আলোচনা : ভ্রমণ―হাসনাত আবদুল হাই : হাসনাত আবদুল হাইয়ের আন্দালুসিয়া : হোসেন আবদুল মান্নান

‘তুমি তো দেখছি আমাকেই অনুসরণ করে চলেছ। এই আমি চট্টগ্রামের ডিসি ও কমিশনার ছিলাম, তুমিও একই স্থানে একই পদে চাকরি করেছ। আবার আমি লেখালেখি করছি, তুমিও শুরু করেছ। বাঃ! বেশ ভালো।’ আমার একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেছিলেন দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই। তবে আমাদের দুজনের পার্থক্য সামান্যই। তিনি সিএসপি। আমি বিসিএস। তাঁর লেখালেখির বয়স প্রায় ৭০ বছর। আমার সাত। তাঁর বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। আমার পাঁচ। কিন্তু আমরা দুজনই লেখক। অনেক দিন বাদে আকস্মিকভাবেই পাঠক সমাবেশে হাজির হই। করোনা কেবল আমার ব্যক্তিগত বা সুদীর্ঘ পারিবারিক অটুট জীবন আচার তছনছ করেছে তা নয়, ঢাকা শহরের একটি অনন্যসাধারণ বই বিতানে ঢুকে বই হাতে করে নিপাট জমানো আড্ডা থেকেও বঞ্চিত করেছে। বন্ধুবর বিজু জানাল, হাসনাত ভাই আপনাকে স্মরণ করেছেন। আমি ফোন করতেই বললেন, আমিও আসতে পারতাম। আজ ছুটির দিন। কী বল ? একটু পরই তিনি সমাবেশে হাজির। হাতে তাঁর সদ্য প্রকাশিত দুটো বই―হ্যাম-বেথ এবং জনকের গল্প। উভয় গ্রন্থই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা। মুজিববর্ষে প্রকাশ করেছে যথাক্রমে আগামী প্রকাশনী ও অন্যপ্রকাশ। বই দুটো আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘তোমার জন্য’। ভিতরে লেখা ‘মান্নানকে শুভেচ্ছার সঙ্গে’।

আমার সঙ্গে এ লেখকের সম্পর্ক মূলত সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অগ্রজ-অনুজের যেমনটি হয়। তবে একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার বিরাট সুযোগ হয়েছিল। যা অন্য পদবিতে এতটা সম্ভব হতো না। বলা যায় তিনি যতটা না আমলা এর চেয়ে বেশি একজন বড় মাপের চক্ষুষ্মান লেখক। অফিস সময়ের পরে একই টেবিলে বসে গল্প বা প্রবন্ধ লেখা যায়, এটি অনেকটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও তিনি তা অনায়াসে করতেন। আমি সন্ধ্যার পরও নির্জন অপেক্ষমাণ থেকে কখনও কখনও তাঁর তৈরি ফিনিশড প্রডাক্টের নিরাপদ বাহক হয়েছি। পত্রিকা অফিসে পৌঁছে দিয়ে আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। এখনকার মতো ইমেইল করার সুযোগ ছিল না। একদিন হুকুম হলো, লেখাটি সরাসরি হাসনাত ভাইয়ের হাতে দিও। আমি যথারীতি পল্টনে সংবাদ অফিসে যাই। এবং সদ্যপ্রয়াত সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কালি ও কলম-এর সম্পাদক আবুল হাসনাত মহোদয়ের হাতে দিই। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হাসনাত সাহেব পাঠিয়েছেন ?’ উভয় জনই হাসনাত। লেখাটি পরদিন দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মহাসচিব হলেন ঘানার নাগরিক মি. কফি আনান। অফিসে বসেই তিনি লিখলেন, কড়ভর অহধহ সু মড়ড়ফ ভৎরবহফ লেখা নিয়ে যথারীতি ইত্তেফাক ভবনের ঞযব উধরষু ঘবি ঘধঃরড়হ-এ যাই। পরদিন সকালে সবাই পড়লাম। পরের সপ্তাহে তিনি কফি আনানের জন্য পাঠালেন আড়ংয়ের ক্রিম কালারের পায়জামা-পাঞ্জাবি। সঙ্গে পত্রিকা এবং তাঁর দারিদ্র্য বিমোচনের ওপর লেখা ইবষড়ি ঃযব ষরহব বইটি। জাতিসংঘে কর্মরত বাংলাদেশের জনৈক কর্মকর্তার হাতে এসব পৌঁছে দেওয়ার জন্য সেদিন আমাকে মধ্যরজনি অবধি ঢাকাস্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। বলা বাহুল্য, লেখক এবং কফি আনান উভয়েই সম্ভবত ক্যামব্রিজে একসঙ্গে ছিলেন। লেখকের অসংখ্য গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনি, অর্থনীতি বিষয়ে ইংরেজি বই, কাব্য সংকলনের বাইরে জীবনকেন্দ্রিক বই নভেরা, একজন আরজ আলী, সুলতান বিখ্যাত। ভ্রমণ কাহিনি হিসেবে জর্নাল/৮৯, সাফারি, ট্রেভেলগ, যানাডু, কলকাতা রানাঘাট, আন্দালুসিয়া বেশ আলোচিত হয়। সাহিত্যে শিল্পকলার নানামাত্রিক বিশ্লেষণধর্মী শিল্পকলার নান্দনিকতা প্রায় ৫৫০ পৃষ্ঠার বই সম্প্রতি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। দীর্ঘ লেখালেখি তাঁকে একাধিক জাতীয় পদকসহ অনেক স্বীকৃতিও দান করে। যা অশীতিপর এ লেখককে সাহিত্য- সংস্কৃতিতে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। লেখালেখির কারখানায় জীবনভর একজন একনিষ্ঠ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে তিনি নানাভাবে বঞ্চনার শিকারও হয়েছেন বলে আমার মনে হয়। নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এমনকি সহকর্মীরাও তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সময় এবং সান্নিধ্য পায়নি। চাকরিতেও সব সময় তিনি যথাযোগ্যভাবে মূল্যায়িত হননি। এগুলো এক ধরনের বেদনা ও অনুশোচনারও বিষয়।

দেশে-বিদেশে পড়াশোনা করা, উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া, বিচিত্র বিষয় অবলোকন ও ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তাঁর ভ্রমণে। ‘সাফারি’ থেকে ‘কলকাতা রানাঘাট’ পর্যন্ত ঘুরে দেখার যে অসাধারণ বর্ণনা তিনি সিদ্ধহস্তে উপস্থাপন করেছেন তা কেবল সুখপাঠ্য নয়, বিপুল তথ্যভাণ্ডারও রয়েছে এতে। লেখকের নাকি মাছির মতো অসংখ্য চোখ থাকে। তারা খুব কম সময় দেখে অনেক বেশি লিখতে জানেন। আর সাধারণরা অনেকক্ষণ ধরে দেখেন কিন্তু ভাষায় বর্ণনা করার সাধ্য থাকে না বললেই চলে। তিনিও তাই করেন। সারাক্ষণ নেশার মতো লেখার প্লট খুঁজে বেড়ান। তাঁর রয়েছে দেখার অসাধারণ চোখ, ঈর্ষণীয় স্মৃতিশক্তি আর শব্দ দিয়ে সুদীর্ঘ মালা গাঁথার অসম্ভব কলাকৌশল। যাঁর বর্ণনা থেকে বাদ পড়ে না আকাশস্পর্শী অট্টালিকা থেকে একখানা ঝরে পড়া শুকনো পত্রপল্লবও।

দৈনন্দিন দাফতরিক কাজ সম্পাদনায়ও ছিল তাঁর অসম্ভব গতি। খুব অল্পে বা ন্যূনতম সময়েই নথির সারবস্তু চিনে নিতে ভুল হতে দেখিনি কখনও। একদিন লক্ষ্য করলাম, ডাক ফাইলের অসংখ্য চিঠিপত্রের ভিড়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপারের একখানা পত্র। তিনি মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে তাঁর অফিসে হাজির হয়ে আগের একটি মামলার বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। সচিব বেশ দ্রুত ডাক ফাইল দেখলেও যথাসময়েই তাঁর নজর পড়ে পত্রটিতে। তিনি তৎক্ষণাৎ এতে লিখে দিলেন, ‘তিনি কি একজন আদালত ? না হলে তাকে এ মন্ত্রণালয়ে এসে সাক্ষ্য নিতে বলা হোক।’ এবং তাই করা হলো।

তাঁর অন্যতম প্রধান ভ্রমণ কাহিনিভিত্তিক বই, আন্দালুসিয়া। এর বেশিরভাগ কাজ হয়েছে অফিসে। স্পেনের মাদ্রিদ সফরের সময় একটি ট্যুর প্রোগ্রাম টাইপ করতে টাইপিস্ট হুমায়ুনকে খসড়া হাতে দিয়ে বললেন, টাইপ করে নিয়ে আস। হুমায়ুন ইংরেজি টাইপ কম করত বিধায় লেখাগুলো সহজে ধরতে পারেনি। এক জায়গায় লেখা ছিল তিনি হোটেলে  ঘরমযঃ ঝঃধু করবেন। হুমায়ুন টাইপ করে দিল ঘরমযঃ ঝঃধু করবেন। লেখক টাইপ রাইটারের কানের কাছে এসে বললেন, তুমি কি চাও আমি বিদেশে গিয়ে সারারাত এদিক-ওদিক পথভ্রষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়াই? টাইপিস্ট হতভম্ব। বুঝতে পারেনি স্যার এ কী বলছেন! আসলে ঝঃধু শব্দটির অর্থ হলো, সঙ্গীবিহীনভাবে বিক্ষিপ্ত ঘোরাফেরা করা। সব সময় ভারী এবং মেজাজি মানুষও যে রসিকতা করতে জানেন তা আমরাও আন্দাজ করতে পারলাম।

আন্দালুসিয়া ৩৪০ পৃষ্ঠার বই। বেইস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ১৪০ মতিঝিল ঢাকা থেকে ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত। মনে পড়ে তখন তিনি সন্ধ্যার পর অফিস থেকে সোজা প্রেসে গিয়ে সময় করে বইয়ের প্রুফ দেখতেন। সত্যিই সৃষ্টির পেছনের বেদনা কেউ দেখে না, সবাই এর পরিপূর্ণ রূপ দেখে মুগ্ধ হয়। বলে বাঃ! আন্দালুসিয়া মূলত মাদ্রিদ, কর্ডোভা, গ্রানাডা, সেভিল―স্পেনের এসব শহরে কয়েক দিনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বই। লেখক হাসনাত আবদুল হাই ১৯৯৮ সালে স্পেন ভ্রমণ করে এর অতীত, বর্তমান ও গৌরবগাথার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। এতে রাজ-কাহিনির পাশাপাশি স্থান পেয়েছে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও দর্শন এবং স্থাপত্যের কালজয়ী সৃষ্টির কথা। তাঁর সফর ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু বর্ণনায় উঠে এসেছে বিশাল এক ক্যানভাসের প্যানোরামায় গোটা স্প্যানিশ সভ্যতা। এখানেই লেখকের অবিশ্রাম ঘুরে দেখার অন্তর্নিহিত সার্থকতা।

এ ক্ষেত্রে লেখকের নিজের বক্তব্য হলো, ‘কোনো একটি দেশের ওপর বিশদভাবে লেখা ভ্রমণ কাহিনির মধ্যে আন্দালুসিয়া আমার প্রথম প্রয়াস। ভৌগোলিকভাবে সমস্ত স্পেন এখানে উপস্থিত নেই, কেননা আমার ভ্রমণ মাদ্রিদসহ আন্দালুসিয়ার কয়েকটি শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল। মাদ্রিদের ওপর বেশ কটি লেখা থাকলেও এ বইয়ের অধিকাংশ লেখা আন্দালুসিয়া অঞ্চলের বলে বইটির এ নামকরণ।’

লেখক হাসনাত আবদুল হাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক থেকে সিভিল সার্ভেন্ট। চাকরি আর সাহিত্য সাধনা সমান্তরালভাবে চলমান থাকে। জীবদ্দশায় কোনটা প্রাধান্য পাবে বলা কঠিন। তবে অবর্তমানে আমাদের ভাষাভাষী মানুষের মাঝে লেখক হিসেবে তিনি সুদীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন। তাঁর কিছু মৌলিক সৃষ্টি ও গবেষণা কালোত্তীর্ণ হয়ে যাবে অনায়াসে। মহাকালের গর্ভে দ্রুত বিলীন হওয়ার অবকাশ নেই। এই তো সেদিনও বললেন, ‘দেখ, আমার হাতে এখনও অনেক কাজ রয়ে গেছে। এগুলো শেষ করে যেতে চাই।’ আমি বলেছি, আপনি নীরদ সি চৌধুরী বা অন্নদাশঙ্কর রায়কে ছাড়িয়ে যাবেন। তবু মনে হয় তিনি অনেকটা একা তবে নির্ভার ও ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। লেখাপড়ায় আগ্রহের একবিন্দু ভাটা পড়েনি বরং তেজোদ্দীপ্ত ও উদ্বেলিত। এটি আমার কাছে রীতিমতো বিস্ময়কর এবং একই সঙ্গে প্রেরণাদায়কও বটে। এমনকি করোনা নিয়েও তাঁর মধ্যে বিশেষ কোনো উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা লক্ষ করা যায় না।

মাথার ভিতর যেন সারাক্ষণ শুধু লেখা, কাহিনি, নতুন প্লট, নতুন বই, পাবলিশার্স ইত্যাদি। এখনও নিমগ্ন পাঠক, প্রফুল্ল মন, চিত্তাকর্ষক শব্দের অনবদ্য উপমার বাক্যবিন্যাসে কথা বলেন। এবং জীবন সম্পর্কে শতভাগ দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত করে চলেন। যা সচরাচর দেখা যায় না। মানুষ তার কর্মের ভিতর দিয়ে জীবনকে ভোগ করতে চায়। আত্মতুষ্টির মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে চায়। ভালোলাগা আর ভালোবাসার কাজ করতে করতে কজন এমন মহাজীবন পাড়ি দিতে পারে? খুব অল্পসংখ্যক ও বিরলপ্রজদের মধ্যে হাসনাত আবদুল হাই একা এবং একজন।

তাঁর শতায়ুর অধিক কামনা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares