শিক্ষকের দায় : রামেন্দু মজুমদার

প্রচ্ছদ রচনা : বাংলাদেশের শিক্ষক আনিসুজ্জামান

আজকের বাংলাদেশে যদি একজন সর্বজনমান্য বুদ্ধিজীবীর নাম করতে বলা হয়, তবে নিঃসন্দেহে যাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হবে- তিনি ড. আনিসুজ্জামান। তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক বা কৃতবিদ্য গবেষক নন, তাঁর শিক্ষাদানের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। আজীবন জ্ঞানের সাধনা করে তিনি যা অর্জন করেছেন, নিরন্তর তা সঞ্চারিত করে চলেছেন অন্যদের মাঝে। তাঁর জীবনাচরণ থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি, তাঁর লেখা পড়ে সমৃদ্ধ হই, সভা-সমিতিতে তাঁর কথা শুনে আমাদের চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত হয়। তিনি এমন একজন মানুষ যাঁর সান্নিধ্যে এলে পরিশীলিত না হয়ে উপায় নেই।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ হয়ে আজকের বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের সকল আন্দোলনে আমাদের আনিস স্যার যুক্ত থেকেছেন। শিক্ষক হিসেবে কেবল পাঠদানকেই তাঁর একমাত্র কর্তব্য বলে বিবেচনা করেননি। দেশ ও জাতির প্রতি বৃহত্তর দায় তিনি অনুভব করেছেন বলে যে-কোনো জাতীয় সংকটে তাঁর বিবেকী কণ্ঠস্বর শোনা যায়। এমনি করেই তিনি হয়ে উঠেছেন জাতির বিবেক।

কিছুদিন আগে স্যার গুরুতর অসুস্থতার জন্যে দেশে-বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সম্প্রতি সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। অসুস্থ হবার আগে তাঁকে বহুবার বলেছি, স্যার আপনি এত অনুষ্ঠানে যান কেন? তাঁর জবাব, লোকজন আমার নিষেধ শোনে না, আমিও জোরের সাথে কাউকে না বলতে পারি না। আমি তাঁকে বললাম, স্যার আমার পদ্ধতি অনুসরণ করুন। তারিখ বললে আমি বলি ঐ দিন আমি ঢাকা থাকব না। নিজেকে রক্ষা করার জন্যে এটুকু মিথ্যা বললে তেমন পাপ হবে না। তাঁর জবাব, সেটাও বলে দেখেছি। তখন তারা বলে আপনি কোন তারিখে পারবেন, সেটা বলুন। অর্থাৎ কোনোভাবেই স্যার অনুরোধ এড়াতে পারেন না।

আমরা যারা স্যারের শুভাকাক্সক্ষী, যারা চাই স্যার আরও দীর্ঘদিন সুস্থ দেহে বেঁচে থেকে আমাদের মাথার উপরে থাকুন, তারা কেন কোনো সাধারণ বইয়ের বা সিডির প্রকাশনা উৎসবে থাকতে স্যারকে অনুরোধ জানাব? আজকালকার ঢাকা শহরে এক ঘণ্টার একটা অনুষ্ঠানে যাতায়াতের জন্যে কমপক্ষে তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। আমাদের সময়ের মূল্য কম, কিন্তু ড. আনিসুজ্জামানের মতো মানুষের? আমি আশা করি, এ বিবেচনাবোধ সবার থাকবে।

আমি যখন স্যারের সব জায়গায় যাওয়া নিয়ে আমার স্ত্রীর কাছে বলি, তখন সে জবাব দেয়, তোমার মুখে এ সমালোচনা শোভা পায় না। তুমি নিজে কি পার এত অনুষ্ঠানে না গিয়ে? তখন অবশ্যি আমার আর বলার কিছু থাকে না। কিন্তু সত্যি সত্যি বলছি, এসব উদ্বোধন আর প্রধান আতিথ্যের চাপে আমি ক্লান্ত। আমি এ  জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো এড়িয়ে অর্থবোধক কোনো কাজ করতে চাই। আমি না গেলে অন্য দশজন মানুষ আছেন কাজটা করতে পারবেন। আমারও তো ৭৬ হয়ে গেছে। জীবন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এখন সময়টাকে হিসেব করে খরচ না করলে কি হয়? আমি এক অর্থে জ্ঞান-পাপী। বুঝি সবই, কিন্তু মেনে চলতে পারি না।

আনিস স্যার বলা আর লেখায় তুলনাহীন। অল্প কথায় তিনি কী সুন্দর করে আসল কথাটা বলেন। তাঁর লেখা মেদবর্জিত। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এ. অনার্সের ছাত্র, তখন বাংলা সাবসিডিয়ারির কয়েকটি ক্লাসে স্যারকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। শিক্ষক হিসেবেও তিনি অনুসরণীয়। তাঁর পড়াবার সুখ্যাতি আমার স্ত্রী এবং অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীর কাছে অনেক শুনেছি।

তিনটি গ্রন্থে আনিস স্যারের আত্মজীবনী বিধৃত হয়েছেÑ কাল নিরবধি, আমার একাত্তর ও বিপুলা পৃথিবী। গ্রন্থ তিনটিতে ব্যক্তির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তখনকার সময়, সমাজ ও রাজনীতি। কী নির্মোহভাবে তিনি বলে গেছেন সব ঘটনা। কোথাও নিজেকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা নেই। কিন্তু এমন সব উদ্যোগের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন যে, আপনা আপনিই তিনি বড় হয়ে দেখা দিয়েছেন আমাদের কাছে। তাঁর এ তিনটি স্মৃতিকথার একটা বিশেষ দিক হচ্ছে, অনেক নেপথ্য ঘটনা আমরা জানতে পারিÑ যা বেশিরভাগ সময়েই আমাদের কৌতূহল উদ্রেক করে। কারও ভূমিকার নিন্দা করতে হলেও তিনি এমন নির্মোহভাবে বর্ণনা করেন যে তা কখনও বৈরিতার পর্যায়ে পৌঁছায় না। অবাক লাগে, এতদিন আগের সব ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা এত নিখুঁতভাবে কী করে তিনি দিতে পারেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ঈর্ষণীয়। স্যারের গ্রন্থ তিনটি সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজের বিশ্বস্ত দলিল হয়ে থাকবে।

আনিস স্যার বিদেশে, বিশেষ করে ভারতের বিদ্বজ্জনমহলে খুবই সমাদৃত। তাঁর পাণ্ডিত্য ও চিন্তার মৌলিকত্বের জন্যে। বিদেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ সভা ও সেমিনারে তিনি হয় সভাপতিত্ব করেছেন বা মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। ভারতে তিনি লাভ করেছেন আনন্দপুরস্কার এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পদ্মভূষণ’Ñ যা বাংলাদেশের আর কেউ পাননি। নোয়াখালী গান্ধী আশ্রমের ঝর্ণাধারা চৌধুরী ‘পদ্মশ্রী’ পেয়েছেন। ভারত সরকারের এ সম্মাননায় বাংলাদেশ সম্মানিত হয়েছে।

আমাদের এখন দলমতনির্বিশেষে শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ এত কমে গেছেন যে, বাধ্য হয়ে আনিস স্যারের দ্বারস্থ হতে হয়। এ দেশের সকল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনে স্যার প্রথম সারিতে। বিবৃতি রচনায় তাঁর জুড়ি নেই। কম কথায় মূল বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন তিনি।

স্যার যেমন দেশ ও জাতিকে তাঁর প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে সেবা দিয়েছেন, জীবদ্দশায় তাঁর প্রাপ্তিও অনেক। আমাদের দেশে অন্যকোনো বুদ্ধিজীবী তাঁর মতো এত পদক, পুরস্কার, সম্মাননা ও স্বীকৃতি পাননি। দেশ-বিদেশের এসব সম্মাননা তাঁর প্রজ্ঞা ও উদার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরই স্বীকৃতি। অল্প কয়েকদিন পরই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সমাবর্তনে তাঁকে একটি সম্মানজনক পুরস্কার প্রদান করবে। এদিক থেকে স্যার খুব ভাগ্যবান।

আনিস স্যারের রসবোধ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। এবারে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সংগীত উৎসব উৎসর্গ করা হয়েছিল তাঁকে। সমাপনী দিনে তিনি বক্তৃতায় কৌতুক করে বললেন, তাঁর এক পরিচিতজন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, জীবিত লোককে এ ধরনের উৎসব উৎসর্গ করা যায় কিনা? স্যার জবাব দিয়েছিলেন, যায় তবে শর্ত থাকে যে, তাঁকে এক বছরের মধ্যে মৃত্যুবরণ করতে হবে। গতবছর একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, এ অনুষ্ঠানের জন্যে শ্রোতাদের কাছ থেকে কোনো প্রবেশমূল্য নেয়া হয় না। কিন্তু একটা অলিখিত প্রবেশমূল্য আছে। সেটা হচ্ছে, আপনাদেরকে আমাদের বক্তৃতা শুনতে হবে।

ড. আনিসুজ্জামান আমাদের বিরাট আশ্রয়। যে-কোনো সংকটে আমরা তাঁর দিকে চেয়ে থাকি আমাদের করণীয় জানবার জন্যে। আমরা চাই আরও অনেকদিন তিনি আমাদের মাঝে থেকে আমাদের পথ-নির্দেশ করুন। তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন কামনা করি।

 লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares