আলোচনা : উপন্যাস―হাসনাত আবদুল হাই : একান্ত ভাব-অনুভবে : হাসনাত আবদুল হাই-এর উপন্যাস লড়াকু পটুয়া : আবদুল্লাহ আল মোহন

বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী কামরুল হাসান। যিনি প্রগতিশীলতা, দ্বিধাহীন চিত্ত, সাহসী পদক্ষেপ আর বাঙালিত্বকে ধারণ করে আমাদের শিল্পজগতে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে সমাসীন হয়েছেন। বরেণ্য চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা চিত্রকর্মের নিজস্ব রীতি ছিল লৌকিকতা আর আধুনিকতার মিশেল। তাই তিনি ‘পটুয়া’ নামে খ্যাতি লাভ করেন। শিল্পের এই মাধ্যমটিতে কামরুল হাসান আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি―এক কথায় বাংলার সামগ্রিক রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। লড়াই করেছেন আজীবন যেমন শুদ্ধ শিল্পের জন্য, তেমনই আদর্শের জন্যও। ব্যক্তিগত জীবনযুদ্ধে নামতেও পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই সৃজনী জীবন শিল্পীকে নিয়ে জীবনভিত্তিক উপন্যাস লড়াকু পটুয়া রচনা করেছেন আরেকজন সৃজনশীল কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই। আজন্মের যোদ্ধা, লড়াকু শিল্পী ও ব্যক্তি মানুষ কামরুল হাসানকে দেখা গেছে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে যেমন প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে, তেমনই শিল্প-সংস্কৃতির দিক থেকে একজন দায়িত্বশীল নিরন্তর শিল্পসাধক হিসেবে। শিল্পী কামরুল হাসান শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকলেও দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক মুক্তি, দেশাত্মবোধ, বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্য―এসব বিষয়ে সজাগ ছিলেন, তিনি কখনওই রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে বিচ্যুত হননি। ব্রতচারী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ এদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনসমূহে যোগদান, তথাপি রাজনৈতিক সচেতনতা সমৃদ্ধ একজন সংগঠক হিসেবে উপস্থিতি- শিল্পী কামরুল হাসানকে শিল্পসাধনার একজন উপযুক্ত সমর্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সার্বিকভাবেই একজন শিল্পীর যতটুকু রাজনীতি-সচেতন হওয়া প্রয়োজন, শিল্পী কামরুল হাসানের মধ্যে তার সম্পূর্ণতা দেখা যায়। তিনি একজন সংগঠক হিসেবেও ছিলেন সফল। লড়াকু পটুয়া উপন্যাসের নানা চরিত্রের ভাষায় উঠে আসে এই বিষয়টিও। প্রধান চরিত্রের ঘটনাবহুল জীবনবৈচিত্র্য যেমন খুঁজে পাই তেমনি দেখা মেলে সমকালকে ছাপিয়ে ওঠা তাঁর আদর্শিক সুষ্পষ্ট বক্তব্য। ফলে চরিত্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা সমাজ ও সময়চিত্র ভবিষ্যতের জন্য হয়ে ওঠে শিক্ষণীয়। পটুয়া কামরুল হাসানের ব্যক্তিজীবন, শিল্প জীবনের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক, নান্দনিক চেতনাবোধের মানবিক আখ্যান হয়ে ওঠে উপন্যাসটি। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিল্পীর যাপিত জীবনের প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের জলছবিটি দারুণ সজীবভাবে অঙ্কিত হতে দেখি উপন্যাসে। কোথাও রঙের প্রাবল্য কিংবা দৃষ্টিকটু ঘাটতি তীব্রভাবে চোখে পড়ে না। আমরা জানি, যে কোনো ভাষার মহৎ উপন্যাসে প্রেম, বিরহ বা স্বপ্ন একেকটা অনুষঙ্গ হয়ে আসে। কিন্তু লেখকের উদ্দেশ্য সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনকে দেখানো। তাই সব উপন্যাসই শেষ পর্যন্ত জীবনের উপন্যাস। সেই বিবেচনায় লড়াকু পটুয়াও হয়ে ওঠে মহৎ এক জীবনশিল্প।

২.

বরেণ্য চিত্রশিল্পী পটুয়া কামরুল হাসানের জন্ম ১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর। সেই বিবেচনায় ২০২১ সাল শিল্পীর জন্মশতবার্ষিকীর বছর। উপন্যাসের আলোচনার শুরুতেই তাই লড়াকু পটুয়ার জন্মশতবর্ষের শুভলগ্নে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। কামরুল হাসান ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে জাতীয় কবিতা উৎসবের মঞ্চে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। লড়াকু পটুয়া উপন্যাসের শুরুটাও কামরুল হাসানের জীবন নাটকের শেষবেলার এই উৎসবের মঞ্চকে ঘিরেই। বুকের ব্যথায় এখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানে চরম দুঃসংবাদে দীর্ঘদিনের একান্ত স্বজন ফয়েজ আহমেদকে শূন্যতা, বেদনাবোধ ঘিরে ধরে। বিয়োগ ব্যথায় বলতে থাকেন সেই চিরন্তন সত্যকে, ‘একজন মানুষ মহৎ হয়ে ওঠে, বড় মাপের মানুষ হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। অনেক বছর ধরে। অনেক সময় লাগে তার পরিণত হতে। কিন্তু যখন সে যায়, এক মুহূর্তেই চলে যায়। একেই বুঝি বলে মহাপ্রস্থান।’ তাঁর ভাবনায় পেয়ে বসে―স্বৈরাচার বিরোধী আর গণতন্ত্রের সপক্ষের সেনাপতি কামরুল হাসানের জীবনের শেষ স্কেচ ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে।’ কামরুল হাসানের আঁকা শেষ ছবি। তাঁর উত্তরাধিকার। ‘মহৎ জীবন, মহৎ মৃত্যু। অন্তিমে মহৎ এক সৃষ্টি। সত্যি বলে মনে হয় না এই ঘটনা, যেন বানানো। নাটকের স্ক্রিপ্টের মতো।’ (পৃ: ১৬) জীবনী উপন্যাস লড়াকু পটুয়া পাঠ শেষে নতুন করে চিনতে, জানতে পারি সত্যিকারের মহৎ মানুষ পটুয়া কামরুল হাসানকে। তাঁর জীবনের নানা দিকের উন্মোচনে সচেষ্ট থাকা কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই সেখানে নিজেকেও একটি চরিত্র, সূত্রধর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। পাঠ শেষে গভীর প্রত্যয় হয়েছে―নায়ক চরিত্র পটুয়া কামরুল হাসানও যথাযথ গুরুত্ব দাবি করেন, কিন্তু আত্মিক টান থেকেই রচিত হয়েছে উপন্যাসটি। আমরা জানি, কথাসাহিত্যিকদের কাজ গল্প বলা। গল্পের চরিত্রগুলো বিশ্বাসযোগ্য হলে লেখক সার্থক হন। লেখক তার উপন্যাসের চরিত্রগুলো পাঠকদের সামনে বিশ্বাসযোগ্যভাবে হাজির করতে সমর্থ হয়েছেন। এই উপন্যাস নিটোল কোনো প্রেমকাহিনি কিংবা ইচ্ছাপূরণের গল্প নয়। এটি জীবনেরই উপন্যাস। প্রেম উপলক্ষ হয়ে এলেও এই উপন্যাসে আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের সঙ্গে কঠিন বাস্তবতার টানাপোড়েনের চিত্র নিপুণ দক্ষতার সঙ্গে এঁকেছেন লেখক। হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো উপন্যাসটি শিল্পরসিক তো বটেই, সাধারণ উপন্যাস প্রেমিককেও পটুয়ার বিচিত্র জীবন ও সেই জীবনের নানান টানাপোড়েনের স্বাদ পাইয়ে দেয়। উপন্যাসিক নানাজনের ভাষ্যে পটুয়ার সৃষ্টির মর্মবেদনাকে উপস্থাপন করেছেন যেমন আবেগে, তেমনি নৈর্ব্যক্তিকতায়।

৩.

জীবনীমূলক উপন্যাসের ক্ষেত্রে হাসনাত আবদুল হাই ঈর্ষণীয় সফলতা অর্জন করেছেন। তাই সাম্প্রতিক সমাজের জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান, বিদ্রোহী ও অমিত প্রতিভা চেতনাকে নতুন আঙ্গিকে, নুতন উপস্থাপনায় উপন্যাসে চিত্রণের কাজে হাসনাত আবদুল হাই অনন্য। সমাজের সর্বজন শ্রদ্ধেয়, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে গৃহীত তথ্য ও গল্প নিয়ে প্রতিবেদনপ্রধান এ রকম উপন্যাস সুলতান, একজন আরজ আলী, নভেরা ও হেমিংওয়ের সঙ্গে। তার উল্লেখযোগ্য ও অনন্য সৃষ্টি লড়াকু পটুয়া। বাংলা ভাষায় জীবনীভিত্তিক উপন্যাসের  ক্ষেত্রে লড়াকু পটুয়া বাংলা সাহিত্যে যোগ করেছে অন্যমাত্রা। উল্লেখিত উপন্যাসগুলিতে হাসনাত আবদুল হাই একই কৌশল অবলম্বন করেন―বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলোকে প্রয়োজনানুযায়ী সাজিয়ে, দরকারে ঐসব ব্যক্তিদের সরাসরি উপন্যাসের চরিত্র করে তাদের মুখ দিয়েই তথ্য বা গল্প আকারে তিনি সেগুলো বের করেন এবং লক্ষণীয় তিনি এ কৌশলে ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছেন সার্থক। এ ধারায় যত তিনি সামনের দিকে এগিয়েছেন তার উপন্যাসের নাম-চরিত্রটি হয়ে উঠেছে তত বেশি বিমূর্ত, নৈর্ব্যক্তিক ও শিল্পসার্থক মনে রাখবার মতন মানুষদের একজন পটুয়াকে স্মরণ করা হয় না, হতে দেখা যায় না তেমনটা। সেই প্রেক্ষাপটে আজন্মের নিমগ্ন এই শিল্প সাধককে নিয়ে উপন্যাস রচনা, পাঠ ও শিল্পীর জীবন সাধনার আলোচনা গুরুত্ব দাবি করে। প্রাণের সেই দাবি পূরণেই কলম ধরেন হাসনাত আবদুল হাই, সফলও হয়েছেন তিনি, এজন্য অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমাদের সমাজ পরিবর্তনে ব্রিটিশ ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ পর্বের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিবর্তনের বাঁকগুলো খুঁজে পাওয়া যায় যেমন উপন্যাসে, তেমনই পটুয়ার জীবনের সাথে ছড়িয়ে গিয়ে জড়িয়ে আছে শিল্পকলার পাশাপাশি সামাজিক ইতিহাসের নানা উপাদানও। কালের যাত্রার ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় বলেই অনুসন্ধিৎসু, আগ্রহী পাঠকের জন্য চেতনা জাগ্রতকারী অনন্য উৎস হিসেবে উপন্যাসটি বিশেষ মূল্যায়নের দাবি রাখে। কামরুল হাসানের প্রেম ও বিয়ের কাহিনিও তুলে ধরেছেন জীবন বাস্তবতার নিরিখ। আবার সেই প্রণয়ী স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদের সংকটের  বেদনাভাষ্যও গোপন করেননি কথাকার। একজন বড় শিল্পীর, বড় মানুষের জীবন বেদনার, একাকিত্বের অনুভবের বিভাকে উপস্থাপন করতে ভাষা ব্যবহারে লেখক দারুণ সংযম ও সুরুচির পরিচয় দিয়েছেন। উপন্যাসের শেষে একজন বাবা ও মেয়ের সম্পর্কের উদঘটিত হতে দেখে পাঠক। যদিও সম্পর্কের সেই রহস্য উদ্ঘাটন সংশয়হীন নয়। তবুও সবকিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রধান হয়ে ওঠে সত্য প্রকাশের জন্য একজন সৃজনী ব্যক্তিত্বের আত্মত্যাগ এবং পিতৃহৃদয়ের বেদনার প্রবল অনুভবের করুণ সুর। উপন্যাসে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে মেয়ে সুমনার কথা, আত্মজার প্রতি প্রবল টানের হাহাকার-বেদনার কথা। স্ত্রীর সাথে গোলমালের পর বিতাড়িত কামরুল হাসানের অস্থিরতা, তিক্ততা, যন্ত্রণা আর নিঃসঙ্গতার কথা তুলে ধরতেও ভোলেন না, সৎ ভাইয়ের বাসায় ফয়েজ আহমেদের সঙ্গ যেমন তাঁর নিঃসঙ্গতা দূর করে, তেমনি তুলিও হাতে তুলে নেন। সৃষ্টি হয় ‘তিন কন্যা’।

৪.

উপন্যাসের শুরু থেকেই পাঠক হিসেবে কামরুল হাসানের জীবনের রেলগাড়িতে চড়ে এগিয়ে চলি ঘটনা থেকে ঘটনাপ্রবাহের দিকে। তিনকন্যা ও নাইয়র, প্রদর্শনী ও মূল্যায়ন, ঢাকা ১৯৪৮, হরিণের ড্রইং, ঢাকা আর্ট গ্রুপ, কামরুলের প্রেম, আনন্দ উল্লাসে, পোস্টার আর আলপনা, কাগমারী, শাহবাগে ইনস্টিটিউট ভবন, ডিজাইন সেন্টার, ছবি আঁকার হাতেখড়ি, আর্ট স্কুলে পড়া, চিফ ডিজাইনার, পুতুলের ঘর, তাঁর রমণীরা, লড়াকু কামরুল, কাঠখোদাই ও খেড়ো খাতা, কামরুলের সংসার, মডেল মেয়ে, সুমনার সঙ্গে কথা, বাবার সঙ্গে সন্ধ্যায়, বাবার সঙ্গে সকালের মতন নানা শিরোনামের বিভিন্ন পরিচ্ছদে ভাগ করে তুলে ধরেছেন পটুয়ার জীবনকথা। যদিও জীবন প্রবাহের সময়ের ধারাবাহিকতা মানা না হলেও পারস্পরিক সূত্রগুলোয় ধরতে, বুঝতে বেগ পেতে হয় না বিখ্যাত কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানকে―আজীবন যিনি এঁকে গেছেন বাংলার চিত্রপট। তবে শিল্পীর চাইতে ‘পটুয়া’ নামে পরিচিত হতে পারাটাই তার বেশি পছন্দের ছিল। কামরুল হাসানের ভাষ্য, ‘যামিনী রায়ের যেখানে শেষ, আমার সেখানে শুরু’ (পৃ:৩৩)। নানা ঘটনাপ্রবাহে আমরা জানতে পারি, শিল্পীর আদি নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কালনা থানার নারেঙ্গা গ্রাম। পুরো নাম এ.এস.এম কামরুল হাসান অর্থাৎ আবু শরাফ মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তার বাবার নাম মোহাম্মদ হাশিম ও মায়ের নাম মোসাম্মৎ আলিয়া খাতুন। ১৯৩০ সালে কলকাতার তালতলায় এসাইলাম লেনে অবস্থিত এম. ই. স্কুলের ইনফ্যান্ট ক্লাসে বালক কামরুলের বিদ্যাশিক্ষার যাত্রা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-পরিকল্পিত এই মডেল স্কুলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বাল্যবয়সে কিছুকাল পড়েছেন। কামরুল হাসানের এখানে পড়ার কাল ষষ্ঠ শ্রেণি অব্দি। এরপর বাবার কথামতো ১৯৩৭ সালে ভর্তি হন কলকাতা মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগের সপ্তম শ্রেণিতে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই প্রচুর ছবি আঁকতেন তিনি। তবে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে তার ছবি আঁকার নেশা এমন চড়া হলো যে তিনি অষ্টম শ্রেণিতে পরীক্ষা দিয়ে ওঠার পরিবর্তে আর্ট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেন। এরপর তার বাবাকে অনুরোধ করে স্কুলে ভর্তির লক্ষ্যে একটি পরিচয়পত্র আনার জন্য খান বাহাদুর ওয়ালিউল ইসলাম সাহেবের কাছে যান। তিনি বালক কামরুলের আঁকা দেখে মুগ্ধ হয়ে তার নিজস্ব প্যাডে দু’লাইন লিখে দেন। আর কামরুল হাসান তার ভিত্তিতে ভর্তি হয়ে যান ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস’ এ ১৯৩৮ সালের জুলাই মাসে। বাবা ধার্মিক হওয়ায় কামরুলকে তার পড়াশোনার খরচ নিজে চালানোর শর্তে আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে হয়। তবে বাংলা ১৩৫০ তথা ইংরেজি ১৯৪৩ সালে মন্বন্তরের সময় পত্রিকায় জয়নুল আবেদিনের স্কেচ দেখে কামরুলের বাবার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয় এবং তিনি কামরুলকে কবরের নকশা আঁকার কাজ জোগাড় করে দেন। তবে কামরুল নিয়মিত আয়ের জন্য একটি পুতুল কারখানায় পুতুলের চোখ আঁকার কাজ নেন। প্রখর সেলুলয়েডের আলোয় চোখ আঁকতে গিয়ে তার নিজের দৃষ্টিশক্তিই কিছুটা কমে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ‘ফরোয়ার্ড ব্লকে’ যোগ দেন। ‘মণিমেলা’ ও ‘মুকুল ফৌজ’ নামক দুইটি শিশু কিশোর সংগঠনের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। এরমধ্যে ‘মুকুল ফৌজের’ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। এসব নানাবিধ কাজে জড়িত থাকায় কামরুলের আর্ট স্কুলের ছয় বছরের কোর্স শেষ করতে নয় বছর লেগেছিল। বিভিন্ন সমস্যায় তাকে ভর্তি হতে হয় ড্রাফটম্যানশিপ বিভাগে, কারণ এই বিভাগ  থেকে চাকরি পাওয়া বেশ সহজ ছিল। পরে তিনি চারুকলা বিভাগে ভর্তি হয়ে যান এবং সেখান থেকেই ১৯৪৭ সালে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ভারত বিভাগের পরে, কামরুল হাসান ঢাকাতে চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকার প্রথম আর্ট স্কুল ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস’ (বর্তমান চারুকলা বিভাগ) প্রতিষ্ঠার পেছনে তিনি বেশ সক্রিয় ছিলেন।

৫.

পটুয়ার সৃজনী জীবনের আলো-ছায়ার দেখা মেলে তেমনি উপন্যাস গতি পায় রাজনৈতিকভাবে মানবকল্যাণমুখী বাম মতাদর্শের অনুসারী কামরুলের স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বহু আন্দোলনে যুক্ত থাকার কাহিনিতে। উপন্যাসে দেখা মেলে তৎকালীন সমাজচিত্র, যে পরিস্থিতিতে শিল্পচর্চা করাটা ছিল বেশ দুরূহ, কারণ তখন ঢাকায় ছিল রক্ষণশীল সর্দারদের প্রবল আধিপত্য। শুধু চারুকলাই নয়, বরং সংস্কৃতি চর্চামাত্রই এসব মহল থেকে বাধা আসতো। ১৯৫০ সালে মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেঁধে যায়। এমতাবস্থায় ঐ বছরই আর্ট ইনস্টিটিউটের বাইরে শিল্প আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’ গঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন জয়নুল আবেদিন এবং কামরুল হাসান ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্টস’ (বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউট)-এ এগারো বছরেরও বেশি সময় শিক্ষকতায় নিয়োজিত থেকেও কামরুল হাসান এ দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৫২ সালে এদেশে প্রথম রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে আর্টস ইনস্টিটিউটের ছাত্র আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন, রশীদ চৌধুরীসহ অনেকেই সক্রিয় ছিলেন। ছাত্র-শিল্পীদের সঙ্গে শিল্পী কামরুল হাসানও সেদিন এসব কাজে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬০ সালে ঢাকার একটি শিল্প প্রদর্শনীতে অংশহগ্রহণ, ১৯৬৪ সালে ঢাকায় একক শিল্পকলা প্রদর্শনী, ১৯৬৯ সালে রাওয়ালপিন্ডি সোসাইটি অব কনটেমপোরারি আর্ট গ্যালারিতে একক শিল্প প্রদর্শনী, স্বাধীনতা-উত্তর বেশকিছু একক ও যৌথ শিল্প প্রদর্শনী তার শিল্পকে সাধারণের আর নিকটবর্তী এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন করতে সহায়তা করে। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে কামরুল হাসানের একটি একক শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় যেখানে স্থান পেয়েছিল ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাঁর আঁকা ১৫৬টি শিল্পকর্ম। পটুয়ার এই জীবনপথে দেখি শিল্পের দায় শিল্পের শক্তির রূপকল্প হয়ে উঠেছেন তিনি এ উপন্যাসের আদলে।

৬.

বাঙালির লোকজ ঐতিহ্যের চেতনাধারা উজ্জীবিত করতে আন্তরিক প্রয়াসী আজন্মের পটুয়ার লড়াইতে প্রাপ্তি বা সম্মাননার যোগসূত্রগুলোও গুরুত্ব বহন করে। ১৯৬৫ সালে কামরুল হাসান প্রেসিডেন্ট পুরস্কারে (তমঘা-ই- পাকিস্তান) ভূষিত হন। ১৯৭৭ সালে কুমিল্লা ফাউন্ডেশন শিল্পী কামরুল হাসানকে তাঁর শিল্পকর্মের জন্য প্রদান করে স্বর্ণপদক। এ ছাড়াও, ১৯৭৯ সালে ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’, ১৯৮৪ সালে ‘বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মান’, ১৯৮৫ সালে কাজী মাহবুবউল্লাহ ফাউন্ডেশন পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালেই তাঁর বিখ্যাত তৈলচিত্র ‘তিনকন্যা’ অবলম্বনে একটি সুদৃশ্য ডাকটিকেট প্রকাশ করে তৎকালীন যুগোশ্লাভ সরকারের ডাক, তার ও টেলিফোন বিভাগ (২ ডিসেম্বর ১৯৮৫)। এটিই ছিল কোনো বিদেশি সরকার কর্তৃক বাংলাদেশি কোনো শিল্পীর শিল্পকর্ম সংবলিত ডাকটিকেট প্রকাশের প্রথম ঘটনা। ১৯৮৫ সালে তিনি মনোনীত হন বাংলা একাডেমির ফেলো হিসেবে। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের ডাকবিভাগ কর্তৃক তৃতীয় দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী উপলক্ষে কামরুল হাসানের ‘নাইওর’ চিত্রকর্মটি অবলম্বনে ৫ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশিত হয়। জোটনিরপেক্ষ দেশসমূহের জন্য টিটোগ্রাদে স্থাপিত চিত্রশালা, লন্ডনের কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউট, জাপানের ফুকুওকা মিউজিয়াম, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর এবং পৃথিবীর বহুদেশের শিল্পরসিকদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে কামরুল হাসানের বহু চিত্রকলা সংরক্ষিত রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি (প্রায় দেড় হাজার) সংগ্রহ রয়েছে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে।

৭.

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষার্ধে কামরুল হাসানের শিল্পী জীবনের এক অন্যতম কাজ হচ্ছে―বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত নকশা অঙ্কন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সংগ্রামী ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের যে জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়েছিল তার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় পতাকার রূপ দেন। এর পাশাপাশি তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারি প্রতীক, বাংলাদেশ বিমান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতীক অঙ্কন করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানের কভার ডিজাইনেরও রূপকার তিনি। ১৯৭১ সালে কামরুল হাসানের আঁকা ইয়াহিয়ার দানবমূর্তি বিষয়ক কার্টুন সংবলিত পোস্টারটির ভাষা ছিল―‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’। সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই পোস্টারটি সম্পৃক্ত হয়ে আছে। ঢাকা শহরে বৈশাখী মেলা আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন কামরুল হাসান। বাঙালিত্বের চেতনা ও জাতীয়তাবাদের প্রসারের লক্ষ্যেই তিনি ঢাকায় বৈশাখী মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা করেন।

৮.

১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কামরুল হাসান জাতীয় কবিতা উৎসবে যোগ দেন। সেখানে স্বরচিত কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতিত্ব করছিলেন। তখনই কবি রবীন্দ্র গোপের ডায়রির পাতায় আঁকেন সে সময়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদকে নিয়ে কার্টুনচিত্র ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’। সে উৎসবেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ চত্বরে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পাশে সমাহিত করা হয়। ফয়েজ আহমেদের নেতৃত্বে তাঁকে সমাধিস্থ করার  কৌশলী ভূমিকাও দারুণ সজীবভাবে উল্লেখিত হয়েছে উপন্যাসে। কামরুল হাসানের জীবনে ঘাত-প্রতিঘাতের নানাচিত্রের পাশাপাশি তাঁর প্রিয়তম বন্ধু, স্বজন ত্রৈমাসিক পত্রিকা খ্যাত সম্পাদক মিজানুর রহমানের, কবি হাবিবুর রহমানদের অনেকের ইতিবাচক ও সহমর্মী ভূমিকাও খুঁজে পাই। জীবনের নানা শূন্যতা পূরণে ফয়েজ আহমেদের, মিজানুর রহমানদের পরম হিতাকাক্সক্ষীর সক্রিয়তা আমাদের আশাবাদী করে। উপন্যাসে উঠে এসেছে খেরো খাতায় ফুটিয়ে তোলা রোজনামচায় যাপিত জীবনের শব্দচিত্রও। জীবনের ঝড়গুলোকে সামলেছেন শিল্প সাধনায় মগ্ন চৈতন্যে, আলোচনা-সমালোচনা- বিতর্কের মাঝেও তিনি ছিলেন আপন সৃজনে সক্রিয়।  বেদনার ভার কিংবা সাময়িক নিরাশা তাকে কাবু করতে পারেনি। শিল্পীর সামাজিক ভূমিকা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন. শিল্পীদের মধ্যে তিনিই প্রথম বৃহত্তর প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখালেখিও করেছেন। বহুতল সৃজনশীলতায় ঋদ্ধ শিল্পী হিসেবে তিনি সতত নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ায় আগ্রহী ছিলেন।

৯.

লেখালেখিই সৃজনশীল কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই-এর একান্ত সাধনার বিষয়। বহুমাত্রিক লেখক, স্বনামধন্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিক হিসেবে সুপরিচিত হাসনাত আবদুল হাই। লিখেছেন গল্প উপন্যাস কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী এবং নন্দনতত্ত্ব নিয়ে। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই তিনি লিখেছেন এবং সমান দক্ষতা অর্জন করেছেন। বাংলা ভাষার অন্যতম সফল কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই-এর উপন্যাস―লড়াকু পটুয়া ছাড়াও সুলতান, একজন আরজ আলী, নভেরা, ভ্রমণকাহিনি আন্দালুসিয়া, ইতালিয়া কিংবা গবেষণাগ্রন্থ সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব, শিল্পকলার নান্দনিকতা পাঠকপ্রিয় হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের জীবন অবলম্বনে, হেমিংওয়ের সঙ্গে নামেও উপন্যাস লিখছেন হাসনাত আবদুল হাই। বাংলা ভাষা-সাহিত্য- সংস্কৃতির আজন্মের নিরলস সেবক হাসনাত আবদুল হাই-এর ঔপন্যাসিক প্রতিভা সম্পর্কে পাঠক দীর্ঘদিন ধরেই জ্ঞাত। সেখানে আরেকটি মাত্রার সংযোজন আমার মতন অসংখ্য পাঠককে বিমোহিত করেছে, করে চলছে। সেটা হলো জীবনীমূলক উপন্যাসে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে জীবনীমূলক উপন্যাসের অনন্য এক রূপকার হিসেবে তিনি আমাদের অনেকের কাছেই বিশেষ সম্মানিত, রচনার গুরুত্বের কারণেই আলোচনারও দাবি রাখেন। হাসনাত আবদুল হাই সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে হাসনাত আবদুল হাইয়ের সরল স্বীকারোক্তিটিও স্মরণযোগ্য, ‘জীবনীভিত্তিক উপন্যাস লিখে তৃপ্তি পেয়েছি’। জীবনীভিত্তিক উপন্যাস লেখার অনুপ্রেরণা বিষয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষায় জীবনীভিত্তিক উপন্যাস কমই লেখা হয়েছে। এ জন্য আমি জীবনীভিত্তিক উপন্যাস লিখতে উৎসাহী হই। জীবনীভিত্তিক উপন্যাসে বাস্তব যে চরিত্র-তা শতকরা ৮০ ভাগ উপস্থিত থাকে। বাকি ২০ ভাগ আমার কল্পনার মিশেল। যদি পুরোপুরি বাস্তবজীবন নিয়ে লিখি তাহলে তা বায়োগ্রাফি হয়ে যাবে। আমি তো বায়োগ্রাফি লিখতে চাই না। লিখতে চাই ফিকশনালাইজড বায়োগ্রাফি। জীবনীভিত্তিক উপন্যাস অর্থাৎ তার মধ্যে বাস্তবতা থাকবে কল্পনাও থাকবে। এখানে কল্পনার অংশ বেশি করে দিলে সেটা অবাস্তব হয়ে যাবে। সুতরাং আমি যেটা কল্পনা করেছি তার সঙ্গে বাস্তব চরিত্রের একটা মিল থাকতে হবে, সামঞ্জস্য থাকতে হবে। একেবারে বিদঘুটে কিছু করলে হবে না। আরজ আলী মাতুব্বরের নির্মোহ বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন আমাকে আকর্ষণ করেছিল, আর এ জন্য লিখেছিলাম একজন আরজ আলী। কামরুল হাসানকে নিয়ে লেখা লড়াকু পটুয়া সম্বন্ধেও একই কথা বলা যায়।’

১০.

সাহিত্য সমালোচকদের মতে উপন্যাসের প্রাণ এর কাহিনি। কাহিনি গড়ে ওঠে থিম ঘিরে। আর কাহিনি জীবন্ত হয়ে ওঠে চরিত্রগুলোর সার্থক রূপায়ণের ভেতর দিয়ে। বিষয়বস্তু নির্বাচন, গল্পের কাঠামো তৈরি এবং গল্প বর্ণনা, এ সবই শিক্ষণীয় বিষয়। তাছাড়া অনুভূতির বর্ণনা ও বিশ্লেষণ আজকের দিনের উপন্যাসের বড় বৈশিষ্ট্য। সেই বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখি পরিস্থিতির বা অনুভূতির বয়ান, ফলে পাঠক পায় অন্য রকম ভাব-অনুভবের গল্প বা চরিত্রায়নে আদর্শ চিন্তা ও আশা-অভিরুচি এবং বাস্তবের মধ্যে সংঘাতের ফলে  মোহভঙ্গ ও সত্যোপলব্ধি ঘটতে দেখা যায়। লেখকের ব্যক্তিগত দক্ষতাই তাকে উন্নত সাহিত্যে পরিণত করতে পারে। গল্পের জাদুতে কল্পনার মিশেল ঘটনাগুলোও সত্য মনে হয়। কারণ বাস্তববাদী শিল্পীর ভাব- কল্পনার ভিত্তি বাস্তবজীবন। উপন্যাসের শিল্পসিদ্ধির প্রশ্নে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত হয়। সদাপ্রত্যক্ষ এই জীবনযাপনের বাইরেও তো মানুষের আরও একটি জগৎ থাকে―ভাবনার পরিমণ্ডল! এখানে কিন্তু অন্যের হাত সামান্য, এর স্বয়ম্ভু বিশ্বকর্মা সে নিজেই, ওই মানুষটি। তিনি যদি হন শিল্পী অথবা কোনো এক মহান আদর্শে বুক বেঁধে জীবনের সিঁড়ি ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়া প্রত্যয়ী ধীমান―তাঁর ক্ষেত্রে এ জগৎটি আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।  যেমনটি উপন্যাসে পটুয়ার জীবনের ক্ষেত্রেও ঘটতে দেখি এ-রকম অনেক কিছু। পটুয়া বহুক্ষেত্র-বিচরনের মানুষ হলেও তার অধিকাংশ পদক্ষেপের আত্মপ্রণোদনার উৎস কিন্তু চিন্তার নির্দিষ্টতা থেকে আদর্শের নিগূঢ় আন্তঃপ্রেরণায়। সজীব ও বিশ্বাস্য করে হাসনাত আবদুল হাই তাদের এঁকেছেন। জীবনের অনেক জটিল বিষয়, দুর্বিষহ ঘটনার ছবি উপন্যাসের ক্যানভাসে তুলে আনার কাজটা সহজ ছিল না। সাধারণের দৃষ্টিতে অনেক সস্তা চটুল ছবিও যেমন মনে হতে পারে দামি-কালজয়ী শিল্পকর্ম, ততটাই মূল্যহীন হয়ে উঠতে পারে সত্যিকারের সেরা ছবি। কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীই কেবল আরেকজন জাত শিল্পীর শিল্পের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারেন।  লেখক হাসনাত আবদুল হাই কথাশিল্পী হিসেবে কলমকে রং-তুলি বানিয়ে উপন্যাসের ক্যানভাসে যথার্থভাবেই আঁকতে সক্ষম হয়েছেন শিল্পী কামরুল হাসানের বিচিত্র জীবনের ছবি। হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো উপন্যাস লড়াকু পটুয়া রচনার জন্য সফল কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাইকে সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares