আলোচনা : গল্পগ্রন্থ―হাসনাত আবদুল হাই : দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রা : ওমর কায়সার

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্য আসলাম খাটক। সে দেশের এক প্রত্যন্ত উপত্যকায় তার বাড়ি। জাতে পাঠান। চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি এসেছিল বিয়ে করতে। বিয়ের সকল আয়োজন শেষ। তাই উৎসবের আমেজ তার পাড়ায়। ‘দিনার গাছের নিচে পাহাড়ি ঝরনার পানি আনতে যায় যখন মেয়েরা, তখন গুনগুনিয়ে গান শোনায়। ফুলের চারদিকে ভ্রমর উড়ছে।’ আসলাম খাটকের বিয়ে হয়েই যেতে পারত। কিন্তু একাত্তরের নিয়তি তার বিয়ে হতে দিল না। একদিন হঠাৎ খবর এলো‘তাকে ছুটির বাকি দিন না কাটিয়ে ফিরতে হবে রাওয়ালপিন্ডি। জরুরি তলব।’ আসলাম অতি সাধারণ মানুষ। রাজনীতি জানে না। শাসনতন্ত্রের কূটকৌশল বোঝার ক্ষমতা তার থাকার কথা নয়। সহজে কিছু মাথায় ঢোকে না। আসলামদের বোঝানো হলো ‘যুদ্ধ শুরু করেছে বাঙালি বিশ্বাসঘাতকেরা। গাদ্দারদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বাঙালি আর্মি, ইপিআর, পুলিশ সবাই। ওদের মদদ দিচ্ছে ভারত। সুতরাং যুদ্ধ আদতে ভারতের বিরুদ্ধেই। পাকিস্তানের অখণ্ডতার ওপর আক্রমণ প্রতিহত শুধু নয়, চিরতরে নির্মূল করতে হবে।’ আর নির্মূল করার জন্যই ওদের রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকায় আনার পরও তাদের বোঝানো হয়‘বাঙালি গাদ্দারেরা মানুষ নয়, জানোয়ার। জানোয়ারের মতোই তাদের গুলি করে মারতে হবে।’  আসলাম খাটক ঢাকায় এসে কতজন ‘বাঙালি জানোয়ার’কে মেরেছিল তার উল্লেখ হাসনাত আবদুল হাইয়ের গল্প ‘আসলাম খাটকের দুশমন’ গল্পে উল্লেখ নেই। কিন্তু সে যে শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানিদের কাছে তার বিবরণ আমরা এই গল্পে পাই।

ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কনভয়ে হামলা চালায় আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। সে সময় আসলাম বন্দি হয় তাদের হাতে। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি এসে সে উপলব্ধি করে ওপরের মহল থেকে তাদের ভুল বোঝানো হয়েছিল। বাঙালিদের সম্পর্কে বানোয়াট কথাবার্তা তাদের শোনানো হয়েছে। এই সত্যটা যখন উপলব্ধি করতে পেরেছে তখন সে বন্দি বাঙালিদের হাতে। মৃত্যুকে খুব সামনে রেখে আসলাম খাটকের মানসিক অবস্থান পাল্টে যায়। এতদিন সে জানত বাঙালিরা তার শত্রু। এখন তার বোধোদয় হয়েছে, বুঝতে পারছে নিজের সেনাবাহিনীই তার শত্রু। গল্পটির শেষে এসে আমরা দেখি মাথার ওপরে উড়তে থাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জেট বিমান লক্ষ করে গুলি ছুঁড়তে থাকে আসলাম।

 মুক্তিযুদ্ধকে অন্যকোণ থেকে দেখা এই গল্পে পাকিস্তানি রাজনীতির ভণ্ড রূপটি ভেসে উঠেছে। পাশাপাশি পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডে মানবঅস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত সাধারণ সৈনিকের পরিণতিও দেখা গেল। ১৯৭১ এ বাঙালির অস্তিত্বের লড়াইয়ে ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহিদ হয়েছেন, লক্ষ লক্ষ নারী তাঁদর সম্ভ্রম হারিয়েছেন, হাজার হাজার ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়েছে, জন্মের আগেই কত মানুষ তাদের পিতা হারিয়েছে। আর এই ব্যাপক ধ্বংসলীলা, মানবতার এই চরম অধপাতটি ঘটেছে আসলাম খাটকদের হাত দিয়েই। তাই ৭১-এর দুঃসহ, বীভৎস অমোচনীয় স্মৃতির ভেতর আসলাম খাটকের মতো সাধারণ সৈনিকের ব্যক্তিজীবনের বঞ্চনা, করুণ পরিণতি আমাদের মনে কোনো রেখাপাত করে না। এই গল্পের পাঠকদের কাছেও সহমর্মিতা জাগবে বলে মনে হয় না। কিন্তু তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের অন্য এক বাস্তবতা চিহ্নিত হলো এটাই মূল কথা। আসলাম খাটক নয়, গল্পের মূল বিষয় ৭১, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। আর সেটিকেই লেখক প্রধান উপজীব্য করেছেন তাই গল্পের বই দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রায়।

বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের পরম্পরায় ১৯৭১ কী কোনো নতুন ধারার সংযোজন করতে পেরেছে ? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সময় এখনও আসেনি। তবে এ কথা নিশ্চিতবাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম এই সময়টি আমাদের গদ্যে পদ্যে শ্রেষ্ঠ অনুষঙ্গ হয়ে থাকবে কালে-মহাকালে। বাঙালি মননের আবেগ এর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। স্বজন হারানো, প্রতিরোধের লড়াই শেষে একটি নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভবের ফলে বাঙালির মনে এক অদম্য আবেগ যুক্ত হয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর সেই আবেগের সঙ্গে এখন যুক্ত হচ্ছে বিবেচনাবোধ, যুক্তি, মনন। আবেগহীন হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতিকে যথাযথভাবে তুলে ধরে সাহিত্যসৃষ্টি হবে ভবিষ্যতে। মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন এরকম সাহিত্যিক এখনও আছেন। ইতিহাস তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও কালজয়ী রচনা হয়তো তাদের হাত দিয়েই আসবে। এটা সময়ের দায়। সেই দায় মেটানোর ভার কাঁধে নিয়েছেন হাসনাত আবদুল হাই।

এই বইয়ের প্রধান উপজীব্য মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ। শিরোনামের গল্প দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রার পটভূমিও মুক্তিযুদ্ধের। ১৯৭১ সাল এখানে সেলুলয়েডের মতো উদ্ভাসিত হয়েছে। সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা বইয়ের সবচেয়ে দীর্ঘ এই গল্পে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা বিবৃত হয়েছে সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো। মুক্তিযুদ্ধ একেবারে সজীব ও জীবন্ত হয়ে আছে এখানে। গল্পটির প্রধান বৈশিষ্ট্য বর্তমানের সঙ্গে একাত্তরকে সংযুক্ত করা। ৭১ শেষ হয়েছে। কিন্তু জাতির ঘাড়ের ওপর এসে গিয়েছিল ৭৫। তারপর একে একে সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন এসে প্রমাণ করে গেছে বাঙালির যুদ্ধ শেষ হয়নি। হাসনাত আবদুল হাইয়ের গল্পগুলোও আমাদের জানিয়ে দেয় একাত্তর শেষ হয়নি। ১৯৭১ সালে অমিয়ভূষণ মজুমদার নামে এক অধ্যাপক, গায়ক, সংস্কৃতিকর্মী কীভাবে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের পরও তার বাড়িটি কীভাবে বেদখল হয়ে আছে, তা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখতে গেছেন রাজধানীর এক সাংবাদিক। কলমের লড়াইয়ে অবতীর্ণ সেই সাংবাদিককে শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হয়েছে। একটি একাত্তরের ঘটনা উন্মোচন করতে গিয়ে আমরা যেন আরেকটি একাত্তরকে প্রত্যক্ষ করলাম। পাশাপাশি ঘটতে থাকা ৫০ বছর আগের ও পরের দুটো ঘটনা। বিলম্বিত এই গল্পের বলার ভঙ্গিটি চলচ্চিত্রের মতো। শুধু চরিত্রকে তুলে ধরা হয়নি। চরিত্রের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে আশপাশের অনুপুঙ্খ ছবি আমরা দেখি। অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট পেয়ে সাংবাদিক (তার নাম উল্লেখ নেই) একাত্তরের অনিমেষ মজুমদারকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখতে মফস্সলে যাওয়ার জন্য গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে যায়। বাসস্ট্যান্ডের নিখুঁত বর্ণনা আমাদের চরিত্রের খুব কাছে নিয়ে যায়। তাকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করি। আর বাস্তবতাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারি। গল্পটি তার পরিণতির দিকে দৌড়ায় না। বরং চারপাশের চোখ রেখে ধীর গতিতে চলতে থাকে। প্রত্যেক দৃশ্যবস্তুর এমন বিশদ বর্ণনা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল এটি একটি উপন্যাসও হয়ে উঠতে পারত।  শুধু এই গল্পটিও নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গল্প ‘সরলাবালা ও কেশবের যুদ্ধ’ গল্পের মধ্যেও দেখি গল্পের পটভূমি কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত। পড়ার পর মনে হয় এটিও একটি উপন্যাস হতে পারত। কেশব মুক্তিযুদ্ধে এতিম হয়। মা-বাবা দুজনকে হারায়। সরলাবালাও তার সর্বস্ব হারিয়েছে পাক হানাদারদের নির্মম পাশবিকতায়। দুজনের দেখা হয় এক হাসপাতালে। সমাজ যাকে গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত, যার কোনো পরিবার নেই আশ্রয়ের, সেই সরলাবালাকে বুকে টেনে নিয়ে জীবনসঙ্গী করে কেশব। তারপর দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু নিজের ভিটেমাটিতে ঠাঁই হলো না তাদের। পথের পাঁচালীর হরিহরের মতো তাকেও নিজগ্রাম ছাড়তে হলো অন্য আশ্রয়ের দিকে। সেখানেও জীবনের যুদ্ধের শেষ নেই। দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে সরলাবালা ও কেশবের জীবন যখন প্রান্তে এসে দাঁড়ায়, তখনও তাদের লড়াই চলতে থাকে। জীবনটা এমনই, বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করতে হয়। গল্প পাঠ করতে করতে এই বোধ ক্রমশ গাঢ় হয়।

মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও এই বইয়ে বায়ান্নর সমুজ্জ্বল উপস্থিতি আছে। ‘উত্তারাধিকার’ গল্পে প্রবীণ আনোয়ার সাহেব নতুন প্রজন্মের নাজনীনের কাছে একুশের গল্প বলে। নদীর ধারার মতো আমাদের অহংকারের গল্পগুলো এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে যেতে থাকবে। এই স্বপ্নই ছড়িয়ে দিয়েছেন গল্পকার। ছোট এই গল্পে কোনো জটিলতা নেই, নেই ঘটনার ঘনঘটা। শুধু তখনকার একুশের স্মৃতিচারণ আর এখনকার একুশের বর্ণনায় এক তুলনামূলক চিত্র আঁকা হয়ে গেল সাড়ে পাঁচ পৃষ্ঠার এই গল্পে।

বায়ান্ন ও একাত্তর ইতিহাস নয়, স্মৃতিও নয়, এগুলো আমাদের সত্তা। আমাদের অস্তিত্ব। সেই অস্তিত্ব জ্বলন্ত করে রাখতে হবে আমাদের চেতনায়। আর তা সম্ভব হবে সাহিত্যের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ভাষা আন্দোলন নয় শুধু, যে কোনো সময়কে বাঁচিয়ে রাখে, সময়ের স্মৃতিকে ধরে রাখে সাহিত্য। তারই একটা উদাহরণ আমরা দেখতে পাই এই বইয়ের প্রথম গল্প ‘দীপা দাশের দশ মিনিট’ এ। ক্ষমতার রাজনীতি মানুষকে কী রকম দানবে পরিণত করে, তার নৈরাজ্য সাধারণ মানুষের জীবনে কী ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসে তারই প্রামাণ্যচিত্র যেন এই গল্প। একটা দুঃস্বপ্ন দিয়ে গল্পের শুরু, শেষ পর্যন্ত পুরো জীবনটা তার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। বিশেষ একটা কাজে ঘর থেকে বের হতে দশ মিনিটি দেরি হয়েছিল দীপার। শত তাড়াহুড়ো করে দশ মিনিটের ব্যবস্থা করতে পারেনি। দশমিনিট আগে একটা বাস ছেড়ে দিয়েছে। পরের বাসটি ধরেছে। সেই বাসে আগুন দিয়েছে হরতাল সমর্থনকারীরা। দীপা দাশের শরীর পুড়েছে। সঙ্গে পুড়েছে পরিবারের সবার কপাল।

হাসনাত আবদুল হাই সময়ের প্রতি খুবই সচেতন।  সময়ে অতীত যেমন এসেছে, তেমনি বর্তমানও বাদ যায়নি। প্রায় গল্পেই সময়ের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়েছে। সময় নিজেই একটা চরিত্র হয়ে বর্ণিত হয়েছে। দীপা দাশ তো একটা প্রতীক মাত্র, মুখ্যত এখানকার প্রধান চরিত্র তো রাজনীতির নৈরাজ্যই। ঠিক তেমনি অনিমেষ মজুমদার, সরলাবালা কিংবা আসলাম খাটক মুখ্য নয়, এখানে মুখ্য একাত্তর, তেমনি ‘উত্তরাধিকার’ গল্পে আনোয়ার সাহেব নয়, এখানেও প্রধান চরিত্র বায়ান্ন। আর যেসব গল্পে আমরা এ রকম বিশেষ কোনো সময়কে চিহ্নিত করতে পারি না, সেখানে কোনো এক ব্যক্তির ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে চিরকালের মানুষ। লাল ‘ছাতাহাতে মেয়েটি’, ‘বাউল’, ‘সহযাত্রী’, ‘কতিপয় বৃদ্ধের যৌবন’ গল্পে আমরা স্পষ্টত দেখি মানুষের মৌলিক প্রবণতাকে। ‘বাউল’ গল্পের জামান আমেরিকার বিলাসী জীবন ছেড়ে চলে আসে মাতৃভূমিতে। তার নিজের জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে কিছু বাউন্ডুলে বাউল মানুষ। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ‘লাল ছাতা হাতে মেয়েটি’ জোহরাও চিরন্তন মানবিক আবেদন নিয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে।

একাত্তর, বায়ান্নর আবেদন যেমন ফুরোবার নয়, তেমনি বাউলের সঙ্গে মিশে গিয়ে অনির্দিষ্ট জীবনের ধাবমান চরিত্র জামানের মনের আবেদনও আমাদের পার্থিব জীবন ছাড়িয়ে অন্য এক অপার্থিব জীবনের আনন্দের কাছে নিয়ে যায়। এভাবেই বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ যাত্রায় সংযুক্ত হয়ে যায় দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রা। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares