প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই, যেভাবে চিনেছি ও তাঁর সাহিত্য : আনোয়ারা সৈয়দ হক

এখানে প্রখ্যাত কথা-সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের  সাহিত্য নিয়ে লিখতে হবে। তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে লিখতে হবে। কিন্তু তার আগে পাঠকের কাছে আমার কিছু কথা না বললেই নয়। হয়তো আর বলার সুযোগ পাব না। সময়ের স্রোতে সবকিছু ভেসে যাবে।

সেটা ছিল আমার জীবনের বিরান একটা সময়। মেঘে ঢাকা সময়। স্বামী-হারা সময়।

বড় দুঃসময়। চোখের নিমেষে আমার চিরদিনের চেনা পরিবেশ যেন অচেনা হয়ে যায়। মানুষের কিছু নগ্ন রূপও প্রত্যক্ষ করি, যেটা স্বামী বেঁচে থাকতে কোনোদিন কল্পনাও করিনি।

আবার অনেক মানুষের সাহায্য করার জন্য হাত বাড়ানোও দেখতে পাই। বড় কৃতজ্ঞ বোধ করি তাদের প্রতি। কিন্তু মুখে কোনো প্রকাশ করতে পারিনে। শুধু নীরবে দেখে যাই। কিন্তু কখনও তাদের আন্তরিকতার কথা ভুলি না।

বেভুল হয়ে এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াই। গাড়ি করে চলে যাই দূর দূর সব জায়গায়। অচেনা অজানা জায়গায়। রাস্তার ধারে আড়াল খুঁজে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। আবার রাস্তার ধারেই গাড়ি থামিয়ে অচেনা দোকান থেকে চা বিস্কুট কিনে খাই। হঠাৎ করে নিজের হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীটির কথা মনে করি। এইভাবে পথ চলতে কতদিন আমরা পথের ধারে চা খেয়েছি।

কোনোদিন যাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় এলাকায়। সেখানে একভাবে দাঁড়িয়ে থেকে শীতের পাখি দেখি। দেখি প্রতিটি পাখি জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে! তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে যেন মনে হয় এ এক আশ্চর্য আবিষ্কার। আগে যেন কোনোদিন এসব খেয়াল করিনি। মানুষের যেমন সঙ্গী থাকে, পাখিদেরও কি তেমন ?

আরও দেখি সেখানে কত ছাত্রছাত্রী আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে সতীর্থদের সঙ্গে। হাসি ও কলকাকলিতে ভরে তুলেছে পরিবেশ। কেউ কেউ প্রেমে পড়েছে, সেটা তাদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। ক্যানটিনের সিঁড়ির ওপরে বসে আমি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখি। ভিড়ের মধ্যে এ রকম একজন বয়স্ক মহিলাকে আপন মনে বসে থাকতে দেখে তাদের কেউ কেউ হয়তো অবাক হয়, অধিকাংশই কিছু খেয়াল করে না। তারুণ্যের দীপ্তি তাদের মনজুড়ে, এইসব খেয়াল করবার সময়ও তাদের নেই। মনে মনে ভাবি, হায়রে অবোধ, হায় রে বাছা, জীবন যে কত জটিল তা যদি তোমরা একটু জানতে! আমিও তো একদিন তোমাদের মতোই এ রকম ছিলাম। আমার কোনো চিন্তা ছিল না। দায়িত্ব ছিল না। কোনো বিশেষ মানুষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ছিল না। কোনো প্রেমও ছিল না। প্রেমহীন সে জীবনও কত যে আনন্দের ছিল। কত নিষ্পাপ ছিল।

তারপর জীবনে প্রেম এসে হানা দিল কি, টানাপোড়েন শুরু হয়ে গেল, কষ্ট শুরু হয়ে গেল। বিরহব্যথা  শুরু হয়ে গেল। আর তারপর জীবন ক্রমে ক্রমে জটিল হয়ে গেল। জটিলতার পৃথিবীতে পথচলা শুরু হয়ে গেল। এইসব ভাবতে ভাবতে আমি সিঁড়ির ওপরে বসে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার সোনালি সেই দিনগুলোর কথা চিন্তা করি। সোনায় মোড়া হারানো সেই দিনগুলোর কথা চিন্তা করি। না, আমি কাঁদি না, আমার কান্না পায় না, শুধু দীর্ঘশ^াস ফেলে ভাবি, কেন আমি সেই দিনগুলোকে সঠিকভাবে তখন মূল্যায়ন করতে পারিনি।

জীবনসঙ্গী হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। দিশেহারা হয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করি।

এই বিশাল বাড়ির মধ্যে আমার শ^াস বন্ধ হয়ে আসে। বাড়িতে ঢুকতে ইচ্ছে করে না। মাত্র কিছুদিন আগেই কাজ সেরে রাতে বাড়ি ফেরার সময় মন উদ্বেল হয়ে উঠত। ভাবতাম, সারাদিনমান বাদে তাঁকে এখন চোখে দেখব। তাঁর সঙ্গে বসে রাতের আহার সারব, তারপর সারা দিন ধরে কি করলাম না করলাম তার ফিরিস্তি দেব; এখন বাড়ির কাছে এলে ভয় করে। মনে হয় গাড়ি ঘুরিয়ে অন্যদিকে চলে যাই। আর আমার শোকগ্রস্ত বাড়ি যেন অভিমান ভরে আমার দিকে তাকিয়ে অনুযোগ করে, তুমি সারাদিন কোথায় পালিয়ে বেড়াও ? শোক কি কেবল তোমারই ? যে আমি তোমাদের আজ ৩৫ বছর ধরে এই বাড়িতে ধারণ করে আছি, সেই বাড়ি, যখন আমি ছিলাম ভাঙাচোরা অবস্থায়, তখন থেকে, আর এখন একজন চলে গেল বলে আমাকে একা ফেলে চলে যেতে চাও ? তুমি কি জানো, এ বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণায় সে মিশে আছে ?

সে তো হারিয়ে যায়নি!

এর কিছুদিন বাদে আমি যেন একটু থিতু হই।

এমন একটি কঠিন সময় একদিন স্বনামধন্য কথা-সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই ভাইয়ের মোবাইল ফোন।

তিনি বললেন, ভাবি, আপনার সঙ্গে বসে একদিন একটু কথা বলতে চাই।

আমি বললাম, কোথায় কথা বলবো ? বাড়িতে আসবেন ?

শুনে হাসনাত ভাই বললেন, তাহলে তো খুব ভালো হয়। কবে আসবো ?

এ কথা বলার দু’একদিনের ভেতরেই হাসনাত ভাই তার গাড়ি নিয়ে সেই কতদূর ধানমন্ডি থেকে আমার বাড়িতে এলেন। আমি তখন আমার বাড়ির চেম্বারে বসে ছিলাম। সেদিন ছিল ছুটির দিন।

হাসনাত ভাই এলে আমি তাঁকে যত্ন করে বাড়ির ভেতরে এনে বসালাম। তিনি সিটিংরুমে বসে আমার সঙ্গে এটা সেটা কথা বলতে লাগলেন। তারপর বললেন, ভাবি, আমি কবি সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক কে  নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে চাই, আপনি কি সাহায্য করবেন ?

তাঁর কথা শুনে আমি অবাক।

এত বড় মাপের একজন লেখক সৈয়দ হককে নিয়ে একটি জীবনী-উপন্যাস লিখতে চান, এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে ? বিশেষ করে যে লেখকটি বিখ্যাত চিত্রকর নভেরাকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন, চিত্রশিল্পী সুলতানকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন, এবং সেসব লেখা বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে অপূর্ব সব সংযোজন হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, সেখানে সৈয়দ হকও তাঁর কলমের লেখনীতে উঠে আসবেন জীবন্ত হয়ে, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে ?

আমি তাঁর কথা শুনে বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু তবু বললাম, সময় করে পারবেন ভাই লিখতে ?

হাসনাত ভাই আত্মবিশ^াসের সঙ্গে বলে উঠলেন, পারব।

তো এরপর থেকে শুরু হয়ে গেল। এর দুসপ্তাহের ভেতরেই আমি হাসনাত ভাইয়ের কাছে ইন্টারভিউ দিতে বসলাম। জায়গাটা হলো ২৭ নম্বর ধনমন্ডির ‘বেঙ্গল বুকস’। প্রথমে নিচ তলা, যেখানে প্রচুর তরুণতরুণী সেই সকাল থেকে আড্ডা দিচ্ছে, প্রচুর পুরোনো বই চারদিকে ছড়ানো ছিটোনো। তাদের কথা এবং কলহাস্যে ভালো করে কিছু কানে শোনা দায়। এ রকম কয়েকদিন নিচে বসে থেকে আমাদের কাজ এগোলো না দেখে আমরা দোতলার ক্যাফে-তে  উঠে বসলাম। ক্যাফেটা ছোট্ট হলেও খুবই সুন্দর, নির্জন এবং পরিচ্ছন্ন। তরুণ ছেলেরা সেখানে অর্ডার নেবার জন্যে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আবহটা একটু বিদেশি ধরনের। সেখানে ছোট ছোট টেবিল চেয়ার। দেখে মনে হয় যেন বাংলাদেশ নয়, ফ্রান্সেরই কোনো একটি ক্যাফেতে আমরা বসে আছি! আবহাওয়ার ভিন্নতার জন্য খাবারের দাম একটু বেশি। সেখানে বসে আমরা অর্ডার দিলাম ক্লাব স্যান্ডউইচের। তার সঙ্গে ক্যাপুচিনো। এরপর শুরু হলো কথোপকথন। একেবারে সেই আদি থেকে টান দিলেন হাসনাত ভাই। কবে, কোথায়, কীভাবে সৈয়দ হকের জীবন শুরু হলো। আমার জন্য ব্যাপারটা একটু কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তবু আমি প্রাণপণে চেষ্টা করলাম সৈয়দ হকের ব্যাপারে যতটুকু জানি তা বিশদ করে বলতে।

লক্ষ করলাম হাসনাত আবদুল হাই ভাইয়ের হাতে ছোট ছোট সাইজের খাতা। সেখানে তিনি আমার কথাগুলো টুকে নিতে লাগলেন। এর আগেই আমি জানতাম সৈয়দ হক সম্পর্কে যেখানে যত মেটেরিয়াল পেয়েছেন সব জোগাড় করেছেন। এখন লিখতে বসবার আগে আমার কাছ থেকে সবকিছু জানতে চাইছেন। একেকটা প্রশ্ন তিনি করেন এবং আমি আপন মনে বলতে থাকি। তিনি মাঝে মাঝে আমাকে থামিয়ে দিয়ে আবারও প্রশ্ন করেন, সেই একই প্রশ্ন। বুঝতে পারি যে তিনি চান এমন কোনো মন্তব্য তাঁর বইতে যেন না করেন যেটা সত্য নয়, যদিও উপন্যাস লিখতে গেলে কোনো না কোনো সময় কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। সে আশ্রয় তিনি নেবেন যখন প্রয়োজন হবে।

আমি নিজে খুব একটা পরিষ্কার মগজের নয়। অনেক কথা আগে পিছে হয়ে যায়। আবার সেটাকে শুধরে নিতে হয়। তবু যাহোক সৈয়দ হকের ওপরে একটা জীবনী উপন্যাস লেখা হবে বলে আমি খুব খুশি।

এভাবে সৈয়দ হককে নিয়ে একটি ক্যাফেতে বসে আলোচনা, তাঁর কথা আলোচনা, তাঁর শৈশবের কথা, যৌবনের কথা, তাঁর সাহিত্যের কথা, এত বড় একজন রাশভারী কথা-সাহিত্যিকের সঙ্গে, যিনি তাঁর ওপরে লিখবেন বলে কলম ধরেছেন, আমি যেন ধীরে ধীরে আমার শোক থেকে জেগে উঠতে লাগলাম!

আমি যেন সৈয়দ হককে নিজেও দূর থেকে চোখে দেখতে লাগলাম। 

আমি হাসনাত আবদুল হাই ভাইয়ের ওপরে কৃতজ্ঞতা বোধ করি।

এভাবে দু’-এক সপ্তাহ পর পর গ্যাপ দিয়ে হাসনাত ভাই বেশ কিছু নোট করলেন। বইও জোগাড় হলো বেশ কিছু। এর মধ্যে একদিন ক্যাফেতে বসে নোট নিতে নিতে হাসনাত আবদুল হাই বলে উঠলেন, ভাবি, আমি এবার একটু ভিন্নভাবে লেখাটা লিখব চিন্তা করেছি।

আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কেমন ?

তিনি বললেন, এবার আমি একজন লেখকের জীবনী মাত্র লিখব না, তাঁর সহধর্মিণীর কথাটাও লিখব! যিনি নিজেও লেখক।

আমি তাঁর কথা শুনে হতবাক। বললাম, সেকি, আমার কথা আবার লিখবেন কেন ? আমি তো বেঁচে আছি!

হাসনাত ভাই শুনে বললেন, তাতে কি ? শুধু হক ভাইয়ের কথা এখানে লিখলে হবে না, আমি এবার দুজন লেখককে এক ছাদের নিচে রেখে লিখতে চাই।

হাসনাত ভাইয়ের কথা শুনে আমি লজ্জায় যেন মরে গেলাম। ভাবলাম, হায়, হায়, হাসনাত ভাই বলেন কী। পাঠকেরা এ কথা শুনলে কী ভাববেন। ভাববেন , নিজে বেঁচে থেকে নিজের ঢোল পিটাচ্ছি আমি।

আমি বললাম, তা হয় না, হাসনাত ভাই। আমার কথা আপনি লিখবেন না, আমি তো এখনও বেঁচে আছি।

শুনে হাসনাত ভাই বললেন, তো থাকেন বেঁচে, তাতে কী ? আমার মনে হয় এর আগে আর কোনো দম্পতি-কথাসাহিত্যিক নিয়ে লেখা হয়েছে বলে মনে হয় না। এটা হবে ইউনিক।

আমি তাঁর কথা শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাম। পর মহূর্তে আমার মনে হলো এভাবে লিখলে সৈয়দ হককে ছোট করা হবে। কারণ তাঁর সাহিত্যের জগৎ বিশাল ও বিস্তৃত। তাছাড়া তাঁর সাহিত্যের জীবন আর আমার জীবন সম্পূর্ণ আলাদা। আমার শৈশব ছিল না কোনো সোনায় মোড়া। আমার শৈশব ও কৈশোর ছিল ভীষণ ট্রমাটিক একটি সময়। একটি তালগোল পাকানো ভাঙাচোরা সময়। আর তাছাড়া আমি এমন কিছু আহামরি হিসেবে নিজেকে সাহিত্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। বস্তুত পক্ষে আমি যে হার্ডকোর একজন লেখক সেটি প্রতিষ্ঠা করতে করতেই আমার জীবন কেটে গেল!

আমি না, না, করতেই লাগলাম। কিন্তু হাসনাত আবদুল হাইয়ের মতো লেখকের জন্য সেটি কোনো ধর্তব্যের ভেতরেই ছিল না। কারণ তিনি নিজেই হার্ডকোর একজন লেখক। ডাকসাইটে লেখক। প্রচুর তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতা। প্রচুর দেশবিদেশে ভ্রমণ।

কিছুদিন বাদে প্রথমা থেকে হাসনাত আবদুল হাইয়ের বই বেরুলো। বইয়ের নাম হেমিংওয়ের সঙ্গে।

সেখানে সৈয়দ হকের সঙ্গে সঙ্গে আমারও জীবন-কথা উঠে এলো। আমার জীবন-কথা এমনভাবে উঠে এলো যে আমার আত্মীয়-স্বজনেরা আমার ওপরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। দেশ-বিদেশ থেকে কল আসতে লাগল। আমি নাকি আমার পরিবারকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চেষ্টা করেছি! আমি তাদের বোঝাতে পারলাম না যে জীবনের সত্য কোনোদিনও হারিয়ে যায় না, যাওয়ার মতো নয়, আর সাহিত্য মানুষের জীবন-সত্য নিয়ে কথা বলে। তাই বলে পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না, রক্তের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না, কারণ আমি আমার রক্তের ভেতরেই সেই অঙ্গীকার বহন করে বেড়াচ্ছি এবং মাথা উঁচু করে খুব গর্বের সঙ্গেই বহন করে বেড়াচ্ছি।

তা ছাড়াও লেখক হাসনাত আবদুল হাই যদি মনে করেন আমার জীবন-সাহিত্যে জীবনের এইসব অভিজ্ঞতারও দাম আছে, তো আছে। কারণ আমি মরে গেলেও তো লোকে কখনও না কখনও আমার সাহিত্য নিয়ে কথা বলবে।

এই এত বড় ভূমিকা এখানে লিখলাম শুধু এটুকু বলবার জন্য যে, আমরা লেখকেরা অধিকাংশ লেখকদের সেভাবে চিনিনে, বা চিনতে চেষ্টাও করিনে। হাসনাত আবদুল হাই সেখানে এক ব্যতিক্রম বলা যেতে পারে। তদুপরি তিনি আমাদের সাহিত্য জগতে বহু বছর ধরে এক উজ্জ¦ল জ্যোতিষ্কের মতো আকাশে বিচরণ করছেন। আমার পড়ার ঘরে সংগৃহীত তাঁর বইগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি হতবাক হই। প্রতিটি বইয়ের ওজন দুই কেজির নিচে নয়, বরং ওপরে। আর তাঁর প্রতিটি বই হচ্ছে একেকটি সোনার খনি। গল্প, উপন্যাস, জার্নাল, কলাম কি নেই সেই রচনাবলির ভেতরে। তাঁর রচনাবলি আমি পড়তে শুরু করেছি প্রায় এক মাস আগে, অন্য সব কাজ সারতে সারতে, কিন্তু মাঝখান থেকে তিন নম্বর ভল্যুমটি মাত্র পড়ে শেষ করতে পেরেছি। প্রথম জীবনে তাঁর রচিত জীবনী উপন্যাসগুলো পড়েছিলাম, এবং যেন একটি ঘোরের মধ্যে ছিলাম কিছুদিন।  সেই অভিজ্ঞতা হাতে নিয়ে এখন আবার পড়তে বসে  দেখি, এ অসম্ভব! এক কথায় তাঁকে মূল্যায়ন করা অসম্ভব। তাঁর রচনার প্রায় প্রতিটি সংকলন ৮০০ পৃষ্ঠার নিচে নয়।

হাসনাত আবদুল হাই রচনাবলির ভেতরে ৩ নম্বর ভল্যুমটি অতি উৎকৃষ্ট একটি ভল্যুম।

ভল্যুমটিতে চারটি উপন্যাস, একটি জার্নাল ও একটি অনিয়মিত কলাম আছে।

এর ভেতরে সবচেয়ে বেশি আমাকে আকৃষ্ট করেছে তাঁর রচিত ইন্টারভিউ উপন্যাসটি।

উপন্যাসটির শুরু হয়েছে একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের নিজের চলমান জীবন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। একজন পুরুষ লেখক। যাকে আমরা মোটামুটিভাবে লিবারেল বলতে পারি, যাকে জীবনে কোনো চাকরি করতে হয় না, যেহেতু তাঁর স্ত্রী যথেষ্ট ধনশালী, এবং সেজন্য পূর্ণকালীন সাহিত্যচর্চা করতে তিনি সক্ষম। স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো, স্ত্রী সন্দেহবাতিকে ভোগেন না, বরং নিজের আত্মীয়স্বজন দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন, প্রায় ছুটির দিনে তিনি বোনদের বাড়িতে খানা খেতে ও তাস খেলতে যান। সেই রকম একদিনে একটি তরুণ মেয়ে জার্নালিস্ট, নাম শাহনাজ, দেখতে সুন্দরী, লেখক আলমের বাসায় হানা দিল। মেয়েটি নারীবাদী। আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিয়েই মেয়েটি লেখকের ইন্টারভিউ নিতে এলো। লেখকের লাইব্রেরি রুমে বসেই সে কথা বলতে লাগল, যেহেতু ‘ইন্টারভিউটা গতানুগতিক করতে চাই না।’

লেখক আলম দেখলেন ‘শাহনাজ বেশ দীর্ঘাঙ্গী এবং তার ফিগারটা তারুণ্যের তাপে টগবগ করছে। ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে সে চঞ্চলতা।’

লেখক আলম মনে মনে মুগ্ধ হয়ে বলে উঠলেন, ‘তুমি তো দারুণ দেখছি।’

‘দারুণ মানে ?’

আলম উত্তরে বললেন, ‘দারুণ মানে এগ্রেসিভ।’

উত্তরে শাহনাজ সপ্রতিভভাবে বলল, ‘খুব অবাক হচ্ছেন বুঝি ? কেন অবাক হচ্ছেন জানেন ? অবাক হচ্ছেন এইজন্য যে এটা পুরুষদের মনোপলি ভেবে নিয়েছেন আপনারা।’

অর্থাৎ পুরুষেরা স্বাভাবজাতভাবে এগ্রেসিভ, যা তাদের চরিত্রে বেশ খাপ খেয়ে যায়। কিন্তু মেয়েদের ব্যাপারে এটা একটু অস্বাভাবিক। 

কাহিনিটি অবশেষে ঘুরপাক খায় মেয়েদের লিবারেশন মুভমেন্ট নিয়ে।

শাহনাজ লেখক আলমের লাইব্রেরিতে ঢুকে বলল, ‘এই যে দেখছি সব নারীবাদীদের লেখা। জারমান গ্রিয়ারের ফিমেল ইউনাক, বেটি ফ্রেইডানের ফেমিনিন মিসটিক, সিমোন দ্য ব্যুভোয়ার সেকেন্ড সেক্স… বলতে চান এসব বই শুধুই সাজিয়ে রেখেছেন ? পড়েননি একটাও ?’

আলমের উত্তর ‘সাজিয়ে রাখব কেন ? পড়েছি কিছু কিছু।’

এরপর কথা শুরু হয়ে যায় নারী আন্দোলনের পুরোধাদের নিয়ে। ভার্জিনিয়া উলফ উঠে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু লেখকের দৃষ্টি তরুণ শাহনাজের শরীরের দিক থেকে বিচ্যুত হয় না। কথা বলতে বলতে শাহনাজ যখন পিঠ বাঁকিয়ে আড়মোড়া খায়, তার ফিগারটা তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লেখক আলমের মনে হয় একটি উঠতি বয়সী বাঁশগাছ বাতাসে যেন দোল খাচ্ছে।

শাহনাজ আধুনিক যুগের মেয়ে। লেখকের এই ধ্যান ধারণার সে থোড়াই কেয়ার করে। সে পত্রিকার জগতে কাজ করে। পত্রিকার জগতে বৈচিত্র্য আছে। কিন্তু এখানেই থেমে থাকার তার ইচ্ছে নেই। সে একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান শুরু করতে পারে জেন্ডার বিষয়ে। সে তরুণ। বলতে গেলে একরোখা তরুণ। সে এ পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায় মানুষের মতো। তারপরও লেখক আলম যখন তাকে টম বয় বলে আখ্যায়িত করেন, তখন সে কপট রাগে মুখ ভেংচে আলমকে বলে, ‘ইউ মেল শওভেনিস্ট পিগ।’

ব্যবহারটা তখন যেন হঠাৎ করে বেশ মেয়েলি ঢং এর হয়ে যায়।

প্রথম দিনের ইন্টারভিউ শেষে মেয়েটি যখন মাথায় হেলমেট পরে মোটরসাইকেল চালিয়ে চলে যেতে চায়,  লেখক আলম তার আগে যেন গার্ডিয়ানের মতো মেয়েটিকে সতর্ক করেন, ‘ওড়নাটা পেছন দিকেই ঝুলিয়ে রাখবে ? বেশ রিস্কি। ইসাডোরা ডারকান নামে একজন মার্কিন নর্তকী গলায় স্কার্ফ জড়িয়ে মারা গিয়েছিলেন।’

আর তার উত্তরে শাহনাজ মোটেই সতর্ক না হয়ে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিতে দিতে নির্বিকার বলে, ‘জানি।’

লেখক আলমের সতর্কতাকে সে যেন আমলেই নিল না। কারণ লেখক আলমের সতর্কতার পেছনে যেন একটা থ্রেটও লুকিয়েছিল, যার অর্থ বেশি বাড় বাড়তে নেই! এবং শাহনাজ তাই তার সতর্কতাকে আমলে নিল না যেন ইচ্ছে করেই।

এবং লেখক আলম লেখার সময় যদিও লেখকজনিত ব্যবহারে নিজেকে আবৃত রেখেছিল, যে মুহূর্তে শাহনাজ বাড়ি ছাড়ল ওমনি সে তার তার ব্যবসায়ী বন্ধু গফুরকে ফোন করে বলল, ‘না দেখলে আর না শুনলে বিশ^াস করবি না। ’

তার উত্তরে আলমের বন্ধু গফুর বলল, ‘কী’

আলম বলল, ‘শাহনাজ নামে একটা মেয়ে। ইন্টারভিউ নিতে এসেছিল। রীতিমতো লাইভ ওয়ার। মুখে কিছুই আটকায় না। ধমকিয়ে, ভয় দেখিয়ে, উপদেশ দিয়ে, ঠাট্টা করে এইমাত্র গেল। সি ইজ ফ্যান্টাসটিক।… মাই গড, হোয়াট অ্যান এক্সপেরিয়েন্স।’

পরিহাসের ব্যাপার এটাই হলো যে এতসব ইনটেলেকচুয়াল তর্কবিতর্ক সব সেই নারীর চেহারা ও ব্যবহারেই বিদ্ধ হয়ে থাকল! 

এর পরবর্তী সেশনে সাংবাদিক শাহানাজ যখন আবার লেখক আলমের ইন্টারভিউ নিতে যায়, ইন্টারভিউ নারীবাদ নিয়ে ঘুরপাক খায়।

 লেখক আলম একসময় শাহনাজকে বলে, ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং… তোমার বিষয়টা, ফেমিনিজম। আমি মাত্র পড়া শুরু করেছি। ভেরি ইন্টারেস্টিং অ্যান্ড টাফ গোয়িং…

সাংবাদিক শাহনাজ উত্তরে ভ্রু কুঁচকে বলল, আপনাদের পুরুষদের কাছে শুধুই ইন্টারেস্টিং। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মেয়েদের কাছে ইট ইজ এ ম্যাটার অব সারভাইভাল।

তারপর থেমে বলল, এই সারভাইভালের দুটি স্তর, নিচের স্তরে বেঁচে থাকার সংগ্রাম যেমন চাকরির সুযোগ, ইকুয়াল পে, ভোটের অধিকার, তালাকের অধিকার, বাচ্চা নেবার অধিকার ইত্যাদি এবং সেই স্তর ছাড়িয়ে ক্রমে ওপরে ওঠা যেখানে সংগ্রাম হবে মানুষ হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার। এবং এই দুই স্তর মিলিয়ে ফেমিনিজমের সংগ্রাম। এবং এই সংগ্রাম হবে ডেড সিরিয়াস।’

 সাংবাদিক শাহনাজের ধারণায় ফেমিনিজমের ইন্টরেস্টিং হওয়ার কোনো দায় না। কারণ পুরো জিনিসটা নট এ ম্যাটার অব জোক।

এতসব গুরুগম্ভীর আলোচনার ফাঁকে আলম কফি আনার জন্য কিছুক্ষণের জন্য ঘর ছাড়ল এবং পর মুহূর্তেই আর্তচিৎকার শুনে দৌড়ে স্টাডি রুমে ঢুকে দেখল নারীবাদী সাংবাদিক শাহনাজ দু’পা চেয়ারে তুলে শঙ্কিত হয়ে চারিদিক তাকিয়ে দেখছে।

আলম বলল, কী হলো ? অমন করছ কেন ?

উত্তরে শাহনাজ বলল, তেলাপোকা, কয়েকটা লাফিয়ে পড়েছিল উড়ে উড়ে। কী সাংঘাতিক।

আলমকী কাণ্ড। তেলাপোকার মতো নিরীহ পোকা দেখে এত ভয় ? আমি ভাবলাম সাপ টাপ বুঝি! লেখকের এই কথার ভেতরে ব্যঙ্গোক্তি অনায়াসে ধরা গেল। এত বড় বড় আন্দোলনের কথার মধ্যে সামান্য তেলাপোকা কী করে নারীরজগতে হুলুস্থূল বাধিয়ে দিতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দিয়ে যেন লেখক আলম নারী আন্দোলনের হাস্যকর দিক তুলে ধরার প্রয়াস পেল।

এবং এই ফাঁকে লেখকের মনোগ্রাহীতাও ধারা পড়ল। কারণ নারীকে এভাবে ভীত অবস্থায় দেখতে পুরুষের ভালোই লাগে। হোক না সে পুরুষ একজন স্বনামখ্যাত লেখক।

শাহনাজ দু’পা হাত দিয়ে ধরে চেয়ারে গুটিসুটি হয়ে বসে থেকে বলল, নিরীহ না ছাই। দেখলেই গা শির শির করে।

লেখক আলম ড্রয়ার থেকে এরোসল বের করে চারিদিকে স্প্রে করে দিয়ে বলল, ‘এবার পা নামিয়ে বসতে পার। আর আসবে না। অবশ্য এই যে তুমি পা তুলে সভয়ে বসে আছ, এই ভঙ্গিতে তোমাকে চমৎকার দেখাচ্ছে। আমার ফিট ফেটিশিজম নেই। কিন্তু মে আই সে, তোমার পা দুটি সুন্দর।’

আর তার উত্তরে শাহানাজ বলল, ‘ফেটিশিজম না থেকেই এত। থাকলে না জানি কী করতেন। আচ্ছা থাক এসব।’

…শাহনাজ বলল, ‘নারীর সারভাইভালের যে দ্বিতীয় স্তর, সেটিই মৌলিক এবং উচ্চতর পর্যায়ের। এই সারভাইভাল কেবল পুরুষের সমতুল্য হওয়ার সংগ্রাম না। এটি একটি অ্যাবসল্যুট লক্ষ্য। এর উদ্দেশ্য নারীর চেতনায় নারীর অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকা।’

এরপর যা ঘটল সেটি খুব কৌতুককর একটি দৃশ্য। কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক শাহনাজের শাড়ির আঁচল বুক থেকে পড়ে গেল। আর লেখক আলম সেদিকে তাকিয়ে নিচু করে ফেলল তার মুখ।

সেটা লক্ষ্য করে শাহনাজ হেসে বলল, ‘তাকাতে লজ্জা পাচ্ছেন বুঝি ? এতে লজ্জার কী আছে ? উদোম গায়ে তো নেই, আচ্ছাদন রয়েছে।… বলে শাড়ির আঁচল বুকে টেনে তুলে দিল শাহানাজ।

তারপর সে আবার তার আলোচনায় ফিরে গেল। যেখানে সিমোন দ্য ব্যুভোয়া তার বইতে বলছেন, ‘কেউ মেয়ে হয়ে জন্মায় না, তাদের মেয়ে হয়ে বেড়ে উঠতে হয়।’

ব্যুভোয়া বললেন, পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়েরা হলো এ সোস্যাল কন্সট্রাক্ট। পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গীতে তৈরি একটি প্রাণী।

এবং জার্মান গ্রিয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী  নারী-প্রাণীকে পুরুষের উপভোগের বস্তু হিসেবে নিজের দেহকে আকর্ষণীয় করে রাখতে হয়। ফলে মেয়েদের নিজস্ব সেক্সুয়ালিটি বলে কিছু আর থাকে না। এক কথায় ফিমেল ইউনাক। যার অর্থ হলো মোগল হারেমের সেই পুরুষ খোঁজা। অর্থাৎ নারী নপুংশক। সুতরাং নারীকে যদি ঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, তাহলে তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে হবে।

এতসব আলোচনার পর শাহানাজ যখন বিদায় নেবে এবং মোটরসাইকেলে তার পুরুষ বন্ধু তার জন্য অপেক্ষা করে নিচে তখন সেটা দেখে সুশীল সংসারের স্বামী ও লেখক আলম অন্যমনস্ক হয়ে যায়। এবং শাজনাজ বিদায় নেবার আগে আলমের স্ত্রীকে সাবধান করে দিয়ে যায় একথা বলে যে, স্বামীকে একাকী একটি যুবতী মেয়ের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারভিউ নেবার অজুহাতে এভাবে একাকী ছেড়ে দেওয়াটা কি ঠিক ?

যুবতী শাহনাজের কথায় লেখক আলেেমর স্ত্রী মোটেই শংকিত হয় না, কারণ তার আছে সেই আত্মবিশ^াস যাকে বলা যায় স্বাধীন অর্থনৈতিক সত্তা। তা ছাড়াও আছে তার স্বামী সম্পর্কে নিজস্ব আত্মবিশ^াস।

সে একদিন তার দুলাভাই ও বোনদের সঙ্গে তাস খেলে এসে লেখক-স্বামী আলমকে বলল, ‘দুলাভাই একজন কার্ড শার্প। কীভাবে কার্ড শাফল করে ইস্কাপনের টেক্কা, রাজা রানি, গোলাম আর দশ পাওয়া যায় সেই ট্রিকস রপ্ত করে ফেলেছেন। আমরা সব বোন বই পড়ে সেই তথ্য পেয়ে গেলাম। পারফেক্ট শাফলস হলেই রয়্যাল ফ্ল্যাশ পাওয়া নিশ্চিত। এতে কোনো লাক নেই।’

আর স্ত্রীর কথা শুনে আলম বলল, ‘কার্ড খেলাতেও তাহলে স্কিল প্রয়োজন ?’

মীরা (স্ত্রী) তার গায়ে আঙুলের খোঁচা দিয়ে বলল, ‘কার্ডে ফাঁকি দিতে স্কিল প্রয়োজন। আর সেটা ধরার জন্যও।’ বলে সে অর্থপূর্ণভাবে তাকাল। তার মুখে রহস্যময় হাসি।

এই ফাঁকে বলে রাখা ভালো যে লেখক আলম তার ব্যবসায়ী বন্ধুু আজহারের প্রেয়সী লুবনাকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে অনুরুদ্ধ হয় এবং স্ত্রীর অলক্ষ্যে ধীরে ধীরে তার বাড়িতে গিয়ে লুবনার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। এই বন্ধুত্ব একটি ক্যাট অ্যান্ড মাউস গেমের মতে হয়ে দাঁড়ায়। যৌবনবতী, লাস্যময়ী লুবনা একবার লেখক আলমকে কাছে টানে আবার ইচ্ছেমত তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। একবার হাতছানি দেয়, তার পর মুহূর্তে হাসতে হাসতে দূরে সরে যায়। বিবাহিত আলম কনফিউজড বোধ করে। নিজের বিছানায় এলিয়ে পড়ে থেকে লুবনা হাতছানি দেয় কিন্তু সে পুরুষকে নিজের শরীর স্পর্শ করতে দেয় না। এই সেডিজিম কোনো নারীবাদ হতে পারে না। একটি বিশেষ পরিবেশে আলম তার অতীত ভুলে লুবনাকে কাছে টানতে চায়, কিন্তু লুবনা তাকে তার অতি কাছে টেনেও তাকে সুযোগ দেয় না। এটাকে সে তার শরীরের বিজয় মনে করে। পুরুষের ওপর আধিপত্য মনে করে। নিজকে এর জন্য কতদূরে নিচে টেনে আনছে সে সম্পর্কে তার কোনো সচেতনতা থাকে না। লুবনার কাছে বডিই সবকিছুর মূলে। এই বিকৃত মানসিকতার মূলে আছে ছেলেবেলায় সে একজনের দ্বারা  ধর্ষিত হয়েছিল। তাই বডির শক্তি সে বিকৃতভাবে আবিষ্কার করেছিল সেই বয়সেই। কিন্তু লুবনা কখনও চিন্তা করতে পারে না যে ৭০ বছর বয়সে তার বডি হয়ে যাবে একটা হিপোপটেমাস, কারণ অতিরিক্ত শারীরিক ব্যায়াম ছেড়ে দেওয়া মাত্রই বডি পাগলের মতো এলিয়ে যাবে।  

কিন্তু এখন এই বয়সে নিজের শরীর দিয়ে বিলাত ফেরত লুবনা পাওয়ার গেম খেলে পুরুষ আলমের সঙ্গে। লুবনা বিবাহিত, তার স্বামী বার বার করে লন্ডনে তাকে ফিরে যেতে অনুরোধ করে। কিন্তু লুবনা বলে, সে বাসনমাজার জন্য আর লন্ডনে ফিরবে না। তার বাংলাদেশই ভালো লাগে। কারণ এখানে রান্নাকরার, বাসন মাজার লোক আছে। লুবনা ভুলে যায় পৃথিবীর বড় বড় নারীবাদী লেখক এই পশ্চিমা দেশ থেকেই এসেছে। এবং তারা নিয়মিত থালাবাসন ধুয়ে, রান্না করে, পায়খানা পরিষ্কার করে, নিজের খাবার নিজে তৈরি করেই নারীবাদের ওপরে বই লিখেছে। সেখানে সিমোন দ্য বেভোয়া, জারমান গ্রিয়ারও তাই।  লুবনা লাস্যময়ী। নিয়মিত বাসায় মহিলা এনে সে শরীর ম্যাসাজ করে। সে বুদ্ধিমতীও। স্বাধীন ব্যবসা করে। আপাতদৃষ্টিতে তার অপর পুরুষের সঙ্গে প্রেম ভালোবাসা করতে কোনো দ্বিধা নেই। তবে ইচ্ছে না হলে সে তার নিজের শরীরের ওপরে কাউকে আধিপত্য করতে দেয় না।

লুবনা নারীর অধিকারবোধ এবং নারী স্বাধীনতা বিষয়ে বেশ সচেতন। কিন্তু নিজকে লুবনা সেভাবে যেন গড়ে তুলতে পারে না। গড়ে তুলতে না পারার কারণ লুবনার শরীর দিয়ে হাতছানি খেলাটা অচিরেই পাঠকের কাছে পুরনো খেলা বলে বোধ হতে থাকে। তার আপাত ভদ্রতাবোধ ও রুচির ঘেরটোপ ডিঙিয়ে তার ব্যবহারের অন্তসারশূন্যতা প্রকাশ পেয়ে যায় ধীরে ধীরে। মুখে যতই সে বলুক যে সে নিজের শরীরের দাবিতে শরীরচর্চা করছে, এতে যদি পুরুষ আকৃষ্ট হয় তো হোক, তাতে তার কিছু করার নেই; এটিও একটি ছল। কারণ তাই যদি হতো তাহলে কখনওই সে একটি অতিশয় নির্জন কক্ষে একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষের সমুখে ঘরোয়া পরিবেশে নীল রঙের জামদানি শাড়ি, মুখে সযত্ন প্রসাধন, ঠোঁটে জ্বলন্ত লাল কয়লার মতো লিপিস্টিক লাগিয়ে হাজির হতো না। সাধারণ বেশেই হাজির হতো। এই মহিলার শরীর তাকে নাচিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। শরীর বৃদ্ধ হলে এই নারীর এই পাওয়ার গেমও যে অচিরে ডাস্টবিনে হাস্যকরভাবে নিক্ষিপ্ত হবে সে বিষয়ে পাঠকের বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না। নারী-স্বাধীনতার নামে দৈহিক স্বেচ্ছচারিতা শুধু পাঠককে একটু কিছুক্ষণের জন্য সুড়সুড়ি দেয় মাত্র। কোনো নারীই এই খেলো স্বাধীনতার পক্ষপাতিত্ব করতে রাজি নয়। এমন কি পুরুষ আলমও ক্রমাগতভাবে তার প্রতি বিরক্ত হতে শুরু করে।

এরপর ধীরে ধীরে উপন্যাস সমাপ্তির দিকে এগোয়।

মীরা আলমের স্টাডি রুমে উঁকি দিয়ে দেখল। ‘তারপর ভেতরে ঢুকে বলল, বলতে ভুলে গিয়েছি, সেই মেয়েটা ফোন করেছিল। কী যেন নাম ? আরে ওই পাগলাটে মেয়েটা।

উত্তরে লেখক আলম বলল, শাহনাজ ?  

হ্যাঁ। বলেছে আমাদের সঙ্গে খাবে একদিন।

খাবে ? হঠাৎ খেতে হবে কেন তাকে ? আলম অবাক হয়।

মীরা হেসে বলল, আমাকে দাম্পত্য পরিবেশে দেখে ইন্টারভিউয়ের বাকি অংশটা শেষ করতে চায়। ওইভাবে না লিখলে নাকি ইন্টারভিউ ন্যাচারাল হয় না। সম্পূর্ণও বলা যায় না। তাপর থেমে বলল, কী জানি বাপু। লেখালেখি ব্যাপারটাই খ্যাপামির বলে মনে হয়। কেউ বানিয়ে বানিয়ে অজস্র কথা লেখে।

কেউ মুখের কথা শুনে, অথবা খেতে দেখে। তুমিই ভালো বোঝ।

আলম বলল, মেয়েটা অন্যরকম। কারো সঙ্গে মেলে না। লেখকদের সঙ্গেও না।’

উত্তরে লেখকের স্ত্রী মীরা বলল, ‘তোমার সঙ্গেও না ? দুজনে তো খুব মিল দেখি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ কর বসে বসে।

আলম মীরার কথাগুলো ভালো করে শুনল। বুঝতে চেষ্টা করল। এর মধ্যে কোনো দ্ব্যর্থবোধ আছে কি না। জেলাসি ? বিদ্রুপ ? কিন্তু মীরা হাসছে নির্মল ভাবে। তার চোখে শুধুই কৌতুক।’

স্বামী স্ত্রীর এই কথোপকথনের পর আলম ভাবতে বসে। সে তার স্ত্রী মীরার কথা ভাবে। তার মনে হয় ‘না, সব জায়গাতেই সে কার্ড শার্প খোঁজে না। পারফেক্ট শাফল করছে কিনা দেখতে চায় না। সংসারে রয়্যাল ফ্ল্যাশ তার হাতেই এই বিশ^াস তার অটুট। কিন্তু কেমন করে তা হতে পারে ? বড় দুলাভাই কার্ডের টেবিলে যেমন ফাঁকি দিচ্ছিলেন এতদিন, আলমও কি কখনও কখনও তেমনি প্রবঞ্চনা করে না ? মীরার এই নির্বিকার, নিরাসক্ত ভাবটা মূলে তাহলে কী ? ইমোশনাল সিকিউরিটি ? মেয়েদের কাছে তাহলে সেটাই বড় ?’

এরপর সাংবাদিক শাহানাজ যখন লেখক আলমের ইন্টারভিউ ছাপবে বলে সবকিছু গুছিয়ে তোলে এবং বিদায় নেয়, তখন হঠাৎ করে একদিন কাগজের বড় একটা এনভেলাপ সকালবেলা লেখক আলমের বাসায় এসে হাজির হয়। সেই এনভেলাপ খুলে খবরের কাগজের দুটো ক্লিপিংস পায় আলম। খুলে দেখে তার একটার হেডিং হচ্ছে, ‘বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় খুলনায় কলেজ ছাত্রীকে এসিড নিক্ষেপ করেছে একদল পাষণ্ড।’

আরেকটি ক্লিপিংস এর হেডিং হচ্ছে, ‘ঘটনাস্থল ব্রাহ্মণবাড়িয়া। চার কন্যাসন্তান সহ ট্রেনের নিচে আত্মাহুতি দিলেন সুরাইয়া।’

কারণ সুরাইয়ার স্বামী ছেলে সন্তানের জন্য আবার বিয়ে করতে উঠেপড়ে লাগায়।

এই দুটো ক্লিপিংসের সঙ্গে শাহনাজের চিঠিও এলো, ‘আপনার ওপর লেখা ইন্টারভিউটা ছাপানো গেল না।… যেখানে সমাজ মডার্নিজমেই পৌঁছায়নি সেখানে লাকাঁ, দেরিদা, ক্রিস্টেভা, ইরিগেরে এদের আলোচনা খুবই একাডেমিক। ওসব এখন থাক’।

পুরো উপন্যাসটি শেষ করার পর পাঠকের যে উপলব্ধি হয় তা যেন ওপর থেকে তাকে মাটিতে আছড়িয়ে ফেলার উপলব্ধি। তখন আমাদের তথাকথিত বিদগ্ধ সমাজের গায়ে যে অতি আধুনিকতার লেবাস, সেটি যেন কে টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে। এবং মুহূর্তেই পুরো সমাজ যেন তার নগ্ন চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চার রাস্তার মোড়ে। অসহায় আত্মগ্লানিতে ভরে ওঠে মন। এ যুগের একজন শ্রেষ্ঠ কথা সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইকে ধন্যবাদ এ রকম একটি সুন্দর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উপন্যাস আমাদের উপহার দেবার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares