আলোচনা : উপন্যাস―হাসনাত আবদুল হাই : হাসনাত আবদুল হাইয়ের একজন আরজ আলী : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

[কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাইয়ের একজন আরজ আলী (১৯৯৫) উপন্যাসটি প্রকাশের পর প্রয়াত কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সুন্দরম পত্রিকায় একটি দীর্ঘ আলোচনা লেখেন, হাসনাত আবদুল হাইয়ের জন্মবার্ষিকীতে শুভেচ্ছাস্বরূপ দুর্লভ আলোচনাটি নিবেদিত হলো।]

আরজ আলীর সংশয় ও সংগ্রাম

‘ধর্মজগতে এমন কতগুলো বিধি-নিষেধ, আচার-অনুষ্ঠান ও ঘটনাবলির বিবরণ পাওয়া যায়, যাহার যুক্তিযুক্ত কোনো ব্যাখ্যা সাধারণের বোধগম্য নহে। তাই সততই মনে কতগুলো প্রশ্ন উদয় হয় এবং সেই প্রশ্নগুলোর সমাধানের অভাবে ধর্মের বিধি-বিধানের ওপর লোকের সন্দেহ ও অবিশ্বাস জন্মে।’

আরজ আলী মাতুব্বর : সত্যের সন্ধানে আজ থেকে ষাট বছর আগে কীর্তনখোলা নদীর তীরে লামচরি নামে একটি গ্রামে এক কৃষকের মাথায় ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে নানা রকম জিজ্ঞাসা কাঁটার মতো বিঁধতে থাকলে তিনি সেসব লিখে রাখেন ‘পুস্তক প্রণয়নের জন্য নহে, স্মরণার্থে।’ এইসব কাঁটা তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল আরও আগে থেকেই, বোধ হয় বাল্যকালেই তিনি বহিষ্কৃত হয়েছিলেন ধর্মের নিশ্চিন্ত ও নির্বোধ কোমল কোল থেকে। তাঁর মনে কেবলই প্রশ্ন, লেখাপড়া না শিখে প্রশ্নের জবাব জানবেন কোত্থেকে ? নিম্নবিত্ত কৃষিজীবী পরিবারের ছেলে, পাঁচ বছর বয়সে পিতৃহীন হওয়ার পরপরই ঋণের দায়ে ভিটেমাটি নিলামে উঠল। মাথা গোঁজার ঠাঁই যেখানে জুটল, সেখানে হাত-পা ছড়িয়ে শোবার জায়গাটুকু পর্যন্ত নেই। বাড়ি বাড়ি কাজ করে মা সন্ধেবেলা সানকিতে করে যা নিয়ে আসেন, তা-ই তাঁদের সারা দিনের আহার। তো এই ঘরের ছেলে লেখাপড়া করার জন্য হন্যে হয়ে ওঠে কেন ? তাঁর ইচ্ছাটা কী? ডিগ্রি নিয়ে নিয়মিত রোজগার নিশ্চিত করা ? না, তাঁর মতো অবস্থা থেকে এসেও অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের সাথে লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরিতে ভালো করেছে, এ রকম দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় বৈকি। সেদিকে আরজ আলীর খেয়ালই নেই। তবে কি শিক্ষিত হয়ে এলাকার পাঁচজনের একজন হয়ে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিলেন ? সামাজিক প্রতিষ্ঠার তোয়াক্কা তিনি কখনওই করেননি। না, এইসব ব্যাপার তাঁকে আকর্ষণ করে না। এমনকি বিদ্বৎসমাজের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার উচ্চাকাক্সক্ষা থেকেও তিনি শোচনীয়ভাবে বঞ্চিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর জোটেনি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের পরোয়াও তিনি করেননি। তাঁর সবচেয়ে তীব্র আবেগ হলো শিক্ষালাভ, শিক্ষা অর্জন এবং শিক্ষা অর্জনের তাগিদ হলো তাঁর জিজ্ঞাসা। তাঁর জিজ্ঞাসার জবাব চান বলেই পড়াশোনা করার জন্য আরজ আলী ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। পড়তে পড়তে তিনি বুঝতে পারেন, বিজ্ঞানচর্চার বিকাশের সঙ্গে পরিচিত হলেই তাঁর জিজ্ঞাসার জবাব মিলবে। শিক্ষক, ক্লাসরুম ও ল্যাবরেটরি ছাড়া কেবল নিজের চেষ্টায়, একা একা বিজ্ঞানের নানান শাখায় তিনি ঢুকতে চেষ্টা করেন নাড়িছেঁড়া মনোযোগ ও অবিশ্বাস্য পরিশ্রমের সাহায্যে।

তবে এই অমানুষিক পরিশ্রমেই ছিল আরজ আলীর সর্বাধিক আনন্দ। সুদীর্ঘকালের বিশ্বাস ও প্রচলিত সংস্কারে অবিরাম জিজ্ঞাসা হলো তাঁর সৃজনশীল তৎপরতা, তাঁর জিজ্ঞাসার উত্তেজনা ও উদ্বেগ অনুভব করার ক্ষমতা পাওয়া যায় কেবল সৃজনশীল মানুষের মধ্যেই। শিক্ষালাভ ও জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়ার বদলে আরজ আলীর মাথায় গজায় নতুন নতুন জিজ্ঞাসা। তাঁর জিজ্ঞাসার ধার তীক্ষè থেকে তীক্ষèতর হয়ে তাঁকে বিঁধতে থাকে আরও গভীর ভেতরে। তাঁর ভেতর বড় হতে থাকে একজন দার্শনিক, প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাক কি না-ই পাওয়া যাক, তাতে দমে না গিয়ে নিজের প্রশ্নকেই গভীরভাবে বোঝার প্রেরণা তিনি অনুভব করেন প্রবলভাবে।

আরজ আলীর সন্দেহের প্রথম লক্ষ্য ধর্মের সঙ্গে জড়িত পুরাণ, তিনি বলেন ‘ধর্মজগতের ঘটনাবলি’। এই পুরাণগুলোই তৈরি করে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি। কখনও এগুলো গড়ে ওঠে ধর্মকে ঘিরে, কখনও প্রচলিত পুরাণকে জড়ানো হয়েছে ধর্মের সঙ্গে। এইসব পুরাণই ধর্মকে মানুষের কাছে সহজবোধ্য, আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এই শতাব্দীর একজন বড় কবি বলতেন, তিনি বাইবেল মানেন, কিন্তু বাইবেলের পুরাণে তাঁর বিশ্বাস নেই। তা কী করে হয়? ধর্ম ও পুরাণ কিন্তু একটি আরেকটির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। হাজার হাজার বছর ধরে পুরাণ রচিত হয়ে চলেছে, ধর্মের বাণী বা মর্মবাণী বা আত্মা যা-ই বলি না কেন, যতি পায় পুরাণের হাত ধরেই। ধর্মের রক্তমাংস হলো তার পুরাণ। ধর্ম লোপ পেলেও তার পুরাণগুলো কিন্তু টিকে থাকতে পারে সংস্কৃতির ভেতর, এইসব ব্যবহার করে বড় বড় শিল্পকর্মও সৃষ্টি হতে পারে। আবার ধর্ম থেকে পুরাণকে ঝেড়ে ফেলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, আমাদের দেশেও হয়েছে। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চায়, ধর্মের প্রাণ ভক্তি ঝরে পড়েছে পুরাণবিহীন ধর্ম থেকে। আবার সংশয়কে ঠেকিয়ে রাখায় যে-ই বুদ্ধিবৃত্তি বিজ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত থেকে গেছে, তা এলিয়ে পড়েছে জীবনযাপনকে মার্জিত করার নতুন নতুন প্রয়াসের মধ্যে। আরজ আলী যখন পুরাণগুলোকে সন্দেহ করেন, তাঁর প্রশ্নে প্রশ্নে পুরাণের অবাস্তবতা, অস্বাভাবিকতা ও প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে সেগুলোর ঘোরতর অসঙ্গতি প্রকট হয়ে ওঠে, তখন তা আঘাত করে মানুষের মূল ধর্মবিশ্বাসে। তাঁর সংশয় হলো বিজ্ঞানচর্চার প্রথম শর্ত, এমনকি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের প্রধান লক্ষণ তাঁর সংশয়পীড়িত চিত্ত। সংশয়ের পর সংশয় তাঁর নিজের জন্য বিজ্ঞানপাঠ অপরিহার্য করে তোলে এবং বিজ্ঞানপাঠের ফলে সংশয় আরও ধারালো হলে এই ধর্মজর্জরিত সমাজে আরজ আলী হয়ে ওঠেন একজন বিপজ্জনক মানুষ। এই প্রশ্নগুলো তিনি গ্রামের আরও দশজনের সামনে যখন তুলছেন, তখন এখানে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তার ভিত্তি ছিল ধর্ম। তাই নিভৃত গ্রামে বাস করেও এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি না হলেও আরজ আলী মাতুব্বর রাষ্ট্রের বিরূপ দৃষ্টিতে পড়েন, দেশদ্রোহী বলে তাঁকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হয়। রাষ্ট্রের রাগ তাঁর মুক্তচিন্তাচর্চার ওপর, তাঁর ভাবনার প্রকাশের ওপর। তাঁকে বেরিয়ে আসতে হয় মুচলেকা দিয়ে, প্রচলিত বিশ্বাসে চিড় ধরাবার মতো প্রশ্ন করা থেকে তিনি বিরত থাকবেন। এ রকম মুচলেকা দেওয়া তাঁর স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না, এটি দিতে তাঁর কষ্ট হয়েছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু মুচলেকার মালিক যে রাষ্ট্র, তার চেয়ে তিনি অনেক বড় মাপের শক্তি। সুতরাং এটাকে ঝেড়ে ফেলে তিনি ফের নিয়োজিত হন নিজের জিজ্ঞাসা ও সংশয়কে ধারালো করার কাজে। তিনি স্তব্ধ হন না, কিন্তু কাজ অব্যাহত রাখার জন্যই তাঁকে একটু গোপনীয়তা অবলম্বন করতে হয়।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের একজন আরজ আলী উপন্যাসে আরজ আলীর প্রসঙ্গের সূত্রপাত একজন আমলার এজলাসে। গতানুগতিকতার প্রতি আমলাতন্ত্রের নিরঙ্কুশ আনুগত্য জানাবার জন্য ওই ঘরটির বর্ণনাই যথেষ্ট। একটু উদার ভাবনার মানুষকে কমিউনিস্ট বলে শনাক্ত করা তখন পাকিস্তানের একটা ব্যারাম। আমলার কাজ সেই ব্যারামটিকে নিষ্ঠার সঙ্গে লালন করা। নিষ্ঠা কথাটি এখানে ঠিক হলো না, নিষ্ঠার জন্য একটু মনোবলের দরকার। আমলাতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে একটি যন্ত্র, তার কল্পনা করার ক্ষমতা নেই, মেধার ব্যবহার তার জন্য নিষিদ্ধ। রাষ্ট্র যেভাবে চলতে চায় কিংবা যেভাবে অচল থাকতে চায়, তা-ই নিশ্চিত করার মধ্যেই তার দক্ষতার বিচার হয়। ‘আজকে যা মিথ্যে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে তা-ই সত্যি বলে গ্রহণ করতে পারে রাষ্ট্র, সমাজ।’ আরজ আলীর এই কথার জবাব আমলার মুখ থেকে বেরোয় সঙ্গে সঙ্গে, ‘আমরাও সেই সত্যকে সমর্থন করব তখন। সত্যের সমর্থনে সমসাময়িক হওয়াই টিকে থাকার প্রধান শর্ত।’ কথাটি আমলার নিজের বক্তব্য নয়, তাঁর বক্তব্য বলে কিছু থাকতে নেই। এখানে অল্প পরিসরেই আমলাতন্ত্রের কলকব্জা হাসনাত খুলে ফেলেন দক্ষতার সঙ্গে। আমলা যতই একটি যন্ত্রাংশ হোন না কেন, তিনি একজন মানুষও তো বটে। তাঁর আমলা স্বভাবের পাশাপাশি তাঁর অসহায়ত্বটিও কিন্তু লেখক ঠিক শনাক্ত করে ফেলেন। ঘটনার মধ্যে দিয়েই ঔপন্যাসিক বুঝিয়ে দেন, আমলা যত জনবিচ্ছিন্ন হোন, কর্মক্ষেত্রে অধিবাসীদের সম্বন্ধে তাঁর উন্নাসিকতা যতই থাকুক, প্রকৃতপক্ষে এই সমাজের মূল প্রবণতার দাসত্ব তাঁকে করতেই হবে। এখানে যা প্রচলিত তার বাইরে কিছু করতে যাওয়া মানেই হলো ঝামেলা সৃষ্টি করা। আরজ আলী মাতুব্বর সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ঝামেলা সৃষ্টি করে গেছেন সারা জীবন ধরে। কিন্তু সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলন তাঁকে আকৃষ্ট করল না কেন ? এর জবাব এই উপন্যাসে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে নায়কের কয়েকটি উক্তিতে। কিন্তু গল্পের মধ্য দিয়ে এর জবাব পেলে আরজ আলীকে বুঝতে কি আমাদের সুবিধা হয় না ? পঞ্চাশের দশকে ভাষা আন্দোলনে তিনি কীভাবে সাড়া দিচ্ছেন কিংবা উদাসীন থাকছেন, ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলন বা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে কতটা আলোড়িত বা বিক্ষুব্ধ বা উদ্বুদ্ধ করেছে, এই ব্যাপারে উপন্যাসটি অস্বস্তিকরভাবে নীরব।

সমকালীন ব্যক্তিত্ব নিয়ে উপন্যাস লেখা কেবল কি দুরূহ, কখনও কখনও লেখকের জন্য বিব্রতকরও বটে। কথাসাহিত্যে এই অ্যান্টি-হিরোর কালে বড় মাপের ব্যক্তিত্বকে নায়ক করে উপন্যাস লেখার উদ্যোগ নেওয়াই ব্যতিক্রমধর্মী সাহসের কাজ। হাসনাত আবদুল হাই একজন আরজ আলীর আগেও এ রকম উদ্যোগ নিয়েছেন এবং নায়কের স্বভাব, তাঁর ভাবনা, তাঁর প্রেরণা, তাঁর ক্ষোভ ও বেদনা প্রভৃতি প্রকাশের জন্য উপন্যাসের চলিত রীতির বাইরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। উপন্যাসে লেখক নিজেও একটি চরিত্র, কিন্তু এখানে নায়কের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে প্রশ্ন করা এবং মাঝে মাঝে মন্তব্য করা ছাড়া চরিত্র হিসেবে তিনি কোনো ভূমিকা পালন করেন না। আরজ আলী মাতুব্বরের সঙ্গে তাঁর কোনো দিন দেখা হয়নি, এতে কিছু এসে যায় না। তাঁর রচনা পাঠ ও তাঁর জীবনযাপন সম্বন্ধে নানান তথ্যও তাঁর প্রতি লেখকের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু লেখকের শক্তি এখানে যে বিহ্বল হয়ে নায়ককে আইডিয়ালাইজ করতে গিয়ে এলিয়ে পড়েননি। ঔপন্যাসিক একটি চরিত্র হলেও ঔপন্যাসিক নিজে কখনও সামনে আসেন না এবং আড়ালে থেকে কেবল আরজ আলীর তৎপরতার মধ্যেই তাঁকে উন্মোচনের চেষ্টা করেন। ফলে চরিত্র হিসেবে হাসনাত আর গড়ে ওঠেন না, কাহিনির বিকাশে কোনো কাজে না এলে সেই চরিত্রটিকে পাঠক সহ্য করবে কেন? কিছুতেই সামনে আসবেন না বলে ঔপন্যাসিকের সতর্কতা প্রায় মাত্রাছাড়া হয়ে পড়েছে। অথচ হাসনাতকে আরেকজন লোক বলে গণ্য করলে কিন্তু হাসনাত আবদুল হাই চরিত্রটিকে রক্তমাংস দিতে পারতেন।

কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে হাসনাত দীর্ঘ আলাপ করেন, তাঁদের সংলাপই এগিয়ে নিয়ে গেছে কাহিনিকে। এইসব সংলাপের বিন্যাসেই গড়ে উঠেছে উপন্যাস। আরজ আলীর বিদ্যাচর্চা, তাঁর লেখা, লেখা ছাপা, বইয়ের যথাযথ প্রচার প্রভৃতির সঙ্গে এই ব্যক্তিগণ নানানভাবে জড়িত। কেবল ইন্টারভিউ দেওয়ার কাজে তাঁরা নিয়োজিত নন, তাঁরা প্রত্যেকে এই উপন্যাসের চরিত্র।

বরিশাল বিএম কলেজের প্রবীণ অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদিরকে একজন বিদ্বান, বিদ্যানুরাগী, বিদ্যাচর্চার প্রতি সশ্রদ্ধ এবং দায়িত্বশীল মানুষ বলে চেনা যায়। তরুণ সহকর্মীদের প্রতি তিনি সস্নেহ, নিজের শিক্ষকদের সম্বন্ধে শ্রদ্ধা ও আবেগে বিহ্বল। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সহপাঠী বন্ধু এবং জীবনানন্দ দাশের ছাত্র বলে তিনি গর্বিত। এসব কিন্তু আসে তথ্যের মধ্য দিয়ে, স্মৃতিচারণ বা ঘটনার প্রবাহে নয়। তবু তাঁকে আলাদা ধরনের একজন মানুষ বলে চিনতে পারি। ঝুঁকি নিয়ে আরজ আলীর বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে তিনি আমাদের শ্রদ্ধাভাজন হন। তবে তাঁর প্রসঙ্গ আরও আসতে পারত, তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য জানার চেয়ে তাঁকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখতে পাওয়াই কি বেশি কাম্য নয়? কাজী গোলাম কাদিরের ব্যক্তিগত কি পারিবারিক জীবন কি এখানে একটু উকি দিতে পারত না ?

একজন আরজ আলী, প্রকাশকাল: ১৯৯৫

উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র শামসুল হক। তিনিও বিদ্বান ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী অধ্যাপক। তিনি অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ মানুষ, আবার স্বভাবের কল্যাণে অনেকের স্নেহভাজন। ঔপন্যাসিকের সঙ্গে যখন তিনি কথা বলছেন, তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যবয়স্ক অধ্যাপক, কিন্তু আরজ আলী মাতুব্বরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে, তখন তিনি বরিশাল কলেজের তরুণ শিক্ষক। যথার্থ শিক্ষিত ব্যক্তির মতোই নানা বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ, তাঁর বইয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ তখনই যে কারও ঈর্ষার উদ্রেক করতে পারে। আরজ আলী মাতুব্বরের রচনার সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়ের বিবরণ খুব আকর্ষণীয়। বর্ণনায় হালকা একটু রহস্য রাখা হয়েছে, কলেজ শিক্ষকদের ক্লাবে কাজী গোলাম কাদির শামসুল হকের হাতে রোল করা এক বান্ডিল কাগজ দিয়ে সরে গেলে তিনি সেটা খুলে পড়তে শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে কৌতূহলী হয়ে ওঠে পাঠক। পড়া শেষ হলে তিনি রীতিমতো শিহরিত হন। তাঁর নিজের জবানিতে শুনি, পুরো লেখাটিতে কুসংস্কার-বিজ্ঞানের তুলনা করে তাদের বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এ তো হলো আরজ আলীর লেখা সম্বন্ধে শামসুল হকের বিবৃতি। পড়তে পড়তে তিনি শিউরে উঠছেন, প্রবলভাবে আলোড়িত হচ্ছেন, সেই ছবিটি কোথায়? আরজ আলী তাঁকে ধাক্কা দিচ্ছেন, তাঁর একটি রচনা প্রগতিবাদী হিসেবে পরিচিত বহু লেখা পড়ার জন্য শামসুল হকের গর্বকে ভেঙে ফেলে কেন ও কীভাবে। তার পরিচয় না থাকায় তাঁর শিহরণের অংশীদার হওয়া থেকে আমরা বঞ্চিত হই। চরিত্রকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় তার বিকাশের যে সম্ভাবনা দেখি, পরে তার বিস্তারে তা হারিয়ে যায়।

আলী নূরও অভিভূত হন আরজ আলীর রচনা প্রথম পাঠ করে। কিন্তু কি শামসুল হক, কি আলী নূর, তাঁদের এই মুগ্ধতা ও বিস্ময় কেন, আধুনিক দর্শন, শিল্পসাহিত্য ও রাজনীতির সঙ্গে তাঁদের অনেক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও আরজ আলী তাঁদের কোথায় এবং কেন ঘা দেন, তার বিশ্লেষণ গল্পের শরীরে মিশে থাকাটা কি এই উপন্যাসের জন্য জরুরি নয়? ঢাকায় মিলন সংঘের আবুল হাসনাৎ আরজ আলীর পাণ্ডুলিপি পড়ে বিস্মিত হন। কেন? সে কি কেবল একজন কৃষকের লেখা বলেই? মিলন সংঘে মুক্তবুদ্ধিচর্চার নিয়মিত আসর বসত, সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে এমন সব আলোচনা করতেন, যা সেই সময়ের রাষ্ট্র বা সমাজের সহ্য করার কথা নয়। তাঁরা যে নিরাপত্তা ভোগ করেছেন, আরজ আলীর ভাগ্যে তা জোটেনি। তাঁদের ভাবনাচিন্তা ও আরজ আলীর ভাবনাচিন্তার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? এই প্রসঙ্গে উপন্যাসে আরজ আলীর দর্শনের একটি প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হতো বলে বিবেচনা করি।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের প্রধান বিবেচনা আরজ আলীর সংগ্রাম। প্রথম জীবনে তাঁর দারিদ্র্যপীড়িত জীবন পাঠককে অভিভূত করে, অভিভূত হওয়ার কারণ দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধে আরজ আলীর অনমনীয় মনোবল। আরজ আলীর পিতামহের ওই গ্রামে এসে বাস করা, নতুন চরে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মধ্যে চাষের জমি তৈরি প্রভৃতি অংশে বাংলার চাষির বল ও সাহসকে চোখের সামনে তুলে ধরে। আরজ আলীর পিতৃবিয়োগ, মায়ের পরিশ্রমে পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদনের করুণ ব্যবস্থা, বিশেষ করে ছোট ঘরে অস্বস্তিকর বসবাস প্রভৃতি চিত্র কৃষকের পারিবারিক জীবন তুলে ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় লেখাপড়া শেখার সঙ্গে অব্যাহত রাখতে হয় রোজগারের চেষ্টা। চাষাবাদের কাজ করেন, এই সঙ্গে শিখে নেন জমি মাপার কাজ। আমিন হিসেবে এতই দক্ষ হয়ে ওঠেন যে জমির মালিকানা নিয়ে বিবদমান লোকজন তাঁর সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে মেনে নিয়েছে দ্বিধাহীন চিত্তে। পেশাগত ক্ষেত্রেও তাঁর সততা ছিল নিরঙ্কুশ। আক্ষরিক অর্থে তিনি স্বশিক্ষিত, তাঁর শিক্ষালাভের পদ্ধতি এতই শ্রমসাধ্য এবং তা এতটাই অধ্যবসায় দাবি করে যে তা অনুসরণ করতে কেউ উৎসাহিত হবে বলে মনে হয় না। উপন্যাসে হাসনাত প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে আরজ আলীর বিনয়ের উৎসও হলো তাঁর দৃঢ় মনোবল। নিজের ওপর অবিচল আস্থাই আরজ আলীকে দিয়েছে গভীর আত্মবিশ্বাস, আত্মবিশ্বাসী মানুষের পক্ষেই বিনয়ী হওয়া সম্ভব।

আরজ আলী মাতুব্বর হলেন রেনেসাঁসের মানুষ। তাঁর দৃষ্টিতে সংশয়, চোখের মণির ভেতর আঁকা ছিল একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অবলম্বন হলো যুক্তি। আবার বিজ্ঞানের অনুমোদন ছাড়া কোনো যুক্তিকেই তিনি গ্রহণ করেন না। তাঁকে নিয়ে লেখা উপন্যাসে গ্যালিলিওর প্রসঙ্গ তাই উটকো মনে হয় না। প্রচলিত বিশ্বাসকে খণ্ডন করতে গিয়ে নিগৃহীত হন দুজনই, দুজনকেই মুচলেকা দিতে হয়েছিল এবং তাঁদের কেউই সেই মুচলেকা মেনে চুপচাপ বসে থাকেননি, নিজের নিজের চিন্তার ক্ষেত্রে কাজ করে গেছেন কোনো রকম আপস না করেই। কিন্তু উপন্যাসের শুরুতে ও শেষে গ্যালিলিওর ওপর নাটক দেখার ব্যাপারটির উপস্থাপনা নাটকীয়, এই নাটকীয়তা কিন্তু উপন্যাসের ভঙ্গিতে অনুপস্থিত এবং তাই উপন্যাসের সঙ্গে খাপ খায় না, দুটো আলাদা ঘটনা হয়ে থাকে। আরজ আলী মাতুব্বর যে রেনেসাঁসের মানুষ, তা বরং প্রকাশিত হয়েছে তাঁর চরিত্রের বিকাশের সঙ্গে।

রেনেসাঁসের একটি বড় উপার্জন হলো মানুষের ব্যক্তি-স্বাধীনতা। ব্যক্তিস্বাধীনতায় আরজ আলীর নিরঙ্কুশ বিশ্বাস এই দেশে আর কারও মধ্যে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। পশ্চিমে বুর্জোয়া সমাজের বিকাশের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সমার্থক হয়ে যায় এবং পরে তা পর্যবসিত হয় ব্যক্তিসর্বস্বতায়। আমাদের মধ্যবিত্ত রপ্ত করে শেষ বৈশিষ্ট্যটি, এমনকি আমাদের এখানে সংস্কারমুক্ত উদার চিন্তার মানুষও ব্যক্তিজীবনে ব্যক্তিসর্বস্বতার শিকার। আরজ আলী এই ক্ষেত্রেও সম্মানজনকভাবে ব্যতিক্রম। এই জন্যই অন্যের স্বাধীনতায় তিনি কখনওই হস্তক্ষেপ করেননি। নিজের পরিবারে ধর্মচর্চার ব্যাপারে কারও ওপর জোর খাটাননি। উপন্যাসে আরজ আলীর এই পরিচয়টি লেখক তুলে ধরেন স্বচ্ছভাবে।

আরজ আলী মাতুব্বর আরজ আলীর অসিয়তনামা বা উইলের সংযোজন উপন্যাসটিকে বিশেষ তাৎপর্য দান করেছে। এই উইল প্রকৃতপক্ষে আরজ আলীর আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মানবোধ ও দৃঢ় মনোবলের দলিল। সম্পত্তি আরজ আলীকে কখনও আকর্ষণ করেনি। সম্পত্তি নয়, তাঁর লক্ষ্য ছিল সচ্ছলতা। কেবল একটি সচ্ছল জীবন যাপনের জন্য প্রাণপণ পরিশ্রম করে তিনি অর্থ উপার্জন করেছিলেন। আজীবন গ্রামের মানুষ, সচ্ছল হওয়ার পরও, এমনকি বিদ্যাচর্চার পথ সুগম করার জন্যও শহরবাসের পরিকল্পনা করেননি, খ্যাতি অর্জনের পরও জীবনযাপনের ধরনে তাঁর রূপান্তর ঘটেনি। উত্তরাধিকারদের জন্যও এমন ব্যবস্থা করেননি, যাতে পিতার উপার্জনে তাঁদের জীবনযাপনের ধরনে বড় কোনো রূপান্তর ঘটে। নিজের কোনো কাজে তিনি অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে চাইতেন না। মৃত্যুর পর তাঁর নির্দেশ অনুসারে তাঁর মৃতদেহের ব্যবস্থা যিনি করবেন, তাঁর পারিশ্রমিকের ব্যবস্থাও তাঁর উইলে করা হয়েছে স্পষ্টভাবে। নিজের জন্য কবর নির্মাণের দৃষ্টান্ত কিছু কিছু পাওয়া যায়, অনেকে নিজের চোখ দান করে যায়। কিন্তু মৃত্যুর পর নিজের মৃতদেহ মেডিকেল কলেজে দিয়ে গেছেন, এমন কথা এ পর্যন্ত শুনিনি। নিজের ওপর আস্থা গভীর হলে এই নির্দেশ দেওয়া যায়। তাঁর ভাবনা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং উইলেও এই বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে। এই উইল দেখে মনে পড়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উইলের কথা। সামাজিক অবস্থান ও প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসাধনায় দুজনের ফারাক থাকা সত্ত্বেও প্রচলিত বিশ্বাসকে যুক্তি দিয়ে বিচার করা, সুশৃঙ্খল চিন্তা করার প্রবণতা এবং মনোবলের দৃঢ়তার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে আরজ আলীর অনেক মিল দেখতে পাই। বিদ্যাসাগরের উইলের ভাষা খুবই স্পষ্ট এবং নির্দেশগুলো সুবিন্যস্ত। বিদ্যাসাগরের কর্মক্ষেত্রে তাঁর সমাজ, সংস্কারমুক্ত চিত্তে তিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন সমাজের অবাঞ্ছিত প্রথা মোচনের কাজে, আরজ আলীর সাধনা প্রচলিত বিশ্বাসে তাঁর সংশয়কে তুলে ধরা এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তির সাহায্যে সংশয়কে ক্রমে শানিত করার কাজে। সামাজিক বিবেচনা তাঁর ছিল বৈকি। শামসুল হক তাঁকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের দিকে আকৃষ্ট করতে চাইলে তিনি জানান, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত হলে মানুষের রাজনীতি স্বচ্ছ হতে বাধ্য। নিজের উপার্জিত অর্থের অনেকটাই তিনি দিয়ে গেছেন গ্রামে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারের জন্য। তিনি নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি, পাঠাগারই তাঁর স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি। তিনি চান, ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে মানুষ পাঠাগারে গড়ে উঠুক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে।

হাসনাত আবদুল হাই তাঁর উপন্যাসে আরজ আলী মাতুব্বরের আজন্ম সংগ্রাম, তাঁর গভীর আত্মবিশ্বাস, সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, অসাধারণ সাহস ও সাহস প্রকাশের জন্য দৃঢ় মনোবলকে যেভাবে তুলে ধরেছেন, তাতে আমরা পরিচিত হই দেশের একজন অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। তাঁর প্রকাশে প্রতিবেদনের ভঙ্গিটি টের পাওয়া যায়, কিন্তু এই ভঙ্গিটি তিনি ব্যবহার করেন গল্প বলার জন্য, গল্পকে এটি অতিক্রম করে না। তবে গল্পের দাবিকে আরেকটু মানলে ভালো হতো। আরজ আলীর পারিবারিক জীবন প্রায় অনুপস্থিত, এখানে তিনি কতটা স্বচ্ছন্দ এবং তাঁর বিশ্বাস কিংবা সংশয় পরিবারে কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল, গল্পে তার অন্তর্ভুক্তি নায়ককে চিনতে আমাদের সাহায্য করত।

যে সংশয় ও জিজ্ঞাসা আরজ আলীকে গড়ে তুলেছে, তাঁকে আত্মবিশ্বাস দান করেছে, তাঁর মনোবলকে করেছে দৃঢ় ও অবিচল, সেই সংশয় ও জিজ্ঞাসার উদ্ভব ও বিকাশ এই উপন্যাসে অনুপস্থিত। আরজ আলীর সমস্ত মহিমার মূলে তাঁর জিজ্ঞাসা, তাঁর জিজ্ঞাসা একজন দার্শনিকের, এটিকে ধারালো করতে করতেই তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন বিজ্ঞানভিত্তিক মুক্তিকে অবলম্বন করে। আরজ আলীর অন্তর্লোকের যন্ত্রণা, দ্বন্দ্ব ও বিকাশ আমাদের আড়ালেই রয়ে যায়।

অথচ এতে তো কোনো সন্দেহই নেই যে আরজ আলীর সংশয়ই তাঁর এই উপন্যাস রচনার প্রধান প্রেরণা। ধর্মান্ধতার শিকল ভাঙার যে আয়োজন আরজ আলী করেছিলেন, তারও পরিচয় এখানে পাই।

এই উপন্যাস যখন প্রকাশিত হচ্ছে, এই উপমহাদেশে তখন ধর্মান্ধতা পুনরুজ্জীবনের পাঁয়তারা চলছে। রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারের জন্যে যারা ফণা তুলেছিল, তাদের আঘাত করা আংশিকভাবে হলেও সম্ভবপর হয়েছে, তাদের ফোঁসফোঁস আপাতত স্তিমিত। কিন্তু সমাজজীবনে ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিস্তার মহামারির আকার ধারণ করলে তা কি আরও ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিত দেয় না ? যে পুরাণের অস্বাভাবিকতা ও অবাস্তবতার কথা আরজ আলী স্পষ্টভাবে দেখিয়ে গেছেন, সেই পুরাণের কাল্পনিক চরিত্রের জন্মস্থান সংরক্ষণের জন্য হত্যা করা হয় বাস্তব জগতের জীবন্ত মানুষকে। ধর্মের বিধান ও ফতোয়া জারি করে মানুষকে পঙ্গু করে রাখার চক্রান্ত ক্রমে বেড়েই চলেছে। হাসনাত আবদুল হাই মহিমান্বিত করেছেন স্বশিক্ষিত ও আত্মসম্মান  বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্বকে। কখন? প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার অধিকারী ও প্রচুর ডিগ্রির দখলদার ব্যক্তিরা মানুষের বিজ্ঞানমনস্কতা নষ্ট করার মতলবে ভাঁওতা দিয়ে চলেছেন যে বিজ্ঞান প্রকৃতপক্ষে ধর্মশাস্ত্রের অন্তর্গত শাখা মাত্র। আত্মমর্যাদাবোধশূন্য এই উচ্চশিক্ষিত গোষ্ঠী ইতর প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে বিজ্ঞানবিমুখ ধর্মান্ধ চেহারা দেওয়ার কর্মে লিপ্ত। উপমহাদেশের দেশগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের চাহিদা বাড়ছে একদিকে, পাশাপাশি চলছে মানুষকে বিজ্ঞানবিমুখ রাখার ষড়যন্ত্র। বিজ্ঞান ও যুক্তিকে আড়াল করে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারে সৃষ্টি হচ্ছে একটি মারাত্মক সাংস্কৃতিক শূন্যতার। এই দুঃসময়ে হাসনাত আবদুল হাই এমন একজন ব্যক্তিত্বকে মহিমা দেন, যিনি প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে পারেন, যিনি ধর্মের সঙ্গে জড়িত পুরাণ সন্দেহ করেন, মানুষের অসীম সম্ভাবনাকে তিনি শনাক্ত করেন বিজ্ঞানের সাহায্যে, মুক্তচিন্তাচর্চায় যিনি অকুতোভয় এবং মৃত্যু পর্যন্ত যিনি চলেছেন মুক্তিকে অবলম্বন করে।

হাসনাত আবদুল হাইকে সকৃতজ্ঞ অভিনন্দন জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares