আলোচনা : গল্পগ্রন্থ―হাসনাত আবদুল হাই : ছোটগল্পের শিল্পরূপ : প্রসঙ্গ ‘হাসু, তুই এলি ?’ : বিশ্বজিৎ ঘোষ

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ধারায় হাসনাত আবদুল হাই একটি বিশিষ্ট ও উজ্জ্বল নাম। উপন্যাস ও ছোটগল্প রচনায় তাঁর সাফল্য ও সিদ্ধি কিংবদন্তিতুল্য। সমাজসচেতনতা ও নান্দনিক মনস্তত্ত্বের নিপুণ মিথস্ক্রিয়ায় রচিত হয় তাঁর কথাশিল্প। আত্মজৈবনিক অনেকান্ত উপলব্ধি শিল্পিতা পেয়েছে হাসনাত আবদুর হাইয়ের উপন্যাস কিংবা ছোটগল্পে। জীবনীকেন্দ্রিক অকথাসাহিত্য রচনায় তিনি রেখেছেন প্রাতিস্বিকতার স্বাক্ষর। কেবল বাংলাদেশ নয়, গোটা বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটেই হাসনাত আবদুল হাইয়ের এই প্রাতিস্বিকতা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। উপন্যাস বা ছোটগল্প রচনায় বিষয়ের পাশাপাশি প্রকরণ প্রসাধনেও সমান মনোযোগী হাসনাত আবদুল হাই। বর্তমান নিবন্ধে হাসনাত আবদুল হাইয়ের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক কোনো পরিচয় নয়, তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প ‘হাসু, তুই এলি ?’র শিল্পরূপ বিশ্লেষণের মধ্যেই আমাদের পর্যবেক্ষণ সীমাবদ্ধ রাখব। একটি গল্পের টেক্সট ব্যবহার করেই আমরা দেখতে চাই ছোটগাল্পিক হিসেবে হাসনাত আবদুল হাইয়ের সাফল্য ও সিদ্ধি, তাঁর জীবনদৃষ্টি, তাঁর ছোটগাল্পিক কলাবোধের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য।

বাংলাদেশের জাতির পিতা, স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর আত্মজা শেখ হাসিনার মধ্যে কল্পলোকের আলাপচারিতা নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘হাসু, তুই এলি ?’ ছোটগল্প। উনিশশ’ পঁচাত্তর সালের মধ্য-আগস্টে কতিপয় বিপথগামী কুচক্রী সেনা-সদস্যের হাতে সপরিবারে শহিদ হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন তারা শুধু বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিজনদেরই হত্যা করেনি, উল্লাসভরে তছনছ করেছে বত্রিশ নম্বরের গোটা বাড়িটাযেন বাড়িটাই হয়ে উঠেছিল তাদের চরম শত্রু। বত্রিশ নম্বরের এই সেই বাড়ি যেখান থেকে অঙ্কুরিত হয়েছিল বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন-বৃক্ষ। পঁচাত্তরের পর এই বাড়িটা দীর্ঘদিন ছিল অবরুদ্ধ, বৈরী সরকার এখানে কেউকে অনুপ্রবেশ করতে দেয়নিতারা মনে-প্রাণে চেয়েছে ধ্বংস হোক ধসে পড়ুক বাড়িটা। এরপর অতিক্রান্ত হয়েছে অনেক দিন। অবশেষে একদিন এই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজা শেখ হাসিনা। বাধা পেরিয়ে অযত্ন-অবহেলার শিকার ধূলি-ধূসরিত বাড়িতে ঢুকেই পিতার মুখোমুখি হন শেখ হাসিনা। মেঝেতে পড়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর ছবি থেকে বঙ্গবন্ধু যেন সশরীরে দেখা দেন প্রিয় আত্মজার চোখে। এভাবে এক ফ্রেম থেকে গল্প রূপান্তরিত হয় পরবর্তী ফ্রেমেবাস্তব রূপ থেকে কল্পলোকে। এবার শুরু হয় পিতা ও আত্মজার কথোপকথনউঠে আসে ঐতিহাসিক এই বাড়িটার নানা কথা, পনেরোই আগস্টের মধ্যরাতের নারকীয় ঘটনার কথাপিতা-কন্যার কষ্ট আর দুঃখের পাঁচালিএকই সঙ্গে কন্যার প্রতিশোধস্পৃহা আর পিতার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার আকাক্সক্ষা। কন্যার মাথার ওপর পিতার স্নেহের হাত আর আশীর্বাদের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ‘হাসু, তুই এলি ?’ ছোটগল্পের পাঠ। সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত এই ঘটনাংশ নিয়ে গড়ে উঠেছে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ছোটগল্প ‘হাসু, তুই এলি ?’

উপর্যুক্ত ঘটনাংশে একটি কথা বলা হয়নি। বলা যায়, সেটিই গল্পের মূল কথা। দীর্ঘ প্রতীক্ষায় কাচ-ভাঙা গুলিবিদ্ধ রক্তমাখা ফ্রেমে ধূলিমলিন অবস্থায় বত্রিশ নম্বরের বাড়ির মেঝেতে পড়ে আছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি প্রতীক্ষায়  আছেন কবে কখন আসবে তাঁর প্রিয় আত্মজাসব শুনে নিজের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব দিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে চিরশান্তিতে শুয়ে-শুয়ে অবলোকন করবেন কন্যার ভূমিকা। অবশেষে দেশ গঠনে এবং অন্যায়ের প্রতিবিধানে আত্মজার সংকল্পের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর এতদিনের প্রতীক্ষার যেন সমাপ্তি ঘটে।

‘হাসু, তুই এলি ?’ ছোটগল্পে স্পষ্টত দুটো ফ্রেম ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম ফ্রেমে আছে হাসিনা, গাড়িচালক মকবুল আর বত্রিশ নম্বরের বাড়ির দারোয়ান। এই ফ্রেমটায় উঠে এসেছে বাড়িটার ইতিহাস এবং একই সঙ্গে বর্তমান দুরবস্থা। বৈরী সরকারের প্রতিহিংসার শিকার বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নম্বরের বাড়িটা। এই বাড়িটার দীর্ঘ ইতিহাস আর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা বাঙালির মন থেকে মুছে দিতে চেয়েছে পঁচাত্তর-উত্তর বৈরী সরকার। গাড়িচালক মকবুলের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনে বাড়িটার বর্তমান অবস্থা উঠে এসেছে এভাবে :

‘শেখ হাসিনা রেগে গিয়ে বললেন, এ বাড়ি এমন ছিল না।… মনে হচ্ছে ব্রিটিশ আমলের কিংবা তারও আগের পুরোনো বাড়ি। ছবিতে যেমন দেখা যায়।

মকবুল ড্রাইভার ওপরের দিকে তাকিয়ে বলল, বটগাছগুলো বড় হয়েছে। শিকড় ঢুকেছে ইটের ভেতরে। ভেঙে ফেলেছে ছাদের কার্নিশ। এইভাবে থাকলে কিছুদিন পর কার্নিশ টুকরা টুকরা হয়ে নিচে পড়ে যাবে।

শেখ হাসিনা বললেন, মনে হয় কেউ চায় বাড়িটা ভেঙেই পড়ুক। জঙ্গলে আর আগাছায় ঢাকা পড়ে থাক। যেন কেউ এটা খুঁজে না পায়; এ বাড়ির কথা যেন কেউ না বলে।’

এক ফ্রেম থেকে গল্প যাবে এবার অন্য ফ্রেমেদীর্ঘদিন পর পিতা আর কন্যার সাক্ষাতের কল্পফ্রেমে। ফ্রেমের এই রূপান্তরটা হাসনাত আবদুল হাই অসামান্য নৈপুণ্যে অন্ধকারের আবহে সম্পন্ন করেছেন। বদ্ধ ধূলি-ধূসরিত ঘরের মধ্যে অন্ধকারের নিপুণ ব্যবহারে গল্প-কাহিনি এবার মূল আখ্যানকে অঙ্গীকার করে। অন্ধকারই হয়ে ওঠে এখানে লেখকের অনিবার্য শিল্প-উপাদান। একবার লক্ষ করা যাক লেখকের বয়ান-কৌশল :

‘…মকবুল দরজা খুললে লোহার কড়ার শব্দ হলো, জং ধরা কব্জায় ধাক্কা লেগে। ভেতরে ঢোকার পর একরাশ অন্ধকার এসে ঢেকে দিল চোখমুখ। প্রথমে তিনি কিছুই আলো-আঁধারিতে দেখতে পেলেন না। তারপর পোলারয়েড ক্যামেরার মতো তাঁর সামনে ছবি ফুটে উঠল। তিনি আস্তে আস্তে আশপাশের ঘরের দরজা, বারান্দা, উপরে ওঠার সিঁড়ি সব দেখতে পেলেন।’ ক্রমে গল্প পৌঁছে যায় নতুন পরিস্থিতিতেএবার বাস্তব পৃথিবী মুহূর্তেই অন্তর্লীন হয় কল্প-পৃথিবীতে। লেখক এই কাজটা করেন এমন নৈপুণ্যের সঙ্গে যে, আখ্যানের পরিস্থিতিগত রূপান্তরটা পাঠকের অজান্তেই যেন ঘটতে থাকে। এক পরিস্থিতি থেকে গল্প উপনীত হয় অন্য পরিস্থিতিতেক্রমে দেখা হয় পিতার সঙ্গে কন্যারসমাপ্তি ঘটে সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার :

সিঁড়ির ওপরে প্রথম ধাপে বঙ্গবন্ধুকে দেখা গেল। সাদা পাঞ্জাবি, চেক-কাটা লুঙ্গি পরে শরীর এলিয়ে দিয়ে তিনি আধশোয়া অবস্থায় বসে আছেন। তাঁর চুল এলোমেলো। চশমা কিছুটা দূরে পড়ে আছে। তার একটা কাচ ভাঙা। কালো পাইপটা ধূসর দেখাচ্ছে, একটু দূরে কাত হয়ে পড়ে আছে ধুলোর  ভেতর। শেখ হাসিনাকে দেখে বঙ্গবন্ধু ধড়মড় করে উঠে বসলেন। উত্তেজিত হয়ে বললেন, হাসু, তুই এলি ? কত দিন থেকে তোর অপেক্ষায় আছি। এইখানে বসে আছি তোর জন্য। যেন তুই এলেই আমাকে দেখতে পাস। যাক, তুই শেষ পর্যন্ত এলি।

শেখ হাসিনা দ্রুত বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়ে তাঁর হাত ধরে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন, এসেছি আব্বা।

এবার পিতা আর কন্যার কথোপকথনে গল্প এগোতে থাকে সামনের দিকে। কন্যার জিজ্ঞেসায় পিতা এবার বলেন পঁচাত্তরের সেই ভয়াল রাতের কথা, কীভাবে কালো-পোশাকধারী জনোয়ারেরা নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তার কথা। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন‘কালো-পোশাকপরা মানুষগুলোর কথা আপনার মনে পড়ে ?’ এবার সেই ভয়াল রাতের কথা বলতে আরম্ভ করেন বঙ্গবন্ধু :

‘…হ্যাঁ, এখন মনে পড়ছে। কালো-পোশাকপরা কয়েকজন লোক সিঁড়ির নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল। তাদের হাতে নানান রকম অস্ত্র ছিল। আমি কাউকে চিনতে পারি নাই। বুঝতে পারি নাই তারা কেন ভেতরে এসেছে। আমি গেঞ্জি পরে ছিলাম। লোকজন এসেছে দেখে সাদা পাঞ্জাবিটা পরে পাইপ হাতে এখানে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোরা কী চাস ? কেন এসেছিস ? কালো-পোশাকপরা লোকগুলো কোনো উত্তর দেয় নাই। শুধু মনে আছেপ্রচণ্ড গর্জন, বিস্ফোরণ আর গরম একটা হাওয়া আমার শরীরের ভেতরে ঢোকে। তারপর ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরছে আর ঘুরছে। উফ, সে কী গরম! তারপর আমার কিছু মনে নাই।’ বঙ্গবন্ধুর এই কথায় আত্মজা শেখ হাসিনা যেন সংবিৎ ফিরে পেলেন। কেবল বাড়িটা দেখার জন্যই নয়, সেই কালো-পোশাকধারী মানুষগুলোকে খুঁজে বের করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা তিনি পিতাকে বললেন :

শেখ হাসিনা বললেন, থাক ওদের কথা বলতে হবে না। আমি ফিরে এসেছি। আমি ওদের এক-এক করে খুঁজে বের করব।…ওই কালো-পোশাকগুলোকেও খুঁজে বের করতে হবে। আমার জানতে হবে, কেন তারা হঠাৎ এ বাড়িতে এসেছিল রাতের অন্ধকারে ? কেন তারা আপনার কথার উত্তর দেয় নাই ? কিছু না বলে কেন সমস্ত বাড়ি বিষাক্ত গ্যাসে ভরে তুলেছিল তারা ?

কন্যার প্রতিশ্রুতিতে পরম আশ্বস্ত হন পিতা। বাড়িটার এই দৈন্য দশা কন্যার হাতের স্পর্শে দূর হবে বাড়িটা আবার সেজে উঠবে নতুন করেএই ভাবনায় প্রশান্ত হয় বঙ্গবন্ধুর মন। বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় এখানে বাড়িটা কেবল বত্রিশ নম্বরের বাড়ি নয়বাড়িটা কালো-পোশাকপরা মানষগুলো দ্বারা অবরুদ্ধ গোটা বাংলাদেশেরই প্রতীক যেন। তাই কন্যার প্রতিশ্রুতি শুনে তিনি বলেন এইকথা‘…তুই এসেছিস খুব ভালো হলো। এই বাড়ি আবার আগের মতো সাজিয়ে তুলবি। ঠিক আগে যেমন সাফসুতরা ছিল সেইরকম হবে। তারপর বললেন, শুধু আগের মতো কেন ? তুই আগের চেয়েও আরও ভালো করে এই বাড়িটা সাজিয়ে গুছিয়ে নিবি। এই বাড়ির চেহারা তুই বদলে দিবি। আমি খুব ভালো করে জানি।’ শেখ হাসিনার জাদুকরি হাতের ছোঁয়ায় গোটা বাংলাদেশের চেহারাই যে বদলে যাচ্ছে, হচ্ছে উন্নতসে-কথাই যেন বঙ্গবন্ধুর বয়ানে লেখক এখানে তুলে ধরেছেন কালোতে ছোপ-ছোপ রক্তের দাগ, পরিজনদের নিথর ছবি, ভাঙা কাঁচ, লুট-হয়ে-যাওয়া খোলা আলমারিএসব প্রসঙ্গ বলতে বলতে একসময় গল্প উপনীত হয় পরিণতিতে। পিতার আশীর্বাদ কন্যার ওপর বর্ষিত হয় এবার, আর কন্যাও প্রতিশ্রুতি আর সংকল্পে হয়ে ওঠেন উচ্চকিত :

শেখ হাসিনা তাঁর আব্বার দিকে ফিরে তাকালেন। ব্যগ্রস্বরে বললেন, আমি পারব আব্বা ? আমি কি পারব ?


পারবি মা, তুই পারবি। তুই আমার বড় মেয়ে। তুই না পারলে কে পারবে ? ইনশাআল্লাহ তুই পারবি।

শেখ হাসিনা তাঁর আব্বার বুকে মাথা রেখে বললেন, দোয়া করবেন আপনি। যেন আপনার যোগ্য সন্তান হতে পারি। যেন আপনার মুখ উজ্জ্বল করার সাহস আর ক্ষমতা পাই। যেন বাড়িটার চেহারা বদলে দিতে পারি। সব ইঁদুর, বাদুড়, তেলাপোকা, খাটাশ আর হায়েনাদের খেদিয়ে সুন্দর বাগান গড়ে তুলতে পারি।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতাংশের শেষ বাক্যের খাটাশ আর হায়েনার উল্লেখে বত্রিশ নম্বরের বাড়িটা আর বত্রিশ নম্বরেই আটকে থাকে না, হয়ে ওঠে গোটা বাংলাদেশেরই প্রতীক। এই খাটাশ আর হিংস্র হায়েনারূপী স্বাধীনতাবিরোধী নরঘাতকদের শাস্তি দিয়ে দেশকে নতুন করে নির্মাণ করেন শেখ হাসিনাসেকথাই যেন ব্যক্ত হয়েছে পিতা-কন্যার স্বপ্ন-সংলাপে।

‘হাসু, তুই এলি ?’ ছোটগল্পে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ছোটগাল্পিক শিল্পদৃষ্টির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ব্যক্ত  হয়েছে যে, বাস্তব থেকে এই গল্প কল্প-বাস্তবে যেভাবে রূপান্তরিত হয়েছে, তা অসামান্য শিল্পগুণান্বিত কৌশলের  পরিচায়ক। পাঠকের মনেই হয় না, গল্প বাস্তবকে অতিক্রম করে কখন কল্প-বাস্তবে উপনীত হলো। এমনই নিপুণ এই গল্পের স্রোত। বক্ষ্যমাণ গল্পে হাসনাত আবদুল হাই বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িটাকে গোটা বাংলাদেশের প্রতীক হিসিবে নির্মাণ করেছেন। শেখ হাসিনা যখন অবরুদ্ধ বাড়িতে প্রবেশ করলেন, তখন পরগাছাবেষ্টিত বাড়িটার প্রতীকে কালো-পোশাকধারী পরগাছারূপী বৈরী মানুষদের কথাই যেন বলেন তিনি :

… বাড়ির সামনের  বড় গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, মনে হচ্ছে পুরোনো গাছগুলো এখনও আছে। তাদের বয়স হয়েছে, জীর্ণ দেখাচ্ছে। গায়ে লতিয়ে উঠেছে কত শক্ত লতা। পরগাছা। সব পরগাছা। বলে তিনি একটু থুথু ফেললেন। শেষের কথাটার ওপর তিনি জোর দিয়ে আবার বললেন, পরগাছা, সব পরগাছা।

এখানে থুথু ফেলা আর গরগাছা শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহারে শেখ হাসিনার ঘৃণা আর অন্তর্গত সংকল্পই যেন প্রতীকায়িত।

বত্রিশ নম্বরের বাড়িটা যে গোটা রাষ্ট্রেরই প্রতীক, তা শেখ হাসিনার সংলাপেও অভিব্যক্ত : ‘… সেই বাড়ি আবার নতুন করে গড়ে তুলতে এসেছি আমি। এত কষ্টে গড়া বাড়ি এইভাবে ভেঙে পড়তে দেওয়া যায় না। জন্তু-জানোয়ারের হাতে এই বাড়ি ছেড়ে দেওয়া যায় না।’ প্রতীকের পাশাপাশি বর্ণনামূলক পরিচর্যাও গল্পটিকে করে তুলেছে শিল্পনিপুণ। দেশের দুরবস্থা শেখ হাসিনার দৃষ্টিকোণে শিল্পিতা পায় নিচের বর্ণনামূলক পরিচর্যায় :

… খাটাশ দেখেননি আপনি ? খুব বিশ্রী স্বভাবের নোংরা প্রাণী। দূর থেকেই দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। দেখলেই ঘেন্না করে। তারা রাতের অন্ধকারে ঘোরাঘুরি করে। শিকার খুঁজে বেড়ায়। দেখতে পেলেই লাফ দিয়ে এগিয়ে ধরে। একটু একটু করে খায়, একেবারে মারে না। খেতে খেতেই প্রাণীগুলো মারা যায়। খাটাশগুলো খুব উল্লাস করে তখন। তারপর তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, খাটাশ! এ বাড়িতে খাটাশ না থেকে যায় না। হায়েনাও থাকতে পারে। কেন থাকবে না ? জঙ্গলের রাজত্ব তো এখানে।

বিষয় ও আঙ্গিকে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘হাসু, তুই এলি ?’ একটি শিল্প-নিপুণ  ছোটগল্প। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর আত্মজার বয়ানে এ গল্প পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় ইতিহাসের বিশাল এক ডিসকোর্সের সামনে। কৌতূহলী পাঠককে এ গল্প, স্বল্প পরিসরে, ইতিহাসের বিশাল এক প্রান্তরে নিয়ে যায়তাকেও করে তোলে কালো- পোশাকপরা মানুষগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধী সত্তার জাগ্রত সেনানী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares