আলোচনা : উপন্যাস―হাসনাত আবদুল হাই : সিকস্তি : বেলাল চৌধুরী

সিকস্তি ফার্সি শব্দ ; মানে ভাঙন। নদীতে, সমুদ্রে জমির ভাঙন। নদীর পাড় ভাঙে, উপকূলে সমুদ্রের পাড় ভাঙে। প্লাবন হয়, চরাচর ডুবে যায়, মানুষ ভূমিহীন হয়। হাসনাত আবদুল হাইয়ের সিকস্তি নামের ছোটো উপন্যাসটি ভাঙনের কাহিনি। শুধু নদী বা সমুদ্রের পাড় ভাঙা নয়, বৃহৎ অর্থে সমাজের সব ভাঙন, ভিতরে বাইরে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, মানবিক স¤পর্কের ভাঙন, পারিবারিক স¤পর্কগুলোতে চিড় ধরা, লোভ-লালসা, প্রতিপত্তির মোহ, শিক্ষাঙ্গনে অসুস্থ রাজনীতি, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে একজন সমাজ নিরীক্ষকের চোখে তুলে এনেছেন হাসনাত আবদুল হাই তাঁর এই ক্ষুদ্রায়তন উপন্যাসে আশ্চর্য দক্ষতায়, অশেষ নৈপুণ্যে।

একটা জনপদ, একটা বসতি, রসুলপুর নামে এক গ্রামের ভাঙনের আখ্যান বলেছেন লেখক এই উপন্যাসে। মাঠে বন্দুকের সঙ্গে বল্লম, সড়কির লড়াইয়ের পর কিছু দেহ পড়ে থাকে। যাদের রক্ত ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ফসল এই ক্ষেত-খামার সেখানেই তাদের রক্ত ঝরে, লাল রক্ত শুষে নেয় মাটি। ধানের চারা গাছের ফাঁকে ফাঁকে ভেজা মাটির কালো রং, রক্ত শুকিয়ে কালচে দাগ পড়ে যাবে। করুণ সুরে ডাক দিয়ে দূরে চলে যায় চিল, জোতদার আর তাদের লাঠিয়াল বাহিনীর সঙ্গে পেরে ওঠে না ছেলিম শেখ, রজব আলি আর মনিরুদ্দির মতো ভূমিহীনরা। গরিব গরিবই থেকে যায়। বঞ্চনা, শোষণ, নির্যাতন জীবনের নিত্যদিনের সঙ্গী হয় এদের।

নদীর পাড় ভাঙা জমি আবার যখন জেগে ওঠে তাতে গরিবদের কোনো দাবি থাকে না, তারা বঞ্চিত হয় নানাভাবে। জোতদার, মালিক আর প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে আঁতাত করে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তি সে সব জমি হাতিয়ে নেয়। ভূমিহীনদের খাস জমি দেওয়ার কথা বললেও তা ঐ বলা পর্যন্তই সার। জরিপ আর বণ্টন ব্যবস্থায় বিপন্ন হয় তাদের স্বার্থ। বর্গা চাষি আর কামলা দরিদ্রই থেকে যায়, তাদের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটে না।

 সিকস্তি উপন্যাসটি মোট আটটি অধ্যায়ে বিভক্ত। চরিত্র চিত্রায়ণের জন্য মুক্তকণ্ঠ তারিফ জানাতেই হয়। মূল চরিত্র প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র কামাল চৌধুরী এ উপন্যাসের মূল সত্তা। তার অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই আমরা এর কাহিনিতে বিচরণ করি। তাকে ঘিরে এবং তার চারপাশের যা কিছু ঘটনা সেগুলোকে লেখক মুন্সিয়ানার সঙ্গে শৈলী আর ফর্মের সামঞ্জস্যে উপস্থাপন করেছেন। মূল পটভূমিকায় গ্রাম থাকলেও শহর থেকেছে ছায়ার মতো, একটা বৈপরীত্য নিয়ে গ্রাম ও শহরের দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে। বেশ কিছু চরিত্র অনায়াসে জীবন-মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে অনায়াসে যাওয়া-আসা করে গল্পে। জীবনকে উপলব্ধি করার, সত্যকে একটা নতুন আঙ্গিকে দেখার প্রয়াস এ উপন্যাসে পরিলক্ষিত ; শুধু ভাষা আর শব্দে সবকিছু, সব বাস্তবতা কি ধরা যায় ? এর বাইরেও একটা জগৎ আছে, থাকে। বিশাল বিস্তৃত যে জীবন, তার কথা বলতে চেয়েছেন হাসনাত আবদুল হাই। এই জগৎটাকে লেখক একটা বিশেষ আঙ্গিকে কাহিনির মধ্যে গেঁথেছেন। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ অনায়াসে যাতায়াত করে তাঁর উপন্যাসের প্লটে। স্থান ও কালের এই সন্নিধি, জীবিত ও মৃতের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে যাওয়ার আবহ নির্মাণ, তার সঙ্গে দ্যোতনা সৃষ্টিতে কাব্যিক ভাষা সিকস্তি উপন্যাসকে একটা বিশিষ্ট স্থান দেয়।

কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র। পড়াশোনায় বেশ ভালো। সামনে পরীক্ষা কিন্তু বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে আড্ডা মারতে দ্বিধা নেই। সে বড়ভাই নাজিমউদ্দিন সাহেব, ভাবি ও তাদের দুই সন্তানের সঙ্গে থাকে। যৌথ পরিবার। বাবা মৃত। মা থাকেন গ্রামে। শহরে আসতে চান না। পুরনো ভিটে-মাটি ছেড়ে ঢাকায় এসে থাকার কথা ভাবতেই পারেন না।

বড়ভাইয়ের চোখে কামাল হলো একজন ‘ভিশনারি’। যাকে বলে আদর্শবাদী। বিশ্ববিদ্যালয়কে সন্ত্রাসমুক্ত করার, ধর্মীয় রাজনীতির অশুভ শক্তির বলয় থেকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখে সে। একদিন বড়ভাই তাকে ডেকে একটা কাজের ভার দেন। গ্রামের জমি-জিরাতের কাজ, গ্রামে গিয়ে মাকে দেখে আসার পাশাপাশি তহসিলদারের সঙ্গে জমি-জিরাত নিয়ে আলোচনাটা সেরে আসতে হবে। কামাল রওনা হয় ঢাকা থেকে কয়েক দিন পর। লঞ্চে জাফর আলম নামে এক পুরনো সতীর্থের সঙ্গে দেখা হয়। সে ভিন্ন প্রকৃতির ছেলে, ভূমিহীনদের ন্যায্য অধিকারের আন্দোলনের শরিক। তার কথাবার্তায় ভিন্ন সুর। তার সংস্পর্শে এসে একটা প্রভাব পড়ে কামালের মনে। এরপর গ্রামে গিয়ে পৌঁছা এবং চাক্ষুষ সব কিছু দেখতে দেখতে নিজেই কখন যেন জোতদারদের অত্যাচারে অত্যাচারিত ভাগ্যবিড়ম্বিত ভূমিহীনদের সঙ্গে একা হয়ে যায় সে। পত্রিকার জন্যে রিপোর্ট লেখে। বিষয় ভূমিহীনদের দুর্গতি, দুর্দশা। নিজের গ্রাম, নিজ পরিবার চলে আসে রিপোর্টে। বড়ভাই ক্ষেপে যান। বাড়ি থেকে বের করে দেন কামালকে। প্রিয় বান্ধবী ফিরোজা প্রবাসী ছেলের সঙ্গে ঘর বাঁধে। কামাল পড়ে থাকে একা, বড় বেশি একা। সে ভাঙনের শব্দ শোনে, খুব কাছে, একটু দূরে, নিজের জীবনকে ঘিরে, সমগ্র সমাজকে কেন্দ্র করে। কামাল ভাঙন রোধ করতে পারে না। কিন্তু তার মুখোশটা খুলে দেয়।

হাসনাতের উপন্যাস  সিকস্তি আকারে ছোটো কিন্তু এর কাহিনির বিস্তৃতি ও তাৎপর্য ব্যাপক। কাহিনিতে এসেছে একই সঙ্গে নাগরিক ও গ্রামীণ জীবন। নাগরিক জীবনে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের পাশাপাশি তিনি তুলে ধরেছেন গ্রামীণ সাধারণ মানুষের ওপর ক্ষমতাধরদের শোষণ-বঞ্চনার আবহমানকালের কাহিনি। সমান্তরালভাবে কাহিনির এই দুই ধারা অগ্রসর হলেও স্থানে স্থানে তাদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে ঘটনার বিন্যাসে ও চরিত্রের আচার-আচরণের মাধ্যমে। দুই ধারা তাই পৃথক থাকেনি, একটা অখণ্ড রূপ পেয়েছে যার জন্য কাহিনির ভেতরকার ঐক্য অক্ষুণ্ন থেকেছে।

সিকস্তি উপন্যাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক এর আঙ্গিক। ন্যারেটিভে হাসনাত জাপানি ‘নো’ থিয়েটারের প্রকরণ ও পদ্ধতি ব্যবহার করে স্থান ও কালকে ভেঙে দিয়েছেন। বর্তমান অবস্থানে বাস্তবতার ভেতর একই চরিত্রকে দেখা গিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে, ভিন্ন সময়ের প্রেক্ষিতে। কাহিনির প্লট নির্মাণের কুশলতার জন্য তো বটেই, বাংলা উপন্যাসে ‘নো’ থিয়েটারের আঙ্গিক ব্যবহারের জন্য সিকস্তি উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares