প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : পরিচয়-সূত্র : শওকত ওসমান

জাত-লেখক কোথায় পা ফেলে, এমন পরিবেশনের প্রতি আমার লোভ পেটুকের মতো। কল্যাণীয় হাসনাত আবদুল হাই আমাদের একজন বিশিষ্ট অনুজ-সতীর্থ। তাঁর কম লেখাই আমার নিকট অপরিচিত।

কিন্তু জাত-লেখক রূপে আমার আবিষ্কার তাঁর জনপ্রিয়তার বাহন উপন্যাসের সড়ক-পথে নয়। তিনি একজন জাত-যাযাবরও বটে। পৃথিবীর বহু জায়গায় তিনি ঘুরেছেন এবং আমাদেরও সঙ্গী করেছেন তাঁর ভ্রমণপঞ্জির বদৌলতে। সাফারি, ট্রাভেলগ প্রভৃতি তাঁর গ্রন্থরাজি বাংলা ভ্রমণ-সাহিত্যে এক নব-সংযোজন। এই পথে সৃষ্ট হয়ে যায় ব্যক্তিসত্তা এবং যুগপৎ সমাজ খননের প্রতি তাঁর সহজাত আকর্ষণ।

কিন্তু ম্যাজিসিয়ানের পিরহানের আস্তিনে আরও ভেল্কি লুকানো ছিল, তা একদম আমার অবগতির বাইরে। হাসনাত আবদুল হাইয়ের হাত থেকে, মানে আস্তিনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল জীবনী-উপন্যাস সুলতানসম্প্রতি প্রয়াত প্রসিদ্ধ চিত্রশিল্পী সুলতানকে নিয়ে। সাহিত্যের আর এক নীহারিকালোকে হাসনাত আবদুল হাই বিশিষ্ট উজ্জ্বল নক্ষত্র রূপে প্রতিভাত হলেন।

দুর্ভাগ্য আমাদের, মানুষে অর্থাৎ ব্যক্তি মানুষের প্রতি এদেশি আগ্রহ এখনও ঐতিহ্যে নয় আদৌ। অলৌকিকতার ঝলকই আমাদের বেশিরভাগ বুঁদ রাখে। অথচ, ইয়োরোপে তৈরি সামগ্রীর স্বাদ নিতে দেশি জিহ্বা কুকুরের লালাসিক্ত জিহ্বার প্রতিরূপ। সেদিক থেকে আমাদের বহু কালের জাড্য ঘোচাতে যেন বহুদিন পরে এগিয়ে এলেন এক লেখক।

পূূর্বে উল্লেখিত, হাসনাত আবদুল হাইয়ের কম লেখাই মদীয় অপঠিত।

প্রকাশ্যমান, না এখন প্রকাশিত, উপন্যাস মোরেলগঞ্জ সংবাদ পূর্বে সাপ্তাহিক ঈদসংখ্যা রোববার পত্রিকায় বেরিয়েছিল। তখনই এই গ্রন্থের পূর্ণবিকশিত রূপ দেখার আমি প্রত্যাশী ছিলাম। এতদিনে তা মিটল। প্রকাশককে এই জন্য অশেষ ধন্যবাদ দিতে হয়।

বক্ষ্যমাণ উপন্যাস মোরেলগঞ্জ সংবাদ আমাকে আকৃষ্ট করেছিল ইতিহাসের ভাঁজ-উন্মোচনের ঝলকের জন্য। ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নামের সঙ্গে মোরেলগঞ্জ নামের একটি উপকথা এদেশে প্রচলিত। হাসনাত আবদুল হাই ঐতিহাসিক সমান্তরালতার দিকে পাঠকের দৃষ্টি টেনে নিয়ে যান সহজে এবং কালের ফারাক কীভাবে প্রতিভাত হয়, তাও মুন্সিয়ানার সঙ্গে আঁকেন। নীলকুঠির এবং বর্তমান যুগে চিংড়ি ঘেরের সাদৃশ্য ও বিভেদ সমাজ-প্রেক্ষাপটে কী রূপ নিতে পারে, তাও ইশারা করতে ঔপন্যাসিক বিস্মৃত হননি।

মোরেলগঞ্জ সংবাদ সকল শ্রেণির পাঠকের জন্য এক নতুন সংবাদ বহনকারী, তা ঘোষণা করতে আমি আদৌ দ্বিধান্বিত নই। ‘মোরেলগঞ্জ’ বেশ কিছুটা Moral গঞ্জ (নৈতিকগঞ্জ) তাও বলা যায়।

প্রশাসনের উচ্চ শিখরে আসীন থেকেও হাসনাত আবদুল হাই সর্বত্র ঐশ্বর্যশালী নয়, ইয়োরোপের তুলনায়। বাংলা সাহিত্যের দারিদ্র্য ঘোচাতে বদ্ধপরিকর। সেদিক থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রয়াত রমেশ দত্ত (Economic History of British India খ্যাত) এবং অধুনা স্বশরীরে দীপ্যমান শ্রী অন্নদাশঙ্কর রায়ের ঐতিহ্য আরও শ্রীমণ্ডিত করলেন।

সাধন-সঙ্গীরূপে, আমি তাঁর নিরাপদ্দীর্ঘ জীবনের অন্যতম প্রার্থনাকারী, হাই পরিবারের অন্যান্য স্বজন সদস্যগণের সঙ্গে।

মোরেলগঞ্জ সংবাদ উপন্যাসের ভূমিকা, ২৭ জানুয়ারি ১৯৯৫।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares