প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : বহুমাত্রিক লেখক : সেলিনা হোসেন

হাসনাত আবদুল হাই বিষয়ের বৈচিত্র্যে, আঙ্গিকের ভিন্নতায় শিল্পের বহুমাত্রিক সৃজনশীল রচনায় নিজের ভুবনের ঈশ^র গড়েছেন। যে মেধা এবং শ্রম লেখককে আপন ঈশ^রের অবয়ব প্রদান করে তিনি সেখান থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেননি। তাঁর ঈশ^র তাঁর শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করেছে আলোর ঔজ্জ্বল্যে এবং গভীরতার সৌকর্যে।

তিনি বহুমুখী লেখকের প্রতিভূ। লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, ভ্রমণকাহিনি, হাইকু এবং প্রবন্ধ। বিষয়ই বলে দেয় যে তিনি সৃজনশীলতা এবং মননশীলতার চর্চা করেছেন একই সঙ্গে।

তাঁর জীবনভিত্তিক উপন্যাসগুলো অমাকে মুগ্ধ করে। সমকালের যে সব মানুষদের তিনি উপন্যাসের হিরো করেছেন তাঁরা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক একটি স্কুল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বলা হয় গত পঁচিশ বছর ধরে বিশ^জুড়ে কথাসাহিত্যে অ্যান্টি-হিরো ধারণা প্রাধান্য পেয়েছে। উপন্যাসে ব্যক্তির বদলে সমষ্টি কিংবা ঘটনা কিংবা কোনো এক বিশেষ সময় উপন্যাসের মূূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে স্থান পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হাসনাত আবদুল হাই ব্যক্তি মানুষের বৈশিষ্ট্য, অসাধারণত্ব এবং মানুষের শক্তি ও সাহসকে উপন্যাসের বিষয় করেছেন। এখানেই তাঁর বিশিষ্টতা।

এ দেশের অসাধারণ চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান তাঁর উপন্যাসের নায়ক। সুলতানের পেইন্টিং আমাদের জনজীবনকে যেমন শক্তির আধার হিসেবে তুলে এনেছে তেমনি সুলতানের জীবনও ছিল ব্যাপক ঘটনাবহুল। হাসনাত তাঁর জীবন ও শিল্পকর্মের ওপর আলো ফেলতে ভুল করেননি। উপন্যাসের নাম সুলতান, নিপুণ দক্ষতায় লেখক রচনা করেছেন উপন্যাসের পটভূমি। অন্য আর একটি উপন্যাস নভেরা। নভেরা ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম নারী যিনি ভাস্কর্য শিল্পে নিজের মেধা ও যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছিলেন। বাঙালি মুসলমান পরিবারের প্রথা বিরোধী জীবনে তিনি প্রবল সাহসে পা বাড়িয়েছিলেন। এই দুইয়ের সম্মিলনে রচিত হয়েছে হাসনাতের এই উপন্যাস। এবারও তিনি উপন্যাসের হিরোতে এনেছেন ব্যতিক্রমী অ্যান্টি-হিরোর বোধ। তবে একই সঙ্গে উঠে এসেছে ব্যক্তি এবং সময়, যা উপন্যাসের পরিসরকে বিস্তৃতি দিয়েছে। নভেরা চিন্তা-চেতনায় নিজ সময়ের অগ্রগামী মানুষ ছিলেন, তাঁর জীবনচর্চা সেখানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলার জনজীবনের আর একজন ভিন্ন ধারার মানুষ আরজ আলী মাতব্বর। তিনি কৃষি কাজ ও আমিন পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেছেন, কিন্তু দূর পাড়াগাঁয়ে বসবাস করেও মননের সাধনায় ছিলেন একজন আধুনিক অগ্রগামী চিন্তার মানুষ। অন্ধ কুসংস্কার এবং পশ্চাৎমুখিনতাকে তিনি দু’পায়ে মাড়িয়েছেন। যা কিছু জীবনের বিপক্ষে তাঁকে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। স্বশিক্ষা ছিল তাঁর জীবনচর্চার অন্যতম হাতিয়ার। তিনি নিজ অভিজ্ঞতায় এবং মেধার শক্তিতে অর্জন করেছিলেন জীবনের পক্ষের পরিচ্ছন্ন রুচির চর্চা। ব্যতিক্রমী এই মানুষটিকে নিয়ে হাসনাত লিখেছেন একজন আরজ আলী নামের উপন্যাস।

এ ছাড়া কাহিনি-নির্ভর উপন্যাস লিখেছেন অনেকগুলো―সুপ্রভাত ভালোবাসা, তিমি, আমার আততায়ী, প্রভু, সুনীতি, ইন্টারভিউ, মহাপুরুষ― এমন আরও কয়েকটি। বড় করে লেখার জায়গা এটা নয় বলে এসব উপন্যাসের ভিতরে ঢোকা গেল না। একই কথা বলা যাবে তাঁর গল্প স¤পর্কে। বেশ কয়েকটি গল্পের বই আছে―গল্পে আছে ভিন্ন আমেজ, আছে তীক্ষ্ম ব্যঙ্গ কিংবা বাস্তব চিত্রের ধারালো টান―‘কয়েকটি বেড়াল ও সাদা সুতো’ গল্পের শুরুটা এমন―‘কৌতূহলী কিশোরের মতো খোলা দরজা দিয়ে গলা বাড়িয়ে দিয়েছে বসবার ঘরের মেঝেতে সকালের চঞ্চল রোদ।’ ‘নবাবের তলোয়ার’ গল্পের শুরু এমন―‘যে সকালে জানা গেল যে পাক-সেনারা নদীপথে এসে আক্রমণ করতে বড় একটা নৌ-বহর নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তখন করম আলী আগের রাতে নওয়াব সিরাজ-উদ্দৌলা যাত্রায় সিরাজের ভূমিকায় অভিনয় করার পর বাড়ি ফিরে ক্লান্ত দেহে মনের সুখে ঘুমোচিছল।’ ‘ইকেরাস’ গল্পের শুরু এমন―‘যদিও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলঘর। কয়েক ডজন উজ্জ্বল তীব্র আলোর বাতির সামনে বসে পুলিশের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পীড়িত আসামির মতো ভিআইপি ব্যক্তিটি অঝোরে ঘামতে থাকেন। সমবেত সাংবাদিকবৃন্দের প্রশ্নমালা জ্যাচ্যুত তীরের মতো একের পর এক তাকে বিদ্ধ করে বিধস্ত করে দেয়।’ তাঁর গল্পের সূচনায় কয়েকটি উদ্ধৃতি দিলাম মাত্র। গল্পের আঙ্গিক ক্রমাগত তীক্ষè হয়ে ওঠে, কাহিনির বুনটে জমে থাকে ধীশক্তি এবং জীবনবোধের অভিজ্ঞতায় গল্প হয়ে ওঠে পাঠকের আবেগ ও মননসঙ্গী।

তাঁর ভ্রমণ বিষয়ক লেখাগুলো আমি মুগ্ধ হয়ে পড়ি। কারণ স্থানের বর্ণনার অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা বাড়তি সুবাস জোগায়। এই অতিরিক্ত জায়গাটুকু আমার পছন্দ। আন্দালুসিয়া গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন :

‘কেবল ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নয়, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিকভাবে উল্লেখ্য কিছু বিষয়ের ওপরও আলোকপাত করার চেষ্টা রয়েছে যার জন্য যতটুকু সম্ভব সাহায্য নিয়েছি বই-পত্র এবং অন্যান্য সূত্রের। বিষয়ের সঙ্গে অধীত তথ্য এইভাবে গ্রথিত করা হয়েছে যেন ভ্রমণের এবং লেখার ধারাবাহিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে এবং প্রাসঙ্গিক হয়। প্রতিটি লেখাই স্বয়ংস¤পূর্ণ করে লেখার জন্য কোথাও কোথাও একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। স্পেনের গ্রহযুদ্ধ এবং মুর শাসনের বিশদ আলোচনার জন্য ইতিহাসের অনুসন্ধান করা হয়েছে, যা এই বিষয়ে আগ্রহী পাঠকের কথা মনে করে লেখা।’

এভাবে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি নিজ দেশের পাঠকের সামনে তুলে ধরেন তিনি। কখনও বাক্তিকে তুলে ধরেন আশ্চর্য বিশিষ্টতায় যেন সত্যিকার ঘটনার মধ্যে ফুটে ওঠে গল্পের আমেজ এবং একই সঙ্গে গল্পের চরিত্রও। উল্লেখ করছি আন্দালুসিয়া বইয়ের ২৬৪ পৃষ্ঠা থেকে :

‘আমি মেঝেতে নৃত্যরত জিপসী রমণীকে দেখে বলি, সে কি কোন নির্দিষ্ট কোরিওগ্রাফ অনুযায়ী নাচছে এখন ? পেপে হেসে বললো, মাথা খারাপ। অতো সুশৃঙ্খল হলে আর দক্ষতা থাকলে এখানে নাচে ? নাইট ক্লাবে গিয়ে পয়সা কুড়োতো। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, ইমপ্রোভাইজড। সব বানিয়ে বানিয়ে নাচছে। আমি বললাম, গিটার আর হাত তালির মধ্যে কি সামঞ্জস্য নেই ? পেপে দেখে বললো, আছে। খুব সাদামাটাভাবে। বাসে যেতে যেতে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন হাত তালি দিয়ে গান গায়, অনেকটা তেমন। আমি তার দিকে তাকিয়ে বলি, তুমি খুব কঠিন মানুষ। দয়ামায়া নেই। এতো কষ্ট করে নাচছে, গাইছে। শুনে পেপে গম্ভীর হয়ে যায়। খুব তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে নর্তকীকে দেখে। তারপর চোখ না সরিয়ে আস্তে আস্তে বলে, তার গ্রীবা আর চোখের চাউনি দেখো। ঠিক বুনো, উদ্ধত আর গর্বিত এক ঘোড়া। যেন বলছে, এসো পাল্লা দাও আমার সঙ্গে। পোষ মানাতে চাও ? এসো আমাকে জয় করো।’ ‘বলতে বলতে পেপে তন্ময় হয়ে যায়। এই প্রথম অনেকক্ষণ পর পেপেকে আমার খুব ভালো লাগে।’

এই অংশটুকু তিনি যেভাবে শেষ করেছেন তা মুহূর্তে বদলে দেয় পুরো প্রেক্ষাপট। একজন ভিনদেশি পেপেকে তিনি যেভাবে আমাদের সামনে হাজির করেন মনে হয় কোথায় যেন সাংস্কৃতিক বোধের টান আছে―যেখানে নারীকে উপেক্ষা করা এবং সার্বিকভাবে মূল্যায়ন সব দেশের সীমানা মুছে দিয়ে সমান্তরাল করে দেয়। তাঁর অন্যান্য ভ্রমণের বই সাফারি, ট্রাভেলগ, ট্রাভেলগ-২ ইত্যাদি।

তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের বই সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব। এ বই পড়তে পড়তে ভাবি একজন ঔপন্যাসিকের পক্ষে কি করে এই বইটি লেখা সম্ভব হয়। কত অনায়াসে তিনি এই গভীর বিষয়টিকে সাধারণের জন্য সহজ করে লিখেছেন। সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় যেভাবে সুলতান উপন্যাসে শিল্পী এস, এম, সুলতান বিশালত্ব পায়, একজন আরজ আলী তাঁর নিজের তৈরি ভুবনে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসের নায়ক হন, যেভাবে ইন্টারভিউ ভিন্ন আঙ্গিকের উপন্যাস হয়, সেভাবে নন্দনতত্ত্ব সাধারণ পাঠকের জনা পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে। লেখকের অনায়াস দক্ষতায় পাঠক সহজে অনুধাবন করে বিষয়টি। বইয়ে আটটি অধ্যায়ে লেখক বিষয়ের বিন্যাস ঘটিয়েছেন। যেমন- নন্দনতত্ত্বের ধারণা, নন্দনতত্ত্বের দেশ-কাল-পাত্র, সৌন্দর্যের দর্শন, শিল্পের দর্শন, সৌন্দর্যের দর্শন- দুই মহাদেশে, শিল্পতত্ত্ব, সংস্কৃতি ও সমলোচনা তত্ত্ব, নান্দনিক অভিজ্ঞতা। এ বইয়ের আর একটি বৈশিষ্ট্য যে তিনি প্রতিটি অধ্যায়ের গ্রন্থপঞ্জিও সংযোজন করেছেন। এটিও ভিন্ন বিষয়ের বই সস্পর্কে পাঠকের আগ্রহ মেটাবে।

কিওতো হাইকু (কুড়ঃড় ঐধরশঁ) নামে তিনি জাপানের হাইকু কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন বাংলাদেশের পাঠককে। হাইকুর আঙ্গিক, বিষয়, ধরন এবং ভাষা আমাদেরকে সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষè এক ধরনের রচনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় যা বাংলাদেশের সাহিত্যে নেই। তবে অনুবাদে ছিল। ‘উত্তরলেখ’ অংশে তিনি লিখেছেন : ‘ষাটের দশকের শেষ দিকে যখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র জীবনের শেষ হতে যাচ্ছে সেই সময় হঠাৎ সপ্তদশ শতাব্দীর জনপ্রিয় জাপানী কাব্যরীতি হাইকুর একটি বঙ্গানুবাদ পেয়ে যাই। …হাইকুর সংক্ষিপ্ত পরিসর আর সহজ সরলতার পেছনে গূঢ়, সূক্ষ্ম যে সব চিন্তা-চেতনা তা আকৃষ্ট করেছিল কবিমনা যারা তাদের। ভাবনা আর প্রকাশ ভঙ্গিমার ক্ষেত্রে নতুন এক দিগন্ত খুলে দিয়েছিলো হাইকু। …চার বছর প্রবাস জীবন শেষে যখন ফিরে আসি দেশে, হাইকু চর্চার কোনো চিহ্ন দেখতে না পেয়ে অবাক হই। বুঝতে পারি একদিন যেমন হঠাৎ করে আলোড়ন তুলেছিল ঠিক সেভাবেই হালফ্যাসনের চমক দিয়ে অপসৃত হয়েছে হাইকু।’ লেখক হাইকু আবার আবিষ্কার করেন জাপানের পুরোনো রাজধানী কিওতো শহরে। ঋতুভিত্তিক অধ্যায়গুলো এমন : হেমন্ত, শীত, বসন্ত এবং অন্যান্য। ছোট ছোট কবিতাগুলো এক পৃষ্ঠায় বাংলা, জাপানি ও ইংরেজি ভাষায় স্থান পেয়েছে। তাঁর লেখা হাইকুর দু’একটি নমুনা এমন :

‘নেতিয়ে পরা খিকু

বাতাসে তোলো মাথা

বলছে, সায়োনারা।’

লেখক এই কবিতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে ‘খিকু মানে ক্রিসেনথিমাস ফুল। আকারে ছোট আর গোলাকার এই ফুল মাটি থেকে তিন/চার ইঞ্চির বেশি ওপরে ওঠে না। হেমন্তের এই ফুল শুকিয়ে নির্জীব হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ‘সায়োনারা’ মানে বিদায়, যে শব্দটির সঙ্গে জাপানের বাইরে অনেকেই পরিচিত।’ এভাবে আমরা পরিচিত হই বিশ্ব সাহিত্যের ভিন্ন একটি কাব্যরীতির সঙ্গে। হাসনাত আমাদের জানান ‘হাইকু’ পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত কাব্যরূপ। তিনটি সংক্ষিপ্ত লাইনে ১৭টি সিলেবল নিয়ে এর গঠন। প্রথম লাইনে ৫টি, দ্বিতীয় লাইনে ৭টি আর শেষের লাইনে ৫টি সিলেবলের সমাহারে তৈরি হাইকুর অবয়ব।’ আমি বাক্তিগতভাবে এই বইটিকে আমার জানার পরিধি বাড়িয়েছে বলে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি।

হাসনাত আবদুল হাই শিল্পের বহুমুখী যাত্রায় তাঁর অনুভবকে প্রগাঢ় করেছেন। শিল্পের নানা পথ-অন্বেষায় নিজেকে ঋদ্ধ করেছেন এবং জীবনের অনুভবের তল ছোঁয়ার চেষ্টা করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares