প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : একজন লেখকের প্রতিকৃতি : নিত্যনতুনের অভিসারী হাসনাত আবদুল হাই : কবীর চৌধুরী

হাসনাত আবদুল হাই সম্পর্কে লিখতে বসে প্রথমে যা আমাকে চমৎকৃত করে তা হল তাঁর সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্য, ব্যাপকতা ও বহুমুখীনতা। তিনি ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, ভ্রমণকাহিনীর রচয়িতা, প্রাবন্ধিক এবং কবিও। আর এর প্রতিটি ক্ষেত্রে হাসনাত সচেতনভাবে চেষ্টা করেছেন গতানুগতিকতা পরিহার করতে। তীক্ষè কিন্তু স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাবলীল রচনাশৈলীর সাহায্যে তিনি পাঠকবর্গকে এমন কয়েকটি রচনা উপহার দিয়েছেন যা তাঁকে তাদের চিত্তে একটি সমাদৃত ও সম্মানিত আসনে অধিষ্ঠিত করেছে, নিজের জন্যও বয়ে এনেছে বিবিধ স্বীকৃতি ও সম্মাননা। ১৯৭৭ সালে তিনি ছোটগল্পের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন এবং সাহিত্যক্ষেত্রে সার্বিক অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে লাভ করেন ‘একুশে পদক’।

তবে হাসনাতের পাঠক সংখ্যা, আমি আশঙ্কা করি, আমাদের কতিপয় জনপ্রিয় সাহিত্যিকের পাঠক সংখ্যার সমতুল্য নয়। এর কারণ সহজবোধ্য। হাসনাত তাঁর কোনো লেখাতেই নিছক বিনোদনমূলক উপাদান পরিবেশন করেন না। তাঁর সব রচনাতেই বিনোদনকে ছাড়িয়ে বাড়তি কিছু থাকে। সেখানে একটা মননশীলতা, অনুভূতির গাঢ়তা এবং বৈদগ্ধ্যের ছাপ লক্ষণীয়। তাঁর গল্পগুলোতেও তিনি শুধু নিছক গল্প বলেন না, গল্পের আড়ালে কিছু বক্তব্য থাকে, তবে তিনি তা যথাসম্ভব নির্ভার ও অপ্রত্যক্ষ রাখেন। সেখানেই তাঁর শৈল্পিক কুশলতা।

ছোটগল্প প্রসঙ্গে, দৃষ্টান্ত হিসেবে, হাসনাতের দুটি গল্পের উল্লেখ করি : ‘শুধু আলাপিতা’ এবং ‘দৌড়া, পরান, দৌড়া।’ প্রথম গল্পটি রোমান্টিক উপাদানে পূর্ণ কিন্তু প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ঋদ্ধ। কিন্তু সবই নিচু লয়ে, আর গল্পের নায়ক দর্শনের ছাত্রের চরিত্রচিত্রণে একটা বিদ্বেষহীন চাপা ব্যঙ্গ পাঠককে আনন্দ দেয়। দ্বিতীয় গল্প ‘দৌড়া, পরান, দৌড়া’ একেবারে ভিন্ন ধরনের ; এক লেখকের লেখা বলেই মনে হয় না। প্রথম গল্পের চরিত্ররা শিক্ষিত, মোটামুটি সচ্ছল, মধ্যবিত্ত শ্রেণির, পটভূমি শহর। আর দ্বিতীয় গল্পের চরিত্ররা হতদরিদ্র, পটভূমি গ্রামাঞ্চল, পরিবেশ-পরিস্থিতিতে রোমান্টিকতার ছিটেফোঁটাও নেই, আছে নির্ভেজাল বাস্তবতা। ভাষার ক্ষেত্রেও হাসনাত বিশেষ একটা আঞ্চলিক গ্রাম্য ভাষা ব্যবহার করেছেন, শুধু চরিত্রের সংলাপের ক্ষেত্রে নয়, লেখকের নিজের বর্ণনার ক্ষেত্রেও। গল্পের নামটি লেখক সচেতনভাবে জন আপডাইকের রান, র‌্যাবিট, রান গ্রন্থ থেকে নিয়েছেন কিন্তু হাসনাতের ব্যবহারে স্বকীয়তা আছে। এ পর্যন্ত হাসনাতের পাঁচটি গল্প সঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে, ১৯৫৮ সালে। তাঁর সাতাশটি গল্প নিয়ে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় শ্রেষ্ঠ গল্প।

ছোটগল্পের বাইরে তিনি বেশ কয়েকটি উপন্যাস রচনা করেছেন। সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত হয়েছে নভেলা নামের তাঁর একটি গ্রন্থ, যেখানে স্থান পেয়েছে দুটি উপন্যাসিকা। গত বছর অর্থাৎ ২০০৬ সালে প্রকাশিত সে এবং তার ছায়া এবং জিন হুজুর ও পোস্ট মাস্টার উপন্যাসিকা দুটি হাসনাত সমাজ বাস্তবতার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার এবং কল্পনার ঐশ্বর্যের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, উভয়ের চমৎকার নিদর্শন তুলে ধরেছেন।

এবং উপন্যাসিকা নয়, হাসনাত কয়েকটি সুলিখিত পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস আমাদের উপহার দিয়েছেন, আর সেখানেও তাঁর বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব অনুসন্ধানী পরিচয় লক্ষণীয়। তিমি, আমার আততায়ী, ইন্টারভিউ, নবীর নৌকা, মোরেলগঞ্জ সংবাদ, সাঁতারু ও জলকন্যাসহ হাসনাতের অন্যান্য উপন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই তা বোঝা যায়। আর হাসনাত তাঁর বিশেষ সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন বাস্তব জগতের কতিপয় ব্যতিক্রমী মানুষের জীবনকে নিয়ে কয়েকটি অভিনন্দনযোগ্য উপন্যাস রচনা করে। এ জাতীয় কাজ বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি হয়নি। এ প্রসঙ্গে সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয় চিত্রশিল্পী শেখ মুহম্মদ সুলতান এবং ভাস্কর নভেরা আহমেদকে অবলম্বন করে রচিত হাসনাতের উপন্যাস সুলতান এবং নভেরা-র কথা। ইংরেজি ভাষায় আরভিং স্টোন, মাইকেল এঞ্জেলো, ভ্যান গগ, কামিই পিসারো, তুলু-লত্রেক প্রমুখের জীবন ও শিল্পকর্ম অবলম্বন করে কয়েকটি স্মরণীয় উপন্যাস রচনা করেছেন। হাসনাতের সুলতান ও নভেরা সেই ধারারই রচনা। তাঁর সুলতান আমার এত ভালো লাগে যে আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করি, আর ওই অনুবাদকে ভিত্তি করে হাসনাতের সুলতান একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারের জন্য হ্রস্ব তালিকায় স্থান পায়, যদিও শেষ পর্যায়ে চূড়ান্ত বিচারে তা পুরস্কৃত হয়নি।

হাসনাত স¤পর্কে যে কোনো আলোচনায় তাঁর ভ্রমণকাহিনিগুলোর উল্লেখ অত্যাবশ্যক। বাংলা ভাষায় সাহিত্যের এই শাখাটি বেশ সমৃদ্ধ। আমাদের সহজেই মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অন্নদাশঙ্কর রায়, প্রবোধকুমার সান্যাল, মুজতবা আলী, সমরেশ বসু ও উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়সহ আরও কয়েকজনের কথা। হাসনাতের ভ্রমণকাহিনিগুলো উপরোক্ত লেখকদের রচনাধারার সঙ্গে যুক্ত হবার যোগ্যতা রাখে। হাসনাতের সাফারি, ট্রাভেলগ, আন্দালুসিয়া, যানাডু প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠককে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত জায়গাগুলোতে নিয়ে যায়, আর লেখকের সহজ আলাপচারী ভঙ্গি তাকে তৃপ্তি ও আনন্দ দেয়। তাঁর সব ভ্রমণকাহিনিই আমার ভালো লেগেছে, তবে আমি বিশেষ আনন্দ লাভ করেছি আন্দালুসিয়া পড়ে। এ গ্রন্থে হাসনাত শুধু তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কথাই বলেননি, তিনি একটি ইতিহাসখ্যাত অঞ্চলের সংস্কৃতির ওপর আকর্ষণীয় আলোকপাত করেছেন।

হাসনাতের প্রবন্ধ ও কবিতার কথা বলে আমি আমার এই লেখা শেষ করব।

এ পর্যন্ত হাসনাতের তিনটি প্রবন্ধ সঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধের অঙ্গনে তার সব চাইতে উল্লেখযোগ্য কাজ ২০০৪ সালে প্রকাশিত সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব। নন্দনতত্ত্বের প্রায় সকল বিষয় নিয়ে লেখা বাংলাভাষায় এ রকম একটি গ্রন্থের খুব দরকার ছিল। লেখক গ্রন্থের ভূমিকায় প্রশংসনীয় বিনয় ও সততার সঙ্গে জানিয়েছেন যে এ বইতে যে সব দর্শন, তত্ত্ব ও ধারণা স্থান পেয়েছে সে সবই অন্যের বই থেকে নেওয়া। আমি বলব, তাতে কোনো ক্ষতি বা অন্যায় হয়নি। বরং একটি গ্রন্থের মধ্যে নন্দনতত্ত্ব স¤পর্কিত নানা দৃষ্টিকোণ, নানা ব্যাখ্যা, নানা তথ্যের উপস্থাপন গ্রন্থটিকে মূল্যবান করেছে এবং তার ব্যবহারযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে। হাসনাত তাঁর গ্রন্থকে আটটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। অধ্যায়গুলোর নামকরণ থেকেই সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব গ্রন্থের ব্যাপক পরিধি বোঝা যায়। গ্রন্থের আটটি অধ্যায় হলো : নন্দনতত্ত্বের ধারণা ; নন্দনতত্ত্বের দেশ-কাল-পাত্র ; সৌন্দর্যের দর্শন ; শিল্পের দর্শন ; সৌন্দর্যের দর্শন : দুই মহাদেশে ; শিল্পতত্ত্ব ; সংস্কৃতি ও সমালোচনা তত্ত্ব এবং নান্দনিক অভিজ্ঞতা। গ্রন্থের ভূমিকায় হাসনাত আরেকটি কথা বলেছেন যা আমার খুব ভালো লেগেছে। তিনি বলেছেন, নন্দনতত্ত্বকে যদি আনন্দতত্ত্ব হিসেবে দেখা যায় তাহলে সে বিষয়ে সকলেরই জানার অধিকার আছে এবং সকলেরই তা জানা উচিত। ‘এর ফলে জীবনযাপন আরো একটু সুন্দর ও আনন্দময় হতে পারে।’ প্রবন্ধ সাহিত্যের অঙ্গনে এ গ্রন্থ হাসনাতের অন্যতম সেরা অবদান।

এবার হাসনাতের কবিতা প্রসঙ্গ। কিওতো হাইকু কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে হাসনাত আবদুল হাই আমাদের সবার সামনে তাঁর বহুমুখী, নতুনত্বসন্ধানী, বৈচিত্র্যপ্রিয় সত্তাকে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরেছেন। বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা তাঁর অনেকগুলো হাইকু কবিতা ছাড়াও গ্রন্থটির বিশেষ উপযোগী একটি অংশ হচ্ছে গ্রন্থের শেষে প্রদত্ত ‘উত্তরলেখ’ রচনাটি। এখানে যেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে তেমনি আছে আলোকসঞ্চারী বিশ্লেষণ। আর হাইকুর কঠোর শৃঙ্খলা মেনে রচিত হাসনাতের নিজের বাংলা ও ইংরেজি হাইকু কবিতাগুলো নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য। গোটা চারেক নমুনা দিই :

(১)         চড়ুইয়ের লুকোচুরি

               গাছের শাখায়

                             ঝরছে পাতা সব

ইংরেজিতে Sparrows hide and seek

                        In a tree

                        With falling leaves

(২)                       নোঙর করা তরী

                             তুলছে মৃদু ঢেউ

                             বরফ গলে ধীরে

ইংরেজিতে Anchored boat

                        Sends ripples

                        To melting ice.

(৩)                       বরফে এটো-কাঁটা

                             কাছেই একটি কাক

                             ঝাড়ছে শুধু ডানা

ইংরেজিতে Snow on garbage

                        A crow nearby

                        Flapping wings

(৪)                       শ্যাওলা জমা পাথর

                             পথিক এক পাশে

                             তাকিয়ে দুজন

ইংরেজিতে Stone with moss

                        Resting traveller

                        Exchange looks

হাসনাত আবদুল হাইয়ের সাহিত্যকর্ম স¤পর্কে বেশ কয়েকজনের লেখা আর তার নিজের নতুন পুরনো নির্বাচিত কিছু লেখা গ্রন্থিত করে একটি বই প্রকাশ হতে যাচ্ছে শুনে আমি আনন্দিত। এই অভিনব প্রকাশনার মাধ্যমে লেখক হাসনাত আবদুল হাইয়ের সৃজনশীল ও মননধর্মী কাজের পরিচয় পাওয়া যাবে যা সব লেখকের মূল্যায়নের জন্যই খুব প্রয়োজন। এই গ্রন্থ প্রকাশের কথা শুনে এবং অনুরুদ্ধ হয়ে আমি এই লেখাটি দিতে পেরে আনন্দিত। আমার এই লেখার সঙ্গে তাঁর উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করছি আমার আন্তরিক শুভ কামনা এবং তাঁর কাছ থেকে আরও অনেক দিন ধরে আরও অনেক লেখা পাবার ইচ্ছার কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares