আলোচনা : ভ্রমণ―হাসনাত আবদুল হাই : ট্রাভেলগ এক টাইম মেশিন : অতীত ঘুরে এলেম : আশান উজ জামান

খ্রীস্টীয় ক্যালেন্ডারে ঊনিশ ষাট। নিউইয়র্কের ঠান্ডা বাতাসে বিবিধ উষ্ণতার প্রশ্ন: কে হচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নিক্সন না কেনেডি ? কী আছে স্নায়ুযুদ্ধের পরিণতিতে ? বর্ণবাদে ছিদ্র চাকা, আমেরিকান ডাইলেমার দোদুল্যমানতা, নিয়ে কতদূর যাবে দ্যা নেশন অন হুইলস ? তার মধ্যেই স্বর্ণতরুণ হাসনাত আবদুল হাই পা রাখলেন আমেরিকায়। গেছেন নিতান্তই গ্রামোপম এক দেশ থেকে, যেখানে টেলিভিশন নেই, একটা বিল্ডিং ছাড়া লিফটও নেই কোথাও; অথচ সেখানে পয়সা দিলেই খাবার বের হয় মেশিন থেকে, সামনে এসে দাঁড়ালেই খুলে যায় স্বয়ংক্রিয় কাচের দরজা, এখানে ওখানে আরও কত চমৎকারি! তবে বিস্ময়ের সেই ঘোর কাটিয়ে একজন প্রকৃত শিল্পী আর সমাজবিজ্ঞানীর অন্তর্দৃষ্টি নিয়েই লেখক দেখলেন দেশটাকে। সেই দেখার কথা লিখলেনও এমন ভাষিক উৎকর্ষে, তুলনা যার সহসা মেলে না।

শিল্পপ্রিয় দুই অনুসন্ধিৎসু চোখ আর মনোহরা বোধের ফাউন্টেন পেন মন নিয়ে তাঁর বিভুঁই-ঘোরার সেই শুরু। ঘুরেছেন, আর ঝরনাধারার মতো ঝরঝরে স্বতঃস্ফূর্ত গদ্যে লিখে রেখেছেন আটপৌরে দিন যাপনের ষাটপৌরে ভাঁজ। ছোট ছোট ঘটনা সবযা তিনি ঘটতে দেখছেন, বা যা তার সঙ্গেই ঘটছে, বা তিনিই ঘটাচ্ছেনকাহিনির মতো লেখা। ভাষাও এত উইটি যে, পড়তে পড়তে চোখ সরিয়ে ভাবতে হয়এমন করেও লেখা যায়!

শুরুতেই আমেরিকান জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে থাকতে দেওয়া হলো তাঁদের। সেখানেই লেখক কাছ থেকে দেখলেন সেখানকার সমাজব্যবস্থার খুঁটিনাটি। নারী পুরুষের অবস্থান, সন্তান লালন-পালন, প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগ, টুকিটাকি কাজের দায়িত্ব, আর বাজার করা-রান্নাবান্না-খাওয়া দাওয়ার রুটিন। যার প্রায় সবকিছুই তাঁর নিজের সমাজের চেয়ে ভিন্ন। বুঝলেন, ‘চার্চ এদেশে শুধু প্রার্থনার স্থান নয়। সামাজিক জীবনের একটা বিশেষ অঙ্গও।’ ‘এ দেশে বাড়ির সব ঘরের মধ্যে প্রাইড অব প্লেস বাথরুমের। দিস ইজ দ্যা অনলি প্লেস হোয়ার ইউ রিয়েলি মেক ইওরসেল্ফ কমফোরটেবল।’ মানুষের সাথে মিশতে মিশতেই মুখোমুখি হলেন ‘ছোট’দের সম্বন্ধে ‘বড়’দের অমোঘ অজ্ঞতার: পশ্চিম আর পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে যাতায়াত প্লেনে হয় শুনে এক আমেরিকানের প্রশ্ন‘প্লেন আছে তাহলে তোমাদের দেশে!’ কিংবা ‘ইজ ইট ট্রু দ্যাট ইউ হ্যাভ ফোর ওয়াইভস ?’

শুধু কি বিদেশিরা? একই দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিদের যে ছোট করে দেখত পাকিস্তানিরাও, তার নজিরও পাওয়া গেল। আমেরিকান ইমেজ এব্রড বিষয়ে বিদেশি ছাত্রদের নিয়ে এক প্যানেল ডিসকাসন হবে। প্যানেলিস্ট হিসেবে লেখককে নির্বাচন করলেন ফরেন স্টুডেন্টস অ্যাডভাইজার। তাতেই বেশ জ্বালা ধরে গেল স্থানীয় পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের। কেউ বলে লেখক নতুন এসেছেন, জুনিয়র, কী থেকে কী বলে ফেলেন। না, তাকে সরে দাঁড়াতে হবে। কেউ বলে অমুক সিনিয়র, তাকে বক্তৃতা দিতে হবে। হ্যান এবং ত্যান। কবিগুরুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তাঁর অংশ নেওয়ার প্রশ্নেও একই রকম ক্রাইসিস ও কনফ্রন্টেশন।

সেমিস্টার শেষে লেখক ঘুরতে গেলেন হুইটবি আইল্যান্ড, বন্ধু ড্যান বারের দাদার বাসস্থান। ‘সবুজ মাঠ, ঢেউ খেলানো অরণ্য, পাখির ডাক, গাছ-পালার ফাঁকে ফাঁকে পিউজেট সাউন্ডের নীল জলরাশি। এখানে এখন গলা ছেড়ে গান করা যায়, মাঠের ভিতর দিয়ে দৌড়ানো যায়, যা খুশি তাই করা যায়।’ প্রশান্তিটুকু যদিও উবে গেল খেতে কর্মরত মজুরদের দুরবস্থা দেখে। ‘নিগ্রো শ্রমিকদের শোষণ নির্যাতনের কথা জানা ছিল, কিন্তু শে^তাঙ্গ শ্রমিকরাও যে এমন মানবেতর জীবনযাপন করতে পারে ধারণা ছিল না।’ কালোদের অবস্থা তখন আরও শোচনীয়। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনও চলছে। মানবিক মানুষেরাকালো সাদা মিলেইলড়ছেন এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে। লেখককেও আমরা শামিল হতে দেখলাম সেই আন্দোলনে।

তার কিছুকাল পরেই পড়াশোনা শেষ, আমেরিকা পর্বের সমাপ্তি। দেশে ফিরবার সময় আবার মাথা তুললো লেখকের ‘ওয়ান্ডার লাস্ট’ভ্রমণের নেশা। বিমানে না চেপে তিনি জাহাজে চড়লেন। উদ্দেশ্যইউরোপ ঘুরবেন ট্রেনে, তারপর তেহরান, তারপর প্লেনে উড়ে দেশে। জাহাজযোগে সে যাত্রায় সাউদাম্পটন যাওয়ার সময়টা উপন্যাসের মতো। ভিজয়া সেথ, অ্যান, আর ন্যান্সিতিন বান্ধবীর সঙ্গে লেখকের পরিচয় ও বন্ধুত্ব, সমুদ্রের বিশালতা, নোনা হাওয়া, আর ‘নোবলিজ অবলিজ’নোবলম্যানস অবলিগেশনচার্লসের বিড়ম্বনা ও ‘লুচ্চা’ লেচারের কটু উপস্থিতি মিলে জম্পেশ আবহ!

তবে ইংল্যান্ড পৌঁছেই বদলে গেল সব। দুটো ভিন্ন ‘বিভুঁই’ দেখার অভিজ্ঞতায় লেখক বলছেন, ‘আমেরিকার তুলনায় চায়ের কাপ ছোট, মানুষগুলো ছোট আকারের, আর সব কিছুই যেন একটু পুরোনো।’ সেই পুরোনো লন্ডনের বেইজওয়াটার ইনভার্সেস টেরেসে থাকছেন তিনি। সঙ্গীসাথী বাঙালি বন্ধুবান্ধব। তারা কেউ পড়ছেন কেউ কাজ করছেন, কেউ কেউ দুটোই। তাদেরই একজনের পরামর্শে দেশে যাওয়া শিকেয় উঠল লেখকের। ভর্তি হলেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকসে। খরচ মেটাতে পার্টটাইম জব নিলেন পাকিস্তানি হাইকমিশনে। কিছুদিন পর ‘আগের মতো বিনা ভিসায় বা ওয়ার্ক পারমিটে আর কোনো কমনওয়েলথ নাগরিক আসতে পারবে না, কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। এই ডেটলাইন এড়াবার জন্য প্রতিদিন চার্টার্ড প্লেন করে কমনওয়েল্থ নাগরিকরা আসছে।’ এত এত আগন্তুক, সামলানো কঠিন। বড় সমস্যা তাদের ভাষাও। দোভাষী হয়ে লেখকই হলেন সমাধান তাদের। প্রথম প্লেনের অর্ধেক যাত্রী সিলেটি, বাকিরা আজাদ কাশ্মীরের। হঠাৎ একজনের ‘কাপড়ের পুঁটলি ছিঁড়ে  পটোল, কচুর লতা আর শুঁটকি মাছ ছত্রাখানে ছড়িয়ে পড়েছে। কুড়িয়ে নেবার জন্য লুটোপুটি, ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়।’ ইমিগ্রেশন অফিসার নাকে রুমাল চেপে দেখে তাদের। কাছে এসে বলে, ‘হোয়াটস দ্যাট স্মেল ? গাঞ্জা ? ওপিয়াম ?’ নিজের দেশের মানুষের এই দুর্গতিতে বিব্রত লেখক, আবার তাদের জন্য কিছু করতে পারছেন ভেবে আশ^স্তও।

সমকামিতার অভিযোগে এক বাঙালি প্রৌঢ়ের বিচারিক কাজে দোভাষীর কাজ করলেন। সাজা ঘোষণার পর ঐতিহাসিক কোর্ট ভবন থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবছেন, এই ভবনের ‘ভাস্কর কি টের পেয়েছিলেন যে, এর ভিতরে বিচারের নামে মাঝে মাঝে প্রহসন হবে ?’ দোভাষি কাজের সূত্রেই হসপিস সম্বন্ধে জানা হলো আমাদের। হসপিস এক ধরনের হসপিটাল, তবে রোগ মুক্তির জন্য না, মুমূর্ষু রোগীরা যেন শান্তিতে মরতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান। এক বাঙালি রোগী ভর্তি সেখানে, দেখার কেউ নেই, লেখক গিয়ে বসলেন তার শয্যাপাশে।

এসবের ফাঁকে ফাঁকেই তিনি ঘুরে বেড়ালেন হাইড পার্ক, পিকাডেলি সার্কাস, ট্রাফালগার স্কয়ার, বাকিংহাম প্যালেস, টাওয়ার অব লন্ডন ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবেসহ প্রায় সকল দর্শনীয় স্থান। শুধু তো ঘোরাই নয়, শুধু সেখানেই নয়, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিউইয়র্ক, সিয়াটল, ফিলাডেলফিয়া, হেলসিংকি, কোপেনহেগেন, বা ইয়াউন্দেযেখানেই গেছেন, সেখানকারই সঙ্গীত সাহিত্য শিল্পকলার নানা অনুষঙ্গের খোঁজ করেছেন, এবং বিশদে লিখেছেন। বইটা তাই দেশে দেশে পুরাকীর্তি, মিউজিয়াম, ভাস্কর্য, স্থাপত্য আর নানা ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানের নির্ঘণ্টও। বলা চলে, একাধারে এটা ভ্রমণকথা, স্মৃতিগদ্য, আর শিল্পসাহিত্যের ডিরেক্টরি।

সত্যিই, লেখক যে উঁচুমানের একজন শিল্পবোদ্ধা, তার প্রমাণও এই বই। দেশে দেশে নামকরা সব চলচ্চিত্র ও থিয়েটার দেখেছেন, সাহিত্য পড়েছেন; তারপর তাদের প্রবণতা, বিশেষত্ব ও শিল্পরূপ নিয়ে করেছেন নিবিড় আলোচনা। শিল্প সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধিগুলোয় বিশ্ববীক্ষা আর শিল্পসারের প্রাচুর্য। ‘সব শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মই কি তাই নয়পুরোনোকে নতুন করে নিজস্বভঙ্গিতে বলা ?’ ‘শিল্পীর স্বাধীনতা একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। এমন সময় আসে যখন সমাজের কাছে দায়বদ্ধতাই তার জন্য মুখ্য হতে পারে। নিজের খেয়ালখুশি নিয়ে তখনই ব্যস্ত থাকা যায় যখন সমাজে সংকট নেই।’ রোঁদা, সালভাদর দালি, মাইকেল এঞ্জেলো, বতেচেল্লি, ক্যানোভা, আলভার আলটোর মতো মহান সব শিল্পী, ভাস্কর, আর স্থপতির নানা কাজের এত সূক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা এবং তার ইতিহাস ও তাৎপর্য তিনি লিখেছেন, পড়তে পড়তে মনে হয় দেখছি!

বইটা যেন টাইম মেশিন এক, টাইম ট্রাভেলে আমি ঘুরতে যাচ্ছি সত্তর দশকের আমেরিকা-ইউরোপে, ছুটে বেড়াচ্ছি আশি নব্বইয়ের ইউরোপ-আফ্রিকায়! ১৯৮৫ সালের কোপেনহোগেন ভ্রমণের সময় লেখকের সঙ্গে যেন আমিও আছি। ক্রনেনবার্গ দুর্গ দেখছি আমরা। সঙ্গী ড. ফ্রাঙ্ক জানালেন, শেকসপিয়ার নিজের নাটকের দল নিয়ে এসেছিলেন এখানে। এখানকার মঞ্চেই প্রথম অভিনীত হয়েছিল হ্যামলেট! ভাবতেও শিহরণ জাগে, না ? এমনই শিহরণ জাগানো আর ইতিহাস সৃষ্টিকারী মহৎ সব মানুষের দেখা পাই ট্রাভেলগের পাতায় পাতায়।

১৯৬০ সালে উইসকনসিনে ক্যাম্প সেন্ট ক্রয়ায় দেখা হলো লেখকের সহপাঠী কফি আনানকে। হ্যাঁ, ঘানার কফি আনান, জাতিসংঘের সপ্তম মহাসচিব। ‘ভারিক্কি চালে এসে বসে। তারপর ম্যাডি নামের মেয়েটির হাত তুলে বলে, দেখি, তোমার হাতের রেখা কী বলে। অন্যসব মেয়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সমস্বরে বলে, আমাদেরটাও দেখো। কফি আনান তখন একেবারে ওথেলো।’

কিছুদিন পর, ১৯৬১র এপ্রিল, কবিগুরুর জন্মশতবার্ষিকী। সিয়াটলে ভারতীয় স্টুডেন্টস ফেডারেশনের আয়োজনে বক্তৃতা করতে এসেছেন ড. চক্রবর্তী, বোস্টন বিশ^বিদ্যালয়ে কমপারেটিভ রিলিজিয়নের অধ্যাপক। লেখকের আবৃত্তি শুনে, পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা চর্চা হয় জেনে তিনি অবাক। অবাক হচ্ছেন সেখানে রবীন্দ্রনাথ শোনা হয় জেনেও! আমরাও অবাক হচ্ছি, কারণ, মানুষটি অমিয় চক্রবর্তী। আলাপে আলাপে কৌতুকের সুরে তিনি বলছেন, তার ‘..কবিতার বইয়ের কথাও পাকিস্তানে বাঙালিরা জানে দেখছি! খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার।’ 

১৯৬১’র বাল্টিমোর। বর্ণবাদ বিরোধী স্টুডেন্ট ননভায়োলেন্ট কো-অর্ডিনেশন কমিটির কনফারেন্স। অংশ নিতে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে নিজেও তিনি শিকার হলেন বর্ণবাদের! সম্মেলন মঞ্চের বাইরে ছাত্রদের গলায় বেজে চলেছে সেগ্রিগেশনবিরোধী সবচেয়ে জনপ্রিয় গান উই শ্যাল ওভারকাম, উইশ্যাল ওভারকাম ওয়ান ডে। মঞ্চে তুমুল বিতর্কÑ কেউ বলছে লুথার কিংয়ের শান্তিপূর্ণ লং মার্চে যোগ দেওয়া উচিত। কেউ বলছে নন-ভায়োলেন্ট মুভমেন্টে কিছুই হবে না, অন্য পথ দেখতে হবে। দর্শকসারিতে এক কোণে চুপচাপ শুনছেন স্বয়ং ড. মার্টিন লুথার কিং। কী নিবিড় আন্তরিকতায়ই না আমাদের সঙ্গে আলাপ করলেন তিনি!

১৯৬২’র লন্ডন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে এসেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি। লন্ডনের পাকিস্তান স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি ছাত্ররা রাজি হলো না। তবু আয়োজিত হলো ‘বাঙালি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী’র সংবর্ধনা। তিনি বলছেন, সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেই আবার রাজনীতিতে নামবেন, রাজনীতিই তার জীবন। ‘মাঠের কৃষক, রাস্তার শ্রমিক থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক সবাইকে রাজনীতি করতে হবেনিজের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হওয়ার রাজনীতি, অন্যায় অবিচারকে না মেনে নেওয়ার রাজনীতি, দেশ গড়ার রাজনীতি।’ মনে ও মগজে সে কথার অনুরণন কাটতে চায় না।

১৯৮৩’র রোমে গিয়ে আলাপ পরিচয় হচ্ছে শামসুদ্দীন আবুল কালামের সঙ্গে। কাশবনের কন্যা’র লেখক, দেশ থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনে আছেন, কাজ করছেন ফ্রেডেরিকো ফেলিনির চলচ্চিত্রে, ডকুমেন্টারি করছেন, না ঘরের না বাহিরের হয়ে ঝুলে আছেন মাঝখানে। এই মহান লেখকের অন্তর্গত বেদনা ও বৈভবও ছুঁয়ে যায় আমায়। ১৯৯৩’র ক্যামেরুনের দোয়ালা বিমানবন্দরে রজার মিলার সঙ্গে কথা বলেও আবার বিশ্বাস হয় নাতিনিই আফ্রিকার ফুটবলের গতিপথ বদলে দেওয়া রজার মিলা!

পড়ছি, দেখছি, আর ভাবছিভ্রমণ যতই দেশ বিদেশে হোক, মানুষ কি মূলত মানুষকেই খোঁজে ? নইলে এই যে এত বড় একটা বই, এতগুলো দেশে ভ্রমণ, আর এত এত শিল্প সাহিত্যের অদ্ভুত সুন্দর বৃত্তান্ত, সব ছাপিয়ে এর মানুষজনের কথাই মনে পড়ছে কেন আমার ? সব ফেলে কেন মনে পড়ছে বিমানবন্দরে সসংকোচ দাঁড়িয়ে থাকা নীলিমার মনশ্রী, আর হেলসিংকির রাইলা কানিস্তো ও ইমুলির ঘটনা ? ক্যামেরুনের ড্রাইভার পেনা এভটকেও দেখতে পাচ্ছি, যে টেকস নো লাঞ্চ, অনলি কফি এন্ড ব্রেড টু ফিল স্ট্রং! এভাবে টাকা বাঁচিয়েই যে স্ত্রীর পরিবারকে যৌতুকের টাকা দিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর, শোধ হতে আরও বছর পাঁচেক। মনে থাকবে লন্ডনের কংক্রিটে ছবিলউদ্দিনের শিকড় গাঁথার গল্প, আর ছখিনার সঙ্গে তার আকুল প্রেমপনাও।

পাকিস্তানি হুকুমদাদের কথাও মনে থাকবে খুব। সব কিছুতেই জ্ঞানগম্যি ফলাতে গিয়ে অপদস্থ হয়েও সপ্রতিভ ও নির্বিকার থাকতে পারার বিরল ক্ষমতাই এদের স্মরণীয় করে রাখে! সিট বেন্ড করতে না পেরে অনায়াসে যে এয়ার হোস্টেসকে বলে দিতে পারে, ‘ইওর প্লেন আউট অব অর্ডার!’ রোমে যাত্রাবিরতির সময় রেস্টুরেন্টে পানির বদলে মদ দেওয়ার ইতালিয়ান অভ্যাসের প্রেক্ষিতে বলে, ‘খাওয়া-দাওয়ার পর কি পানি খেয়ে স্বাদ নষ্ট করতে আছে ?’ লেখকের এক গ্রিক বন্ধু, ডিমিট্রিয়াস গ্রিভাস, ক্যাম্পাসের উচ্চারণ করে ক্যাম্পুস, বাটকে বুট, কালচারকে কুলচুর। পড়ে হাসতে হাসতে আমার ইন্দোনেশিয়ান বন্ধু তৌফিক ফাজরিনের কথা মনে পড়ল। সেও এমন অদ্ভুত উচ্চারণে ইংরেজি বলত। ‘পানি ঘোলা, অপরিষ্কার। কয়েক বছর আগেও এই নদীতে মাছ ধরা যেত, এখন সেটা অকল্পনীয়। এমনই দূষিত হয়েছে এর পানি নানা কেমিক্যাল ব্যবহারে।’ পড়তে পড়তে বুড়িগঙ্গার কথা মনে পড়বে হয়তো; তবে দুরবস্থাটা সে সময়ের টেমস নদীর। ‘সরকারের অনুষ্ঠানমালা যেভাবে প্রাধান্য পায় তাতে সন্দেহ থাকে না যে এর প্রতিষ্ঠা হয়েছে ফোর্থ এস্টেটের অংশ হিসাবে নয়, প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেটের বশংবদ হিসেবে।’ বিবিসির প্রসঙ্গে যেমন বিটিভির কথাও মনে পড়তে পারে। ক্যামেরুন ভ্রমণের প্রথম দিনেই দোয়ালা বিমানবন্দর থেকে ইয়াউন্দে যাওয়ার পথে গাড়ির ইঞ্জিনবিভ্রাটের বর্ণনায় স্মরণে আসে দ্যা গডস মাস্ট বি ক্রেজির বিখ্যাত সেই গাড়ির সিকোয়েন্স, নায়িকাকে রিসিভ করতে গিয়ে নায়ক যেখানে তুমুল নাস্তানাবুদ হয় গাড়ি এবং রাস্তার খামখেয়ালিতে!

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে অমূল্য বিশ্লেষণ, অকৃত্রিম মানবিক বোধ আর অসামান্য প্রজ্ঞার অধিকারী লেখককেও জানা হলো। বিশেষত উইসকনসিসের সেই ক্যাম্পে কাটানো তাঁর দারুণ দিনগুলোর কথা বলতেই হবে। সকালে সাঁতার। বিকেলে খেলা। সাঁতার। সন্ধ্যায় ক্যাম্প ফায়ার। বিচ পার্টি। হৈ হল্লা গান বাজনা। খাওয়া দাওয়া। লেখক অবাক হয়ে ভাবেন, ওরা না বিশ্রাম নিতে এসেছে এখানে? সদ্যপরিচিত বন্ধু গ্রিভাস হেসে বলে, ‘কুলচুরের অভাব। খাও দাও আর স্ফূর্তি করো, এর বাইরে কিছু ভাবতেই পারে না।’ কিন্তু লেখক বলছেন, ‘ভেবে দেখেছি, মার্কিনি রীতির বিশ্রামই সত্যিকারের বিশ্রাম। কর্মব্যস্ততার মানেই মনকে ভারাক্রান্ত করে রাখা অসংখ্য চিন্তায় আর দায়িত্বে। তার থেকে মুক্তি আনে যে বিশ্রাম, সেটা কর্মহীনতা নয় বরং এমন কর্ম যা দেহকে ব্যস্ত রেখে মনকে দেয় ছুটি!’

বইটা তিরানব্বইয়ের দিকে প্রকাশিত। বাংলা বানান তারপর বদলে গেছে বেশ। পুরোনো বানান দেখে ভুল বলে প্রমাদ হতে পারে। আদতেও কিছু ভুল তো রয়েছেই ছাপার, বানানের। কিছু স্থানে লেখা খুব মসৃণ, পরিমিত, আবার কোথাও কোথাও মনে হয়েছে বর্ণনা একটু বিশদ, ক্লান্তিকর। আমেরিকা পর্বের টানটান লেখার পর ইউরোপ পর্বের বেশ কয়েক জায়গায় বর্ণনা খানিকটা গ্লুমিও। দর্শনীয় স্থানগুলোর একটানা বর্ণনার জন্যেই হয়তো। তবে এত অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত ভাষায় লেখা সুখপাঠ্য আর সারবত্তা এ বই, এতটাই বুঁদ হয়ে থাকা যায়, এই ত্রুটিখামতি চোখেই পড়ে না। পড়তে পড়তে বরং ভেবেছি, সাতাশ বছর আগে প্রকাশিত বই, কিনেছিও এগারো বছর আগে, অথচ এতদিন পড়িনি! কেন পড়িনি ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares