আলোচনা : উপন্যাস―হাসনাত আবদুল হাই : সুলতান : এক মরমি চিত্রকরের আখ্যান : আবুল আহসান চৌধুরী

সেখ মোহাম্মদ সুলতানএই নামে তাঁকে চিনতে অসুবিধে হবে। তবে এস. এম. সুলতান বললে তাঁর পরিচয় স্পষ্ট হয়। শহুরে কাছের মানুষ তাঁকে আরও সংক্ষিপ্ত করে নিয়েছেনসুলতান। গাঁও-গেরামের মানুষ তাঁকে জানেন লাল মিয়া বলেডাকেনও এই নামে। এই লাল বা লাল মিয়া নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাটির সোঁদা গন্ধ, পক্ষির কুজন, নদীর জলধারার মৃদু শব্দ, ফসল-কুড়ানি মাঠের নারী, শক্ত-পেশির কর্মিষ্ঠ পুরুষ।

সুলতান এক আশ্চর্য মানুষখেয়ালি-উড়নচণ্ডী, তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে জীবনকে সন্ধান করে ফেরেন। এক ভিন্ন ধরনের দর্শন অন্তরে লালন করেনকখনও সে-দর্শন সহজিয়া সাধনার বিবরে প্রবেশ করেছেঁকে আনে মরমিয়াবাদের সাধন-বিশ^াসের নির্যাস। এক অদ্ভুত মিলনতত্ত্ব আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠা করতে চান মানুষ ও পশু-পাখির মধ্যে।

সুলতান শিল্পসাধনায় নিবেদিতবাঁশি বাজান, নৃত্য করেন, ছবি আঁকেন। ভারী-ভাষায় যাকে বলে প্রথা-বিরোধী, তিনি তাই। অন্য শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর মনে-মতে মিল হয় না। না-মানেন তিনি চিত্রচর্চার ব্যাকরণ, না-নিজেকে বাঁধতে দেন সমাজ-শাসনের নিগড়ে। কোনো দায় নেই কারও কাছে। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে অশান্ত, ক্ষুব্ধ, হতাশস্বপ্ন দেখেন এই বঙ্গীয় জনপদের উত্থানের, যাকে জড়িয়ে আছে আদিম সমাজের স্মৃতি, স্বর্ণ-শস্যের প্রত্যাশা, সক্ষম-সুঠাম-পেশিবহুল নর, গুরু নিতম্ব-উন্নত পয়োধরের নারীসৃষ্টিতে-উৎপাদনে তাদের সক্ষমতা অসীম। এ হলো খোয়াব ও আফসানার যুগলবন্দিশিল্পীর প্রত্যাশার প্রতীক।

দুই.

খুব কাছ-থেকে বার-কয়েক দেখার সুযোগ হয়েছিল সুলতানকেঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপে মুগ্ধ করেছিলেনঅপরিচয়ের বাধা সরিয়ে আপন করে নিতে বিলম্ব হয়নি তাঁর। দু’বারের কথা খুব মনে পড়েএকবার ১৯৮৫, আবার তার তিন-বছর পর ১৯৮৮ সালে। বলা যায়, প্রায় অসাধ্য-সাধনই করেছিলাম তাঁকে দিয়ে চার-চারটি প্রচ্ছদ আঁকিয়ে। ১৯৮৫-তে কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরির পঁচাত্তর বছরপূর্তিতে প্লাটিনাম জুবিলি উৎসবের আয়োজন হয়তিনদিনের এই অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সে-সময়ের উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল হক, দ্বিতীয় দিনের প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও শেষদিনে ছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। এই উপলক্ষ্যে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের উদ্্যোগ নেওয়া হয়পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে এর সম্পাদনার দায় বর্তায় আমার ওপর। খুব কাক-ভোরে একদিন রওনা হই নড়াইলের উদ্দেশে। সকাল-সকালই পৌঁছতে পারলাম সুলতানের আবাসে, শহরের উপকণ্ঠে কুড়িগ্রামে। দেখি সুলতান বসে আছেনকোলে দুই সফেদ মার্জার, পায়ের কাছে অলস-শয়ানে এক কৃষ্ণ সারমেয়অন্যেরাও আশপাশেই অবস্থান নিয়েছেএকটা মজলিশের আবহ যেনো। সুলতান উঠে দাঁড়িয়ে এমন ভঙ্গি ও ভাবে অচিন-অতিথিকে অভ্যর্থনা জানালেন যেনো বহুকালের পরিচিতজন দীর্ঘ-ব্যবধানে তাঁর গৃহে এসেছে। তাঁর খুব প্রিয় ও পরিচিত যশোর মাইকেল মধুসূদর কলেজের বাংলার অধ্যাপক কবি আজীজুল হক, যিনি আমারও শ্রদ্ধেয় প্রিয়জন, বলেছিলেন তাঁর কথা সুলতানকে বলতে। এমনিতেই খাতির পেলাম, অধ্যাপক হকের কথা বলায় উনি আরও উচ্ছ্বসিত হলেন। বেশ জমিয়ে আলাপ-পরিচয় হলোচা-বিস্কুট এল। দিনে-দিনে ফিরতে হবে, তাই সংকোচ-দ্বিধা ঝেড়ে সরাসরি বললাম, বই আর স্মরণিকার প্রচ্ছদ এঁকে দিতে হবেলাইব্রেরির পঁচাত্তর-পূর্তিতে বেরুবে। একটুখানি চুপ থেকে কী ভেবে তারপর শিশুর সারল্যমাখা গলায় বললেন : ‘আমি তো প্রচ্ছদ আঁকিনে, কখনও আঁকিনিএসবের আলাদা ধরন-ধারণ আছেআমি কি পারব!’ বললাম : ‘আপনার তুলির পরশটুকু শুধু চাই।’ কথা না-বাড়িয়ে কাজ শুরু করলেনমিনিট পঁচিশ-তিরিশের মধ্যে বইয়ের প্রচ্ছদ নামিয়ে দিলেন স্মরণিকাটার জন্য আরও কম সময় নিলেন। সারা মুখে লজ্জামাখা হাসি, বললেন : ‘আপনাদের পছন্দ হবে তো ?’ একটু হেসে ভক্তিভাব গলায় এনে বলে উঠলাম‘জয় গুরু, জয় গুরু!’ সুলতান হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কিন্তু তখনও তো এই পর্ব শেষ হয়নি, বললাম : ‘একটা শুভকামনা লিখে দেবেন’। এবারে সত্যিসত্যিই আঁতকে উঠলেন সুলতান, বললেন : ‘বলেন কি! লেখার অভ্যাস তো আমার নেই! কি করে লিখব ?’ যা-হোক, বলে-ক’য়ে তৈরি করা হলো তাঁকেমাঝেমধ্যে কথা বা শব্দ জোগানো এবং সেইসঙ্গে খেই ধরিয়ে দিতে হলো। তারপর দিব্যি একটা লেখা বেরিয়ে এলোনিচে নামসই করলেন ‘সেখ মোহাম্মদ সুলতান’, তারিখ ১৪ ডিসেম্বর ১৯৮৫। সেই লেখার একটু নমুনা এখানে তুলে ধরি : ‘… নড়াইল থেকে নিউইয়র্ক এই পথপরিক্রমায় কত ছবি কত স্মৃতি মনে গেঁথে আছে। ফুলের মতো স্মৃতির সুবাস মাতাল করে আমাকে। নিভৃত পল্লির এই অজ্ঞাতবাস আমাকে দিয়েছে সৃষ্টির আনন্দ-উপলব্ধির বিশ^াস।’ পরের অর্থাৎ শেষ অনুচ্ছেদে জানালেন : ‘ছবি আঁকি, তবে কখনও প্রচ্ছদ আঁকিনি কোনো বইয়ের। কিন্তু যখন কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরির প্লাটিনাম জুবিলি উপলক্ষে প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকবার জন্য অনুরোধ আসল, তখন এই ঐতিহ্যবাহী প্রায় শতাব্দীর স্পর্শ মাখা প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে নিজের নাম জড়িয়ে রাখার মানসে সেই প্রচ্ছদ আঁকলাম।’

কাজ শেষ হলে বেশ অনেকক্ষণ ধরে গল্প-গাছা চলল। নানা কথা জানতে চাইলাম। উনিও ধীর গলায় নিজের কথা বললেন। ‘আবার আসব’ বলে সুলতানের গাঢ় আলিঙ্গনের পরশের স্মৃতি ও অনেক প্রাপ্তির আনন্দ নিয়ে ফিরে এলাম।

বছর-তিনেক পরে আবার যাই চিত্রা নদীর পারে সুলতানের সন্ধানেতাঁর তুলনাহীন উষ্ণ ভালোবাসায় সিক্ত হতেতাঁর প্রিয়-সান্নিধ্যের সৌরভে আমোদিত হতে। তারিখটা লেখা আছে১৯ জুলাই ১৯৮৮। এবারেও একটি আরজি ছিল‘হারামণি’র সংগ্রাহক- সংকলক অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন স্মারকগ্রন্থের প্রচ্ছদ-রচনার। মনসুরউদ্দীন ও সুলতানের স্বভাবে খানিক মিল ছিলবাউলের মতো অবিন্যস্ত দীর্ঘকেশের ক্ষেত্রে বিশেষ করে। সে-প্রচ্ছদও দেখতে-না-দেখতেই আঁকা হয়ে গেল। এ-যেন শ্মশ্রƒবিহীন সুলতানের আংশিক আত্মপ্রতিকৃতি! সবাই কিছুটা অবাকই হয়েছিলেনকী করে সুলতানের কাছ থেকে এই কাজ বের করা সম্ভব হলো! মাত্র দু’চারবারই তো দেখা, কিন্তু খুব আপন করে নিয়েছিলেন, কোনো অনুরোধই উপেক্ষা করেননি। আর-একবার এঁকে দিয়েছিলেন একতারা-হাতে গীতমুখর-নৃত্যরত লালনকে, যা নন্দলাল বসুর আঁকা ‘রবীন্দ্রবাউলে’র রেখাচিত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এইভাবে সুলতান সম্পর্কে স্বল্প-দেখার সামান্য-স্মৃতি মনের কোণে জেগে আছে।

তিন.

এ দেশের  কথাশিল্পের ভুবনে হাসনাত আবদুল হাই (জ. ১৯৩৯) ভিন্ন-স্বাতন্ত্র্যে চিহ্নিত। তাঁর গল্প-উপন্যাসে বিষয়-ভাষা-মনোজগৎ ও নিরীক্ষায় একটা আলাদা ভঙ্গির পরিচয় মেলে। গল্প-ভ্রমণকথা-প্রবন্ধ লিখেছেন তিনিতবে উপন্যাসেই তাঁর প্রকৃত সিদ্ধি।

উপন্যাসেই, আমাদের দেশে, হাসনাত প্রবর্তন করেন এক ভিন্ন ধারার। দেশের কীর্তিমান চিত্রশিল্পী-ভাস্কর- লোকদার্শনিক-সব্যসাচী লেখক : কামরুল হাসান (লড়াকু পটুয়া), নভেরা আহমদ (নভেরা), আরজ আলী মাতুব্বর (একজন আরজ আলী), সৈয়দ শামসুল হক (হেমিংওয়ের সঙ্গে) উপন্যাসের আধারে স্থাপিত হয়েছেন এবং সেইসঙ্গে এস. এম. সুলতানও (সুলতান)। এইসব বরেণ্য মানুষের জীবন-বৈচিত্র্য ভিন্ন আঙ্গিক, ভিন্ন দর্শন, ভিন্ন গদ্যভাষায় পাঠকের কাছে পৌঁছেছে।

চার.

বাস্তব মানুষের জীবনকে উপন্যাসে রূপায়িত করা কঠিন, দুরূহও বটে। কোনো মানুষের জীবন ঘটনাবহুল নাটকীয় বিন্যাসে রচিত না-হলে সেই মানুষ উপন্যাসের উপকরণ হতে পারেন না। চড়াই-উতরাই, বৈচিত্র্য, প্রেম- বিচ্ছেদ-বিরহ, আত্মদ্বন্দ্ব, ট্র্যাজিক-চেতনা না থাকলে সাদামাটা নিস্তরঙ্গ জীবন উপন্যাস-রচনার উপযোগী বা অনুকূল হতে পারে না, তা-তিনি যত বিখ্যাত বা বড়োমানুষই হোন-না কেন! বনফুল দুটি নাটক লিখেছিলেন বিদ্যাসাগর ও মধুসূদন এবং নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রামমোহনকে নিয়ে। কিন্তু নাটক হিসেবে শ্রীমধুসূদন যতখানি উতরেছে ‘রামমোহন’- ‘বিদ্যাসাগর’ সম্পর্কে সেকথা বলা চলে না। সেই নিরিখে নজরুলের জীবন নাটক-উপন্যাস রচনার মূল্যবান উপকরণ হতে পারে। যুগন্ধর সংগীতশিল্পী কে. মল্লিককে নিয়ে ষাটের দশকের প্রথমদিকেই কবি-কথাশিল্পী গোলাম কুদ্দুস একটি অনবদ্য উপন্যাস রচনা করেন সুরের আগুন নামে। হাসনাত আবদুল হাই যে-পাঁচজনকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন, তারমধ্যে এস. এম. সুলতানের জীবনই সবচেয়ে ঘটনাবহুল ও বৈচিত্র্যময় এবং এ-ধরনের রচনার জন্যে উপযোগী।

পাঁচ.

হাসনাতের সুলতান উপন্যাসের ফ্ল্যাপে এই শিল্পী সম্পর্কে যে-সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্য-চয়ন করা হয়েছে, তা-পাঠককে তাঁর প্রতি অনিবার্যভাবে মনোযোগী ও সন্ধিৎসু করে তোলে : ‘এদেশে শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সুলতান এক কিংবদন্তি পুরুষ। উপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর তাঁর জীবন। ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব, বিচিত্র জীবনযাপন এবং শিল্প-শৈলীর নির্ভুল স্বাতন্ত্র্যের জন্য তাঁকে নিয়ে অপার কৌতূহল, বিস্ময় এবং শ্রদ্ধাবোধ অসংখ্য জনের। সেই সুলতানকে নিয়ে এই উপন্যাস।… এর কাহিনি শিল্পী সুলতানকে নিয়ে আবর্তিত হলেও এতে ছয় দশকের ব্যাপ্তিতে চলমান ঘটনার বর্ণনা যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যক্তি ও সমাজজীবনের আশা-আকাক্সক্ষা এবং ইতিহাসের পতন ও অভ্যুদয়ের বন্ধুর গতিপথ অত্যন্ত বিশ^স্ততার সঙ্গে বিধৃত হয়েছে।’ এই ধরনের বই লেখক কেন এবং কোন প্রেরণায় লিখতে উদ্বুদ্ধ হন লেখকের সেই ব্যাখ্যা থাকে ভূমিকা বা প্রবেশক হিসেবে, যা-পাঠকের জন্যে গ্রন্থপাঠের একটি প্রয়োজনীয় সংকেত। এখানে তা নেই, ফলে ফ্ল্যাপের লেখা অনেকখানি সেই প্রবেশকের অভাব পূরণ করেছে। কোনো কোনো লেখক আবার কখনও সন্ধিৎসু পাঠকের জন্যে প্রয়োজনীয় গ্রন্থপঞ্জির উল্লেখও করে থাকেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনী-উপন্যাসে, যেমন লালনকে নিয়ে লেখা মনের মানুষ-এ, ভূমিকা ও সেইসঙ্গে গ্রন্থতালিকাও সংযোজিত হয়েছে। ‘… কোনো শিল্পীর জীবদ্দশায় তাঁকে নিয়ে সম্পূর্ণ উপন্যাস লেখার প্রচেষ্টা সম্ভবত বাংলাদেশে এই প্রথম’ফ্ল্যাপের এই শেষ-পঙ্্ক্তি সম্পর্কে কোনো দ্বিমত বা প্রশ্ন নেই। তবে পশ্চিমবঙ্গের কথা যদি বলতে হয় তাহলে বলা যায়, শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ বেঁচে থাকতেই, নাকি তাঁর মৃত্যুর পর, সমরেশ বসু দেশ পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে লিখতে শুরু করেনদেখি নাই ফিরে! শেষের কাছাকাছি এসে আকস্মিক মৃত্যু ঘটে সমরেশ বসুর, অসম্পূর্ণ থেকে যায় উপন্যাসটি। পরে সেই অসমাপ্ত দেখি নাই ফিরে প্রকাশ করে আনন্দ পাবলিশার্স, বিকাশ ভট্টাচার্যের অসামান্য অলংকরণসহ। কোনো ভাস্কর-চিত্রশিল্পীকে নিয়ে দেখি নাই ফিরেই কি প্রথম বাংলা উপন্যাস ?

ছয়.

সুলতানকে নিয়ে উপন্যাস-লেখা হাসনাতের জন্যে খুব সহজ কাজ ছিল না। খুব বড় এক ক্যানভাসে তিনি ধরতে চেয়েছেন সুলতানের প্রায়-মহাকাব্যিক জীবনকে। দীর্ঘ-সময়ের প্রস্তুতি নিয়ে তাঁকে এ-কাজে হাত দিতে হয়েছে। এ-বিষয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় সহায় ছিলেন সুলতান নিজেই। দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুলতানের সঙ্গে হাসনাতকে কাটাতে হয়েছে তাঁর জীবনের কথা শোনার জন্যে। কতবার যে নড়াইল যেতে হয়েছে তার লেখাজোখা নেইঢাকাতেও তাঁর সান্নিধ্যলাভের সুযোগ নিয়েছেন। তাঁর শিল্পকে, শিল্পীমনকে বোঝার জন্যে বারবার তাঁর ছবি দেখেছেনআপ্রাণ-চেষ্টা করেছেন তার মর্ম-আবিষ্কারের। সুলতানের কাছে পৌঁছানোর জন্যে সেতু হয়েছেন শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, আফজাল করিম, পিটার জেভিস, আহমদ ছফা, আবুল খায়ের লিটু এবং আরও কেউ কেউ। এক সময় সুলতানের মনের দরোজায় পৌঁছে যান হাসনাতগড়ে ওঠে সখ্যআর তখনই সুলতান তাঁর কাছে খুলে দেন স্মৃতির ঝরনাধারা। লালন যেমন বলেছেন : ‘খুলবে কেন সে ধন ও তার গাহেক বিনে’এ-ঠিক তেমনই। হাসনাত খুব মনোযোগ ও যত্নে সুলতানের বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে নির্মাণ করেছেন এক মনোরম আখ্যান। সে-জীবন বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও অভ্যাসে পূর্ণ, রহস্যময়তায় আচ্ছন্ন, সৃষ্টির বেদনায় প্রস্ফুটিত। এ-কাহিনি একমুখী নয়, নয় নিস্তরঙ্গআছে ভাঙাগড়াআছে অর্জনের তৃপ্তি আবার এর বিপরীতে নৈরাশ্যের হাহাকার। সুলতানের জীবন যেন সুফিকবিদের মরমি-দর্শনভাষ্যের প্রতিরূপ : ‘জীবন এক ছেঁড়া পুথি, যার আদি গেছে হারিয়ে, অন্ত রয়েছে অলিখিত’। সুলতানের জীবনের নানাবর্ণের টুকরো টুকরো কাহিনির একীভূত রূপ যেন এই আখ্যান।

সাত.

সুলতান জন্মেছিলেন নড়াইলের একটেরে চিত্রা নদীর তীরে মাসিমদিয়া গ্রামেএক নিম্নবিত্ত পরিবারে। শৈশবেই অকালে মাকে হারিয়েছিলেনতাই ছিলেন স্নেহের কাঙাল। বাবা ছিলেন নামি রাজমিস্ত্রিঅট্টালিকার নকশা ও অলংকরণের কাজে তাঁর জুড়ি-মেলা ভার ছিল। স্থানীয় জমিদারবাড়িতে তাঁর কাজের নিদর্শন, মানুষের নজর কাড়ত। সুলতানের ছবি-আঁকার প্রথম প্রেরণা নড়াইল-জমিদারবাড়ি‘সিংহদরজার নানা কারুকাজ, পশুপাখির মূর্তি, উঁচু নহবতখানায় সুন্দর ভাস্কর্য, বড় বড় স্তম্ভের ওপর সিংহের মাথা, লতাপাতার অলংকরণ, এসবই তার বাবা আর সহযোগী অন্যান্য রাজমিস্ত্রির হাতের কাজ। তন্ময় হয়ে সেই সব কাজ দেখেছে লাল। মনের ভেতর নানা নকশার ছবি হঠাৎ উঁকি দিয়ে সরে যায়। ‘যেন অধরা কিছু, কিন্তু অদৃশ্যে থেকেও আকর্ষণ করে এমন কোনো শক্তি।’ সেই থেকে বালকের মনে ছবি আর নকশা স্থায়ীভাবে মুদ্রিত হয়ে যায়। ওই জমিদারবাড়িরই আঁকার স্কুল-ছুট এক তরুণের কাছে লালের ছবি-আঁকার হাতেখড়ি। অল্পদিনের শিক্ষাতেই তাঁর হাত এমন খুলেছিল যে নড়াইল সফররত কলকাতার এক বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতার প্রতিকৃতি এঁকে লাল মিয়া বিশেষ প্রশংসা কুড়ান। স্কুলের নিচু ক্লাসের ছাত্র থাকাকালেই আঁকিয়ে হিসেবে লালের নজর-কাড়াএভাবেই তার স্বীকৃতি ও সাফল্যের সূচনা।

আট.

বিচিত্র ঘটনায় পূর্ণ সুলতানের জীবন একতালে চলেনিতাঁর ভবঘুরে জীবন বরাবরই থেকেছে চলমান, কোথাও নোঙর ফেলেনিযতটুকু ‘থিতু’ হয়েছেন তা-তাঁর চির-প্রিয়ভূমি নড়াইলেই। তাঁর ভ্রাম্যমাণ জীবনের অনেকগুলো পর্ব রয়েছে, তার-উল্লেখে স্পষ্ট হয় তাঁর জীবনপঞ্জি : ক. নড়াইলপর্বআদি (মাসিমদিয়া), মধ্য (চাচুরি পুরুলিয়া-কুড়িগ্রাম) ও অন্তিমপর্ব (কুড়িগ্রাম), খ. কলকাতাপর্ব, গ. আগ্রা- দিল্লি-আজমির-লক্ষেèৗ-জলন্ধর-লাহোর-কাশ্মীরপর্ব, ঘ. পশ্চিম পাকিস্তানপর্ব (লাহোর-করাচি), ঙ. আমেরিকা- লন্ডনপর্ব, চ. ঢাকা ও সোনারগাঁপর্ব, ছ. যশোরপর্ব, জ. পুনশ্চ নড়াইলপর্ব।

জন্মগ্রাম মাসিমদিয়াতে প্রায় পনেরো বছর বয়স পর্যন্ত সুলতানের কাটেতখন তিনি স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে সদ্য উঠেছেন। এরপর দেশান্তরি হন, প্রায় একযুগ বিচ্ছিন্ন ছিলেন নড়াইল থেকে। দেশ-বিদেশের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসেন নড়াইলেচোখে অনেক স্বপ্নস্কুল করার, শিশুদের চিত্রশিক্ষার প্রতিষ্ঠান বানানোর। এ-বিষয়ে কাতর-আরজি জানান তাঁর এক মাতুলকেযাঁর নিবাস চিত্রা নদীর অপর পারে চাচুরি পুরুলিয়া গ্রামে। তাঁরই আনুকূল্যে সন্ধান পান বনজঙ্গলে-ঘেরা গ্রামের এক ভগ্ন-জীর্ণ জমিদারি অট্টালিকারনাম তার ‘কৈলাসটিলা’। উৎসাহী কিশোর-তরুণদের আগ্রহ-শ্রমে পরিষ্কার হয় জঙ্গলাকীর্ণ প্রাঙ্গণভেসে ওঠে পরিত্যক্ত জমিদার-গৃহ। এই গ্রামে এসে প্রথমে মামার বাড়িতে ওঠেন, পরে অন্যদের আগ্রহে ও নিজের একঘেঁয়েমি কাটাতে ‘পালা করে’ গ্রামের হিন্দু-মুসলমানের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। এরপর উপন্যাসের ভাষ্য : ‘কৈলাসটিলা পরিষ্কার করে পোড়োবাড়িটাতেই ছিলেন কিছুদিন। একেবারে অন্যধরনের মানুষ। খাওয়াদাওয়া নিয়ে চিন্তা নেই। কোনোরকম মাথা গুঁজবার জায়গা পেলেই হলো। আর ভয়ভীতি তো ছিলই না। না হলে কেউ পারে একা ঐ পোড়োবাড়িতে রাত্রি কাটাতে ? শোনার পর গ্রামের লোকের সেকি উত্তেজনা! বেশ কিছু গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁকে নিয়ে। যেমন, পশুদের সঙ্গে কথা বলেন। পশুপাখিদের ভাষা বোঝেন। এই সব।’

সাপখোপ-বন্যজন্তুর আশঙ্কা সত্ত্বেও নির্জন-নিভৃত কৈলাসটিলা সুলতানকে কেমন যেন টানেরাত্রিযাপনের সাহসী সিদ্ধান্ত নেন আরও এক কারণে, রহস্যময়-ভৌতিক ভীতি সম্পর্কে গ্রামের মানুষের মনের আঁধার ও কুসংস্কার দূর-করা। আখ্যান-লেখক বর্ণনা দিয়েছেন : ‘রাতের বেলা সুলতান উঠোনে বসে আছেন একা। মাঝে মাঝে গিরগিটি আর তক্ষক ডেকে উঠছে তীক্ষè স্বরে। ঝোপঝাড়ে সরসর শব্দে নড়ছে বুনো জন্তু আর সরীসৃপ। আকাশ তার হাজার তারার চুমকি নিয়ে তাকিয়ে আছে নর্তকীর মতো নিচের দিকে। নিকষ কালো শরীর নিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকার।’ নৈশ-নৈঃশব্দ্যের এই পরিবেশ-বর্ণনা যে-চিত্রকল্প রচনা করে, তা লেখকের ভাষা-নৈপুণ্যের পরিচয় দেয়।

চাচুরি পুরুলিয়া গ্রামে সুলতানের উদ্যোগে ও শ্রমে স্কুল গড়ে উঠেছিল বটে, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন স্কুলের নাম হবে ‘নন্দকানন স্কুল অব ফাইন আর্টস’, এখানে ‘ছোট ছেলেমেয়েরা পড়বে’ আর ‘পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ছবি আঁকা শিখবে’। কিন্তু সুলতানের প্রস্তাবমতো স্কুলের নামকরণ যেমন খারিজ হয়ে যায়, পাশাপাশি শিশুদের চিত্রাঙ্কন-শিক্ষার বিষয়টিও আমলে নেওয়া হয় না। ‘নন্দনকানন’ নাম দিলে সরকারি অনুমোদন পেতে সমস্যা হবে, এই ছিল কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির মতামততাই গ্রামের নামেই স্কুলের নাম দেওয়া হয়। প্রায় বছর দুই পর ১৯৫৫ সালে, আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে সুলতান চাচুরি পুরুলিয়া গ্রাম থেকে নড়াইলে ফিরে আসেন, আশ্রয় নেন নমশূদ্রদের গ্রাম বাকরিতে। এরপর নড়াইল-ঢাকা যাওয়া-আসা শুরু হয় তাঁর। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত সময় ছিল তাঁর ‘ঠিকানাবিহীন জীবনযাপনে’র কাল।

১৯৬৮ মনে হয় সুলতানের জন্যে এক শুভ-কালএ-বছর তাঁর জন্যে বয়ে নিয়ে আসে দীর্ঘ-লালিত স্বপ্ন-পূরণের এক আনন্দ-বার্তা। যশোরের শিল্পানুরাগী জেলা প্রশাসকের কল্যাণে প্রতিষ্ঠা পায় ‘নড়াইল স্কুল অব ফাইন আর্টস’স্কুল বসে চিত্রা নদীর পাশেই জমিদারদের ভগ্ন-জীর্ণ দোতলা বাড়িতে। শিশুদের কলকাকলিতে মুখর হয় কালের সাক্ষী নিস্তব্ধ জমিদারবাড়িআর সুলতান মগ্ন হন শিশুদের সঙ্গে রং-তুলির খেলায়। নিঃশব্দে কখন যে সময় হারিয়ে যায়মেঘে মেঘে কত যে বেলা হয়, তা-কেউ বুঝতে পারে না, সুলতানও পারেননি। তাই লেখক-হাসনাতের সঙ্গে আলাপচারিতায় উদাস হয়ে ‘স্বগতোক্তি’র মতো বলেন : ‘… এইভাবে চেষ্টা করেছি। কিছু একটা দিয়ে যেতে হবে দেশের মানুষদের। তারপর দীর্ঘশ^াস ফেলে বলেন, জীবনটা বড় ছোট। আরও সময় পেলে ভালো হতো। বলে তিনি আকাশের দিকে তাকান। পাখিরা দল বেঁধে ফিরে যাচ্ছে। সন্ধ্যার দেরি নেই।’ সুলতানের জীবন, এক বিশেষ-অর্থে, অসমাপ্ত ও অসফলতাঁর সাধ আর সাধ্যের মিল হয়নি কখনও। সুলতানের মনের ভেতর কখনও কি গুঞ্জরিত হয়ে উঠেছে বাহাদুর শাহ জাফরের এই শের-শায়েরিটি : ‘উমরে দারাজ মাঙ্্কে লায়ে থে চার দিন, / দো আরজু মে কট্্ গ্যয়ে, দো ইন্তেজার মে’।

নয়.

১৯৩৬-৩৭ সালের কথা। লাল মিয়া প্রথম কলকাতা যাওয়ার সুযোগ পান তাঁর বাবার চিকিৎসার সূত্রে। এমন সাজানো-গোছানো মন-মজানো বড় শহর তো আগে আর দেখার সুযোগ হয়নি। মুগ্ধ না-হয়ে আর উপায় কী! লালের কলকাতার সঙ্গী জমিদারের গোমস্তা-পুত্রও তাঁকে এই মহানগরীর মাহাত্ম্য সম্পর্কে ধারণা দেয়। নড়াইলে ফিরে এসেও কলকাতার ক্ষণকালের সেই মধুর স্মৃতি তাঁকে বুঁদ করে রাখে। কলকাতা তাঁকে হামেশাই হাতছানি দিতে থাকে।

১৯৩৮ সালের গোড়ার কথালাল মিয়া সপ্তম শ্রেণি পাশ করে সবে অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। কলকাতা গিয়ে লেখাপড়া করতে চায় এ কথা জানায় বাবাকে। লেখাপড়া মানে চিত্রবিদ্যা শেখার আগ্রহ তাঁর, কলকাতার আর্ট স্কুলে, যেখানে নড়াইলের জমিদারের এক ছেলে ছবি-আঁকা শেখার চেষ্টা করেছিল কিছুকাল। বাবার মৌন-সম্মতি ও কলকাতার আবাসিক নড়াইলের জমিদার-পরিবারের আন্তরিক আনুকূল্যে লাল মিয়ার কলকাতা-যাওয়া সম্ভব হয়। আহার-বাসস্থানের ব্যবস্থা ওই জমিদার-পরিবারের কাশীপুরের বাড়িতেই। লাল মিয়া আর্ট স্কুলে ভর্তির বাসনা পেশ করে। কিন্তু সেখানে ভর্তি হতে গেলে এন্ট্রান্স পাসের প্রয়োজন। এই জায়গায় ঠেকে যায় লাল মিয়া। নড়াইলের আট শরিকের এক শরিক ব্যারিস্টার ডি. এন. রায় আরও খোঁজ নিয়ে জানান, অধ্যক্ষ মুকুল দে আইনকানুনের বেলায় খুবই কড়া। হাসান শাহেদ সোহরাওয়ার্দি ছিলেন প্রখ্যাত শিল্প-সমালোচক ও আর্ট স্কুলের পরিচালনা-পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্য। ভর্তি-পরীক্ষায় প্রথম-হওয়া লাল মিয়া শেষপর্যন্ত শাহেদ সোহরাওয়ার্দির জোর-সুপারিশে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পায়। প্রতিভার গুণে লাল মিয়া শাহেদ সোহরাওয়ার্দি ও তাঁর অনুজ বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির বিশেষ স্নেহ লাভ করে। আর্ট স্কুল কাছে হবে বলে শাহেদ লাল মিয়াকে অনুজ শহীদের বাড়িতে উঠতে বলেন কিছু পরে নিজের বাড়িতেই আশ্রয় দেন তাঁকে। লাল মিয়ার নতুন নামকরণ করেন তিনি সেখ মোহাম্মদ সুলতান, আর্ট স্কুলে ভর্তির জন্যে। শাহেদের সান্নিধ্য সুলতানের শিল্পীজীবনের এক প্রেরণাময় অধ্যায়Ñ এতে তার শিল্পবোধ পোক্ত হয়।

আর্ট স্কুলের দিনগুলো সুলতানের অত্যন্ত স্মরণীয় সময়। মঞ্চের নাটকে নারী-ভূমিকায় অভিনয় করে নাম করেনএর পরিচালনা করেন তাঁর ওপরের ক্লাসের ছাত্র ও উত্তরকালের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র-পরিচালক রাজেন তরফদার। তাঁর সহপাঠিনী ছিলেন অধ্যক্ষ মুকল দে-র স্ত্রী বীণাপাণি। আউটডোর ড্রইং, ক্লাস-পরীক্ষা বা বার্ষিক পরীক্ষায় সুলতানের ফলাফল বরাবর খুবই ভালো ছিল। এতে প্রায়-সকলেরই নজরে পড়েন তিনিবিশেষ করে অধ্যক্ষ মুকুল দে-র। সে-কারণ আউটডোর ড্রইং-এর জন্যে মুকুল দে তাঁর স্ত্রী বীণাপাণিকে সুলতানের হাওলা করে দেন। এইভাবে আর্র্ট স্কুলের দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল সুলতানেরএকটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত প্রায়-স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়।

প্রায় ছ’বছর কলকাতা ছিলেন সুলতান। প্রথম তিন বছর কাটে গৃহী-ভবঘুরের ভূমিকায় আর জমিদার-পুত্রের কাছে ছবি-আঁকা শিখে। পরে বিশেষ সুযোগ পেয়ে ভর্তি হন আর্ট স্কুলে। তাঁর প্রতিভার গুণে বেশ ভালোই করছিলেন সেখানে। কিন্তু ভেতরের মুসাফির-মনটি প্রবলভাবে জেগে ওঠে : ‘থার্ড ইয়ারে উঠে পড়াশোনায় আর মন বসলো না। পড়াশোনায় ভালো করছি, ফার্স্ট, সেকেন্ড হচ্ছি। কিন্তু আরো তিন বছর এমনি নিয়মকানুন, শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে ভাবতেই বিতৃষ্ণা এলো। ভাবলাম, ছবি আঁকার কায়দাকানুন তো শেখা হলো মোটামুটি। এবার নিজে ইচ্ছেমতো আঁকব। ঘরের চার দেয়ালে আটকে থেকে কী লাভ। বাইরে বিশাল পৃথিবী পড়ে আছে।’ প্রথমেই টানলো তাজমহল‘মানুষের শিল্পকর্ম কী অপরূপ আর বিশাল… তার নিদর্শন’। তাঁর অভিভাবক ও শুভাকাক্সক্ষী শাহেদ সোহরাওয়ার্দি এবং নড়াইল জমিদার-পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ‘মন চলো আগ্রা’ বলে রেলগাড়িতে চড়ে বসেন১৯৪৩-এর অক্টোবর মাসের কোনো এক দিনে।

দশ.

বহির্বঙ্গে অবাঙালি-পরিবেশে এই তাঁর প্রথম যাত্রা। যাওয়া হলো আগ্রা-দিল্লি-আজমির-লক্ষেèৗ-জলন্ধর-লাহোর এবং আরও-আরও জায়গা। মুগ্ধ-চোখে দেখেন পাহাড়-নদী- বনানী-দুর্গ-প্রাসাদ-স্মৃতিসৌধ-জাদুঘর, চিত্রাগার, সেইসঙ্গে দ্রষ্টব্য আরও অনেককিছু। বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে দেখা হয়আলাপ-পরিচয়ে ঋদ্ধ হন। মুসাফির-সুলতানের রাত্রিযাপনের স্থান হয় বস্তি থেকে রাজভবন। থেমে থাকে না তাঁর শিল্পচর্চাফুটপাথ থেকে নবাবমহলে পৌঁছে যায় তাঁর ছবিসাদরে আমন্ত্রণ আসে অভিজাত পরিবারের জেনানা-মহলে তসবির বানানোর জন্যে। আম্বের নবাব-মহিষীকে ছবি-আঁকাও শেখান কিছুদিন। ভাবতে অবাক লাগে, এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে আজনবি সুলতান শুধু স্বীকৃতিই পান নাতাঁর চিত্রপ্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হয় সমারোহে এবং সিমলার সেই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন কাপুরতলার শিল্পরসিক মহারাজ। কাহিনির এখানেই শেষ নয়মহারাজা তাঁর ছবি দেখে মুগ্ধ হন এবং নিজের প্রতিকৃতি আঁকার জন্যে তাঁকে বরাত দেন। সেই সুবাদে সিমলা থেকে জলন্ধর যেতে হয় সুলতানকেকাপুরতলা প্রাসাদের অতিথি-নিবাসে তাঁর থাকার জায়গা হয়। পরে কাপুরতলাতেই পরিচয় হয় আমীর হাবিবুল্লাহ খানের সঙ্গেতারবন্দের নামকরা জমিদার, দিলদার ও মজলিশি মেজাজের মানুষ, যাঁর মধ্যে আছে ‘দার্শনিক ভাবুকতা’। এই মানুষটির সঙ্গ-সান্নিধ্য-মেহমানদারিতেই সুলতানের কেটে যায় ছ’ছটি [?] বছরকর্মহীন আলস্যে, আড্ডায়-আড্ডায়। এঁর আবাসেই বাবার মৃত্যুর খবর আসেÑ নড়াইলে ফেরার জন্যে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন সুলতান। বিদায় জানান বন্ধু হাবিবুল্লাহকে। বাড়ি-ফেরার আগে অল্পসময়ের জন্যে লাহোরে গিয়ে দেখা করেন ‘খাকসার’-নেতা আল্লামা মাশরেকির সঙ্গে। মনে মনে আগে থেকেই সুলতান খাকসার-আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। এবারে খাকসারের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে তাঁর গায়ে চড়ে কালো আলখাল্লা আর হাতে বেলচা। এই বেশে নড়াইলে ফেরেন ১৯৪৬-এআট বছর পরবিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে।

এগারো.

নড়াইলে দীর্ঘ ব্যবধানে ফিরে এসে খাকসার-আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কৃষক-আন্দোলনে যোগ দিয়েও সুবিধে করতে পারেননি। পুলিশি হয়রানি ও জোতদারের চক্রান্তের আশঙ্কা দেখা দেয়। ফলে সুলতানের ভবঘুরে-মন্ত্রে দীক্ষিত নড়াইলের কয়েকজন ভ্রমণপিয়াসী তরুণতাদের তিনজন ব্রাহ্মণ-হিন্দু ও দু’জন মুসলমানএই পাঁচজনকে নিয়ে সুলতান হাজির হন তালবন্দে তাঁর পুরোনো ইয়ার আমীর হাবিবুল্লাহ খানের সমীপে। সময়টা দেশভাগের প্রায় মুখোমুখি‘তখন ১৯৪৬-এর শেষ’। সুলতানের ভ্রমণের নেশা তখনো কাটেনিঘুরে বেড়ান দেরাদুন-মুসৌরি, সেইসঙ্গে আরও ছোটো-বড়ো খ্যাত-অখ্যাত কত-না শহর-বাজার-গ্রাম। দেশীয় রাজ্য আম্বের নবাবের অসুখী বেগম ও পুত্রের অনুরাগ-প্রীতি-আকর্ষণের বন্ধন ছিঁড়ে ফাঁকি দিয়ে সুলতান পৌঁছে যান ভূস্বর্গ কাশ্মীরে। চারদিকে উৎফুল্ল জনতাএকটা উৎসবের সমারোহ। কৌতূহলী সুলতান জিজ্ঞেস করে জানেন‘ভারত স্বাধীন হয়েছে’। কাশ্মীরে সুলতান বছরখানেক ছিলেনমন্তব্য করেছেন : ‘শ্রীনগর ছেড়ে চলে যাবার কোনো তাগিদ অনুভব করিনি। মনে হতো বাকি জীবন কাটিয়ে দিলেও তৃপ্তি মিটবে না।’ তাঁর শিল্পসৃষ্টির ধারা যেন অবিরাম বয়ে চলে এই সময়। তিনি জানিয়েছেন : ‘খুব ছবি আঁকতাম। ছবি আঁকার আদর্শ স্থান কাশ্মীর। ডাল লেকে নৌকা করে ঘুরতাম প্রায়ই। অনেক মাঝির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।… বৈঠা মেরে খুব আস্তে আস্তে যেত লেকের মাঝখানে। আমি নিবিষ্ট হয়ে ছবি এঁকে যেতাম।’

কিন্তু অচিরেই স্বপ্নভঙ্গ হয় সুলতানের। কাশ্মীরের দখল নিয়ে অশান্তি শুরু হয় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে এবং তা যুদ্ধে গড়ায়বোমা পড়ে শ্রীনগরে। এই চরম সংকটে জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে মানুষের। জীবন বাঁচাতে অন্য অনেকের সঙ্গে সুলতানকেও পালাতে হয় বিভক্ত ভারতের পাকিস্তান-অংশেপ্রথমে শিয়ালকোটে, তারপর লাহোর। সবকিছু ফেলে আসেন শ্রীনগরেতাঁর জিনিসপত্র আর ছবিগুলো। সুলতানের জবানিতে তাঁর জীবনী-আখ্যায়ক জানান : ‘সিমলা, মুসৌরি, কাগান ভ্যালি, শ্রীনগর ভ্যালির অনেক সুন্দর দৃশ্য নিয়ে আঁকা ছিল সেই সব ছবি। মনকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে, আমার ছবি অমনি করেই ছড়িয়ে আছে নানা জায়গায়। নিজের কাছে কিছুই তো রাখিনি। সেই সোনার তরী কবিতার মতো সবকিছু নৌকায় বোঝাই করে দিয়ে পারে একা থাকা।’ সেইসঙ্গে এ-ও বলেন : ‘অধিকাংশ শিল্পীর ভাগ্যই তো তাই।’ খ্যাতির দাবিবিহীন সংসারবিবাগী সুলতানের এই কথায় একধরনের দার্শনিকতার ছোঁয়া লাগে।

লাহোর এবং পরে পশ্চিম পাকিস্তানের আরও দু-একটি শহরের সঙ্গে সুলতানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। চিত্রচর্চা, সংগীত ও বরেণ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের কারণে এই শহরগুলোর সঙ্গে তাঁর ছিল অমলিন স্মৃতির সম্পর্ক। লাহোরেই বিখ্যাত শিল্পী আবদুর রহমান চুগতাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয় সুলতানের। চুগতাইয়ের সৌজন্যে ১৯৪৮-এর ডিসেম্বর লাহোরে সুলতানের একক চিত্র-প্রদর্শনী হয়সে-প্রদর্শনী খুবই সফল হয় এবং তা সুলতানকে খ্যাতি এনে দেয়। এখানেই দেখা পান কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, গল্পকার সাদাত হাসান মান্টো, কবি আহমেদ দানেশেরশোনেন লেখক সাজ্জাদ জহিরের কথাএঁরা সবাই বামপন্থায় বিশ^াসী। এঁদের সঙ্গ-সান্নিধ্য আর আলাপ-আলোচনায় ধীরে ধীরে কমিউনিজমের প্রতি তাঁর কেমন যেন একটা টান আসে‘কমরেড’ ডাকটা তাঁর মনে গেঁথে যায়।

করাচি তখন পাকিস্তানের রাজধানী১৯৪৯-এর শেষভাগে সেখানে গেলেন সুলতান। করাচিতেও তাঁর চিত্র-প্রদর্শনীর আয়োজন হয়, আগের পৃষ্ঠপোষক সেই চুগতাইয়ের আর্থিক আনুকূল্যেই। এবারের প্রদর্শনীতেও নাম ছড়ায় সুলতানের। এই করাচিতেই তাঁর জন্যে অপেক্ষা করে বড় পরিসরে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ।

মার্কিন মুলুক সফরের একটা সুযোগ আসে ১৯৫০-এ। আমেরিকার এক সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি-দল করাচিতে এসে একজন পাকিস্তানি শিল্পীকে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন, যিনি আমেরিকা সফর করবেন। পাকিস্তানের দুই অংশ থেকেই শিল্পীরা ছবি জমা দেন ও সাক্ষাৎকারে অংশ নেন। সুলতান মনোনীত হনশিল্পী হিসেবে লাভ করেন ঈর্ষণীয় স্বীকৃতি।

বারো.

এরপর ‘গায়ে আলখাল্লা, মাথায় লম্বা চুল’ সুলতান আমেরিকা রওনা হন। বিমান-বদলের দু’ঘণ্টার যাত্রা-বিরতি হয় আমস্টারডামেসুলতান বেরিয়ে পড়েন রেমব্রাঁর মিউজিয়াম দর্শনে। কিন্তু আশা পূর্ণ হয় না। ফেরার পথে থামেন বিলেতেঅর্জন করেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

আমেরিকায় গিয়ে কত শহর ঘোরেন, দেখেন যা-কিছু তাঁর প্রিয়, নিজের মনের কথা শোনান, মুখোমুখি হন ‘বিপন্ন বিস্ময়ে’র। নিউইয়র্ক তাঁর ভালো লাগেনিমনে হয়েছে ‘নিষ্প্রাণ, কঠিন, দুর্ভেদ্য’এ-শহর ’আনন্দ দেয় না, কেবল চমকিত করে’। এর বিপরীতে তাঁর প্রাণে ‘অন্তরঙ্গ অনুভূতি সঞ্চার করে’ অন্য শহরের আর্ট মিউজিয়ামগুলো, যেখানে আছে ভ্যান গঘ, গগাঁ, পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালি এবং আরও অনেক নামী শিল্পীর অসাধারণ সব ছবি। বিদেশে বহু-আকাক্সিক্ষত স্বদেশির দেখা পান, শিকাগোতে আলিঙ্গনে আবদ্ধ হন নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের। নিজের শিল্প-সৃজন-প্রতিভার পরিচয় ছড়িয়ে দিয়ে আসেন আমেরিকার অন্তরেতাঁর ছবির প্রদর্শনী হয় ওয়াশিংটন-বোস্টন- শিকাগো-মিশিগানে।

লন্ডনে সুলতানের জন্যে কাতর-অপেক্ষায় থাকেন উত্তরকালের বাংলা চলচ্চিত্রের দুই কীর্তিমান পুরুষফতেহ লোহানী আর খান আতাউর রহমান। বিমানবন্দরেই এ-দু’জন চুম্বনে চুম্বনে সিক্ত করে সপ্রেম অভ্যর্থনা জানান সুলতানকে। লোহানী আর আতার সঙ্গে পুরো ন’টি মাস কাটাতে হয় লন্ডনের বাঙালি-হোটেল ‘তাজমহলে’। পৌনে এক বছর এখানে কাটে ‘লন্ডনের সব দর্শনীয় স্থান’ দেখে, আড্ডায়-গল্পে, পানাহারে। শেষে ওই দুইজন স্থির করেন সুলতানের প্রদর্শনী হবে, তাই শুরু হয় ছবি-আঁকার পালা।

লোহানী-আতা-সুলতান তিনজনের চেষ্টায় সেইসব ছবি কিছু কিছু টিউব স্টেশনে বিক্রি হয়ে যায়। উৎসাহ বাড়ে। এরপর সুলতানের ছবি প্রদর্শিত হয় সানডে আর্টিস্টদের সঙ্গে। সুলতানের ছবি শিল্পরসিকদের নজর কাড়ে। এক ইংরেজ শিল্প-সমালোচক প্রস্তাব দেন সুলতানের দুটি ছবি লন্ডনের লেইস্টার গ্যালারিতে একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে প্রদর্শনের। ১৯৫০-এ লেইস্টার গ্যালারির প্রদর্শনীতে পিকাসো-মাতিস-দালি ও আরও কিছু বিখ্যাত শিল্পীর ছবির পাশাপাশি সুলতানের ছবিও প্রদর্শিত হয়। তিনিই প্রথম এশীয় শিল্পী, যিনি এই দুর্লভ ও সম্মানজনক সুযোগ পান। স্টুডিও পত্রিকায় তাঁর শিল্পকর্মের আলোচনা প্রকাশিত হয়তা ছিল প্রশংসামূলক। সুলতানের পরিচিতি ক্রমে প্রসারিত হতে থাকে। এবারে প্যারিসে চিত্র-প্রদর্শনীর কথা ওঠে। কিন্তু ওই যে ধন-মান-খ্যাতি সম্পর্কে চির-উদাসীন সুলতানের কাছে এ-প্রস্তাব কোনো আবেদন সৃষ্টি করেনিসরাসরি তা নাকচ করে দেন। ফতেহ লোহানী কিছু ক্ষুণ্ন ও হতাশ হয়ে বলেন : ‘কেন, না কেন ? আন্তর্জাতিক খ্যাতির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন। ভ্যান গগ অব দ্য ইস্ট খেতাব পেতে যাচ্ছেন। এখন না কেন ? আর প্যারিসই যখন আর্ট জগতের কেন্দ্র। সেখানে তো প্রদর্শনী করতেই হবে।’ সুলতান এসব অনুরোধ-যুক্তি সরিয়ে রেখে আবেগাপ্লুত-কণ্ঠে বলেন : ‘অপেক্ষা করে আছে। নেই কে বললে ? দেশ অপেক্ষা করছে। বিদেশ বিদেশই, যত খ্যাতি হোক, অর্থ বিত্ত হোক, দেশে ফিরতে হবে।’ এই হলেন বাঙালির সুলতান, বাংলার কাদা-মাটি আলো-হাওয়ার শিল্পী। সব মোহ ছিন্ন করে, ‘গতানুগতিকের দাসত্ব’ অগ্রাহ্য করে, ‘পরিবর্তন আর গতির মধ্যেই নিজের জীবনকে সাজিয়ে’-রাখা মানুষটি ফিরে আসেন দেশে।

তেরো.

করাচি বিমানবন্দরে পান উষ্ণ-সংবর্ধনাবিজয়ের মাল্যে ঢেকে যায় তামাম শরীর। দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির মাশুল তোলার জন্যে ইয়ার-বক্সিরা অস্থির ও উত্তেজিত হয়ে আছেনআর সুলতান মুখিয়ে আছেন তার প্রত্যুত্তর দিতে। করাচিতে ফিরে এসে প্রথমে ওঠেন তাঁর প্রিয় এক দম্পতির বাসায়, তারপরে সেখান থেকে উঠে আসেন উদার-মুক্ত পরিবেশে ক্যাসিনো গেস্টহাউসে। এখানে মজলিশ-মহফিল-আড্ডা জমে ওঠে ধীরে ধীরে। আসা শুরু করেন হরেক কিসিমের মানুষলেখক-কবি, চিত্রশিল্পী, সংগীতসাধক ও সমঝদারেরা। সুলতানের তিনঘরের আবাসের প্রায় পুরোটারই দখল নেন এঁরা। বিকেল থেকেই শুরু হয় নরকগুলজাররাত যত বাড়তে থাকে মজলিসের মৌতাতও তত উচ্চগ্রামী হয়। সুলতানের আসরের খবর করাচি শহরের রসিকমহলে বেশ ভালোই চাউর হয়ে যায়। ক্যাসিনো গেস্টহাউসে সুলতানের আসরের উচ্চতা কেমন ছিল দু’একজনের নাম বললেই তা বেশ বোঝা যায়আসতেন ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ, ওস্তাদ আল্লারাখা, মরিস মিউজিক কলেজের অধ্যক্ষ বড়ে আগাপাশাপাশি কবি ইকবালের বিদগ্ধ পুত্র ড. জাভেদ ইকবাল ও আরও অনেক গুণী মানুষ। মাঝেমধ্যে সুলতানকে ডেকে পাঠান তাঁর প্রতি স্নেহশীল হাসান শাহেদ সোহরাওয়ার্দিক্বচিৎ দেখা হতো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে। সুলতান কী-এক জাদুতে মাতিয়ে তোলেন করাচিকেতাঁর এক অনুরাগীর মুখে শোনা যায় : ‘ক্যাসিনো গেস্টহাউস না থাকলে আমাদের জন্যে করাচি শহর মরুভূমি হয়ে থাকত’। কিন্তু কী যেন হয়ে গেল ভেতরে-ভেতরে! খুব কাছের সংবেদনশীল মানুষের চোখে ধরা পড়ল তাঁর এই ভাবান্তর ও আনমনা-ভাব। করাচি ফেরার পর কোথা দিয়ে কেমন করে যেনো দু’টি বছর কেটে যায়। সুলতান একদিন বিষণ্ন কণ্ঠে সবাইকে জানিয়ে দেন ‘দেশে’ ফিরে যাওয়ার কথা। কোনো ফলবান ভবিষ্যতের ইশারায় তিনি ফিরে যাচ্ছেন না, এ-তিনি বেশ ভালোই জানেন। বরঞ্চ বিশাল এক প্রাপ্তির সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে, গুণী ও প্রিয় মানুষের হাত ছেড়ে, এক প্রবল নেশার টানে তাঁর প্রত্যাবর্তনের এ-সিদ্ধান্ত।এ-এক ‘বড় পুরনো নেশা। মাটির গন্ধ শোঁকার নেশা। ষড়ঋতুর শোভা দেখার নেশা। দোয়েল-কোয়েলের ডাক শোনার নেশা। কৃষকের গায়ে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমে উঠেছে সেই দৃশ্য দেখার নেশা, কৃষানি উঠোনে ফসল তুলে নিচ্ছে গভীর তৃপ্তিতেসেই শান্তির ছবি দেখার নেশা। শুধু স্মৃতি থেকে তাদের যেন সম্পূর্ণভাবে পাওয়া যায় না আর। স্মৃতিও মলিন হয়।’তা-ই ফিরে আসাক্লান্ত পাখি যেমন সন্ধ্যায় খুঁজে নেয় তার নীড়ের ঠিকানা।

চোদ্দো.

দেশ থেকে, দেশ মানে পূর্ববাংলা, দেশ মানে নড়াইল, তাঁর বিচ্ছিন্নতার কাল বছর সাতেক। ফিরে আসেন ১৯৫৩-তে। বদলাননি তেমন‘সাদা আলখাল্লা আর ঋষি-ফকিরদের মতো পিঠময় চুল ছড়ানো।… মুখে স্মিত হাসি।’ জয়নুল আবেদিন তখন সেগুনবাগিচায় অবস্থিত আর্টস কলেজের অধ্যক্ষতাঁরই সৌজন্যে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে সুলতানের অভ্যর্থনা ও সেগুনবাগিচায় কলেজহোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হয়। ঢাকায় পৌঁছেই সুলতান তাঁর কর্মকাণ্ডে নিজের বিচিত্র স্বভাবের পরিচয় দেন রাস্তার নেড়িকুত্তাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করার মধ্য দিয়েআরও অবাক হওয়ার ব্যাপার আসে যখন তিনি বলে ওঠেন : ‘কামড়াবে কেন ? বাঙালি কুকুর না ? আমিও বাঙালি, এও বাঙালি। উই আর ব্রাদার্স, ফ্রেন্ডস। তাই না ?’ এরপর গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পথে ফকিরের দেখা পেলেই তার হাতে একশ টাকার নোট গুঁজে দিতে থাকেন। যে-দু’জন তাঁকে আনতে গিয়েছিলেনআবদুর রউফ ও দেবদাস চক্রবর্তীসুলতানের খেয়ালিপনা আর অদ্ভুত সব কথাবার্তায় বিস্মিত, মুগ্ধ ও আকৃষ্ট হন। কলেজ-হোস্টেলে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয় এবং এখানেও নানা মজার কাণ্ড-কারখানায় মাতিয়ে তোলেন। শুরু হয় বাঁশিতে সুর-তোলা, খালি পায়ের নাচে মন ভরে না বলে পায়ে পরেন নূপুর, কখনও ‘রাধাভাবে’ শাড়ি পরেন, নেশার আসর বসানজমিয়ে তোলেন আড্ডা, সেখানে কলেজের ছেলেমেয়েরাও এসে যোগ দেয়, ইচ্ছে হলে আবার ছবিও আঁকেনএক ‘ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ’ যেন। তবে কখনও বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। আসলে এটা তো শিক্ষাঙ্গন, এর পরিবেশ রক্ষার একটা দায় তো আছে! আর এখানে সুলতানের কর্মকাণ্ডে ছেলেমেয়েদের বখে যাওয়ার শঙ্কা কর্তৃপক্ষ কীভাবে অস্বীকার করবেন! সুলতানের এই ‘বাড়াবাড়ি’তে শিক্ষকদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, বিচলিত হন অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিনও। অবশ্য এ-বিষয়ে কারও কারও মনে ভারি সূক্ষ্ম প্রশ্ন জাগে জয়নুল ও সুলতানের সম্পর্কের রসায়ন নিয়ে। উপন্যাস-লেখক সেই সময়ের ছাত্র ও এইসব ঘটনার নিকট-সাক্ষী দেবদাস চক্রবর্তীকে জিজ্ঞেস করে তাঁর মুখ থেকে জানতে পারেন : ‘কলেজের মঙ্গলের জন্য, না অন্য কোনো কারণে বিরূপ হয়ে স্যাররা এমন বলতে শুরু করলেন, বুঝলাম না।’ দেবদাসের ইঙ্গিত অস্পষ্ট নয়, কিন্তু কতটা যৌক্তিক সে-প্রশ্ন অবান্তর নয়তবে এই মনস্তত্ত্বের ব্যাখ্যা ভারি জটিল ও দুরূহ। এই সংকটের ফলে আবার আর্থিক ও মানসিক নিঃস্বতা নিয়ে ঢাকা ছাড়েন সুলতান। কোথায়ই বা যেতে পারেন নিরাশ্রয় সুলতানজন্মভূমি নড়াইল ছাড়া!

পনেরো.

নড়াইলে এসে আবার ‘স্বচ্ছন্দে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ’ বেছে নেন সুলতান। মাসিমদিয়ার পিতৃগৃহ ততোদিনে বেদখল। দেশভাগ হয়েছে কয়েক বছরজীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে জমিদারেরা সপরিবার একেবারে চলে যান কলকাতা। এক-দু’জন থেকে গেছেন আসবাবপত্র এবং সেইসঙ্গে বিশাল বাড়িটা ভেঙে ফেলে তার দামি কাঠের জানালা-দরোজা ও কড়ি-বরগা বিক্রি করে কিছুটা যদি আদায়-উশুল হয় সেই ভরসায়। এককালের জৌলুসপূর্ণ গমগমে জমিদারবাড়ি কয়েক বছরের মধ্যেই পোড়োবাড়ির চেহারা নেয়। এখানেই ঠাঁই নেন সুলতান, পাশাপাশি একটি নার্সারি স্কুলও খোলেনযেখানে লেখাপড়া ও ছবি-আঁকা দুইই চলতে থাকে। কিছুদিন বেশ ভালোই চললোতারপর জমিদারের উত্তরপুরুষেরা বাড়ি ভেঙে এর উপকরণ বিক্রিতে হাত দিলেন। বন্ধ হলো সাধের স্কুলআবার ঠাঁইনাড়া হতে হয় সুলতানকে। এবারে ডেরা হয় চিত্রা নদী পেরিয়ে চাচুরি পুরুলিয়ায়।

ষোলো.

আবার চেষ্টা, নতুন করে স্কুল গড়ে তোলারছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করবেছবি আঁকবে। একদিন সেই পর্বও শেষ হয় বছর-দুই পরে। আবার চিত্রা নদী পারাপারের পালা। এবার কোথায় হবে মুসাফিরের নয়া-আস্তানা! কেননা, লেখক জানতে পারেন তাঁর সুবাদেই : ‘শিক্ষিত ভদ্রলোকদের সংস্রবে থাকা হয় না। তাঁরা সন্দেহের চোখে দেখে, অস্পৃশ্য মনে করে। তাঁর জীবনযাপনের, আচার- আচরণের কাহিনি পল্লবিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মুখে মুখে। অপ্রকৃতিস্থ মনে করে কেউ কেউ। অন্যেরা নেশাগ্রস্ত, পথভ্রষ্ট একজন মানুষের বেশি স্বীকৃতি দেয় না। ভদ্রসমাজ এড়িয়ে চলে তাঁকে।’কথা তো মিথ্যা নয়! কিন্তু কে তাঁকে ভালোবাসেকারা সানন্দে-সাগ্রহে তাঁর অন্ন-আশ্রয় জোগায় ? এর সংক্ষিপ্ত জবাব‘ছোটোলোকেরা’, বাকরি গ্রামের অস্পৃশ্য- গরিব নমশূদ্ররা। এরাই তাঁর কাছে বাঙালির শক্তি-শৌর্য-সাহসের প্রতীকএদের ‘বজ্রমুষ্টিতে, হাতের পেশিতে চিরদিনের সংগ্রামী জীবন। সুলতান তাদের মাঝে আবহমান বাংলাকে খুঁজে পান। পূর্বপুরুষের আদিম প্রকৃতি আবিষ্কার করেন। রক্তের ভেতর ঢেউ ওঠে উত্তাল’। সুলতান এঁদের সঙ্গে মিশে যান গানে- নাচে-নেশায়-আনন্দে-দুঃখে-বেদনায়। এইসব নিয়ে ভুলে থাকেন। আবার হঠাৎ-হঠাৎ মনে পড়ে যায় ঢাকার বন্ধুদের কথাসেখানে গেলে আবার জুটে যায় নতুন নতুন বন্ধুতাঁদের সাহচর্য- প্রেরণায় ছবি-আঁকার ঝোঁক আসেনতুন সৃষ্টির প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। এইভাবে নড়াইল-ঢাকা আসা-যাওয়া চলতে থাকেএকসময় ঢাকায় মন বসে। নতুন করে শুরু হয় স্থগিত-শিল্পীজীবনের আর-এক চলিষ্ণু অধ্যায়।

সতেরো.

একথা কবুল না-করলে সত্যের অন্যথা হয়, ঢাকায় সুলতান কখনওই লাহোরের আবদুর রহমান চুগতাইয়ের মতো একজন পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী পাননি। ঢাকার শিল্পীরা নানা কারণে সুলতানের প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না। আর এখানে শিল্পবোদ্ধার মান যে খুব উঁচু ছিল তা মনে হয় বলা যায় না এবং শিল্প-সমালোচনার ধারাও তেমন ঋদ্ধ ছিল না। তবুও ঢাকায় তাঁর কিছু গুণগ্রাহী ও সমঝদার তৈরি হয়, যাঁরা আন্তরিকভাবে চাইতেন পূর্ববাংলায় বা বাংলাদেশের শিল্পক্ষেত্রে সুলতানের একটি জায়গা তৈরি হোকতাঁর সম্মানজনক মূল্যায়ন যেন ব্যাহত না-হয়। পথ মসৃণ ছিল না, কিন্তু তবুও কিছু শিল্পী, শিল্পরসিক, সংস্কৃতিবান আমলা ও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে, সেই উদ্্যোগ একেবারে বিফল হয়নি।

সুলতানের তো স্থিরতা নেইআজ এখানে তো কাল ওখানে। ঢাকায় এসেও থাকেন নানা জায়গায়আজিমপুরে শিল্পী আমিনুল ইসলাম, আবুল হাসনাত রোডে আফজাল করিম, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে বা পরিবাগে আহমদ ছফা, ঢাকার ইরানি দূতাবাসের কালচারাল অ্যাটাশে সুলতানী ও ঢাকার জার্মান কালচারাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক পিটার জেভিসের বনানীর বাসা কিংবা রামপুরায় শিল্পকলা একাডেমির ভাড়া-করা বাড়িতে। অবশ্য সব জায়গাতেই সমান খাতির মেলেনি। শিল্পী আমিনুল ইসলামের ওখানেই সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। ওই বাড়ি থেকেই শাড়ি পরে তিনি প্রায়ই আর্টস কলেজে যেতেন, সে-বড় বিব্রতকর অবস্থা আমিনুল ভারি বিরক্ত ও বিব্রত হন। তবে খুব সংগত কারণেই আমিনুল-পত্নীর আপত্তি দৃঢ়-ভিত্তি পায়, যখন গাঁজার ধোঁয়া ও গন্ধে ঘরগুলো আচ্ছন্ন হয়ে যেত। সুলতান এতটাই স্বাধীনতা ভোগ করতে চাইতেন যে তাতে তিনি সামাজিক বা পারিবারিক সুবিধা-অসুবিধার বিষয়কে আদৌ আমলে নিতে চাননি। সম-স্বভাব না-হলে কোনো গৃহস্থের পক্ষে এই আচরণ ও অভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন।

শিল্পীর খ্যাতি ও পরিচিতি নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের ওপর : শিল্পীর কাজের বিরতিহীন ধারাবাহিকতা, কোনো আর্ট-গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, পেইন্টিং ওয়ার্কশপ এবং সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ, দেশে-বিদেশে একক বা যৌথ প্রদর্শনীতে যত বেশি সম্ভব অংশগ্রহণ, যোগ্য শিল্প-সমালোচকের আলোচনা এবং পত্র-পত্রিকায় তার প্রকাশ। কিন্তু সুলতানের এর কোনোটাই ভালোভাবে হয়নি। দেশবিভাগের আগে সিমলায় তাঁর প্রথম প্রদর্শনী হয়, তার বছর চারেক পরে বিভক্ত দেশের লাহোর ও করাচিতে আরও দুটি একক প্রদর্শনী হয়। বিদেশ-সফরকালে লন্ডনে ধ্রুপদি শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর এক স্মরণীয় প্রদর্শনী তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির মুখোমুখি করে দেয়। ১৯৭৬ সালের আগ-পর্যন্ত পূর্ববাংলা বা বাংলাদেশে সুলতানের কোনো চিত্র-প্রদর্শনী হয়নিএদেশে প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এই প্রদর্শনীতেই পুরোনো সুলতান নতুন করে আবিষ্কৃত হন। শিল্পজগতে একটা বিস্ফোরণ ঘটে যায়। সুলতান স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হন।

এরপর আবার হারিয়ে যান সুলতান। কিছু ভক্ত-অনুরাগী-শুভানুধ্যায়ী তাঁর চিত্র-প্রদর্শনীর জন্যে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। পরিকল্পনা-প্রস্তুতিতে বেশ সময় যায়। প্রায় এক যুগ পর আবার সুলতানের একক প্রদর্শনীর সম্ভাবনা সফল হতে চলে। এবারের আয়োজকজার্মান কালচারাল ইন্সটিটিউট। দেশি-বিদেশি শিল্পরসিকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনী প্রাণময় হয়ে ওঠে। রসিক দর্শকের কাছে প্রতিটি আবির্ভাবেই সুলতান উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠেন, এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

আঠারো.

জার্মান কালচারাল ইন্সটিটিউটের এই প্রদর্শনীর প্রায় দশ বছর আগের একটি পর্বের কথা উল্লেখ করতে হয়শিল্পকলা একাডেমির প্রদর্শনীর পরে-পরের ঘটনা।

প্রদর্শনী শেষ হয়। সুলতানকে নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। সমঝদার দর্শকের চোখে বিস্ময় ফুটে ওঠেপ্রাজ্ঞ সমালোচকের কলমে প্রশংসা ঝরে পড়ে। ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’এই প্রশ্নই যেন সবার চোখে-মুখে। বেশকিছু ছবি বিক্রি হয়। কিন্তু সমস্যা বাধে বিক্রি না-হওয়া ছবি নিয়ে, তার সংখ্যাও কম নয়। সুলতান সমস্যার কথা জানান তাঁর এক প্রভাবশালী অনুরাগী-শুভাকাক্সক্ষীকেÑ একটি বড় জায়গা প্রয়োজন, যেখানে‘ছবিগুলো রাখা যায়। নতুন ছবি আঁকা যায়। থাকা যায়। আর ছোট ছেলেমেয়েদের ছবি আঁকা শেখানো যায়।’ সুলতান যেমন চেয়েছিলেন তেমনই একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি পাওয়া গেল সোনারগাঁতে। একসময়ের বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ের আলাদা ঐতিহ্য ছিলতারই ধারাবাহিকতায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এখানে গড়ে তোলেন লোকশিল্প জাদুঘর এবং সেইসঙ্গে কারুপল্লি।

একদিন দু’চোখে প্রত্যাশার স্বপ্ন বুনে সোনারগাঁয়ে পৌঁছে যান সুলতান। বাড়িঘর সংস্কার করে তাঁর ছবিগুলো সাজান, শুরু হয় শিশুদের ছবি-আঁকা শেখার পর্ব, নিজেও আঁকায় হাত দেন এবং সেইসঙ্গে মাথায় ঘুরতে থাকে কী করে শিল্পী-সাহিত্যিকদের একটি ‘কমিউন’ গড়ে তোলা যায়। সুলতান এখানে আসায় একটা সাড়া পড়ে যায়অনেকেই খুশি হন, অবশ্য কেউ কেউ প্রসন্ন হতে পারেন না।

কিন্তু সবকিছু সহজ পথে চলে না। কিছু লোক স্বার্থের কারণে বাদ সাধেসুলতানের জীবনাচরণ সম্পর্কে নানা অভিযোগ এনে এলাকার লোকজনকে ক্ষেপিয়ে তোলে। অন্যদিকে প্রকৃতিও বিরূপ হয় জানালা দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে ছবিগুলো ভিজে নষ্ট হতে থাকে। এই লোকনিন্দা ও ছবির ক্ষতি সুলতানের মন ভেঙে দেয়। প্রথমে ছবি, পরে নিজেকে সরিয়ে নেন সোনারগাঁ থেকে। আবার মাটির ডাক শোনেনফিরে আসেন নড়াইলে।

উনিশ.

এর অনেক আগে, ষাটের দশকে, সুলতান কিছুকাল যশোরেও কাটান। যশোরপর্বের কথাও ছোটো করে জানান তাঁর জীবন-আখ্যানের রচয়িতা হাসনাতকে : ‘চাঁচড়ায় পুরনো একটি জমিদারবাড়ি পরিত্যক্ত ছিল। সেখানে কলেজ-অধ্যাপক, শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিয়ে কমিউন গড়ে তুলেছিলাম একটা। চাঁচড়ায় জমিদারবাড়ির দেয়ালে কয়লা দিয়ে অনেক ছবি এঁকেছিলাম। কমিউনের পরিবেশ ফুটিয়ে তোলার জন্য।’ সুলতান এই ‘কমিউনে’র ধারণাটা পেয়েছিলেন আমেরিকায় গিয়ে। যশোরে কিছুদিন ভালোই চলে চাঁচড়া রাজবাড়ির কমিউন। কিন্তু দেখা যায়, কিছু মতলবি ‘ছোকরা’ সুলতানের নাম করে নানাজনের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ে খুব তৎপর হয়ে ওঠে এবং সেই টাকা তাদের ভোগেই লাগেকমিউনের কোনো উপকারই তাতে হয় না। সুলতান এই ফুর্তির আর্থিক উৎস একটু কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েই বন্ধ করে দেনসেইসঙ্গে তাঁর সাধের কমিউনেরও বিলুপ্তি ঘটে।

তবে সুলতানের যশোরবাসের দিনগুলি একেবারে নিষ্ফল হয়নি। যশোরে তৈরি করেন ‘চারুপীঠ’ নামে ছোটো ছেলেমেয়েদের ছবি-আঁকার স্কুল। এখান থেকে অনেক প্রতিভারই জন্ম হয়, যারা জাতীয় পর্যায়ে শিশু চিত্র-প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নাম করে। সুলতানের স্মৃতি-চিহ্নিত সেই ‘চারুপীঠ’ এখনও টিকে আছে।

এরপরে যশোরের সঙ্গে সুলতানের সম্পর্ক শিথিল হয়ে আসে, তবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নিকখনও কোনো অনুষ্ঠানে হয়তো তাঁকে পাওয়া যেত। আবার বড় কোনো অসুস্থতায় চিকিৎসা নিতেন যশোর সিএমএইচ-এ। যশোরেও সুলতান স্মৃতির স্পষ্ট ছাপ রেখে গেছেন।

কুড়ি.

শিল্পী আমিনুল ইসলাম একবার আলাপচারিতায় বলেছিলেন : ‘সুলতান ইজ দ্য লাস্ট অব দ্য বোহেমিয়ানস’সুলতান সম্পর্কে এর চেয়ে খাঁটি কথা আর হয় নাতাঁর জীবন-স্বভাব-প্রকৃতি- প্রবণতা এই মন্তব্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।

অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের শ্রুতি ও পর্যবেক্ষণে এইভাবে ধরা পড়েন সুলতান : ‘… শুনতে পাই, হে নাকি বড় অস্থির। কোথাও বেশিদিন থাকতে পারে না। গ্রামে গিয়া পইড়া থাহে। নেশাটেশা করে। মাঝে মাঝে ঢাকায় আসে। পোলাপানদের মাতাইয়া রাইখা আবার গ্রামে যায় গিয়া।’ অধ্যাপক রাজ্জাক সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারেন : ‘সুলতান তো দুনিয়াদারি বোঝে না কিছু। শৃঙ্খলা নাই জীবনে।’ যখন সরাসরি পরিচয় হয় দু’জনের তখন রাজ্জাকের কাছে সুলতান আবিষ্কৃত হন এইভাবে : ‘কথাবার্তা হয়।… তার লগে কথা কইয়া খুব আরাম পাওন যায়। সুন্দর কইরা কথা কয়। অনেক কিছু জানে। বেশি পড়াশোনা করে নাই। কিন্তু গুণী, বেশ জ্ঞানী।’

সুলতান আনুষ্ঠানিক বিয়ের পথে পা-বাড়াননিতিনি ছিলেন ভবঘুরে- ভ্রামণিক, আবার অন্য-অর্থে বলা যায়Ñ গৃহী-সন্ন্যাসী, বা বাউল-ফকির-দরবেশের ছায়া। আশ্রিত এক নমশূদ্র-ঘরের বিধবা ও তার দুই কন্যাকে নিয়ে তাঁর সংসারএরা তাঁর কন্যা ও নাতনি। এই সংসারের আরও সদস্য‘তিরিশটা বেড়াল, বিশটা কুকুর, তিনশো গিনিপিগ, পাঁচটা হনুমান, বাঁদর, টিয়া পাখি, ময়না’এইসঙ্গে গরুও কয়েকটা। খুব কর্তব্যপরায়ণ কর্তা তিনি। এই যে পশুপাখি-পোষা, নানা ফুল-ফলের বাগান-তৈরি, এ-ও ছিল তাঁর শখনা, শখ না-বলে নেশাই বলতে হয়। খুব ভোরে ওঠেন সুলতানপশুপাখিগুলো দেখেন, কথা বলেন ওদের সঙ্গে, গরুগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে তারপর প্রবেশ করেন ফুলবাগিচায়‘তখন ভোরের প্রথম রোদ বাগানের গাছগাছালির ভিতর দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। ঠিক হলুদ নয়, হালকা সবুজ রং রোদের। যেন সূর্য নয়, গাছগাছালি থেকেই বিকিরিত হচ্ছে সুবজাভ আলো।’

তখন তিনি বাগেরহাটে, এক ভক্তের বাড়িতেসেখানেও সুলতানের এলোমেলো জীবন বয়ে চলেছে খেয়ালের বশে। ১৯৮৯ সালে এসে তিন দশক আগের স্মৃতি মেলে ধরেন ভক্ত : ‘সে সময় তাঁর বেশভূষা ছিল অপরূপ। কখনও শাড়ি পরে, নূপুর পায়ে। আবার কখনও বাঘের ছাল গায়ে, হাতে বাঁশি নিয়ে। রীতিমতো বহুরূপী। পাড়ার ছেলেরা হইচই করে পেছনে পেছনে ছুটত, ঢিল ছুড়ে মারতো। মাথায় ঘা হয়ে গিয়েছিল ইটের ঢেলায়। তাঁর কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই।… ভাবজগতে বিচরণ করছেন তখন। লোকে অবশ্য পাগল বলেই মনে করত।… উধাও হয়ে যেতেন। শুনতাম, যাত্রাদলে নাচ শেখাচ্ছেন, মঞ্চ সাজাচ্ছেন, গান গাইছেন। অদ্ভুত জীবন ছিল তাঁর।’

সুলতানকে খেয়েছে সর্বনাশা গাঁজার নেশা। পেটে দানাপানি পড়েনি, কিন্তু ছিলিমের পর ছিলিম উড়ে যাচ্ছে। এই করে গাঁজা তাঁর ফুসফুসটাকে ঝাঁজরা করে দেয়। গঞ্জিকা-সেবনকে তিনি শৈল্পিক রূপ দান করেছিলেন। উত্তরসময়ে খ্যাতিমান এক শিল্পী তাঁর শিক্ষানবিশি-পর্বে কিছুকাল সুলতানের সেবায় নিয়োজিত ছিলেনতাঁর প্রত্যক্ষ-দর্শনের বিবরণ এই রকম : ‘পকেটভর্তি হাজার হাজার টাকা সব উধাও। লোকজনকে খাইয়ে, দান করে উড়িয়ে দিলেন।… গাঁজাতেও বেশ খরচ হয়েছে। নেশা করতেন রিচুয়ালের কায়দায়। তাঁর মতো কলকে সাজাতে কাউকে দেখিনি। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, যারা নেশা কন্ট্রোল করতে পারে, তারা নেশা করলে দিব্যসৃষ্টি পেয়ে যায়।… কপালের ওপরই স্পিরিচুয়াল জগৎ।… যারা চিন্তার জন্য নয়, সৃষ্টির জন্যও নয়, কেবল নেশাগ্রস্ত হবার জন্য ওপথে আসে তারা ধ্বংস হয়ে যায়। এ এক ভীষণ অস্ত্র। প্রবলভাবে বাঁচতে সাহায্য করে। আবার মারতেও দ্বিধা করে না।’ সুলতানের জীবনে কোনটা ঘটেছিল, সে-প্রশ্ন থেকেই যায়।

তবে গাঁজার টানে সুলতান হয়তো সৃষ্টির প্রেরণা অনুভব করতেন। কৈলাসটিলায় এক নির্জন রাতের বর্ণনা দিয়েছেন লেখক : ‘সুলতান কলকেতে টান দিয়ে বুক ভরে ধোঁয়া টেনে নেন। বুঝতে পারেন শরীর ক্রমেই হালকা হয়ে আসছে। এরপর মাটির ওপর থেকে উঠে যাবে শরীর। মেঘের মতো ভাসবে। চোখের সামনে অনেক রং ঝিলিক দেবে। কানে বাজবে সুরলহরি।’ একেই হয়তো বলে নেশার সৌজন্যে তুরীয়ানন্দ অনুভূতি।

তরল পানীয়েও অরুচি ছিল না তাঁর। তবে সে-হতো উচ্চমার্গের অভিজাত আসর-বাসরে। সুরার মাহাত্ম্য সম্বন্ধে সুলতানের মন্তব্য বা মতামত পাওয়া যায়নি। তবে গঞ্জিকার ওপরে যে তিনি একে স্থান দেননি, তা বলাই বাহুল্য।

একুশ.

কোনো কোনো উন্নাসিক শিল্পী বা শিল্প-সমালোচক সুলতানকে অর্ধশিক্ষিত হিসেবেই জ্ঞান করে থাকেন। তাঁর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এ-ও এক বাধা। তবে মনে রাখতে হয়, তাঁর শিল্প-ধারণার ভিত গড়ে দেন শাহেদ সোহরাওয়ার্দির মতো আন্তর্জাতিক-খ্যাত শিল্পবোদ্ধা। শিল্প-পাঠ গ্রহণ করেন মুকুল দে-র কাছে। কিছু পরে আবদুর রহমান চুগতাই তাঁর পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেন। শিল্পকলার বইপুস্তকের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় তো নড়াইলের জমিদারবাড়ির সৌজন্যেআর তার নিবিড়-পাঠ সোহরাওয়ার্দি-ভবনে। ছাড়া-ছাড়াভাবে অন্য বইপুস্তক পড়ারও অভ্যাস ছিল। প্রিয় ছিলেন বিদ্যাসাগরঅবসরে বিদ্যাসাগরের রচনা সুলতানকে মুগ্ধ-আবিষ্ট করে রাখত। জলধর সেনের বই পড়েই তো অপরূপ নিসর্গনন্দিত মুসৌরি দেখার সাধ জেগেছিল তাঁরছবিতেও তার ছাপ পড়ে।

বাইশ.

সুলতানের মতো জন্ম-যাযাবরের কখনও ঘর হয় নাসংসার হয় না,  প্রেমও হয় না। তবে কখনও কখনও প্রেমের ছোঁয়া লাগে মনে। তার সূক্ষ্ম-পরিচয় এই উপন্যাসে মেলে। হাসনাত অসাধারণ নৈপুণ্যে ইঙ্গিতময়তায় সেই বিষয়টির উন্মোচন করেছেন।

সুলতানের জীবনে অনেক নারী এসেছেনকেউ কেউ প্রবল আকর্ষণ বোধ করেছেনতাঁকে অধিকারের শিথিল চেষ্টাও কারও কারও ছিল। তবে সুলতান কখনও নীরব থেকে, কখনও স্মিতহাস্যে, কখনও-বা যোগাযোগ না-রেখে সবসময়ই একটা রহস্য রচনা করেন। আবার তাঁর ঔদাসীন্য বা উন্মনা-ভাবকে কেউ কেউ বিরহবোধের চিহ্ন বলে কল্পনা করেন। সবই আবছায়া, সুলতান কখনও তাঁর মনের ভাব কারও কাছে স্পষ্ট বা প্রকাশ করেননিসুলতান তবে কি এক নীলকণ্ঠ শিল্পী-মানুষ!

সারাজীবনে বালকবেলায় একবারই প্রেম এসেছিল এক বালিকার আকর্ষণ- অনুরাগ-মান-অভিমানের মন-ছোঁয়া দাবি নিয়েতার সাক্ষী চিত্রানদী আর গাঙপাড়ের বটবৃক্ষ। ‘খেলার সাথি’ সেই বালিকার নামজয়া। সেই বয়সের লাল মিয়া জমিদারবাড়িতে ছবি-আঁকা শিখতে যায়, ফলে জয়ার সঙ্গে নিত্য-দেখার ও শিকার-খেলার বিঘ্ন ঘটেঅভিমানে আহত হয় জয়া, তার আনন্দভুবন কে-যেনো লুট করে নিয়ে যায়! একদিন বিষণ্ন জয়া এসে খবর দেয়, তারা চিরদিনের জন্যে চলে যাচ্ছে নড়াইল ছেড়েজয়ারা কলকাতা চলে যায়। যাওয়ার আগে একদিন বিদায় নিতে আসে জয়ালালকে দিয়ে যায় তার খরগোশ আর ইঁদুর, ওদের দেখে তাকে মনে পড়বে বলে। লাল কাতর কণ্ঠে বলে, এগুলো সে ছেড়ে দেবে, কেননা ওদের দেখে মন খারাপ হবে তার, জয়ার কথা ভেবে। কান্না চাপতে পারে না জয়া, ছুটে চলে যায়। কত স্মৃতিসেসব জলে-ভাসা ছবির মতো একে একে মুছে যাবে! বিচ্ছেদ-কাতর লাল বটের ঝুরি ধরে বসে থাকেচিরদিনের মতো একা হয়ে যায়। তাঁর নিঃসঙ্গতার বেদনা উঠে আসে লালের জবানিতে হাসনাতের লেখায় : ‘সেদিন বাড়ি ফেরার পথে নহবতখানায় সানাইয়ে বেহাগ বাজতে শুনলাম। সন্ধ্যায় ঐ সংগীত প্রায়ই বাজে। সংগীতের মূর্ছনায় কান্নায় গমক যেন মিশে আছে। খুব মন খারাপ করে দেয়। আমি বাড়ি না ফিরে চিত্রা নদীর পাড়ে চলে যাই। বুড়ো বটগাছটার নিচে চুপচাপ বসে থাকি। পাশের ঝুরিতে অবিকল মনে হয় কে যেন বসে আছে। চোখ মুছে ভালো করে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। পুরনো ঝুরি নিস্পন্দ ঝুলছে।’

জমিদারবাড়ির মেয়ে মীরা, আর্ট স্কুলের সহপাঠিনী বীণাপাণি দে, আম্বের নবাব-মহিষী, করাচির অসুখী নাগী ভাবি, লাহোরের জেদি-খেয়ালি-নিঃসন্তান- নিঃসঙ্গ নারী শামিমএঁরা সবাই কিছু না-কিছু বলতে চেয়েছেনকেউ ইঙ্গিতে, কেউ অভিমানে, কেউ কপট-রাগে, কেউবা অনুরাগে। সুলতান সেসব বুঝতে পারেন কী পারেন না, তা রহস্যের আড়ালেই থেকে যায়স্পষ্ট হয় না। মৌনতার ছদ্মবেশে সুলতান যে প্রচ্ছন্ন-রোম্যান্টিক সেই সত্য কে অস্বীকার করবে! ‘রাধাভাব’ প্রকাশের জন্যে তিনি নিজেকে নারীর ভূষণে সাজাতেন বটে, কিন্তু মোহন-বাঁশি হাতে নিয়ে তাঁর কৃষ্ণরূপও তো দর্শন করা গেছে!

এক বিকেলে করাচির ক্লিফটন বিচে সঙ্গীসহ সুলতানসূর্য ডুবছে আরবসাগরের দিগন্তরেখায় ‘ঢেউয়ের গর্জনে যেন অস্ফুট কণ্ঠস্বর’বাইরে শান্ত-স্থির-সৌম্য সুলতান, কিন্তু ভিতরে তাঁর তীব্র ঝড় বয়ে যাচ্ছে, চূর্ণ করে দিচ্ছে অনুভূতির সব কাঠামো। আকস্মিক আনমনা-উদাসী সুলতানের সঙ্গী এর কারণ জানতে চান‘যার চাওয়াই এত সামান্য, না পাওয়ার বেদনা থাকার কথা না তার।’ উদাস হয়ে যাওয়ার কারণ অন্যদিন বলবেন বলে জানান। এই উদাসী-ভাব যদি শুধুই দেশে-ফেরার কারণ হয়, তবে তা প্রকাশে বাধা কিসের! এর গূঢ় কারণ নিশ্চয়ই ছিলতা কি তাঁর আত্মরক্ষার জন্যে দূরত্ব-রচনা এবং মোহের বন্ধন থেকে মুক্তির প্রয়াস ?

তেইশ.

সুলতানের গানের প্রতি ঝোঁক সেই ছেলেবেলা থেকেই। গ্রামের বাউল-ফকির-বৈষ্ণব বা আরও নানা গ্রামীণ গান শুনে ‘কান’ পাকিয়েছেনসেইসঙ্গে যাত্রার অভিজ্ঞতাও লাভ করেন। গ্রামোফোন-হার্মোনিয়াম- এসরাজ-তানপুরা-বেহালার সঙ্গে পরিচয় হয় স্থানীয় জমিদারবাড়ি থেকে। বাঁশি হাতে-উঠেছিল যাত্রা বা লৌকিক গানের সূত্রে, নাকি রাখাল-পাখালের সঙ্গ-সান্নিধ্যে, তা-আর আজ কে বলবে! কখনও তো গুরু ধরে বা কোনো প্রতিষ্ঠানে গান শেখেননিসে-সামর্থ্য বা সুযোগই কোথায় পাবেন! তবে বিস্ময়ের কথা শাস্ত্রীয়সংগীত বা বিদেশি-সংগীত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান জন্মেছিলআর তবলা এতটাই ভালো শিখেছিলেন যে, ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ সাহেবের সঙ্গে সংগত করার হিম্মতও ছিল। তাঁর অনানুষ্ঠানিক দীক্ষা বাংলা মুলুকের বাইরেই হয়েছিল। আর এতটাই সমঝদার হয়ে উঠেছিলেন যে, করাচিতে তাঁর আস্তানা ক্যাসিনো গেস্টহাউসে নিয়মিত মজলিশ-মাইফেল বসতো। ব্যবস্থাপনা-আয়োজন-অভ্যর্থনা -আপ্যায়ন সবকিছুর দায়ই বহন করতেন সুলতান। সংগীতপিপাসুদের তীর্থে পরিণত হয় ক্যাসিনো গেস্টহাউসসারা করাচি শহরে এর নাম চাউর হয়ে গিয়েছিল।

বড়ে গোলাম আলী খাঁর খুব প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন সুলতান। মার্গসংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ ও কিছু-পরিমাণে অধিকারের জন্যে। এক মজলিশে নিভুল সময়ে ‘দাদ’ দেওয়ায় বড়ে গোলাম আলী এতটাই আনন্দিত ও অভিভূত হন যে, মঞ্চে তুলে নেন সুলতানকে, তাঁর বাঁ-পাশে বসান। সেই থেকে খাঁ সাহেবের মজলিশে উপস্থিত থাকলে বরাবর সুলতানকে বাঁ-পাশেই বসত হতো। সুলতানের তবলার ‘ঠেকা’র প্রশংসা করে বড়ে গোলাম আলী বড়ো তবলাবাদক হওয়ার প্রতিভা তাঁর আছে বলে মনে করতেন। ভারতবিখ্যাত ও সেইসঙ্গে বহির্বিশে^ও যিনি শাস্ত্রীয়সংগীতের জন্যে পরিচিত, সেই ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলীর এই স্বীকৃতি ও তাঁর একান্ত কাছের প্রিয় মানুষ হওয়া কম গর্বের ব্যাপার নয়!

মার্গসংগীতে সুলতানের সবচেয়ে প্রিয় শিল্পী ছিলেন ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁ সাহেব। আবদুল করিমের দুটি গানের রেকর্ড ছিল সুলতানের মহা-পছন্দের‘পিয়া বিনা না আউতে চাইন’ এবং ‘গোপাল মোরি করুণা’। তবে প্রথম গানটিই বেশি শুনতেনবারবার শুনতে চাইতেন। এমনও দিন গেছে যে, সারারাত ওই একই গান শুনেছেন‘প্রিয়তমা না এলে শান্তি আসবে না’।

শেষের দিকে নড়াইলের বাড়িতেও গান-শোনার যন্ত্র ছিল। কখনও কখনও বেজে ওঠে ওস্তাদ বিলায়েত হোসেন খাঁর বাদ্যসংগীত। সুলতান কান পেতে তন্ময় হয়ে শোনেন। আর স্বগতোক্তির মতো বলে ওঠেন : ‘কী আবেগমাখা দীর্ঘ আলাপ। মনে হয় যন্ত্র নয় একটা রক্তমাংসের মানুষের হৃদয়ের গভীর থেকে হাহাকার লুটিয়ে পড়ছে। খুব মন খারাপ করে, উদাস করে দেয় এই সব সুর।’

বাঁশি সুলতানের সংগীতানুরাগের আর-একটি অনুষঙ্গ। চমৎকার বাঁশি বাজাতেন। যেখানেই যেতেন বাঁশি থাকত তাঁর সঙ্গেই। রাধাভাবে নারীর পোশাকে পায়ে নূপুর দিয়ে নাচতে ভালোবাসতেন সুলতান। কিছুকাল তিনি কলকাতায় সেকালের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী সাধনা বোসের প্রতিষ্ঠান ‘নৃত্যলীলা’য় ভর্তি হয়ে নাচ শেখেন। নৃত্যকলা ও নৃত্যশাস্ত্র সম্পর্কে তাঁর ভালো ধারণা ছিল।

চব্বিশ.

সুলতানের ছবিতে স্বকীয়তা ও আলাদা বৈশিষ্ট্যের সন্ধান মেলে। বিষয় ও অংকন-পদ্ধতিতে অন্যদের সঙ্গে একটা পার্থক্য ও ভিন্নতা ছিল। অনেকক্ষেত্রে ছবি আঁকেন যে রং দিয়ে তা প্রাকৃতিকঅনেকসময় সে-রং নিজেই বানিয়ে নেন। একটু দীর্ঘ হবে, তবুও হাসনাতের কথা এখানে তুলে ধরলে সুলতানের ছবির বিষয় এবং তার দর্শন স্পষ্ট হয় : ‘সামান্য কয়েকটি রেখায় ব্রীড়াবনতা মেয়েটির মুখাবয়বের সৌন্দর্য বিশাল বিশাল ক্যানভাসে ইফেক্টের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। ঠিক একই ধরনের পরিপূর্ণতার আভাস পেনসিলে আঁকা মা ও কোলের শিশুর ছবি, ‘তৃপ্তিতে’। অন্ধকারে, প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষক স্বামী যখন এক হাতে কাস্তে অন্য হাতের দৃঢ়বন্ধনে কোলের শিশুসহ স্ত্রীকে এগিয়ে নিয়ে যায় সামনে, তখন তার এই ‘দায়িত্বকে’ কেবল বৈরী প্রকৃতির সংগ্রামেই সীমাবদ্ধ মনে হয় না, জীবনের সামগ্রিকতায় তার পদযাত্রা বিশিষ্টতা পেয়ে যায়। নগ্নদেহ বলিষ্ঠ কৃষকটির চোখের দৃষ্টিতে ভীতি নয়, অপরাজেয় মানুষের গভীর আত্মবিশ^াস এবং দুর্মর সংকল্পই বড় হয়ে দেখা দেয়।… সুলতান আদম ও ইভের প্রতীকে বেশ কয়েকটি ছবি এঁকেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘প্রথম বৃক্ষরোপণ’ ছবিটি যেখানে আদম দু’হাতে যত্ন করে ছোট একটি চারা গাছ রোপণ করছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ফুঁসে উঠেছে কাঁধ এবং দু’হাতের পেশি। এ যেন শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, দৃপ্ত অঙ্গীকার ভবিষ্যতের মানুষের কাছে। খুব যত্ন আর মমতার সঙ্গে হাত দিয়ে ধরা কচি চারার গাছ। ওপরে ইভের পাশে দেবশিশুর আদলে আঁকা নগ্ন নারীমূর্তির ভেতর জীবনের পূর্ণতা আশীর্বাদের মতো ঘিরে আছে আদমকে। এইখানে ইউরোপীয় শিল্পীদের কিছু প্রভাব চোখে পড়ে। তফাৎ এই দেবশিশুর স্থানে পূর্ণযৌবনা নারীকে চিত্রিত করেছেন সুলতান। দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার এবং বন্ধনহীনতার স্বাক্ষর রয়েছে ওখানে। ইভকে নিয়ে আঁকা আরও একটি স্মরণীয় ছবি শিশুদের স্তনের দুধ পান করানোর দৃশ্য, যা মাতৃত্বের চিরন্তন অভিব্যক্তি হয়েও জীবনের সুখ ও শান্তির নির্দেশিকা হিসেবে ব্যঞ্জনাধর্মী। বিশ^সংসারের ফলমূল, চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য- পেয় সকল সম্পদ এইভাবে ধরিত্রী মাতার কাছ থেকে ভাগ করে নিতে হবে তার অযুত সন্তানদের, যদি তারা সুখ শান্তিতে থাকতে চায়।’ লেখকের এই মূল্যায়ন-মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণযোগ্য : ‘তাঁর ক্ষমতার বলিষ্ঠতায়, দৃষ্টির ব্যাপকতায় তিনি অতিক্রম করে যান সমসাময়িক এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্বসূরিদের।’

পঁচিশ.

সুলতানের জীবনদর্শনের সঙ্গে তাঁর চিত্রভাবনার একটি গভীর মিল আছে। জীবন ও সমাজ নিয়ে তিনি যা ভেবেছেন, বিষয় হিসেবে তা তাঁর ছবিতে উঠে এসেছেফুটে উঠেছে। যৌথ ও সমবায়ী গ্রামীণ সমাজ এবং বিচ্ছিন্ন নাগরিক জীবন ও সমাজের যে দ্বন্দ্ব ও ফারাক সে-সম্পর্কে এই উপন্যাসে তাঁর মুখে এসেছে : ‘কেউ ধান ফলাবে, শস্য উৎপাদন করবে, কেউ কাপড় বুনবে, কেউ বিক্রি করবে দোকানে পাটে, এইভাবে ভাগাভাগি করে নেওয়া যায় জীবন। আধুনিক জীবনযাপনের উপকরণ জোগাড় করা ভালো, কিন্তু যেটুকু দরকার সেটুকুই।… সামান্যতেই জীবন সুন্দর। খেয়ে-পরে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যেই আনন্দ, জীবনের সার্থকতা। শহরে এসব নেই।’

আল্লামা মাশরেকি-প্রবর্তিত ‘খাকসারর্ আন্দোলনে’র সঙ্গে একসময় সুলতান যুক্ত হন। সুলতান তাঁর এক বন্ধুকে বলেছিলেন : ‘খাকসার মানে বিশ^াস, আদর্শ। আমল বা কর্মএই হলো জীবনের মূল কথা। সুকর্মের অধিকারী হতে হবে। তাহলেই জীবন সার্থক। বাঙালি জীবনদর্শনের সঙ্গে খুব মিল আছে।’ সুলতান অঙ্গীকার-মতো এই আন্দোলনকে নড়াইলে ছড়িয়ে দিতে পারেননি, তবে নিজে যথাসম্ভব ‘আমল বা কর্ম’ অনুসরণ করেছেনসুকর্মে উদ্বুদ্ধ হওয়ার মতি ছিল তাঁর।

সুলতানের জীবনে অধ্যাত্মবাদের একটি মরমি ছাপ পড়েছিল। তাঁর পোশাক-আচরণ-কথাবার্তায় তার পরিচয় মেলে। এ-বিষয়ে তাঁর ধারণা যে কত গভীর ছিল তা এই মন্তব্যে বেশ বোঝা যায় : ‘… অধ্যাত্মবাদে ঢোকার সিঁড়িই হলো ভাববাদ। প্রথমটা সুনির্দিষ্ট, অন্যটা কিছুটা অস্পষ্ট। সীমার মাঝে অসীম তুমি, এই যে কথা, এই তো অধ্যাত্মবাদ। বান্দা বন্দেগি করে বলেই সৃষ্টিকর্তার কাছে যেতে পারে। ঈশ^রকে পাওয়া মানে নিজের মধ্যে পবিত্রতা উপলব্ধি করা। আধ্যাত্মিকতার এই অর্থে গাছের মূলে পানি দেওয়াও উপাসনা হতে পারে। সব সময়ই আনুষ্ঠানিকতাকে বড় করে দেখলে চলে না। ভালো সংগীত, ছবি, সুন্দর আবেগ, উচ্ছ্বাস, ভালোবাসা, সততা, এই সবই সৃষ্টিকর্তাকে কাছে এনে দেয়।’

ছবি সম্পর্কে সুলতানের মতামতও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও মান্যতা পাওয়ার যোগ্য। ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট’ কেন তাঁকে টানে না, সে-ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন : ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট আমাকে আকর্ষণ করে না। কালার ডিস্টিবিউশন আর পিওর ফর্ম ছাড়া কী আছে ঐ সব ছবিতে ? দেশ-কাল-পাত্র নেই। ক্ল্যাসিক্যালধর্মী কিছু গুণ নেই। কোনো আইডেনটিটি খুঁজে পাওয়া যায় না। দেশ নেই, দেশের মানুষ নেই।’

বিমূর্ত চিত্রকলার পক্ষেও নিশ্চয় কিছু বলার সুযোগ আছেকিন্তু সুলতান বুঝতেন দেশজ প্রসঙ্গ ও পদ্ধতির চিত্রশিল্প। বিদেশের প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ নিয়ে কখনো কোনো ছবি আঁকেননি, মনের সাড়া মেলেনি বলে। ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ ও ‘নাড়ির টান’ অনুভব করেছেন দেশের বিষয় নিয়ে ছবি আঁকতে গিয়ে। তাঁর কাছে ‘দেশ’ মানে মূলত ‘গ্রাম’। তিনি অকপটে বলেছেন : ‘পেনসিল কিংবা ব্রাশ হাতে নিলেই গ্রামের ছবি এসে যায়। বিলে শালুক ফুটেছে, ফসল কাটছে মানুষ, দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ, দূরে গাছপালা, খড়ের ঘর, গরুর পাল এইসব ভাবতে-না-ভাবতেই ক্যানভাসে বা ড্রইং কাগজে কোথা থেকে বলে আসে টের পাই না।… কেউ যেন আমাকে দিয়ে আঁকিয়ে নিচ্ছে। সব শিল্পের ভেতরের কথা কিন্তু এই। অদৃশ্যে থেকে কোনো শক্তি যত কিছু করিয়ে নেয়। সেটা স্মৃতি হতে পারে, অভিজ্ঞতা হতে পারে, রক্তের টান হতে পারে, মাটির আকর্ষণ হতে পারে। একটা প্রবল শক্তি হয়ে তারা এইসব করায়। আমি যখন কোনো ছবি আঁকি তখন আমার সচেতন ইচ্ছা বা পরিকল্পনা শুধু নয়, অবচেতনের নির্দেশেই চলি। সব মানুষের চেতনার জগতে অবচেতনার ভূমিকা বড়। শিল্পীদের জন্য এই সত্য আরও প্রবল।’

উপন্যাসের কাহিনি যত এগোতে থাকে, বোদ্ধা পাঠকের কাছে তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে সুলতানের শিল্প-মনস্তত্ত্ব ও চিত্র-বিষয়ের তাৎপর্য। মনে হয়, সুলতানের ছবি যেন ‘মানুষের অভিযাত্রার একটি মিউরাল’, ‘একটি সচিত্র দলিল’, ‘মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম’ ও ‘তাদের অপরাজেয় সত্তার দৃপ্ত ঘোষণা’।

হাসনাতও এই উপাখ্যানের একটি চরিত্র যিনি সুলতানের মুখোমুখি হন, তাঁর কথা শোনেন আর জমা রাখেন স্মৃতির খোপে। হাসনাত ভাবেন : ‘ভবঘুরের জীবনেও টান থাকে শেকড়ের, অনিবার্য আর্কষণে ফিরে আসতে হয় তাঁকে উৎসে বারবার। নদীর শান্ত স্রোত, মাঠে ফসলের হাতছানি, উড়ন্ত এক ঝাঁক টিয়ার টিটিটি ডাক, কৃষকের ঘর্মাক্ত শরীর, শ্রমিকের পেশিতে বিদ্যুৎ চমকের মতো শক্তি, গরুর আয়ত চোখের মায়া, কৃষানির ধান শুকোনোর ছন্দ, রাখালের বাঁশিসব বুঝি তিনি শুনতে পান ধমনিতে রক্তের স্রোতে। এইখানে থেকে তিনি নিজেকে চিনতে পারেন, আবিষ্কার করেন পূর্বপরুষদের ঐতিহ্য। মাটি আর তামাটে মানুষের হাজার হাজার বছরের ছবি মিছিলের মতো চলে যায় সামনে দিয়ে চলমান ইতিহাস হয়ে। তাঁর ধমনিতে কি চঞ্চল স্রোতে বয়ে যায় পূর্বপুরুষের আদিম, অশান্ত রক্ত, যা তাঁকে নিয়ে আসে বিশুদ্ধ নিসর্গের কোলে সময় থমকে যাওয়া জীবনের দৈনন্দিনতায় ? কে জানে।’ এই সামগ্রিক বিবেচনাতেই সুলতানের একজন চিত্রবীক্ষক যথার্থই বলতে পারেন : ‘তাঁর ছবিতে বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে…’।

ছাব্বিশ.

হাসনাত আবদুল হাই শিল্পী সুলতানের জীবন নিয়ে উপাখ্যান রচনার এক দুরূহ উদ্্যোগ গ্রহণ করেন। নানা কারণে এই ধরনের প্রয়াস ক্বচিৎ সফল হয়ে থাকে। হাসনাত এই কাজের জন্যে সুলতান ও সুলতানকে যাঁরা জানতেন, তাঁদের সহায়তা  নেন। ঢাকা ও নড়াইলে সুলতানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সময় কাটেখুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নেন তাঁর জীবনের নানা পর্বের অজানা সব কথা। জীবনতথ্যের উপকরণ এই লেখক পর্যাপ্তই পেয়েছিলেনতাঁর উপাখ্যান- নির্মাণে সেই তথ্যের যোগ্য ব্যবহারে অবহেলাও করেননি।

আলাপে হাসনাত জানান, সহসাই তাঁকে বিদেশ চলে যেতে হবে, তাই দিন-পনেরোর মধ্যেই লেখাটা শেষ করতে হবে। শিল্পী মুর্তজা বশীর লেখক হাসনাত আবদুল হাইকে এমন একটি ‘গবেষণাধর্মী’ উপন্যাস লেখার জন্যে তাড়াহুড়া না-করে একটু সময় নিতে বলেন। বশীর আরভিং স্টোনের কয়েকটি উপন্যাসের উদাহরণ দেন হাসনাতকে, যেগুলো লিখতে যথেষ্ট সময় নিয়েছিলেন লেখক। হাসনাত জবাব দেন, তিনি স্টোনের মতো ‘বায়োগ্রাফিক্যাল’ উপন্যাস লিখছেন না। একটু যেন বেশি প্রত্যয়ের সঙ্গেই বলে ফেলেন : ‘উপন্যাসের গতানুগতিক ফর্ম দেখে বিচার করলে একে উপন্যাস বলা যাবে না। কিন্তু ফর্ম ভাঙতে পারব না, একথা কেউ বলেনি। এটা উপন্যাস লেখার উপন্যাস।’ হয়তো ব্যাখ্যাটা যৌক্তিক বা মনঃপূত হলো না দেখে বশীরকে ভ্রু কুঁচকাতে হয়। উপন্যাসটা শেষ হলে আখেরে দেখা গেলো সত্যি সত্যিই হাসনাত অন্য-কিছু নির্মাণ করেছেন, যার সঙ্গে গতানুগতিক বা ঐতিহ্যিক রচনা-নির্মাণকৌশলের বিশেষ মিল হয় না। একে না-উপন্যাস, না-জীবনী, আবার না-জীবনী-উপন্যাস, পুরোপুরি কোনো ছাঁচেই ফেলা যায় নাএকে এসবের সমন্বয়ে এক সংকর-সৃষ্টি বলতে হয়। তবে ফর্মের এই অভিনবত্ব, কাহিনি-বিন্যাসের নৈপুণ্য, বিষয়-উপস্থাপনের বৈশিষ্ট্য সুলতান নামের এই রচনাটিকে স্বাতন্ত্র্যের গৌরব দিয়েছে। আর-একটি বিষয়ের উল্লেখ এখানে আবশ্যকতা-হলো এর গদ্যশৈলী। অনেক গল্প-উপন্যাসই পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে না ভাষার কারণে। সেদিক দিয়ে হাসনাতের গদ্যের আলাদা স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য পাঠককে স্বস্তি ও আনন্দ দেয়বর্ণনা ও কথোপকথন উভয় ক্ষেত্রেই এ-কথা প্রযোজ্য। নিসর্গ-বর্ণনায় এ-গদ্য কাব্যময়তার সুরভি ছড়ায়। ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁর সঙ্গে সুলতানের শেষ-সাক্ষাতের মর্মস্পর্শী দৃশ্য, ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁর গান-শোনার সময় সুলতানের আত্মসমাহিত রূপ, আর্ট কলেজের সতীর্থা বীণাপাণির উচ্ছলতা-কটাক্ষের ছবি, করাচির নাগী ভাবির সঙ্গে খুনসুটির বিবরণ, ক্লিফটন বিচে প্রকৃতি ও মানবমনের টানাপড়েনের উল্লেখহাসনাতের গদ্য যে পরিবেশ-ভেদে কত বৈচিত্র্যমণ্ডিত ও স্বাদুসে-উদাহরণ এই উপাখ্যানে দুর্লভ নয়। হাসনাত সচেতন গদ্যশিল্পীশব্দ-চয়ন ও বাক্য-নির্মাণে তিনি সজাগ ও কুশলীআঞ্চলিক কথ্যবুলি ও উর্দুভাষার লাগসই প্রয়োগ পরিবেশ ও চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে সহায়ক হয়।

সাতাশ.

এই উপন্যাসে কিছু ত্রুটি-অসংগতি চোখে পড়ে, তার উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন হয়তো নয়। প্রথমেই শুরু করি নামের বানান দিয়েসুলতান তাঁর পদবির বানান লিখতেন ‘সেখ’কিন্তু এই বইয়ের সবখানেই তা হয়েছে ‘শেখ’। বানান-ভুল দু’একটা চোখে পড়ে, যেমন‘নিঃসন্দিহান’ (হবে ‘নিঃসন্দেহ’ বা ‘নিঃসন্দিগ্ধ’)। দুর্বল বাক্যের নমুনা‘ছাপার মান খুবই নিম্ন মানের’শেষ শব্দটি না-বসালেই বাক্যটি তেজি হয়ে উঠত। ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁর যে-গানটিসুলতানকে গভীর ভাবতন্ময়তায় আবিষ্ট করতো, তার সূচনা-পঙ্ক্তিটি বইয়ে সব জায়গায় একই রকম উদ্্ধৃত হয়নি। সত্যজিৎ রায় তাঁর শিল্পগুরু উত্তরকালে দৃষ্টিহারা বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে যে-তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন তার নাম ‘ঞযব ওহহবৎ ঊুব’, লেখক-কথিত ‘ইনার ভিশন’ মোটেই নয়। এই উপাখ্যানে সাল-তারিখের ত্রুটি ও অসংগতি কম নয়সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যভ্রান্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের তারিখ নিয়ে২৬ মার্চ, এই বইয়ের বেশ কয়েক জায়গায় সেই তারিখের উল্লেখ মেলে ২৫ মার্চ। আবার একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সাল-তারিখ পাঠককে বিভ্রান্ত করে। সুলতানই হয়তো স্মৃতিভ্রমের কারণে লেখকের কাছে সাল-তারিখের এমন হেরফের করেছেনকিন্তু এই অসংগতি সম্পর্কে সতর্ক-সচেতন থাকা ও তা যাচাইয়ের দায় লেখকের ওপরেই বর্তায়। কিছু অনাবশ্যক-অপ্রাসঙ্গিক- গুরুত্বহীন বিবরণও লেখকের প্রশ্রয় লাভ করেছে, যা কাহিনির গতি ব্যাহত করে, পাঠকের মনোযোগও ছিন্ন হয়। এই বইয়ের প্রকাশক নামী প্রকাশনা-সংস্থা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডকিন্তু বইয়ের কিছু মুদ্রণ-প্রমাদ পাঠকের জন্যে পীড়াদায়ক।

আটাশ.

এই উপাখ্যানের সূচনায়, শিল্পীর মগ্নচৈতন্যে তাঁর বিশাল ক্যানভাসের চরিত্রেরা স্থাণু-স্থবির অবস্থান থেকে তাদের নিজের কাহিনি নিয়ে একে একে বেরিয়ে আসেমুখর, গতিশীল ও জিজ্ঞাসু হয়ে। তারা সামনের দিকে এগিয়ে যায়আশ্রয়, আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের মানসে। এই আখ্যান আবহমানকালেরযুদ্ধ, সংগ্রাম, ধ্বংসআর তার ভেতর দিয়েই উত্থাননতুন জীবনের কলরব, পরাভব না-মেনে।

এই কাহিনির শেষপর্বে দেখা যায়, সূচনায় বর্ণিত ছবিটি (‘ট্রায়ামফ অ্যাইমফ অ্যান্ড ট্রাজেডি’) একটি প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত হয়। তারপর ‘অবাক বিস্ময়ে’ সেই ছবি দেখতে থাকে‘রিকশাঅলা, ফেরিঅলা এই ধরনের লোক বেশিরভাগ।… তাদের দেখাদেখি… আরও লোক এল। আরও ফেরিঅলা। শ্রমিক এল ঠেলাগাড়ি রাস্তায় রেখে। প্রায় ন্যাংটো টোকাইরা এল।’ ভিড় ক্রমে বাড়তে থাকে। অভিভূত সুলতানের আদম সুরতে এক অপার্থিব আনন্দের ছটা ফুটে ওঠে।

উপন্যাসের সূচনা-শীর্ষে ভ্যান গগ সম্পর্কে অ্যালবার্ট অ্যরিয়ার (Albert Aurrier)-এর যে-উক্তি উদ্ধৃত, সুলতান প্রসঙ্গে তার চেয়ে যোগ্য সাদৃশ্য-মন্তব্য আর কী হতে পারে!

সুলতানের জীবনের বিচিত্র কলাজ এই উপাখ্যান। তাঁর ছবি যেমন বহমান কালকে ধারণ করে, তেমনি সুলতানের মহাজীবন নিয়ে লেখা এই উপাখ্যানও সমাপ্ত হতে জানে নাএই সুলতান-কাহিনি, তাই এক ভিন্নার্থে, ‘তামাম্ ন্ শুদ’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares