হাসনাত আবদুল হাই-এর সাক্ষাৎকার : আমরা খোলা মনে কাউকে প্রশংসা করতে পারি না, এটা আমাদের দীনতা : ―হাসনাত আবদুল হাই

[‘দূর থেকে, হাসনাত আবদুল হাইকে যতই দেখছি, অবাক হচ্ছি, বিশেষ করে গত চার-পাঁচ বছর ধরে তিনি ক্লান্তিহীন লিখে চলেছেন, একের পর এক গল্প, প্রকাশ পাচ্ছে বইয়ের পর বই, এর ভেতর আবার তরুণ লেখকদের বই পড়ে ফেসবুকে রিভিউ করছেন নিয়মিত, ঘুরতে যাচ্ছেন কলকাতা―ফিরেই এক-দু মাসের মধ্যে উপহার দিচ্ছেন ভ্রমণকাহিনি―এই যে এত কর্মযজ্ঞ, তিনি কোথা থেকে পান এত প্রাণশক্তি, এত প্রেরণা আসে কোথা থেকে―স্বভাবতই জানার কৌতূহল হয়, এবং সে তাড়নাতেই, শব্দঘর থেকে যখন আমন্ত্রণ আসে, বাইশ বছর আগে গৃহীত হাসনাত আবদুল হাইয়ের পুরোনো সাক্ষাৎকারটি তাদেরকে প্রকাশের জন্য দিতে পারব কিনা, তখন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রস্তাব করি যে, তাহলে একটু লেখকের সঙ্গে না হয় নতুন করে কথা বলে নিই, তারই পরিপ্রেক্ষিতে এই করোনা-বিপর্যয়-কালেও এক বিকেলে তাঁর ধানমন্ডির বাসায় ছুটে গেলাম।

হায় বাইশ বছরের ব্যবধানে পদ্মার কত পার যে ভেঙে গেছে, কত ঘাট হয়েছে আঘাটা, এক সময়ের জাঁদরেল আমলা হাসনাত আবদুল হাই এখন কাটাচ্ছেন অবসর জীবন, দুরারোগ্য ক্যান্সারে হারিয়েছেন প্রিয়তমা স্ত্রীকে, একমাত্র পুত্রবধূও এখন সেই বৃশ্চিক দংশনে কাতরাচ্ছে, অথচ এত বিপর্যয়ের ভেতরেও তাঁর পড়াশোনা আর লেখালেখিতে সামান্য ক্লান্তি আসেনি, তিনি সেই আগের মতোই মনননিবিষ্ট। শুরু হলো আমাদের কথোপকথন।’]

শব্দঘর-এর জন্য এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন কথাসাহিত্যিক হামিদ কায়সার

প্রশ্ন : আপনি দেখছি অবসরজীবনে এসে বেশ সৃষ্টিমুখর হয়ে উঠেছেন।

হাসনাত আবদুল হাই : হ্যাঁ, বিশ বছর হলো অবসর নিয়েছি। সেদিন হিসাব করে দেখলামঅ, এই বিশ বছরে আমার সাইত্রিশটা নতুন উপন্যাস বেরিয়েছে। তুমি তো আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলে বাইশ বছর আগে, আমার মনে আছে। তারপর আমি এই সাইত্রিশটা নতুন উপন্যাস লিখেছি।

প্রশ্ন : সাইত্রিশটা উপন্যাস বিশ বছরে ? বিশাল ব্যাপার!

হাসনাত আবদুল হাই : সাইত্রিশটা নতুন উপন্যাস বেরিয়েছে। চারটা গল্পগ্রন্থ বেরিয়েছে। ভ্রমণ আরও ছয়টা বেরিয়েছে, ভ্রমণকাহিনি। নন্দনতত্ত্বের ওপর তিনটা বই বেরিয়েছে। আর আমার স্মৃতিকথা ইংরেজিতে লিখেছি তিন খণ্ড। শৈশব একটা, যৌবন একটা, শৈশব মানে আমার স্কুলজীবন, যৌবন মানে ইউনিভার্সিটি লাইফ, ঢাকায়-আমেরিকায় এবং ইংল্যান্ডে এই তিন জায়গায় মিলিয়ে আমার যৌবন, আর তৃতীয় খণ্ড চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা। এই তিন খণ্ডে আমি আমার আত্মজীবনী লিখেছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আমি রিটায়ারমেন্টের পরই করেছি।

প্রশ্ন : নন্দনতত্ত্বের ওপর আপনি তিনটি বই লিখেছেন, এত দ্রুত সময়ে কীভাবে সম্ভব হলো ?

হাসনাত আবদুল হাই : তিনটি তো বই বেরিয়েছে। আরও দুটো লিখছি। নন্দনতত্ত্বের ওপর কাজের পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই ছিল। আমি এ বিষয়ে অনেক বই কিনেছি চাকরি থাকতেই। প্রচুর বই কিনেছিলাম তখন। যে জন্য আমি যখন লেখা শুরু করলাম, তখন আমাকে আর বাইরে যেতে হয়নি। প্রথমে আমি লিখলাম সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব। তুমি তো জানো নন্দনতত্ত্ব দর্শনের বিষয়। দর্শনের একটা অংশ সেটা। তো, প্রচুর দর্শনের বইটই পড়েটড়ে আমি প্রায় এক বছরে বইটা লিখে ফেললাম। সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব। এই নামটা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, যারা খুব বেশি লেখাপড়া জানে না, ধরো গ্র্যাজুয়েট, তারাও যেন এ বইটা পড়ে নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে জানতে পারে। তাদেরকে বিশেষজ্ঞ হওয়া না, সাধারণ একটা ধারণা দেওয়া। তো, এই জন্য আমি বইটার মধ্যে সবকিছু আনলাম। আমি দেখলাম নন্দনতত্ত্বের ওপরে অনেক বই আছে। বাংলায় লেখা ইংরেজিতে লেখা অনেক বই। তো সবগুলো একটা বইয়ের মধ্যে নাই। কোনোটায় হয়তো শুধু দর্শন নিয়ে আলোচনা, কোনোটায় হয়ত শুধু তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কোনোটা হয়তো শুধু তোমার, কী বলে ওটাকে, লেখকদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তো আমি চাইলাম যে একটা বইয়ের মধ্যে সবকিছু আনতে। যাতে একজন সাধারণ পাঠক বইটা পড়ে সবকিছু সম্পর্কে কিছু কিছু জানতে পারে। তো, এটা একটা খুব বড় ধরনের কাজ ছিল। এত বই এইসব পড়েটড়ে আমি একসময় দিশেহারা হয়ে পড়লাম, সামাল দিতে পারছিলাম না, কী হবে না হবে! দিনরাত তখন তো আমার অন্য কোনো চিন্তাভাবনা নাই। আমি একেবারে মরিয়া হয়ে যে, আমার এতদিনের পরিকল্পনা, এত বই কিনেছি, এর সদ্ব্যবহার করতে হবে। তো, এক সময় ওটা লিখে শেষ করলাম, সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব। এটা দৈনিক সংবাদের আবুল হাসনাত খবর পেয়ে বলল যে, আমি ধারাবাহিকভাবে ছাপব। তো, আমি বললাম যে, কতটুকু ছাপবে, এটা তো অনেক বড়। বলে যে, আমি সবই ছাপব। এবং সে কয়েক বছর, দুতিন বছর ধরে ধারাবাহিক সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব সংবাদে ছাপল। কিন্তু আশ্চর্য কি জানো, এই নিয়ে আমি কোনো লোকের প্রতিক্রিয়া দেখলাম না।

প্রশ্ন : তাই নাকি! এত দীর্ঘদিন ধরে সংবাদের মতো সাহিত্যপাতায় প্রকাশিত এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ লেখার কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না ? সত্যিই তো অবাক করা ব্যাপার!

হাসনাত আবদুল হাই : ভালোমন্দ কেউ কিছু বলল না। আমাদের দেশে যা হয়। এ রকম একটা লেখা, যা নাকি এত বড় বাংলাদেশে কেউ ধরেনি। চেষ্টা করেনি ধরার। চেষ্টা করলে যে পারত না, তা না। কিন্তু চেষ্টা করেনি। আমি ওটা করলাম। তো, এই একটা বড় কাজ হলো। সেটার তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। আমার তো আবার পরিকল্পনা ছিল, রিটায়ার্ড লাইফে আমি নন্দনতত্ত্বের ওপরে পাঁচটা বই লিখব। এই একটা। আরেকটা শিল্পকলার নন্দনতত্ত্ব। ফাইন আর্টস। ফাইন আর্টস-এর ওপরে একটা নন্দনতত্ত্ব করব। মানে চিত্রকলা, ভাস্কর্য। তৃতীয়  বইটি হবে চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা। চলচ্চিত্র আমার খুব আগ্রহের বিষয়।  তো, এই তিনটা কিন্তু আমি করে ফেলেছি। পরপর না, বেশ কয়েক বছরের ব্যবধান দিয়ে। এই তিনটা আমার লেখা হয়ে গেছে। চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা এবং সবশেষে লিখেছি খুব বড়, পাঁচশ সাড়ে পাঁচশ পৃষ্ঠার শিল্পকলার নান্দনিকতা। এটা বের হলো ২০১৯ সালে, আগামী বের করেছে। বিরাট বই এবং এ ধরনের বই বাংলাদেশে তো কেউ লেখেনি, কলকাতাতেও নাই। আমি অনেক খুঁজেছি। একটা বইয়ের মধ্যে সব পাওয়া যায় না। একেবারে গুহাবাসী থেকে শুরু করে ডিজিটাল আর্ট। সবই এখানে আছে। নন্দনতত্ত্বের ওপর পাঁচটার মধ্যে তিনটা আমার লেখা হয়ে গেছে। বাকি দুটোর মধ্যে একটা হলো সঙ্গীতে নন্দনতত্ত্ব। সবার জন্য সঙ্গীত। বইটই সবই আছে আমার। পঞ্চম যেটা, সেটা হলো কথাসাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব। ফিকশন, ছোটগল্প, উপন্যাস―এই। এই বাকি দুটো আমি পারব কিনা, জানি না, বয়স হয়ে গেছে, শরীরে অনেক অসুখ বাসা বেঁধেছে। 

প্রশ্ন : নন্দনতত্ত্বের বই বলতেই বাগেশ্বরী প্রবন্ধাবলির কথা মনে পড়ে যায় অবন ঠাকুরের, কিন্তু বেশ কঠিন বইটা। সবাই বুঝবে না।

হাসনাত আবদুল হাই : উনি তত্ত্ব নিয়ে না, উনি নিজে যেভাবে নন্দনতত্ত্বকে বুঝেছেন, নন্দন বিষয়কে বুঝেছেন, উনার মতন করে লিখেছেন। উনি কিন্তু ওখানে নিটশে হোক বা ইমানুয়েল কান্ট হোক এসব পাশ্চাত্যের কোনো দার্শনিকের উল্লেখই করেননি। একেবারে নিজের মতন করে লিখেছেন। সেজন্য বলা যায়, ওই বইটা নন্দন সম্পর্কিত তার ধারণা, তত্ত্ব না। তার পেছনে অবশ্য দর্শন আছে তত্ত্ব আছে। কিন্তু উনি যেভাবে নন্দনটাকে দেখেছেন, নন্দন তো শুধু সৌন্দর্য না, নন্দনের মাঝে সুন্দর আছে, অসুন্দরও আছে। নন্দন হলো এমন কিছু সৃষ্টি যা মনকে মুগ্ধ করে, তৃপ্তি দেয়। যেমন একটা কদর্য ছবিও কিন্তু মানুষের মনকে তৃপ্তি দেবে। ফ্রান্সিস বেকনের ছবি, খুব কদর্য মুখ ভয়ংকর মুখ, গ্যোয়ার ছবি, গ্যোয়ার ছবির মধ্যেও খুব ভয়ংকর রয়েছে, বীভৎসতা রয়েছে। সেগুলোও শিল্পগুণের জন্য সুন্দর বলে বিবেচিত। সুতরাং নন্দনতত্ত্ব শুধু সৌন্দর্য তত্ত্ব নয়। সুন্দরও আছে অসুন্দরও আছে। অসুন্দরটাকে শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, এটাই নন্দনের বিষয়, বাগেশ্বরীতে অবনীন্দ্রনাথ এই অসুন্দরের ব্যাপারটাও নিয়ে এসেছেন। ওটা বেশ বিমূর্ত, বিমূর্ত ধরনের আলোচনা, সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব না, আমার বইতে তার উল্লেখ আছে। আমি যতটা পেরেছি সাধারণ পাঠকের কথা মনে করে লিখেছি। মোটামুটি লেখাপড়া জানে, তবে এসএসসি এমএসসি পাস করলে হবে না, অন্তত দর্শন সম্পর্কে কিছু জানতে হবে। তারপর শিল্পকলা সম্পর্কে জানতে হবে। ওইভাবে লিখেছি।

প্রশ্ন : নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে তো প্রকৃতিরও একটা সম্পর্ক আছে, ঈশ্বরবোধ বা রহস্যময়তা… 

হাসনাত আবদুল হাই : প্রকৃতি আর ঈশ্বর এটা দুটো দুই প্রান্তে। প্রকৃতি হলো সৌন্দর্যের যে অনুভূতি সেটাকে মূর্তভাবে দেয়। প্রকৃতি মানে গাছপালা, সূর্যাস্ত, পাহাড়, নদী―এগুলোর সৌন্দর্য আছে। এসব সৌন্দর্যের আবার কোনোটা খুব প্রকট কোনোটা খুব সাবলাইম। যেমন ঝড় হচ্ছে, ঝড়ের যে সৌন্দর্য ওটা সাবলাইম সৌন্দর্য! আগ্নেয়গিরির যখন অগ্নুৎপাত হচ্ছে, ভয়ংকর, কিন্তু ওই ভয়ংকরের মধ্যে একটা সাবলাইম বিউটি আছে। তো, এই প্রকৃতি নন্দনতত্ত্বের একটা উৎস। নন্দনতত্ত্বের একটা উৎস প্রকৃতি অবশ্যই, কেননা প্রকৃতি থেকেই কিন্তু সব ফর্ম উদ্ভূত হয়েছে। প্রকৃতি সব সৌন্দর্যের আধার। সেখান থেকেই আমরা আমাদের সৌন্দর্যের ধারণা করি, দেখে। আচ্ছা, যখন ওটা করি, তারপর যখন সৌন্দর্যের ধারণা প্রকৃতিকে নিয়ে, বাস্তবকে নিয়ে, আকারকে নিয়ে, আমাদের যে চিন্তা সৌন্দর্য সম্বন্ধে, এটাকে যখন নাকি আমরা ওপরের দিকে নিয়ে যাই, পরিশীলনের মাধ্যমে, চিন্তার মাধ্যমে, তখন সেটা আধ্যাত্মিকতার দিকে চলে যায়, নিরাকার হয়ে যায়। তখন সে সৌন্দর্য চিন্তা নিরাকার হয়ে যায়। সুতরাং ঈশ্বরচিন্তাও এই নন্দনের মধ্যে আছে। যেমন জেন বৌদ্ধজম তারা এক জায়গায় বসে নিরাকার কিছু চিন্তা করে। নিরাকার চিন্তা করতে করতেই তাদের মধ্যে একটা সৌন্দর্যের ভাব আসে। তো, তুমি যেটা বললে এটা খুবই প্রাসঙ্গিক, যে নন্দনতত্ত্বের একদিকে রয়েছে আকার বিশিষ্ট প্রকৃতি, যেখানে আমাদের যে পঞ্চেন্দ্রিয়―গন্ধ, রূপ, বর্ণ, রস, স্পর্শ সব আমরা সেখানে পাই। এর বিপরীতে রয়েছে এই যে তোমার দার্শনিক হাইফেন আধ্যাত্মিক চিন্তা, আমি এটাকে এইভাবে বলব। দার্শনিক যেটা নাকি আধ্যাত্মিক না, মানে ঈশ্বর সংক্রান্ত না, যেমন জীবন নিয়ে মৃত্যু নিয়ে অ্যাবস্ট্র্যাক্ট চিন্তা, এটা দার্শনিক চিন্তা। কেন মানুষ জন্মায়, কী হয়, কোথায় যায়―দার্শনিক চিন্তা, কিন্তু এই দার্শনিক চিন্তা যখন নাকি ঈশ্বর চিন্তা হয় তখন ওটা আধ্যাত্মিক হয়ে যায়। তো নন্দনতত্ত্ব এই সবগুলোকে নিয়েই।

প্রশ্ন : যাক, এটা একটা বিশাল কাজ হলো, কিন্তু আমাদেরই দুর্ভাগ্য, সংবাদে যখন প্রকাশ পাচ্ছিল আপনি তেমন প্রতিক্রিয়া পাচ্ছিলেন না, সময়টাই যেন এখন কেমন, পেছনমুখী।

হাসনাত আবদুল হাই : আমরা যারা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চায় নিয়োজিত আছি, দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের মধ্যে একটা সংকীর্ণতা আছে। আমি কিংবা আমার যে গণ্ডি, গণ্ডিতে যারা রয়েছে চার-পাঁচজন, এর বাইরে কে কি লিখছে না লিখছে, এটা  নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। আমার গণ্ডিতে যদি পাঁচজন থাকে, আমি খুব বাহবা দেব। খারাপ লিখলেও বাহবা দেব। এটা পরস্পর একটা প্রশংসা করার একটা পিঠ চুলকানি সমিতির মতন। এটা আমাদের মধ্যে খুব বেশি। এই গণ্ডির বাইরে যদি দেখি কেউ কিছু লিখছে আমরা নীরবতা করব, উপেক্ষা করব, এটা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করব না। এখানে আমরা বেশ মার খাচ্ছি। আমাদের যে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা এটা অনেকটা মার খাচ্ছে এই জন্য। আমাদের মধ্যে একতার অভাব। আমাদের গণ্ডিভুক্ত না হোক, আমি হয়ত চিনিই না তাকে, কিন্তু সে একটা ভালো জিনিস লিখল, খোলা মনে সেটাকে আমি গ্রহণ করব, প্রশংসা করব, সমাদর করব, এটা আমাদের দ্বারা হচ্ছে না। আমরা খোলা মনে কাউকে প্রশংসা করতে পারি না―এটা আমাদের দীনতা, এটা আমাদের একটা দীনতা।

প্রশ্ন : আপনাকে কি এসব নেতিবাচকতা কোনোভাবে প্রভাবিত করে ?

হাসনাত আবদুল হাই : মোটেই না। এগুলো আমাকে নিরুৎসাহিত করে না। কেননা, আমি তো মরিয়া হয়ে লিখে যাচ্ছি। চুরাশি বছর, আমার তো ষাট বছরের বেশি হলো লেখকজীবন, কে আমার বই পড়ল না পড়ল এটার জন্য আমার কিছু এসে যায় না, আমার বই যদি প্রকাশকরা ছাপে, তাহলে বুঝব আমার বইয়ের চাহিদা আছে। কিন্তু আমি একজন নতুন লেখকের কথা ভাবছি। নতুন লেখক যদি এভাবে নিরুৎসাহিত হয়, তাহলে তো সে গোড়াতেই বসে যাবে, সে লিখবে না।

প্রশ্ন : আবুল হাসনাত সম্প্রতি প্রয়াত হলেন, যিনি আপনার সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব দীর্ঘ সময় ধরে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় ছেপেছেন। 

হাসনাত আবদুল হাই : আমার অনেক লেখাই আবুল হাসনাত দৈনিক সংবাদ-এ ধারাবাহিক ছেপেছে। সে অনেক উদার মনের ছিল। তার মনে সংকীর্ণতা ছিল না। তবে যেহেতু সে বামপন্থি রাজনীতি করত, বামপন্থি লেখকদের প্রতি তার একটা দুর্বলতা ছিল। তাদের লেখা সে চেয়ে চেয়ে আনত। নতুন লেখকদেরও বিশেষ করে যারা প্রতিভাবান, তাদের লেখাও ছেপেছে। তার একটা বায়াস ছিল, যেহেতু নিজে বামপন্থি, বামপন্থি লেখকদের ডেকে ডেকে এনে লেখা ছাপত। তারপরে এই যে শব্দঘরের মোহিত কামাল, ইনিও কিন্তু  উদারমনা, উদারমনস্ক। নতুন অনেক লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন এবং প্রবীণদের প্রতিও তার শ্রদ্ধাভাব রয়েছে। কিন্তু প্রবীণদের নিয়েই তার পত্রিকা সীমাবদ্ধ নয়, পত্রিকার পাতা খুললেই তুমি দেখবে নতুন নতুন নাম দেখা যাচ্ছে।

তবে সামগ্রিকভাবে সাহিত্য পাতা সম্পাদনার মান আর আগের মতো নেই।

প্রশ্ন : হ্যাঁ, মান অনেক পড়ে গেছে। কেমন যেন সাহিত্যবিরূপতাও তাদের মধ্যে। আগে তো গল্পকার, কবি বা প্রাবন্ধিক তৈরিতে দৈনিকের সাহিত্য পাতারই একটা ভূমিকা ছিল, সেখানে সৃজনশীলতার জায়গাটাকে যেন নষ্ট করার নীলনকশা হচ্ছে। এখন না হয়, করোনার জন্য সাহিত্য পাতা কমাতে হচ্ছে। কিন্তু করোনাকালের অনেক আগ থেকেই তো, আমরা লক্ষ্য করছিলাম, লাভজনক দৈনিক পত্রিকাগুলোতেও সাহিত্য পাতায় বিজ্ঞাপনের দখল, গল্প লেখার জন্য গল্পকারদের বলে দেওয়া হচ্ছে  ৬৫০ শব্দে গল্প লিখতে হবে, বারোশ শব্দে গল্প লিখতে হবে। পনেরোশ শব্দে গল্প লিখতে হবে। এভাবে কি শব্দসংখ্যা হিসেব করে গল্প লেখা যায় নাকি সম্ভব সেটা ? 

হাসনাত আবদুল হাই : এবং ওদের একটা গোষ্ঠী থাকল, গোষ্ঠীর বাইরে যায় না। সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে গেছে।

প্রশ্ন : একদম। প্রতিটি দৈনিকের সাহিত্যপাতাকে ঘিরের ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীবদ্ধতা। তো, এই যে গল্পলেখায় শব্দ ধরে দেওয়া, এটা তো লেখকদের বিকাশের জন্য অন্তরায় হলো। একজন লেখক তার মতো করে একটি গল্প লিখে যাবে, সে গল্পের শব্দসংখ্যা তিন হাজার হোক, চার হাজার হোক, সাহিত্য পাতায় ছাপা হবে, আগে তো অনায়াসেই ছাপা হতো এবং লেখক এবং পাঠকের মধ্যে সে লেখার মাধ্যমে একটা পারম্পর্য গড়ে উঠত, সে সুস্থ ধারাটা তো নষ্ট হয়ে গেল। আবার এদিকে দেশের কোনো প্রধান বইয়ের দোকানেই বাংলাদেশের কবি লেখকদের বই পাওয়া যায় না। এই যে বাতিঘর, এত চমৎকার একটা ব্যাপার হলো, এত বড় একটা ব্যাপার হলো, কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের লেখকদের বই নেই।

হাসনাত আবদুল হাই : না, পাঠক সমাবেশে কিন্তু বাংলাদেশের সব পত্রিকা লিটল ম্যাগাজিন পাওয়া যায়।

প্রশ্ন : পাঠক সমাবেশে তবু বাংলাদেশ কিছুটা আছে, তবু বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখকদের বই সেখানে পাওয়া যায় না।

হাসনাত আবদুল হাই : বাংলাদেশের লেখকদের বই একটু কম পাওয়া যায়, ট্রু। ভারতীয় বই প্রচুর। বেঙ্গল বইতেও তাই। বাতিঘরেও তাই। বাতিঘর, বেঙ্গল বই, পাঠক সমাবেশ আমাদের তিনটা বইয়ের দোকান, প্রধান আধুনিকতম। এমন আধুনিকতম দোকান কলকাতাতেও নাই। এরা কেন কলকাতার লেখকদের এত প্রাধান্য দিচ্ছে, আমাদের লেখকদের তুলনায়। এটার ব্যাখ্যা কি ? আমি আমার প্রকাশক আগামীকে বলেছিলাম যে, বেঙ্গল বইতে গিয়ে দেখলাম আমার কোনো বই নাই, কি ব্যাপার ? বলে যে, ওদের কাছে আমার অনেক পাওনা টাকা। সে টাকা দেয় নাই। আমি এখন কীভাবে বই দিই। আমার চার লক্ষ টাকা পাওনা। দুই নম্বর হলো, ওরা তো বই চায় না। ওরা তো বই চাবে যে, এ বই শেষ হয়ে গেছে। আমাকে পাঠান। ওরা চায় না। এই দুটো কারণ বলল, টাকা দেয় না, বই যেটা বিক্রি হচ্ছে টাকা দেয় না এক। আর দুই হলো বই চায় না। বই চাইতে হবে তো। আচ্ছা অমুক লেখকের এ বইটা পাঠান দশকপি। এরকম বলে না। এটা তো বলতে হবে। আমার মনে হয়, এখানে যে পশ্চিম বাংলার লেখকদের প্রাধান্য এর কারণ হলো, ওরা মনে করে যে, পশ্চিম বাংলার লেখক শুনলেই, প্রতিষ্ঠিত যারা তারা তো বটেই, কোনো গল্পের বই কিনতে চায়, আচ্ছা ও কলকাতার লেখক, হ্যাঁ কেনো। অর্থাৎ ওরা বেশি বিক্রয়যোগ্য এই মনে করে, আমরা অত বিক্রয়যোগ্য না। যেহেতু দোকান খুলেছে, কেনাবেচার ব্যাপার আছে। ওরা কেনাবেচার ব্যাপারটা বেশি দেখে। এবং মনে করে, কলকাতার লেখকের বই বেশি বিক্রি হবে বা হয়। তো এভাবে একটা বিসিয়াস সার্কেল বিষচক্রের মতন হয়ে গেছে। যেহেতু ওদেরটা আনে, ওদেরটা বিক্রয় হয়। আমাদেরটা কম নেয়, আমাদেরটা কম বিক্রি হয়। এটা একটা বিষচক্রের মতো হয়ে গেছে। কিন্তু বইয়ের দোকান, আমাদের পাবলিশার তো বটেই, কোনো কোনো পাবলিশার আবার পশ্চিম বাংলার লেখকদের বই ছাপা শুরু করেছে। যেমন ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, একটা সম্ভ্রান্ত পাবলিশিং হাউজ, শংকরের মতো একটা মিডিয়োকার লেখক এবং তারও পুরনো বই, তারা এখানে ছাপল। অবাক হয়ে গেলাম আমি। এই হলো অবস্থা। অথচ ওরা আমাদের লেখকদের জন্য অনেক কিছু করতে পারত। ইংরেজি বই প্রকাশ করে অনেক টাকা কামিয়েছে। সেই টাকা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে, আচ্ছা আমাদের লাভ হবে না, আমরা কিছু সাহিত্যের বই ছাপি, এ রকম ছাপতে পারত, কিন্তু ছাপল না।

প্রশ্ন : আপনি বাংলাদেশের জীবনী- উপন্যাস লেখায় বেশ কাজ করেছেন এবং এক্ষেত্রে আমাদের সাহিত্যের জগৎকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন, তো এই বিশ বছরের মধ্যে যে উপন্যাসগুলো লিখেছেন, সেখানে তো নতুন জীবনী-উপন্যাসও আছে ?

হাসনাত আবদুল হাই : বিশ বছরে যে-কটি উপন্যাস লিখেছি, তার মধ্যে দুটি জীবনী-উপন্যাস আছে। আটানব্বই পর্যন্ত নভেরা, সুলতান, আরজ আলী এ তিনজনের জীবনী-উপন্যাস লিখেছিলাম। আটানব্বইয়ের পরে এ পর্যন্ত আমি আরও দুটো লিখেছি। একটি হলো শিল্পী কামরুল হাসানকে নিয়ে। ওটা আজ থেকে পাঁচ-ছ বছর আগে বেরোয়। লড়াকু পটুয়া। আগামী প্রকাশন বের করেছে। আর এ বছরের বইমেলায় বেরুল হেমিংওয়ের সঙ্গে, ওটা লিখেছি গত বছরে। হেমিংওয়ের সঙ্গে হলো সৈয়দ শামসুল হক এবং তার স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক―দুজনের জীবনী-উপন্যাস।

প্রশ্ন : বাহ! এটা তো চমকপ্রদ এক ব্যাপার। তা, দুজনের মাঝখানে হেমিংওয়ে এলো কীভাবে ?

হাসনাত আবদুল হাই : আনোয়ারা সৈয়দ হক নিভৃতে মানে ফ্যামিলির মধ্যে সৈয়দ হককে হেমিংওয়ে নামে ডাকতেন।

 কেননা উনি যখন লেখক-জীবন শুরু করেন, হেমিংওয়ের খুব ভক্ত ছিলেন। সেই থেকে তাকে হেমিংওয়ে বলে ডাকেন। তো ওইভাবে হেমিংওয়ের সঙ্গে মানে সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে ওনার যে জীবন, এটা আমি বললাম। এই জীবন বর্ণনা করতে গিয়ে আমি সাহিত্য নিয়ে আসলাম দুজনের। তো, এই জীবনী-উপন্যাসটা আমার অন্যান্য জীবনী-উপন্যাসের চাইতে ভিন্নধর্মী। এক হলো, দুজনের জীবন এখানে এসে যাচ্ছে। দ্বিতীয় হলো এটা আমি লিখেছি, হেমিংওয়ের সঙ্গে, তার মানে কি, তার মানে হলো আনোয়ারা সৈয়দ হকের দৃষ্টি থেকে, হেমিংওয়ের সঙ্গে যে জীবন ওনার, সেটা ওনি বলছেন। তো এই দিক থেকে এই জীবনী-উপন্যাসটি অন্যগুলোর চাইতে ভিন্ন। আমার সব জীবনী উপন্যাসই আঙ্গিকের দিক দিয়ে ভিন্ন। একটার সঙ্গে অন্যটার মিল নেই অন্তত স্টাইলের দিক দিয়ে।

প্রশ্ন : তাছাড়া আমার যতটুকু ধারণা আছে, দুজনের জীবনই বর্ণাঢ্য, অনেক রকম চড়াই উতরাই ঘটনা আছে তাদের জীবনে।

হাসনাত আবদুল হাই : এবং আনোয়ারা সৈয়দ হকও কিন্তু বহুমাত্রিক। সৈয়দ শামসুল হককে সব্যসাচী বলা হয়। উনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে লিখেছেন বলে, আনোয়ারা সৈয়দ হকও কিন্তু সবদিকে লিখেছেন―কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, কিশোর সাহিত্য। সৈয়দ শামসুল হক যা যা করেছেন, উনিও ঠিক একই। জীবনী! তিন খণ্ডে জীবনী লিখেছেন। এবং তার জীবনী এত ক্যান্ডিন্ড এত স্পষ্টভাষী। আমাদের দেশে খুব কম মেয়ে লেখিকা এত খোলামেলাভাবে নিজের জীবন নিয়ে লিখেছেন। এই রকম। তিন খণ্ডে লিখেছেন, আরও হয়তো লিখবেন।

প্রশ্ন : আর তার সবচেয়ে বড় অবদানটা হলো, উনি যে সৈয়দ শামসুল হককে তৈরি করেছেন!

হাসনাত আবদুল হাই : হ্যাঁ, এটা ওনার সবচেয়ে বড় অবদান। বড় অবদান। ওনি না থাকলে সৈয়দ শামসুল হকের যে অর্জন, ওনার যে সৃষ্টি-অবদান, এর অর্ধেকও হতো না। অর্ধেকও হতো না। এই জন্য আমি এ জীবনী-উপন্যাস লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। নইলে আমি ঠিক করেছিলাম আমি আর জীবনী-উপন্যাস লিখব না। কেননা চারটা লেখা হয়ে গেছে। আরও যদি লিখি, তাহলে লোকে আমাকে জীবনী- উপন্যাস লেখক হিসেবেই চিহ্নিত করবে। আমি ওভাবে ব্র্যান্ডেড হতে চাই না। কিন্তু দুটো বিষয় আমাকে এই হেমিংওয়ের সঙ্গে লিখতে উদ্বুদ্ধ করল। এক হলো মৃত্যুশয্যায়, মারা যাবেন যে কোনো দিন, এটা জানা সত্ত্বেও ওনি লিখছেন, গল্প লিখছেন, কবিতা লিখছেন। এবং লিখতে পারছেন না, স্ত্রীকে বলছেন, তুমি লেখো, আমি বলে যাই। এই একটা ব্যাপার, আমি দেখলাম পৃথিবীর ইতিহাসে এই রকমের নজির নাই। একজন লেখক মরে যাচ্ছেন, উনি জানেন, আর লিখে কী হবে, অনেক তো লিখেছি, অনেক পুরস্কার পেয়েছি, এখন আমি সংসার নিয়ে একটু আলাপ করি, সুখদুঃখ নিয়ে আলাপ করি। কিচ্ছু না, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত উনি লিখে গেলেন। এই জিনিসটা আমাকে সাংঘাতিক আলোড়িত করল যে একটা লোক মরে যাচ্ছে, লেখক, অনেক লিখেছে, না লিখলেও চলবে, তার যা খ্যাতি হয়ে গেছে, যা পুরস্কার পেয়ে গেছেন, আবার কি! শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লিখলেন। আমি মনে করলাম, এই রকম একজন লেখকের জীবন নিয়ে আমাকে লিখতে হবে। আর সেই সঙ্গে এসে গেল আনোয়ারা সৈয়দ হক। সৈয়দ হক এই যে লেখক, এই লেখক তো উনি হতে পারতেন না আনোয়ারা সৈয়দ হক যদি না থাকতেন! এবং শুধু তাই না, লেখক হতে সহায়তার পাশাপাশি উনি এর মধ্যে নিজের পেশা অনুসরণ করেছেন, চিকিৎসা করেছেন, ডাক্তারির পেশা অনুসরণ করেছেন, আবার নিজে লিখেছেন। একটা দুটা না, অনেক লিখেছেন। তো আমি বললাম, না, এদের দুজনকে নিয়ে আমার জীবনী-উপন্যাস লিখতে হবে, লিখলাম। 

প্রশ্ন : খুব ভালো একটা কাজ হয়েছে। পড়তে হবে।

হাসনাত আবদুল হাই : আমার কাছে শেষ কপিটা ছিল, ওটা হরিশংকর জলদাসকে দিয়ে দিলাম। ও চাইল। প্রথমা এটা বের করেছে। আমাকে পাঁচ কপি না দশ কপি দিয়েছে। ওদের ফোন করলাম একজনকে, সজল রায় না  সৌমেন রায়, তাকে আমি বললাম, ভাই, আমার তো মনে হয় আরও কিছু বই পাওনা আছে, আমাকে আরও পাঁচ কপি পাঠান তো! বই তো পাঠালই না, কোনো উত্তরও দেয় নাই। অ্যাজ এ রেজাল্ট, ও বই আমার কাছে এখন এক কপিও নেই। আমাকে এখন কয়েকটা বইয়ের জন্য স্মরণ করা হয়, সুলতান, নভেরা। হেমিংওয়ে এখনও অতটা খ্যাতি অর্জন করেনি, কিন্তু সুলতান, নভেরা বললেই আমার নামটা এসে যায়।

প্রশ্ন : আপনার কি গল্পসমগ্র বেরিয়েছে ?

হাসনাত আবদুল হাই : দুই খণ্ডে বেরিয়েছে। মনিরুল হকের অনন্যা থেকে। আর আমার গল্প সংকলন বেরিয়েছে আটটা। ২২ বছর আগে তুমি যখন আমার ইন্টারভিউ নাও, তার আগে বেরিয়েছিল চারটা আর তারপর চারটা। আর সব গল্প সংকলন নিয়ে বেরিয়েছে দুটো সমগ্র। গল্পসমগ্র এক, দুই। আরও একটা হবে। আমি দিইনি এখনও। সেটা দিলে গল্পসমগ্র তিন হবে।

প্রশ্ন : আপনার নতুন জীবনী-উপন্যাস সম্বন্ধে জানলাম, তো এই যে সাইত্রিশটা উপন্যাস লিখলেন, তার মধ্যে আপনার লেখা প্রিয় উপন্যাস কোনগুলো, যা লিখতে পেরে আপনার ভালো লাগছে।

হাসনাত আবদুল হাই : তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হলো তোমার সাঁতারু ও জলকন্যা। আমি উপন্যাসটার নাম চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস দিতে পারতাম কিন্তু দিইনি, উপন্যাসটায় চিটাগাং হিলট্র্যাক্টস-এর ব্যাপারটা এসেছে। হিলট্র্যাক্টস আর সমতলের মানুষের মধ্যে যে একটা দ্বন্দ্ব, জমি নিয়ে এটাসেটা নিয়ে―এ বিষয়টাকে কেন্দ্র করে, কিন্তু আসলে এসেছে চিটাগাংয়ের হিলট্র্যাক্টস-এর ব্যাপারটা। এটা আমি লিখেছি ভূমিকায়, যে কোনো দেশের যেখানে এ ধরনের পাহাড় রয়েছে আদিবাসী রয়েছে এবং সমতলের মানুষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব রয়েছে, এটা যে কোনো জায়গা হতে পারে, ভারতবর্ষ হতে পারে, বাংলাদেশ হতে পারে―এটা একটা ইমপর্টেন্ট লেখা। তারপর ইমপর্টেন্ট লেখার মধ্যে রয়েছে কমরেড অনুর অপরাহ্ন। এটা ২০০৮ সালে বই হিসেবে বেরিয়েছে, ২০০৭-এ লেখা। এই উপন্যাসে আমি বাংলাদেশের কলকাতা থেকে শুরু করে, কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে ইতিহাস, উপন্যাসের আকারে উপস্থাপন করেছি। আমার চরিত্ররা সব কমিউনিস্ট, এবং তাদের ভাগ্যে কী হলো, আন্দোলনের কী হলো অবস্থা, সেটা, ওই কলকাতার কমরেড মুজফফর থেকে শুরু করে, এমএন রায় থেকে শুরু করে একেবারে বাংলাদেশের মণি সিং পর্যন্ত, এবং তারা যে ভাগ হয়ে গেল, চীনপন্থি, মস্কোপন্থি―একেবারে শেষ পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। আমাদের দেশের বামপন্থি রাজনীতির যে ইতিহাস সেটাকে আমি উপন্যাসে ধারণ করলাম। এটা কেউ করেনি, বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরো ইতিহাস নিয়ে লেখেনি। আমি এটা লিখেছি, কমরেড অনুর অপরাহ্ন। কমরেড অনু হলো আমার উপন্যাসের মূল চরিত্র, সে অপরাহ্নে রিটায়ার করে গেছে, এখন আর আন্দোলন নাই কিছু নাই। তখন আদিবাসীরা তাকে গিয়ে ধরল, আমরা অবস্থান ধর্মঘট করব, আপনি আমাদের একটু নেতৃত্ব দেন। উনি বললেন, না, আমি তো এখন রিটায়ার করেছি। তো শেষ মুহূর্তে দেখা গেল উনি সবার সামনে দাঁড়িয়েছেন। এইভাবে কমরেড অনুর অপরাহ্ন অর্থাৎ নিভেও নিভে নাই আন্দোলনটা। এরপর একটা উপন্যাস আছে। ইউটোপিয়া। ইউটোপিয়া হলো যে, মুক্তিযুদ্ধে একজন গিয়েছিল, সে প্রগতিশীল, বামপন্থি বলতে পারো। তো সে গিয়েছিল, তার একটা স্বপ্ন ছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। সেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। শ্রেণিহীন সামাজিক ন্যায় বিচার থাকবে। ধনীদরিদ্রের পার্থক্য অতটা থাকবে না। সবাই মোটামুটি একটা সাম্যবাদের আদর্শে জীবনযাপন করবে। তো, বাংলাদেশ হওয়ার পরে যখন দেশে এসে দেখল যে এ রকম হচ্ছে না, তখন সে তার দেশের বাড়িতেই জমিজমা ছিল, ওইগুলো নিয়েই একটা কমিউন করল। যারা বর্গাদার, ওদেরকে নিয়ে একটা কমিউনের মতো করল। চীনে যেমন কমিউন ছিল, সব একসঙ্গে থাকবে খাবে, একসঙ্গে কাজ করবে, একসঙ্গে ও রকম একটা করল। এভাবে আমি দেখাতে চাইলাম তার যে স্বপ্ন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ এ রকম হবে, সেটা যখন হলো না দেখল, তখন সে তার নিজের গণ্ডিতে নিজের চেষ্টায় যতটুকু পারে, সে স্বপ্নটাকে বাস্তবায়ন করতে চাইল। ইউটোপিয়া। নাম দিলাম ইউটোপিয়া। এটাও আমার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। তারপর তোমার একদা এক যুদ্ধে। এটা হলো আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের কয়েকজন ডাক্তার― জাফরউল্লাহ চৌধুরী, ডাক্তার আবদুল মোবিন এবং ডাক্তার সোফিয়া এরা মিলে একটা ফিল্ড হাসপাতাল করেছিল। বাঁশের দরোজার বেড়া, টিনের ঘর, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য। তাদের কাছে কিছুই ছিল না যন্ত্রপাতি, বাঁশ দিয়ে অপারেশন করত।

প্রশ্ন : আমি ওখানে গিয়েছি, জায়গাটা ঘুরে দেখে এসেছি।

হাসনাত আবদুল হাই : তাই, ওখানে ডাক্তার মোবিন ছিল, ও আমার ছোটভাই। একদা এক যুদ্ধে ওদেরকে নিয়ে লেখা।

প্রশ্ন : দেশের এগিয়ে যাওয়া, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্তি আপনার উপন্যাসের ধারা।

হাসনাত আবদুল হাই : এসব উপন্যাস লিখতে গিয়ে একটা অসুবিধা, যেটা তুমি আগে উল্লেখ করেছ, উপন্যাসগুলো প্রায় সবই ঈদসংখ্যায় বেরিয়েছে। ওরা কিন্তু বেশি ছাপতে চায় না পৃষ্ঠা। না বললেও আমার মনের মধ্যে ওই ধরনের একটা রেস্ট্রিকশন থাকে যে, এত বড় লেখা যাবে না। এর ফলে, উপন্যাসগুলো বড়জোর একশো পৃষ্ঠা দেড়শো পৃষ্ঠা হয়েছে, আড়াইশো, তিনশো পৃষ্ঠায় যেমন হওয়া উচিত উপন্যাসে, তেমনটা হয়নি।

প্রশ্ন : তো এই অতৃপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে আপনার কি নতুন কোনো পরিকল্পনা রয়েছে উপন্যাস নিয়ে ?

হাসনাত আবদুল হাই : এ বছর ২০২০ সালে আমি কোনো উপন্যাস লিখিনি। মাথার মধ্যে দুটো আইডিয়া আছে। একটা লিখব করোনা নিয়ে। এটা একটা এপিকের মতো ঘটনা। করোনার যে ঘটনা, এটা একটা এপিকের মতো ঘটনা। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাস যেমন, সেরকম। তার চাইতেও বেশি বলতে গেলে। এখনও চলছে, অর্থনীতি ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু সে লেখা একটু নতুন ধরনের হতে হবে। নতুন আঙ্গিকের হতে হবে। দ্বিতীয় যেটা উপন্যাস লিখতে চাই, সেটা অনেকদিন থেকে মাথায় ঘুরছে। সেটা হলো এই যে বাঙালি মুসলমান আমরা তিন পুরুষে মধ্যবিত্ত হয়েছি, নাগরিক হয়েছি। তিন পুরুষ আগে যাও। আমাদের যে কোনো  ফ্যামিলিতে দেখবা, আমাদের দাদা―তারা কৃষক। এই যে কৃষক পরিবার থেকে এসে, এই যে ধানক্ষেত থেকে ধানমন্ডিতে, এটা কীভাবে হলো, এটা নিয়ে আমি লিখতে চাই একটা উপন্যাস। বাঙালি মুসলমানের এই ক্রমবিকাশের ধারাকে উপন্যাস আকারে ধরতে চাই।

এভাবেই আমাদের কথা এগিয়ে চলে, কথা শেষ হয় না, উপন্যাস নিয়ে স্মার্টফোনে তার কথা আরও জমতে থাকে, কথা হয় তার লেখা ভ্রমণ নিয়ে রানাঘাট নিয়ে, কলকাতার রানাঘাট ঘুরে এসে এক মাসেই লিখেছেন ভ্রমণ উপন্যাস, তিনি কথা বলতে বলতেই আমার হাতে বাড়িয়ে দেন নাটকের বই হ্যাম-বেথ। বলেন যে, এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ লেখা, শেক্সপিয়রের হ্যামলেট আর ম্যাকবেথকে ভেঙে চরিত্রগুলোকে এক নাটকে নিয়ে এসেছি। আরও বাড়িয়ে দেন জাপানের সংস্কৃতি, জনকের গল্প―তাঁর অফুরন্ত কাজের যেন শেষ নেই। আরও বহু বছর এমনভাবেই তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলুন। এই আশিস মনে মনে কামনা করতে করতে তার ধানমন্ডির বাসা থেকে সন্ধ্যার আঁধারে বেরিয়ে আসি।

আমার এই সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি চলুন পাঠক হাসনাত আবদুল হাইয়ের পুরনো একটি সাক্ষাৎকারও পাঠ করা যাক। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায়।

নব্বই দশকের সূচনালগ্নে, তিনি যখন দেশের একজন ডাকসাইটে আমলা, এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণের সূত্রে আমি তাঁর বেইলি রোডের বাসার ব্যক্তিগত লাইবেরি পরিভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিলাম। কত যে আকাশ গ্রহ নক্ষত্রে পরিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ সে লাইব্রেরি, ঘুরে দেখতে দেখতে আমার বেশকিছু সময় পেরিয়ে গেছে। স্যার আমাকে হাতে ধরে ধরে দেখিয়েছেন কোন বইগুলো কোন প্রয়োজনে সংগ্রহ করে এখানে রেখেছেন, কীভাবে রেখেছেন! কোন বইগুলো কেন মহার্ঘ্য! সে-এক বড় পয়মন্ত দিন ছিল! আসুন পাঠক! সেদিনের গৃহীত সাক্ষাৎকারটিতে এখন প্রবেশ করা যাক।

প্রশ্ন : আপনার শৈশব- কৈশোরের বই পড়ার অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু করা যাক―আপনার পড়া শুরু হয়েছিল কোন বই দিয়ে।

হাসনাত আবদুল হাই : বাংলাদেশের অন্যান্য শিশু-কিশোরের মতো আমারও বই পড়া শুরু হয় রূপকথা দিয়ে―ঠাকুরমার ঝুলি, এধরনের গল্পের বই হাতের কাছে যা পেয়েছি, পড়েছি। কিন্তু, সেই ছোটবেলায় আরও একটি ঘটনা ঘটেছে, যেটা হয়তো কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, ঘটনাটি হলো, আমি যখন ক্লাস থ্রি-তে পড়ি তখনই বিষাদ সিন্ধু পড়ে শেষ করি।

প্রশ্ন : মাত্র ক্লাস থ্রি-তে পড়া অবস্থায় ?

হাসনাত আবদুল হাই : হ্যাঁ, ক্লাস থ্রি-তে থাকতেই বিষাদ সিন্ধু পড়ে শেষ করে ফেলি। পরে এটা একটা ব্যতিক্রমী ব্যাপার বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। রীতিমতো অকালপক্বতা যাকে বলে আর কি। এছাড়া অন্যদের মতন শিশু এবং কিশোর বয়সে রূপকথাই বেশি পড়েছি। এরপর, ক্লাস ফোরে পড়ার সময় পর্যটক রমানাথ বিশ্বাসের লাল চীন বইটা পড়ি। এটা ভ্রমণকাহিনি। তখনই আমার মধ্যে ভ্রমণকাহিনি এবং ভ্রমণের ব্যাপারে একটা বেশ আগ্রহ জন্মে। আমার আব্বা তখন সরকারি চাকরি করতেন, বদলির চাকরি। সেই সুবাদে উভয় বাংলার নানা জেলায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়ে যায়। ভেতরে একটা যাযাবর ভাব আসে। দেশ বিভাগের পরে আমরা ঢাকায় আসি। তারপর যশোরে যাই। ক্লাস ফাইভে ভর্তি হই। যশোর তখন হিন্দুপ্রধান ছিল। সেই কারণে আমার প্রায় বন্ধুই হিন্দু ছিল। সেখানে গিয়ে দেখলাম পাড়ায় পাড়ায় বইয়ের লাইব্রেরি আছে এবং বই পড়ার ব্যাপারে ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা আছে। এভাবে আমিও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ফেললাম। তখন প্রহেলিকা সিরিজ কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের রহস্য রোমাঞ্চ বই বিশেষ করে হেমেন্দ্র কুমার রায়, পাঁচকড়ি দে, সৌরিন্দ্র মোহন, নীহাররঞ্জন তাঁদের বই আমি প্রায় কয়েক মাসেই পড়ে শেষ করে ফেললাম। এরপরে একটু প্রাপ্ত-বয়স্কদের জন্য লেখা মোহন সিরিজের বই পড়া শুরু হয়ে গেল, শশধর দত্তের লেখা। সেটা ঠিক কিশোরদের জন্য লেখা না। একটু প্রাপ্ত-বয়স্কদের জন্য। কিন্তু, আমরা বন্ধুরা মিলে সেগুলো পড়েও শেষ করে ফেললাম। তার পরে আমরা, একেবারেই প্রাপ্ত-বয়স্কদের জন্য লেখা, যেমন, মনোজ বসু, তারাশংকর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, সুশীল জানা, বনফুল―এদের বই-পত্র পড়া শুরু করে দিলাম। এইভাবে পড়ার ব্যাপারে আমার মধ্যে একটা অকালপক্বতা এসে যায়। এর কারণ হিসেবে বুঝতে পারি, ঐ যে, যশোরে আমার যে বন্ধুরা, তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আর পাড়ায় পাড়ায় যে বইয়ের লাইব্রেরি ছিল,―ওসবই সহায়ক হয়েছে।

প্রশ্ন : হ্যাঁ, পরিবেশটাই ছিল বই পড়ার জন্যে অনুকূল।

হাসনাত আবদুল হাই : আমার বন্ধুরা, তারা যে খুব বড়লোক, উচ্চবিত্ত ছিল, তা না। নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির, কিন্তু তাদের মধ্যে পড়া-শোনার খুব চর্চা ছিল। এবং আড্ডার সময়ও এই পড়া নিয়ে আলোচনা হতো। যশোর থেকে যখন ফরিদপুরে গিয়ে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হই তখন পড়ুয়া বন্ধুরা তেমন ছিল না, কিন্তু পড়ার অভ্যাস তো হয়ে গিয়েছে। তাই একা একাই সতীনাথ ভাদুরী, সৈয়দ মুজতবা আলী এদের লেখা পড়তে থাকি। মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে-এর চেয়ে পঞ্চতন্ত্র যে বেশি ভালো লাগে তার পেছনে ছিল মননশীলতার প্রতি আকর্ষণ। সেই সময়, স্কুলে থাকতে একটা রচনা লিখে যে পুরস্কারের টাকা পাই তা দিয়ে কিনি পঞ্চতন্ত্র, আলাউদ্দিন আল আজাদের জেগে আছি, ধানকন্যা এই সব বই। আজাদ খুব সিরিয়াস লেখক ছিলেন। খুব প্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। দুঃখের বিষয় শেষের দিকে তার লেখায় উৎকর্ষ থাকলো না। এ ভাবেই আমার কৈশোর কাটে মানে বই পড়ার বিষয় নিয়ে যদি আলোচনা করি। এরপর ১৯৫৪ সালে ম্যাট্রিক পাস করে যখন কলেজে পড়ি, তখন কবিতা আর প্রবন্ধের বই পড়া শুরু করলাম।

প্রশ্ন : কলেজ জীবনটা কোন কলেজে কেটেছে ?

হাসনাত আবদুল হাই : ঢাকা কলেজে। মনে আছে কলেজে এসে স্কলারশিপের যে টাকা পেলাম, সে টাকা দিয়ে ‘সমর সেনের কবিতা’ সংকলন কিনলাম। বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ সংগ্রহ এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্বগত সংলাপ বই কিনলাম। তারপর, আঁন্দ্রে জিদের জার্নাল এবং সমারসেট মমের এ রাইটার’স নোটবুক বইটিও কেনা হলো। এই বইগুলো এখনও বুক শেলফে আছে, ঐ যে―(আমি তাকাই তার লাইব্রেরির দিকে, সীমাহীন এক বিস্তৃতি)

প্রশ্ন : অনেক পুরনো…।

হাসনাত আবদুল হাই : পুরনো তো বটেই। সেই ১৯৫৪-তে কেনা। তখন তো বেশি টাকা স্কলারশিপ দিত না। প্রথম গ্রেডের বৃত্তির জন্য ১৫ টাকা দিত বা ৩০ টাকা, যা হোক, সে টাকা দিয়ে এসব বই কিনলাম। (বই হাতে নিয়ে) সমারসেট মমের বইয়ের কথা বলছিলাম। সত্যি সত্যি এটা একটি লেখার নোটবই। তিনি যখন যেখানে গিয়েছেন, যা দেখেছেন সঙ্গে সঙ্গে নোট করেছেন―বেশ কিছু গল্প উপন্যাসে এসব তিনি ব্যবহার করেছেন। যেমন, তার বিখ্যাত গল্প ‘দি রেইন’ যেখানে একজন পাদ্রির মতিভ্রম হলো, পরে আত্মহত্যা করলো―এ গল্পটির সূত্রও এই নোটবইয়ে আছে। দেখা যায় যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গল্প-উপন্যাস যারা লেখেন, তারা যা লিখেন পুরোটাই কিন্তু কল্পনা না। বাস্তবে সামান্য কিছু হলেও তা ঘটে থাকে,―আমার বেলায়ও তাই হয়। মমের সব বইয়ের মধ্যে এই নোটবুকটি আমার প্রিয়। যেমন প্রিয় আঁদ্রে জিদের জার্নাল। দুজনেই খুব পরিশ্রমী এবং আন্তরিক ছিলেন। লেখার ব্যাপারে। রুশোর ‘কনফেসনের’ মতো অতটা হয়তো অবারিত ছিলেন না তারা। তবু…

প্রশ্ন : আপনিও নিয়মিত নোট করেন ?

হাসনাত আবদুল হাই : আমি ঠিক এভাবে জার্নাল মেইনটেইন করি না। তবে, হঠাৎ করে একটা ঘটনা, কি একটা সংলাপ, কি একটা দৃশ্য―যেটা আমার কাছে মনে হয় কোনো গল্প বা উপন্যাসের উপজীব্য হতে পারে―সেটা আমি আমার একটা ডায়েরিতে লিখি, পরে যখন একটা লেখার অনুরোধ আসে―নিজের গরজে আজকাল তো লেখাটেখা হয় না, যখন কেউ অনুরোধ করে, চাপ দেয়―তখন আমি ডায়েরিটা খুলে দেখি যে, আচ্ছা, এ পত্রিকার জন্য এই বিশেষ সংখ্যার জন্য কোন লেখাটা, কোন আইডিয়াটা ডেভেলপ করলে যথাযথ হবে। সেই সূত্র ধরে লেখাটা দাঁড় করাই। আর আমি যখন ভ্রমণকাহিনি লিখি, তখন আমি পুরোপুরি ডায়েরির ওপর নির্ভরশীল। একটা দেশে যাবার পর পথের দু’ধারে কি দেখছি, কার সঙ্গে কথা হচ্ছে, কি বলছি, কি শুনছি তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ডায়েরিতে নোট করি। পরে অবশ্যই বইপত্র পড়ে পড়ে এ নোট সাপ্লিমেন্ট করতে হয়। একটা দেশ সম্পর্কে সবই তো আর যা দেখলাম, যা শুনলাম-এর উপর ভিত্তি করে লিখলে হয় না। সেজন্য, সম্পূর্ণতা আনার জন্য, আমি ঐ দেশের ওপরে বইপত্র পড়ি। যেমন, আমি স্পেনের ওপর লিখেছি, তখন আমি নোট তো ব্যবহার করেছি-ই, নোটের সঙ্গে স্পেনের ওপর অনেক বই পড়েছি। যেমন, সিভিল ওয়ার বিষয়ে।

প্রশ্ন : আপনি কলেজ-জীবনে পড়বার কথা বলছিলেন।

হাসনাত আবদুল হাই : কলেজ-জীবনে আরেকজন লেখকের লেখা পড়েছিলাম, যার তিন খণ্ডের রচনাবলি এখনও আমার লাইব্রেরিতে আছে―ধূর্জটি প্রসাদ। খুবই মননশীল লেখক। ধূর্জটি প্রসাদ একজন অর্থনীতিবিদ, কিন্তু তিনি একজন সাহিত্যিক―মননশীল সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার এবং রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক প্রশংসিত একজন সঙ্গীতজ্ঞ। উনি নিজে গাইতেন না, কিন্তু সঙ্গীত বিশ্লেষণে, সঙ্গীতকে উপভোগ করার যে ব্যাকরণ―এ সম্পর্কে তার যে জ্ঞান তা অসাধারণ। কলেজে গিয়ে ধূর্জটিপ্রসাদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো, পড়া হলো। এভাবেই পড়ার ব্যাপারে এবং লেখকের ব্যাপারে একটা রুচি আস্তে আস্তে আমার মধ্যে গড়ে উঠেছে। যার উপর ভিত্তি করে বিনোদনমূলক যাঁরা লেখেন তাদের চাইতে যারা একটু চিন্তা-ভাবনা করে লিখেন, মননশীল এ ধরনের যারা, তাদের লেখার প্রতি আমার আগ্রহ ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। বিনোদনের জন্যে বই আমি পড়ি না।

প্রশ্ন : ভ্রমণের প্রতি আপনার মধ্যে গভীর আগ্রহ লক্ষ করা যায়। ভ্রমণ-সাহিত্যের মধ্যে আপনার প্রিয় বই কী ?

হাসনাত আবদুল হাই : অন্নদাশংকরের পথে প্রবাসে। এটি একটি অত্যন্ত বিদগ্ধ, মননশীল ভ্রমণ-কাহিনি। যে বইয়ে শুধু কোথায় গেলাম, কী খেলাম তার উল্লেখ নেই―চমৎকার সব বিশ্লেষণ আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পথে প্রবাসের যে ভাষা পরিশিলীত সাহিত্যিক ভাষা। ঐ সময়েই দেবেশ দাশ ইউরোপা নামে একটি ভ্রমণ-কাহিনি লিখেছিলেন। তিনি ইংল্যান্ডে পড়তেন, ছুটিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। এ বইতে তিনি তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লিখেছেন। এটিও অত্যন্ত মননশীল এবং বিদগ্ধ একটি ভ্রমণ কাহিনি। ১৯৫৪ সালে কেনা এই বইটি এখনও আমার কাছে আছে। এ বইটি আমি প্রায়ই পড়ি। এর ভাষা এতই অনবদ্য যে, বার বার পড়তে ইচ্ছে করে শুধু ভাষার জন্যে। আর কী গভীর অন্তর্দৃষ্টি! যেমন, আমি যখন স্পেনে গেলাম, তিনি স্পেন সম্পর্কে যা বলেছেন, গিয়ে দেখলাম যে, সব অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। তিনি স্পেন নিয়ে লাইব্রেরিতে বসে যে গবেষণা করেছেন, তা নয়। যা দেখেছেন, তা-ই বিশ্লেষণ করেছেন। সামান্য যা কিছু জানতেন, তার ওপর ভিত্তি করে যা লিখেছেন, তাতেই মনে হয় গবেষণা-নির্ভর ঐতিহাসিক বই―দেবেশ দাশের ইউরোপা। স্কুলে থাকতেই পড়েছিলাম একটি বই, তখনকার বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় বই যাযাবরের দৃষ্টিপাত। কলেজে এসে যখন দেবেশ দাশের ইউরোপা এবং অন্নদাশংকর রায়ের পথে প্রবাসে পড়লাম, তখন আমার মনে হলো যে, যাযাবরের দৃষ্টিপাত লিখতে গিয়ে ভাষার ব্যাপারে এ দু’জনের কাছে বেশ ঋণী। এরা দু’জন বাংলা ভাষায় যে সমস্ত নতুনত্ব এনেছেন, বৈদগ্ধ্য এনেছেন, ঔজ্জ্বল্য এনেছেন―এসবের উৎসমূল ঐ দু’জনের লেখা উল্লিখিত দু’টি বই। কিন্তু, যেখানে যাযাবর এ দু’জনকে ছাড়িয়ে গেছেন―সেটা হলো তার কৌতুক-বোধ এবং হাস্য-রসিকতা সঞ্চারে। যাযাবরের দৃষ্টিপাত আমার কাছে ভ্রমণ কাহিনির একটি মডেল। আমি এ ধরনের ভ্রমণ কাহিনি লেখার চেষ্টা করি। পারি কিনা জানি না―

প্রশ্ন : যাযাবরের লেখায় রসবোধ আছে―

হাসনাত আবদুল হাই : হ্যাঁ, সেখানে রসবোধ আছে, ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজনীতি আছে―এসব নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা আছে। তার পাশেই আবার হাস্যরস আছে, কৌতুকবোধ আছে, রোমান্টিসিজম আছে। সব মিলিয়েই একটা খুব হিউম্যান ব্যাপার, যান্ত্রিক কিছু মনে হয় না। কিন্তু অন্নদাশংকর রায়ের পথে প্রবাসে কিংবা দেবেশ দাশের ইউরোপা মনে হয় যেন, মেশিন থেকে বেরিয়ে এসেছে, রক্ত-মাংসের মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য, যাযাবরের দৃষ্টিপাত আমার কাছে একটা আদর্শ ভ্রমণ-কাহিনি এবং আমি প্রায়ই সেটা পড়ি। কিন্তু, দুঃখের বিষয়, আজকালকার ছেলেমেয়েরা বোধহয় যাযাবরের নামও শোনে নি। তার বইও মনে হয় পড়ে নি। কিন্তু বইটি এতো চমৎকার, কী বিদগ্ধ চিন্তা আর বুদ্ধিদীপ্ত ভাষা!

প্রশ্ন : এখনও ঐ বইটা থেকে অনেকেই অনেক কথা ‘কোট’ করে।

হাসনাত আবদুল হাই : করে ?

প্রশ্ন : যেমন, ‘আধুনিক বিজ্ঞান দিয়াছে বেগ, কাড়িয়া নিয়াছে আবেগ’। অনেক তরুণের মুখে এ কথা শোনা যায়।

হাসনাত আবদুল হাই : হ্যাঁ। এ ধরনের চমৎকার সব উক্তি, বাক্যবন্ধ আছে। এফোরিজম।

প্রশ্ন : যাযাবরের দৃষ্টিপাত বইটি এখনও অনেকের বাড়িতেই আছে।

হাসনাত আবদুল হাই : তাই নাকি ? চমৎকার। যা হোক ওসব বাংলা ভ্রমণ-কাহিনি পড়ার অনেক পর রবার্ট বায়রন, লরেন্স ভ্যানডার পোস্ট, পল থেরো, ব্রুস চ্যাটউইন, উইলিয়াম ডারলিম্পল, জান মরিস এদের লেখা ভ্রমণ-কাহিনি পড়ি। এরা সবাই এক এক দিকে চমৎকার। সব মিলিয়ে এদের মধ্যে রুস চ্যাটউইনের লেখা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। অস্ট্রেলিয়ার এবোরিজিনসদের দিয়ে লেখা তাঁর সংলাইনস ভ্রমণ-সাহিত্যে ক্লাসিক হবার মতো।

ইউনিভার্সিটিতে এসে আমাদের সাহিত্যচর্চা-পড়া-লেখার পরিবেশটা আরও বিস্তৃত হলো। সেখানে দেওয়াল পত্রিকা বের হতো। জহির রায়হান বের করতেন একটা। পাশপাশি আমার সম্পাদনাতে একটা।

প্রশ্ন : এটা কি ক্যাম্পাসে ?

হাসনাত আবদুল হাই : হ্যাঁ, ক্যাম্পাসে। এটা এখন মেডিক্যাল কলেজ হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সামনেই গাড়ি বারান্দার দেয়ালে হাতে লেখা গল্প-কবিতা শোভা পেত। আমরা এসে দেখে ঠিক করলাম আমরাও একটা দেওয়াল পত্রিকা বের করব। সে উপলক্ষে লেখা যোগাড় করা, সম্পাদনা এসব চলত। পাশাপাশি আমরা সাহিত্য-সভাও করতাম। সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হতো। এভাবে ঐ সময় ক্যাম্পাসে শিশু-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার একটা খুব সুস্থ পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। প্রতিযোগিতা ছিল। কে ভালো গল্প লিখতে পারে, কে ভালো বক্তৃতা দিতে পারে, কে ভালো কবিতা পড়তে পারে। ঐসব সাহিত্য-সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা সভাপতিত্ব করতেন। ক্লাস শেষে ৫টার পরে, বিশাল একটা রুমে সভা বসতো। এ রকম সাংস্কৃতিক একটা পরিবেশ ছিল তখন। যার জন্য বই পড়া, বই লেখার একটা প্রেরণা ছিল। তখন অবশ্য পত্র-পত্রিকা অনেক কম ছিল। মাহে নও বলে একটা পত্রিকা ছিল। মোহাম্মদী অনিয়মিতভাবে বেরোত। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রবাহ নামে একটা পত্রিকা বের করতেন, পরে মেঘনা বের করতেন। আহমদ মীর বার করতেন স্পন্দন নামে লিটল ম্যাগাজিন। বোধ করি এদেশের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন। সেখানেই প্রথম সৈয়দ শামসুল হকের লেখা পড়ি। তখন খুব রোমান্টিক গল্প-উপন্যাস লিখতেন তিনি। আহমদ মীরও লিখতেন। তাঁর একটা গল্পের নাম ছিলো ‘ধোবিয়া তলাও’। রমাপদ চৌধুরীর আদলে লেখা।

প্রশ্ন : তখন আর কারা লিখতেন ? পড়তেনই বা কাদের লেখা ?

হাসনাত আবদুল হাই : সে সময়ে যারা লিখতেন মানে তখন যাদের গল্প উপন্যাসের বই দেখতাম,―তারমধ্যে শওকত ওসমানের গল্প-উপন্যাস, সরদার জয়েনউদ্দিন-এর, আবু রুশ্দ-এরও বই বেরোত, তবে কম। আর সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন অস্তিত্ববাদী ধারার লেখক। জহির রায়হান, গাফ্ফার চৌধুরী। জহির রায়হান আমার প্রিয় লেখক হয়ে আছেন। তারপর হঠাৎ করে রশীদ করীমের উপন্যাস আমরা পেলাম, উত্তম পুরুষ, প্রসন্ন পাষাণ। এর আগে তার নাম শুনিনি। দুটোই খুব আধুনিক আর বড় মাপের বই। ভাষার ব্যাপারে তার বেশ বৈদগ্ধ্য আছে―আভিজাত্য আছে। রশীদ করীম তখন থেকেই আমার প্রিয় লেখক হয়েছেন। শামসুদ্দিন আবুল কালাম, তার উপন্যাসও আমি পড়েছি। তার কিছু কিছু গল্প আমার খুব ভালো লেগেছে―যেমন ‘অনেক দিনের আশা’, ‘একটি বারবণিতার গল্প’। তার লেখার মধ্যে গ্রাম বাংলার ছবি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

প্রশ্ন : কাশবনের কন্যা।

হাসনাত আবদুল হাই : কাশবনের কন্যা, উপন্যাস। মৃত্যুর পর বেরিয়েছে তার এপিক উপন্যাস কাঞ্চনগ্রাম। তিনিও আমার প্রিয় লেখক ছিলেন। সরদার জয়েনউদ্দিনের উপন্যাস তো বটেই, গল্পেও গ্রাম-বাংলা বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে―গ্রামীণ জীবন এদের লেখায় যতটুকু পাওয়া যায়, আজকালকার লেখকদের লেখায় সেভাবে পাওয়া যায় না। গ্রামীণ জীবন নিয়ে হাসান আজিজুল হক, আবু বকর সিদ্দিক কিছু সার্থক ছোটগল্প লিখেছেন। ড্রাইভার- হেলপারদের নিয়ে লেখা শওকত আলীর ছোটগল্পও সফল।

প্রশ্ন : কবিতা পড়া হতো না ?

হাসনাত আবদুল হাই : কলেজে সমর সেন, জীবনানন্দ দাশ আর বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পড়েছি। জীবনানন্দ বেশ প্রভাব ফেলেছিলেন তার স্বপ্নময়তা আর নিভৃতির অবগাহনে। বাংলাকে মনে হয়েছে সত্যি রূপসী, এমন তার বর্ণনা। তবে আমি কবিতার ব্যাপারে অত আগ্রহী ছিলাম না। যদিও ইউনিভার্সিটিতে এসে ছড়া লিখেছিলাম। কবিতার বই খুব একটা পড়তাম না। ঐ সময়ে কবিতার বই খুব নয়, কিছু বেরিয়েছে, তবে কবিরা বেশ সক্রিয় ছিলেন। যেহেতু আমি নিজে কবিতা লিখতাম না, তাই কবিতার প্রতি আগ্রহ কমই ছিল। আমার পড়াশোনা বিশেষ করে গল্প-উপন্যাসেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে শামসুর রাহমানের রোমান্টিক সব কবিতা, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ছড়ায় মুগ্ধ হয়েছি কবিতার ব্যাকরণ না বুঝেই। সেই সময় শামসুর রাহমানের ‘রূপালী স্নান’ কবিতাটিকে মনে হয়েছে কবি-সাহিত্যকদের ঘোষণাপত্রের মতো।

প্রশ্ন : বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বিদেশি সাহিত্যেরও সংস্পর্শ পেয়েছিলেন ?

হাসনাত আবদুল হাই : হ্যাঁ। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বিদেশি সাহিত্যের প্রতি খুব আগ্রহ জন্মালো। টলস্টয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস পড়া হলো। ডস্টয়ভস্কি দারুণ প্রিয় হয়ে গেলেন। গোর্কির মা, অভিভূত করে ফেলল। সলোকোভের ধীরে বহে ডন, পার্ল বার্কের গুড আর্থ-ও ঐ সময়ে পড়ি। এরপর ফরাসি লেখকদের প্রতি দারুণ আকর্ষণ বোধ করি। সাঁর্ত্রে, কামু, আঁদ্রে ব্রেঁতো, লুই আরাগঁ, জাঁ কতোঁ, আন্দ্র্ েজিদ, ফ্লবেয়ার। এদের মধ্যে সাঁর্ত্রে আর কামু প্রিয় হয়ে থাকেন শেষ পর্যন্ত, তাদের উপন্যাসেও দর্শন আছে অস্তিত্ববাদ, এলিয়েশনে ইত্যাদি। কাফকার গল্প-উপন্যাস তীব্রভাবে কাছে টানে। তাঁর সব বই আমি তখন পড়েছি―সব বইয়ের সংগ্রহ আছে আমার কাছে। এই সব লেখকদের পাশাপাশি ইংরেজ লেখক ডি এইচ লরেন্স, ব্রন্টি ভগিনীদ্বয়, জর্জ এলিয়ট, কনরাড, জর্জ অরওয়েলের বই ঐ সময়ে পড়া হয়ে যায়। এইভাবে দেশি সাহিত্য, বিদেশি সাহিত্য একসঙ্গে পড়ে যাচ্ছিলাম সে সময়ে কিন্তু পশ্চিম বঙ্গের সাহিত্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ছিলাম।

প্রশ্ন : কেন, কি কারণে ?

হাসনাত আবদুল হাই : ঐ সময়ে মানে ষাটের দশকে পশ্চিম বাংলার বই               আসতো না। যা পড়েছি সেই স্কুলের ছাত্র জীবনে―বনফুল, তারাশংকর, মানিক। এরপরে যে একটা গ্রুপ এসেছে―তার খবর রাখতাম না, বইও পাওয়া যেত না, পড়তামও না। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সাল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন―এই সময়কালে আমাদের নিজেদের লেখকদের মানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের লেখকদের লেখাই বেশি পড়েছি―সরদার জয়েনউদ্দিন, রশীদ করীম, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শামসুদ্দিন আবুল কালাম, আবু রুশ্দ, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, জহির রায়হান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, টিপু সুলতান, শওকত আলী, এদের লেখা। পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের প্রতি তখন আমার আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। কারণ, বিদেশি বইÑটই টঝওঝ লাইব্রেরিতে, ব্রিটিশ কাউন্সিলে পাওয়া যাচ্ছে, নিউ মার্কেটের বিভিন্ন দোকানে পেঙ্গুইন সিরিজের, সিগনেটের বই সাড়ে তিন শিলিং আর পঁচিশ কি পঞ্চাশ সেন্ট দিয়ে পাওয়া যেত। ঐ সময়ে আমার পড়ার ব্যাপারে এভাবে বেশ বৈচিত্র্য এলো। শুধু উপন্যাস-গল্প নয়। যেমন টয়েনবি―টয়েনবির যে ইতিহাস, সেটা আমাকে বেশ মুগ্ধ করে ফেললো―‘স্টাডি অফ হিস্ট্রি’ দর্শনও, উইল ডুরান্তের ‘দি স্টোরি অব ফিলোসফি’, বিজ্ঞান বিষয়েও কিছুটা আগ্রহ দেখা দিল। বিশেষ করে ডারউইনের তত্ত্ব। মহাকাশ নিয়ে তখন অবশ্য কার্ল সাগান, স্টিফেন হকিং, পল ডেঙিস বা ওয়াহিন বার্গের পপুলার সায়েন্স বই বের হয় নি। কসমোলজি নিয়ে আমার আগ্রহ, সম্প্রতি বই পাবার সুযোগ হয়েছে। বিজ্ঞান-ইতিহাস এবং শিল্প। শিল্প বলতে আর্ট। আর্টের বিভিন্ন বই পড়লাম। যেমন, আরভিং স্টোন পড়লাম, আরভিং স্টোনের ‘লাস্ট ফর লাইফ’-এ ভ্যান গগের যে জীবন, তা পড়ে শিল্পীদের প্রতি আগ্রহ জন্মালো। তারপর থেকেই, শিল্পীদের প্রদর্শনী দেখতে যেতাম। তাদের ওপর লেখা বইপত্র পেলেই পড়তাম―

প্রশ্ন : লাস্ট ফর লাইফ বইটি পড়ার প্রভাব থেকেই এটা হলো ?

হাসনাত আবদুল হাই : এই বইটা পড়ার ফলেই। আমার মনে হলো শিল্পীদের জীবন তো খুব কষ্টের, ত্যাগের। বাইরে থেকে মনে হয় গ্ল্যামারাস। অথচ গ্ল্যামারাস তো নয়। বেশ কষ্টের―পরিশ্রমের, বেশ ত্যাগের। খুব সাফারিং আছে ওদের লাইফে। তারপর থেকেই ওদের জীবন, ওদের শিল্পকর্মের প্রতি আমার বেশ আগ্রহ জন্মালো। শিল্পের ওপর প্রচুর বই পড়তে শুরু করলাম, শিল্প বোঝার চেষ্টা করলাম! এসব বইয়ের মধ্যে ভাসারির লেখা লাইভস অফ দি আর্টিস্টস এবং হারবার্ট রিডের মিনিং অফ আর্ট উল্লেখযোগ্য। হারবার্ট রিড আমার প্রিয় শিল্প-সমালোচক। এরপর ’৬০ সালে আমি আমেরিকায় চলে যাই।

প্রশ্ন : পড়া-শোনাতেও নিশ্চয়ই বড় ধরনের একটা বাঁক এল ?

হাসনাত আবদুল হাই : ব্যাপকভাবে। ঐ দেশে গিয়ে আমেরিকান সাহিত্য, বিশেষ করে বিট জেনারেশনের যে দিকপাল জ্যাঁক ক্যারুয়াক, লরেন্স মার্লেনগেতি, অ্যালেন গিপ্সবার্গ এদের বইপত্র খুব পড়লাম। ক্যাম্পাসে বিটদের একটা গ্রুপ ছিল। তাদের সঙ্গেও আমার বেশ দেখাশোনা, আলোচনা হতো। বিট জেনারেশনের বই আমি ওখানে খুব পড়লাম। পাশপাশি অবশ্য মূলধারার যাঁরা ছিলেন তাদের লেখাও পড়লাম।

প্রশ্ন : ফক্নার―

হাসনাত আবদুল হাই : ফক্নার, স্টেইনব্যাক, জন ডল্স প্যাসেস, মেলভিল, থিওডর ড্রেইজার, হেনরি জেমস, সিনক্লেয়ার লুইস, হেমিংওয়ে, সেলিঞ্জার, র‌্যালফ এলিসন, ট্রুমান ক্যাপোর্ট, নেলসন আলগ্রেন, এইসব লেখকের বই। মোট কথা, আমেরিকায় যাঁরা প্রধান ঔপন্যাসিক ছিলেন তাদের বই পড়লাম। এদের মধ্য হেমিংওয়ে, সেলিঞ্জার, ট্রুমান ক্যাপোর্ট আর র‌্যালফ এলিসন প্রিয় হয়ে গেলেন। হেমিংওয়ে দি ওল্ড ম্যান এ্যান্ড দি সি, ট্রুমান ক্যাপোর্টের গল্পগ্রন্থ আদার ভয়েসেজ, আদার রুমস। র‌্যালফ এলিসনের ইনভিজিবল ম্যান পড়ি। ঐ সময় একটা বই পড়লাম,―জেমস অ্যাগি বলে একজন সাংবাদিকের লেখা বই, লেট আস্ প্রেজ দি ফেমাস―এটা হলো ঐ যে, ওকলাহোমায়, যখন খরার সময়, তিনি ওখানে গিয়েছিলেন। গিয়ে কিছু কিছু চরিত্রের তিনি ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন, তারা যে ওখানে অসম সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিকূল পরিবেশে লড়াই করে যাচ্ছে। এদের ব্যাপারে উনি বললেন যে, এরাই হলো হিরো লেট আস্ প্রেজ দি ফেমাস। এদেরই ইতিহাসের আসল নায়ক হওয়া উচিত। এ বইটা আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল। বইটি পড়ার কিছুদিন পরই, আরেকটি সমসাময়িক ঘটনা; ক্যালিফোর্নিয়ায় কিছু সস্তা শ্রমিক আসত মেক্সিকো থেকে, ইল্লিগ্যাল। ওরা এসে ভেজিটেবল, টমেটো এগুলো হারবেস্ট করত। ওদেরকে ঠিক সরকারি যে হারে মজুরি দেওয়ার কথা, তা দেওয়া হতো না। নানানভাবে এক্সপ্লয়েট করা হতো। এর উপর একটা টেলিভিশন ফিল্ম হয় ‘বিটার হারভেস্ট’ নামে, ওটার সঙ্গে স্টেইনব্যাকের ‘গ্রেপস অব র‌্যাথস’-এর একটা সাদৃশ্য আছে―একই ব্যাপার প্রায়। আমেরিকায় গিয়ে এভাবেই অনেক আমেরিকান গল্প-উপন্যাস পড়া হলো। লেখকদের মধ্যে জ্যাঁক ক্যাকোয়াক-এর বেশ ভক্ত হয়ে গেলাম। তার ‘অন দ্য রোড’, ‘ধর্মবাম’, ‘সাবতারিয়ান’―এগুলো পড়েছি। মূলধারার বাইরে হলেও বেশ শক্তিশালী তার লেখা। আর বিট কবিদের মধ্যে গিনসবার্গের ‘হাউল’ তো তখনই দারুণ তোলপাড় তুলেছিলো। ‘আই হ্যাভ সিন দ্য বেস্ট মাইন্ড অফ মাই জেনারেশন গন রেভিং ম্যাড’, কি বলিষ্ঠ উচ্চারণ দ্রোহের এই সব কথায়।

প্রশ্ন : শুধুই কি পড়তেন ? লেখালেখি ?

হাসনাত আবদুল হাই : তখন আমি লিখতাম না। বলতে গেলে লেখা ছেড়ে দিয়েছি। ১৯৬০-এ বিদেশ যাওয়ার পর আমি আর লিখিনি। বিট-দের যে জীবন দর্শন―ঘুরতে হবে, বন্ধনমুক্ত হয়ে থাকতে হবে, এটা আমাকে মোটামুটি একটা বোহেমিয়ান লাইফে নিয়ে যেতে প্রভাবান্বিত করেছে। ঐ সময়, আর্থার মিলারের নাটক সব আমি পড়লাম। আর্থার মিলার-এর ডেথ অব এ সেলসম্যান, ইউ ফ্রম দ্য ব্রিজ দ্য ক্রসিবল―যেটা সালেমের উইচ হানটিং নিয়ে লেখা। কিন্তু, একচুয়্যালি বইটা রূপক। ঐ বইয়ের মাধ্যমে উইচ হানটিং বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ম্যাককাথিজমকে। ষাটের দশকের আগে ম্যাকার্থি নামের এক সিনেটর বিভিন্ন মহলে শিল্পী-সাহিত্যিক -অভিনেতা-রাজনীতিকদের মধ্যে কে কমিউনিস্ট এটা নিয়ে সাংঘাতিক একটা বিচার এবং জেরার ব্যবস্থা করেন―ওটার ওপর ভিত্তি করে আর্থার মিলার দ্য ক্রুসিবল নাটকটি লেখেন। অবশ্য তার সবচাইতে বিখ্যাত নাটক হলো, ডেথ অব এ সেলসম্যান। এটা ক্লাসিক। এই নাটকটিও আমার দেখার সৌভাগ্য হলো। এবং আর্থার মিলার আমার একজন প্রিয় লেখক হয়ে গেছেন। যদিও আমি এর আগে কোনো নাটক পড়িনি এবং নাট্যকারের প্রতি আগ্রহ ছিল না। কিন্তু, এরপর আর্থার মিলারের সব বই কিনলাম, পড়লাম। আর্থার মিলার একটা ফিল্ম স্ক্রিপ্ট লেখেন, পরে বইয়ের আকারে বেরিযেছে। ওটাও পড়ার মতন। ক্লার্ক গ্যাম্বল ছিলেন প্রধান চরিত্রে আর মেরেলিন মনরো হলো নায়িকা। আর্থার মিলার সত্তর দশকের পরে আরও একটি স্ক্রিপ্ট লিখেছেন, ‘আফটার দ্য ফল’―এটা লিখেছেন তিনি তার প্রয়াত’ স্ত্রীকে নিয়ে। একজন অভিনেত্রী, কিভাবে আস্তে আস্তে মানসিক বৈকল্যের শিকার হচ্ছে এই বিশ্লেষণ নিয়ে বই―এটা লেখার জন্য তিনি খুব সমালোচিত হয়েছেন, যে, তার নিজের একজন কাছের মানুষ, হতে পারে ডিভোর্স হয়েছে,―একজন খুব নিকটের মানুষের প্রাইভেসিকে তিনি এক্সপোজড করলেন, ব্যবহার করলেন―এজন্যে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। ঠিক ইদানীং যেমন কাগজে পড়লাম।

প্রশ্ন : ইংল্যান্ডের রাজ কবি…

হাসনাত আবদুল হাই : ইংল্যান্ডের নোবেল লরিয়েট টেড হিউজ সম্পর্কে যে, তিনি তার স্ত্রী সিলভিয়া প্লাথের উপরে বিভিন্ন কবিতা লিখেছেন যাতে প্লাথের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুন্ন হয়েছে। এটা নিয়েও লোকে কিছুটা সমালোচনা করেছে। যাহোক, ঐ সময়ে গল্পকার ঔপন্যাসিকদের পাশাপাশি নাট্যকার আর্থার মিলার আমাকে মুগ্ধ করেছে। এরপরে আমি অন্য নাটকও পড়া শুরু করলাম। যেমন, টেনেসি উইলিয়ামসের নাটক। হয়তো তার নাটকে তেমন গভীরতা নেই, কিন্তু বেশ সমসাময়িক এবং বুদ্ধিদীপ্ত, ক্যাট অন এ হট টিন রুফ, নামগুলোই কি চমৎকার, সাডেনলি লাস্ট সামার, স্ট্রিট কার নেম্ড্ ডিজায়ার। তাঁর অনেকগুলো নাটকই পরে সিনেমা হয়েছে। তাঁর অনেক নাটক এখনও আমার লাইব্রেরিতে রয়েছে। ইউজিন ও নীল অবশ্য টেনেসি উইলিয়ামের চেয়েও বুদ্ধিদীপ্ত, তার লেখা দি মিল্ক ট্রেন ডাজ নট স্পপ হিয়ার এনি মোর পড়ার পর খুব অভিভূত হই। পরে সিনেমা দেখি―বেশ বিমূর্ত চিন্তা, দার্শনিক ব্যাপার-স্যাপার। তবে আমেরিকান নাট্যকারদের মধ্যে মিলারই আমার প্রিয়। তারপরই এডওয়ার্ড এলবি। তিনি বেশ পরে এসেছেন।

প্রশ্ন : মূলধারার বাইরে আমেরিকান আর কোন লেখকের লেখা পড়েছেন তখন ? কারা প্রিয় ছিলেন তাদের মধ্যে ?

হাসনাত আবদুল হাই : বিট-জেনারেশনের কথা তো বলেছি। মূলধারার বাইরে গোষ্ঠীবদ্ধ না, প্রায় একাকী সাহিত্যচর্চা করেছেন এদের মধ্যে উইলিয়াম বারোজ ড্রাগ খাওয়ার পর প্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন দি নেকেড লাঞ্চ এবং এরপর মেথড রাইটিং নামে নিরীক্ষামূলক উপন্যাস দি টিকেট দ্যাট এক্সপ্লোডেড। অনুকরণীয় কিছু নয় কিন্তু পড়তে ভালো লাগে ব্যতিক্রমী হওয়ার জন্য। আর যৌনতা নিয়ে বাড়াবাড়ির জন্য যিনি কুখ্যাত হয়ে যান ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সারের’ লেখক হেনরি মিলার তার সব বইও পড়ি তখন। তেমন সাহিত্যমূল্য নেই, তবে পড়তে কষ্ট হয় না। ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সার’-এ প্যারিস শহরের রাস্তা, অলি-গলির যে বিশদ বর্ণনা তাতে কোনো ট্রাভেল গাইডের প্রয়োজন পড়ে না। আমার ভ্রমণ-কাহিনিতে রাস্তাঘাট, পারিপার্শ্বিকের যে বিশদ বর্ণনা দিই সেটা অনেকটা তার প্রভাবে বলা যায়।

প্রশ্ন : আমেরিকা পর্বের পর ? দেশে ফিরে এলেন―এরপর ?

হাসনাত আবদুল হাই : এরপর, ’৬২-র দিকে আমি ইংল্যান্ড চলে আসি, এমনি বেড়াবো কিছু দিন এমন পরিকল্পনা ছিলো। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে থেকে গেলাম। বললাম না, বোহেমিয়ান ভাব এসে গেছিল। সেখানে দু’বছর মানে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত থাকি। ইংল্যান্ডে এসে আবার আরেক গ্রুপ ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যানদের’ লেখার সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পেলাম। জন অসবর্ন, এলান সিলেটো, ওয়েসকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক এইসব কয়েকজন। এদের লেখা আমি পড়তে শুরু করলাম, জন অসবর্নের লুক ব্যাক ইন অ্যাঙ্গার নাটকটিকেই ধরা হয় এদের মানিফেস্টো বলে।―অ্যাংরি ইয়াংম্যান, এই গোষ্ঠীটির বিদ্রোহ হলো ওয়েল ফেয়ার স্টেট ইংল্যান্ডে কোন চ্যালেঞ্জ নেই। সবকিছু রাষ্ট্রই করছে। এটার ব্যাপারে তাদের একটা বিদ্রোহ, ক্ষোভ যে, সেখানে আর কিছু করার নাই। সব গভর্নমেন্ট করে দিচ্ছে। একটা অতৃপ্তি―জন অসবর্ন, আর্নেন্ড ওয়েস্কার এঁরা নাটকের মাধ্যমে রাগী যুবকদের দর্শনকে তুলে ধরতে লাগলো। আর ঔপন্যাসিক এলান সিলিটের স্যাটারডে নাইট এ্যান্ড সানডে মর্নিং উপন্যাসের নায়ক হলো এই বিদ্রোহী প্রজন্মের প্রতিভূ। শুনেছি আমাদের এখানে বিশেষ করে কোলকাতাতে তখন এদের একটা অনুগামী দল সৃষ্টি হয়েছিল। আমি যখন ইংল্যান্ডে গেলাম, তখন অ্যাংরি ইয়াংম্যানদের খুব প্রতাপ। বিশেষ করে নাটকে। এদের নাটক পড়েছি, কিছু কিছু নাটক দেখেছি―সব নাটক তো আর দেখতে পারি নি। কারণ, টিকেটের খুব দাম। তবু, যতটা পেরেছি দেখেছি। তখন ওরাও আমাকে বেশ ইনফ্লুয়েন্স করেছে, এই জন্য যে, ওরা একটা নতুন জিনিস করছে। ঐ সময়ে আরেক ধরনের বই ইংল্যাণ্ডে আমার পড়ার এবং দেখার সুযোগ হয়েছে। সেটা হলো, অ্যাবসার্ড সমস্ত নাটক; আয়েনেস্কো, বেকেট―এদের নাটক দু’একটি দেখেছি। সব দেখার মত সচ্ছলতা আমার ছিল না। তবে, তাদের বই আমি কিনেছি, বেকেটের প্রায় সব বই আমার আছে, তার উপন্যাসগুলো আমার বেশি প্রিয়। লণ্ডন প্রবাসের এই দু’বছরে, মেইনস্ট্রিম থেকে একটু আলাদা হয়ে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, এ ধরনের যারা লেখে, তারা আমাকে বেশ আকর্ষণ করলো। এ কারণেই আয়েনেস্কো, বেকেট―এদের নাটক পড়তে শুরু করি। ১৯৬৪-তে কেনা ওয়েটিং ফর গডো বইটি এখনও আমার সংগ্রহে আছে। বইটি কিনে পড়ার পর নাটকটি আমি দেখতেও গিয়েছিলাম। তখন খুব একটা বুঝতে পেরেছি বলবো না। কিন্তু, ব্যাপারটি যে খুব সিরিয়াস এবং এরমধ্যে যে একটি দর্শন আছে, তা বেশ বোঝা গেছে। ইংল্যান্ডের সেই দু’বছর আমার জন্যে বেশ ফলপ্রসু ছিল, পড়ার দিক দিয়ে প্রোডাকটিব ছিল। আমি কিন্তু তখন লিখিনি। এই যে আমেরিকায় দু’বছর থাকলাম, ইংল্যাণ্ডে দু’বছর থাকলাম এসময়ে আমি কিছুই লিখিনি; নোট-ফোট কিছুই না―শুধু পড়েছি; কোনদিন যে আবার লিখবো, সে ধারণাও আমার মনে আসেনি।

প্রশ্ন : এর আগে কি কিছু লিখেননি ?

হাসনাত আবদুল হাই : লিখেছি। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিদেশে যাবার আগে। তবে প্রকাশিত বই ছিল না। অনেক গল্প লিখেছি। দু’তিনটা উপন্যাস লিখেছি। ১৯৬০ সালে। পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায়, উপন্যাস বেরিয়েছে। রোমান্টিক―উপন্যাস সাগর থেকে ফেরা। অরণ্য নগরটা অবশ্য একটু সিরিয়াস ছিল―গ্রামীণ পটভূমি। গ্রাম বদলে যাচ্ছে রাস্তা হচ্ছে―এ ধরনেরই একটি কাহিনি। কোন বই ছাপা হয়নি। তখন বই প্রকাশ করাটা অত সহজসাধ্য ছিল না―এত প্রকাশক ছিল না। আর আমারও আগ্রহ ছিল না পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের কাছে ধর্ণা দেওয়ার। যাই হোক, ইংল্যান্ডে ঐ দু’বছর নাটক দেখে, অ্যাংরি ইয়াংম্যানদের বই পড়ে আমার বেশ কাটল। ঐ সময় বেকেট আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছিল। তাঁর লেখার শৈলী, বিশেষ করে অগতানুগতিক সংলাপ আমার খুব ভালো লেগেছিল। কিংসলে আমিস, মার্টিন এমিস তাঁর ছেলে―সেও ঔপন্যাসিক হয়েছে। মার্টিন এমিস-এর বাবা কিংসলে আমিস-এর লেখা অতটা ভালো না হলেও মোটামুটি পর্যায়ের। জন ব্রেইনের রুম অ্যাট দ্য টপ সাড়া জাগিয়েছিল। পরে সিনেমাও হয়। কিন্তু ঐ দলের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে এলান সিলিটোই ছিল আমার প্রিয়। তার দুটো উপন্যাসই সিনেমা হয়েছে। ১৯৬৪-এর মাঝামাঝি আমি দেশে চলে আসি। কিছুদিন অধ্যাপনা করলাম। ঐ এক বছর খুব একটা পড়াশোনা হয়নি। কারণ, আমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এরপর সরকারি চাকুরিতে ঢুকলাম।

প্রশ্ন : আবার নিশ্চয়ই পূর্ণ উদ্যমে পড়াশোনা শুরু হলো ?

হাসনাত আবদুল হাই : না। পড়া কম হয়েছে। যা পড়েছি তাও ইতিহাসের বই―বিশেষ করে কলোনিয়াল হিস্ট্রি। এগুলি খুব পড়েছি। পেন্ডোরাল মুনের ‘ডিভাইণ্ড এন্ড কুইট’। ফিলিপ উডবাফের ‘দি ম্যান হু রুলড ইন্ডিয়া’ আরও একজন যার নাম এই মুহূর্তে মনে আসছে না। তাঁর লেখা দি গ্রেট ডিভাইড, দেশ বিভাগের ওপর এইসব বই। তারপর, ব্রিটিশ কলোনিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের বেশ কিছু লেখা―সব ইতিহাসগামী লেখা। এই সময়ে সুইডিস অর্থনীতিবিদ গুনার মরডালের তিন খণ্ডে লেখা দি এশিয়ান ড্রামা বইগুলো পড়ে ফেলি। আমি অর্থনীতির ছাত্র, তিনি আমার প্রিয় অর্থনীতিবিদ। এরপর আমি যখন চাকুরির সুবাদে পশ্চিম পাকিস্তানে থাকি তখন পশ্চিম পাকিস্তানি লেখক সাদত হাসান মান্টো, পশ্চিম পাকিস্তানি বলবো না, উর্দু ঔপন্যাসিক; খাজা আহমদ আব্বাস, ইসমাত চুগতাই, কৃষণ চন্দর―এদের বই কিছু কিছু অনুবাদ পেয়েছি ইংরেজিতে। সেগুলো পড়েছি। বিশেষ করে সাদত হাসান মান্টোর লেখা আমার খুব ভালো লেগেছে। সাদত হাসান মান্টো আমার প্রিয় লেখক। ১৯৭১ সালে, স্বাধীনতার পরে, লেখার প্রতি আমার আবার আগ্রহ হলো। তখন চারদিকে সৃজনশীলতার একটা প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে―নাটক হচ্ছে, নাট্যোন্দোলন হচ্ছে, কবিরা কবিতা পাঠ করছে। ছাত্র জীবনে ইউনিভার্সিটিতে এসে আমরা যেরকম এবং উৎসাহ নিয়ে কাজ করেছি, পরিবেশটা তখন সেরকমই। ঐ সময়ে আবার, যেহেতু আর কোনো বিধি-নিষেধ নেই, এই প্রথম শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু, সমরেশ বসু, মহাশ্বেতা দেবী, কমলকুমার মজুমদার এইসব পশ্চিম বাংলার লেখকদের বইপত্র আসা শুরু করল। আমি ওঁদের লেখা পড়লাম। এদের মধ্যে কমলকুমার মজুমদার, মহাশ্বেতা দেবী, সমরেশ বসুর লেখা আমাকে বেশ প্রভাবান্বিত করল। এদের মধ্যে কমলকুমার আমার প্রিয় লেখক হয়ে গেলেন তার গদ্যের জন্য, তীক্ষè দৃষ্টিভঙ্গীর গুণে।

প্রশ্ন : সমরেশ বসু আর কমলকুমারের কোন বইগুলো পড়েছিলেন তখন ?

হাসনাত আবদুল হাই : মহাকালের রথের ঘোড়া, বাঘিনী এইসব। তার একটা ছোটগল্প তো দারুণভাবে চমকে দিয়েছিল ‘সানা বাউরীর কথকতা’। মারাত্মক ছোটগল্প ইনসেস্ট নিয়ে লেখা। তিনি ছোটগল্পও খুব ভালো লিখেছেন। কমলকুমারের অন্তর্জলী যাত্রা, সুহাসিনীর পমেটম এই সব। ইদানীং, এখন যারা পশ্চিম বাংলায় লিখছেন তাদের মধ্যে জগদীশ মিশ্র, অনিল ঘড়াই, তারপর দেবেশ রায়,―দেবেশ রায়ের লেখায় নতুনত্ব আছে। খুব জীবনমুখী লেখক। দেবেশ রায়কে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে এখন, পশ্চিম বাংলায় যারা লিখছেন তাদের মধ্যে। তিস্তাপারের বৃত্তান্ত খুব শক্তিশালী লেখা। তাঁর লেখার মধ্যে নতুনত্ব আছে, মুন্সীয়ানা আছে, আর খুব জীবনঘনিষ্ঠ এবং বাস্তববাদী। তিনি আমার একজন প্রিয় লেখক। জগদীশ মিশ্র―তার লেখায় লোককথা, পুরাণ এগুলোকে নিয়ে এসে বেশ একটা নতুন শৈলী সৃষ্টি করেছেন।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে ভালো লাগে কার লেখা ?

হাসনাত আবদুল হাই : বাংলাদেশে অবশ্যই আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ―তাঁর লেখায় আভিজাত্য আছে, নতুনত্ব আছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রবণতা আছে। শক্তিশালী লেখক। তার লালসালু, চাঁদের অমাবস্যা, কাঁদো নদী কাঁদো,―এসব উপন্যাস একেকটি ক্ল্যাসিক। জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের কিছু লেখা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কিছু লেখা বেশ ভালো লাগে। হাসান আজিজুল হকের কিছু লেখা, আবু বকর সিদ্দিকের কিছু লেখা, সৈয়দ শামসুল হক-এর কিছু লেখা, সেলিনা হোসেন-এর কিছু লেখা, শওকত আলীর কিছু লেখা, মাহমুদুল হক-এর কিছু লেখা, রিজিয়া রহমান, রাবেয়া খাতুনের এবং রাহাত খানের কিছু লেখা ভালো লাগে। এতবার ‘কিছু লেখা’ বললাম এই জন্য যে তাঁদের সব লেখাই আমার ভালো লাগে না, এটাই স্বাভাবিক।

আর, আমাদের চেয়ে বয়সে কম, এদের মধ্যে ইমতিয়ার শামীম, নাসরীন জাহান। কনিষ্ঠ লেখকদের মধ্যে নাসরীন জাহানকে আমি অত্যন্ত উঁচুদরের লেখক বলে মনে করি। খুবই শক্তিশালী। আমাদের সমাজে একজন মেয়ে কি করে তার অভিজ্ঞতার এত ব্যাপকতা আনতে পারে লেখায় এবং এত নিষ্ঠার সঙ্গে, এত ট্রথফুলি, এত সত্যনিষ্ঠভাবে―এটা ভাবলে অবাক লাগে। আমরা পুরুষরা অভিজ্ঞতা নানাভাবে অর্জন করতে পারিÑ ইচ্ছেমতো এখানে সেখানে যেতে পারি। কিন্তু, একটা মেয়ের পক্ষে এ সুযোগ নেই। ওঁর যে লেখা, সে লেখার মধ্যে যে বক্তব্য, যে ঘটনা, যে পরম্পরা, চরিত্রের যে চিত্রণ তা এত জীবন ঘনিষ্ঠ―মনে হয় যেন ঐসব জীবন সে নিজেই যাপন করে এসেছে। আর ঐ ছেলেটার নাম কি, আমি ভুলে গেলাম, যে লিখেছে ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’―

প্রশ্ন : শহীদুল জহির।

হাসনাত আবদুল হাই : হ্যাঁ, শহীদুল জহির। শহীদুল জহির খুব শক্তিশালী লেখক এবং তার লেখায় নতুনত্ব আছে, গতানুগতিক না। আরেকটি ছেলে, আমি নাম মনে করতে পারছি না। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোতে চাকরি করে।

প্রশ্ন : ওহ! ওয়াসি আহমেদ।

হাসনাত আবদুল হাই : হ্যাঁ, ওয়াসি আহমেদ। ওয়াসি আহমেদ-এর লেখাও আমার খুব প্রিয়। সে-ও খুবই শক্তিশালী লেখক। কম লিখে, কিন্তু ভালো লেখে। ওয়াসি আহমেদের লেখা আমি প্রথম পড়েছি ঈদসংখ্যা বিচিত্রায়, উপন্যাস। গল্পও পড়েছি। দুটোতেই সিদ্ধহস্ত। এরপরে, আরেকটি উপন্যাস সে লিখেছিল সেটা অবশ্য অতটা আমার ভালো লাগেনি। কিন্তু, ওয়াসি আহমেদ নতুনদের মধ্যে ভালো লেখে। ওর বয়স কতো আমি জানি না। আমার সঙ্গে পরিচয় নেই। তবে তার আরও লেখা উচিত। শামীম আখতার বলে একটি মেয়ের গদ্য লেখাও আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রবীণ গদ্য লেখকদের মধ্যে খান সারওয়ার মুরশিদ, আহমদ শরীফ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আনিসুজ্জামান, আবদুল মান্নান সৈয়দ আমার প্রিয়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, মইনুদ্দিন খালেদ, রবিউল হুসাইন, এরা সফল শিল্প-সমালোচক। তবে বুদ্ধিদীপ্ত এবং স্টাইলিশ গদ্যের জন্য অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের লেখা আমার খুব প্রিয়।

প্রশ্ন : ঐ বুক সেলফে অনেক জাপানি বই দেখছি। জাপানি লেখা, লেখকদের সম্বন্ধে কিছু বলুন ?

হাসনাত আবদুল হাই : জাপানি সাহিত্য বলতে বাসোর কিছু হাইকু, কাওয়াবাতা আর মিসিমার উপন্যাসই বুঝতাম। ১৯৯৫-এর অক্টোবর থেকে ছয় মাসের জন্য জাপানে ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো হয়ে গিয়ে প্রচুর জাপানি বই পড়ার সুযোগ হলো। কিনলামও অনেক। দেখতে পাচ্ছো। সব রকমের বই আছে। শিল্প, ফিল্ম, বাগান তৈরি, স্থাপত্য, ইতিহাস দর্শন আর অবশ্যই গল্প উপন্যাস। কাওয়াবাতার প্রতি আমার দুর্বলতা অক্ষুণ্ন থাকলো। লিরিকাল মিস্টিসিজম আছে তার লেখায়, যা জাপানি চরিত্রের একটা প্রধান দিক। কোবো আবের গল্প উপন্যাস দারুণ আধুনিক। আর নিরীক্ষাধর্মী। তারই নোবেল পাওয়া উচিত ছিল। কেনজাবুরোর দি সাইলেন্ট ক্রাই ছাড়া আর কোন বই ভালো লাগেনি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের প্রবীণ-নবীন লেখকদের সম্বন্ধে আপনার সাধারণ ধারণা কি ?

হাসনাত আবদুল হাই : অনুকরণ প্রিয়, মানে আঙ্গিক এবং শৈলীর দিক দিয়ে। যখন পরাবাস্তববাদ ফ্যাশনেবল তখন সেই আদলে লেখা, যখন অস্তিত্ববাদ তখন তার প্রভাবে লেখা, যেমন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ লিখেছেন। আবার যখন ল্যাতিন আমেরিকা উদ্ভূত ম্যাজিক রিয়েলিজমে না লিখলে আধুনিক মনে হয় না তখন সেটা অনুসরণ করা। নাটকে সাইদ আহমেদের মতো শক্তিশালী নাট্যকার অ্যাবসার্ড নাটকের বৃত্ত থেকে বেরুতে পারলেন না। অথচ আমাদের প্রধান লেখকদের সবাই না হলেও কিছু কিছু লেখকের স্বকীয়তা অর্জনের ক্ষমতা ও প্রতিভা ছিল এবং আছে।

এই হলো মোটামুটি আমার প্রিয় লেখকদের তালিকা। তারপর আমি কীভাবে বই পড়েছি তার বিবরণ। একটা কথা দিয়ে শেষ করি। এটা কোন স্নবারি বা উন্নাসিকতা না, এখন, বর্তমান পর্যায়ে এসে যেহেতু আমার সময় কম এবং যেহেতু একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে আমি পড়ি,―এই জন্য সবার লেখা আমি পড়ি না। এমনকি, আমার যারা প্রিয় লেখক, যাদের নাম বললাম, এদেরও নতুন একটা লেখা বেরোলে আমি কয়েক পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখি, এটা পড়ার উপযুক্ত কিনা, এটা পড়ার জন্য আমি সময় দিতে পারব কিনা। যদি মনে হয় যে উপযুক্ত, তখন পড়ি। এভাবে আমি খুব সিলেকটিভিটির―মানদণ্ডটা হলো, বইটিতে নতুন কিছু আছে কিনা-ভাষার দিক দিয়েই হোক, বিষয়ের দিক দিয়েই হোক, উপস্থাপনার দিক দিয়েই হোক। নতুন যদি কিছু না থাকে, শুধু গতানুগতিকভাবে গল্প ‘বলে গেল, এটা আমাকে আর এখন আকর্ষণ করে না। এইজন্য আমার যারা প্রিয় লেখক তাদের সব বই আমি কিনে এনে বইয়ের পাতা উল্টিয়ে দেখি যে এটি আমার পড়া ঠিক হবে কিনা, মানে পড়ার জন্যে আমি সময় দিতে পারবো কিনা। কারণ, আমার সময়তো এখন সীমাবদ্ধ। এই যে আমার লাইব্রেরি, এখানে এক তৃতীয়াংশ বইই আমার পড়া হয়নি। জয়েসের ইউলিসিস পড়তে লেগেছে একটানা চারদিন, তাও সব স্পষ্ট হয়নি। টমাস পিনচন যাকে আধুনিক জেমস জয়েস বলা হয়ে থাকে, তার গ্যাভেটিজ রেইনবো পড়তেও তিনদিন। আর এই যে প্রুস্তের রিমেমব্রাস অফ থিংস পাস্ট, এর তিন খণ্ড পড়বার অপেক্ষায় আছি সেই কবে থেকে। একসঙ্গে পড়া আর লেখা খুব কঠিন। তারপর দিনগত না পর্যায়ের মতো হলেও জীবিকা অর্জনে রাখতেই হয় নিষ্ঠা। কোনোটার দাবিই তো কম না। অথচ একটাই জীবন। দেখে শুনে তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসের নায়িকার মতো বলতে ইচ্ছে করে, ‘জীবন এত ছোট ক্যানে ?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares