আলোচনা : গল্পগ্রন্থ―হাসনাত আবদুল হাই : চোরা লণ্ঠনের আলোর মতো : রাহাত খান

শব্দ, ঘটনা, গ্রন্থনা ও শিরোনামে আড়াল থেকে যিনি একটি গল্পকে মজবুত শরীর ও টলটলে আত্মা দিতে পারেন, তিনি আমার প্রিয় লেখক। তাঁর হাতে ভাষা কখনও অনাবশ্যক কণ্টকিত ও অলঙ্কৃত হয় না। অথচ প্রত্যেকটি বার ভাষা তাঁর কলমে নতুন মুদ্রার মতো ঝকঝকে হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যে এই স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের একজন লেখক হচ্ছেন হাসনাত আবদুল হাই।

হাসনাত আবদুল হাই। লিখতে শুরু করেন ১৯৫৮-৫৯ সালের দিকে। ঐ সময় প্রচুর লিখেছেন তিনি। মাঝে হঠাৎ তাঁর কলম একটু নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর, সম্ভবত, ১৯৭৩ সালে আবার তাঁর উপস্থিতি লক্ষ করি আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে। গত চার বছর ধরে তো অবিরাম লিখছেন। মাত্র বছর তিনেকের মধ্যে বেরিয়েছে তাঁর একটি উপন্যাস, একটি ত্রয়ী নাটিকার সংকলন ও দুটো ছোটগল্পের বই। ১৯৭৭ সালে ছোটগল্পের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। কিন্তু পুরস্কারের বিবেচনায় নয়, তাঁর গল্প আপন বৈশিষ্ট্যেই আলোচনা ও পর্যালোচনার দাবি রাখে।

তাঁর দ্বিতীয় গল্প-গ্রন্থটির নাম : যখন বসন্ত। ১২০ পৃষ্ঠার বই। বইঘর প্রকাশনী এই বই চট্টগ্রামের ‘দি আর্ট প্রেস’ থেকে ছেপে বার করেছেন। কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ। মুদ্রণ সংক্রান্ত ভুল-ত্রুটি যদিও বেশ আছে, তবু বইটির প্রকাশনা মোটামুটি পরিচ্ছন্ন ও শোভন হয়েছে।

গোটা বইটিতে এগারোটি গল্প। যথা : যখন বসন্ত, একটি মানুষের জন্ম, নীড়ে ফেরা লখিন্দর, ম্যাডোনার ছবি, দুপুরের পাখি, আমার যত যুদ্ধ, ব্যালকনী-৭৫, বেচাকেনার সন্ধ্যা, রাক্ষুসী, এক মহিলার বিকেল, ১৯৬০ সাল, ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস,―এই সময়-খণ্ডের কিছু কিছু অন্তরঙ্গ সামাজিক চিত্র বইটিতে স্থান পেয়েছে।

গোটা বইটি পড়ে প্রথমেই মনে হয় লেখকের নির্লিপ্ততার আড়ালে নিহিত একটি অখণ্ড মূল্যবোধের কথা। মানুষ যার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করুক, তার মুখ যে জীবনের দিকে ফেরানো,―লেখকের এই বিশ্বাস শতকরা একশো ভাগ আছে। এক অনন্য মৃদুভাষিতা গল্পগুলোকে কখনও স্বপ্নের গোধূলিতে কখনও জীবনের কলরবমুখর বারান্দায় সংস্থিত করেছে, যা থেকে প্রাচীন বিশ্বাসের মতো পাওয়া যায় সুখকর স্বস্তি এবং আনন্দ। ভাষা-প্রয়োগের ক্ষেত্রে কখনও কখনও ভোকাব্যুলারির দাবি মেটাননি, তবে স্থানীয় জীবন-চিত্রের শঙ্খ-শুভ্র বর্ণনা দিয়েছেন ক্ষমতাবানের মতো, তাই গল্পের আবহ বিশেষ ক্ষুণ্ন হয়নি। তাঁর রাক্ষুসী গল্পের একটি বর্ণনা এ রকম: ‘দ্যাখে ভাটা চলছে। পানি অনেকদূর সরে গিয়েছে। ভিজে কাদামাটি থিক-থিক করছে। শুকনো গর্ত থেকে লাল কাঁকড়া বেরিয়ে আসছে। সমস্ত পাড়জুড়ে আগাছা, ছেঁড়া কাগজ, মরচে ধরা টিন এইসব পড়ে আছে। আর আছে পচা মাছের টুকরো।’―চমৎকার নয় ? জলরঙে এই রকম নম্র, সুন্দর, রঙিন গন্ধময় চিত্র বইয়ের বহু জায়গায় আছে।

‘ব্যালকনী’ শিরোনামের গল্পটি আমার কাছে অসাধারণ এক উত্তীর্ণ গল্প বলে মনে হয়েছে। আর এই গল্পটিতে হাসনাত আবদুল হাই যে আশ্চর্য সংযমের সাথে আবেগের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন তা সত্যই বিস্ময়কর। এই গল্পে লেখক আসলে বলেছেন দুর্ভিক্ষের কথা। দুর্ভিক্ষে মানুষ কী রকম বদলে যায়, কোথায় শুরু হয় তার আত্মবঞ্চনা ও সুবিধাবাদের দাসত্ব, সেই বিষয় নিয়ে এই কাহিনি। কিন্তু গোটা বক্তব্যটিই চোরা লণ্ঠনের আলোর মতো লুকোনো। গল্পের প্রতিটি শব্দ ধারণ করছে সেই আলোর সন্ধান-ভেদী উদ্ভাস, কিন্তু আশ্চর্য, আলাদাভাবে কোথাও নেই দুর্ভিক্ষের বর্ণনা, নেই অবক্ষয় ও পতনের ব্যাখ্যা,―শুধু গল্পটি যখন শেষ হয় তখন ধুঁক করে বুকে বাজে মধ্যবিত্ত চৌহদ্দির ব্যাল্কনিতে দাঁড়ানো মানুষের নির্মমতা ও নির্দয়তার চেহারা। শহরের মোহন ছবি ও দুর্ভিক্ষের ভাগাড়ের মাঝে কারা প্রসন্নতা নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ায় তখন তা ¯পষ্ট হয়।

‘যখন বসন্ত’, ‘একটি মানুষের জন্ম’, ‘আমার যত যুদ্ধ’―এই তিনটি গল্পে গুরুতর কোনো বিষয় ব্যাখ্যার চেষ্টা নেই। কিন্তু এই তিনটি গল্পেই জীবনের তিনটি সুন্দর ও স্নিগ্ধ মুখ আঁকা হয়েছে। ‘একটি মানুষের জন্ম’ দুটি মানুষের নবজন্মের কথা আছে। তিনটি গল্পের উপসংহারেই আছে খুব স্বতঃস্ফূর্ত প্রশান্তি―হাসনাত আবদুল হাই জীবন-চেতনায় যার যথেষ্ট মূল্য ও গুরুত্ব নিরূপণ করেছেন।

যখন বসন্ত গল্প-গ্রন্থে হাসনাত আবদুল হাইয়ের দীর্ঘ আঠারো বছরের সময় পরিক্রমা, জীবন-যাপন ও লেখনী চর্চার ইতিবৃত্ত মুদ্রিত হয়ে আছে। আঠারো বছর আগের হাসনাত আবদুল হাই ও আঠারো বছর পরের হাসনাত আবদুল হাই―নিশ্চয়ই এক ব্যক্তি নন জীবন-বোধ, অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের অর্থে, গল্পগুলোতে এই সত্যের প্রবল ছাপও আছে। তবে একটি শক্তিশালী ভাষা তিনি যে আগেই আয়ত্ত করেছিলেন, সেটা বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করা যায় বিভিন্ন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লেখা তাঁর গল্পগুলো পড়ে। হাসনাত আবদুল হাইয়ের রচনাশৈলীর কথা শুরুতেই উল্লেখ করেছি, লেখক যথেষ্ট শক্তিশালী আত্মবিশ্বাসী হলেই শুধু অমন রচনাশৈলী তাঁর আয়ত্তে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares