আলোচনা : উপন্যাস―হাসনাত আবদুল হাই : সোয়ালো : পাখির মোড়কে মানবজীবন পাঠ : ড. নিলুফা আক্তার

নতুন প্রজন্মের লেখকের সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে জানার আগ্রহ ও অভিপ্রায়ে গত বইমেলা থেকে তরুণ কবি-লেখকদের বেশ কিছু গ্রন্থ ক্রয় করেছিলাম এবং সঙ্গে একজন প্রথিতযশা প্রবীণ লেখকের ক্ষুদ্র কলেবরের একটি উপন্যাস। যাঁর গ্রন্থপাঠের মুগ্ধতা নিয়ে আমার বেড়ে ওঠা। স্কুল জীবনে বিশেষ করে তাঁর ভ্রমণ সাহিত্যের তরী বেয়ে পাড়ি দিতাম সাত সমুদ্দর তের নদীর ওপারের চিত্র বিচিত্র দেশ-বিদেশ। লেখকের সৃষ্টির শব্দশিল্পের সারথী হয়ে জীবনানন্দ দাশের বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতের মতো কল্পনায় আমিও ঘুরে বেড়াতাম তাঁর অভিজ্ঞতার পৃথিবীর নানা ভূখণ্ড। তিনি হলেন বাংলা সাহিত্যের বহুমাত্রিক শিল্প সৃষ্টির ও আঙ্গিকের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষায় নিবিষ্ট কারিগর বরেণ্য কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই। আর গ্রন্থটির নাম সোয়ালো।

বইমেলার বিচিত্র পাঠক আর নানাবিধ গ্রন্থের ভিড়ে একাকী অনেকটা জনাকীর্ণ কোলাহলের মধ্যে নিঃসঙ্গ পড়ে থাকা নাতিদীর্ঘ এই উপন্যাসটি আমাকে আকৃষ্ট করেছিল সোয়ালো নামটার কারণে। হাতে নিয়ে দেখলাম প্রকাশক ইউ.পি.এল, প্রকাশকাল ১৯৯৬ সাল। প্রচ্ছদে নজর কাড়ার মতো কিছু পেলাম না। অথচ চোখের সামনে ভেসে উঠল চকচকে উজ্জ্বল নীল আর সাদা রঙের দারুণ মনোহরিণী চঞ্চলমতী পাখি সোয়ালো। আমাদের দেশে পরিযায়ী এই পাখিকে আবাবিল, জলঠোকা নামেও ডাকে। তারপর ঘর-গেরস্থালি আর কর্মক্ষেত্রের নানাবিধ ব্যস্ততায় সেই উত্তেজনায় ভাটা পড়ল। অনেকটা যেন বনফুলের ‘পাঠকের মৃত্যু’র মতন। আমার তাৎক্ষণিক অনুভূতি বোঝানোর জন্য ঐ গল্পের পাঠকের উত্তেজনাটুকুই ধার করলাম। বইটা ব্যক্তিগত পাঠাগারে লেখকের অন্যান্য গ্রন্থের পাশে সযত্নে ঠাঁই নিল।

এরপর এলো করোনার ক্রান্তিকাল। আততায়ী ঘাতকের ভয়ে বেশ কিছুদিন এলোমেলো মানসিক অস্থিরতায় পার হয়ে গেল। অশরীরী ভয় কেটে গেলে তরুণ লেখকদের বই পড়া শুরু করলাম। অগোছাল পাঠের মধ্যেই জানলাম জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকা শব্দঘর বাংলাদেশের খ্যাতিমান কথাশিল্পী, বর্ষীয়ান চৌকস ব্যক্তিত্ব হাসনাত আবদুল হাইকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা করছে। আমার ওপর সেই সংখ্যায় লেখার দায়িত্ব পড়ল। মনে মনে প্রথমেই ধন্যবাদ জানালাম শব্দঘরকে। কারণ জীবদ্দশায় গুণীর সম্মান জানানো আমাদের সংস্কৃতিতে এখনও অপ্রতুল অথচ শব্দঘর সেই শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর জন্যই লেখা আহ্বান করছে। ভালো লাগলো এই ভেবে যে, এত হতাশ হবার কিছু নেই, কেউ না কেউ ঠিকই এগিয়ে আসেন যেমন শব্দঘর।

বাংলা সাহিত্যের নানা শাখায় অবাধ, সহজ পারঙ্গমতা নিয়ে লেখক হাসনাত আবদুল হাই-এর বিচরণ। ঘটনাবহুল জীবনের আশিটির বেশি বসন্ত অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়া প্রাজ্ঞ এই লেখকের সৃষ্টির সংখ্যা শত-এর দোরগোড়ায়। ভ্রমণ সাহিত্য, নিরেট উপন্যাস, জীবনীভিত্তিক উপন্যাস, শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ অর্থাৎ যেখানেই তিনি কলম চালিয়েছেন সেখানেই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও মা-বাবার স্বপ্নপূরণকল্পে তিনি সি.এস.পি অফিসার হন। আশি বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রথম আলো পত্রিকার ‘অন্য আলো’র সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন―‘আমি তো লেখকই হতে চেয়েছি শেষ অব্দি’ (প্রথম আলো; অন্য আলো; ১৩ জুলাই ২০১৭) তাঁর এই আকাক্সক্ষার জীয়নকাঠি সাহিত্য সাধনায় এখনও তিনি নিবিষ্ট নিমগ্ন। বহিরাবরণে তিনি রাশভারী ব্যক্তিত্বের সি.এস.পি কর্মকর্তা কিন্তু অন্তরঙ্গে একজন সরস লেখক। পাঠক, আমি বলব, তিনি যতটা না সরকারি কর্মকর্তা তার চেয়ে অনেক বেশি একজন সৃষ্টিশীল মানুষ, একজন আপাদমস্তক লেখক। তবে জাগতিক কর্ম ও সৃষ্টিধর্ম উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সততার প্রশ্নে কোনো আপস করেন নি। তাই তো তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্র এত ঋদ্ধ-সিদ্ধ এত উর্বর, এত বিপুল বিচিত্র ফলন্ত ফসলে ভরপুর।

ভাষার হৃদয়ঙ্গমক্ষম সারল্য সর্বস্তরের পাঠকের জন্য অক্ষত রেখে কাহিনির বসতভিটায় জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার নির্যাস ছড়িয়ে পাঠকের ভাবনা ও কল্পনাকে উজ্জীবিত করে, তার চৈতন্যে আলোড়ন তোলার মহৎ কঠিন প্রয়াস হাসনাত আবদুল হাই-এর লেখনীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর নানা দেশের শিক্ষানবিশ পরবর্তী চাকরিসূত্রে অবস্থানকালীন উত্তিষ্ঠমান জ্ঞানের সুষম বণ্টন তাঁর সাহিত্যকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। হাসনাত আবদুল হাই-এর ভ্রমণ সাহিত্য পাঠ করে একজন পাঠক যেমন বিশ্বভ্রামণিক হতে পারেন, ঠিক তেমনি শিল্পের প্রগাঢ় প্রেমিক এই লেখকের শিল্প ও শিল্পীর জীবনকেন্দ্রিক গ্রন্থ পাঠে এক অদ্ভুত পৃথিবীর আস্বাদন নিতে পারেন। এই দুইয়ের পাশাপাশি মৌলিক উপন্যাসের উর্বর জমিনের বিচিত্র শস্যভাণ্ডার পাঠককে আটপৌরে জীবনের পাশাপাশি বৃহত্তর জীবনবোধের নানা গূঢ়তত্ত্ব পাঠে মোহিত করে রাখে। সহজ করে সহজ কথাটি বলা সবচেয়ে অসহজ কাজ। এই কঠিন কাজটিই তিনি অনায়াসে করেছেন তাঁর সৃষ্টির চারণভূমিতে। তাই তো তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে সব শ্রেণির পাঠকই অবলীলায় নৈকট্য অনুভব করেন। সম্ভবত এই বৈশিষ্ট্যগুলো লেখকের পাঠক প্রিয়তার মূল কারণ। পাঠকের এই ভালোবাসার কারণেই জীবনের ভারে ন্যূব্জ না হয়ে বরং অসীম ক্ষমায়, সাহসে স্বতঃস্ফূর্ত স্ফূর্তি নিয়ে তিনি এখনও লিখে যাচ্ছেন ক্লান্তিহীন। স্কুল জীবন থেকেই হাসনাত আবদুল হাই-এর লেখার ভক্ত আমি। আমার প্রিয় লেখকদের অন্যতম তিনি। তাঁকে নিয়ে লিখব ভাবতেই ভালো লাগছিল।

স্রষ্টা আর সৃষ্টির কথা যখন ভাবছি তখন প্রথমেই মনে পড়ল তাঁর অসাধারণ জীবন সুধা আহরিত উপন্যাস নভেরার কথা। কিছুক্ষণের জন্য সেই গ্রন্থপাঠের সময়টাতে ফিরে গেলাম। ‘নভেরা’ বাংলাদেশের প্রথম নারী ভাষ্কর্য শিল্পী, উফ্ কী ভীষণ অদ্ভুত এক চরিত্র! তার চরিত্রের অস্থিরচিত্ততা পাঠক আমাকেও উদ্বায়ী করে তুলেছিল। ভাষার কী অসাধারণ গতি সে দ্রুততা নভেরা’র চরিত্রের অশান্ত চিত্তের আনপ্রেডিকটেবল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে লীন হয়ে কাহিনির মধ্যেও সংক্রমিত হয়ে গেছে, ভাষার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাগুলোও যেন ছুটছে। হাসনাত আবদুল হাই-এর বর্ণনার দুর্দান্ত কৌশলে এখন মনে হয় চঞ্চলমতী বোহেমিয়ান নোভেরার চরিত্রের অশান্ত গতির ভেতর দিয়ে যেন পাঠক ও লেখক দু’পক্ষই সমানতালে ধরাশায়ী হয়েছেন। যাই হোক, নোভেরার ভাবনা থেকে দৃষ্টি ফেরালে দেখি আমার হাতে রূপসী চঞ্চলা পাখি সোয়ালো এর নামের সেই উপন্যাসটি। যেটি আমি কিনেছিলাম অনেক কৌতূহল আর উত্তেজনা নিয়ে সোয়ালো পাখির মোড়কে লেখক কি লিখেছেন জানার সেই প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে। তারপর জীবনের চাপে স্তিমিত হয়ে যায় সেই উন্মাদনা। হেমন্তের চকচকে রঙের উত্তাপহীন রোদ-সকালে সোয়ালো পাঠ শুরু হলো। মলাটের ডানে-বায়ের চিরকুট পড়া থেকে বিরত থাকলাম। এ আমার বরাবরের অভ্যাস। কারণ আমার মুক্ত চিন্তাকে কোনো ছকে ফেলতে চাই না। কাকতালীয়ভাবে দেখলাম উপন্যাসটির প্রথম শব্দটাই হচ্ছে ‘হেমন্ত’। মৃদু হাসির চমকিত অনুভব নিয়ে সামনে চোখ রাখলাম, শুরুটা হচ্ছে ‘হেমন্ত নয় তবু উত্তর থেকে যে বাতাস আসে, সেখানে শীতের আমেজ। তাদের শরীর তাই কেঁপে কেঁপে ওঠে।’ (আবদুল হাই, হাসনাত; ইউপিএল; ১৯৯৬; পৃ: ০১) এমন একটি নিরাভরণ বাক্য দিয়েই প্রারম্ভ। অথচ তৃতীয় লাইন-ই পাঠককে সামনে এগুনোর আগ্রহ তৈরি করে দেয়। যখন পাঠক ‘সোয়ালো’ নামক পাখির সঙ্গে পরিচিত হয়, পরিচিত হয় তাদের ট্রেইনারের সঙ্গে। তার গলা বাজখাই, মেজাজ রাশভারী, শরীর নিখুঁত অটুট। পাঠক দ্বন্দ্বে পড়ে যান, কে এই ট্রেইনার ? কে সে ? মানুষ নাকি পাখি ? কারণ এই বর্ণনা মনুষ্য প্রাণির বেলায়ই বেশি জুতসই। কিন্তু পাখির ডাক আর ডানা মেলার দৃশ্যে পাঠক নিশ্চিত হন যে, লেখক পাখির গল্প বলছেন-‘পি পি পি ই ই ই ই ই ই ই পি ই ই ই…

‘ট্রেইনার সোয়ালো শিক্ষানবিশদের শেষ নির্দেশ দেন। তার পাখা দু’দিকে মেলে দিয়েছেন তিনি।’ (তদেব) এভাবে আটষট্টি পৃষ্ঠা পর্যন্ত লেখক পাখিদের জীবন বৃত্তান্ত বয়ান করেন। মনুষ্যজগতের জীবনের আদলে পাখির প্রেম, পরিণয়, ঘর বসতির বর্ণনার ডানা ঝাপটানো ছাড়া কোথাও মানুষের পদশব্দ শোনা যায় না। সেখানে দেখানো হয়, সামনে বরফ সময় সমাগত তাই পক্ষীকুলকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ সে পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য তারা ট্রেনিং নিচ্ছে। তত্রাচ পাখিদের জীবনযাপনের বর্ণনায় পাঠক বার বার নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পায় কিন্তু উপরোল্লিখিত পৃষ্ঠা অর্থাৎ বৃহৎ একটা অংশজুড়ে কোথাও মানুষের ’রা -টি পর্যন্ত নেই। অথচ কী ভীষণ স্পষ্ট করে লেখক পাখিদের জীবনের ঠিক মধ্যখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন মানুষের অস্তিত্বকে! এখানেই লেখকের পারঙ্গমতা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। পাখিদের রূপকে মানব সমাজের জীবনাচরণের প্রতিই তিনি বার বার ইঙ্গিত করেছেন। লেখকের অসাধারণ উপস্থাপন কৌশলের ফলে পাঠক মূলত সমান্তরালভাবে পাখি ও মানুষের সমাজ-জীবন পাঠ করে। রূপকের নেপথ্যে ‘আর্ট ফর লাইফ সেইক’ এর মন্ত্রণায় লেখক তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যটুকুও পরিষ্কার করে দেন। একশত পাঁচ পৃষ্ঠার সাধারণ অবয়বের অন্তরালে পাঠক মানুষ এবং পাখি উভয়ের জীবনসহ বৃহত্তর পৃথিবীর ইতিহাসে ঋদ্ধ হয়ে ওঠেন। লেখকের বিষয়-ভাবনা, কাহিনি- বিন্যাসের অনন্যতায় উপন্যাসটি ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে যায়।

পাখি আর মানুষের জীবনের রূপক জুড়তে গিয়ে লেখক মানব ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন। আমরা পৃথিবীর জন্ম সম্পর্কেও বৈজ্ঞানিক ধারণা পাই। আরও জানতে পারি, মানবেরও আগে এ পৃথিবীতে পাখিদের আগমন তারও আগে সরীসৃপ জাতীয় একটি প্রাণীর। উপন্যাসটি পাঠকালীন বার বার বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের স্থাবর আর ডানা উপন্যাসের কথা মনে পড়ছিল। স্থাবর উপন্যাসটিতে বনফুল মানব ইতিহাসের সূচনা থেকে উপন্যাসটি রচনাকাল পর্যন্ত একটি বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। অন্যদিকে পক্ষী বিশারদ, পাখিপ্রেমিক বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত লেখক বনফুলের মুক্ত আকাশে পাখিদের স্বাধীন সঞ্চরণ দেখে মনে হয়েছিল, মানুষের এই বাস্তব সংসারও অনেকটা আকাশের মতন। বিভিন্ন ধরনের মানুষ পাখির মতোই এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তিনটি বৃহৎ খণ্ডে বিভক্ত উপন্যাস দুটোর বিচিত্র নির্যাস সোয়ালো উপন্যাসে অনুভূত হয়। কিন্তু সোয়ালো উপন্যাসে লেখক আরও একধাপ এগিয়ে গেছেন। তিনি রূপকের মাধ্যমে দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার, মানুষের হিংস্রতা শঠতা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের কারণে শ্রেষ্ঠ জাতি মানুষ সম্পর্কে পাখিদের করুণাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি যার জন্য প্রকৃতপক্ষে মানুষই দায়ী, পাখি ও মানুষের ঘর-সংসারের সমান্তরাল পটভূমি, অনুভূতির প্রকাশ সর্বোপরি সমাজতান্ত্রিক পৃথিবী নির্মাণ ইত্যাদি বহুরৈখিক চিত্র অঙ্কন করেছেন। হাসনাত আবদুল হাই বৈজ্ঞানিক কৌতূহল ও জীবনের গূঢ় জটিল রহস্যের তাত্ত্বিক ভাবনাকে সদৃশ দৃশ্যপটে দাঁড় করিয়েছেন অথচ বলতে চেয়েছেন শাসক আর শোষিতের অক্টোপাসে আবদ্ধ সমাজের অর্গল ভেঙে সাম্যবাদের ভাব-পুষ্ট সমাজ নির্মাণের কথা। এখানেই উপন্যাসটির ভিন্নতা। ত্রয়ী বীজ মন্ত্রণা উপন্যাসটির বিষয় ও ভাবনাকে স্বতন্ত্র ও স্বকীয় করেছে।

খুব কম লেখকই পারেন ভালোলাগার দুর্বলতাটুকু এড়াতে। হাসনাত আবদুল হাইও সেই দুর্বল ভালো লাগার ছাপ উপন্যাসে রেখে গেছেন। পাখিদের জীবনযাপন প্রণালির বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক ইতিহাসের নানা বিষয় টেনেছেন যা উপন্যাসের জন্য হয়তো তেমন প্রাসঙ্গিক ছিল না। তাছাড়া ‘গবেষণা প্রতিবেদন’, ‘সমীক্ষা প্রতিবেদন’ নামে কিছু তথ্যও তিনি সংযোজন করেছেন। এটি যুক্ত না হলেও উপন্যাসের অঙ্গহানি ঘটত না। এখানেই হয়তো লেখকের দুর্বলতা কিংবা ভালোবাসা অথবা বর্ণিত বিষয়টির যথার্থতা প্রমাণের প্রয়াস। যেমনটি করেছেন হাসান আজিজুল হক তাঁর সাবিত্রী উপাখ্যান উপন্যাসে। সেই সময় রাজশাহীতে ঘটে যাওয়া বীভৎস ধর্ষণের ঘটনার আলোকে রচিত তাঁর সাবিত্রী উপাখ্যান উপন্যাসটি। ধর্ষণের ভয়াবহ ঘটনাপঞ্জির বুনন শেষে ঔপন্যাসিক হাসান আজিজুল হক, সেই সত্য ঘটনার আইনি নথিপত্র উপন্যাসের শেষে সংযুক্ত করে দেন। হাসান আজিজুল হক অথবা হাসনাত আবদুল হাই সম্ভবত তাঁদের উপন্যাসের পটভূমিকে আরও বাস্তবসম্মত, নিখুঁত করার জন্য এই প্রক্রিয়া বেছে নিয়েছেন। নিজেদের সৃষ্টির তীব্র গভীর দায়বদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছেন।

হাসনাত আবদুল হাই পাখিদের জীবনাচরণ, কথোপকথনে জুড়ে দিয়েছেন সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্রের মন্ত্রণা বীজ। শোষক আর শোষিতের চেহারা উন্মোচনের পূর্বে তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন নারী-পুরুষের সমান অধিকার। যখন সোয়ালো ট্রেইনার বলে :

দিস অলটিচুড সেপারেটস বয়েজ ফ্রম এডাল্টস ‘হোয়াই বয়েজ অনলি ? হোয়াট এবাউট আস ? মেয়ে সোয়ালোটি ট্রেইনারের কাছে থেকে বলে।’ (প্রাগুক্ত; পৃষ্ঠা ০৮)

এভাবেই পুরুষ ট্রেইনারের একাধিপত্য মানসিকতায় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নারী পাখি তার স্বাধিকারের প্রশ্ন তুলে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার ভাবনাকে উস্কে দেয়। পাখিদের সমাজের রূপকে ঔপন্যাসিক মনুষ্য সমাজের শ্রেণিবিভেদের বিভিন্ন দৃশ্যের অন্ধকার পর্দা উন্মোচন করেছেন। পাখিদের ঠোঁটে ভাষা পুরে দিয়ে সেই বিভাজন তিনি চোখে আঙুল দিয়ে যেমন দেখিয়েছেন, তেমনি পাঠকের চৈতন্যে নাড়া দিয়েছেন। সোয়ালো কমিউনিটির নেতার পুত্র প্রিন্সের প্রতি পক্ষপাতিত্বের তীব্র প্রতিবাদ করে সাধারণ সোয়ালো শ্রেণি। যখন ট্রেইনার বলে প্রিন্স দুর্বল, তার জন্য বিশেষ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, তখন সাধারণ শ্রেণি যৌক্তিক প্রতিবাদ করে :

বিশেষ ব্যবস্থা ? শুধু ওর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা কেন ? অন্য দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য তো আপনি এমন ভাবেন না। তাদেরকে জোর করে, তিরস্কার দিয়ে সবার সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিতে বলেন। (প্রাগুক্ত; পৃষ্ঠা ১০)

শাসকের কূট-কৌশলের চরম কিন্তু নিম্নস্বরের প্রকৃত চেহারাও লেখক পাঠকের সামনে নগ্ন করে দেন :

হোক না মেধাবী, তবে এই স্বাধীনচেতা ভাব কম্যুনিটির জন্য মঙ্গলজনক নয়। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের প্রতি অন্ধ আনুগত্যই কম্যুনিটির স্থায়িত্ব এনে দিয়েছে। ভিন্নমত, সমালোচনা এসব কঠোর হাতে দমন করে যে শৃঙ্খলা আনা হয়েছে তা বিপন্ন করতে দেওয়া যায় না। (তদেব)

পদস্থ আর অধীনস্থের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক বিস্তর ব্যবধানের সুস্পষ্ট ধারণা পাই নিম্নোক্ত আলাপচারিতায় : ‘আপনি অভিজ্ঞ, আমার চেয়ে বিচক্ষণ। আপনার কথার বিপরীতে বলার দুঃসাহস নেই আমার।’ (প্রাগুক্ত; পৃষ্ঠা ১২) এভাবেই পদে পদে শাসক শোষিতের কণ্ঠরোধ করে। তাদের মনোজগৎকে নিয়ন্ত্রণ করে। কথা বলার অধিকার হরণ করে। চেতনাকে নিস্তেজ করে দেয়। শাসক ট্রেইনার সুকৌশলে শ্রেণিসংঘাত, ব্যক্তিবাদকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা, ভোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে পাঠদান এড়িয়ে যায় যেন শোষিতের চৈতন্যেদয় না ঘটে।

সোয়ালো সম্প্রদায়ের পাখিদের নেতা এবং পুত্র প্রিন্সের কথোপকথনের মাধ্যমে পাঠক, শাসক শ্রেণির নতুন প্রজন্মের মানসিকতা জেনে যান :

আমি চেয়েছি তুমি যেন সবার সঙ্গে অনায়াসে মিশতে পারো, তাদের একজন হতে পারো। তা হতে যাবো কেন ? আমি তোমার পুত্র, শাসকশ্রেণির একজন। আমি সাধারণের একজন হবো কেন ? … নেতাদের আলাদা থাকতে হয়। না হলে সবাই মানবে কেন ? প্রিন্সের স্বরে দৃঢ়তা। (প্রাগুক্ত; পৃষ্ঠা ২১)

শাসক কর্তৃক শোষিতের অবদমনের প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসে ব্রাইটের মত দৃঢ়চেতা সাহসী সোয়ালো যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, আত্মনির্ভরতায় বিশ্বাস করে। শোষিত শ্রেণির প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে রূপকার্থে এখানে সাহসী, আত্মবিশ^াসী সোয়ালো ব্রাইটের আবির্ভাব। যে কি-না প্রতিনিয়ত প্রতিবাদে মুখর থাকে, যে ভালোবাসে মুক্ত জীবন, বিশ^াস করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ :

ঐবধাবহ রং হড়ঃ ধ ঢ়ষধপব ধহফ রঃ রং হড়ঃ ধ ঃরসব. ঐবধাবহ রং নবরহম চবৎভবপঃ. (প্রাগুক্ত; পৃষ্ঠা ১১)

নতুন প্রজন্মকে নিয়ে তাই সে গড়ে তোলে নতুন সমাজ যেখানে সবাই স্বনির্ভর, সবাই ব্যক্তিক। এক সময় নেতাবাদী শ্রেণির পতন ঘটিয়ে স্বাতন্ত্র্যবাদের উত্থান ঘটে। ব্যক্তিবাদের স্বাধীনতা ব্রাইট অনুসারীদের মুক্তির আনকোরা অভিজ্ঞতার উন্মাদনায় নেশাগ্রস্ত করে তোলে। সবার জন্য ভাবতে হচ্ছে না। নেতার নির্দেশ নেই। রবি ঠাকুরের সাম্যবাদী সঙ্গীতের ভাবনার বীজমন্ত্রে ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে, নইলে মোদের রাজার সঙ্গে মিলবে কি শর্তে’―এই প্রেরণায় উদ্দীপিত হয়ে তারা সবাই নেতা এমন অভিজ্ঞতা তাদের আনন্দিত করে। অবাধ মুক্তির আস্বাদন পায়। কিন্তু এই স্বাতন্ত্র্যবাদের প্রকৃত শিক্ষা সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। তাই সংকটে সমষ্টিগত না হয়ে ব্যক্তিবাদে যখন আচ্ছন্ন হয়ে থাকে ঠিক তখন সাধারণ সোয়ালোদের নেতা ব্রাইট তার চিন্তার দুর্বলতা, পদক্ষেপের হঠকারিতা উপলব্ধি করে।

তরুণ সমাজে আধুনিকতার হাওয়া লেগেছে। তারা অন্য সম্প্রদায়ের পাখিদের সঙ্গে ভাবের আদান প্রদানে মজে ওঠে। স্বাধীন পাখা উড়িয়ে পাড়ি জমায় বিপুলা এই পৃথিবী রূপ সন্দর্শনে। কিন্তু তাদের এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের, বিশ্বাসের ভিত নড়ে উঠে যখন শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষাকল্পে অন্য ভূখণ্ডে যাবার সময় আসন্ন হয়। কারণ সমষ্টির ভাঙনে বিলুপ্ত হয়ে গেছে গোষ্ঠীর কাঠামো, নেই ট্রেইনার, জ্যোতির্বিদ, আবহাওয়াবিদ, স্বাস্থ্যবিদ প্রমুখ। ব্রাইট আবার সমষ্টি নির্মাণে এগিয়ে যায়। এখানে ব্রাইটের আত্মোপলব্ধি, ‘আমরা ভুল করি শেখার জন্য।’ (প্রাগুক্ত; পৃ ১০৪) এখানেই উপন্যাসের পরিসমাপ্তি টেনেছেন লেখক।

সমাপ্তির ঠিক প্রাকপর্বে হাসনাত আবদুল হাই সোয়ালো পাখিদের জীবনকে প্রধান রেখে এই প্রথম সশরীরে মানুষের উপস্থিতি দেখান। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় পক্ষীকুলকে উপলক্ষ্য করে মানুষের কথা বললেও আসলে মানুষের জীবন নয় বরং পাখিদের জীবন এখানে মুখ্য কিন্তু আদতে তা সত্য নয়। মানুষকে গৌণ রেখে তার নেতিবাচক কার্যকলাপ দিয়ে তাকেই আবার মুখ্য করেছেন লেখক। শুধু তাই নয় এই পাখি সমাজ মানুষের সমাজের রূপক মাত্র। কিন্তু এখানেও লেখক কৌশল অবলম্বন করেছেন, তিনি শান্তিপ্রিয় প্রজাতি পাখিদের দ্বারা মানুষের অমানবিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তিরস্কার করেছেন নির্দ্বিধায়। আবার এই পাখিদেরকেই তিনি রূপকার্থে মানুষের অস্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

পাখিদের জীবনযাপন, নেতৃত্ব তথা নেতা ও তার সহকর্মীদের চিন্তা-চেতনা, কার্যকলাপের ভেতর দিয়ে তিনি শাসককে পরাজিত করে শোষিতের উত্থান, কমিউনিজমের আদর্শে সমাজ তৈরির স্বপ্ন, বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ও প্রয়োগে বুদ্ধিগত কৌশলের অভাবে তার ফল ভোগে ব্যর্থতা, নতুন করে সমাজকে ঢেলে সাজানোর প্রয়াস স্বল্প পরিসরে ইত্যাদির বিশদ আলোকপাত করেছেন। অথচ সেখানে কোথাও মানুষের উপস্থিতি নেই। যখনই মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে শুরু হয়েছে হিংস্রতা। মানুষের পদার্পণের প্রথম দৃশ্যই শুরু হয়েছে নির্মমতা দিয়ে। আর তা হলো, অতিথি পাখি শিকার ও খাঁচায় বন্দি করে বিক্রয়। সেই পাখিটিই আবার হচ্ছে পাখিদের সমাজ বদলের নেতা ব্রাইট। এক সময় সে মানবিক এক নারীর হাতে মুক্তি পায়। নিজের সমাজে ফিরে সমাজ বদলে নেতৃত্ব দেয়। সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, পথ প্রদর্শক, এই বন্দিত্ব, মৃত্যুঝুঁকি, মুক্তি, বিপ্লবীদের জীবন বাস্তবতার রূপক মাত্র !

তারপর মানুষ নামক প্রাণী সম্পর্কে পাখিদের পর্যবেক্ষণ ও অভিমত ব্যক্ত হয়। যেখানে দেখি আপামর পাখি সমাজ, মানুষের কার্যকলাপে ক্ষুব্ধ, বিস্মিত এবং নিজেদের রক্ষাকল্পে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ :

এদেশের মানুষ এখন পাখি মারছে, জাল দিয়ে ধরছে। তাদের প্রতি নজর রাখতে হলে সংঘবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। …ওরা ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠেছে। কথায় কথায় নিজেরা খুন জখম করছে। আগে এমন দেখিনি। (প্রাগুক্ত; পৃষ্ঠা ৬৫)

এবং মনুষ্য সমাজের এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে পাখিরা শিক্ষা নিতে চায় অথচ মানুষ নেয় না। মানুষ এবং পাখি এখানে শাসক ও শোষিতের রূপক মাত্র। পাখিদের ভাবনা এখানে শাসকের বিরুদ্ধে শোষিতদের অর্থাৎ বিপ্লবীদের সংঘবদ্ধ হবার ইঙ্গিত।

অতিথি পাখি শিকার ও নিধনের অমানবিক দৃশ্যপটে দেখা যায়, খেকো মানুষ চর্বি ভর্ত্তি বুনোহাঁসটাকে ভক্ষণের জন্য কিনে নেয়। হালকা দেহ চটপটে সোয়ালো এ যাত্রা রক্ষা পায়। স্বাস্থ্যবান বুনোহাঁস ও খাদকের দৃষ্টিতে রুগ্ণ পাখি সোয়ালোর উপস্থিতি বনফুলের ‘মানুষ’ গল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যদিও চিত্ররূপ ভিন্ন কিন্তু মৌল প্রবণতা এক―

‘ব্যাধি ও স্বাস্থ্য পাশাপাশি দাঁড়াইয়া আছে―একই উদ্দেশ্যে

ক্ষুধার অন্ন চাই।’ (মুখোপাধ্যায়, বলাই চাঁদ; নন্দন; ২০০৫; পৃষ্ঠা ৬২)

আর এখানে স্বাস্থ্যবান ও রুগ্ণ পাখি নিয়ে পাখি শিকারি দাঁড়িয়ে আছে বিক্রির জন্য কারণ তার ক্ষুধা অন্ন চায়। মানবতার বুভুক্ষ দৃষ্টি দুটো কাহিনিতে নগ্ন বাস্তবতা নিয়ে প্রকট হয়ে আছে। কী অপার কল্পনার আকাশে পাখা মেলে হাসনাত আবদুল হাই উড়ন্ত বোহেমিয়ান পাখির চেতনায় আর ঠোঁটে ভাষা পুরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আলো ফেলেছেন! পাখিদের অভিজ্ঞতার দেশ আসলে বাংলাদেশ। পাখির রূপকে কখনও লেখক নিজেই যেন পাখির অবস্থানে দাঁড়িয়ে স্বদেশ, স্ব-মানুষের ভালোমন্দ বিচারে তৎপর হয়েছেন। তেমনি একটি দৃশ্যপট-

কমান্ডার উত্তর দেন, সংগঠন ভেঙে পড়েছে অথবা বলা যায় এরা সংগঠন গড়ে উঠতে দেয়নি। শৃঙ্খলাবদ্ধ আচরণ এদের চরিত্রে বেশ অনুপস্থিত। এরা নিয়মকানুন মানতে চায় না, একে অন্যকে ছলে-বলে-কৌশলে পেছনে রেখে এগিয়ে যেতে চায়। এই সবই কালেকটিভ চিন্তা চেতনার বিপরীত। এরা প্রবলভাবে ব্যক্তিবাদী। এনার্কিষ্ট।

না, না। এটা বললে সত্যের অপলাপ হবে। এদের মধ্যেও যৌথ ক্রিয়াকর্মের পরিচয় রয়েছে।

কেমন ? কমান্ডার নেতার দিকে তাকান।

কেন মনে নেই পঁচিশ বছর আগে যখন শীতের সময় এদেশে এসেছিলাম আমরা! স্বাধীনতার যুদ্ধ চলছিল। এইসব গ্রামেই দেখেছি সাধারণ মানুষ যা হাতে পেয়েছে তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। …শক্ত মনোবল ছিল এদের। দারুণ সংগ্রামী। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬৬)]

কিন্তু পরবর্তী সময়ে লেখক সমষ্টি ছাপিয়ে মানুষের সর্বজনীন স্বরূপ উন্মোচনে প্রয়াসী হন। সেখানে মানুষের স্বার্থপর, ঈর্ষাকাতর, লোভাতুর চেহারাটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটাই তাদের সহজাত প্রবৃত্তি রূপে চিহ্নিত হয়।

সোয়ালো উপন্যাসটির সবচেয়ে অসাধারণ পর্ব হলো, কাজের মেয়ে সুতুলির মুখ দিয়ে রূপকথার আবহে দেশের স্বাধীনতার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পাঠ, খন্দকার মোশতাকের বিশ্বাসঘাতকতায় সপরিবারে জাতির পিতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি নাতিদীর্ঘ বয়ান। ছোট্ট পরিসরে রূপকের আবহে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর ঠোঁটে ভাষা দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম এবং পরবর্তী জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অর্থবহ চিত্রকল্প নির্মাণ নিঃসন্দেহে উপন্যাসটির অনন্য সাধারণ শিল্পকর্ম এবং লেখকের কল্পনা ও বাস্তবতার অত্যাশ্চর্য সমন্বয়। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, তাঁর চেতনার জীয়নকাঠির নির্যাসে বাঙালি জাতির বেঁচে থাকার প্রেরণা ও সাহস সঞ্চয়ের চিরন্তন মহান ইতিহাস নিয়ে প্রায় একই আবহে রচিত অসাধারণ একটি রূপকধর্মী গল্প নিভৃতচারী প্রতিভাবান গল্পকার আকমল হোসেন নিপুর ‘বুড়ি চাঁদ ডুবে যাবার আগে’।

‘সোয়ালো’ পাখি যারা আকাশে ওড়ে কিন্তু মাটির কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে। তাদের নামে উপন্যাসের নামকরণের কারণ উল্লেখ নেই। তবে কাহিনির সারাংশে ধারণা করা যায় ‘সোয়ালো’র মৃত্তিকা ও আকাশের সঙ্গে সম্পর্কের রূপকে লেখক হয়তো জীবন ও স্বপ্ন কিংবা মানুষ ও তার আকাক্সক্ষার সাঁকো নির্মাণ করতে চেয়েছেন। মাটির মানুষের মহিমান্বিত ভাবনা সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র সমাজ প্রতিষ্ঠা সেই স্বপ্ন বা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজনীতির বিচিত্র পর্যবেক্ষণ বিচার বিশ্লেষণের প্রতিপাদ্য হয়ে পাখি আর মানবজাতির জীবন বৃত্তান্তের সংক্ষিপ্ত, অর্থবহ বিবরণ দিয়েছেন লেখক। রূপকধর্মিতার পাশাপাশি মিথ ও পুরাণের প্রয়োগও এখানে লক্ষণীয়। এঁকেছেন চিত্রকল্পরূপময় বাক্যবিন্যাস। উপমার দারুণ নির্মাণ! শব্দের সৌকর্য আর কাহিনির পরতে পরতে নকশী কাঁথার মতো গল্প বুনে বুনে সৃষ্টি করেছেন উপন্যাসের শরীর। গড়েছেন পাখি আর মানুষের জগৎ সংসার। তাঁদের ভাব ভাবনা আদর্শের নানামুখী বুনন বীজকণার মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন সেই জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। রূপকের বর্ম ভেদ করে পাঠককে নিতে হয় তার অসাধারণ আস্বাদন। হাসনাত আবদুল হাই এর ভাষা নির্ভার, নির্মেদ, সরস এবং গতিশীল। খুব সাবলীল ভাষায় অবলীলায় তিনি বলে যান জীবনের গূঢ়তত্ত্ব। কাহিনি বয়ানে রয়েছে তাঁর অসাধারণ সম্মোহনী ক্ষমতা। কল্পনার চূঁড়ায় উঠে কত অনায়াসে জীবনবাস্তবতাকে শুধু স্পর্শ করা নয় প্রতিষ্ঠা করা যায় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সোয়ালো উপন্যাস। বোহেমিয়ান উড়ন্ত পাখির জীবন আর মাটির স্পর্শে পথ হাঁটা মানুষের মেলবন্ধন ঘটিয়ে রূপকের আড়ালে জীবনের এমন বৃহত্তর প্রগাঢ় জীবন-পাঠ নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্য সম্ভারে সমৃদ্ধির নতুন পালক সংযোজন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares