প্রচ্ছদ রচনা : হাসনাত আবদুল হাই―সৃজনশীল-মননশীল বহুমাত্রিক লেখক : জীবনপঞ্জি : হাসনাত আবদুল হাই

হাসনাত আবদুল হাই ১৯৩৭ সালের মে মাসে কলকাতা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলায় সৈয়দাবাদ গ্রামে। পিতা মরহুম আবুল ফতেহ পুলিশের চাকুরিব্যাপদেশে কলকাতাসহ পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে সাময়িকভাবে বসবাস করেন। হাসনাত আবদুল হাইয়ের মাতার নাম মরহুমা আয়েশা সিদ্দিকা। তারা পাঁচ ভাই এবং চার বোন, বয়সে তিনি চতুর্থ। তিনি বর্তমানে বিপত্নীক, তাঁর স্ত্রী নাসরিন বেগম ২০১২ সালে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের এক পুত্র সাহেদ এবং কন্যা সোনিয়া। তিনি পুত্র ড. সাহেদ, পুত্রবধু সাবরিনা এবং দৌহিত্র সানজার-এর সঙ্গে ধানমন্ডিতে বাস করছেন।

হাসনাত আবদুল হাই-এর শৈশব কেটেছে কলকাতা, লালমনিরহাট, নড়াইল এবং সৈয়দাবাদ গ্রামে। তার হাতে খড়ি হয় নড়াইলে এক মক্তবে (১৯৪৫)। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছেন মাতুলালয় মনিয়ন্দ গ্রামে পাঠশালায়, কলকাতার পার্ক সার্কাস হাই স্কুলে, ঢাকার হাম্মাদিয়া স্কুলে এবং যশোর একাডেমিতে। তিনি ১৯৫৪ সালে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৫৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আই.এ পাস করেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিক্স-এ অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তী অক্সফোর্ড-এ কুইন এলিজাবেথ হাউজে এবং কিওতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন।

হাসনাত আবদুল হাই-এর কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে (১৯৬৪)। এক বছর অধ্যাপনার পর তিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। সরকারি কর্মজীবনে তিনি টাঙ্গাইল এবং করাচিতে এসডিও, সিন্ধু প্রদেশের সরকারের ডেপুটি সেক্রেটারি, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রামের কমিশনার, কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমির পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, শিল্প মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ বিভাগের সদস্য ছিলেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হিসেবে তিনি স্থানীয় সরকার সংস্কার সম্পর্কিত কমিশনের সদস্য সচিব ছিলেন এবং সেই ভূমিকায় সকলের আলোচনার ভিত্তিতে সুপারিশসহ প্রতিবেদন লেখেন। তাঁর উদ্যোগে এবং প্রচেষ্টায় ঢাকায় সুশাসনের উপর একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হয় (১৯৯৮), যা ছিল বাংলাদেশে প্রথম। এরপর একই বিষয়ে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ আয়োজিত কনফারেন্সে যোগদানের জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

হাসনাত আবদুল হাই চাকরি জীবনে দেশে এবং বিদেশে উন্নয়ন বিষয়ে বহু সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন এবং সেখানে কখনও সভাপতিত্ব এবং কখনও রিসোর্স পার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কুয়ালালামপুরস্থ আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থা এপিডিসি একটি দক্ষিণ এশীয় উন্নয়ন প্রকল্পের গবেষণায় সমন্বয়ক হিসেবে তাকে নিয়োগ দান করে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকাকালীন তৎকালীন মন্ত্রী জনাব জহিরুদ্দিন আহমদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তিনি মন্ত্রণালয়ের সহকর্মীদেরকে নিয়ে কাঁচা পাটখড়ি ব্যবহার করে নিউজ প্রিন্ট, কাগজ এবং কাপড় তৈরির প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতার জন্য তাকে অবসরের পর সরকার আড়াই বছর চাকুরিতে চুক্তিবদ্ধ করে। ২০০০ সালে চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করেন। এই সময়ে ইউএনডিপি, ডানিডা, সিডা তাকে স্বল্পকালীন কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে গবেষণা পত্র লেখার জন্য চুক্তি করে। তবে তিনি লেখাপড়া বিঘ্নিত হতে পারে বিবেচনায় কোনো দীর্ঘকালীন কনসালটেন্সি করতে সম্মত হননি।

ছাত্রজীবন থেকেই হাসনাত আবদুল হাই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। গল্প এবং উপন্যাস লেখা শুরু হয় কলেজ জীবন থেকে। পরবর্তীকালে তিনি মননশীল প্রবন্ধ এবং গবেষণা গ্রন্থ লিখেছেন। লেখক হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর চর্চা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত লেখা তাঁর গল্পগ্রন্থের সংখ্যা আট; উপন্যাস লিখেছেন বায়ান্নটি, তাঁর লেখা ভ্রমন কাহিনি সংখ্যা নয়টি; নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে তিনি গবেষণামূলক তিনটি বই লিখেছেন; হাইকুসহ তাঁর লেখা কবিতার বই তিনটি; তিনি ইংরেজিতে তিন খণ্ডে স্মৃতিকথা লিখেছেন; ইংরেজিতে তিনি একটি ভ্রমন কাহিনিও লিখেছেন; ইংরেজিতে অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিষয়ে লেখা তাঁর বইয়ের সংখ্যা আটটি। ২০২০ সালে তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক বারটি গল্প লিখেছেন যা জনকের গল্প নামে নভেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়েছে। একই বছরে ডিসেম্বর মাসে বের হয়েছে তাঁর লেখা শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট এবং ম্যাকবেথ নাটক অবলম্বনে নতুন  নাটক হ্যাম-বেথ। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি প্রায় প্রতিদিন কবিতার ফর্মে যে সব লেখায় তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করেছেন সেগুলি সামনের বইমেলায় ‘দিনলিপি-২০২০’ শিরোনামে বের হবে। বইটির লেখাগুলি ইংরেজিতেও থাকবে পাশাপাশি, যে জন্য শিরোনাম-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ডায়েরি-২০২০’।

কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য হাসনাত আবদুল হাই ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। সাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য তাকে ১৯৯৬ সালে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় একুশে পদক। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে সাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য তিনি এ´িম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন বছরে তিনি পেয়েছেন অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, ক্রান্তি পুরস্কার, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন পুরস্কার, এস. এম. সুলতান সম্মাননা, স্যার জগদীশ চন্দ্র পুরস্কার এবং মাওলানা আকরাম খাঁ পুরস্কার।

হাসনাত আবদুল হাই জাতীয় প্রায় সব দৈনিকে ইংরেজি ও বাংলায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন। বাংলাদেশ অবজারভারে লেখা তার কলাম ডেটলাইন গ্রামবাংলানোটস ফ্রম রুরাল বাংলাদেশ বই আকারে প্রকাশ হওয়ার পর জনাব আখতার হামিদ খানসহ অন্যান্য পল্লী উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছে। হাসনাত আবদুল হাই বিভিন্ন বিষয়ে উপন্যাস লিখলেও তাঁর জীবনীভিত্তিক পাঁচটি উপন্যাস বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব, চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা এবং শিল্পকলার নান্দনিকতা, এই তিনটি গবেষণামূলক বই তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান বলে স্বীকৃত হয়েছে। বর্তমানে তিনি শিল্পকলায় নারী শীর্ষক একটি বই লিখছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ

উপন্যাস

সুপ্রভাত ভালোবাসা (১৯৭৭)

আমার আততায়ী (১৯৮০)

তিমি (১৯৮১)

যুবরাজ (১৯৮৫)

প্রভু (১৯৮৬)

মহাপুরুষ (১৯৮৬)

সুলতান (১৯৯১)

সময় (১৯৯১)

কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৯৪)

মোরেলগঞ্জ সংবাদ (১৯৯৫)

একজন আরজ আলি (১৯৯৫)

নভেরা (১৯৯৫)

বাইরে একজন

হাসান ইদানীং (১৯৯৫)

সোয়ালো (১৯৯৬)

সাতজন (১৯৯৬)

বাবুই (১৯৯৭)

ইন্টারভিউ (১৯৯৭)

সিকস্তি (১৯৯৭)

সাঁতারু ও জলকন্যা (২০০১)

নবীর নৌকা (২০০১)

মৈত্রেয়ী ও রবীন্দ্রনাথ (২০০২)

রবীনের ভেতর বাহির (২০০৫)

মেয়ে (২০০৬)

সুনীতি (২০০৬)

অসুখ (২০০৬)

নভেলা (২০০৬)

সাইবার কাফে/বানভাসির কথকতা (২০০৮)

কমরেড অনুর অপরাহ্ন (২০০৮)

আষাঢ়ে (২০০৯)

দংশন (২০০৯)

পানেছারবানুর নকশীকাঁথা (২০১০)

বুড়ি গোয়ালিনী (২০১১)

এক এগারো অন্য জীবন (২০১১)

জোনাথান ও নিওগথিক (২০১১)

উজানে (২০১২)

বিকেলে একজন (২০১২)

ছায়ার মানুষ (২০১২)

ছবির পালাকার (২০১২)

তিন বন্ধু এবং একটি দেশ (২০১২)

ডেটলাইন : ভূষণপুর (২০১২)

বৃষ্টিতে কিংবা কুয়াশায় (২০১২)

লড়াকু পটুয়া (২০১২)

ইঁদুর দৌড় (২০১২)

ইউটোপিয়া (২০১৩)

নটে গাছটি (২০১৩)

জয়নাব (২০১৪)

নদীপুরাণ ও প্যাকেজ ট্যুর (২০১৪)

একদা, এক যুদ্ধে (২০১৫)

সুপ্রভাত বিষণ্নতা (২০১৫)

শুচিতা (২০১৬)

একলা (২০১৮)

সময় অসময় (২০১৮)

দু’টি উপন্যাস : যুগলবন্দী ও কয়েকদিন (২০১৮)

হেমিংওয়ের সঙ্গে (২০২০)

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র (২০১৯)

উপন্যাস সমগ্র-১

উপন্যাস সমগ্র-২

উপন্যাস সমগ্র-৩

উপন্যাস সমগ্র-৪

উপন্যাস সমগ্র-৫

ছোটগল্প

একা এবং একসঙ্গে (১৯৭৬)

যখন বসন্ত (১৯৭৭)

নির্বাচিত গল্প (১৯৭৮)

শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯৩)

মরচে পড়া স্টেনগান (২০০৮)

নবাবের তলোয়ার (২০০৯)

কাদামাটির জ্যোৎস্না (২০১২)

বৈশাখে ভার্জিনিয়া উলফ্ (২০১৪)

গল্প সমগ্র (২০০২)

গল্প সমগ্র-২ (২০১০)

দু’টি রাতের ভোরের দিকে যাত্রা (২০১৮)

টিভি ক্যামেরার সামনে মেয়েটি এবং অন্যান্য (২০১৮)

মুক্তিযুদ্ধের গল্প সংকলন (২০১৮)

জনকের গল্প (২০২০)

ভ্রমণ কাহিনি  

              .

সাফারি (১৯৯০)

জার্নাল ’৮৯ (১৯৯১)

ট্রাভেলগ (১৯৯৪)

ট্রাভেলগ-২ (১৯৯৫)

আন্দালুসিয়া (১৯৯৭)

যানাডু (১৯৯৭)

ভূমধ্যসাগরে (২০০৮)

সাত দিনের আমেরিকা (২০১০)

ইস্তাম্বুলে (২০১১)

ইতালিয়া (২০১৪)

কলকাতা রানাঘাট (২০২০)

প্রবন্ধ                 

.

নদী (১৯৮০)

পল্লী উন্নয়ন (১৯৮১)

অনিয়মিত কলাম (১৯৯০)

সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব (২০০৪)

জাপানের সংস্কৃতি (২০১৪)

গ্রাম উন্নয়নে রবীন্দ্রনাথ (২০১৪)

চলচ্চিত্রের নন্দনতত্ত্ব (২০১৬)

শিল্পকলার নান্দনিকতা (২০১৯)

কবিতা

ষড়ঋতু হাইকু (২০১৯)

পুলিশ এলে বলবো আইডি নেই কবিতার বই দুটি ছাড়া (২০১৯)

নাটক

হ্যাম-বেথ (২০২১)

Books in English

           .

Memoirs:

Aide-Memoir 1943-1954 (2008)

All Those Yesterdays :

1954-1964 (2009)

From The Horse’s Mouth :

1965-2000 (2014)

Dateline : Gram Bangla ( 1980)

Local level Planning ( 1981)

Integrated Approaches to

Rural Development (1983)

Decentralization (ed-1984)

Below The Line :

Rural Poverty in

Bangladesh (1995)

Kyoto Haiku (1995)

Good Governance (ed-2000)

Xanadu-A Journey (2000)

সাহিত্য পুরস্কার : শেরে বাংলা ফজলুল হক, মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, শিল্পাচার্য্য জয়নুল আবেদিন পুরস্কার, ক্রান্তি সম্মাননা, এস এম সুলতান সম্মাননা।

ছোটগল্পের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৮), সাহিত্যে অবদানের জন্য একুশে পদক লাভ (১৯৯৬)।

যে সব প্রকাশনা সংস্থা বই ছাপিয়েছে : মনীষা/স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স, বইঘর (চট্টগ্রাম)। মুক্তধারা, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, বাংলা একাডেমি, আগামী প্রকাশনী, মাওলা ব্রাদার্স, অনন্যা, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, অন্যপ্রকাশ, সন্দেশ, সাহিত্যপ্রকাশ, পাঠক সমাবেশ, মূর্ধণ্য, পরমা (ঢাকা)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares