আলোচনা : গল্পগ্রন্থ―হাসনাত আবদুল হাই : বহুমাত্রিক ছাঁচে লেখা গল্পসকল : একা এবং একসঙ্গে : শামসুজ্জামান খান

একা এবং একসঙ্গে হাসনাত আবদুল হাইয়ের গল্পের বইয়ের নাম। গল্পের বইয়ের নাম হিসেবে একা এবং একসঙ্গে সুন্দর। এ নামের একটি গল্প আছে বইয়ে। কিন্তু শুধু সে জন্যই বোধহয় বইয়ের এ নামকরণ করেননি লেখক। আসলে নামটি আধুনিক, অর্থপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। গল্প বিস্তারে এর ভার সহ্য করতে অপারগ, তাই ব্যক্তিক কোনো সুখ-দুঃখ, সঙ্কট-বেদনা, ইচ্ছা-আকাক্সক্ষার রসঘন, ইঙ্গিতময় ও ব্যঞ্জনধর্মী প্রকাশের ছাঁচ বেছে নিয়েছেন লেখক। কিন্তু এই ব্যক্তিক (একা) সমস্যা সমাজের (একসঙ্গে) সঙ্গে সম্পর্ক-নিরপেক্ষভাবে উদ্ভাসিত নয়। হাসনাত আবদুল হাই সমাজের বৃহৎ পটে ব্যক্তি বা কীর্তিময় কতিপয় কুশীলবের জীবন প্রবাহের চয়ন করা অংশকে গল্পের ছাঁচে ঢালাই করে আমাদের উপহার দিয়েছেন। তাই তাঁর গল্পে সামাজিক চৈতন্য কখনও সরাসরি, কখনও কিছু অন্তরাল সৃষ্টি করে, আবার কখনও চোরা স্রোতের মতো উপস্থিত। গল্পকার হিসেবে তাঁর এ ভূমিকা ইতিবাচক। তিনি সরলভাবে গল্প বলেছেন, কিন্তু শুধুই গল্প বলেননি। বক্তব্য প্রকাশের একটা তাগিদ নিরন্তর ভেতরে ভেতরে কাজ না করলে তাঁর গল্প বলার ধরনটা বোধহয় অন্য রকম হতো। এদিক থেকে তিনি একজন সচেতন গল্পকার। সচেতন বলেই অন্য অনেকের রীতিকে মান্য করে সংকলিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে একটা গল্পকে বেছে নিয়ে বইয়ের নামকরণ করেছেন, কিন্তু বাছাইটা এমনভাবে করেছেন যে সাধারণ রীতি-রক্ষাও একটা দীর্ঘ মাত্রা ও অর্থময়তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এটা যদি তিনি খুব সচেতনভাবে নাও করে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে লেখকের সহজাত জীবনবোধ আছে যা সবল, বলিষ্ঠ, ইতিহাস-সচেতন ও লোকজীবন ঘেঁষা।

হাসনাত আবদুল হাই গল্প লিখছেন ১৯৫০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে। এখন চলছে ৭০-এর দ্বিতীয়ার্ধ। বিশ বছরে তাঁর সঞ্চিত শস্যের ভাণ্ডার স্ফীত নয়। তাঁর পেশার ধরন এর জন্য আংশিক দায়ী হতে পারে। তবে ক্ষীণকায়া সংকলনটির অবয়ব খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলে তেমন আফসোস থাকে না। কারণ, তাঁর গল্প আপাত দৃষ্টিতে ট্রাডিশনাল, সরল কিন্তু ভালো গল্পের কতকগুলো লক্ষণ এর মধ্যে এমনভাবে সংগুপ্ত হয়ে আছে যে, গল্পগুলোর প্রতি মনোযোগী দৃষ্টি না দিয়ে উপায় নেই। কিছুটা নাটকীয়তা, রহস্যময়তা, অর্থ ও তাৎপর্যগত দ্ব্যর্থতা বা বহুমুখিতা ভালো গল্পের লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য হাসনাত আব্দুল হাইয়ের গল্পে আছে।

একা এবং একসঙ্গে গল্পটিতে তিনি যে উপাদান ও ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাতে অসাধারণ কিছু নেই। কিন্তু তিনি গল্প বলতে জানেন বলেই গল্পটি সাধারণ নয়। এ গল্প থেকে প্রতীক-রূপক ও মনস্তত্ত্বের আভাস পেতে পারেন কেউ কেউ। আবার শুধু একটানা পড়ে গিয়ে ছোট্ট সমস্যার সুন্দর ও সুবিধাজনক সমাধান পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন এক ধরনের পাঠক। বাৎসল্যের দ্বন্দ্ব ও দ্বৈতরূপের সঙ্কটমুক্তি হিসেবেও একে নিতে পারেন এক ধাপ ওপরের গল্পরসিক। অন্য কেউ হয়তো সোনালি মাছ আর বেড়ালকে গ্রহণ করতে পারেন রেবা আর সুমনের ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধি হিসেবে। আরও নানাভাবে এ গল্পের ব্যাখ্যা হয়। বেড়াল আর মাছের আজীবন বৈরিতা এ গল্পের বিষয় নয়। বরং প্রায় অবিশ্বাস্য মিত্রতার ও বন্ধুতার এক নাটকীয় চিত্র এ গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে। এ ঘটনাকে কীভাবে নেব ? এ ধরনের পরিস্থিতিতে (এ ক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব) এমন ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু এ গল্পে আকস্মিক বিপদে দুই শত্রু বন্ধু হয়ে গেছে, এমন ভাবার কারণ দেখি না। এর অর্থ অন্যভাবেই খোঁজ করতে হবে। লেখকের বর্ণনায় বেড়ালের দৃষ্টিতে লোভ বা ক্রূরতা আছে বলে মনে হয় না। রহস্যময়তা, কৌতুকবোধ ও বিস্ময় ফুটেছে লেখকের ভাষ্যে। বেড়াল আর সোনালি মাছ কি তাহলে সুমন আর রেবার স্বভাবেরই অপর নাম, দুটো স্বভাবের ভিন্নতা সন্দেহের জন্ম দিয়েছে ? সকালে বাথরুমে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে যে কথা কাটাকাটি, তিক্ততা, রেবার বাইরে বেরিয়ে যাওয়া সেও কি স্বভাবের ভিন্নতার রূপ ? দুটো স্বভাব দুটো আলাদা বৃত্তে আবদ্ধ থেকে একা একাই থেকে গিয়েছিল কি ? একসঙ্গে হতে পারল একটি বড় ঘটনার অভিঘাতে ?

একটা গল্প নিয়ে যদি এতদিক থেকে ভাবা যায়, তাহলে সে গল্পকে অবশ্যই ভালো গল্প বলতে হবে। কারণ এতে বহুমুখিতা আছে, ইঙ্গিতধর্মী ব্যঞ্জনা আছে, আছে সংযত পঠন বিন্যাস।

‘কার্নিভাল’―বাৎসল্যেরই অন্যপিঠকে সামনে এনেছে। পরিবেশ প্রেক্ষিত ভিন্ন। গ্রামীণ মানুষের কাঁচা, বলিষ্ঠ ও পেশিবহুল জীবন-চেতনার ভেতরে কোমল পুষ্পকে রক্ষার এক আদিম ও শাশ্বতবোধ এ গল্পে দীপ্ত। ‘সৈকতে একা’ গল্পের সাহানা বেগম তাঁর অন্তঃসারশূন্য পুনরাবৃত্তিময় একঘেয়ে অথচ আপাত চকচকে জীবন নিয়ে ক্লান্ত। তার সমাজের আচার-আচরণ তাকে আরও ক্লান্ত করে। এই শূন্যতার প্রেক্ষাপটে তিনি পাগল লোকটার প্রেমিকা রেখা হিসেবে নিজেকে কল্পনা করে ভাবলেন এই মুহূর্তে আমি একটি ভালোবাসার শ্বেতপদ্ম। এই মুহূর্তে আমি যৌবনের রক্তকরবী। একটি পুরুষের ভালোবাসার সিংহাসনে আমি সম্রাজ্ঞী। এই তো সেই সব-পেয়েছির দেশ। এখানে মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই, আছে আকাশ ভরা তারা আর মস্ত থালার মতো হলুদ চাঁদ।

‘যেতে যেতে যেতে’ ―গল্প হিসেবে উন্নত। উপস্থাপনাটা ভিন্নধর্র্মী। দুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা। কিন্তু রূপকথার সঙ্গে দুর্ভিক্ষকে এনে তিনি যে বিরোধের সৃষ্টি করেছেন তাতে গল্প আরও সার্থকতায় পৌঁছেছে। ভিন্ন পটভূমিকায় এ বিরোধ-এর আরও চমৎকার ব্যবহার লক্ষ করি ‘জ্যোৎস্নায় আমরা তিনজন’ গল্পে।

ক্ষুধা, সূর্যমুখী, দুর্যোগ প্রভৃতি গল্পেরও কোনো না কোনো দিক পাঠককে আকৃষ্ট করে। এমনকি ‘ইন্টারভিউ’ বা ‘শুধু আলাপিতা’র মধ্যেও লেখকের গল্প বলার দক্ষতা পাঠকের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না।

হাসনাত আবদুল হাই গল্প বলেন সহজ ও সাধারণ ভঙ্গিতে। কিন্তু লেখায় গভীরতা আছে। জীবনকে তিনি বেশ খুঁটিয়ে দেখেছেন। অভিজ্ঞতার দিকটা তাঁর বেশ সমৃদ্ধ। গল্পে বৈচিত্র্য প্রচুর। নাগরিক মধ্যবিত্ত, গ্রামীণ সাধারণ পেশাজীবী কিন্তু বলিষ্ঠ মানুষ, শ্রমিক আন্দোলনের আবহাওয়া, একেবারে নিম্নশ্রেণির ছাপোষা বা ক্ষুধার্ত মানুষ এমনি আরও বিচিত্র চরিত্র ও পরিবেশ এসেছে তার গল্পে। এর প্রায় সব ক্ষেত্রেই তিনি গল্প বলেছেন স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে। তাঁর গল্পে একটা কেন্দ্রবিন্দু গড়ে ওঠে―একটা বিশেষ জায়গায় আলো পড়ে। এতে গল্প তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে―প্রকৃত গল্প হয়ে ওঠে। ঠিক জায়গাটিতে কিছুটা নাটকীয়ভাবে তিনি অল্প কথার বুননে এটা করেন। এদিক থেকে তিনি একজন নিখুঁত গল্পকার।

আমরা হাসনাত আবদুল হাইয়ের গল্পগ্রন্থ একা ও একসঙ্গের বহুল প্রচার কামনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares