আলোচনা : উপন্যাস-গল্প―হাসনাত আবদুল হাই : হাসনাত আবদুল হাইয়ের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র এবং মুক্তিযুদ্ধের গল্প : মুস্তাফিজুর রহমান

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক। এই গৌরব অর্জিত হয়েছে তিরিশ লাখ শহিদের জীবনের বিনিময়ে; মুক্তিযুদ্ধের গৌরব এসেছে দশ লাখ জননী, বধূ ও কন্যার চরম আত্মত্যাগের মূল্যে; নয় মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের শেষে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশের আপামর জনগণের সাহস, বীরত্ব এবং সংকল্পের হাত ধরে। মুক্তিযুদ্ধ যেমন দুঃখ-কষ্টের, অশ্রু এবং রক্তপাতের, সেই সঙ্গে আনন্দ ও গর্বের। যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ হয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, সেই শক্তি পরিণতি পায় একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার জাগরণে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ডের আবির্ভাবে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের দুর্নিবার ঘোষণা; মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের পরিচয়। প্রতি নিঃশ্বাসে আমরা জীবন্ত আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করে বেঁচে থাকার প্রেরণা এবং নিরন্তর ইতিহাস রচনার অভিলাষে। মুক্তিযুদ্ধ শুধু স্মৃতি নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপনের শক্তি, সাহস ও বিশ্বাসের উৎস।

মহান মুক্তিযুদ্ধ অমর হয়ে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে, গবেষকের ইতিহাস চর্চায়, শিক্ষিতদের পঠন-পাঠনে এবং গ্রাম ও শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ এবং স্মৃতিচারণামূলক বই লেখা হয়েছে যা আমাদের সৃজনশীল সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এমন কোনো দেশপ্রেমিক বাংলাদেশে নেই এবং ছিল না যিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু লেখেননি। জাতীয় জীবনে আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক এবং জাতিসত্তার উৎস হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ শিল্পী ও সাহিত্যিকদের প্রেরণা দিয়েছে, দিচ্ছে এবং দিয়ে যাবে অনন্তকাল। যতই লেখা হোক, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর চেতনার বয়ান কখনওই সম্পূর্ণ হবে না, কেননা বিষয়টি বিশাল এবং বহুমাত্রিক। বাংলাদেশের লেখকদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ যেমন প্রেরণা ও উৎসাহের উৎস, তেমনি এক বিশাল চ্যালেঞ্জও বটে। শুধু ঘটনা বা তথ্য নয়, তার পেছনে যে আদর্শ-রাষ্ট্রের স্বপ্ন এবং সামষ্টিক জীবনের রূপরেখা তার প্রতিফলনে সচেষ্ট হবে অনাগত প্রজন্মের লেখক। কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে এবং নাটকের শাখায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে সাহিত্য রচিত হয়েছে তার শুধু নবায়ন নয়, নতুন ব্যাখ্যা এবং প্রতিফলনও ভবিষ্যতের লেখকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে, এ কথা বলা যায়।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যর একজন লেখক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ হাসনাত আবদুল হাইকেও সৃজনশীল লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছে। এই সংকলনে স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা তার উপন্যাস। উপন্যাসের বিষয় মুক্তিযুদ্ধ হলেও তাদের প্রত্যক্ষ উপাদানগুলো ভিন্ন, যেমন পৃথক তাদের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক পটভূমি। সাতজন উপন্যাসের নায়ক কারাবন্দি সাত কয়েদি যারা সমাজের অবিচারের শিকার হয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হয়েছে জীবিকা নির্বাহের জন্য। একাত্তরে মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় তাঁরা জেলে অন্তরীণ থাকলেও পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয় এবং জেলের ভেতরে প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল বের করে। জেল ভেঙে বেরিয়ে তারা গা ঢাকা না দিয়ে সোজা চলে যায় শহিদ মিনারে এবং সেখানে দাঁড়িয়ে দৃপ্তভঙ্গিতে শপথ গ্রহণ করে জানায় তারাও জাতির মুক্তি অর্জনে অংশগ্রহণ করতে বদ্ধপরিকর। ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ এবং হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর সাতজন সাবেক কয়েদি সীমান্তের এক গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। অসম যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণে পরাস্ত হয়ে তারা বেঁচে যাওয়া গ্রামবাসীর পক্ষে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যায়। সেখানে তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান অধিকৃত ভূখণ্ড, তাদের মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য অভিযানে যায়। বিভিন্ন স্থানে অপারেশনে অংশগ্রহণকারী ছয়জন মৃত্যুবরণ করে, শুধু একজন বেঁচে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশে সে পুনর্বাসনের জন্য দরজা থেকে দরজায় করাঘাত করে। জীবিকা নির্বাহের জন্য তার আইনসম্মত কিছু পাওয়ার ব্যর্থতা ও হতাশা রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। মুক্তিযুদ্ধকে যেমন এই উপন্যাসে দেখা হয়েছে সাহস ও বীরত্বের কাহিনি হিসেবে, একই সঙ্গে এর শেষ অধ্যায় মনে করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসম্পূর্ণ বাস্তবায়নের বিষয়টিও। এই উপন্যাস সাব-অলটার্ন, নিম্নবর্গের মানুষের বীর হয়ে ওঠা এবং বৃহত্তর স্বার্থে তাদের চরম আত্মত্যাগের কাহিনি।

তিন বন্ধু ও একটি দেশ উপন্যাসটি ঢাকার বাইরে এক মফস্সল শহর এবং সংলগ্ন গ্রমাঞ্চলের কিছু মানুষের জীবনে মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব, মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং পরবর্তী অভিজ্ঞতা ধারণ করেছে। হিন্দু এবং মুসলমান-উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ এই কাহিনির চরিত্র যার মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সমাজের প্রধান প্রবণতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এসব চরিত্রের জীবন যেভাবে বিপর্যস্ত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের পর তাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকে ধ্বংস ও মৃত্যুর পটভূমিতে, তাদের নতুন করে বাঁচার সংগ্রাম নিয়ে লেখা হয়েছে এই উপন্যাসের কাহিনি। তিন বন্ধু ও একটি দেশ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র শুধু তিনজন নয়, তারা এদশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিও বটে।

ইউটোপিয়া উপন্যাসের মূল চরিত্র মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমানা অতিক্রম করে কলকাতা যায় এবং সেখানে তার মতো করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে সে নিজের স্বপ্নের পরিপ্রেক্ষিতে এবং সীমিত সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য গ্রামাঞ্চলে গড়ে তোলে কমিউন। সমতার ভিত্তিতে নতুন জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য এই প্রচেষ্টা সীমাবদ্ধ থাকে প্রধান চরিত্র এবং আপনজন ও কিছু অনুসারীর মধ্যে। কিন্তু নতুন সমাজ গড়ার যে প্রতিশ্রুতি মুক্তিযুদ্ধে ছিল তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে উপন্যাসটি হয়েছে আপামর জনসাধারণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন।

একদা এক যুদ্ধে উপন্যাসিকায় মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য সীমান্ত সংলগ্ন একটি স্থানে কয়েকজন অকুতোভয় যুবক-যুবতীর প্রচেষ্টায় ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও চিকিৎসার সত্য কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। এই যুবক-যুবতীর মধ্যে রয়েছে ইংল্যান্ড থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন ডাক্তার, সেনাবাহিনীর মহিলা ডাক্তার এবং বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণরত ছাত্র ও ছাত্রী। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের তাগিদ তাদের মধ্যে ঐক্যসূত্র রচনা করে। ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাবে সংখ্যায় সীমিত ডাক্তার এবং নার্স এই ফিল্ড হাসপাতালে যেভাবে আহত এবং অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে সেই প্রায় অবিশ্বাস্য কাহিনি নিয়ে এই উপন্যাস। উপন্যাসের চরিত্রগুলো আফ্রিকার আলবার্ট সোয়াইটজার এবং ভিয়েতনামে মানবতার সেবায় নিয়োজিত টম ডুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অথবা কুওমিংটান চীনে গৃহযুদ্ধের সময় ভারতীয় ডাক্তার চিটনিসের কাহিনি।

চারটি উপন্যাসের পটভূমি এবং চরিত্র ভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ইতিহাস ও কাহিনির মাত্র সামান্য অংশই ধারণ করা হয়েছে এই চারটি উপন্যাসে। এদের মাধ্যমে লেখক হিসেবে হাসনাত আবদুল হাই মুক্তিযুদ্ধের মহান উত্তরাধিকারের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং কর্তব্য পালন করতে চেয়েছেন। তাঁর এই নিবেদন সফল হয়েছে, পড়ার পর এ কথা বলবে পাঠক। এভাবেই তিনি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন শহিদ, আহত এবং বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের। একই সঙ্গে কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করেছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের সেই সব নর-নারীকে, যারা পরোক্ষে হলেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে নানাভাবে, নিজ নিজ পরিধিতে।

দুই.

মুক্তিযুদ্ধের এপিক নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এ এক অন্তহীন কাহিনি যার বয়ান অনেক বলা হলেও শেষ হয় না। উপন্যাসের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের খণ্ড অংশ নিয়ে লেখা হয়েছে ছোটগল্প। এইসব গল্পেও প্রতিফলিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আগের সময়ের এবং পরবর্তীকালের বিভিন্ন কাহিনি যার উৎস লেখকের অভিজ্ঞতা অথবা শ্রুতি। উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাস না থাকলেও ছোটগল্পে পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রেক্ষিতের রোমাঞ্চকর কাহিনির আভাস। এখানে ইতিহাসের খণ্ড অংশ হয়েছে মহত্ত্বে এবং বীরত্বের কারণে প্রাণবন্ত এবং অবিস্মরণীয়।

মুক্তিযুদ্ধের ১২টি গল্প নিয়ে লেখা হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প সংকলন’। মুক্তিযুদ্ধের পর বিভিন্ন সময়ে লেখা এইসব ছোটগল্পে প্রতিফলিত হয়েছে বিভিন্ন প্রেক্ষিতের কাহিনি। এদের চরিত্রে যেসব নর-নারী তারা প্রায় সবাই সাধারণ শ্রেণির। মুক্তিযুদ্ধ তাদেরকে অসাধারণ ভূমিকা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে। এদের কেউ কেউ বাস্তব ঘটনার চরিত্র, যারা তা নয় তাদেরও মনে করা যেতে পারে বাস্তবের প্রতিনিধি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প যখন লেখা হয় সেখানে নিছক কল্পনার ভূমিকা থাকে না। বাস্তব এবং ইতিহাসের ঘটনাই হয় কল্পনার ভিত্তি। সেই জন্য উপন্যাস তো বটেই, প্রতিটি ছোটগল্পকেই মনে করা যায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। উপন্যাসে যেমন ছোটগল্প লেখাতেও হাসনাত আবদুল হাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের খণ্ড চিত্র শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন। কথাসাহিত্যিক হিসেবে এখানেই তাঁর সার্থকতা। এইসব গল্প পড়ার পর পাঠকের মন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, সাহস এবং স্বার্থত্যাগের জন্য যেমন উদ্বেলিত হবে, একই সঙ্গে নতুনভাবে উজ্জীবিত হবে  দেশপ্রেমে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares