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেনÑমুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বজলুল করিম বাহার, শোয়েব শাহরিয়ার, জাকির তালুকদার, শিবলী মোকতাদির, আহমেদ জুয়েল, শামীম শাম্স, এমরান কবির, ইন্দ্রজিৎ সরকার, প্রান্তিক অরণ্য ও অরিন্দম মাহমুদ।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘আন্ওয়ার আহমদের কবিতা : অঙ্গে কুসুমের উত্তাপ’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘আন্ওয়ার আহমদ, এক তীব্র রোমান্টিক বোহেমিয়ান কবি, ষাটের দশক থেকে তিনি ছিলেন কবিতা জগতে বিচরণে কার্পণ্যহীন। মৃত্যুর আগে তিনি দুই হাজার এক ও দুইয়ের মধ্যে চারটি কবিতার বই প্রকাশ করেন। এই বইগুলো আকৃতিতে ছোট কিন্তু পাতায় পাতায় স্বচ্ছ সরল প্রেমের স্বীকারোক্তি। এত প্রেম এত ভালোবাসা আন্ওয়ারের হৃদয় কুঠুরিতে জমা থাকে, নিঃশেষ হয় না। …আন্ওয়ার মূলত কবি। তাঁর অন্যান্য রচনার আলোকে তাঁর কবিতার পাল্লাই ভারী। সে হিসেবে তিনি কবিতাঙ্গনে একজন হৃদয়নির্ভর ভালোবাসার কবি হিসেবে স্বীকৃত। বস্তুত আন্ওয়ার কবিতা লেখেন স্বতঃস্ফূর্ত এক প্রাণচাঞ্চল্যে। তিনি মানবীয় শরীর-মন-প্রাণ সবেরই এক উত্তাপ কবিতায় ছড়িয়ে দিতে ব্যগ্র।’ আনওয়ার আহমদকে তিনি এভাবেই মূল্যায়ন করেছেন।

বজলুল করিম বাহার ‘স্মৃতি যেসব দৃশ্য জমা রেখেছিল’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘ প্রায় ছয় দশককাল আগে, বগুড়া শহরের উপকণ্ঠে শিববাটি এলাকায় প্রথম সাক্ষাতে কিছুটা বিরূপতা সত্ত্বেও যে মানুষটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম তাঁর নাম আন্ওয়ার আহমদ। …পৈতৃকসূত্রে তাঁরা ইতোপূর্বে কোলকাতায় বসবাস করতেন। এবং সেখানকার আধুনিক খ্যাতিমান কবি-লেখকদের সাথে তাঁর পরিচয় ছিল। …তিরিশের আধুনিক কবিকুল ও বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস। …এক যুগসন্ধিকালে আন্ওয়ার আহমদ ক্রমেই যেনো নতুনভাবে আত্মপ্রকাশিত হতে শুরু করেন। অভ্যুদয় ঘটে এক ব্যতিক্রমী আন্ওয়ার আহমদের। তিনি একাধারে হয়ে ওঠেন কবি, সাংবাদিক, পত্রিকা সম্পাদক এবং প্রথিতযশা লেখক ও তরুণ কবি ও সাহিত্য যশোপ্রার্থীদের উদ্দীপক এক অনন্য পৃষ্ঠপোষক। এই অবস্থান থেকে কখনও সরে যাননি বাকি জীবনব্যাপী। আমৃত্যু তিনি একাকীই উৎসুক থেকেছিলেন সাহিত্যের এই দুর্মর আকর্ষণের পথ ধরে। প্রতিষ্ঠিত কোনো কবি বা লেখক, তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল কোনো কবি বা লেখককে বেছে নিয়ে তাঁদের বই প্রকাশনা, লেখালেখিতে প্ররোচনা দিয়ে এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন, যা এর আগে বা পরে এদেশে কেউ করেছে বলে আমাদের জানা নাই। নিজের সময়, স্বোপার্জিত অর্থ, নিষ্ঠা ও অভিনিবেশ সবÑসবকিছু বিলিয়েছেন প্রায় উন্মাদের মতো। …তিনি তিনটি সাহিত্য পত্রিকা রূপম, কিছুধ্বনি ও সাহিত্য সাময়িকী কখনও নিয়মিত বা কখনও অনিয়মিতভাবে প্রকাশ করে গেছেন দীর্ঘকাল। স্থায়িত্বের দিক থেকে এসব পত্রিকার প্রকাশনা এমন দীর্ঘস্থায়ী ছিল যে যার তুলনা হয় না। ওপার বাংলা ও বাংলাদেশের খ্যাত, অখ্যাত, নবীন, প্রবীণ, তরুণ, অতিতরুণ, প্রতিশ্রুতিশীল প্রায় অনেক লেখক ও কবিকে বাধ্য করেছিলেন লিখতেÑএ পত্রিকায়।’ বজলুল করিম বাহারের লেখাটি পাঠ করার পর বিরলপ্রজ এই মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আছে। সাহিত্যের নিবেদিতপ্রাণ এমন একজন কর্মীকে আর কি আমরা কখনও পাব ?

‘আনওয়ার আহমদ : আত্মনৈবেশিক কবিসত্তা’ শিরোনামে শোয়েব শাহরিয়ার লিখেছেন : ‘পাগল হাওয়ার বিষম তোড়ে মস্তিষ্কের  কোষে যে ক্রোধের জন্ম হয়, সে ক্রোধের নাম আন্ওয়ার আহমদ। সৌকর্যকুশল পুষ্পকে দলিত-মথিত করার পর আবারও পুষ্প-আদলে প্রত্যাবর্তনের নাম আন্ওয়ার আহমদ। তথকথিত ট্র্যাডিশনের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে মুক্ত আকাশে উড়াল দেবার জন্য জন্মেছিলেন আন্ওয়ার আহমদ। আন্ওয়ার আহমদকে গুনতে হলে, চিনতে হলে প্রচলিত দাঁড়িপাল্লা হাতে দাঁড়ানো যাবে না। এক কথায় আন্ওয়ার আহমদ উড়নচণ্ডী, বিরুদ্ধ-স্রোতী, জাত বোহেমিয়ান। …সাহিত্যের প্রতি অকুণ্ঠ, নিঃস্বার্থ, অবারিত ভালোবাসা না থাকলে কারও পক্ষে সাহিত্য সম্পাদক হওয়া অসম্ভব। অর্থের অনটন, মানসম্পন্ন লেখার দুষ্প্রাপ্যতা, পৃষ্ঠপোষকতার নিদারুণ অভাব ইত্যাকার নানাবিধ জটিলতা কীভাবে একজন প্রতিশ্রুতিশীল সম্পাদককে পীড়ন করে তা কেউ বোঝে না। এই পীড়ন সীমাহীন হয়ে পড়লে কবি-সম্পাদকদের বেদনানিঃসৃত কান্না কী রঙ ধারণ করে আন্ওয়ার আহমদের “আত্মজ তিন লাশ” কবিতা তার প্রমাণ : আমার কাঁধের ’পর তিনটি লাশ দুঃসহ ভারী/ তিনটি বছর একা একা আমিই বাহক…/আমার সঙ্গে লাশ, লাশের সঙ্গে আমি একাকার।/…আজ একযোগে সেবার অভাবে মরে গেছে তারা/লাশের বাহক আমি, আমিই শরীক তার…/তবু বলিনি, রূপম, কিছুধ্বনি, সাহিত্য সাময়িকীর/লাশের কাহিনি/আমি ছাড়া তিন লাশ সমাহিত হবে না কিছুতে।

একজন সম্পাদক তিনটি সাহিত্য-পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন দীর্ঘকাল এ-উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে বিরল।’

জাকির তালুকদার ‘আন্ওয়ার আহমদÑআপাদমস্তক কবি’ শিরোনামে লিখেছেনÑ‘তিনি সম্পাদনা করেছেন রূপম, কিছুধ্বনি, ‘সাহিত্য সাময়িকী’, মিউজ। অনেক পত্রিকার প্রথম দিকের সংখ্যা দেখে মনে হয় একটি উদ্দেশ্যবিহীন অগোছালো কাগজ। পয়সা-পরিশ্রম এবং সময় ব্যয় করে এমন পত্রিকা করতে দেখলে আমার কিঞ্চিৎ বিরক্তির উদ্রেক হয়। কারণ প্রতিশ্রুতিশীল সাহিত্যকর্মীর এমন পণ্ডশ্রম আমার কাছে নেহায়েত অপচয় মনে হয়। মনে হয় অসংখ্য পত্রিকার পাশাপাশি এটি করার কোনো কারণই নেই। …অথচ আন্ওয়ার আহমদের বিভিন্নধর্মী এই পত্রিকাগুলির মধ্যে কখনওই কোনো অগোছালোতার ছাপ দেখা যায়নি। তিনি পত্রিকায় লেখক-স্বল্পতায় ভোগেননি কখনও। প্রতিষ্ঠিত লেখকরা তো বটেই, তরুণতম লেখকও তার পত্রিকার জন্য নিবেদন করেছেন নিজের শ্রেষ্ঠতম রচনাটি। কারণ সম্পাদকের বুকে সবার জন্য ছিল ভালোবাসা।’ আন্ওয়ার আহমদ বুকে তরুণদের জন্য যে অপরিসীম স্নেহ-মমতা লালন করতেন তাঁর সাথে যারা কাজ করেছেন বা কাছে থেকে তাঁকে যারা দেখেছেন তারা ভালো জানেন।

‘আছো তুমি গোপন হয়ে ফরটিডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে’ শিরোনামে শিবলী মোকতাদির লিখেছেনÑ‘ছোটকাগজ সম্পাদক কেমন হয়? তার জ¦লন্ত উদাহরণ আমাদের আন্ওয়ার ভাই। ব্যক্তিগত জীবনে প্রভূত দুঃখ থেকেই জন্ম নেওয়া অগাধ দরদ দিয়েই বুকের দুপাশে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন তার দুটি পত্রিকাকে। একহাতে দেখভাল করতেন, যত্ন নিতেন, ঠিক যেন দুহাতে দুটি সন্তানের হাত ধরে সারাদিন এপথে-ওপথে ঘুরে, ক্লান্ত কোনো ফেরিওয়ালা; রাত নেমে এলে বিছানাতে আদর আর আপ্যায়নে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়াতেন তাদের। মাঝে সম্পাদক, এ-পাশে কিছুধ্বনি ও-পাশে রূপম।’ শিবলী মোকতাদির সরল বয়ানে এভাবে তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন।

আমেদ জুয়েল ‘পকেটের কষ্টই ছিল তার মৃত্যুর দূত!’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘এক ধরনের হতাশা কিংবা চাপা উত্তেজনায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা না বলে থাকতে দেখেছি তাকে। মাঝে মাঝে তার কথাবার্তা আর ভাব প্রকাশের ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে, ‘সব শালা বেঈমান’। এই যে কষ্ট, হতাশা আর নিজেকে ব্যর্থ ভেবে নেয়ার গ্লানিÑবয়স্ক মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে তা মোটামুটি সবারই জানা। তখন বয়স কম ছিল বলে এসবের গুরুত্ব বুঝিনি। এখন বুঝি সেই সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন একা একজন মানুষ নিজের জীবনের কতটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি পার করছিলেন। …তার বাড়িটা আমি বেচে দিতে পারিনি বা বেচতে সহায়তা করতে পারিনি। মৃত্যুর আগে বাধ্য হয়ে তিনি নিজেই সে কাজ করেন। এরপর বাড়ি বিক্রির টাকা ব্যাংকে রাখেন বাকী জীবনের জন্য। কিন্তু হায়! দ্বিতীয়বার তিনি আর ব্যাংকে যেতে পারেননি।’ তিনি এমনই একজন ছোটকাগজ সম্পাদক ছিলেন, পত্রিকার জন্য নিজের বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে দ্বিধা করেননি।

এমরান কবির ‘আন্ওয়ার আহমদ : শিল্পী-জীবনের উদাহরণ’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘আন্ওয়ার আহমদ-এর এক-জীবনের সাধনা সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর পুত্র নাজিম আন্ওয়ার রূপমের ভেতরও। রূপম কবিপুত্র। রূপম একটি গল্পের কাগজ। সুদীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে যে-কাগজটি বের হয়েছে। …তাঁর ১৫টি কাব্যগ্রন্থ। রিলকের গোলাপ প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। উল্লেখযোগ্য অন্যান্য গ্রন্থÑ মানসম্মত বিরোধ, নির্মাণে আছি, হঠাৎ চলে যাবো, নীল কষ্টের ডাক, অঙ্গ তোমার কাব্য করে উনষাটের পদাবলী, ষাটের প্রান্ত ছুঁয়ে, উড়ো খই গোবিন্দ নমঃ। চারটি গল্পগ্রন্থÑসতর্ক প্রহরা, অন্ধকারের সীমানা, অন্ধ অন্ধকার, আন্ওয়ার আহমদের গল্প।’ এসবই তিনি রেখে গেছেন।

‘বিকেলের শেষ আলোয় একটি দীর্ঘ ছায়া’ শিরোনামে ইন্দ্রজিৎ সরকার লিখেছেন : ‘একজন মানুষ সাহিত্যের জন্য কতটা নিবেদিতপ্রাণ হলে স্বজন-সংসার ছেড়ে জীবনের সবটুকু আয় দিয়ে শুধু সাহিত্য পত্রিকা-লিটলম্যাগ বের করতে পারেন ? তাঁর জীবনের ব্রতই ছিল বিভিন্ন এলাকার তরুণ কবি-লেখকদের খুঁজে বের করা। তাদের লিখতে উৎসাহ দেওয়া। আনাড়ি হাতের লেখাগুলো ঘষামাজা করে পত্রিকায় ছাপানো। যাদের লেখা একটু ভালো মনে হতো, তাদের লেখা নিজ গরজে ও নিজ খরচে জাতীয় পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে পাঠাতেন, ছাপার ব্যবস্থা করতেন। শুধু কি তাই? অসচ্ছল লেখকদের নানাভাবে সহায়তা করতেন তিনি। বহুল ব্যবহৃত পন্থাটি ছিল, তার লিটলম্যাগে লেখার জন্য সম্মানি দেওয়া।’ তরুণদের প্রতি তার অপরিসীম ভালোবাসাই একজন বড় মাপের সম্পাদকের আসনে তাঁকে অধিষ্ঠিত করেছে। 

প্রান্তিক অরণ্য ‘আন্ওয়ার আহমদ : এক অনিকেত মেঘের সারথি’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘সাহিত্যের পথে নিজেকে আরও উচ্চকিত করতে, সাহিত্যকে ভালোবাসতে যে মানুষটি শিখিয়েছেন আমাকে তিনি কবি, সম্পাদক, গল্পকার আন্ওয়ার আহমদ।’ …আন্ওয়ার আহমদের জীবদ্দশায় যথাক্রমে জলছাপ ও সুবিল নামে দুটি পত্রিকা তাকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ‘আন্ওয়ার আহমদ সংখ্যা’ প্রকাশ করে। …আন্ওয়ার আহমদ’র রূপম আর কিছুধ্বনি অনেককে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। যেমনÑ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, আহমদ ছফা, শামসুর রাহমান, সিকদার আমিনুল হক ইত্যাদি। আন্ওয়ার আহমদ এর মতো দরদি সম্পাদক আজ আর কোথায়? প্রান্তিক অরণ্যের সাথে আমিও সহমত পোষণ করি, এ ধরনের সম্পাদক আর জন্মগ্রহণ করবে না।

অরিন্দম মাহমুদ তার ‘একদিন পালকিতে চড়ে বর সেজে এসেছিলেন আন্ওয়ার আহমদ’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘আমি আন্ওয়ার আহমদকে দাদু বলে সম্বোধন করতাম। দাদু বলে ডাকায় একদিন আমায় বল্লেন ‘বুড়ো হইনি তো শুধু দু-একটা চুল পেকেছে মাত্র, ঠিক আছে তোমার যখন এতোই ইচ্ছে তাহলে দাদু বলেই ডেকো।’ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে তিনি ভীষণ জেদি ছিলেন, আন্ওয়ার আহমদকে বাহির থেকে খুব রাগী মনে হলেও ভেতরটা ছিল তার আবেগময় অতি নরম স্বভাবের। আন্ওয়ার আহমদ গল্প, কবিতা ও সম্পাদনার মাঝেই খুঁজেছেন সৃষ্টি সুখের নিরন্তর পথ, তরুণ প্রজন্মকে তিনি নিজের কাছে টেনেছেন সবসময়। তাঁর হাত দিয়ে তৈরি হয়েছিল অগুণতি তরুণ কবি ও সম্পাদক। শূন্য দশকের অনেক কবি ও সম্পাদকের দিকে তাকালেই খুঁজে পাওয়া যাবে আন্ওয়ার আহমদকে, আমি এবং আমার পালকি তার ব্যাতিক্রম নই। পালকি সম্পাদকের লেখক নাম ও তার পত্রিকার পালকি নামটি তিনিই ঠিক করে দিয়েছিলেন। 

এ সংখ্যায় একমাত্র প্রবন্ধ লিখেছেন নজমুল হক খান। তার প্রবন্ধের শিরেনামÑ‘রবীন্দ্র সংগীতের ধারা’। সংগীতের ক্লাসিক্যাল ধারা, লাইট মিউজিক ধারা ও ফোক ধারা নিয়ে একটি সুখপাঠ্য প্রবন্ধ পাঠককে মুগ্ধ করবে।

এ সংখ্যায় গল্প লিখেছেন, মিলা মাহফুজা, অরণ্য প্রভা, লতিফ জোয়ার্দার, পিন্টু রহমান, আব্দুর রাজজাক বকুল ও আশরাফুল নয়ন।

এ সংখ্যায় কবিতা লিখেছেন, আমিনুল ইসলাম, সুজন হাজারী, আনোয়ার কামাল, সরকার আজিজ, বাদল মেহেদী, চন্দনকৃষ্ণ পাল, মাসুদ মুস্তাফিজ, রহমান হেনরী, বীরেন মুখার্জী, জাকির জাফরান, আশিক আকবর, অতনু তিয়াস, কামাল আহসান, মাহমুদ সীমান্ত, অনন্ত সুজন, রুদ্রাক্ষ রায়হান, অনিন্দ্য আকাশ, তিথি আফরোজ, ইউসুফ তাপস, রবু শেঠ, মারিয়া আজাদ, অনিন্দ্য তুহিন, অথির চক্রবর্তী, অদ্বৈত মারুত, সিকতা কাজল, কামরুন নাহার কুহেলী, রনি বর্মণ, আসিফ ইলাহী ও অরিন্দম মাহমুদ।

অরিন্দম মাহমুদ সম্পাদিত আন্ওয়ার আহমদ সংখ্যাটি অনন্য উচ্চতার একটি সম্পাদনা। পাঠক কবি, গল্পকার, সম্পাদক আন্ওয়ার আহমদকে এক মলাটে জানবার দারুণ এক সুযোগ পাবেন। আন্ওয়ার আহমেদকে তার সমবয়সী বা তরুণ যারা তাঁকে কাছে থেকে দেখেছেন, বুঝেছেন তারাই বিস্তৃত পরিসরে লিখেছেন এই অকৃপণ সাহিত্য-দরদি উদার লিটলম্যাগ সম্পাদককে। আমাদের ভেতর থেকে অগ্রজদের স্মরণীয় করে রাখার বা স্মরণ করার রেওয়াজ বোধ হয় দিন দিন কমে যাচ্ছে। সেদিক থেকে পালকি সম্পাদক অরিন্দম মাহমুদকে সাধুবাদ জানাতেই হবে। সেই সাথে আন্ওয়ার আহমদকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে মনে পড়ছে। তাঁর কীর্তনীয় কর্মকাণ্ড আমাদের মাঝে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে।

জীবনানন্দ

জীবনানন্দ-চর্চার কাগজ জীবনানন্দ। বইমেলা ২০২০-এ ৩য় সংখ্যা হিসেবে বেরিয়েছে। মোটে তিনটি সংখ্যা বেরুলেও জীবনানন্দ অনুরাগীদের নজর কেড়েছে, এটা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়। এদেশে তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে প্রবীণ লেখক-পাঠকের পছন্দের তালিকায় তাকে বাদ দেওয়ার মতো সময় আসে তো না-ই বরঞ্চ দিনের পর দিন তাঁকে জানবার আগ্রহ মানুষের ভেতর দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হচ্ছে। জীবনানন্দকে নিয়ে এপার বাংলা ওপার বাংলা দু’পারেই তুমুল জনপ্রিয়তায় তিনি শীর্ষে নিজের অবস্থানকে ধরে রেখেছেন।

সুরজিৎ দাশগুপ্তের একটি অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকারÑ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতা সিনেমার ট্রেলারের মতো তির্যক’ শিরোনামে। এখানে আমরা জানতে পারি সুরজিৎ দাশগুপ্তের সাথে জীবনানন্দের খুব নৈকট্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। দুজনের মধ্যে চিঠি আদান-প্রদান হতো। এখানে মাসউদ আহমাদের কাছে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘অনেকেই বলেন যে উনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন ট্রামের সামনে পড়ে। আমি কিন্তু একেবারেই সেটা মনে করি না। আমি মনে করি, ওটা একটা দুর্ঘটনা এবং তার আগে তিনি জেনে গেছেন, উনি একটা বড় পুরস্কার পেতে চলেছেন। তাঁর “মহাপৃথিবী” বলে একটা কবিতা আছে। ওটা বোধ হয় ওঁর শেষ লেখা কবিতা। সেই কবিতায় তিনি একটা নতুন বাঁক নিচ্ছেন। একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। কেন তিনি আত্মহত্যা করবেন ? পরে কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের সঙ্গে আমার এ নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিল। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গেও কথা হয়েছিল।’ …তিনি এই সাক্ষাৎকারে আরও বলেন, ‘তাঁর কবিতা সিনেমার ট্রেলারে যেমন চুম্বক জায়গাগুলো পর্দায় ফেলে দর্শকদের দেখানো হয়; তাঁর কবিতাতেও তেমন একটা ব্যাপার আছে।’ …‘জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথের পর সবচেয়ে বড় কবি। নজরুলের চাইতেও বড় কবি। নজরুলের প্রভাব জীবনানন্দের ঝরা পালক-এ ছিল; কিন্তু পরে তা উতরে গেছেন এবং এখন জীবনানন্দই সবচেয়ে বড় কবি।’ এ সাক্ষাৎকারটি পাঠ করলে পাঠক জীবনানন্দ সম্বন্ধে ভালো একটি ধারণা পেতে পারেন। সুখপাঠ্য সাক্ষাৎকারটি আমাকে প্রাণিত করেছে।

গৌতম মিত্র এখানে সাক্ষাৎকারে সম্পাদক মাসউদ আহমাদকে জানিয়েছেন, ‘জীবনানন্দকে যে বলা হয়, বিপন্ন বিস্ময়ের কবি, এটা প্রমাণ করতে গেলে নানাভাবে তাঁকে বুঝতে হবে। এটা কেবল তাঁর “আট বছর আগের একদিন” কবিতায় আছে, তা কিন্তু নয়। তাঁর অসংখ্য কবিতায়, এমনকি তাঁর গল্প-উপন্যাস ও ডায়েরিতে এটা ছড়িয়ে আছে। মোটকথা, জীবনানন্দের মানসরাজ্যে এই বিপন্ন বিস্ময় ব্যাপারটা ছড়িয়ে আছে। এখন এটাকেই আমি খোঁজার চেষ্টা করছি। …জীবনানন্দ বেঁচে থাকতে ১৬২টি কবিতা, তাঁর ৫টি বইতে। এর বাইরে আর তো কিছু নেই। এখন তো তার তিন হাজার কবিতা আমরা পাই। এটাকে ১৬২টি কবিতার পাশে রাখলে কোনো পার্সেন্টেজের মধ্যেই আসে না। …জীবনানন্দ যা কিছুই লিখেছেন বা লেখার চেষ্টা করেছেন, তিনি কোথাও একটি কমতি যদি থাকেন, খুব সচেতনভাবে এবং দায়িত্ব নিয়ে দিয়েছেন। জীবনানন্দ কোনো এলেবেলে লোক ছিলেন না। …জীবনানন্দ’র অপ্রকাশিত লেখা নিয়ে অনেকে অনেক রকম কথা বলেছেন; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, এগুলো ছাপানোর দরকার নেই। অশোক মিত্র বলেছেন, এগুলো জঞ্জাল। কিন্তু আমি বলি যে, জীবনানন্দ দাশ লোকটা জঞ্জাল বহন করবার লোক নন। মাসউদ আহমাদকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গৌতম মিত্র এভাবেই বলেছেন।’

এছাড়াও কবি কায়সুল হকের একটি পুরানো সাক্ষাৎকার এবং কায়সুল হককে লেখা জীবনানন্দের পাঁচটি চিঠি এখানে পত্রস্থ হয়েছে। জীবনানন্দ সম্বন্ধে তিনি বলেন, ‘যদি জীবনানন্দের সমস্ত স্মৃতিকথা সংগ্রহ করেন, তাহলে পারে খুব কাজের হয়। সত্যিকার অর্থে তিনি মাটির মানুষ। মাটি দিয়েই যেন তৈরি জীবনানন্দ দাশ। এমন মানুষ হয় না। অন্যের প্রতি যে তাঁর ঘৃণা বা ক্রোধ, আমি দেখিনি। আর কবি হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ। তাঁর কথা ভোলা অত সহজ নয়।’

সনৎকুমার সাহা ‘রূপসী বাংলা : মননের দ্বিধা’ শিরোনাম প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘রূপসী বাংলা তাঁর জীবদ্দশায় (১৮৯৯-১৯৫৪) আলোর মুখ দেখে না,Ñযদিও তা সবটাই ছিল সুসম্পূর্ণ ও প্রকাশযোগ্য (১৯৩৪) Ñতাঁর মৃত্যুর বিশ বছর আগেই। কিন্তু এর অস্তিত্ব তিনি কাউকে জানতে দেননি। গোপন ভালোবাসার মতো আগলে রেখেছেন, তা-ও কিন্তু মনে হয়নি। হঠাৎ করে, আক্ষরিক অর্থেই, ‘পরীর দেশের বদ্ধ দুয়ার’ খুলে যায় তাঁর মৃত্যুর পর। তার কাহিনি অপ্রত্যাশিতের মুখোমুখি হওয়ার রোমাঞ্চ জাগায়। যাঁর কাঠির ছোঁয়ায় ওই ‘দুয়ার’ খোলে, তাঁর নাম ভূমেন্দ্র গুহ। জীবনানন্দের সাথে সাক্ষাৎ-পরিচয় তাঁর ১৯৫২ সালে।’

ঋতম্ মুখোপাধ্যায় : ‘মাল্যবান উপন্যাসের নাট্যরূপ ও মঞ্চায়ন’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘কথাসাহিত্যিক জীবনানন্দের সর্বাধিক আলোচিত এবং বহুল পঠিত উপন্যাস মাল্যবান (১৯৪৮) তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে পাঠকের হাতে পৌঁছয়। চেতনাপ্রবাহ, মনস্তাত্ত্বিক নাকি যৌন অতৃপ্তি আর নষ্ট দাম্পত্যের আখ্যান, কোন অভিধায় একে অভিহিত করব? এই নিয়ে নানা আলোচনা চললেও, শেষাবধি দাম্পত্যের নির্মম ব্যর্থ রূপ এবং জীবনানন্দ-লাবণ্যের ব্যক্তিগত জীবনের ছায়া নিয়ে এই উপন্যাস বাংলা কথাসাহিত্যে নিজস্ব মূল্য নিয়ে বিদ্যমান।’ …মাল্যবান প্রসঙ্গে সুমিতা চক্রবর্তী কথিত ‘যৌনাকাক্সক্ষা এবং তজ্জানত তৃপ্তি ও অতৃপ্তির বোধই উপন্যাসটির অন্যতম বিষয়বস্তুÑ’ এই অভিমত-কে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি নাট্যকার। বরং বাস্তব আর পরাবাস্তবে মেশা জীবনানন্দের যে বোধের জগৎ, সেখানে মাল্যবান কবির আরেক সত্তা হয়ে ওঠে যেন। …তাই অন্তর্গত দহনের নির্মম ক্ষতচিহ্ন শরীরে নিয়ে মাল্যবান একটি মঞ্চসফল কাব্যগুণান্বিত নাটক হলেও সার্থক কাব্যনাট্য হয়ে ওঠে না।’

ফারুক সুমন : ‘ কবিতায় সমর্পিত মহৎ কবি’ শিরোনামে এবং শামস্ আল্দীন :‘ জীবনানন্দ দাশের গল্প : প্রণয়হীনতা’ শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ লিখেছেন। যা পাঠে পাঠক কিঞ্চিৎ হলেও জীবনানন্দীয় আবহে বিমোহিত হবেন। ধন্যবাদ প্রাবন্ধিকদের।

আমার জীবনানন্দ বিভাগে হরিশংকর জলদাসÑ‘কবিরা কখনও সম্পূর্ণ আবিষ্কৃত হন না’ শিরোনামে এবং প্রশান্ত মৃধাÑ‘বন্ধুর জীবনানন্দ’, ‘বন্ধু জীবনানন্দ’ শিরোনামে দুটি নিবন্ধ লিখেছেন।

জীবনানন্দকে নিয়ে গল্প লিখেছেনÑহাসান অরিন্দম, মনি হায়দার, শামস সাইদ, রবিন জামান খান, নূৎফা নিরু, মুহিম মনির ও মফিজুল হক।

এ সংখ্যায় জীবনানন্দ দাশকে নিবেদিত কবিতা লিখেছেনÑসৈয়দ তারিক, আনিসুল হক, ফজল সন্নাসী, মারজুক রাসেল, শাহাবুদ্দীন নাগরী, পিয়াস মজিদ, মুম রহমান, স. ম. শামসুল আলম, দুলাল সরকার, হানযালা হান, তৌফিক গহুর, ফারহানা রহমান, শামীম মেহেদী, বিপুল অধিকারী, শাকিল মাহমুদ, সৌম্য সালেক, কিং সউদ, দিপংকর মারডুক, শুভঙ্কর নূতন, অমিত সিনহা, নূৎফা নিরু, রেহেনা মাহমুদ, মিরাজুল আলম, আনিসুর রহমান, মাহফুজ রিপন, উমা মাহাতো, গাফফার মাহমুদ, বিটুল দেব, আইভি হোসেন, সাজ্জাদ হোসাইন সামিন, সৌহার্দ সিরাজ, সুজাউদ্দৌলা, শামীম আল মাহমুদ, অরণ্য আপন, রিয়েল আবদুল্লাহ, রেহানা জামান, পূর্ণপ্রভা ঘোষ ও প্রত্যয়ী দত্ত।

বইয়ের গল্প বিভাগে মনসিজ মজুমদার ‘ইংরেজিতে জীবনানন্দ’ শিরোনামে লিখেছেন। সুরঞ্জন প্রামাণিক তার সোনালি ডানার চিল লেখার নেপথ্যগল্প নিয়ে লিখেছেন। শাহাদুজ্জামান লিখেছেনÑ যেভাবে লেখা হলো একজন কমলালেবু। বই এর গল্প বিভাগের তিনটি লেখাই অনেক ঋদ্ধ। পাঠককে নানান তথ্যে চমকিত করবে এ লেখা তিনটি। সেই সাথে পাঠকদের কাছে জীবনানন্দকে ব্যাপক বিস্তৃতভাবে জানবার এক সুযোগ উন্মোচিত হবে। 

মুক্তগদ্য

মুক্তগদ্যে মূলত আমরা পরস্পরের কাছে ভাষার লালিত রূপ শিখি। আর এই কাগজে প্রকাশিত মুক্তগদ্যগুলোর প্রথাগত ক্রমবিন্যাস নেই। এইসব প্রকৃত অর্থে বাগান নয়Ñঅরণ্যের বিন্যাস। ফলত বড়ো লেখক, ছোট লেখক, নবীন লেখক, প্রবীণ লেখক, কিংবা কাঁচা লেখক, পাকা লেখক এই বিবেচনায় বিন্যস্ত নয়। ক্রিয়াপদের সুষম ব্যবহার বা একাডেমির নিয়মে বানানও আমরা মেনে চলি না। একথাগুলো ‘মুক্তগদ্যে’র সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে। তাহলে বিষয়টা এমনই দাঁড়াচ্ছে যে, ছোটকাগজ হিসেবে মুক্তগদ্য, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যে ছোটকাগজের প্রথার বিরুদ্ধে, স্রোতের প্রতিকূলে দাঁড়টানা মাঝির ভূমিকায় রয়েছে। আর এর হাল ধরে রেখেছেন কবি, গদ্যকার, চিত্রশিল্পী নির্ঝর নৈঃশব্দ্য আর একঝাঁক মুক্তচিন্তার তরুণপ্রাণ যুবক।

এবারের বই মেলায় বেরুনো মুক্তগদ্য ১০ম সংখ্যাটি পাঠ করে নিজের ভেতরে তার চারিত্র্যিক কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে লিখবার তাড়না দিয়েছে। সেই ভেতরের তাগিদ বা তাড়না থেকেই কিঞ্চিৎ আলোকপাত করবার প্রয়াস।

ছোটকাগজ মুক্তগদ্য মূলত গদ্যের কাগজ। গদ্য বিষয়ক লেখা দিয়ে সাজানো হয়েছে এর আশিটি পৃষ্ঠা। প্রতিটি পৃষ্ঠায় ঠাসা রয়েছে তরুণ-নবীনদের অবাধে গদ্যময় ৬৩ জনের তরতাজা মূল্যবান স্বাধীন মতামত। এ যেন বাঁধভাঙা একদল তরুণের উদ্দম স্পর্ধা নিয়ে জ¦ালাময়ী গদ্যের পদাবলি। এ কারণেই গদ্যকে পদাবলির সাথে তুলনা করলাম, গদ্যগুলো পাঠ করলে আপনার কাছে মনে হবেÑ এযেন গদ্য নয় আপনি কবিতার ভুবনে বিচরণ করছেন।

এ সংখ্যার গদ্যকাররা হলেন, আনন্দময়ী মজুমদার, হাসান মাহবুব, দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম, গোলাম কিবরিয়া, জারিফ এ আলম, মুক্তি মণ্ডল, নাফিদা নওরীন, তাইফ আদনান, জিললুর রহমান, নীল কথন, আতিক ফারুক, বাবুল হোসেইন, নন্দিতা বৈষ্ণব, হাছিব সাইফ, ওমর ফারুক জীবন, মিলটন রহমান, রওশন ঋমু, মলয় দত্ত, মোশতাক আহমদ, শামীম আজাদ, ফারাহ সাঈদ, ইমরান আসিফ, দেবাশীষ ধর, সকাল রয়, কৌস্তভ শ্রী, আহমাদ সাব্বির, অমিত চক্রবর্তী, সুকান্ত হৃদয়, অরণ্য শর্মা, এম মনজুর হোসেন চৌধুরী মানিক, সূর্যমুখী, ফেরদৌস নাহার, লুসিফার লায়লা, স্বাতী রিছিল, নীলাঞ্জনা অদিতি, রেজাউল করিম, সোহেল মাহমুদ, মাহফুজুর রহমান কনক, ফাতেমা ফেরদৌস নীপা, অরিত্র দে, হাবীব ইমন, ফকির ইলিয়াস, কাজী যুবাইর মাহমুদ, মাশরুর ইমতিয়াজ, জাহিদুর রহিম, সাজ্জাদ সাঈফ, লাবণ্য প্রভা, মো. মহসীন আলী, আসমা অধরা, নুরেন দুর্দানী, শে^তা শতাব্দী এষ, মাহমুদ মাসুম, মানিক বৈরাগী, মুজিব মেহেদী, নাসিরুদ্দিন শাহ, কৃষ্ণ জলেশ^র, তমাল রায়, নূর নাজমুল, ভাগ্যধন বড়ুয়া, ওয়াহিদ সুজন, মনজুরুল হক, শিমুল ভট্টাচার্য ও রিজওয়ানা তৃষা।

এই ৬৩ জনের মুক্তগদ্য এখানে স্থান পেয়েছে। কেউ লিখেছেন এক পৃষ্ঠা, কেউবা অর্ধ পৃষ্ঠা, আবার কেউবা দেড় পৃষ্ঠা জুড়ে। তবে দুপৃষ্ঠা জুড়ে লিখেছেন এদের সংখ্যা কম। অনেক সমৃদ্ধ লেখা এখানে স্থান পেয়েছে। 

বিষয়বস্তু ছিল মৃত্যুভাবনা। প্রথম লেখাটি আনন্দময়ী মজুমদার ‘নীড়ের পাখি’ শিরোনামে লিখেছেন ‘তোমার কাছে আসব বলে প্রস্তুত হলেও, সমুদ্রক্রান্তা আমরা হই হিমবাহ থেকে চৌচির হতে হতে মোহনার জালে, রোদের চুমুক আমাদের পান করে তথাপি।’ বাহ্!  কি দারুণ অনুভূতি।

দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম ‘তাকে বলি শীতকাল’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘আমাদের মক্তব যাওয়ার ভোরের পথে যে শীতকাল ছড়িয়ে পড়ত তার স্মৃতি নিয়ে একদিন বসতে হবে কে জানত, যেরকম গায়ে কাঁপুনি দেওয়া রাত্রি জাগরণের মতো পুরোনো দিন কেবলই জলের অক্ষরে লেখা শুধু। একদিন ঘুম ভেঙে তুমি শুনো পথ বদলে গেছে, চেনা গন্তেব্যের চূড়ায় ঝুলে আছে কোনো অভাগিনীর লম্বাটে দেহ। …স্মৃতি সতত এক তর্পণের মতো শরীর গন্ধের সঙ্গে মিশে যায়, রক্তের অক্ষরে বাজতে থাকে প্রিয় সব নাম, নাম না জানা মুখ। শ্মশানের দিকে যুক্ত হতে থাকে তোমার নিবিড় বন্ধন, এইসব স্মৃতির সুতো ধরে, শীতের স্পর্শ ঘোরে।’ শীতকালে একটি অত্মহত্যাকে বর্ণনার ঘনঘটায় এভাবেই মূর্ত করেছেন দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম। অসাধারণ ব্যঞ্জনাময় আবেদন রয়েছে এ লেখার পরতে পরতে।

ভাগ্যধন বড়ুয়া লিখেছেন : ‘মৃত্যু এক আঁধারের পাতিল’ শিরোনামে ‘মৃত্যু একটা আঁধারের পাতিল; আঁধার জমায়! সবই ঠিক থাকবে! হঠাৎ সবাই জানবে সেই সংবাদ; হায় হায় অনুভবে দীর্ঘশ^াস বের হবে শূন্যতায়। তারপর দীর্ঘ নীরবতায় দৈনিক দুঃখ-সুখের ভিড়ে সরে যায় ছবি। তখনো জোয়ারের টান, কোকিলের গান, মুকুলের ঘ্রাণ, ঝরনার কলতান কিংবা অমাবস্যার অন্ধমায়া গতিধারায় বহমান। কার কী যায় আসেÑকে আছে কে নেই, আছি জেনে নেয় কুশল, চোখের আড়াল হলে আঁধারে হারায় চেনা অবয়ব!’

মুজিব মেহেদী তার ‘এতখানি জীবন পেয়েছি আমি মৃত্যু ভালোবেসে’ শিরোনামের লেখায় লিখেছেন : ‘মরে যাওয়ার আগে মৃত্যুকে ছুঁয়ে দিতে পারা এক দারুণ ব্যাপার, এর মানে হলো, স্থায়ীভাবে বিলীন হওয়ার আগে মৃত্যুর শোবার ঘরে গোপনে রেকি করে আসা, বাজিয়ে দেখা ও শানিয়ে তোলা নিজ গমন প্রস্তুতি।

‘ডেথ : অ্যান ইন্টারপ্রিটেশন’ শিরোনামে হাবীব ইমন লিখেছেন : ‘বড় বিস্ময়করভাবে ছোট হয়ে যাচ্ছি। ছোট হয়ে যাচ্ছে আমার ভুবন। আমার পৃথিবী। একটু একটু করে ছোট হয়ে যাচ্ছে আমার হাত, আমার পায়ের পাতা, ছোট হয়ে যাচ্ছে যা কিছু আমার কাছের। আর যা কিছু আমার দূরের, ছোট হয়ে যাচ্ছে, আর অদ্ভুতভাবে আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে একটু করে আমার কল্পনা। কেনই-বা ছোট হয়ে যাচ্ছি আমি ?’ মৃত্যুভাবনা বিষয়ক অনিন্দ্য সুন্দর একটি লেখা পাঠে মুগ্ধ হলাম।

‘মৃত্যু পারাবত’ শিরোনামে শে^তা শতাব্দী এষ লিখেছেন : ‘মৃত্যুবিষয়ক কিছু আমি লিখি নাই কখনও। একটা মানুষ তার জানার আর উপলব্ধির বাইরে আর কীই-বা লিখতে পারে! তাই আমি আমার অতিকথনের একলা জগতে বরাবরই দেখি কিছু হলুদ রোদ জানালার ফাঁক গলে ঘরে আসে, এই হিমঘরে যেখানে শুধু বরফের ঋতুর ভেতর জীবনকে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো মনে হয়। …‘এইসব ভেবে না-ভেবে একটু ঘুমিয়ে নিই, যেহেতু ঘুম আমার কাছে অনেকটা রহস্যময় মৃত্যুর মতোই!

মৃত্যুর চেয়ে প্রিয় আর কিছুই চোখে পড়ে না।’ 

মৃত্যুর চেয়ে প্রিয় সত্য আর কিছু নেই। মৃত্যুর কোলে আমাদের সবাইকে ঢোলে পড়তে হবে। মৃত্যু নামক হেমলক পান করতেই হবে। তবে তার স্বাদ কেমন ? যদি পৃথিবীতে বেঁচে-বর্তে থাকার ভেতর যদি কেউ মারা গিয়ে আবার বেঁচে ওঠে, তবে তার মৃত্যুর অভিজ্ঞতা কেমন হতে পারে। এমনতরো মৃত্যুবিষয়ক নানামাত্রিক চিন্তার স্ফূরণ এখানে নানান বোধের মিশ্রণ হয়ে ধরা দিয়েছে, ভিন্নধারার মুক্তগদ্যর এই ছোটকাগজটিতে। এখানে একটিও বিজ্ঞাপন নেওয়া হয়নি। সম্পাদক নিজে কোনো লেখা দেননি এ সংখ্যায়। বিজ্ঞাপনবর্জিত কাগজটি জানান দিচ্ছে ছোটকাগজ’র মাহাত্ম্য। ঝকঝকে ছাপা এক রঙা নান্দনিক প্রচ্ছদের মুক্তগদ্য ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পাক আর ছড়িয়ে পড়ুক দেশময় এ প্রত্যাশা করছি।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares