প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : কথাশিল্পীর আলোকচিত্র : রবিউল হুসাইন

বহুপ্রজ ছোটগল্প রচয়িতা, ঔপন্যাসিক, কলামিস্ট, ভ্রমণ-সাহিত্যিক, চিত্রশিল্প-চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক হাসনাত আবদুল হাই এদেশের গদ্য সাহিত্য জগতে একটি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী হয়েছেন তাঁর নিরন্তর নানা বিষয়ে রচনা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। একজন নিবেদিতপ্রাণ বুভুক্ষু পাঠক যেমন, তেমনি তিনি নিয়মিত বহু ধরনের সাহিত্য রচনার ভেতর দিয়ে নিজেকে সফলভাবে মেলে ধরেছেন। এবারে তিনি একটি চমক সৃষ্টি করেছেন আলোকচিত্রী হিসেবে নিজেকে প্রকাশিত করে। কার্যোপলক্ষে পৃথিবীর বহু দেশে তাঁর ভ্রমণ করার সৌভাগ্য হয়েছে এবং ওই সব সম্বন্ধে বহু ভ্রমণ-সাহিত্য রচনা করে পাঠকদের উপহার দিয়েছেন তাঁর সহজাত প্রতিভাদীপ্ত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার সাহায্যে। চেঙ্গিস খানের মঙ্গোলিয়াও একটি চমৎকার তথ্যবহুল ভ্রমণকাহিনি নিয়ে পাঠকদের ভেতরে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। এবারে ভূমধ্যসাগরের বিখ্যাত দ্বৈত শাসনের দেশ তুর্কি-সাইপ্রাস দ্বীপ নিয়ে ভ্রমণকাহিনি উপস্থাপন করেছেন তবে তা অক্ষর বা শব্দ দিয়ে নয়, করেছেন আলো আর আঁধারের সম্যক গড়ন দিয়ে অর্থাৎ আলোকচিত্র দ্বারা। এটা তাঁর ভাষায়, দুর্ঘটনাজনিত হঠাৎ সৃষ্টি, নিজেকে তাই তিনি ‘হঠাৎ আলোকচিত্রী’ বলে অভিহিত করেছেন। যেহেতু তিনি নিষ্ঠাবান গাল্পিক, ঔপন্যাসিক এবং গল্প-কাহিনি তাঁর অন্যতম পছন্দের কাজ, তাই সাইপ্রাসের তুর্কি অঞ্চলের সাধারণ মানুষজনের সাধারণ ও দৈনন্দিন জীবনাচরণ, সমুদ্র, পাহাড়, প্রকৃতির সূর্যকরোজ্জ্বল সমুদ্রজল, পোতাশ্রয়, ভাঙা দুর্গ, প্রাসাদ ইত্যাদি নিয়ে আলোকচিত্রের মাধ্যমে একটি গল্প বলার চেষ্টা করেছেন এবং সেই গল্প বলাতে সম্পূর্ণ সফল হয়েছেনএ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

হাসনাত আবদুল হাই তাঁর সহজাত পর্যবেক্ষণ দৃষ্টি দ্বারা এই প্রদর্শনীর আলোময় ছবিগুলোর প্রাণ সঞ্চার করেছেন একজন প্রকৃত ছোটগল্পকারের মতো। সামগ্রিকভাবে চারটি ভাগে তাঁর ছবির ধরন-ধারণ এবং সেই রকমে বিভাজন করা যায়। প্রথমতুর্কি সাইপ্রাসের জনজীবন, দ্বিতীয়সে দ্বীপের নিসর্গ, সমুদ্র ও প্রকৃতির দৃশ্য, তৃতীয়ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যপুরনো দরদালান, খিলান, স্তম্ভ, সমুদ্র তীরবর্তী আদিগন্ত, দূরের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া জলভূমি আর চতুর্থদুর্গ বা চার্চের খিলানের ভেতর থেকে সান্ধ্যকালীন সময়ের সূর্য ডোবা কালে সাদা-কালোর বৈষম্যে ফুটে ওঠা অপূর্ব আলোকচিত্র। তুর্কি সাইপ্রাস মূল সাইপ্রাসের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, যেখানে সর্বমোট ৩৫৭২ বর্গমাইলব্যাপী দ্বীপের আয়তন। ৭০০ বছর ধরে এ দ্বীপটি কালে কালে গ্রিক, ফিনিশীয়, রোমান শাসকদের কলোনি হিসেবে বিরাজ করছিল। ১৫৭৩ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনের আগে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। পরে ১৮৭৮ সালে ইংল্যান্ডের অধীনে ন্যস্ত হয় কলোনি হিসেবে। সাইপ্রাসের উত্তর অংশ নিয়ে তুর্কি রিপাবলিক দেশ ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়, যা শুধু তুরস্ক দ্বারা স্বীকৃত। গ্রিক সাইপ্রাসের তুলনায় অনেক নি®প্রভ হলেও দ্বীপটি সমুদ্র, বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির মধ্যে একজন সুন্দরী দ্বীপরানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, যার চারদিকে বেলাভূমি, যেখানে সমুদ্রের অশান্ত ঢেউ বারবার অনাদিকাল থেকে আছড়ে পড়ছে। উত্তর সাইপ্রাসের অধিবাসীরা মূলত পশ্চিমা ভাবধারায় জীবনযাপন করলেও জনগণের মধ্যে গ্রিসীয় প্রভাব রয়েছে তাদের স্বভাববৈচিত্র্যে। এই বিশেষ বিষয়টি হাসনাত আবদুল হাইয়ের আলোকচিত্রের মাধ্যমে সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে। কয়েকটি ছবি ভিন্নমাত্রায় বিভূষিত যেমনলেফকোসার একটা দোকানের সম্মুখভাগ যেখানে একটি চেয়ার-টেবিলে কিছু রঙিন কাপড়, ফুলের টব, কালো দরজা, ওপরে জিম উরুবা, পুরনো বাড়ির গোলাকার খাম, খিলান ইত্যাদি মিলে সুন্দর বিন্যাস। বেল্লাপেজে কয়েকজন তরুণী আধুনিক প্যান্ট, টপস আর ওড়না-ঢাকা কেউ বসে সময় কাটাচ্ছে বাড়ির আঙ্গিনায়, যেখানে একটি বারের বা পানশালার দরজায় ককটেল লেখাব্ল্যাক, জ্যাক, চিচি, পিনাকোলাদা, ব্ল্যাক রাশিয়ান, টাকিলা সানরাইজ, ব্লাডি মেরি, মার্গারিতা, আমারেতা কিস, সান অন দি সি ইত্যাদি লোভনীয় ও বিখ্যাত রসনাতৃপ্তিকর পানীয়। গার্নেতে সমুদ্রতীরের পাশে বাঁধানো চত্বরে দেখা যায় একটি পামগাছের অদূরে একটি একাকী কবুতর; সেখানকার আর একটি ছবিতে একটি ক্যাসিনোর দরজায় রয়েছে শুধু একটি বিশাল তাসের প্রতিকৃতিরুইতনের টেক্কা; সেন্ট হিলারিয়নের ভাঙা দুর্গে রানির জানালা দিয়ে দূরের অনেক স্তর বিশিষ্ট পাহাড়ের সারি দেখা যায় আকাশের নিচে নীলাভ প্রান্ত; ফামাগুস্তার দোকানে উচ্ছল এক হাস্যময় তরুণী বিক্রেতার ছবিতে স্বতঃস্ফূর্ত অন্তরঙ্গতা; এরপর লেফকোসার ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট একটি মেয়ের কৌতূহলী দৃষ্টি মনোমুগ্ধকর তো বটেই, বাস্তবতার স্পর্শে উজ্জ্বল। এই ছবিটি নিয়ে আলোকচিত্রী তাঁর লেখায় বলেছেনমেয়েটির উঁকি যেন আন্তর্জাতিক জনমতের কাছে দেশবাসীর দাবি হয়ে দেখা দিয়েছে। আসলে ছবি অনেক কথা বলে, তুমি কি কেবলই ছবি, তা নয়, অনেক কিছুএই মর্মকথাও। তাঁর বিভিন্ন বহু স্তরের অর্থ নিয়ে যে ছবি যতভাবে দর্শকদের মধ্যে ধরা পড়বে সে ছবি ততই শিল্পগুণে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এই আন্তরিক চেষ্টা হাসনাত আবদুল হাইয়ের আলোকচিত্রগুলোর মধ্যে, তাঁর জীবনের প্রথম আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। নিশ্চয়ই তাঁর এই প্রচেষ্টা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। তাঁকে প্রাণঢালা অভিনন্দন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares