আলোচনা : উপন্যাস―হাসনাত আবদুল হাই : জটিল জীবন ও সময়ের আখ্যান : বিশ্বজিৎ চৌধুরী

আমাদের চেনা জগৎ, চেনা ছন্দ ও তালে গড়িয়ে চলা প্রতিদিনের জীবন। কিন্তু এর আলো-অন্ধকারকে কতটা আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারি আমরা? চারপাশের মানুষগুলোর মুখও তো খুব চেনা, এই মানুষের মানচিত্রের ভেতর থেকে মন ও মনস্তত্ত্বের সন্ধান কি কখনও  করেছি ?

এসব কথা মনে আসে, নানা প্রশ্নে নানা বর্ণের বুদবুদ তৈরি হয় ক্ষীণাঙ্গী একটি উপন্যাস পড়ে। হাসনাত আবদুল হাইয়ের সাইবার ক্যাফে উপন্যাসটি আমাদের জটিল জীবন ও সময়ের আখ্যান। কিন্তু নির্মোহ লেখক এই জটিলতাকে আপাত সরল ভাষা ও বর্ণনায় তুলে ধরেন পাঠকের সামনে, পাঠক নিজের জীবনের সঙ্গেও আরেকবার বোঝাপড়া করে নেওয়ার প্ররোচনা পায়।

রাজধানী ঢাকার উচ্চবিত্ত জীবন আছে এই আখ্যানে, তার বিত্ত-বৈভব ও প্রাচুর্যসমেতই আছে। কিন্তু আলোর প্রলেপে মোড়া অন্ধকার, অর্জন ও সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ও গ্লানিকে পাশ কাটিয়ে যাননি লেখক। ক্ষমতাধর মানুষের অসহায়ত্ব, সাফল্য ও ব্যর্থতায় একাকার জীবনকে প্রত্যক্ষ করি আমরা। তেমনই আছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জীবন, যে জীবন দোয়েলের ফড়িঙের। সেখানেও আছে আশা ও আনন্দ, উচ্চাকাক্সক্ষা, আশা-ভঙ্গের বেদনা, সর্বোপরি ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। এই সব জীবন বাস্তবতা উঠে আসে সাইবার ক্যাফে উপন্যাসে।

আবদুল জলিল বিত্তবান ব্যক্তি। গুলশান দুই নম্বর সার্কেলের কাছে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন তিনি। ঢাকা শহর গত কয়েক দশক ধরে যেমনটি হচ্ছে, বড় জমির ওপর পুরোনো আদলের বাড়িগুলো ভেঙে ঝাঁ চকচকে বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে বিস্ময়বোধক চিহ্নের মতো, এক্ষেত্রেও সে রকমই। দেড় বিঘা জমির ওপর দোতলা বাড়ি ভেঙে তৈরি হচ্ছে বিশ তলা ভবন, যেখানে থাকবে নামিদামি পণ্যসামগ্রীর দোকান, ব্যাংক-বীমার কার্যালয়, সর্বোপরি বিশতলার ওপর রিভলবিং রেস্তোরাঁ।

 কেন হচ্ছে এই বিরাট কর্মযজ্ঞ ? কাহিনি সূত্রে জানতে পারি, ‘প্রথমে ভাঙতে রাজি হননি তিনি। ছেলে-মেয়ে বড় হয়ে যা করার করবে। তিনি তাঁর তৈরি বাড়িতেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আত্মীয়-স্বজন পরামর্শ দিয়েছে অন্য কথা বলে। তিনি জীবিত অবস্থায় কিছু করে না গেলে বাড়ি এবং জায়গাটার যে কী অবস্থা হবে তার ঠিক নেই। তাঁর টাকার দরকার ছিল না। গার্মেন্টসহ যেসব ব্যবসা নিয়ে আছেন, তা থেকেই যথেষ্ট আয় হচ্ছে। তা ছাড়া ধানমন্ডিতে বাবার কাছ থেকে পাওয়া দশ কাঠা জমির ওপর বাড়িটাও রয়েছে, যার দাম গুলশানের জমির চেয়ে কোনো অংশে কম না। বরং বেশিই হবে।’

এই বিবরণ থেকে জলিল সাহেবের আর্থ-সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। জলিল সাহেবের বয়স পঞ্চান্ন বা ততোধিক বলে ধারণা করে নিতে পারি। মোটামুটি অভিযোগহীন তাঁর দাম্পত্যজীবন। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে নিয়ে সংসারটাও গোছানো ও সুখময় হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। জলিল সাহেবরা তাঁদের বিত্তের জোরে ছেলে-মেয়েকে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। ফলে ছেলেকে ‘এ’ লেবেলের পর পড়াশোনার জন্য আমেরিকায় উন্নত বিশ্বের অন্য কোনো দেশে পাঠাতে হয়, তা সে মানের দিক থেকে খুব একটা আহামরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না-ও যদি হয়। জলিল সাহেবও পাঠিয়েছেন। এখানেই তাঁর আশাভঙ্গের সূত্রপাত। ছেলে ঘন ঘন টাকা চেয়ে পাঠায়, মা-বাবার সঙ্গে ফোনে এমন ভাষায় কথা বলে, যা আমাদের রীতি-ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মোটের ওপর ছেলেটি বখে যাচ্ছে এটা বোঝা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ছেলের আবদার মেটাতে হয় তাঁকে। মেয়ের উগ্র চাল-চলনও মেনে নিতে হয়। এখানেই সম্ভবত এই জলিল সাহেবের এবং আমাদের সমাজের আরও জলিল সাহেবদের ট্র্যাজেডি। উচ্চবিত্তের এই জীবনকে চেনেন লেখক, তাই এই জীবনের চিত্রায়নকে অনায়াসে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারেন তিনি।

এই উচ্চবিত্ত জীবনের সমান্তরালে সুলতানা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে জলিল সাহেবের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার সূত্রে একটি মধ্যবিত্ত বা বলা চলে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে পাঠকের। সুলতানা সপ্রতিভ। সুজিত নামের একটি ছেলের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক। এই ছেলেটিই তার মধ্যে উচ্চাকাক্সক্ষার বীজ রুয়ে দেয়। তারই পরামর্শে একটি ‘সাইবার ক্যাফে’তে বিনিয়োগের জন্য জলিল সাহেবের কাছে টাকা ধার চেয়ে বসে সুলতানা। টাকার অভাব নেই আবদুল জলিলের, সুলতানার প্রতি তাঁর এক ধরনের স্নেহও জমেছে ততদিনে। তা সত্ত্বেও ঝানু ব্যবসায়ী জলিল সাহেব পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। অনেক হিসাব-নিকাশ করে সুলতানাকে টাকা ধার দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সুলতানার স্বপ্ন ভেঙে যায় প্রেমিকের প্রতারণায়।

এদিকে আমেরিকায় ড্রাগ-অ্যাডিক্ট হয়ে পড়ে জলিল সাহেবের ছেলে জিমি। মাদক রাখার দায়ে জেলও খাটতে হয়েছে তাকে। অবশেষে তাকে নিজে গিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনেন জলিল সাহেব। দেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেন। কিন্তু সাধারণ চিকিৎসার কারণে নয়, আশ্চর্যজনকভাবে সুলতানার সান্নিধ্য বা সাহচর্যে সুস্থ হয়ে ওঠে জিমি। ঠিক এ রকমটা আদৌ ঘটতে পারে কিনা পাঠকের এই সংশয়ের উত্তর দিতেই হয়তো লেখক চিকিৎসককে দিয়ে বলিয়ে নেন। ‘এই ট্রিটমেন্টে আমরা নতুন এক থেরাপির সন্ধান পেলাম। এমপ্যাথি।’ চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ রকম সম্ভব কিনা এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু ফিকশনে এটা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। এখানে লেখকের শক্তিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।

সুলতানার সঙ্গে জিমির একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা দুজনে মিলে জলিল সাহেবের বহুতল ভবনেই একটি সাইবার ক্যাফে খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ সুলতানার স্বপ্ন পূরণে এবার পাশে দাঁড়িয়েছে জিমি। এই সম্পর্ক আরও নিকটতর হতে পারে এমন একটি সম্ভাবনার মধ্যে আবার সুজিতকে ফিরিয়ে এনে লেখক শেষ পর্যন্ত দোলাচলের মধ্যে ফেলে দেন পাঠককে।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের ভাষা ঝরঝরে। কিন্তু দ্রুতগতির বর্ণনা চারপাশে তাকিয়ে দেখার সুযোগ যেন নষ্ট করেছে। ‘একটানে পড়ে ফেলা যায়’এই বহুল ব্যবহৃত বাক্যটি প্রশংসাসূচক কি না এ বিষয়ে সংশয়ের মধ্যে থেকেও আমরা বলতে পারি, এই আখ্যানটিকে দ্রুত পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে প্রতিটি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে যেমন বঞ্চিত হয় পাঠক, তেমনি কাহিনির সমান্তরালে ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিকতা, ঢাকা শহরের সমকালীন সমাজ-রাজনীতির চিত্র থেকে যায় অধরা। এমনকি প্রকৃতিও প্রায় অনুপস্থিত এ আখ্যানে। এসব ব্যাপারে আরও ডিটেলিংয়ের প্রত্যাশা ছিল হাসনাত আবদুল হাইয়ের মতো বরেণ্য একজন কথাশিল্পীর কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares