আলোচনা : আত্মজীবনী―হাসনাত আবদুল হাই : তিনটি গোলাপ : বাদল সৈয়দ

বইটির নামটিই প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

চমৎকার  তো! ‘All Those Yesterdays’.

নিজে নিজেই বাংলা অনুবাদ করি ‘সেই সব গতকাল’।

হাতে নিয়ে দেখি, না কোনো ফিকশন নয়, আত্মজীবনী। হাসনাত আবদুল হাইয়ের আত্মজীবনী। বইটির নাম কী পনের শতকের কবি ভিলিয়নের ‘Where are the snows of yesteryears’ দ্বারা প্রভাবিত ? ঠিক জানি না। তবে বইটি পড়ে ২৯ আগস্ট, ২০১১ সালে নিজেই এর মার্জিনে লিখেছিলাম,‌ ‘বইটি পড়াটাই ছিল একটি অভিজ্ঞতা। সকালে শুরু করেছিলাম, বিকেল হয়েছে তারপর তা গড়িয়ে রাত নেমেছে; কিন্তু এটা ছেড়ে উঠতে পারিনি।’

কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী অতি সুখপাঠ্য বই পড়ে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। কারণ এটি শুরু হয়েছে লেখকের কলেজ জীবন থেকে শেষ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বর্ণনায়। তাহলে বাল্যকাল কই ? কর্মকাল ? শুধু কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয় কেন ?

একটু ঘেঁটে বুঝলাম আনাড়ি পাঠকের যা হয় তাই হয়েছে। হাসনাত আবদুল হাইয়ের আত্মজীবনী আসলে তিন খণ্ডে। প্রথম খণ্ডে তাঁর বাল্যকাল, দ্বিতীয় খণ্ডে যৌবন এবং তৃতীয় খণ্ডে কর্মজীবন বিবৃত হয়েছে। আমি বোকার মতো শুরু করেছি দ্বিতীয় খণ্ড দিয়ে। তাই এ বিভ্রান্তি।

এভাবেই শুরু হলো ‘আমার লেখকের তিন খণ্ডের জীবনী পাঠ’।

জোগাড় করলাম তাঁর বাল্য কাহিনি Aid Memoir: 1943-54, Boyhood in British India and Pakistan এবং কর্ম জীবনের বৃত্তান্ত From The Horse’s Mouth (1965-2000) Memoir of bureaucrat in Pakistan and Bangladesh.

যাই হোক পাঠের ধারাবাহিকতায় ছন্দ ঘটলেও পাঠ পর্যালোচনায় তা বজায় রাখা উচিত।

প্রথমেই আসি Aide Memoire. 1943-54, Boyhood in British India and Pakistan নিয়ে। নাম দেখেই বোঝা যায় এটি লেখকের শৈশব নিয়ে। শুরু হয়েছে কলকাতার রানাঘাট থেকে, যেখানে কেটেছে তাঁর জীবনের প্রথম চারটি বছর। শিশুর সদ্য ফোটা চোখে দেখা প্রথম দুনিয়া ‘রানাঘাট’ লেখকের মগজে কিন্তু চিরকাল গেঁথে গিয়েছিল, যার কারণে অনেক বছর পর পূর্ণ বয়সে তিনি সেখানে ফিরে গিয়েছিলেন জীবনের প্রথম শোঁকা মাটির গন্ধ নিতে। তবে সেটা আরেকটি বইয়ে বলা হয়েছে, তাই সে প্রসঙ্গ এখানে থাক।

লেখকের চার বছর বয়সেই তাঁর পরিবার পূর্ববঙ্গে ফিরে এলেও মজার ব্যাপার হলো তাঁর বাবা অন্য আটজন ভাই-বোনকে নিয়ে কর্মসূত্রে নড়াইলে থিতু হলেও তাঁকে কিন্তু বড় বোনকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য পাঠানো হয় লালমনিরহাট। অবশ্য কয়েক মাস পরই তিনি নড়াইলে ফিরে আসেন পরিবারের কাছে এবং নড়াইল থেকেই আসলে বইটির প্রকৃত শুরু বলা যায়’ এবং তা শেষ হয়েছে তৎকালীন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে। (অবশ্য পরে কিছুদিনের জন্য তাঁর পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে গিয়েছিল, কিন্তু দেশ বিভাগের পর আবার পূর্ব বঙ্গে ফিরে আসেন।)

পুরো আত্মজীবনীর প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের একটি বিশেষত্ব আছে, তা হলো এখানে লেখক নিজের কথা বলেছেন তৃতীয় পুরুষে। (যদিও দু’একটি জায়গায় উত্তম পুরুষ এবং মধ্যম পুরুষ ব্যবহার করা হয়েছে। অবশ্য এ ট্রিলজির শেষ পর্বে তিনি প্রথম পুুরুষেই ফিরে গেছেন।)

প্রথম খণ্ডে (Aide Memoir) তৃতীয় পুরুষে এক বালক কথা বলছে। সে গভীর বিস্ময়ে পৃথিবীর রূপ এবং কুরূপ দুটোই আবিষ্কার করছে। রূপের ঝলকে যেমন সে উচ্ছ্বসিত হচ্ছে, একইভাবে অনেক অন্যায্য ব্যাপার তাকে আন্দোলিত করছে। যদিও লেখক স্পষ্টভাবে বলেননি, তবু আমার মনে হয়, অতি শিশুকালে কলকাতার রানাঘাট ছেড়ে আসাটা তার মস্তিষ্কে স্থায়ী বেদনার ছাপ ফেলেছিল।

বালকটির শৈশব ছিল মার্বেলের মতো। সে থামতে পারেনি, কেবল গড়িয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়  গেছে। রানাঘাট থেকে লালমনিরহাট, সেখান থেকে নড়াইল, তারপর দাদার বাড়ি সায়েদবাদ, কিছুদিন মাতুলালয় মনিয়ান্দ হয়ে আবার কলকাতায় ফেরা তারপর আবার বাংলাদেশ। পুরোটাই একটি শিশুর গড়িয়ে চলা এবং নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার। 

সত্যি কথা বলতে কী আমার কাছে বইটি ‘ম্যাচিউরড’ হতে শুরু করেছে কলকাতা পর্ব থেকে। এর আগের বর্ণনা খানিকটা অকিঞ্চিৎকর মনে হয়েছে। এর কারণ জন্মমাটি কলকাতায় যাওয়ার পর লেখকের মধ্যে এক ধরনের অসাধারণ অনুভূতির জন্ম হয়েছিল, যিনি সেটা বর্ণনা করছেন এভাবে, ‘I was startled when mother told me : This is Calcutta. You were born here’. These words sent a strange sensation throughout my body.’

এ ‘অদ্ভুত’ অনির্বচনীয় অনুভূতি নিয়েই লেখকের কলকাতার বাল্যকালের একটি অংশ কেটেছে। এ সময়ের বর্ণনায় আমরা ভারত ভাগের আগের মুহূর্তগুলো একটি শিশুর চোখে দেখতে পাই, যে সীমান্ত বোঝে না, কিন্তু সীমান্তের কারণেই তাকে কলকাতা ছাড়তে হবে। একইভাবে তাঁর নিষ্পাপ চোখেই দেখতে পাই ছেচল্লিশের রায়ট। মানুষের মধ্যে দানবের আবিষ্কার কীভাবে শিশুটিকে অবাক করেছিল তার ছোট্ট কিন্তু মূর্ত একটি দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে। একইভাবে ক্ষুদ্র পরিসরে সাতচল্লিশের দেশ ভাগের ব্যাপারটিও আমরা তাঁর চোখেই এখানে খুঁজে পাই। সাত বছরের একটি শিশুর অনুভূতি কী ছিল ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, তা আর কারও লেখায় আমি অন্তত পাইনি। শিশু-চোখে ভারতভাগ আমি এর আগে দেখিনি। সীমান্ত ভাগ হয়ে গেছে, মানুষের উঠান ভাগ হয়ে গেছে, সবার মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তা। এ অনিশ্চয়তা শিশুটিকেও  ঘিরে আছে, আশ্রয়হীনতা, ভয়, পার্ক সার্কাস স্কুল ছাড়ার বেদনা সব তাকে বিপন্ন করে তুলছে। মাত্র কয়েকটি অধ্যায়ে লেখক শিশু-চোখে দেখা অভিজ্ঞতা কিংবা বিপন্নতা এমন চমৎকার ফুটিয়েছেন, যা পাঠককে দুহাতের তালুতে চিবুক ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবতে বাধ্য করবে। 

১৯৪৭ সালে আবার ঢাকায় ফেরা। কিন্তু কী আশ্চর্য! এবার জন্মমাটি ছেড়ে আসার সময় বালকটির মধ্যে বেদনার চেয়ে আনন্দই ছিল বেশি; কারণ নতুন ভারতে মুসলমানদের অনিশ্চিত ভবিষৎ। এরপর আসলে বইটির মধ্যে তেমন টানটান ভাব নেই, যা পরের দুখণ্ডে আছে। থাকার কথাও না, কারণ এটি শেষ হয়েছে লেখকের কিশোর জীবনের বর্ণনা দিয়ে। রানাঘাটে জন্ম থেকে শুরু, ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে শেষ। সময়কালটাই এমন যে এ সময় পাঠককে উত্তেজিত করার মতো কোনো ঘটনা তেমন ঘটে না। যা ঘটে তা প্রায় সবার জীবনে ঘটে। মধ্যবিত্তদের বেড়ে ওঠার কাহিনি সবার কমবেশি এক, তাই এখানে বিস্মিত বা মুগ্ধ হওয়ার মতো তেমন বিশেষ কিছু নেই, কেবল লেখকের অপূর্ব লেখনশৈলী ছাড়া। তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার আছে তাহলো বইটিতে চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে পঞ্চাশ দশকের প্রথমার্ধের একটি নিটোল, তথ্যবহুল বর্ণনা ফুটে উঠেছে, যা পরের প্রজন্মগুলোকে সে সময়টি বুঝতে সাহায্য করবে। 

ট্রিলোজির দ্বিতীয় বইটি হচ্ছে All Those Yesterdays: 1954-1964. Youth in Pakistan America Europe  অর্থাৎ প্রথম খণ্ডের ধারাবাহিকতায় এখানে তৃতীয় পুরুষের মুখে পরের কয়েক দশক বর্ণিত হয়েছে। যে সময়ে লেখকের শিক্ষাজীবন কেটেছে দেশ-বিদেশে। বর্ণনার ক্ষেত্রে এটি আগের খণ্ডকে ছাড়িয়ে গেছে বলে আমার ধারণা। এতে লেখকের শিক্ষাজীবন ছাড়াও চলার পথে মুখোমুখি হওয়া ঘটনা, মানুষ এবং নানা জায়গা দেখার অভিজ্ঞতা এক অনন্য উচ্চতায় বর্ণিত হয়েছে। কখনও কখনও অপ্রত্যাশিত সুযোগের গল্প এসেছে, ঘটনার কথা এসেছে যা সবার জীবনে ঘটে না। দীপ্ত যৌবনের এ আখ্যান পড়ে যে কেউ নস্টালজিক হবেন এবং নিজের মনেই উচ্চারণ করবেন ‘হোয়্যার অল দোজ ইয়েস্টারডেইজ ?’ আমার সোনালি গতকালগুলো কোথায় হারিয়ে গেছে ? সবাই ফিরে যেতে চাইবেন তারুণ্যের উচ্ছল দিনগুলোতে, হয়তো কেউ কেউ ইয়াহুর একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতার মতো বলবেন, ‘গত হয়ে যাওয়া শুধু একটি বছর ফিরে পাওয়ার জন্য আমি মিলিয়ন ডলার খরচ করতে রাজি আছি।’ (যিনি বলেছিলেন তাঁর নাম মনে করতে পারছি না বলে দুঃখিত) বইটি যে পাঠকের মনে এ আফসোসের জন্ম দিতে পারছে, সেটাই এর সবচে বড় সাফল্য।

এটি শুরু হয়েছে লেখকের ম্যাট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার আগের অলস দিন দিয়ে, শেষ হয়েছে বিলেতের  লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকসে পড়ে দেশে ফেরার বর্ণনা দিয়ে। মাঝখানে পড়েছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমেরিকায় ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনে।

ঢাকা কলেজেই আমরা আবিষ্কার করি লেখকের লেখক সত্তার উন্মেষ। বন্ধু মোস্তফা জামান টুলুর গঠিত ‘আমাদের আসর’ নামে ছোট্ট একটি সাহিত্য গ্রুপই কিন্তু ভবিষ্যতের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম  মহীরুহ ‘হাসনাত আবদুল হাই’ এর বীজ বপন করেছিলেন বলে আমার ধারণা।

পঞ্চাশ দশক থেকে ষাটের দশকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ঢাকা যেমন বইটিতে ফুটে উঠেছে, একইভাবে সে সময়ের অস্থির রাজনীতির সাক্ষ্যও এতে পাওয়া যায়। পঞ্চাশ দশকে এ অঞ্চলে সামরিক শাসনের ভূতের যে সূত্রপাত যা ক্রমে ক্রমে পুরো দেশ গ্রাস করছে এবং যার শেষপ্রান্তে অপেক্ষা করছে একটি দেশের মুক্তিযুদ্ধ তার ইঙ্গিতও একজন সতর্ক পাঠক এতে পেতে পারেন। ইতিহাসের পাতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচে সাহসী সময়টিতে লেখক সেখানকার ছাত্র ছিলেন। এর একটি হলের (এসএম হল) সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। তাই তাঁর বর্ণনায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে তখন পুরো জাতিকে জাগানোর দায়িত্ব নিয়েছিল তা সরল কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে। রাজনীতির এ টানাপোড়েন বর্ণনায় ব্যক্তিগতভাবে আমি এখানে এমন অনেকের বেড়ে ওঠার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, যাদের কেউ আমাদের প্রজন্মের কাছে হয়েছেন নায়ক, কেউ ভিলেন।

একইভাবে হাসনাত আবদুল হাইয়ের আত্মজীবনীর এ পর্বে নতুন একটি দেশের (তৎকালীন পাকিস্তান) রাজধানীতে শিল্প-সাহিত্য কীভাবে আঙ্গিক পাচ্ছে তাও পরিষ্কার হয়ে ওঠে এবং তখনকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুণগত মান আমাকে ভাবতে যে শেখায় প্রায় সত্তর বছর পর এর উচ্চতা যে পর্যায়ে আজ যাওয়ার কথা ছিল তা তো যায়-ই নি, বরং পিছিয়েছে। এটা নিষ্ঠুর বাস্তবতা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্ব শেষে এসেছে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনে লেখকের শিক্ষাজীবন। মাঝে ছোটখাটো দুয়েকটি পর্ব বাদ দিলে যে ব্যাপারটি আমাকে মুগ্ধ করেছে সেই আমলেই আমেরিকায় প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়া রেল যাত্রায় লেখকের মিনিয়াপলিশ থেকে সিয়াটল যাওয়ার অভিজ্ঞতা। দুনিয়ার সবচে প্রাচুর্যময় এ দেশটিতে রেলওয়ে কেন জানি বাজার হারিয়েছে অনেক আগেই। দূরপাল্লার বাস বা প্লেনের সাথে ম্যারাথনে সে বাঁশি বেজে ওঠার আগেই প্রায় দম হারিয়ে ফেলেছিল। তারপরও সবার পরামর্শ উড়িয়ে দিয়ে লেখকের এ দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা শুধু অ্যাডভেঞ্চারই বর্ণনা করেনি, এতে আছে যাত্রাপথের বিবরণ সাথে সংশ্লিষ্ট ইতিহাসের উল্লেখ যা পাঠককে চুম্বকের ক্ষমতায় টেনে রাখে।

লেখক যখন আমেরিকায় গেছেন, তখন সেখানেও পরিবর্তনের হাওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরোনো নেতৃত্ব ছেড়ে দেশটি নতুন প্রজন্মের তরুণ নেতা জন এফ কেনেডির হাত ধরেছে। একই সাথে দেশটিতে বড় ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হচ্ছে। লিভারপুল থেকে ‘বিটলস’ জানান দিচ্ছে তারা আসছে। আমেরিকায় ব্রিটিশদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে নেতৃত্ব দিতে (British Invasion)।

আবার একইভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে সেখানে গড়ে উঠেছে তীব্র জনমত। অ্যালেন গিন্সবার্গের মতো প্রথাবিরোধী কবিরা এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। তার মানে হলো লেখক আসলে অগ্নিগর্ভা ঢাকা ছেড়ে আমেরিকার আরেক গরম উনুনে গিয়ে পড়েছিলেন। মার্কিন মুল্লুকও তখন পার করছে পরিবর্তন, দ্রোহ ও ভেঙে পড়া মধ্যবিত্তদের বিষণ্ন্ন সময়। তবে এ ক্ষোভ কিংবা সন্ত্রাসের চূড়ান্ত প্রকাশ প্রেসিডেন্ট কেনেডি হত্যাকাণ্ডের এক বছর আগেই লেখক আমেরিকা ছেড়ে সাগর পথে বিলেত পাড়ি জমিয়েছিলেন।  

লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে খণ্ডকালীন চাকুরি এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকসে পড়ার অভিজ্ঞতা দিয়ে বইটি শেষ হয়েছে। এখানেও সে সময়কার বিলেতের পরিবর্তনশীল পরিবেশ, রাজনীতির চাবি বদলে যাওয়ার পালা শুরু দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে। একই সাথে ক্ষয়িষ্ণু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অস্তায়মান রূপ লেখক নিজে যেমন দেখেছেন, পাঠককেও তাতে টেনে নিয়ে গেছেন।

তিন খণ্ডের আত্মজীবনীর এ অংশটিকে যদি চিত্রকর্মের সাথে তুলনা করি তাহলে বলা যায় শিল্পী সফল হয়েছেন। এর কারণ সম্ভবত তিনি সাহিত্যিক, তাই নিজের জীবনালেখ্যেও তিনি সাহিত্যগুণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। 

হাসনাত আবদুল হাইয়ের আত্মজীবনীর শেষ পর্ব হচ্ছে From the HorseÕs Mouth (১৯৬৫-২০০০) এতে লেখকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন বর্ণিত হয়েছে, মোটামুটি রাজকীয় কর্মজীবন। কারণ এতে সব আছে, তাঁর কাজ, কাজের ক্ষেত্র অর্থাৎ বিভিন্ন জায়গা আর একদম কাছে থেকে ইতিহাসের বাঁকবদল দেখার অভিজ্ঞতা। একই সাথে আমরা পরিচিত হই বিভিন্ন চরিত্রের সাথে যাদের মধ্যে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস একাডেমির ‘ভ্যালেট’ ফজল দীন যেমন রয়েছেন, তেমনি আছেন বঙ্গবন্ধুর মতো মহীরুহ। একহাত দূরত্বকে একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে জাতির পিতাকে আবিষ্কার করার মতো ঘটনা তাঁর জীবনে ঘটেছে, যা ঈর্ষণীয়।

আমলাতন্ত্রে লেখকের অভিজ্ঞতা সরকারি যন্ত্র কীভাবে কাজ করে সে ব্যাপারে পাঠককে যেমন ধারণা দেবে তেমনি আবার তাঁর মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই যে সৎ, ঋজু ও সাহসী একজন আমলাকে, যার কল্পনা আমরা সবসময় করি।

বিভিন্ন ব্যাপারে তাঁর সরাসরি নৈতিক অবস্থান, অন্যায় তদবির ডিসমিস করা ও নির্লিপ্তভাবে তার ফল ভোগ করা; কিন্তু শেষ অব্দি মাথা উঁচু রাখা―তাঁকে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের ইতিহাসে অন্য উচ্চতা দেবে কোনো সন্দেহ নেই। যখন দেখি আশির দশকে প্রবল ক্ষমতাধর ‘সামরিক’ রাষ্ট্রপতির অতি কাছের স্বজনের অন্যায় আবদার তিনি ঝাপটা মেরে উড়িয়ে দেন, তখন আমরা আবিষ্কার করি আমলা অনেকেই হন, কিন্তু ‘হাসনাত আবদুল হাই’ সবাই হন না।

শুধু নিজের অভিজ্ঞতা ছাড়াও এতে এসেছে ইতিহাসের সবচে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যায়। পঁয়ত্রিশ বছরের কর্মজীবনে তিনি প্রশাসনের ভেতর থেকে উনসত্তরের গণআন্দোলন দেখেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, আবার জাতির জনকের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড দেখার দুর্ভাগ্যও তাঁর হয়েছে। আবার কীভাবে সামরিক শাসনের ভূত বাংলাদেশের মাথায় ভর করল তাও তিনি দেখেছেন। আমার ধারণা এ সিন্দাবাদের ভূত কাঁধে নিয়ে কাজ করাটা তাঁর জীবনের সবচে কঠিন সময়। এক কথায় বলা যায়, লেখক যেন নিজের কথা বলছেন না, একটি কালের ধারা বিবরণ দিচ্ছেন, যা আমাদের জানা খুবই জরুরি। এ বর্ণনায় তিনি নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন, তবে সবসময় তা থাকতে পারেননি। কখনও কখনও তাঁর পছন্দ-অপছন্দও উঠে এসেছে। ব্যক্তির নিজের কাহিনি যেখানে জড়িত থাকে সেখানে পুরোপুরি নির্মোহ থাকা সম্ভবও নয়।

বাকি দুখণ্ডের মতো এটি তৃতীয় পুরুষে নয়, প্রথম পুরুষে লেখা, তাই পাঠককে টানবে সহজে। আবার অন্য খণ্ডগুলোতে তিনি অনেক সেকেন্ডারি সোর্স ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এ খণ্ডে একেবারে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে, যা সে সময়ের মূল্যবান দলিল হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

পুরো বইটির মধ্যে যে অংশগুলো আমাকে সবচে বেশি টেনেছে, তাহলো বঙ্গবন্ধুর আমলাদের রাজনীতি-নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে না দেখার বিশালত্ব, যার কারণে কান কথা শুনে তিনি লেখকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো নেনই নি বরং সবসময় দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে বিশেষ স্নেহ দেখিয়েছেন। জাতির পিতার এ গুণটি এখন প্রায় বিলুপ্ত।

এখানেও লেখকের কেম্ব্রিজে পড়ার অভিজ্ঞতা এসেছে, যদিও খুবই সংক্ষিপ্ত। যদ্দুর জানি এ সময় লেখকের সাথে নীরদ সি চৌধুরীর সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। এ ব্যাপারটি কেন তিনি আলোচনা করেননি তা আমাকে বিস্মিত করেছে। (যদিও ব্যাপারটি তাঁর অন্য ভ্রমণ কাহিনিতে আলাদাভাবে এসেছে, তারপরেও এত গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা এ বইটিতেও আসা দরকার ছিল বলে আমার মনে হয়।)

হাসনাত আবদুল হাইয়ের কর্মজীবনের এ বর্ণনা প্রশাসনের যে কোনো ছাত্রের অবশ্য পাঠ্য বলে আমি মনে করি এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে আমি এ বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছি।

সব মিলিয়ে হাসনাত আবদুল হাইয়ের তিনখণ্ডের আত্মজীবনী সামান্য কিছু সীমাবদ্ধতা বাদ দিলে সফল বলে আমার ধারণা। সত্যি কথা বলতে কী, লেখকের ইংরেজি গদ্য অসাধারণ, এর আগে একমাত্র কে নটওয়ার সিং ছাড়া সমসাময়িক আর কোনো উপমহাদেশীয় লেখকের এত সাবলীল ইংরেজি আত্মজীবনী আমি পড়িনি।

সবচে বড় কথা এটি শুধু তাঁর আত্মজীবনী নয়, প্রায় সাতান্ন বছরের সময় এবং মুহূর্ত এতে উঠে এসেছে। তাই এটা আসলে লেখকের একার সময়ের বর্ণনা নয়, বরং আমি বলব তাঁর এবং পরের প্রজন্মের সময়ালেখ্য।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের আত্মজীবনীর ট্রিলজিটি এভাবেই হয়ে গেছে ‘টেল অব দা মোমেন্টস অব মিলিয়নস’।

এখানেই লেখকের সার্থকতা।

তাঁর হাতে তিনটি গোলাপ ফুটেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares