প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : হাসনাত আবদুল হাই : ফেসবুকে কয়েকদিন : সিরাজুল ইসলাম মুনির

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ তাঁর ফেসবুক জীবনের প্রথম বর্ষ উদযাপন করলেন এই বলে : To-day I have completed my first year in facebook. During the year I made many new friends, renewed old acquiantance, exchanged greetings and views on matters of mutual interest, written a full-length post-modern novel on facebook, published Haikus in Bangla and English on my wall, started a series of limmericks on caravanserai in Bangla and English and am now writing lyrics on the eternal subject of love in Bangla. When I joined facebook it was with reluctance, at the behest of my nephew. Looking back. I find no reason to regret. Almost unwittingly, I have opened a new world of warm relationships, camaraderie and last but not the least, of creativity. All these have been made possible by facebook friends, far and near, young and old. At 80 plus what more can I expect? Thanks  and a very happy New Year to all .’

তাঁর নিজের কথা থেকেই জেনে গেলাম ২০১৮ বছরজুড়ে ফেসবুকে তাঁর কার্যক্রম কী ছিল। যারা ফেসবুকে তাঁর সান্নিধ্যে ছিলেন, নিশ্চয়ই তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর জ্ঞানের আলোয় অথবা পরিচিত হয়েছিলেন তাঁর জ্ঞান-মনীষার সঙ্গে।

এতক্ষণ ধরে উপরের কথাগুলো আমি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক হাসনাত আবদুল হাই সম্পর্কে বলেছি। আমি এর পরবর্তী সময় অর্থাৎ ২০১৯ এর প্রথম দিন থেকে ২০২০- এর ২০ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাভাষার লেখক ও তাঁদের বইয়ের ওপর পোস্ট করা বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে চাই।

এখানে আরেকটা বিষয় বলে রাখা ভালো, আমার আলোচনার বাইরেও হাসনাত আবদুল হাই সমসাময়িক রাজনীতি, সামাজিক সমস্যা নিয়ে সোচ্চার ছিলেন তাঁর ফেসবুক পাতায়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংগীত, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, সাহিত্য ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি তাঁর পাণ্ডিত্য দিয়ে পাঠক ও অনুসারীদের ঋদ্ধ করেছেন। বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি কমিউনিজম, সোসালিজম, ক্যাপিটালিজমের ওপর তাঁর পড়া বই, নিবন্ধ অথবা আলোচ্য বিষয়ে তাঁর লেখা প্রবন্ধের বিষয়গুলোও জানাতে চেয়েছেন তাঁর পাঠকদের।

ফেসবুকের মূল কনসেপ্ট সামাজিক যোগাযোগ। স্বদেশে এবং বিদেশে বসবাসরত আত্মীয় ও বন্ধু সম্পর্কীয়দের মধ্যে যোগাযোগ, কথা বলার সুযোগ তৈরি করেছে ফেসবুক। কিন্ত দেখা গেল, বিশেষ করে করোনা মহামারি যখন বিশ্বকে জাপটে ধরেছে, তখন তা আরও বিস্তৃত পরিসরে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। আজকাল ‘ফেসবুক লাইভ’ নামে আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি যা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির মেলবন্ধনের ভূমিকা রাখছে।

ফেসবুক কার্যক্রমের বিস্তৃত পরিধি নিয়ে কথা বলা অবশ্য আমার উদ্দেশ্য নয়। বলতে চেয়েছি ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার সুযোগে তিনি বহু লেখকের রচনাকর্মের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এটাও সত্য যে, হাসনাত আবদুল হাই ফেসবুকে কেবল নিজের জয়ঢাক পেটান নি, যদিও এই সুযোগ তাঁর ছিল এবং এই অধিকার তিনি সংরক্ষণ করেন।

হাসনাত আবদুল হাই দীর্ঘদিন তাঁর কাছে সংগৃহীত, উপহারপ্রাপ্ত সাহিত্যের বই সম্পর্কে তাঁর মতামত দিয়েছেন। বইয়ের প্রচ্ছদের ছবির সঙ্গে বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়াও তিনি লিখেছেন। আমার কাছে এই কাজকে অসাধারণ মনে হয়েছে, বিশেষ করে যাদের বই নিয়ে তিনি পাঠ-প্রতিক্রিয়া  জানালেন তাদের কাছে এ এক অসামান্য প্রাপ্তি। এর ফলে অন্তর্জাল সুবিধার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে বইটির সংবাদ পৌঁছে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, আমাদের অগ্রজ লেখকদের মধ্যে অনুজদের নিয়ে কথা বলার দৈন্য দেখতে পাই, হয়তো তাদের বইয়ের পাতা উল্টে দেখার সময়ও তাঁরা করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে  ব্যতিক্রম অবশ্য বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। অগ্রজদের কেউ কেউ অবশ্য কথা বলেন, কোনো বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত হলে তাৎক্ষণিক পাতা উল্টে কথাটথা বলেন। আর অন্যতম ব্যতিক্রম হলেন হাসনাত আবদুল হাই। তাঁর ফেসবুক জীবনের প্রথম বছরেও তিনি তাঁর নিজের বইয়ের বাইরে অন্য অনেকের বই নিয়ে কথা বলেছেন।

কথাসাহিত্যের মহান কারিগর বহুমাত্রিক লেখক হাসনাত আবদুল হাইয়ের এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮০। এর মধ্য থেকে ফেসবুকে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বইগুলোর প্রচ্ছদের ছবি তিনি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। এগুলো হলো : মুক্তিযুদ্ধের গল্প, একলা, ফেসবুকে কয়েকদিন, যানাডু, চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা, হাসনাত আবদুল হাই রচনাবলি-১, হাসনাত আবদুল হাই রচনাবলি-২, শিল্পকলার নান্দনিকতা, হেমিংওয়ের সঙ্গে, সাতজন, সুলতান, সাফারি, ভ্রমণসমগ্র-২, আন্দালুসিয়া, হ্যম-বেথ, একা এবং একসঙ্গে  নির্বাচিত আশি, পুলিশ এলে বলব আইডি নেই কবিতার বই দুটো ছাড়া, ষড়ঋতু হাইকু। শেষোক্ত বই দুটি কবিতার বই।

আমরা আলোচনা শুরু করতে চাই ২০১৯ সালের প্রথম দিন থেকেই। শুরু করতে চাই তাঁর পোস্ট করা একটা কবিতা দিয়ে।

কথা বললেই কি একা একা থাকা শেষ তাকালেই চার চোখে দেখা? মেঘদূত তবে কেন হলো লেখা ? ‘পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ ?’ টেলিপ্যাথি সে কি শুধু অভিধানে আছে অথবা ক্লেয়ারভয়েন্স ? না শোনা, না দেখা কোনো ব্যাপারই  ছিল না কোনোকালে, দেখাশোনা ছেলের হাতের মোয়া ছাড়া কিছু নয় ডিজিটাল এই যুগে তবু আসতে হবে, দেখতে হবে মুখোমুখি ? বিজ্ঞান হেরে গেল তোমার মনের কাছে অবাক করলে তুমি।

হাসনাত আবদুল হাই বিশ্ব সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ পাঠক। ফেসবুকের পাতাজুড়ে তাঁর অধীত অসংখ্য উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধের বইয়ের সংক্ষিপ্ত আলোচনা রয়েছে। রয়েছে ইংরেজি ও বাংলায় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার লিঙ্ক ও ছবি। বিশ্ব চলচ্চিত্রের সেরা সব মুভির তথ্য ও ছবি তিনি শেয়ার করেছেন। সে সব নিয়ে কথা বলে আলোচনাকে দীর্ঘ করতে চাই না। আমি কেবল বাংলাদেশের যে কজন সৌভাগ্যবান লেখকের বইয়ের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন তাঁদের নাম ও বইয়ের কথা উল্লেখ করব। তবে এই  আলোচনার পরিসর সংক্ষিপ্ত রাখতে সবগুলো নয়, কয়েকটি বই সম্পর্কে হাসনাত আবদুল হাইয়ের মতামত উপস্থাপন করতে চাই।

আলোচ্য সময়ের মধ্যে যে বইগুলো নিয়ে হাসনাত আবদুল হাই কথা বলেছেন সেগুলো হলো : কাজী জহিরুল ইসলামের  কবিতাগ্রন্থ হেমন্তের পত্রবৃষ্টি, রওনক আফরোজের কবিতা,  মাসবুর আরেফিনের আলথুসার, মাসরুর আরেফিনের আগস্ট আবছায়া,   অপরাহ্ন সুসমিতোর গল্পগুলো,  মোজাফফর হোসেনের পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা, দিলারা মেসবাহর মাটি ও মানুষের কুহক,  ফেরদৌস হাসানের  কিছু দূরে নদী,  শান্তনু বিশ্বাসের গানের কবিতা খোলাপিঠ,  মাজহারুল ইসলামের ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনার গল্প,  মাহবুব আজীজের দাহ,  নুরুল করিম নাসিমের সেরা তিন উপন্যাস,  নাজিব ওয়াদুদের সেরা পঁচিশ,  রাধা চক্রবর্তীর  Feminism And Cotemporary Women Writers,  আলিম আজিজের অনুদিত  কার্লোস ফুয়েন্টেসের উপন্যাস আউরা,  মিরাজুল ইসলামের নার্সিসাসে প্রজাপতি,  মুর্তজা বশীরের জীবনালেখ্য,  শরীফ আতিকু-উজ-জামানের  বিমূর্ত শিল্প প্রসঙ্গ,  জাকির তালুকদারের গল্পের জার্নাল,  লুৎফুল হোসেনের নাগর,  মীজানুর রহমান শেলীর স্বনির্বাচিত গল্প, হায়াৎ সাইফের হায়াৎ সাইফের কবিতা, রওশন হাসানের Over the Horizon,  মিনার মনসুরের কবিতা,  পান্না কাযযসারের মুক্তিযুদ্ধঃ আগে ও পরে, জয়নাল হোসেনের প্রেমিক ভ্যানগগ ভিনসেন্টের বেদনা-বিলাস ও শিল্পসত্তার গল্প, জাহিদুল হকের গল্পসমগ্র, শামীমা সুমির নাতিশীতোষ্ণ পারদ,  শাহানা ইসলামের অরুন্ধতী,  ফারুক মাহমুদের কবিতাগ্রন্থ  রৌদ্র এবং জলের পিপাসা, আসাদ মান্নানের  কবিতার বই কুয়াশা উপেক্ষা করে বসে আছে আশা,   সৈয়দ শামসুল হকের শ্রেষ্ঠ গল্প,  সৈয়দ লুৎফুল হকের ভাবানুবাদ  গীত গোবিন্দ কবি জয়দেব, সৈয়দ শামসুল হকের দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, আশরাফ পিন্টুর সুনির্বাচিত অনুগল্প,  রঞ্জনা ব্যানার্জীর একে শূন্য,  শানু লাহিড়ীর রবীন্দ্র চিত্রকলার উপর বই  রবীন্দ্রচিত্র- চেতনা, খালেদ চৌধুরীর লাল জিহ্বার নিচে, পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের নিয়ে লেখা নুরুদ্দীন জাহাঙ্গীরের উপন্যাস A Tale of Rohingya,  নুরজাহান সরকরের আত্মজৈবনিক বই স্মৃতির জানালায়, মীর রবির কবিতার বই ইরেজারে আঁকা ব্ল্যাক মিউজিক,  মালেকা ফেরদৌসের কবিতাগ্রন্থ পাখির মতো বৃষ্টিরা উড়ে যায়,  ইশরাত তানিয়ার গল্পগ্রন্থ  বীজমন্ত্র, পাপড়ি রহমানের নদীধারা আবাসিক এলাকা,   নিলুফা আকতারের অতলান্ত খোঁজ,  সিরাজুল ইসলাম মুনিরের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক উপন্যাস এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, রাজীব সরকারের প্রবন্ধের বই সাহিত্য ভাবনায় সেকাল একাল ও  বহুমাত্রিক বুদ্ধদেব বসু বৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যে, দিলারা মেজবাহর একজোড়া পয়মন্ত ইলিশ, সাদাত হোসাইনের নিঃসঙ্গ নক্ষত্র, নিলুফার আকতারের অতলান্ত খোঁজ, বাদল সৈয়দের অলৌকিক আঙুল, ফারহানা আনন্দময়ীর কবিতার বই দীর্ঘায়ু চাইনি আনন্দায়ু দাও, মাজহারুল ইসলামের ভ্রমণগদ্য বজ্র ড্রাগনের দেশে সিকি শতাব্দী আগে, সুপর্ণা এলিজ গোমেজর কবিতার বই মালঞ্চ ও অনুভূতির পঙক্তিমালা, তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরীর পানপাত্রে দ্রাক্ষারস(কবিতা), পুঁথি  গাজীকালু চম্পাবতী ও ছয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামাল, জাহিদুল হকের কবিতা সংগ্রহ,  আহমদ ছফার বাঙালি মুসলমানদের মন,  বিনয় কৃষ্ণ সরকারের কবিতার কথা, কমল কুমার মজুমদারের অন্তর্জলি যাত্রা,  সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর কাঁদো নদী কাঁদো, অমিয় ভূষণ মজুদদারের মধু সাধুখাঁ, শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন,  শহীদুল জহিরের সে রাতে পূর্ণিমা ছিল, আশান উজ জামানের বা অথবা কিংবা,  আমোস টুটুওলার  তাড়িখোর,  আলম খোরশেদের মানবী মঙ্গল, আজিজুর রহমান খানের আমার সমাজতন্ত্র, মোহিত কামালের লুইপার কালসাপ, মনি হায়দারের গল্প পঞ্চাশ ইত্যাদি।

হাসনাত আবদুল হাই  তাঁর ফেসবুক পোস্টে বর্ণিত গ্রন্থগুলোর পরিচিতির পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছেন। কিছু কিছু আলোচনা পাঠকের জানা এতই জরুরি যে, সেগুলো থেকে কয়েকটির চুম্বক অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো :

মাসরুর আরেফিনের উপন্যাস আলথুসার পড়লাম। প্রথম পাঠে মুগ্ধ হয়েছিলাম কাহিনির ঠাসবুনুন আর কুশলী বর্ণনাভঙ্গির জন্য। এবার অবাক হলাম ভাষা ব্যবহারে তার অনন্য দক্ষতা দেখে। এমন জটিল অথচ প্রাঞ্জল ভাষা  যার আয়ত্তে তিনি ভাষার কারিগর। এই ভাষা কোথাও থামে না, ছুটে চলে বল্গাহারা ঘোড়ার মতো আপন বেগে। এই ভাষার সঙ্গে তুলনীয় টমাস পিনচনের লেখা, যিনি ২০ বছর আগে নোবেল প্রাইজ পাবেন বলা হয়েছিল।  কাহিনির ঠাসবুনন, বর্ণনাভঙ্গি  আর ভাষার ব্যবহারে মাসরুর আরেফিনকে বলা যায় এই মুহূর্তে বাংলা ভাষার সব চেয়ে শক্তিশালী  কথাসাহিত্যিক। তাকে অগ্রজের অভিবাদন।

মোজাফফর হোসেনের গল্পগ্রন্থ পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা। তরুণ কথাশিল্পী কিন্তু তাকে এখন আর প্রতিশ্রুতিশীল বলা যাবে না। মাত্র দুটি ছোটগল্প সংকলন দিয়ে তিনি কথাসাহিত্যের জগতে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। কোনো এক ধারায় গল্প লিখে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ না করে বেছে নিয়েছেন কথকতার বিস্তৃত পরিসর। বাস্তবতার পরিচিত আঙ্গিকে যেমন, একইভাবে অতিপ্রাকৃত এবং জাদুবাস্তবতার ধূসর ও অলৌকিক  জগতের আবহ নিয়ে গল্প নির্মাণে তিনি সমান সিদ্ধহস্ত।

   মাজহারুল ইসলাম একজন  দক্ষ সম্পাদক ও সফল প্রকাশক। তিনি যে একজন ভালো গল্পকারও তার পরিচয় পাওয়া গেল সদ্য প্রকাশিত ‘ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনার গল্প’ গল্প সংকলনে। তার গল্পে রয়েছে সেই সরলতা যা সনাতন ছোটগল্প বয়ানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর  অনুষঙ্গ হিসেবে যুক্ত হয়েছে কাহিনি বর্ণনার শেষে চমকের ব্যবহার। যারা তত্ত্বের কচ-কচানি আর জটিল বর্ণনারহিত গল্প পড়তে ভালোবাসেন তাদের কাছে মাজহারুল ইসলামের ছোটগল্প সমাদৃত হবে।

অপর এক পোস্টে মাজহারুল ইসলামের ভ্রমণগদ্যের বই বজ্র ড্রাগনের দেশে সিকি শতাব্দী আগে সম্পর্কে হাসনাত আবদুল হাই লিখেছেন, এই বই সাহিত্যের জগতে একটা রেকর্ড হওয়ার মতো বই।

জাকির তালুকদারের এই গল্পের বইটির নাম (গল্পের জার্নাল) দেখেই  কৌতূহলী হয়ে পাতা উল্টিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখি। বুঝতে পারি গল্পগুলো নতুন আঙ্গিকে লেখা। জাকির তালুকদারের বইটিতে যে ৭টি গল্প আছে তার প্রতিটির আগে আলাদা করে লেখা হয়েছে গল্প লেখার গল্প। গল্পের পটভূমি হিসেবে লেখা এই অংশে পাওয়া যায় যে পরিবেশ নিয়ে এবং চিন্তা-ভাবনার ভিত্তিতে প্রতিট গল্প লেখা হয়েছে, সেই তথ্য। বেশ অভিনব গল্প লেখার এই আঙ্গিক। বাংলায় আর কেউ এইভাবে গল্প লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে এইভাবে লেখার জন্য লেখক প্রশংসার দাবিদার। এই সংকলনের একমাত্র দুর্বলতা কয়েকটি গল্পে লেখকের  প্রত্যক্ষ এবং উচ্চকিত বক্তব্য যা লেখার শিল্পগুণ ক্ষুণ্ন করেছে। বইটি যারা ছোট গল্প লেখেন আর পড়তে ভালোবাসেন তাদের পড়া উচিত।

‘প্যারি শহরের এক তরুণ ধীরে ধীরে সালামান্দারে রূপান্তরিত হল। বুদাপেস্টবাসী মোহময়ী এক তরুণী পুল পার হতে হতে জরতী বৃদ্ধায় পরিণত হলো। এইভাবে শুরু হয়েছে মীজানুর রহমান শেলীর গল্প ‘দুঃস্বপ্নের দেশ’। তার প্রায় সব গল্পেই রয়েছে আধুনিক মনন ও আঙ্গিকের ব্যবহার।পরিশীলিত এবং ক্ষুরধার ভাষা গল্পগুলোর আধুনিক চরিত্র নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।

আসাদ মান্নান অনেকদিন থেকে কবিতা লিখছেন, প্রথম সারির কবি হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছেন। তার অন্য কবিতার বই পড়া হয়নি, নিচের বইটি  কুয়াশা উপেক্ষা করে বসে আছে আশা পড়ে মনে হলো তিনি আপাদমস্তক কবি। এই বইতে তার অধিকাংশ কবিতার বিষয় রাজনীতি যা কবিতাকে প্রচারণার মাধ্যম করে তুলতে পারে।  কিন্তু পড়ে মনে না হয়ে পারে না যে তিনি প্রথমত কবিতাই লিখতে চেয়েছেন, যার জন্য ব্যবহার করেছেন কবিতার ভাষা ও ছন্দ। যিনি লিখতে পারেন ‘মানুষ দুঃখ চাষ করে’, অথবা দেখেন, ‘মেঘের স্তন ফেটে ফেটে বৃষ্টি নামে’,  তাকে মৌলিক কবি না বলে পারা যায় না। তার রাজনৈতিক বিশ্বাস স্থান-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে বলেই তিনি লেখেন : ‘মানব তোমাকে আমি ছোট হতে কখনও দেব না’ এবং ‘নারীকে মানুষ ভেবে পৃথবীকে বাগান বানাও ’। এমন সব এবং আরও বজ্র কঠিন পঙ্ক্তি যিনি লিখতে পারেন তার কবিতায় রাজনীতি হয়ে ওঠে মানুষ হয়ে বাঁচবার ঘোষণা। তাই বলে আত্মতৃপ্ত তিনি নন, জীবন-যাপনে তারও রয়েছে গ্লানি যার জন্য তার ক্ষমাহীন আক্ষেপ: ‘নগ্ন হয়ে এসেছিলাম/ পোশাক পরে চলে যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি’।

বাংলা ছোটগল্প লেখায় ইশরাত তানিয়া শুধু একটি নতুন স্বর নয়, খুব আত্মপ্রত্যয়ী ব্যতিক্রমী স্বর। প্রথম গল্পগ্রন্থেই (বীজপুরুষ) তিনি প্রচলিত গল্প বলার ধরনকে বাদ দিয়ে নিজের ঘরানা তৈরির চেষ্টা করেছেন। একেবারে শূন্য থেকে কোনো সৃষ্টি হয় না, ইশরাতের গল্পে তাই দেখা যায় রূপকথার আবহ, অতিলৌকের ছায়া আর বাস্তবতার উপকরণ। আলকেমিস্টের মতো তিনি এইসব মিশিয়ে তৈরি করেছেন গল্প না বলার গল্প।… উত্তর-আধুনিক গল্পের কলা-কৌশল তার ভালো করেই জানা যার জন্য এমন প্রত্যয়ে নিজের মতো করে নির্দ্বিধায় লিখতে পেরেছেন তিনি। এভাবেই এগিয়ে গেলে বাংলা কথা-সাহিত্য তাঁর নতুন স্বরে ঋদ্ধ হবে।

পাপড়ি রহমান যে বড় মাপের উপন্যাস খুব স্বচ্ছন্দে লিখতে পারেন তা তার নদীধারা আবাসিক এলাকা উপন্যাসে- তিনি আবার তা প্রমাণ করেছেন। বুড়িগঙ্গা নদীর দু’তীরের জনপদ আর তার নর-নারীদের নিয়ে লেখা হলেও ঢাকার বিপরীতে গড়ে ওঠা অপেক্ষাকৃত অনুন্নত আগানগরেই তার কাহিনির নর-নারীদের বাস আর কর্মস্থল। কিন্তু বর্ণনায় ঢাকা যেমন গুরুত্ব পেয়েছে আগানগরও ততটাই। সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর। এই দুষিত নদী কেবল দুই জনপদকে দুহাতে ধরে রাখেনি তাদের জীবনের সুখ-দুঃখের  পটভূমিও তৈরি করেছে। অসহায় মুহূর্তে নারীচরিত্রেরা এই নদীর সঙ্গেই কথা বলে।

সিরাজুল ইসলাম মুনিরের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা সব চেয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী উপন্যাস। এর পৃষ্ঠাসংখ্যা ৮৮০ এবং চরিত্র অসংখ্য। পরিচিত চরিত্রদের পাশাপাশি রয়েছে কল্পিত চরিত্র, যারা সবাই একই সময়কালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে নিজ নিজ ভূমিকায়। সমান্তরালে এগিয়ে গেলেও এই দুই শ্রেণির কাহিনি অভিন্ন হয়েছে। বর্ণনার কুশলতায় সব চরিত্র মিশে গিয়েছে ঘটনার প্রেক্ষিতে। তথ্যের ভারে নুয়ে পড়েনি কাহিনি যার জন্য শেষ  পর্যন্ত পড়ে যেতে আগ্রহ একটুও বাধাগ্রস্ত হয় না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাসের মধ্যে একে সেরা বলা যায় অনায়াসে।

আমাদের সাহিত্যে মননশীল লেখা সংখ্যায় অনেক কম, বেশ পিছিয়ে আছে। এর একটা কারণ মনে হয় পঠন-পাঠনের সীমাবদ্ধতা। দ্বিতীয় কারণ, মৌলিক চিন্তা করতে যে পরিশ্রম প্রয়োজন  তার প্রতি অনীহা। বয়স অনুযায়ী রাজীব সরকারকে নবীনই বলতে হয়। কিন্তু অল্প বয়সেই সে মননশীল লেখায় তার আন্তরিকতা ও মেধার পরিচয় দিয়েছে। সম্প্রতি তার লেখা যে দুটি প্রবন্ধের বই পেলাম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত না পড়েও মুগ্ধ হয়েছি। এত স্বল্প কলেবরে বুদ্ধদেব বসুর মতো বহুমুখী লেখকের ওপর (বহুমাত্রিক বুদ্ধদেব বসু বৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যে) এমন পূর্ণাঙ্গ আলোচনা আর কেউ করেছেন বলে আমার জানা নেই।

রাজীব সরকারের দ্বিতীয় বই সাহিত্য ভাবনায় সেকাল একাল―এ রয়েছে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে হাসান আজিজুল হকের ওপর আলোচনা। তার লেখার ভঙ্গি সরল কিন্তু লক্ষ্যভেদী। পড়তে যেমন অসুবিধা হয় না, একই সঙ্গে বক্তব্য বোঝা যায় সহজেই।

তরুণ ঔপন্যাসিক সাদাত হোসেনের নিঃশব্দ নক্ষত্র উপন্যাস পাঠের প্রতিক্রিয়ায় হাসনাত আবদুল হাই লিখেছেন, ভাষার ওপর এমন দখল যার তার গল্প বলা শুনতে শুরু করলে শেষ না করে উপায় থাকে না। মুগ্ধ হয়ে তার উপন্যাস পড়ে ভাবছি তার লেখা আগে পড়ি নি কেন ? সাদাতকে আন্তরিক অভিনন্দন।

নতুন করে পড়ার জন্য দেবেশ রায়ের তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত বের করে টেবিলে রেখেছিলাম।…দেবেশ রায় অন্য লেখকদের মতো নদীর জীবন নিয়ে লেখেননি, অর্থাৎ তার লেখায় জেলে জীবন  ও জেলেরা নেই। কিন্তু তিনি নদী তীরের মানুষদের নিয়ে যে কাহিনি লিখেছেন তা নদী ও মানুষের সম্পর্ককে তুলে এনেছে কোনো রোমান্টিসিজম ছাড়া, কঠোর বাস্তবতায়। অতিরিক্ত ডিটেইল থাকায় তার ম্যাগ্নাম ওপাস একবারে পড়া সম্ভব হয় না, কিন্তু চরিত্রচিত্রন এমন  নিপুন যে বিস্ময়ের মুগ্ধতায় সেই একঘেয়েমি কেটে যায়। তার বাঘারু চরিত্র বাংলা সাহিত্যে নিম্নবর্গের মানুষের চিরায়ত আর্কিটাইপ হয়ে থাকবে।

শাকিব লোহানীর একটি বাজপাখি ও ক’জন মানুষ প্রথম প্রকাশিত বই যার প্রচ্ছদের ছবি তিনি নিজেই এঁকেছেন। হাসনাত আবদুর হাই বলছেন, ছবিটি যখন প্রথম ফেসবুকে পোস্ট করা হয় সে সময় অনেকে প্রশংসা করেছিলেন যাদের মধ্যে আমিও ছিলাম।

দেরিতে হলেও বইটির গল্পগুলো পড়লাম। বেশ ভালো লাগল। নাম গল্পটি আমার কাছে মনে হয়েছে অসাধারণ। এই গল্পে মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে প্রকৃতি ও পাখির মতো প্রাণী। বেশ কিছু গল্পে লেখকের প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ বেশ উপলব্ধি করা যায়। মানবিক সম্পর্কের নানা টানা-পোড়েনেরও তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষক।

দ্বিতীয় উপন্যাস লিখেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছিল শহীদুল জহির। কিন্তু আপাতদৃষ্টে তার উপন্যাস, ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ অসাধারণ কিছু নয়, পড়ার সময় বরং মনে হয় সামান্য ক’টি ঘটনাকে ঘুরে ফিরে এনে কাহিনির বিস্তার করা হয়েছে। এখানে ঘটনায় অগ্রগতি নেই, চরিত্রগুলোও ঘটনার আবর্তে পড়ে অসহায় বোধ করে।… কাহিনির বর্ণনায় এই যে নিরাবেগ, নিরুত্তাপ  মনোভাব যা দূরবর্তী কোনো পর্যবেক্ষকের বলে মনে হয়, এটিই এই উপন্যাসের ব্যতিক্রমী সৌন্দর্য। বর্ণনাকারী এখানে একেবারেই নিরপেক্ষ, যেন তার নিজের এবং অন্যের মুখে শোনা কথা ছাড়া আর বলার কিছু নেই।…

বাংলাভাষায় পোস্ট-মডার্ন ধারার উপন্যাস খুব বেশি লেখা হয় নি যার জন্য মাসরুর আরেফিনের লেখা আগস্ট আবছায়া বাছাই করা পঠকের দৃষ্টি ও মনোযোগ, দুই-ই আকর্ষণ করবে। করবে কেন, বলা যায় ইতোমধ্যে করেছে।

পোস্ট-মডার্ন ধারার উপন্যাসে যে সব শনাক্ত করার মতো বৈশিষ্ট্য তার সবই তার জানা শুধু নয়, নখদর্পণে। তিনি তাই খুব কষ্ট করে ভাবনা-চিন্তা না করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লিখে গিয়েছেন এই জটিল উপন্যাস। কাহিনির ব্যাপ্তি বিশাল  আর মৃৎ-জীবিত চরিত্রের সংখ্যা অনেক হলেও তিনি তাদের সম্বন্ধে যেটুকু বলার তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে কাহিনি সামনে নিয়ে গিয়েছেন। সামনে নিয়ে গিয়েছেন প্রথাগতভাবে অবশ্য নয়, পোস্ট-মডার্ন পদ্ধতির অনুসরণে সময়কে ভেঙে-চুরে এলোমেলো করে দিয়ে। উপন্যাসের কাহিনি বিশাল, যার কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং সমগোত্রীয় সব রাজনৈতিক সহিংসতা।…কাহিনি বর্র্ণনার ভাষাও নতুন, অপরিচিত syntax, নতুন বাক্যবন্ধ, ঠিক পোস্ট-মডার্নের দোসর structuralist পদ্ধতি যেভাবে প্রচলিত ভাষাকে ভেঙে দিতে বলে, তার অনুসরণে লেখা। বুদ্ধিদীপ্ত আর শানিত এই ভাষা না হলে বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো না।

মোহিত কামালের লুইপা’র কালসাপ একটি আয়াস-সাধ্য এবং শ্রমলব্ধ উপন্যাস যা পড়ার পর লেখকের প্রতি যেমন শ্রদ্ধাবোধের সৃষ্টি হয়, একই সঙ্গে তার অনুপম শিল্পনৈপুণ্যের জন্য উৎসারিত হয় পাঠকের মুগ্ধতা।

উপন্যাসটি  মূলত ইতিহাসের তথ্য নির্ভর এবং অতীতের সমাজ ও সমাজ জীবনের অনুসন্ধান এর প্রধান লক্ষ্য। উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁকে পড়তে হয়েছে চর্যাপদের আদ্যোপান্ত ইতিহাস, বিশেষ করে উদ্ধারকৃত চারটি পুঁথির মধ্যে প্রাচীন বাংলাভাষায় (সান্ধ্যভাষা) লেখা পুঁথি ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ পুঁথির ৪৬টি পদ এবং ৫০তি গান বা গীতি। চর্যাপদের ভাষা দ্ব্যর্থবোধক, কেননা এর মধ্যে রয়েছে নানা প্রতীকী শব্দ ও শব্দবন্ধ। ব্যবহৃত রূপকের পেছনে লোকায়ত জীবন থাকলেও, এর মর্মার্থ পাওয়ার জন্য যেতে হয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় যেখানে তনময়তাকে অতিক্রম করেছে মন্ময়ের দ্যোতনা।… চর্যাপদের এই ব্যখ্যা ও বিশ্লেষণ  কথাসাহিত্যের মোড়কে উপস্থাপন করতে গিয়ে  তিনি তৈরি করেছেন সেকাল ও একালের সেতুবন্ধ হিসেবে দুই নারীচরিত্র ও তাদের যাপিত জীবনচিত্র। তাদের উভয়ের গড়ে ওঠা সম্পর্ক, ভাবের আদান-প্রদান ও পারস্পরিক চিন্তায় উঠে এসেছে সেকালের জীবনের সঙ্গে  বর্তমানের চর্যাপদের ইতিহাস।… মোহিত কামাল সেই পরিচিত ইতিহাসে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন তাঁর এই উপন্যাসে। এর জন্য যে নিপুণতা ও শিল্পবোধের তিনি স্বাক্ষর রেখেছেন তা অতুলনীয় বলা যায়। এত ছোট পরিসরে এমন বিশাল ব্যঞ্জনাময় এক ঐতিহাসিক-কাল্পনিক কাহিনি বর্ণনা করে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের সর্বশেষ আলোচনা মনি হায়দারের গল্প পঞ্চাশ নিয়ে। দীর্ঘ আলোচনা করতে গিয়ে  মনি হায়দার সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। ‘আজ সে বাংলাদেশের অতিপ্রজ লেখকদের শীর্ষে বলা যায়, কেননা এত কম সময়ে এত গল্প, উপন্যাস, শিশু-কিশোর পাঠ্য বই আর কেউ লেখে নি। সব মিলিয়ে ৬১টি। সে মাত্র ৫০ বছর পেরিয়ে এসেছ। একেবারে রূপকথার মতো শোনায় কথাসাহিত্যিক মনি হায়দারের জীবন।… জানোই তো sky is the limit. মনি হায়দার নিশ্চয় আরও ওপরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গল্প পঞ্চাশের বেশ কিছু গল্প তার আভাস দিচ্ছে। তার অভিজ্ঞতার ঝুলি এখন বেশ ভারী। সে গ্রামীণ জীবনের আলো-আঁধারির সঙ্গে যেমন সুপরিচিত, মহানগরের বিচিত্র জীবনও এখন তার কাছে অজানা নয়। সে অবলীলায় এই দুই ভুবনের কথা বলতে পারে তার গল্পে, কখনও ভদ্র ভাষায়, কখনও খিস্তি খেউর করে, যখন যা সে প্রয়োজন মনে করে।’

ফেসবুকে হাসনাত আবদুল হাই নিজের লেখা অনেকগুলো কবিতা পোস্ট করেছেন। সেখান থেকে ছোট্ট একটা কবিতা উৎকলিত করে এই লেখা শেষ করছি :

কোনো কিছুই টেকে না বেশিদিন

মানুষ ধাতস্থ করে ফেলে সব,

টিকে থাকার অভ্যাস লুফে নেয়

দুঃখ, শোক, হতাশা, এমনকি ভয়,

এখনও হয়েছে তাই, ভাবা যায়;

কিন্তু তারপরও থাকে কথা

জীবনে সব কিছু এক নয়

যতক্ষণ না হয় কারও পরাজয়।

টরেন্টো, ২০. ১০. ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares