প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : হাসনাতের ভ্রমণ-সাহিত্য : মুর্তজা বশীর

হাসনাত আবদুল হাই মূলত কথা সাহিত্যিক। তাঁর প্রধানতম পরিচয় তিনি ছোটগল্প লেখক ও ঔপন্যাসিক। মাঝে তিনটি নাটক লিখেছেন : ১৯৭৪ সালে ঘুম নেই, ১৯৭৬ ও ১৯৭৭-এ সিসিফাসের একদিন এবং সামনে যাই থাক ট্রেন চলবে। এই ত্রয়ী নাটক গ্রন্থ হিসেবে ১৯৭৮ সালে তিনটি নাটক এই শিরোনামে প্রকাশ করেন তিনি। মাঝে অবশ্য জাপানে প্রবাসকালীন অনুভূতিতে সিক্ত হয়ে দুই তিন পঙ্্ক্তির চিত্রময় কবিতামালা কিয়োতা হাইকু উপহার দেন ১৯৯৭ সালে। পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন, যার জন্য ভ্রমণ লেখক হিসেবে তিনি নন্দিত হয়েছেন। দেশে এবং বিদেশে ভ্রমণের ওপর লেখা তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা এ পর্যন্ত ছয়টি। এ ছাড়াও অগ্রন্থিত অবস্থায় আছে আরও কিছু লেখা। সম্ভবত বাংলাদেশে লেখকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। শুধু সংখ্যার দিক দিয়ে নয়, বিষয়ের বৈভব ও বর্ণনার উৎকর্ষের জন্যও তাঁর ভ্রমণকাহিনি হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয়। তাঁর ভ্রমণকাহিনি নিছক দেশ-ভ্রমণের ইতিবৃত্ত নয়, কিংবা শিল্পী দেলেক্রোয়া, আঁদ্রে জিদের জার্নাল বা গোটের ‘ইতালিয়ান জার্নির’ মতো প্রতিদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতি, ঘটনা ও চিন্তার দিনলিপি নয়। যদিও তিনি বেশ কিছু ডায়েরির আকারে লিখেছেন প্রতিদিন, আবার কখনও দৈনন্দিন লেখাকে পরিহার করে একসঙ্গে ঘটনাবলিকে লিপিবদ্ধ করেছেন। লেখাগুলো যেভাবে তিনি উপস্থাপন করেছেন, চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন তাতে সহজেই একজন সফল ছোটগল্পকারকে দেখতে পাওয়া যায়, আবার অনেক লেখায় প্রায়ই একজন নৃবিজ্ঞানীর অন্বেষী মনের দেখা পাই। কোনো কোনো ভ্রমণকাহিনি ক্ষুদ্রাকার পরিধি ছাড়িয়ে আমাদের নিয়ে যায় বিস্তৃত ঘটনা ও ইতিহাসের পাতায়। পরিচয় করিয়ে দেয় সে দেশের অজানা শিল্প ও সংস্কৃতির জগতের সঙ্গে। তার ভ্রমণ সাহিত্যে ইতিহাস, সমকাল এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটে পাঠকের বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তার কিছু লেখায় গবেষণা আছে কিন্তু তা বিষয়ের প্রয়োজনে, পাণ্ডিত্য দেখানোর জন্য নয়।

হাসনাতের প্রথম ভ্রমণকাহিনির বিষয় ও সময় ১৯৬০ সাল যখন ছাত্রজীবনে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকা যান ও সেখানে প্রবাস জীবনযাপন করেন। ট্রাভেলগ নামে প্রকাশিত এই ভ্রমণকাহিনিতে যুক্ত হয়েছে আমেরিকা থেকে ফেরার পথে ইংল্যান্ডে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সালে তার দুবছরের প্রবাস জীবন, যখন তিনি পড়াশোনা এবং চাকরি দুই কাজেই ব্যাপৃত ছিলেন। ‘৬২-তে ইয়োরোপের হেলসিংকি, জার্মানি ভ্রমণও এখানে অন্তর্ভুক্ত। প্রথম জীবনের এবং প্রথম লেখা হিসেবে ট্রাভেল-এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। খুবই সহজ আর সরল এর বর্ণনা। ভাষার নৈপুণ্য কিংবা চিন্তার বৈদগ্ধ্যের চেয়ে আন্তরিক হয়ে ভ্রমণ আর প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনাই প্রাধান্য পেয়েছে ট্রাভেলগ-এ। লেখক হিসেবে তার দৃষ্টি প্রায় সর্বত্রগামী, যা কিছু তিনি দেখেন এবং শোনেন সব কিছুই তাকে আকৃষ্ট করে। তার আগ্রহের ক্ষেত্র বেশ ব্যাপক। কেবল বিদেশ কিংবা নতুনত্বের জন্য না, মানবিক আগ্রহের কারণেও তুচ্ছ বিষয় তার দৃষ্টি এড়ায় না। যেমন, ঢাকা থেকে করাচির পথে আকাশযানে যাত্রার সময় পাশের সিটে মন্ত্রীর কথাবার্তা কিংবা সামনের সিটে উপবিষ্টা সহযাত্রিনীর বিচিত্র কাণ্ডকারখানা, কিছুই তার দৃষ্টি এড়ায় না, বেশ কৌতুকের সঙ্গে তিনি বর্ণনা করেন এই অভিজ্ঞতা যা অসামান্য হয়ে ওঠে। মাত্র ১০ ডলার সম্বল করে নিউইয়র্ক শহরে একদিন আর একরাত কাটানোর টেনশনও তিনি পৌঁছে দেন পাঠকের কাছে। পুরনো লিফটে চড়া নিয়ে তার বিপন্ন বিস্ময় হাসির খোরাক জোগায়, কেননা লিফটে চড়ার অভিজ্ঞতা তখন বাঙালিদের কাছে নতুন। ভ্রমণকাহিনি লিখতে গিয়ে তিনি গল্পই বলেন। প্রতিটি লেখাই ছোটগল্পের মতো স্বয়ংস¤পূর্ণ। অভিজ্ঞতার বর্ণনায় হাস্যরস আর কৌতুকবোধ অন্তরঙ্গতা নিয়ে আসে সহজেই। শিবরাম চক্রবর্তী আর যাযাবরের রসিকতাবোধের কথা মনে করিয়ে দেয়। হয়তো তাদের প্রভাব পড়েছে তার লেখায় ; শুনেছি এই দুজনই তার প্রিয় লেখক।

ট্রাভেলগ-এর সব লেখাই এক সময়ের না। ষাটের দশকে আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের প্রবাস জীবনের ওপর লেখা ছাড়াও এখানে স্থান পেয়েছে ১৯৭৪-এ ইয়োরোপের পশ্চিম বার্লিনে, ১৯৮৩-তে রোম, ১৯৮৫-তে কোপেনহেগেন ও এলসিনোরে স্বল্পকালীন ভ্রমণ এবং ১৯৯৩ সালে পশ্চিম আফ্রিকার ক্যামেরুনে ভ্রমণকাহিনি। প্রথম পর্বের লেখার সঙ্গে পরবর্তী এই সব লেখার বেশ পার্থক্য রয়েছে। এখানে তার বর্ণনা আরও তথ্যবহুল এবং ভাষার ব্যাপারে তিনি যেন আরও সচেতন। বুদ্ধির দীপ্তি আর মননের গভীরতা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন অনেক বিষয়। কিন্তু আগের মতোই মানুষের চরিত্রচিত্রণে ব্যবহার করেছেন কৌতুকবোধ এবং প্রসন্নচিত্তের ঔদার্য। তাই দুর্বৃত্ত চরিত্র হয়েও ক্যামেরুনের দুই পুলিশকে মনে হয় কমিক ক্যারেক্টার, যেন লরেল আর হার্ডির মতো বোকামির জন্য হাসাতেই তাদের অবতারণা। রোমে গিয়ে স্বদেশ থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন বরণ করে নেয়া কথা-সাহিত্যিক শামসুদ্দিন আবুল কালামের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে যেমন রয়েছে হাস্য রসিকতা একই সঙ্গে রয়েছে তার প্রবাসে নিভৃতচারী জীবনের জন্য বেদনাবোধ। হাসনাত যে একজন শিল্পপ্রেমী তার বেশ ধারালো পরিচয় রয়েছে ট্রাভেলগে। তিনি যেখানেই গিয়েছেন আর্ট গ্যালারি ও মিউজিয়ামে সমকালীন বা পূর্ববর্তী শিল্পীদের প্রদর্শনী দেখেছেন। স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা সব প্লাস্টিক আর্টসই তাকে আকৃষ্ট করে। বোঝা যায় ছাত্রজীবন থেকেই তার ভেতর শিল্প-রসিকতা এবং বোদ্ধার একটি সত্তা গড়ে উঠেছিল যা তার প্রবাস জীবনে শিল্পকলার রসাস্বাদনে সহায়ক হয়েছে।

ট্রাভেলগ-এ আমেরিকাকে দেখা যায় তার সব বৈচিত্র্যে, ভালো এবং মন্দ মিলিয়ে। সেখানে হোস্ট ফ্যামিলির আতিথেয়তা যেমন হাসনাতকে মুগ্ধ করে, আবার বাল্টিমোরে শ্বেতাঙ্গ রেস্তোরাঁয় বাদামি বর্ণের জন্য প্রত্যাখ্যাত হওয়ার তিক্ত অপমানবোধও তিনি ভোলেন না। এখানেই তিনি দেখা পান মার্টিন লুথার কিংয়ের সঙ্গে, যার কাছে গান্ধী তাঁর অহিংসা আন্দোলনের জন্য এক আদর্শ । ট্রাভেলগ-এ ইংল্যান্ডের প্রবাস জীবনে সেই দেশের অনেক দিকের পরিচয় পেলেও সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র পাই না। হয়তো তাদের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ঘটেনি, অন্তত তার তেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না লেখায়। ফলে ট্রাভেলগ-এ আমেরিকাকে যেমন পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায়, ইংল্যান্ডকে সেইভাবে পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও হিথরো বিমান বন্দরে দোভাষী হিসেবে কাজ করার সময় তাঁর অভিজ্ঞতা যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি হৃদয়বিদারক কিছু ঘটনা মনকে আপ্লুত করে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকসের আলাপিতা এক রমণীর সঙ্গে সম্পর্কে দেখি এক চাপা রোমাঞ্চ। যখন হোবোর্ন স্টেশন, চেলসি, পিকাডেলি সার্কাস, বেইজওয়াটার বা হাইড পার্ক কর্নারের বর্ণনাগুলো পড়ি তখন এক নস্টালজিয়া আমাকে উদাস করে ফেলে। হাসনাত ইয়োরোপে যেহেতু স্বল্পকালীন ভ্রমণে গিয়েছেন তাই জার্মানি, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, রোম এসব দেশ ও শহরের বর্ণনাতে আংশিক পরিচয়ই পাওয়া যায়। কিন্তু যতটুকুই বলেন, বর্ণনাগুণে তা আকর্ষণীয় হয়। সিসটেন চ্যাপেলের বর্ণনা পাঠকের মতো আমাকেও নিয়ে যায় সেই বিখ্যাত গির্জার অভ্যন্তরে। মনে করিয়ে দেয় ১৯৫৭ সালে ইতালিতে ছাত্রকালীন সময়ে মাইকেল এঞ্জেলোর এ কাজটি দেখার জন্য ফ্লোরেন্স থেকে এসেছিলাম, চোখে ছিল বিস্ময়, মনে ছিল উত্তেজনা। শুধু এটুকুই ছিল অনুভূতি। কিন্তু হাসনাতের লেখার ভেতর দিয়ে এমন সব তথ্যের সন্ধান পাই যার সঙ্গে তখন কোনো পরিচিতি ঘটেনি। সিসটেন চ্যাপেলের বিশদ বর্ণনা বলতে গিয়ে তিনি যে শুধু দৃষ্টিনন্দন অভিজ্ঞতা বলতে চেয়েছেন, তা নয় ; একজন গবেষকের মতো পরিশ্রমী হয়ে আমাদের সম্মুখে তুলে ধরেছেন সবকিছু। ঠিক এমনিভাবে কোপেনহেগেনে তার দেখা রাশিয়ান শিল্পকলাকে তিনি উপস্থাপন করেন বিশেষ ভঙ্গিতে। আমাদের দেশে রাশিয়ান শিল্পকলা স¤পর্কে তেমন বিশেষ কিছু জানা যায় না। তাঁর এই লেখা আমার মনে হয় আমার মতো আরও অনেকের জন্য জানার পিপাসাকে কিছুটা হলেও তৃপ্তি দেবে। ট্রাভেলগ-এর শেষে ক্যামেরুনের ওপর লেখায় দেশটির মোটামুটি পরিচয় পাওয়া যায়। সবচেয়ে অবিস্মরণীয় সেখানে তার গাড়ির চালক পেনা আভট, যার সঙ্গে লেখকের হৃদ্যতা গড়ে ওঠে প্রায় সমশ্রেণির মানুষের মতো। পেনা আভটের সঙ্গে লেখকের একসঙ্গে সিনেমা দেখার বর্ণনা যেমন হাস্যকৌতুকে পরিপূর্ণ, তেমনি বিদায় দিনে প্লেনে বসে মাটিতে চালককে দেখে লেখকের যে অনুভূতি তা হৃদয়র্শী।

ট্রাভেলগ-২ এ স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান এবং বিদেশের কয়েকটি শহরে ভ্রমণের স্বল্পকালীন অভিজ্ঞতা। এখানে তিনি স্মৃতিতাড়িত হয়েছেন পৈতৃক গ্রামে গিয়ে, কৈশোরের শহর নড়াইল আর যশোরে স্বল্পকালীন যাত্রাবিরতিতে। শৈশবের স্মৃতির আকুলতা দেখি নব্বই দশকের প্রথমে লেখা কলিকাতা-রানাঘাট লেখাটিতে। লেখাটি পড়লে ছোটগল্প মনে হয়। সব মানুষই ছোটবেলায় দেখা পথঘাট, বাড়িঘর, নদী-নালা দেখে যা ভাবেন হাসনাতেরও সেই প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ছোটবেলার কৌতূহলী দৃষ্টিতে যা ছিল বিশাল এখন পরিণত চোখে সব কিছু ছোটো দেখায়। এই অভিজ্ঞতার বর্ণনায় বাস্তবতা যেমন আছে, নস্টালজিয়াও ঘিরে ধরে। শিলাইদহে আর শাহজাদপুরে গিয়ে লেখক রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে বেড়ান, তাঁর কথা বলেন। এখানে গবেষণার সাহায্য নিলেও পরিবেশিত তথ্য আরোপিত মনে হয় না। বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এসে যায় রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘ছিন্নপত্রের’ উল্লেখ। পুরনো ঢাকায় গিয়েছেন তিনি আমাকে নিয়ে ছোটবেলার স্মৃতির খোঁজে। আমারও ছোটবেলা কেটেছে সেখানে; দুজনের স্মৃতি রোমন্থনকে তিনি গ্রথিত করেছেন মনোগ্রাহীভাবে। এই বইতে বিভিন্ন সময় আর স্থান এসেছে পরম্পরা ছাড়াই, যার জন্য একটু হোঁচট খেতে হয়। কিন্তু প্রতিটি লেখাই গল্পের মতো বলার জন্য পড়ায় আগ্রহ আর কৌতূহল হ্রাস পায় না। সিলেটে আশির দশকে ‘একদিনের ট্যুরিস্ট’ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখার পরই যখন অন্য লেখায় সিন্ধু প্রদেশে সেহওয়ানে শাহবাজ কলন্দরের খোঁজে যান লেখক তখন প্রাথমিক চমক কাটিয়ে ওঠার পর তার সেই লেখায় রস আস্বাদনেও অসুবিধা হয় না। লেখকের মতোই পাঠকও নর্তকি-গায়িকা সাইয়ার মনের আর্তি স্মরণ করে বিষণ্নতায় আপ্লুত হন। দিল্লিতে কুলদীপ নায়ার আর মার্ক টালির সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজনের সময় আলাপের বিষয় হিসেবে উঠেছিল রাজনীতি, কিন্তু সেই কথাবার্তাকে ম্লান করে দেয় কুশওয়ান্ত সিংয়ের সঙ্গে তাঁর বাসায় সান্ধ্যকালীন আলাপচারিতার মজাদার বর্ণনা। পড়ার শেষে লেখকের মতোই হাসিতে উচ্ছ্বসিত হতে হয় পাঠককে। নিউইয়র্কে নব্বুইয়ের দশকে প্রায় ৩০ বছর পর দ্বিতীয়বার যান হাসনাত। সাবওয়েতে লোরকার কবিতার উদ্ধৃতি দেখে তিনি কবির ওপর যা লেখেন সেটি তথ্যমূলক এবং গবেষণাধর্মী হয়েও ভ্রমণকাহিনির আকর্ষণীয়তা হারায় না। ‘সানডে ইন নিউইয়র্কে’ তিনি একটি দিনের বর্ণনা করেন বেশ ধীরেসুস্থে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এবং বুঝিয়ে দেন যে, সেটি ছুটির দিন। ছুটির আমেজ সমস্ত লেখায় জড়িয়ে থাকে।

ট্রাভেলগ-২ এর শেষে জাপান ভ্রমণের ওপর বেশ কয়েকটি লেখা আছে। পূর্ণাঙ্গ না হলেও ওই দেশটির অনেক কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় লেখাগুলো। বিষয়গুলো সিরিয়াস থেকে মাঝারি হালকা চরিত্রের। এরপরই স্থান পেয়েছে চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে লেখকের ভ্রমণ। সামান্য একটি লেখার মধ্য দিয়েই চিলির সাম্প্রতিক ইতিহাস সম্বন্ধে অবহিত করেছেন তিনি। বেশ তথ্যবহুল এসব লেখা। সবচেয়ে মনোগ্রাহী পাবলো নেরুদার বাড়ি ভ্রমণের ওপর লেখা প্রবন্ধটি। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আমি নিজেই যেন ঘুরে ঘুরে দেখছি। পাঠক লেখাটির সঙ্গে নিজেকে একীভূত করে ফেলেন। গাইড চরিত্রটিকে অবিস্মরণীয় করেছেন তিনি তার কথাবার্তা আর আচরণের কৌতুককর বর্ণনায়। নেরুদার প্রতি তার আকর্ষণ আর দুর্বলতা প্রকাশিত হয়েছে বেশ স্পষ্টভাবেই। নেরুদা আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তবে ট্রাভেলগ-২ এর যে ভ্রমণকাহিনি আমার হৃদয়কে ¯পর্শ করেছে তা হল ওয়াশিংটন ডিসিতে হলোকাস্ট মিউজিয়াম। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর কনসেনট্রেশন ক্যা¤েপ নিহত ইহুদি নারী, পুরুষ ও শিশুদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত এই স্মৃতিসৌধ। ব্যথাতুর হয়েছি আমাদের দেশের জন্য, সংস্কৃতির জন্য আত্মোৎসর্গিত শহীদের প্রতি অবজ্ঞা দেখে, আর নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের কোনো সচিত্র ম্যুরালের অনুপস্থিতিতে তাই শহীদ মিনার বা সাভারের স্মৃতিসৌধ তথ্যবিহীন, ইতিহাসবিমুখ বিশাল এক স্থাপত্যের নিদর্শন হয়, হৃদয়কে বেদনায় আপ্লত করে না।

১৯৯২ সালে প্রকাশিত সাফারি বইটি হাসনাতের প্রথম আফ্রিকা সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। বই ছাপা হওয়ার আগে তিনি আমাকে প্রচ্ছদ ও কয়েকটি ড্রয়িং এঁকে দিতে অনুরোধ জানান। তখন তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারি যে বইটিতে যে সাফারির তিনি উল্লেখ করেছেন সেটি কেবল তার ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়, সমগ্র মানবজাতির বিবর্তনের ইতিহাস, অন্তত প্রাচীনকালে। কেনিয়াতেই আবিষ্কৃত হয়েছে সবচেয়ে পুরনো মানুষের কঙ্কাল যা সেখানকার মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। হাসনাত কেনিয়ায় ট্যুরিস্টদের দর্শনীয় স্থান দেখেছেন কিন্তু তার চেয়েও বেশি আকৃষ্ট হয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রতি, যার ভিত্তিতে মানবজাতির যাত্রার সূচনাকালকে চিহ্নিত আর বর্ণনা করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ লিকির সঙ্গে সাক্ষাৎকার, মিউজিয়াম পরিদর্শনএসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন অধীত জ্ঞান। প্রত্নতত্ত্বের পাশাপাশি নাইরোবির অদূরে ডেনমার্কের বিখ্যাত লেখিকা আইজাক ডিনেসনের বা কারেন ব্লিক্সেনের খামারবাড়ি দেখার আগ্রহও দেখান তিনি। ‘আউট অব আফ্রিকায়’ পটভূমি ভেসে ওঠে তাঁর লেখায়। কারেন ব্লিক্সেনের বেদনাবিধুর জীবন নতুন করে স্পর্শ করে পাঠককে। নাইরোবিতে ভ্রমণ শেষে জিম্বাবুয়ে গিয়ে খুঁজে খুঁজে এক গুহায় ৪০ হাজার বছরের পুরনো চিত্রকর্ম দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন লেখক, যা মানবজাতির মহাযাত্রা সাফারির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। একজন খাঁটি শিল্পরসিক না হলে এই কষ্টকর যাত্রা তিনি করতেন না। ধন্যবাদ তাঁকে, একজন পাঠককে গুহা থেকে এই অমূল্য ভাণ্ডারের শিল্পকর্মের স্বল্প অথচ নিখুঁত বর্ণনা দেওয়ার জন্য। তিনি ১৯৯১ সালের এপ্রিল-মে-তে আফ্রিকায় যান। আফ্রিকার প্রকৃতির সৌন্দর্য ও জীবনচিত্রের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ‘হেমিংওয়ের দ্য ক্লোজ অব কিলিমাঞ্জারো’ পড়ে এবং পরে গ্রেগরি পেকের অভিনীত ছায়াছবি দেখে। আফ্রিকার প্রতি আমার কৌতূহল ও আগ্রহের যে ক্ষুধা ছিল তা এই গ্রন্থের ভেতর থেকে অনেকাংশেই নির্বাপিত হয়। সাফারিতে হাস্যকৌতুক এবং গালগল্পের আমেজ নেই, বেশ-মননশীল ভঙ্গিতে লেখা। তা সত্ত্বেও এই বৈদগ্ধ এবং গাম্ভীর্য পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টিতে অন্তরায় হয় না। বইটির ভাষা ব্যবহার পরিশীলিত ও সচেতন এবং সেই সঙ্গে বিষয়ের প্রতি আন্তরিক।

হাসনাত ১৯৮৯ সালে কয়েক মাসের জন্য অক্সফোর্ডে যান। সেই সময় নীরোদ চৌধুরীর সঙ্গে তার বেশ কয়েকবার দেখা হয় তাঁর বাড়িতে। কৈশোরের শেষে ও যৌবনের প্রারম্ভে নীরোদ চৌধুরীর অটোগ্রাফি অফ এ্যান আননোন ইন্ডিয়ান পড়ে তার স¤পর্কে কৌতূহল হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারের ওপর লেখা প্রবন্ধগুলো নীরোদ চৌধুরীর পছন্দ-অপছন্দ, কৌতুকবোধ, ব্যক্তিত্ব, পাণ্ডিত্য এবং সীমাবদ্ধতাকে যেভাবে উপস্থাপিত করেছে সেখানে লেখকের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। কেতকী কুশরী ডাইসনের লেখচিত্রও বেশ আকর্ষণীয় হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও ছোটগল্পের অনুবাদ উইলিয়াম রাদিচির সঙ্গে সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র সাহিত্য অনুবাদের সমস্যা স¤পর্কে জানতে পারা যায়। অ্যাসমলিয়ান মিউজিয়ামে প্রি-রাফেলাইটদের চিত্রপ্রদর্শনী দেখার পর তিনি তাদের স¤পর্কে কিছু প্রশ্ন করে আমাকে চিঠি লেখেন। আমি তথ্যসহ তার উত্তর দিয়েছিলাম। এসব কিছু নিয়ে তিনি একটি বড় প্রবন্ধ লিখেছেন যেখানে আমার সম্বন্ধে বেশ কিছু প্রশংসামূলক মন্তব্য করে তিনি বিব্রত করেছেন আমাকে। সেই সময় তাঁর অনুরোধে একটি বহুজাতিক কো¤পানির জন্য বাংলা উপন্যাসের নায়িকাদের ছবি আঁকছিলাম আমি। সেই প্রসঙ্গেও তার সঙ্গে লেখালেখি হয়েছে যার উল্লেখ আছে জার্নাল/৮৯ বইটিতে। প্রায় ২৫ বছর পর আমার ফিগারেটিভ ছবি আঁকায় প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে হাসনাতের যোগাযোগটা মনে থাকবে আমার। জার্নাল/৮৯ নামে লেখা এই ভ্রমণকাহিনিতে কেবল অক্সফোর্ড নয়, লন্ডন, ক্যান্টারবেরি এসব স্থানে ভ্রমণের কাহিনিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বেশ কিছু লেখা তথ্যবহুল, যেমন রয়াল একাডেমিতে ফোটোগ্রাফি প্রদর্শনী আর পল গগাঁর প্রদর্শনীর ওপর প্রবন্ধ দুটি। হাসনাত জীবনবিমুখ আত্মকেন্দ্রিক একজন লেখক নন, তা যেমন আমরা তার সাধারণ মানুষের চরিত্র সৃজন করার ভেতর দিয়ে পর্যবেক্ষণ করি, সেভাবে বিলেতের রাজনীতির ধারা স¤পর্কে যে আগ্রহের কমতি নেই তা এই জার্নালে লক্ষ করি। লন্ডনের বিবিসিতে গিয়ে সিরাজুল ইসলাম, সাদেক খান, সাইদ আহমেদকে নিয়ে বাঙালি রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া এবং সেখানকার মালিকের সঙ্গে হাস্যকৌতুকে পরিপূর্ণ কথোপকথন বইটির গুরুগম্ভীর বিষয়গুলোতে কিছুটা বৈচিত্র্য দিয়েছে। হাসনাতের এই গ্রন্থটি যখন হাতে নিই নামকরণ দেখে তখন কেন জানি জ্যাঁ জেনের দ্য থিভস জার্নাল ও পল গগাঁর মাই ইনটিমেট জার্নালের নামটি মনে উঁকি দিয়েছিল।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে হাসনাত ¯েপনে যান। সরকারি কাজে আমেরিকা গিয়েছিলেন, ফেরার সময় স্পেন ঘুরে এসেছেন। মুরদের ইতিহাস আর স্পেনের সিভিল ওয়ারের জন্য দেশটি তাকে আকর্ষণ করেছে ছাত্রজীবন থেকে, এ কথা পরে জেনেছি। আন্দালুসিয়া নাম দিলেও তার এই ভ্রমণকাহিনি শুরু হয়েছে মাদ্রিদ থেকে। মাত্র একদিনের ভেতর পিকাসোর গুয়ের্নিকা থেকে শুরু করে মাদ্রিদের প্রাদো চিত্রশালাসহ দর্শনীয় প্রায় সবকিছু দেখে তিনি যেভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে যা লিখেছেন তা বিস্ময়কর। পিকাসোর গোয়ের্নিকা আমি দেখেছিলাম ১৯৭৮ সালে নিউইয়র্কের এক মিউজিয়ামে। যে কক্ষে এই বিশাল ছবিটা ছিল সে ঘরে গুয়ের্নিকার প্রস্তুতি স্কেচ ছিল অসংখ্য। শুনেছিলাম পিকাসো নির্দেশ দিয়েছিলেন, স্পেনে রাজতন্ত্রের পতন যতদিন না হবে চিত্রটি আমেরিকায়ই থাকবে। শিল্পী মুনিরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর দেখা ও কথাবার্তা বেশ আমোদিত করবে পাঠককে। এই বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায় সিভিল ওয়ারের ওপর লেখাগুলো। স্পেনের গৃহযুদ্ধ স¤পর্কে প্রথম জানতে পারি হেমিংওয়ের উপন্যাস ফর হুম দা বেল টোলস পড়ে। আর জেনেছিলাম ক্রিস্টোফার কডওয়েলের ইলিউশন এন্ড রিয়েলিটি গ্রন্থটির লেখকের জীবনবৃত্তান্তে। তবুও কৌতূহল ছিল। কিন্তু হাসনাতের লেখার ভেতর দিয়ে এই জনযুদ্ধের স¤পর্কে যে অনুসন্ধিৎসা ছিল তা পূরণ হয়। স্বভাবতই এখানে তিনি গবেষণার সাহায্য নিয়েছেন। তিনি একঘেয়েমি পরিহার করার জন্য সুকৌশলে ব্যবহার করেছেন মাদ্রিদ থেকে কর্ডোভার ট্রেন যাত্রাকে। জানালার বাইরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার পাশাপাশি তিনি সিভিল ওয়ারের ওপর বই পড়ে যাচ্ছেন, এই ভান করে বলে যাচ্ছেন যুদ্ধের ইতিহাস। সত্যি সত্যি এমনভাবে নিশ্চয়ই পড়েননি, কিন্তু লেখার কৌশল হিসেবে এটি গ্রহণযোগ্য হয়েছে। দীর্ঘ এবং তথ্যবহুল এই বর্ণনা ; কিন্তু বিরক্তি আসে না, বরং পড়তে হয় রুদ্ধশ্বাসে। আন্দালুসিয়ায় লোরকার ওপর লেখা দুটিও তথ্যবহুল। লোরকা আমার প্রিয় কবিদের অন্যতম ; তার ‘সোমনাবুলার ব্যালাড’ কবিতাকে কেন্দ্র করে লন্ডনে ১৯৫৮ সালে একটা চিত্র নির্মাণ করার পরিকল্পনা করি যা ১৯৫৯ সালে করাচিতে শেষ করেছিলাম। লোরকাকে আরও গভীরভাবে পাই লোরকার গ্রাম ও লোরকার বাড়ি ভ্রমণের বর্ণনায়। মুরদের ওপর লেখায় ইতিহাস সচেতনতা আছে, সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিজিতের জন্য সহানুভূতিবোধ। কোনো একটি দেশ নিয়ে বিশদভাবে লেখার মধ্যে আন্দালুসিয়া তার প্রথম প্রয়াস, বলেছেন তিনি ভূমিকায়। স্পেন খুব বড়ো দেশ, মাত্র চারদিনে দেশটি স¤পর্কে সব বলে শেষ করা যায় না। কিন্তু হাসনাত যেভাবে ভ্রমণকাহিনি বলেছেন তা পাঠকের কৌতূহল মেটাতে আর আগ্রহ সৃষ্টিতে কোনো অংশেই ব্যাহত হয় না। আন্দালুসিয়া গ্রন্থটি তিনি পূর্বের ভ্রমণকাহিনি থেকে উপস্থাপন করেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী ক্লদ মনে যেমন তার খড়ের গাদা ও রূয়েঁর গির্জার ছবিগুলোতে প্রকৃতিতে বিভিন্ন সময়ে যেভাবে রঙের তারতম্য ঘটে তা তুলে ধরেছেন, তেমনভাবে হাসনাত মাদ্রিদ, কর্ডোভা, গ্রানাডা ও সেভিলের চিত্র তুলে ধরেছেন সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা ও রাতের ভেতর দিয়ে। এই গ্রন্থটি ভ্রমণকাহিনির ভেতর দিয়ে আমাদের পরিচিত করায় অতীতের ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও স্থাপত্যের সঙ্গে, যার জন্য পাঠকের জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ হতে পেরেছে। আন্দালুসিয়ায় হাসনাত ব্যবহার করেছেন ঋজু, মেদহীন সাহিত্যের ভাষা। বিষয়ের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যময় হয়েছে এই ভাষা-ব্যবহার।

বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখা যানাডু হাসনাতের ভ্রমণকাহিনির মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর। ছাত্রজীবনে কোলরিজের ‘কুবলাই খান’ কবিতা পড়ার পর থেকে তার গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ যানাডু দেখার আগ্রহ জাগে তার। এর জন্য অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ ৩৫ বছর। যানাডু পরিদর্শন করে এসে বই লিখেছেন এমন দুজন বিদেশির বই পড়ার পর সেখানে যেতে তাঁর সঙ্কল্প দৃঢ় হয়। ১৯৯৮ সালে জাপান থেকে আসার পথে চীনে যাত্রা বিরতি করে বেইজিং থেকে দুই চৈনিক দোভাষীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যাত্রা করেন ৬০০ কি. মি. দূরের পথ যানাডুর উদ্দেশে। একজন প্রত্নতাত্ত্বিক যেভাবে অন্বেষণ করে প্রাচীন কোনো সভ্যতা, ঠিক সেভাবেই তার যাত্রা শুরু। দোভাষীর কেউই যানাডু কোথায় জানে না, অন্যরাও বলতে পারে না। সহায় কেবল হাতের ম্যাপ আর বই পড়ে জানা সামান্য তথ্য। অর্ধেক দিনের যাত্রা শেষে এক শহরে রাতের বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন সকাল থেকে অজানাকে জানার অভিযানে উত্তরে মঙ্গোলিয়ার দিকে যাত্রা শুরু হয় আবার। আন্দাজ করে, পথে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে ক্রমাগত জনমানবশূন্য স্তেপ ভূমির দিকে অগ্রসর হয়ে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে দিনের শেষে তারা দেখা পান এক মেষপালকের। সেই মেষপালক যখন নিয়ে যায় যানাডু (চীনে ভাষায় ‘স্যানডু’) প্রাসাদের ভগ্নাবশেষের কাছে, তখন লেখকের উল্লাসের সীমা থাকে না। শিশুর মতো তিনি দৌড়ান পরিত্যক্ত প্রাসাদ প্রাঙ্গণে, কুড়িয়ে নেন প্রস্তর খণ্ড। তারপর মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটেন আলফ নদীর রুপোলি পাড় দেয়া নীলাম্বরী শাড়ির মতো তন্বী দেহের পাশে পাশে। এই নদী তাকে কল্পনায় নিয়ে যায় সূর্যালোকহীন সমুদ্রে, যার কথা কোলরিজ লিখেছেন তাঁর কবিতায়। যানাডুতে ইতিহাস আছে, সাহিত্য আলোচনা স্থান পেয়েছে আর আছে ভ্রমণের রোমাঞ্চকর বর্ণনা। যে কোনো ভাষায় যে কোনো সময়ে লেখা ভ্রমণকাহিনির সঙ্গে এটি তুলনীয় হতে পারে। বইটি লেখার সময় তিনি আমার কাছে কুবলাই খানের ছবি পাওয়া যায় কিনা, এই অনুরোধ করেছিলেন। আমি ছবি দিয়েছিলাম সেই সঙ্গে মোঙ্গল সাম্রাজ্যের ম্যাপ। সব ব্যবহার করেছেন তিনি বইতে যা এর গুরুত্বও আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি করেছে।

ইতিপূর্বে হাসনাতের ভ্রমণকাহিনিগুলো পৃথক বই হিসেবে বেরিয়েছে। এখন তিন খণ্ড ভ্রমণ সমগ্রের আকারে পরিবেশিত হয়ে এদের লভ্যতা সহজ হল। বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যে এসব বই নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তাঁর মতো এত ভ্রমণকাহিনি এ দেশে আর কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই।

কেন ভ্রমণকাহিনি লেখেন, এই প্রশ্নের উত্তরে হাসনাত জানিয়েছেন, যেহেতু ভ্রমণ করতে হয়েছে ছোটবেলা থেকেই সেজন্য ভ্রমণের নেশা হয়ে গিয়েছে তাঁর। ভ্রমণের সময় যা দেখেন আর শোনেন, সেসব বিষয়ে যতটুকু পারেন লিখে রাখেন, যেন ভুলে না যান। পরে ভাবলেন স্বার্থপরের মতো কেবল নিজের মনের তৃপ্তির জন্য নোট লিখে রাখা ঠিক না, অন্যের সঙ্গেও এসব অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া উচিত। সবার পক্ষে সব জায়গায় যাওয়ার সময় বা সুযোগ হয় না, এই বিবেচনাতেই লিখেছেন তিনি। তার ভ্রমণকাহিনির উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করেছে যে তাঁর অনুমান অমূলক নয়।। ভ্রমণ সাহিত্য রচনায় তিনি যে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছেন, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares