আলোচনা : গল্পগ্রন্থ―হাসনাত আবদুল হাই : দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রা অবিকল বাংলাদেশের চিত্র : আফরোজা পারভীন

হাসনাত আবদুল হাইয়ের  লেখা দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রা পড়ে মুগ্ধ হলাম। তিনি স্বনামখ্যাত লেখক। গল্প উপন্যাস স্মৃতিকথা ভ্রমণসহ সাহিত্যের সব শাখায় তার অনায়াস বিচরণ। তার নভেরা ও সুলতান পড়ে ভালোলাগার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম। তাই তার কাছে প্রত্যাশা সবসময়ই বেশি। দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রা ১২টি গল্পে ১১২ পৃষ্ঠার একটি গল্পগ্রন্থ। গল্পগুলো ২০০৭ থেকে ২০১৭ সময়কালে লেখা। তবে ‘আসলাম খাটকের দুশমন’ গল্পটির সময়কাল উল্লেখ নেই।  গল্পগুলো সাজানো হয়েছে সময়কাল অনুযায়ী। গল্পের নাম ‘দীপা দাশের দশ মিনিট’, ‘লাল ছাতা হাতে মেয়েটি’, ‘আসলাম খাটকের দুশমন’, ‘উত্তরাধিকার’, ‘বাউল’, ‘সহযাত্রী’, ‘কতিপয় বৃদ্ধের যৌবন’, ‘রাত এগারোটায় মেয়েটি’, ‘তাহেরার চাকরি’, ‘সানকি’, ‘সরলাবালা ও কেশবের যুদ্ধ’, ‘দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রা’। এর মধ্যে আসলাম ‘খাটকের দুশমন’, ‘সরলাবালা’ ও ‘কেশবের যুদ্ধ’, দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রা মুক্তিযুদ্ধের ক্যানভাসে রচিত। বাকি গল্পগুলিতে চিত্রিত হয়েছে বাংলাদেশের চালচিত্র। তার মাঝে ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতির আছে, আছে সামাজিক অবক্ষয়, অন্ধকার, ঘা-এর কথা। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বইটি প্রকাশ করেছে ‘কথাপ্রকাশ’ । দাম ২০০ টাকা।

প্রথম গল্প ‘দীপা দাশের দশ মিনিট’। মাত্র দশ মিনিটের হেরফেরে দীপা দাশ আর তার পরিবারের ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবার গল্প এটি। দুই মেয়ে রুচি, সুচি আর স্বামী নরেনকে নিয়ে দীপা দাশের সুখের সংসার। খুবই অল্প তার চাওয়া। ভালোভাবে বেঁচে বর্তে থাকতে চায়, মেয়ে দুটোর ভালো বিয়ে দিতে চায় এতটুকুই। বড় মেয়ে ব্যাংকে কেরানির চাকরি করে। ছোট মেয়ের আরও পড়ার ইচ্ছে ছিল। রুচি তাকে নিজের বেতনের পয়সায় পড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু  নরেন রাজি হয়নি। বলেছে বিয়ের পর রুচির স্বামীর একটা মতামত থাকবে। সমস্যা হতে পারে। বরং সুচি চাকরি করুক। সেদিন সুচি যাবে ইন্টারভিউ দিতে। দীপা যাবে তার সাথে। মেয়ের বারণ সে শোনেনি। মেয়ের জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ বলে কথা। সে সাথে থাকলে মেয়েটার ভালো লাগবে, মনে সাহস পাবে।

 নিয়ম করে সারা বছর সকাল সাতটায় ওঠে দীপা। তারপর রেঁধে  বেড়ে  খাইয়ে স্বামী আর দুই মেয়েকে কাজে পাঠায়। বছরের পর বছর এর কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। দেহঘড়ি তাকে জাগিয়ে দেয়। কিন্তু আজকের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ দিনটিতেই সে দশ মিনিট দেরি করে উঠল। দেরি করে উঠল একটা দুঃস্বপ্ন দেখে। ঘুম ভাঙার পরও দুঃস্বপ্নটা তাকে তাড়া করে ফিরতে লাগল। দশ মিনিট দেরি করে ওঠায় সব কাজেই সে দশ মিনিট পিছিয়ে পড়ল। হাজার চেষ্টা করেও এই দশ মিনিট সে পোষাতে পারল না। মেয়ের, স্বামীর বের হতে দশ মিনিট দেরি হলো। দশ মিনিটের জন্য সে মেয়েকে নিয়ে প্রথম বাসটা মিস করল। তারপরের বাসে যদিও মেয়েকে নিয়ে  উঠল, প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে অসংখ্য হাত তার শরীরে বিচরণ করতে থাকল। সে নিজের জন্য যতটা না, মেয়ের জন্য ভীষণ চিন্তিত হল। এই কুৎসিত লোকগুলোর সাথে একই বাসে চড়ে তার মেয়ে প্রতিদিন কাজে যায় ভেবে তার মন বিষণ্ন হলো। দিনটা ছিল হরতাল অবরোধের। বাস আর যানবাহন ছিল কম। ইন্টারভিউ শুরু হয়ে যাবে কিনা এই চিন্তায় দীপা যখন অস্থির তখনই বাসে আগুন দেওয়া হলো। তারপর ঝলসানো শরীরে দীপা হাসপাতালে নিজেকে আবিষ্কার করল, কিন্তু মেয়ে সুচিকে দেখল না। নার্সকে বলল মেয়ে সুচিকে খুঁজে দিতে। নার্স বলল, হ্যাঁ ওই নামটাই এখন দরকার। তাছাড়া কাউকেই এখন আলাদা করে খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। এই বাক্যেই বোঝা যায় কী বীভৎসভাবে পোড়ানো হয়েছিল তাদের। তাদের দেখে বোঝা সম্ভব ছিল না কে সুচি কে দীপা বা অন্য কেউ। এমন সময় একজন নেতা এলেন দীপার কাছে, সাথে মিডিয়া। লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিয়ে দীপাকে বললেন,  বলুন কার অপরাধে আপনার এই অবস্থা ? দীপা তখনও সুচির কথা বলে চলেছে। সে নেতাকে বলল, সে নেতা বোঝে না রাজনীতি বোঝে না, কারও কোনো ক্ষতি করেনি তাহলে কেন তাদের সাথে এমন হল। নেতা যখন এমাগত চাপ দিতে থাকল তখন দীপা চিৎকার করে বলল, দশ মিনিট, দশ মিনিট।

এই গল্পটিতে আমাদের দেশের রাজনীতির কুৎসিত চেহারা, প্রতিহিংসা আর সেই চেহারার বলি সাধারণ মানুষের চিত্র ফুটে উঠেছে। ফুটে উঠেছে কতকগুলো কদর্য কুৎসিত মানুষের চেহারা যারা সুযোগ পেলেই মেয়েদের শরীরে হাত দেয় সে কুমারী তরুণী বৃদ্ধা নির্বিশেষে। নীতি নৈতিকতার চরম স্খলনের বাস্তব চিত্র এ গল্পটি। দীপা মা। তার  মনে হয়েছে ঘুম থেকে উঠতে দশ মিনিট দেরি হয়েছে বলে এমনটা হয়েছে। বাস্তবতা তা নয়। ক্ষমতা লোভ ঈর্ষায় ছেয়ে গেছে দেশ। আর এই লোভ লালসার চর্চা যারা করছে তাদের আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে দীপার মতো অসংখ্য সাধারণ মানুষ।

‘লাল ছাতা হাতে মেয়েটা’ গল্পে দুজন মডেলকে চিত্রিত করা হয়েছে। আমাদের দেশে মিডিয়ায় যারা কাজ করে তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আছে। মডেলদেরও যে মর্যাদাবোধ আছে, স্বাতন্ত্র্য আছে, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আছে তা প্রথম  মডেল যিনি লাল ছাতা হাতে বৃষ্টিতে ভিজে এসেছিলেন তার মাঝে এঁকেছেন লেখক। যিনি ‘এ লাইনে কীভাবে এলেন’ বলাতে ফুঁসে উঠেছিলেন। আত্মবিশ্বাসের সাথে নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, স্বামী তার কাজ পছন্দ করুক বা না করুক তিনি কাজ করবেন। আর দ্বিতীয় মডেল গতানুগতিক। যে সাংবাদিক দ্বিতীয় মডেলের  ইন্টারভিউ নিতে এসেছিলেন  প্রথম মডেল স্টার সাবান সুন্দরী জোহরা ভুল করে তার সামনে বসে। আর সাংবাদিকও তাকে প্রশ্ন করে । কিন্তু সে কিছুই নোট নেয় না। এই নৈতিকতা সে বজিয়ে রাখে। এ গল্পে মডেলকে দেখে মাতলামি, রেস্টুরেন্টের বয়-বেয়ারাদের তাকে বাঁচানো এবং তাঁকে ঘিরে বয় বেয়ারাদের কৌতূহলের চিত্র বর্ণিত হয়েছে যা সচরাচর ঘটে থাকে।

‘আসলাম খাটকের দুশমন’ গল্পের আসলাম একজন পাঠান। সে সেনাবাহিনীতে  চাকরি করে। বিয়ে করতে নিজ গ্রাম আকোরা খাটকে গিয়েছিল। কর্নেল দানজুয়া জরুরি তলব করে তাকে ডেকে আনে রাওয়ালপিন্ডি। কতকগুলো ছবি দেখায় তাকে। কারও স্তনে নখের আঘাত, কারও উরুতে গভীর ক্ষত, কারও পেটের নিচে কালসিটে দাগ। দানজুয়া জানায় নিরীহ পশ্চিম পাকিস্তানিদের আচমকা আক্রমণ করেছে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা। অন্যান্য সিপাহিরাও একই কথা বলে। দানজুয়া জানায় তাকে যেতে হবে পূর্ব পাকিস্তান। রক্ত টগবগ করে ওঠে পাঠানের। ঢাকায় আসার পর ব্রিগেডিয়ার সুলতানও একই কথা বলে। আসলামদের নিয়ে কনভয় রওনা হয় ঢাকা ছাড়িয়ে মানিকগঞ্জের দিকে। রাস্তায় মুক্তিযোদ্ধারা অ্যামবুশ করে গাড়ি উল্টে দেয়। আসলাম ধরা পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। তাকে বিচারের জন্য নিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধারা। তখনও আসলাম নিজ বিশ্বাসে অটল। সে বলে চলে, এদেশের মানুষ নিরীহ পাকিস্তানি নারী পুরুষ শিশুদের হত্যা করছে।  ঢাকা থেকে আসার পথে জ্বালিয়ে দেয়া গ্রামগুলোর কথা বলে, মানুষ শূন্য শহরগুলোর কথা বলে। বলে সে নিরাপরাধ। এসবই বাঙালিরা করেছে। গ্রামবাসীরা জানায়, তারা না, করেছে পাকিস্তানিরা।  মুক্তিযোদ্ধারা কিছুক্ষণ আগের রকেট হামলায় মৃত অনেকগুলো শিশুকে দেখায়। তারপর আসলামকে একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হবে তাকে। ওকে ফাঁসি দেবার প্রক্রিয়া যখন শুরু করেছে মুক্তিযোদ্ধারা তখনই শুরু হয় পাকিস্তানিদের আক্রমণ। তারা স্ট্রেফিং করে প্লেন থেকে, হেলিকপ্টার নিয়ে আক্রমণ করে। জেট প্লেন থেকে রকেট ছোড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা থ্রি নট থ্রি দিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করে। অনেকে মারা যায়। আর ঠিক তখন  আসলাম একজন গুলি খাওয়া মক্তিযোদ্ধার হাত থেকে ত্রি নট থ্রি নিয়ে পাকিস্তানিদের আক্রমণ করে। এতক্ষণে সে বুঝে গেছে তার আসল দুশমন কারা।

এদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনেক পাকিস্তানি বাধ্য হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, শুনেছি। কিন্তু কোনো পাকিস্তানি সেনা সে বালুচ পাঠান বা সিন্ধ যেই হোক না কেন নিজেদের সেনার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে বলে শুনিনি। বরং স্বাভাবিক ছিল ওই জেট প্লেনের আরোহীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজে বাঁচার চেষ্টা করার। তবে অনেক সময় নৈতিকতা ও শুভবোধের কাছে নিজের জীবন তুচ্ছ হয়ে যায়। এ গল্প সেটাই বলেছে।

‘উত্তরাধিকার’ গল্পটিতে নানা নাতনি মেয়ে তিন প্রজন্মের একুশে ফেব্রুয়ারি ও ভাষা আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কথা বিবৃত হয়েছে।

‘বাউল’ গল্পটিতে স্ত্রী বিচ্ছেদের পর বিদেশ ফেরত জামানের বন্ধুদের সাথে হৈ চৈ করে সময় কাটানো, সঙ্গীতপ্রীতি, বিশেষ করে বাউল সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। পিকনিক করতে কালিয়াকৈর এসে একদল বাউলের দেখা পাওয়া, তাদের গান শোনা, গ্রামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে তাদের থাকতে দেওয়া এবং শেষাবধি নিজে থেকে যাওয়া তার মাটিলগ্নতার প্রকাশ।

‘সানকি’ গল্পটিও অনেকটা একই ধাঁচের। মাসুম সাহেব তার স্ত্রী জমিলা খাতুনকে নিয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন পয়সা বৈশাখের অনুষ্ঠান দেখতে। বৈশাখে ঘুরে ঘুরে গান বাজনা শোনা, মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখার পর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই চিন্তিত। ফোন করলে জানা যায় তিনি সানকিতে পান্তাভাত খাচ্ছেন। দারুণ লাগছে খেতে, পোড়ামাটির গন্ধ পাচ্ছেন। যা সকালবেলা প্লেটে খেয়ে পাননি। তিনি অন্যদেরও এসে সানকিতে পান্তাভাত খেতে বলেন।

‘কতিপয় বৃদ্ধের যৌবন’ গল্পটি মহানায়িকা সুচিত্রা সেনকে নিয়ে লেখা। বৃদ্ধ রসুল সাহেব, হাসান সাহেব ও ইসলাম সাহেব ‘পূর্বাণী হাই রাইজ’-এ থাকেন। তাদের বয়স পঁচাত্তরের উপরে। তিনজন আড্ডা দেন, চা নাস্তা খান আর প্রতিদিন সিনেমা দেখেন। সুচিত্রা সেনের অনুরাগী তারা। তার সব ছবির ডায়লগ মুখস্থ। সুচিত্রা সেন যখন হাসপাতালে মৃত্যুশযায়, তখন তাকে নিয়ে উদ্বেগ এই গল্পের মূলে আছে। ৫ বার বেলভিউতে যাবার পরও যখন তিনি ফিরে এসেছেন এবারও ফিরবেন প্রাচ্যের এই গ্রেটা গার্বো, বৃদ্ধদের এটাই ধারণা। কারণ তিনি যোদ্ধা, অসম্ভব আত্মনিয়ন্ত্রণ। সুচিত্রা ছিলেন ৩৫ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে আর গ্রেটা ৩৯ বছর। সুচিত্রা শেষাবধি মারা যান। এক লোক জয়পুর থেকে হেঁটে তাকে বেলভিউতে শেষ দেখা দেখতে আসেন। কাগজে এটা পড়ে বৃদ্ধরা বলেন লোকটির কল্পনাশক্তি নেই। অর্থাৎ তাদের কল্পনার চোখে সুচিত্রা এখনও অপরূপা। 

এ গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘সহযাত্রী’। অধ্যাপক হুমায়ুন কাদির একটি বাসের যাত্রী ছিলেন। বাস একটি মাইক্রোবাসকে পেছন থেকে আঘাত করে। বাসের ড্রাইভার কাটিয়ে চলে যেতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। মাইক্রোবাসের সব যাত্রী নেমে বাসটিকে ঘিরে ধরে। গ্রাম থেকে লাঠিসোটা হাতে ছুটে আসতে থাকে মানুষ। মারপিটের সাথে সাথে লুটপাট করাও কিছু মানুষের উদ্দেশ্য। হুমায়ুন কাদিরের বাসের পেছনে যানবাহনের লম্বা লাইন পড়ে যায়। বাসের ড্রাইভার, হেলপারকে টেনে নামিয়ে মারধোর শুরু হয়। বাসে একজন ভরা অন্তঃসত্ত্বা মহিলা ছিলেন। তার সাথে একজন কিশোর। দুশ্চিন্তায় অস্থির মহিলা। তিনি বারবার  পেটের ওপর হাত বুলাতে থাকেন আর বলেন, তাকে খুব তাড়াতাড়ি কুষ্টিয়া যেতে হবে। বাসের সব লোক একজোট হয়ে হুমায়ুন কাদির সাহেবকে বলেন নিচে নেমে সবাইকে অনুরোধ করে ঘটনাটা মিটানোর চেষ্টা করতে। তার চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ আছে। সবাই মেনে নেবে বলে যাত্রীদের বিশ্বাস। ততক্ষণে বাসের বডিতে চপেটাঘাত শুরু হয়েছে। উইন্ডশিল্ড ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো কাচ ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাসে। হুমায়ুন কাদির সাহেব রাজি হন না। তিনি বলেন, ‘মবের সামনে গিয়ে লাভ নেই। তারা কারও কথা শোনে না।’ এমন সময় উঠে দাঁড়ায় মেয়েটি। সে বাসের দু’সারি বেঞ্চির মধ্য দিয়ে হেঁটে সামনে যেতে থাকে। সবাই অবাক! সে দরজা খোলে, সিঁড়ির ওপর দাঁড়ায়। মারমুখী জনতা ওকে দেখে ঘুরে দাঁড়ায়, থমকে যায়। মেয়েটি ড্রাইভারকে বলে, বাসে উঠে আসেন। ড্রাইভার সাহস পায় না। মেয়েটা আবার বলে, ‘উঠে আসেন। ওরা কিছু বলবে না।’ ড্রাইভার উঠে আসে। বাস চলতে শুরু করে।

গল্পটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বলছি এ জন্য যে, প্রথমত এ ধরনের বাস এক্সিডেন্ট এদেশে নিত্যকার ঘটনা। আনাড়ি ড্রাইভার, লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ড্রাইভারদের পাল্লাপাল্লি,  ট্রাফিকের অব্যবস্থা, খারাপ রাস্তার কারণে প্রতিনিয়ত এসব ঘটনা ঘটে। এর কোনো উন্নতি নেই। দ্বিতীয়ত, এদেশের এক শ্রেণির লোক যতই মারপিট লুটতরাজে সিদ্ধহস্ত হোক না কেন, ভরা অন্তঃসত্ত্বা একজন নারীর প্রতি মমতা এখনও দেশের অধিকাংশ পুরুষের আছে। এই নৈতিকতার জায়গাটি এখনও লুপ্ত হয়নি।  যে কারণে মদমত্ত পুুরুষেরাও নারীর জননী রূপ দেখে থমকে যায়। হয়তো নিজেদের মায়ের কথা মনে পড়ে।

‘রাত এগারোটায় মেয়েটি’ গল্পে আমাদের মানুষ ও সমাজের অবক্ষয় এবং নৈতিকতা দুটো রূপ পরিস্ফুট হয়েছে। চৌধুরী আনোয়ার বিশাল বড় লোক। সব নতুন মডেলের গাড়ি তার কাছে আছে। গল্পটি প্রথম পুরুষে লেখা। যিনি গল্পটি বলছেন তিনি কোনো এক কাজে চৌধুরীর আনোয়ারের কাছে গিয়েছিলেন। আনোয়ার সাহেব তাকে লিফট দিতে চাইলেন। কিন্তু একটা গড়ি  নিয়ে বেরিয়েছে তার মেয়ে আর মাইক্রোবাস নিয়ে ছেলে। সগর্বে বললেন, তার ছেলে মেয়ে রাতে গাড়ি চালাতে খুব ভালোবাসে। মেয়ে পূর্বাচল ছাড়িয়ে চলে যায় সিলেটের দিকে আর ছেলে গাজীপুর ছাড়িয়ে ত্রিশালের দিকে। ছেলের কেসের কি হয়েছে জানতে চাইলে আনোয়ার সাহেব বললেন, ‘রেপ কেসে পেরে ওঠা কঠিন। মিটে গেছে। পুলিশ তার সাথে লাগতে আসেনি।’ মীরপুর চৌদ্দ নাম্বারের কাছে বাসের লাইনে একটা সুশ্রী মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চৌধুরী সাহেব ড্রাইভারকে বললেন, মেয়েটিকে ডেকে আনতে। গন্তব্যে পৌঁছে দেবেন। মেয়েটা রাজি হলো না। তাকিয়েও দেখল না। অবাক হলেন প্রথম পুরুষ। তিনি বললেন, এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়া ঠিক না, এতে ঝুঁকি আছে। মানুষ ভুল বোঝে।  তিনি কেন এটা করতে গেলেন ? আনোয়ার সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তিনি দুটো কারণে এটা করেন। প্রথমত, তিনি সত্যিই মেয়েটাকে সাহায্য করতে চান। দ্বিতীয়ত, রাতে মেয়েটা বিপদে  পড়তে পারে।  তার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল সেটা মিথ্যে নয় তা তিনি জানেন। প্রথম পুরুষ বাড়ি পৌঁছে চিন্তায় অস্থির হয়ে যান। কল্পনার  চোখে তিনি দেখেন মেয়েটা একটা বাস ধরেছে। আস্তে আস্তে বাসের সবাই নেমে গেছে। মেয়েটা এখন বাসে একা। ভয়ে কাঁপছে মনে মনে। একটা অন্ধকার জায়গায় বাস থেমে যায়। প্রথমে তার ওপর হামলে পড়ে কন্ডাকটার তারপর ড্রাইভার।

 মেয়েটা বাড়ি পৌঁছায় তার এক সহকর্মীর  মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে। মা রাত জেগে অপেক্ষা করছিলেন।

প্রথম পুরুষ সকালে পত্রিকা খুলে কোনো গণধর্ষণের খবর না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

আজকাল মেয়েদের আত্মসম্মান, আত্মসচেতনা অনেক বেড়েছে। এমনকি গার্মেন্টসের মেয়েদেরও । সেকথা আছে বাউল গল্পটিতে। লিফট দিতে চাইলেও গার্মেন্টসের মেয়েরা লিফট নেয় না। এ গল্পের মেয়েটিও লিফট নিতে অস্বীকার করেছে। চৌধুরী আনোয়ার আর তাদের ছেলেমেয়ের পাপের ভারা এতটাই পূর্ণ যে বাজ পড়লে বোমা মনে করে। অন্ধকার হলে একসাথে ডাকে পাঁচজন বডিগার্ডকে। ছেলের রেপ কেস ধামাচাপা দেয়। কিন্তু সেই লোকটিরও মনের কোথায় যেন জেগে আছে বিবেকবোধ। সেই বিবেকের তাড়নাতেই রাত এগারোটায় মেয়েটা বিপদে পড়বে ভেবে তাকে লিফট দিতে চায়। আর এদেশে বাসে ধর্ষণ এতটাই স্বাভাবিক যে প্রথম পুরুষ কল্পনায় যে চিত্র দেখে তাও স্বাভাবিক। মেয়েটির সহকর্মীর দেখা না পেলে হয়ত ওদিন সেটিই ঘটত। পুরো গল্পটায় আনোয়ার চৌধুরীর চরিত্র যেভাবে আঁকা হয়েছে তাতে শুধু বিবেকবোধের তাড়নায় মেয়েটিকে লিফট দিতে চাওয়াটা ঠিক বাস্তব মনে হয় না। তবু আমরা আশা রাখি এমনটি যেন সত্যিই হয়।

‘তাহেরার চাকরি’ গল্পটিও বাস্তব। আমাদের দেশের এক শ্রেণির লোক  মেয়েদের বিদেশে  চাকরি দেবার প্রলোভন দেখায়। গরিব বাবা মায়েদের টাকার লোভ দেখিয়ে তাদের মেয়েদের বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। কখনও বিদেশে আয়ার চাকরি দিয়ে পাঠায়। কখনও চাকরি না দিয়েই বিদেশে পাঠায়। কখনই বিদেশে না পাঠিয়ে দেশেই তাদের দিয়ে পতিতাবৃত্তি করায়। একইভাবে আজিজ মিয়া জব্বার মিয়াকে টাকার লোভ দেখিয়ে প্রথমে তার মেয়ে মাজেদাকে নিয়ে যায়। মাজেদার চিন্তায় যখন বাবা আর মা জহুরা অস্থির তখনই সে আবার টোপ ফেলে। তাহরাকে নিশানা করে। তাহেরা সুশ্রী, দেখতে শুনতে ভালো। জব্বার তাহেরাকে বিয়ে দিতে চায় কিন্তু আজিজ তার হাতে অ্যাডভান্স বাবদ টাকা গুনে দিয়ে বলে, ‘তাহেরাকেও সে বিদেশে পাঠাবে। মাজেদার চেয়ে তাহেরার ভালো চাকরি হবে। তারা টাকার গদিতে শোবে। বাড়িতে দালান কোঠা হবে।’ তাহেরা রাজি হয়ে যায়। সে তার প্রেমিকের ভালোবাসাকে পায়ে দলে আজিজের সাথে আসে। এরপর খবর পেয়ে পুলিশ রেড দিয়ে ঢাকা শহরের এক বাড়ি থেকে কতকগুলো মেয়েকে উদ্ধার করে। আদম ব্যাপারি আজিজ আগেই পালিয়ে যায়। এনজিওর লোকও পৌঁছে যায়। যারা বাড়ি যেতে চায় তাদের এনজিওর ব্যবস্থাপনায় বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। যারা ঢাকায় থেকে কাজ করতে চায় তাদের কাজ দেয়। একদিন জব্বার মানিঅর্ডারে কিছু টাকা পায়। সে বুঝতে পারে না কে টাকা পাঠিয়েছে। তবে ধরে নেয়  তাহেরা পাঠিয়েছে। তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। জোহরার সম্পর্কে কিছু জানতে না পেরে অতৃপ্তি থেকে যায়।

সরলাবালা ও কেশবের যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত। গল্পে সরাসরি যুদ্ধ নেই। তবে আছে যুদ্ধের দাবদাহ, যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের অবস্থা। সরলাবালা বীরাঙ্গনা। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে হাসপাতালে ফোঁড়া কাটাতে গিয়ে সরলাবালাকে দেখে কেশব।  মেয়েটাকে তার ভালো লাগে। বন্ধু অরুণের কাছে সে সব জানতে পারে। সে সরলাবালাকে বিয়ে করে দেশে নিয়ে আসে। ক্যাম্পে তার বাবা মা মারা গিয়েছিল। দেশেও ঘরবাড়ি বলতে কিছু ছিল না। নতুন করে সংসার গড়ে তারা। কিন্তু সংসার করা হয় না। গ্রামে সরলার ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। গ্রাম্য সালিশে রায় হয়, সরলাকে না ছাড়লে তাকে একঘরে করবে। কেশব সরলাকে নিয়ে গ্রাম ছাড়ে। এক বন্ধুর সহায়তায় সে ঘর বাধে শিবচরে।  তাদের সংসার ছেলেমেয়ে হয়। বাজারে একটা মুদি দোকান আছে। তা দিয়ে কোনমতে চলে। কেশব হাঁপানির রোগি। এমন সময় একদিন সে শোনে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। তার সমস্ত অসুখ যেন উধাও হয়। সে সরলাকে বলে ঢাকায় গিয়ে তার সবকথা জানাতে। সরলা আপত্তি করে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। এতদিন পর সবাই সব জেনে যাবে। কিন্তু কেশবের প্রবল ইচ্ছেয় সে রাজি হয়।

গ্রাম্য এমন সালিশের ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তীকালে অনেক ঘটেছে। বীরাঙ্গনা মেয়েরা অনেকে গলায় দড়িও দিয়েছে। দু’চারজন কেশবের মতো মানুষ তাদের ঘর সংসার দিয়েছে। সমাজ তাদের ভালো  চোখে দেখেনি। সবই সত্যি। কিন্তু যুদ্ধের ছেচল্লিশ বছর পর কেশবের সরলাকে দিয়ে নিজের কথা বলাতে চাওয়াটা কেমন যেন বিশ্বাস হয় না। যুদ্ধের পর বদলে যাওয়া বাংলাদেশ কি কেশবের মতো যোদ্ধারা দেখেনি? ছেচল্লিশ বছর পর একজন বীরাঙ্গনার নিজের গল্প দেশবাসীকে জানিয়ে কি ফল হবে তাকি কেশবের একবারও মনে হয়নি? তার ঘরের চাল ভাঙা, বেড়ার ফুটো দিয়ে হু হু হাওয়া ঘরে ঢোকে, চিকিৎসা হয় না। এমন দেশে সরলা তার গল্প বললে কি হবে! যুদ্ধাপরাধীর বিচার যদি  হয়ও তার আঁচ কতটা কেশবের গায়ে লাগবে সেটা সে ভাবেনি!

নাম গল্প ‘দুটি রাতের ভোরের দিকে যাত্রা’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। মফস্সল শহরের ইংরেজির শিক্ষক অমিয়ভূষণ। তার স্ত্রী কমলা রানী। যুদ্ধ শুরু হলে কমলা অনেকবার স্বামীকে বলেছেন, ওপারে চলে যেতে। তার সন্তানরা ওপারে আছেন। অমিয় রাজি হননি। তার কথা, কিছু হবে না তাদের। তারা তো কোনো অন্যায় করেননি।  ‘কুকুরের মতো লেজ গুটিয়ে কেন পালাবেন জন্মভিটে ছেড়ে।’ কমলা বলেছেন, ‘আমরা হিন্দু।’ অমিয়ভূষণ বলেছেন, ‘পাকিস্তানিরা মুসলমানদেরও মারছে।’ অমিয়ভূষণ বন্ধুপ্রিয় মানুষ। বন্ধুদের সাথে গল্পগজব, গান গেয়ে সময় কাটান। বন্ধুরা প্রথম দিকে আসা কমিয়ে দিলেও কিছুদিন পর মাঝে মাঝে আসতে থাকে। তখন চা নাস্তার পর্ব চলে, গান বাজনা হয়। বাড়ির দরজা জানালা বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। একদিন শহরে মিলিটারি আসে। বন্ধু সবুর সাহেব জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঞ্জাবি সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সাত্তার খুবই নিষ্ঠুুর। রোজ সন্ধ্যায় নদী তীরে নিজ হাতে মানুষকে গুলি করে মারে। তিনি শহরের এলিট আর প্রফেশনালদের একটা তালিকা তৈরি করেছেন। গ্রিন মানে সন্দেহের বাইরে, গ্রে সন্দেহভাজন আর ব্লাক বিচার ছাড়াই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। তবু অমিয়ভূষণ  শহর ছাড়ার কথা ভাবেন না। একদিন সেনাবাহিনির গাড়ি বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যায়। তারপর একদিন সন্ধ্যায় জিপ গাড়ি এসে থামে তার বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নামেন অফিসার সাত্তার। স্ত্রী ভয় পেয়ে কাঁপতে কাঁপতে  বলেন, ‘চলো পেছন দিয়ে পালিয়ে যাই। ও মারতে এসেছে।’  অমিয়ভূষণ বলেন, ‘একা এসেছে। ভয় পেও না। কেমন শান্ত দেখাচ্ছে ওকে। হয়তো কিছু বলতে এসেছে।’ তিনি কম্পনরত স্ত্রীকে রেখে দরোজা খুলে অফিসারকে রিসিভ করেন। অফিসার করমর্দন শেষে  সোফায় বসে তার সাথে গল্প জুড়ে দেন। চা নাস্তা খান। তারপর অমিয়ভূষণের কাছে গান শুনতে চান। গজল তার প্রিয়। অমিয়ভূষণ তাকে গেয়ে শোনান। তার ওঠার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। রাতে খান। যতবার অমিয়ভূষণ গান থামান ততবারই তিনি চালিয়ে যেতে বলেন। অমিয়ভূষণ  ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তিনি ক্লান্ত হন না। সকালে নাস্তা খান। তারপর যাবার জন্য উঠে দাঁড়ান। ঘর থেকে  বেরিয়ে কিছু দূর গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে  বলেন, ‘ও। একটা কাজ বাকি রয়ে গিয়েছে। আপ কা ওয়াইফ কে বুলাইয়ে।’ অমিয়ভূষণ স্ত্রীকে ডেকে আনেন। সকাল ৮টায়  অফিসার অফিসে যান। রেজিস্টার টেনে নিয়ে কালো কালিতে লেখা দুটো নামের পাশে ক্রস দিয়ে কেটে দেন। তারপর আরদালিকে ডেকে বলেন, এক কাপ কফি লে আও।

 ছেচল্লিশ বছর পর সংবাদপত্র অফিসে এসে এ গল্প বলে যান একজন। স্টোরি করবার জন্য এলাকায় যান একজন সাংবাদিক। ফরেস্ট  রোডের শেষ মাথায় সামনে বকুল গাছঅলা একতলা বাড়ি খুঁজে পান না। সেখানে দেখতে পান একটা তেতলাবাড়ি। খুঁজতে গিয়ে তিনি মুখোমুখি হন মুখে চাপদাড়ি চোখের নিচে সুরমার দাগ বেশ হৃষ্টপুষ্ট লম্বা ভারিক্কি একজন লোকের। তার ইঙ্গিতে পাঁচজন ষণ্ডামার্কা সাগরেদ  সাংবাদিককে মেরে ফরেস্ট রোডের শেষ মাথায় গাছপালার নিচে ফেলে দেয়। সকালে কয়েকজন হাঁটতে গিয়ে বডিটা দেখে থানায় জানায়। থানা থেকে পুলিশ গিয়ে ভ্যানগাড়িতে বডিটা নিয়ে আসে। মানুষটা মরেনি। ওই সুরমাআঁকা লোক তার লোকজনদের নির্দেশ দেয় হাসপাতালে গিয়ে ওটাকে শেষ করে দিতে।

মুক্তিযুদ্ধকালে এলিটদের এভাবে নিধন ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সে কারণে হিন্দু এলিট  শ্রেণি যুদ্ধের শুরুতেই ইন্ডিয়া চলে গিয়েছিল। দুচারজন দেশপ্রেমিক মানুষ দেশে থেকে যাননি এমনও নয়। তবে তাদের সংখ্যা নগণ্য। হয়তো তেমন একজন অমিয়ভূষণ। আর সেনা কর্তকতার যে চরিত্র আঁকা হয়েছে তা সত্যিই অদ্ভুত। হ্যাঁ অনেক নিষ্ঠুর মানুষ আছে যারা গান বাজনা ভালবাসে, ছবি আঁকে। কিন্তু দুজন মানুষকে হত্যা করার জন্য একজন পাকিস্তানি অফিসার এতটা সময় দেবে কি ? সবচেয়ে বড় কথা, যে বিষয়টার জবাব পাওয়া যায় না তা হচ্ছে  ছেচল্লিশ বছর পর যিনি সংবাদপত্র অফিসে এসে এ ঘটনা বললেন তিনি কে, এ পরিবারের সাথে তার কি সম্পর্ক ? কেন তিনি এই গল্পটা বলার জন্য বিদেশ থেকে এলেন ! তাও ছেচল্লিশ বছর পর! সেকথাটাও জীবনানন্দকে উদ্ধৃত করে সাংবাদিকের ভাবনায় বলেছেন লেখক, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন ?’

হাসনাত আবদুল হাই-এর লেখা ঝরঝরে, গতিশীল। পড়তে বসলে শেষ না করে ওঠা যায় না। পড়ার পরও অনেকক্ষণ রেশ থেকে যায়। মনের মধ্যে অনুরণন তোলে। উপমা প্রয়োগে তিনি অনন্য। যেমন, ‘কাঠের টুকরার মতো ঘুমায়’, ‘দাপুটে বৃষ্টি’, ‘ঘষার জন্য ভেজা কাগজের অংশ এখানে সেখানে লেগে থাকে।  দেখে মনে হয়  বেলি কিংবা বকুল ফুলের পাঁপড়ি’, ‘কিচেন টাওয়েলের রোল ঘুরতে ঘুরতে ছোট হয়ে আসে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে সে বুঝি চরকা থেকে মোটা সুতো টেনে টেনে নিচ্ছে’। চরিত্র বিশ্লেষণে সার্থক। গল্পের শেষে মোচড় প্রায় সবগুলো গল্পেই উপস্থিত। তিনি বাংলাদেশের বাস্তব গল্প বলেছেন। সে বলা সার্থক হয়েছে। তার গল্পে বাংলাদেশকে দেখতে পেয়েছি আমি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares