আলোচনা : ভ্রমণ―হাসনাত আবদুল হাই : কলকাতা রানাঘাট ও : হাসনাত আবদুল হাইয়ের আশ্চর্যভ্রমণ : ইকবাল হাসান

হাসনাত আবদুল হাই [জন্ম : ১৭ মে, ১৯৩৭। কলকাতা] বিরলপ্রজ একজন ধীমান লেখক। ব্যক্তি হিসেবেও অসাধারণ। স্মার্ট, আধুনিক, বলা যায়উত্তরাধুনিক। প্রাজ্ঞজন। আচার আচরণে রয়েছে আভিজাত্যের দীপ্র উদ্ভাস। বিশ্ব-সাহিত্য, বিশেষ করে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ও স্প্যানিশ সাহিত্যে তাঁর রয়েছে অগাধ পাণ্ডিত্য। জীবনী-উপন্যাস, অনুবাদ, উপন্যাস, গল্প, ভ্রমণসাহিত্য, কবিতা, আত্মজীবনী, নাটক, ফিউশন নাটক, শিল্প-ভাবনা ও উন্নয়নমূলক ভাবনা বিষয়ক সত্তরটি গ্রন্থের প্রণেতা তিনি।

নভেরা সর্বজন সমাদৃত রচনা হলেও এই লেখাটি দিয়ে তাঁর বিশাল সাহিত্য-কর্মকে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত নয়। হতাশ হই যখন দেখি, কারও কারও ভাবনায় এই ধারণাটি প্রোথিত হয়ে আছে যে, হাসনাত আবদুল হাই মানেই নভেরা। যেমন, শরৎচন্দ্র মানেই দেবদাসঅনেকটা সেরকম আর কী! যারা তাঁর অসাধারণ পরাবাস্তব গল্প ‘পানকৌরি’ পড়েননি, বানেসা বানুর নকশীকাঁথা উপন্যাস পড়েননি, পড়েননি কলকাতা রানাঘাট তাদের জন্য এমত ধারণায় ডুবে থাকা অস্বাভাবিক নয়।

উপন্যাস এবং গল্পের মতো ভ্রমণ বৃত্তান্তেও হাসনাত আবদুল হাই এক কথায় মাস্টার। ভ্রমণ যে কতটা বিস্তৃত, সুখপাঠ্য এবং মনোমুগ্ধকর হতে পারেচরিত্র, কাহিনি, পারিপার্শ্বিক দৃশ্যচিত্রের অসাধারণ ব্লেন্ড, গল্পের ভিতরে ভিতরে অনু-গল্পের আগমন ও প্রস্থান যে কতটা অপরিহার্য ও ব্যাকরণসুলভ বর্ণময় হয়ে উঠতে পারে, মাত্র তিন দিনের সফরে রানাঘাট নিয়ে এমন বিস্তৃত অসাধারণ এক গ্রন্থ রচনার কৃৎকৌশল দেখানো বোধকরি একমাত্র হাসনাত আবদুল হাইয়ের পক্ষেই সম্ভব। তাঁর হাতে ভ্রমণ কেবল ভ্রমণই থাকে না, উঠে আসে উপন্যাসের আদলে। সেখানে প্রায়শ অনুপস্থিত কংক্রিটের জঞ্জাল, সাদা বালুর সৈকতে স্বল্প-পোশাকের সমুদ্রবিলাসিরা। উপস্থিত হয় জানা-অজানা মানুষ ও তাদের পরিপার্শ্ব আর আলো-আঁধারের গল্প।

মনে পড়ে, বইমেলায় একবার স্বনামধন্য প্রকাশক, বন্ধু ওসমান গণির আগামী প্রকাশনীর স্টলে তাঁর সঙ্গে দেখা।

বলছিলেন ভ্রমণ নিয়ে অপার আগ্রহের কথা, আমিও। ভ্রমণ আমারও একটি প্রিয় বিষয়। হাসনাত আবদুল হাই বললেন, ‘দ্যাখো, ভ্রমণ মানেই শুধু দার্জিলিং, কক্সবাজার, পাতায়া আর ইউরোপ-আমেরিকার ট্যুরিস্ট স্পটগুলো দ্যাখা নয়। লেখার ক্ষমতা আর দ্যাখার যোগ্যতায় আমাদের মিরপুর থেকে সদরঘাটও হয়ে উঠতে পারে অনন্য এক আশ্চর্যভ্রমণ।’

এ যেন এক বিস্ময়কর উপলব্ধি, এমন করে তো ভেবে দেখিনি কোনোদিন! হাসনাত আবদুল হাই যেন আমার চোখের ক্যাটারাগ সরিয়ে দিলেন। আর মুহূর্তেই আমার চোখের সামনে ঝলমল করে ওঠে ঢাকার আকাশ, মানুষ ও প্রকৃতি আর তার পরতে পরতে ডুবে থাকা ইতিহাস ও ঐতিহ্য। অই তো বর্ধমান হাউস, কার্জন হল, অই তো গুলিস্তানের কামান গোলা ছুড়ে দিচ্ছে হাওয়ায়, অই তো পুরোনো ঢাকার অন্ধ অলিগলি, অই তো বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে ভেসে আসা সিপাহিদের আর্তনাদ, বুড়িগঙ্গার কালোজলে ‘অস্ট্রিচ’, ‘কিউই’ নামের প্যাডেল স্টিমারের ভেপু, অই যে…, অই যে…!

আর এভাবেই সে-রাতে মিরপুর থেকে সদরঘাট, সদরঘাট থেকে মিরপুর নির্ঘুম রাখল আমাকে।

২.

তিনদিনের হলেও এক অসাধারণ ভ্রমণগ্রন্থ কলকাতা রানাঘাট। [ অন্যপ্রকাশ। ২০২০। প্রকাশক : মাজহারুল ইসলাম। প্রচ্ছদ : মাসুম রহমান ]। অনেকদিন ‘যাবো যাবো’ করে অতঃপর একদিন হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি রানাঘাট যাবেন। এই সিদ্ধান্তে ভ্রমণসঙ্গী মামার মতো সকলেই অবাক। অবাক করা কাণ্ডই বটে! পৃথিবীতে এত জায়গা থাকতে শেষ পর্যন্ত রানাঘাট!

তিনি রানাঘাট যাবেন বলে কলকাতা এসেছেন শুনে, এমন কি, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাও অবাক!

‘…শুনে প্যারালিসিস আক্রান্ত রোগীর মতো তাঁর হাত যেখানে কাজে ব্যস্ত ছিল সেখানেই প্রস্তÍরীভূত হয়ে গেল। তিনি অবিশ্বাসী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললেন, রানাঘাট! তারপর সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার মতো করে তিনি প্রশ্ন করলেন, সেখানে কেউ আছেন ?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, না। কেউ নেই।

তাহলে কেন যাচ্ছেন ? দেখলাম, ভদ্রলোকের চোখে এবার অবিশ্বাসের সঙ্গে কৌতূহল দানা বেঁধেছে।

দেখতে। রানাঘাট দেখার জন্য যাচ্ছি।’

কী আছে দ্যাখার রানাঘাটের মতো অই মফস্সল শহরে? আছে কিছু স্মৃতি, বালক-বয়সের। তিনি পিছনের দিকে ফিরে যেতে যেতে তুলে আনবেন স্মৃতির সেলুলয়েডে আড়াল হয়ে থাকা অমোঘ,অপ্রতিরোধ্য ভেজা বাল্যকাল।

যে কোনো যাত্রার প্রারম্ভে প্রাক-প্রস্তুতির একটা ব্যাপার থাকে, হাসনাত আবদুল হাইয়ের রানাঘাট যাবার সিদ্ধান্তটা একেবারে হুট করে নেওয়া। 

শুধু দু-একজনকে ফোন করে জানালেন রানাঘাট যাবার কথা। তাদের একজন কবি, প্রাবন্ধিক পিয়াস মজিদ। [ প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আমিও যখন তখন প্রিয় অনুজ পিয়াসকে ফোন দিই। অন্য অনেকের মতো পিয়াসও আমার কাছে এক ভ্রাম্যমাণ অভিধান]।

তিনি পিয়াসকে ফোন করে বললেন, ‘আমি রানাঘাট যাব ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতে। শুনেছি কবি জয় গোস্বামী দীর্ঘ সময় রানাঘাটে ছিলেন। ছেলেবেলা থেকে যৌবনের অনেক বছর পর্যন্ত। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারলে রানাঘাটের অনেক খবর পাওয়া যেত। তোমার সঙ্গে কি তাঁর জানাশোনা আছে ?

পিয়াস বলল, অল্পস্বল্প আছে। তিনি খুব মিশুক নন। কখনও ফোন ধরেন, কখনও ধরেন না। কম কথা বলেন। আমি আপনাকে তাঁর ফোন নম্বর জোগাড় করে দেব। তিনি ধরবেন কিনা সেই নিশ্চিতি দিতে পারছি না।

আমি বললাম, নিশ্চিতি দেওয়ার দরকার নেই। ফোন নম্বর দিলেই হবে। আমি চেষ্টা করে দেখব। দেখা হলে ভালো, না হলেই বা কী! রানাঘাট যাওয়া এর জন্য বন্ধ হবে না।

পিয়াস বলল, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভেতর ‘বাতিঘর’ বইয়ের দোকানে জয় গোস্বামীর লেখা রানাঘাট লোকাল বইটা আছে। সেটা দেখতে পারেন। হয়তো রানাঘাট সম্বন্ধে কিছু লিখেছেন। নাম শুনে তা-ই মনে হয়।

আমি উল্লসিত হয়ে বললাম, বাহ! খুব ভালো খবর দিলে। আজই কিনে ফেলব বইটা। চমৎকার! মনে হচ্ছে রানাঘাট যাওয়াটা খুব ইন্টারেস্টিং হবে।

পিয়াস বলল, দেখি জয় গোস্বামীর মেয়েকে ফোনে পাই কি না। পেলে আপনার যাবার কথা বলব। সে তার বাবাকে বলে রাখবে। তাহলে আপনি ফোন করলে তিনি বুঝতে পারবেন কে, কেন কথা বলছেন।

আমি বললাম, পিয়াস, ইউ আর গ্রেট। থ্যাংক ইউ।

পিয়াস বলল, কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে অবশ্যই প্যারামাউন্ট শরবতের দোকানে যাবেন।

সেখানে কী ?

নানা রকমের শরবত পাবেন। দেখবেন দেয়ালে পোস্টারে লেখা আছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম থেকে অনেক লেখক-শিল্পী প্যারামাউন্টে গিয়ে শরবত খেয়েছেন।

আমি বললাম, সেখানে ডায়াবেটিক শরবত পাওয়া যাবে ?

পিয়াস বলল, বলতে পারব না। জিজ্ঞেস করে দেখবেন। বসন্ত কেবিনেও যাবেন। ওটাও কলেজ স্ট্রিটে বইপাড়ায়।

আমি বললাম, সেখানেও কি শরবত পাওয়া যায় ?

পিয়াস বলল, না। ওটা চা-কফির দোকান। স্ন্যাকস পাওয়া যায়। দুপুরের লাঞ্চও। লেখকদের প্রিয় জায়গা।

আমি বললাম, লিখে রাখলাম।

পিয়াস বলল, খালাসিটোলায় যেতে ভুলবেন না।

কেন? সেখানে কী খাবার পাওয়া যায় ?

পিয়াস বলল, দেশি মদ। সুনীল, শক্তি, বেলাল ভাই ওরা প্রায় প্রত্যেকদিন যেতেন।

আমি বললাম, আমার তো ওসব খাওয়া নিষেধ।

পিয়াস বলল, দেখতে যাবেন। অত নামকরা লেখকদের আড্ডার জায়গা, দেখবেন না ?

আমি বললাম, তীর্থস্থান ?

পিয়াস হেসে বলল, অনেকটা তা-ই।’

কলকাতা রানাঘাট-এ কবি জয় গোস্বামীর সংগীত-প্রেম ও মাকে হারানোর কখা [রানাঘাট লোকাল ],

১৯৪৩ সালে রানাঘাটে ও ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হাসনাত আবদুল হাইয়ের শৈশব এবং অন্যান্য অনুষঙ্গ আমাদের আপ্লুত করে। আমরা যেন নিজেদের অজান্তেই জড়িয়ে যাই পরিত্রাণহীন এক অপ্রতিরোধ্য স্মৃতির মায়াজালে।

৩.

‘শব্দ, ঘটনা, গ্রন্থনা ও শিরোনামের আড়াল থেকে যিনি একটি গল্পকে মজবুত শরীর ও টলটলে আত্মা দিতে পারেন, তিনি আমার প্রিয় লেখক। তাঁর হাতে ভাষা কখনও অনাবশ্যক কণ্টকিত ও অলংকৃত হয় না। অথচ প্রত্যেকটির ভাষা তাঁর কলমে নতুন মুদ্রার মতো ঝকঝকে হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যে এই স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের একজন লেখক হচ্ছেন হাসনাত আবদুল হাই।’

১৯৭৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞা ও আনন্দের বাহক হয়ে সাপ্তাহিক ‘রোববার’ প্রকাশিত হয়েছিল খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক রাহাত খানের নেতৃত্বে [পরে কবি রফিক আজাদ পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন]। রোববারের প্রথম সংখ্যায় হাসনাত আবদুল হাইয়ের গ্রন্থ যখন বসন্ত নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রাহাত খান উপরোল্লিখিত মন্তব্য করেছিলেন।

মনে পড়ে, অই সময় ‘রোববার’, রাহাত খান ও রফিক আজাদকে কেন্দ্র করে ইত্তেফাক ভবনে আড্ডা হতো নিয়মিত। দিনভর আড্ডায় অসীম সাহা, আবু করীম, আতাহার খান, ইমদাদুল হক মিলন, কাজী হাসান হাবীব, সেলিম নজরুল হক, তাপস মজুমদার, আবেদীন কাদের, নাদিরা মজুমদার, শিহাব সরকার, ইকবাল হাসান ও ত্রিদিব দস্তিদার নিয়মিত। কখনও কখনও বেলাল চৌধুরী, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, রবিউল হোসাইন, সৈয়দ ইকবাল, কালেভদ্রে আবিদ আজাদ ও মাহবুব হাসান। আর সময় পেলেই আসতেন হাসনাত আবদুল হাই। তিনি তখন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি দফতরের সচিব। আড্ডায় তিনি [ডাকসাইটে সিএসপি এবং জাঁদরেল আমলা চরিত্রটি আড়ালে পাঠানো] আমাদের প্রিয় হাসনাত ভাই। মানবিক, সরলঅন্তপ্রাণ ও আভিজাত্যময়।

সারাদিনের কাজকর্ম আর আড্ডা শেষে সন্ধ্যা হবার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ রাত্রি নামার আগেই আমদের কণ্ঠনালিতে নেমে আসতো মরুভূমির সর্বগ্রাসী তৃষ্ণা। আর এসব উট্কো সমস্যা সমাধানে রাহাত ভাইয়ের জুড়ি নেই, তিনি হাওয়ায় দুআঙুল ঘুরিয়ে বলতেন, ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে, হাসনাত ভাই আছেন না! লেখাটা শেষ করেই আমরা বেরিয়ে যাব।

হাসনাত আবদুল হাই তখন থাকতেন শেরে বাংলা নগরে সংসদ ভবন এলাকার ভিতরে। লাল ইটের ভিলা টাইপের বাড়ি। আমরা এভাবে কতবার যে তাঁর বাড়িতে রাতভর আড্ডা দিয়েছি তার হিসেব নেই। দিনের পর দিন আমাদের এহেন অত্যাচার তিনি সহ্য করেছেন। কোনোদিন বিরক্তি প্রকাশ করেননি। অসম্ভব হৃদয়বান আর আড্ডাপ্রিয় এমন মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।

রাহাত ভাই, রফিক আজাদও বলতেন, এমন হৃদয়ের মানুষ তুমি এদেশে খুব বেশি পাবে না।

জয়তু প্রিয় কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই।

ডিসেম্বর ২৫, ২০২০

টরন্টো, কানাডা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares