আলোচনা : উপন্যাস―হাসনাত আবদুল হাই : হাসনাত আবদুল হাইয়ের উপন্যাস নবীর নৌকা : আদৃতা মেহজাবিন

‘নবীর নৌকা নামটা পড়ার সাথে সাথেই যেন মনের সাথে প্রকৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। দৃষ্টির সীমানায় ভেসে আসে নৌকা ও জলের মনোলোভা এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। উপন্যাসের নামকরণ যদিও ঔপন্যাসিক রেখেছেন নবীর নৌকা তবে এই গল্প শুধু নৌকার মাঝেই স্থির করে রাখেননি। একটি বই পড়ার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই বইয়ের নামকরণ একটি মুখ্য ভূমিকা রাখে। নবীর নৌকা উপন্যাসটিও তার ব্যতিক্রম নয়।

উপন্যাস শুরুর সাথে সাথেই বর্ণিল কিছু চরিত্রের সাথে যেন নিজেও প্রবেশ করলাম ছেঁড়াখোঁড়া দুষ্টু বালকের ঘুড়ির মতো মেঘ আর বৃষ্টিতে সয়লাব শান্ত ভেজা এক পবিত্র গ্রামে।

বেশ কয়েকদিন ধরেই বৃষ্টি ঝরছে। কোনো কারণেই থামাথামির কোনো ইচ্ছে নেই। অভিমানী বালিকার মতো অল্প কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে বাঁধভাঙা অভিমান জল হয়ে আবার ওপর থেকে নেমে আসছে।

চলুন পাঠক গ্রামীণ কিছু মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনাবলি আমরাও একটু দেখে আসি। সরল বর্ণনায় শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনার মাঝে কী ঘটছে সেখানে আমরাও তার কিছু সাক্ষী হই।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নবী পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনমতে বাস করে চাল খসে যাওয়া এক ছনের ঘরে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। দমকা হাওয়া বারবার নড়বড়ে ঘরটিকে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে। তার স্ত্রী জরিনা  সন্তানসম্ভবা। নিয়তির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নবী ঘুরঘুট্টি অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছে। বৃষ্টিতে ভিজছে তার কাঁধ, বুক। ছেঁড়াখোঁড়া ভেজা কাপড় লেপ্টে তার পাশে শুয়ে আছে জরিনা ও তাদের সন্তান মনু ও বানুকে নিয়ে। ক্রমশ বেড়ে উঠতে থাকা বৃষ্টির কারণে যখন ঘরে আর একরত্তি শুকনো জায়গা নেই, তখন জরিনা আবদারে গলায় বলে গতবছরই কইছিলাম ঘরডা সারাও, হুনলা না তো ফুটাফাটা চাল দিয়ে পানি পড়বে না তো কি ? হায় হায় রে অ্যাহন কি করা ?

উঠোনে চড়বড় চড়বড় করে বৃষ্টি পড়ছে। সারা ঘর দিয়ে পানি পড়ছে আশ্রয় নেওয়ার কোনো জায়গা নেই, ঘরে খাবারের সংস্থান নেই। গণ্ডির বাইরে এসে জীবনকে খোলা চোখে দেখে সমাজের তথাকথিত অধিপতি  আবুল মৃধার ফাঁকিগুলো তার বুকে শেলের মতো বিঁধে। পুরো উপন্যাসজুড়েই এই অসহনীয় দুর্দশা দাঁড়িয়ে রয়েছে অটল-অবিচল।

বৃষ্টিটা ধরে এসেছে এখন, কিন্তু আকাশের চেহারায় কোনো পরিবর্তন নেই। কালো আর গভীর ধূসর মেঘ নিজেদের মধ্যে ফুটবল খেলোয়াড়দের মতো জায়গা দখল করে নিচ্ছে ধীরে সুস্থে। আকাশটা তাদের ঠাসাঠাসি ভিড়ে পুরো ঢাকা। নবী ভাবে এই রকম আর কয়েকদিন চলতে থাকলে বান না এসে থাকতে পারে না। সে গ্রামের মাথা আবুল মৃধার কাছে অগ্রিম টাকা নেওয়া এক নৌকা শ্রমিক। সে শিল্পী। তার কাজ নৌকা তৈরি। সাথে দুজন যোগাল থাকলে, র‌্যাদা ছেনি, হাতুড়ি, পাতিম ঠিকঠাক থাকলে নৌকা বানানো তার জন্য কোনো বড় ঘটনা না। এর আগেও সে নৌকা বানিয়েছে। আর তার বানানো শক্ত ও মজবুত নৌকা নিয়েই নদী পাড়ি দিয়ে বন্দর থেকে বন্দরে মালামাল পৌঁছে দিচ্ছে মৃধার লোকজন।

ভারি শৌখিন মানুষ মৃধা। তিন বৌ পরপর শুধু মেয়ে জন্ম দিয়ে চলেছেতার চাই নতুন স্ত্রী। যে স্ত্রী তার জন্য বংশধর হিসেবে ছেলে জন্ম দিতে পারবে। পারবে মৃধার শরীরে সুখের বন্যা বইয়ে দিতে। কিন্তু বৃষ্টিটা বড্ড জ্বালাচ্ছে। সামনে বিয়ের অনুষ্ঠান। গরু মেরে লোক না খাওয়ালে বিয়ে আবার বিয়ের মতো হয় নাকি? ইশ কী সব ঝামেলা।

এর মাঝে আবার আরেক যন্ত্রণা মাটির নিচে লুকানো লবণ নিয়ে। হু হু করে বাড়ছে লবণের দাম। ৩০০ বস্তা ৫০০ বস্তা ও ১০০ বস্তার নৌকা রওনা হয়েছে বিভিন্ন বন্দরে। কিন্তু ৯০০ বা হাজার বস্তা

লবণ নেওয়ার মতো নৌকা এখনও তৈরি হলো না? ব্যাটারা পেয়েছেটা কী?

আজীবন তার ঘরে পোষা ডান হাত নওয়াবকে পাঠায় মৃধা নবীর বাড়িতে। তিন দিনের মাঝে নৌকা ভাসাতে হবে মাঝ দরিয়ায়। ঝড় তুফান যাই থাকুক বৃষ্টির ছুঁতোয় ফাঁকি দেওয়া চলবে না। নৌকা যেন নদীতে ভাসে। ছপছপ শব্দ তুলে এগিয়ে চলে নওয়াব। উফ অসময়ের এই অসহ্যকর বৃষ্টির আর বিরাম নেই।

নবীর বাড়িতে গিয়ে নবীকে তাগাদা দেয় নওয়াব। চাইট্টা পানতা খাইয়া আহি। নবীর উত্তর।

পানতা? মৃধার ডাকের পরেও আবার দেরি করার শখ? ছোটলোকদের সাহস দেখে অবাক হয় নওয়াব।

এদিকে নবীর ঘরে অন্ন নেই, ঘরের চালের ঠিক নেই। তার মাঝে মৃধার হুকুম। যেতেই হবে। ছেড়া শার্টটা আর বুঝি গায়ে দেয়া চলে না। এই জোর বাতাসে। এতো  ছেঁড়া শার্টটা সে গায়ে দিয়ে বাইরে বের হয় কি করে ? তবুও জীবন যখন, থামিয়ে রাখলে তো চলতে পারে না। বৃষ্টির মাঝেই ছপছপ শব্দ তুলে গোড়ালি ভিজিয়ে বাজারের দিকে এগিয়ে যায় নবী, এভাবেই উপন্যাসটির শুরু হয়।

গ্রামের অসহায় মানুষগুলোর আরও অনেক বেশি পরিমাণ  দুর্দশার চিত্রের দেখা মেলে উপন্যাসের ১৯ পৃষ্ঠায়। সুজন মিস্ত্রির বাড়ির সামনে মস্ত এক ডাল পড়ে ভেঙে পড়ে আছে। জ্বরে কাঁপছে সুজন। এমন সময়ে আবুল মৃধার সমন নিয়ে হাজির হয় নবী। সুজন আছো ? হুকুম হয়েছে। তিন দিনের মাঝে নাও ভাসাতে হবে। জ্বর তপ্ত সুজন মুখ বাড়িয়ে বলে। আরও জোগালি নাও ভাই। আমি তো জ্বরে পড়েছি। ‘উপায় নাই ভাই, যেতেই হবে। নতুন জোগালি নেওয়ার মানুষ মৃধা না। তার কাছ থেকে অল্প হলেও অগ্রিম নিয়ে সংসার চালিয়েছে। আমরা তার কাছে বান্ধা। জ্বরে কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটা কাঁথার নিচে টেনে নিতে নিতে বলে সুজন। গোড়ালি পর্যন্ত পানিতে ডুবে যাওয়া পা নিয়ে ফিরে চলে নবী। খন্দা, পেরেক, পাতিম প্রয়োজন। নইলে নৌকা তৈরি শেষ করার কাজে সে হাত দেবে কি করে ? বাজারের দিকে যেতে হবে। শ্রীকান্ত কামারকে ধরতে হবে। এই উপকরণগুলো ছাড়া কাজ করা অসম্ভব।

পুরোপুরি  বর্ষা আসার আগেই বৃষ্টিতে জান জীবন অতিষ্ঠ। নেই তেমন আয় রোজগার তারপরেও অন্তত পনেরো দিনের কাজ। তিন দিনে বেঁধে দিয়েছে মৃধা। তার পালিত বান্ধা নওয়াব জানিয়ে গেছে তিন দিনে নাও ভাসাতে হবে নইলে মস্ত ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে মৃধার। মাটির নিচে গুপ্তধনের মতো লুকিয়ে রাখা লবণসহ নৌকা বন্দরে পাঠাতে পারলে আবুলের শান্তি।

অস্থির মুহূর্তে সংসারের ঘানি টানতে টানতে হাঁপিয়ে উঠেছিল নবী ও অন্ধকারাচ্ছন্ন চলার পথে একটু আলোর দিশা পাবার লোভেই তার শ্রীকান্তের কাছে আসা । কিন্তু বাস্তবতার চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। পেশকারের বাজার নিজস্ব সমস্যায় জর্জরিত, বৃষ্টি বাদলায়  বাজার  জমেনি। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে শ্রীকান্ত কামারের  সমস্যা। না, একটি জিনিসও তৈরি হয়নি। লোহার সংকট এবং দাম দুটোই বেড়ে গেছে। মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে জোগানের সামঞ্জস্য নেই। একা মানুষ হাঁপর ফুলিয়ে, হাতুড়ি দিয়ে লোহা পিটিয়ে কতটুকু আর কাজ আগানো যায় ?

উপন্যাসের শুরুতেই একটি প্রতীকী লাইনে দৃষ্টি আটকে যায় – ‘নবীরে তোর নাওগুলা আমারে দৌলত আনতিছে। চাঁদ সওদাগরের পরেই আমি।’

অভাবের তাড়নায় নবী পেটের ভাত পর্যন্ত জোগাতে পারে না। মৃধার এই অন্যায় তাকে বড্ড কষ্টে ফেলে দেয়। কী করে সম্ভব লোকবল ছাড়া, উপযুক্ত উপকরণ ছাড়া মাত্র দুজন জোগালি সাথে নিয়ে তিন দিনের মাঝে নৌকা ভাসানো?

পৃষ্ঠা – ৩১

নবীর নৌকা  উপন্যাস যত গভীরে প্রবেশ করছি ততই যেন মনে হচ্ছে মহাপ্লাবনের পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে লেখা একটি মহা-কাব্যিক উপন্যাসের স্বাদ পাচ্ছি। কখনও ব্যাপকভাবে, কখনও স্বল্প পরিসরে আবার কখনও অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে লেখক সংক্ষিপ্ত চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমে একটি মহাকাব্যকে তুলে ধরেছেন।

পুরো উপন্যাসজুড়ে বেশ কয়েকটি চরিত্র আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। তার মাঝে আবুল মৃধার  ছায়াসঙ্গী নওয়াবও একজন। খুব ছোটবেলায় বাবা তাকে এই মৃধা-বাড়িতে এনে কাজে লাগিয়ে দেয়। আবুল মৃধার ডান হাত এখন সে। অথচ এক দিন কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি প্যাঁকাটির মতো শরীরের মানুষটা একদিন হাতির মতো জোয়ান হবে। মৃধার সব কাজের হাতিয়ার হয়ে উঠবে ।

তবে মৃধার মনে এখন চরম প্রশান্তি, মনের সুখে নবীকে গালিগালাজ দিয়েছেন তিনি। নবী দুয়েকটা অজুহাত তোলার চেষ্টা চালিয়েছে। অকাল বৃষ্টিতে নাকি তছনছ হয়ে গেছে জিনিসপত্র। ছুতোর মিস্ত্রির একজন অসুখে পড়ে আছে। জোগালি দুজন বাড়ি চলে গেছে। এসব ফিরিস্তি তিনি শুনতে চান না। তার ন’শো-মণী বালাম নৌকা চার মাসের মাঝে পানিতে ভাসার কথা ছিল। অথচ সময় চলে গেল পাক্কা পাঁচ মাস!  আর সময় দেওয়া যায় না। এদিকে তার বিয়ের খবর শোনার পর থেকে পুরাতন তিন বিবির মাঝে আবার আন্দোলন শুরু হয়েছে। কাটা কাটা কথা শোনাচ্ছে তারা। সব্বাই তার শত্রু।

অন্দর মহলে ডাক পড়েছে নওয়াবের। ডাক দিয়েছেন মৃধার ছোট বিবি। বাপের বাড়ি চলে যেতে চান তিনি। নওয়াব কি কোন ব্যবস্থা করতে পারে ? এই বৃষ্টির মাঝে কি করবে নওয়াব ভেবে পায় না। মৃধার নুন খেয়ে যে মানুষ সে তো আর বেঈমানি করতে পারে না।

কিন্তু ঘটে যায় অঘটনমৃধার ছোট বিবি ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করে। তার মৃত্যু প্রথম প্রতিবাদ হয়ে ফিরে আসে আবুল মৃধার জীবনে। এদিকে বৃষ্টি বাড়ছে। পানি তার বাগান ছাড়িয়ে সিঁড়ি ছুঁই ছুঁই।

এদিকে আবুল মৃধার কন্যাকে ভালোবাসার অপরাধে বাড়ি থেকে অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হয় ফরিদ নামে এক যুবক। অন্য গ্রাম থেকে মানুষ আসছে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে। আশ্রয় কই? একটা শেল্টার, সেটিও আবুল মৃধার দখলে।

 আটটি পরিবারকে ভিজে চুপসে যেতে দেখে ফরিদ তাদের নিয়ে আসে সরকারি শেল্টারের দিকে। উপায় নেই। শান্ত রূপসা নদীতে বাঁধ দেয়া হয়েছে। ফুঁসে উঠেছে রূপসা। বাঁধ ভেঙে গেছে।

পানি বাড়ছে। মজিদের বানানো কলার ভেলা উলটে পড়ছে। বীজ ধান নষ্ট হবে। হাঁস মুরগি গরু ছাগল ডুবে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে মানুষের বহু পুরাতন সংসার। এ কোন খেলায় নেমেছে প্রকৃতি ?

পাগলা জবেদ আলি হাত বাড়িয়ে শুধু বলছে ‘জমি দে’।

ঠিক সেই মুহূর্তে নবী পৌঁছায় মৃধার বালাম নৌকার কাছে। হায় হায় নৌকার সব পাটাতন চুরি হয়ে গেছে। এই বৃষ্টি বাদলায় কেউ পাহাড়ায় থাকেনি। এখন কি হবে। শাল অর্জুন ও গড়াই কাঠের সব পাটাতন। মৃধা খবর পেলে মেরে ফেলবে নির্ঘাত। ট্রলারে করে রিলিফ এসেছে ভেবে এগিয়ে যায় লোকজন। কিন্তু হায় এরা তো শুধু ছবি তুলতে এসেছে। রিলিফ কই ? হ্যাঁ একটা নৌকা দেখা যাচ্ছে বটে তবে সেটা মৃধার। ঘটিবাটি যা আছে দাও। তার বদলে নাও রিলিফের বিস্কুট বা গম। হায়রে নিয়তি। কেউ বিপদে পড়ে কেউ তার ফায়দা লোটে।

পানি বাড়ছে হাঁটু ছাড়িয়ে কোমর, হয়তো তারও বেশি। নবী আধ্ সের গম কর্জ করে ঘরে ফেরে। সবাই ভেলা বানাতে ব্যস্ত। তার একটা ভেলাও নেই। হঠাৎ তার মনে পড়ে আছে আছে। আশ্রয় নেবার মতো একটি জায়গা অবশিষ্ট আছে। সেখানে ধরবে সবাইকে। সবার সংসার। একটু শুকনো আশ্রয় সব হবে।

নিকষ কালো রাত্রির বুকচিরে কিছুই এখন স্পষ্ট দেখা যায় না। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি প্রতিহত করছে গতি। বহুকষ্টে ধীর পায়ে এগুতে থাকে সবাই। কারা ওরা ? মৃধার শেল্টারে আশ্রয় না পাওয়া মানুষগুলো। নবীর পরিবার, মজিদের পরিবার, ফরিদ ও মরিয়ম।

পায়ের নিচে বেগবান পানি, খড়কুটো ডালপালা। যেতে যেতে হোঁচট খেয়ে পড়ে ওরা। খানা খন্দক থেকে উঠে এসে আবার রাস্তা আঁচ করে হাঁটতে থাকে। বৃষ্টিতে, বন্যার পানিতে মাখামাখি হয়ে বিপর্যস্ত হয়। সেই সময় তারা শব্দটা শোনে। শো শো করে ছুটে আসছে যেন অনেকগুলো ক্ষুধার্ত  অজগর।

আবার মনে হয় অনেক বুনো জন্তুর ক্রুদ্ধ কোলাহল।

ক্রমেই শব্দ তীব্রতর হতে থাকে। অবিশ্রাম বৃষ্টির বর্ষণকে আলোড়িত করে আতঙ্ক ছড়ায়। প্রায় কোমর পর্যন্ত বেগবান পানি চারিদিকে নিñিদ্র অন্ধকারে কেবলই শাসাতে থাকে।

নবী চিৎকার করে বলে ওঠে। তাড়াতাড়ি চলো সবাই, সময় নাই।

এক সময় সবাই সেই বালাম নৌকায় ওঠে। মানুষ ওঠে, হাঁস মুরগি ওঠে।

কালু খলিফা প্রাণপণে তার সেলাই মেশিন টেনে তোলে। শ্রীকান্ত কামার সঙ্গে এনেছে তার ভেজা হাঁপর। কেরামত নিয়ে আসে সাজানো ধানের চাড়া। তারপর জায়গা খুঁজে বসে পড়ার আগেই, আপনজনের খোঁজ খবর নেওয়ার সময় না দিয়েই দেয়ালের মতো উঁচু পানির ধাক্কায় নৌকাটা ঘুরে যায়। যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খায়। নবী চিৎকার দিয়ে বলে হেইয়ো হুঁশিয়ার, সব বইসে পড়ো, নৌকা ভাসিতেছে। হুঁশিয়ার।

 যেন কালের অতল থেকে একটি শব্দ বের হয়ে আসে। ‘হুঁশিয়ার ,হুঁশিয়ার। 

অবশেষে এটুকু বলা যায় নবীর নৌকা উপন্যাসে রয়েছে সংক্ষিপ্ত এপিকের মাঝে এক অপার বিশালতা। এতে উঠে এসেছে গ্রামীণ কিছু মানুষের কয়েকদিনের জীবন-উপাখ্যান। তুলনীয় রহস্য ও রোমাঞ্চের সাথে রয়েছে জাগতিক ও সাংসারিক বেদনার্ত উপাখ্যান। মূলত উপন্যাসজুড়ে আত্মমগ্ন এই মানুষগুলো ছুটে বেড়িয়েছে অনিশ্চয়তার পথে। কিন্তু কীভাবে সেটা জানতে হলে পাঠককে হাতে নিতে হবে নবীর নৌকা।  নিম্নবিত্ত ও শোষিত শ্রেণির জীবনের সংকট-টানাপড়েন যেখানে জমাট বাঁধা মেঘের মতো স্থির হয়ে আছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে জীবনের সংকটময় যে চিত্র প্রথিতযশা লেখক হাসনাত আবদুল হাই তাঁর কলমের শক্তিতে রূপায়িত করেছেন তা পাঠক চিত্তকে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম। উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর চিন্তা এবং মননশীলতার বিবর্তন দেখিয়েছেন। আমার দৃষ্টিতে মহা-কাব্যিক ব্যঞ্জনায় রচিত এই কালোত্তীর্ণ উপন্যাসটি সবাইকে পড়ে দেখার আমন্ত্রণ রইলো ।

উপলব্ধির গভীরে ডুব দিয়ে যাপিতজীবনের অভিজ্ঞতার নির্যাস তুলে আনতে যার জুড়ি নেই, তিনি লেখক ‘হাসনাত আবদুল হাই’। প্রতিটি উপন্যাসই তিনি লিখেছেন দীর্ঘ সময় নিয়ে। তার উপন্যাসগুলো গড়ে উঠেছে নাগরিক ও সমাজের সব ধরনের মানুষের জীবনাভিজ্ঞতা দিয়ে।

উপন্যাসের সবচেয়ে সুন্দর দিক হচ্ছে দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধ চেতনার ঘোর কাটিয়ে মানবিক সম্পর্কের বিবর্তন। নির্মোহভাবে লেখক বিচার করেছেন ব্যক্তিসত্তার আলো-আঁধারির জটিল খেলা। তবে সব কিছু উপস্থাপন করেছেন তিনি খুব পরিমিত শিল্পবোধ নিয়ে ।

মানুষের জীবনযাপনকে বুঝবার ও নিবিড়ভাবে জানবার জন্য এমন একজন লেখকের লেখাকে বেছে নেওয়াই আমি শ্রেয় মনে করি। যার লেখায় থাকবে সমাজ, দর্শন,  ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। শ্রেষ্ঠ মানুষের জীবন সম্পর্কে বলতে পারার অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা  দেখবার মতো সুদূর প্রসারী দৃষ্টি। আমি বলব লেখক এই সবগুলো গুণেই গুণান্বিত। আমরা তাই উনার অন্য উপন্যাসগুলিতেও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় ও জ্ঞানার্জনের সুযোগ পাই।

জীবনের দুই অবিচ্ছেদ্য অনুভূতি, বাস্তবতা ও বেদনায় ডুব দিতে বইটি সত্যিই অসাধারণ। সেইসাথে একটি সময়ের গল্প শুনতে পারাটাও পাঠক হিসেবে আমাদের এক নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করবে। একজন দক্ষ লেখকের কথায় ভর করে এমন অন্যরকম একটি যাত্রা তো করাই যায়, যেখানে দেখা মিলবে জীবনের নানারূপের সাথে, হোক সেটা বেদনার! এসবই তো জীবনের সত্য, লেখক তো তাই জানিয়েছিলেন :

‘মিথ্যের সাথে স্বস্তি বোধ করার চেয়ে সত্যের আঘাতই অনেক বেশি শ্রেয় ’।

হাসনাত আব্দুল হাই-এর জন্ম ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর, কলকাতায়। তাঁর পিতা আবুল ফতেহ এবং মাতা আয়েশা সিদ্দিকা। স্কুল শিক্ষা কলকাতা, যশোর, ফরিদপুর শহরে। ঢাকায় তিনি তার কলেজ শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিকস এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদে তিনি কর্মরত ছিলেন। এবং তিনি অবসর গ্রহণ করেন সচিব পদ থেকে। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হন ১৯৯৫ সালে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares