আলোচনা : উপন্যাস―হাসনাত আবদুল হাই : ছবির পালাকার হাসনাত আবদুল হাই : রওনক আফরোজ

ফরিদ নামে একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর শহিদ মিনারে তাঁর  লাশ দেখার দেখার জন্য যে ঢল নেমেছিল সেটার বর্ণনা এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ছবির পালাকার উপন্যাসের শুরু। ফরিদকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের কাহিনি তৈরি হলেও এর মূল বিষয় মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ঘটনাবলি। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত লোকজনের  সংলাপে এবং পরবর্তী ঘটনার বর্ণনায় বারবার উঠে আসে সমাজের ক্ষমতার অধিকারী, রাজনৈতিক নেতা এবং অন্যান্য স্বার্থান্বেষীগণ কীভাবে মুক্তিযুদ্ধকে নিজস্বার্থে ব্যবহার করে এর চেতনাকে বিকৃত করছে তারই কাহিনি। এ ছাড়াও প্রেম, আন্তসম্পর্কের টানাপোড়ন, সময়ের পরিবর্তনে বিপরীত স্রোতে ভেসে যাওয়া সম্পর্কের পরিণতি উপন্যাসটিকে জীবনমুখী করে তুলেছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মধ্যেও একজন জেদি মানুষের আদর্শ ধরে রাখার এই কাহিনি কষ্টের মধ্য দিয়ে শেষ হলেও এখানে নিপুণভাবে আশাবাদও ব্যক্ত করা হয়েছে। যেখানে জীবদ্দশায় মানুষ তাদের কর্মের প্রাপ্য স্বীকৃতি পায় না, সেখানে একজন অতিসাধারণ ফরিদের জীবিতাবস্থায় কিংবদন্তি হয়ে ওঠার কাহিনি বেশ চমকপ্রদ।

হাসনাত আবদুল হাই প্রধানত কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত কিন্তু তিনি এই শাখাতেই তাঁর সাহিত্যচর্চা সীমাবদ্ধ রাখেননি। সাহিত্যের অন্যান্য শাখা যেমন : ভ্রমণ সাহিত্য, সাহিত্য সমালোচনা, শিল্প সমালোচনা ইত্যাদি। তিনি এ দেশের সাহিত্যে জীবনীভিত্তিক উপন্যাসের ধারার প্রচলন করেছেন। উন্নয়ন অর্থনীতি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট, নন্দনতত্ত্ব এবং রাজনীতি নিয়েও তিনি লিখেছেন সমান উদ্দীপনায়। তিনি হাইকু লিখেছেন এবং ইদানীংকালে কবিতার অঙ্গনেও তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ লক্ষণীয়।

এক কথায় তিনি বহুমাত্রিক লেখক। সংখ্যার দিক দিয়ে তাঁর লেখা উপন্যাসই বেশি। সে কারণে আমি আলোচনার জন্য তাঁর একটি উপন্যাসই বেছে নিয়েছি।

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ফরিদ আর্ট কলেজের ছাত্র ছিল। দেশপ্রেম ও আদর্শ স্কুল মাস্টার পিতার অনুপ্রেরণায় ফরিদ যুদ্ধের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। তাঁর চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন, দেশের উন্নতির স্বপ্ন। জুলাই মাসে পাকিস্তানি মিলিটারি ফরিদের বাবা আহমাদুল্লাহ মাস্টারকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হলেও তিনি আর ফিরে আসেননি। তাঁর লাশ পাওয়া যায়নি বলে ফরিদের মা অপেক্ষায় থাকেন এই বিশ^াসে যে, তিনি ফিরবেন। মা তাঁর অপেক্ষাকে যুক্তিযুক্ত করতে স্বামীকে স্বপ্নে দেখার কথা বলেন, যেটা অসহায়ের আত্মপ্রবোধ ছাড়া কিছুই না। স্বাধীনতার পর অর্থাভাবে ফরিদের পড়া শেষ করা হয় না। সংসারের প্রয়োজনে ফরিদ সাইনবোর্ড আঁকে। এতে নিয়মিত আয় না হওয়ায় সে রিকশার পিছনে মুক্তিযুদ্ধের ছবি আঁকে এবং কিছুদিন পর সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য ও নায়ক নায়িকার ছবি আঁকতে শুরু করে। ফরিদ এক সময় ময়মনসিংহ গীতিকার কাহিনিতে আকৃষ্ট হয়ে এর কল্পদৃশ্যগুলো রিকশার পিছনে আঁকতে থাকে। ক্রমান্বয়ে পুঁথি থেকে মলুয়া, চন্দ্রাবতী, রূপবতী, দেওয়ানা মদিনা, রূপকথার  কাঞ্চনমালা, কাজলরেখা এদের কাহিনিও তার ছবির উপজীব্য হয়।

এরমধ্যে পাড়ার নব্যধনী কন্ট্রাক্টর কফিলুদ্দিনের কন্যা রেশমা ফরিদের প্রেমে পড়ে এবং পিতার প্রচণ্ড আপত্তির মুখে গৃহত্যাগ করে ফরিদের বাড়িতে আসে এবং সেখানে তাদের বিয়ে হয়। এই সময়ের পটভূমিতে দেশে যে রাজনৈতিক ঘটনা ঘটতে থাকে গুরুত্ব বিবেচনা করে সেগুলো কাহিনির মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। যেমন, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্ব কাহিনি, সামরিক অভ্যুত্থান ও পালটা অভ্যুত্থান; মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁসি, যেটা ফরিদের মনে গভীর বিষাদ ও দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। হতাশা থেকে মুক্তির জন্য ফরিদ ছবি আঁকায় আরও মনোনিবেশ করে। সে ওয়ার্কশপের জায়গা বাড়ায়, সহকারী রাখে। ক্রমে ফরিদের খ্যাতি বাড়তে থাকে। এর সাথে পাড়ার বাচ্চাদের নিয়ে ফরিদের ফুটবল খেলা চলে। পাড়ার লোক বিশেষ করে বিভিন্ন বয়সের কিশোরদের কাছে ‘ওস্তাদ’ নামে সে ক্রমেই খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। লোককথার আর্টিস্ট, লোকশিল্পী হিসেবেও মূল চরিত্র ফরিদ নতুন শতাব্দীর শুরুতে দেশে-বিদেশে বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

উল্লেখ্য, এই উপন্যাসে দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক পট পরিবর্তনের বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন অধ্যায়ে আনা হয়েছে। এসব ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু কিংবা ফাঁসি এবং আশির দশকের শেষ থেকে নব্বই দশকজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতিতে অনেক মুক্তিযোদ্ধার অংশগ্রহণে ফরিদের কষ্ট ও হতাশ প্রতিক্রিয়া চিত্রায়িত করা হয়েছে। এরপর কাহিনিতে তাঁর ব্যক্তিগত সংঘাত প্রকট হয়ে আসে যখন ফরিদের স্ত্রী রেশমা পুত্রের উন্নত শিক্ষার প্রয়োজন দেখিয়ে ধানমন্ডিতে পিত্রালয়ে চলে যায়। ফরিদকে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছল্য দিতে রেশমার বাবার সব প্রস্তাবকে ফরিদ নাকচ করে দেয় কিন্তু রেশমা পিত্রালয়ে যেতে চাইলে সে কোনো বাধা দেয় না। এলাকার মানুষের ভালোবাসা আর নিজের জেদে ফরিদ থেকে যায় পুরাতন ভিটায়। তারপর ক্যান্সারে আক্রান্ত ফরিদের সাথে তার মৃত্যুশয্যায় রেশমার আবার দেখা হয়।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, বৈচিত্র্য। গতানুগতিকতা ও পৌনঃপুনিকতা পরিহার করে নতুনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘গল্পে এবং উপন্যাসের বিষয় প্রায় সবই পুরনো, এখানে স্বতন্ত্র হতে হলে দুটো উপায় আছে : (এক) প্লট ও তার ওপর ভিত্তি করে যে ন্যারেটিভ বা বর্ণনাভঙ্গি, তা পৃথক হতে হবে। অর্থাৎ গল্প বলার কৌশল নতুন হতে হবে। (দুই) ভাষা ব্যবহারে থাকতে হবে সতেজতা যা কাহিনিকে বিশেষ করে তোলে। গতানুগতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে লেখায় এই দুটি গুণের একটিও থাকে না।’

ছবির পালাকার উপন্যাসটি শুরু থেকে শেষ আঞ্চলিক ভাষায় লিখে তিনি সেই ধারামতে লেখায় নতুনত্ব এনেছেন। তাঁর ‘দৌড়া পরান দৌড়া’ ছোটগল্প আঞ্চলিক ভাষায় লেখা।

এভাবে তিনি পাঠকের কাছে কাহিনিকে আরও  নিজস্ব, বিশ^াসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন।

 ছবির পালাকার উপন্যাসের চরিত্রদের সাথে সাথে লেখক নিজেও মাঝেমাঝে উপস্থিত হয়ে বিশেষ বিশেষ ঘটনাকে সময়ের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন।

বাংলদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাস স্বল্প পরিসরের এই উপন্যাসে খণ্ডিত সামগ্রিকতায় ধারণ করা সম্ভব হয়নি কিন্তু নতুন প্রজন্মের মধ্যে সেসব নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি করবে বলে আমার বিশ^াস। বইটিকে স্বাধীনতার পর থেকে ২০১২ সালে বইটি প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত দেশে ঘটে যাওয়া সকল রাজনৈতিক ঘটনাবলির একটি অণুডায়রি  অথবা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক উপন্যাস বলা যায়। ছবি আঁকার সাথে সাথে ফরিদকে দিয়ে গল্প বলিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে চতুরতার সাথে লোকগাথাগুলো পাঠকের কাছে উপস্থাপন করে লেখক বাংলাদেশের লোকজশিল্পের প্রতি তাঁর অনুরাগ প্রকাশ এবং গুরুত্ব আরোপ করেছেন।  ফরিদের মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর বক্তব্য রেখেছেন। সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও তাই প্রসঙ্গক্রমে এসেছে প্রখ্যাত গায়ক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আযম খানের কথা।

ছবি আঁকা ফরিদের পেশা হলেও ছবির বিষয় নির্ধারণের পিছনের কাহিনি চমৎকৃত করার মতো। এই চমক বেড়ে যায় যখন প্রধান চরিত্র হয় একজন শিল্পী। এই পেশাকে নিয়ে এর আগে বাংলাদেশে আর কেউ লিখেছে বলে আমার জানা নাই। এই উপন্যাসে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বীরত্ব, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের হতাশা, ব্যর্থতা, লোভ এবং স্বার্থপরতা ও বিশ^াসঘাতকতার করুণ চিত্র। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বিস্মৃত হয়ে জাতি যে জীবন যাপন করছে সেটার বিপরীতে লেখক একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এঁকেছেন নির্মোহ, আদর্শের লড়াইয়ে অটল, সংগ্রামী এবং চিরদেশপ্রেমিক হিসেবে। চারিদিকে দেখেশুনে আপাত হতাশ হলেও যিনি হারেননি। এমনকি যে স্ত্রী তাঁকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছিল তাকেও হাসপাতালের মৃত্যুশয্যায় বলছেন, ‘তোমার উপর রাগ করি নাই। ক্যান করমু ? যখন গ্যাছো গিয়া বুঝছি যে সাহস নিয়া আইছিলা আমার কাছে হেইডা শেষ হইয়া গ্যাছে। এরপরে ক্যামনে থাহো ? মনের বিরুদ্ধে মানুষ বাস করতে পারে না’। জীবনে পরিবর্তন যেমন বাস্তব, সেটা মেনে নেওয়াও বাস্তব কিন্তু সবাই উদারতা ও প্রশান্তির সাথে সেটা করতে পারে না, ফরিদ পেরেছিল। কিছুটা পেরেছিল ফরিদের স্ত্রী রেশমাও।

ফরিদের পিতা একজন শহিদ। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি মাত্র একবারই এসেছে। পাঠক হিসেবে এখানে আমার কিছুটা অতৃপ্তি রয়ে গেছে যেটা মুক্তিযুদ্ধের সাথে আমার ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার কারণেও হতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখক একাধিক উপন্যাস, অসংখ্য ছোটগল্প লিখেছেন। প্রতিটি লেখাই স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। এরমধ্যে কৃষ্ণপক্ষ, একাত্তরের মোপ্যাঁসা, প্রমিথিউস, ভাগীরথীর গল্প  ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তিনি ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করেন যা তার বর্ণনাকে আপাতদৃষ্টিতে করে তোলে সরল। এই সরলতায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে ভাষার পরিকল্পিত এক নান্দনিকতা। ছবির পালাকার এর প্রচ্ছদের কোলাজও লেখকের নিজের আঁকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares