আলোচনা : প্রবন্ধ―হাসনাত আবদুল হাই : শিল্পকলার নান্দনিকতা গ্রন্থ প্রসঙ্গে : রফিকুন নবী

সম্প্রতি একটি বই হাতে পেলাম। বইটি আমার পেশা-সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ আমার চর্চাক্ষেত্র শিল্পকলার জগৎ, ইতিহাস এবং নান্দনিকতা বিষয়ক। বইটির বিপুলায়তন, শোভন-সৌকর্য এবং সুকুমার কলার তাবৎ বিষয়ের অনুপূর্ব এবং অনুপুঙ্খ বর্ণনা ও বিশ্লেষণে লেখকের নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি, ভাষাশৈলী ইত্যাদি সংবলিত আকর্ষণীয় বইটি পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করার মতো এবং সম্প্রতি প্রকাশিত বইসমূহের মধ্যে এটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে গণ্য হবার মতো বলে মনে হয়েছে। ভারী বিষয়ের মতোই ভারী এই বই পাঠককে পড়ায় আগ্রহী করে তুলবে। লেখকের নামটি দেশের সাহিত্যাঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত। প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিক তিনি।

 লেখক হাসনাত আবদুল হাই সৃষ্টিশীল লেখালেখির জগতে বিশিষ্টজন। পরিশীলিত রুচির, সমকালীন ভাব-ভাবনা, চিন্তা-চেতনালব্ধ আধুনিক চালচলনে অভ্যস্ত ব্যক্তিত্ব এবং দেশের শিল্পকলা ও শিল্পীদের সুহৃদ তিনি। অতএব তাঁর এবং বইটির সামগ্রিক  গুণাবলিতে আকৃষ্ট হয়ে তা নিয়ে কিছু লেখার দুঃসাহসটিকে অগ্রাহ্য করতে পারলাম না। বলা বাহুল্য এর আগে কোনোদিন কোনো বই নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে হয়নি যদিও বইপত্রের সাথে যুক্ত আছি বহুকাল ধরে। হতে পারে হয়তো এই লিখতে যাওয়াটা শিল্পকলা নিয়ে লেখার দিকটির কারণে পেশাগত অতিমাত্রিক দুর্বলতা। যাই হোক লেখকের নিজস্ব কর্মকাণ্ড সাহিত্যচর্চার বিপুল ব্যস্ততার পাশাপাশি এই ভিন্ন জগৎটিকে, অঙ্গনকে নিয়ে তার দীর্ঘ সময় ব্যয় এবং শ্রমসাধ্য কাজটিতে অপরিসীম ধৈর্য দেখে বিস্মিত হয়েছি। তবে তাঁর এই ইচ্ছা পূরণের দুরূহ যাত্রাটি সাফল্যের সাথে গন্তব্য ছুঁতে পেরেছে যে তা উপলব্ধি করেছি বইটির পাঠ শেষে। অতএব কঠিন এই কর্ম সমাধার জন্য লেখককে সাধুবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই তাঁর এই কর্মযজ্ঞকে সহায়তা দেওয়ার জন্যে আগামী প্রকাশনীকে। শিল্পকলার ক্ষেত্রে অতি সীমিত পাঠকপ্রাপ্তির সম্ভাবনার দিকটিকে অগ্রাহ্য করে বিশাল কলেবরের এই গ্রন্থটি প্রকাশের ঝুঁকিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন তাঁরা নির্দ্বিধায়। অবশ্য আমি নিশ্চিত যে, বাংলায় লেখা অনুপম গ্রন্থটি দেশের সুশীল পাঠকাংশে আদৃত হবে এবং রুচিশীল সু-গ্রন্থ তালিকায় অসামান্য একটি সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।

এ রকম প্রকাশনার পাঠক নিয়ে অন্য আর একটি প্রধান দিককে গণ্য করা যায়। তা হলো দেশের  চারুকলা শিক্ষায় এবং শিক্ষাদানে নিয়োজিত শিক্ষার্থী এবং শিল্পী-শিক্ষকবৃন্দের কাছে প্রয়োজনীয় বলে গৃহীত হতে পারা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ রকম মহোদায়তন বাংলা বই অপরিহার্যতা পাবার উপযোগী। তেমন হলে লেখক এবং প্রকাশকের শ্রম সার্থক হবে।

 শিল্পকলাবিষয়ক বই সম্পর্কে কিছু ধারণা পোষণ করে থাকি। আর তা হলো বইটি বহুপৃষ্ঠা সংবলিত গুণে-মানে ভারী ওজনের হওয়া উচিত। ভালো বেশি গ্রামের কাগজ এবং প্লেটগুলো ছাপানো ঝকঝকে হতে হবে। প্রচ্ছদ গেটআপ মেক-আপও আকর্ষণীয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাঁধাইতে শক্তপোক্ত বোর্ড ব্যবহার এবং বইয়ের পুটটি কয়েক ইঞ্চি চওড়া থাকা প্রয়োজন। এ রকমটা না হলে শিল্পকলাবিষয়ক ভারী লেখার বইটিকে যেনতেন প্রকারের ঠুনকো চেহারার মনে হতে পারে। বিদেশে এই ধরনের করেই প্রকাশকরা শিল্পকলার সচিত্র বই প্রকাশনা করে থাকে। তবে সাথে কখনও কখনও অনেকের কাছে সহজলভ্য করতে সুলভ এডিসনও করে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্যে। দুই ক্ষেত্রেই ছবির প্লেটের সুন্দর ছাপার ব্যাপারটি রক্ষিত থাকে।

আগামী প্রকাশনী প্রায় কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। ৫৩৬ পৃষ্ঠার বই। আকারের বড়ত্ব বেশি গ্রামের কাগজ বাঁধাইও বেশ চলনসই। ছাপাও ভালো। শুধু ছবির ছাপা সেই অর্থে খুবই সাধারণ। চমৎকারিত্ব থেকে যথেষ্ট পিছনে রয়ে গেছে। এই খামতিটুকু যে অন্য রিপ্রোডাকশন থেকে তা খেয়াল করলে পাঠকমাত্রই বুঝতে পারবেন। অবশ্য আমাদের দেশে অন্য কোনো উপায়ও নেই। বিদেশের গ্যালারি এবং মিউজিয়ামে সংগৃহীত শিল্পকর্মেও ছবি ছাপানো রিপ্রোডাকশনের ওপরেই ভরসা করতে হয়। অতএব প্রযুক্তিগত যেটুকু করা সম্ভব সেটাকেই সম্বল করে এ রকম কাজে মন দিতে হয়। এই গ্রন্থের ক্ষেত্রেও তা মেনে নিতে হয়েছে যে তা বলাই বাহুল্য। সব মিলিয়ে বইটির যত্নের চেষ্টা রয়েছে সাধ্য অনুযায়ী, প্রচ্ছদ সহজ সরল ভালো লাগার মতো। সালভাদর দালি এবং গুহাচিত্রের রিপ্রোডাকশনের ছাপা ভিতরের চাইতে ভালো। আকর্ষণীয় বই। শিল্পকলা এবং নান্দনিকতা নিয়ে যাঁরা ভাবেন, কাজ করেন, তাঁদের পছন্দনীয় হবার মতো এই প্রচেষ্টাটি সফল হবে বলে আমার বিশ্বাস।

একটা কথা না বললেই নয় যে, দেশে প্রকাশনার ক্ষেত্রে আর  যত রকম বই-ই বের হোক শিল্পকলা এবং নান্দনিকতা নিয়ে বই অহরহ প্রকাশিত হয় না। সংখ্যার ব্যাপারেও বিপুলতা তেমন নেই। অতএব এই বইটি এ সময়ের প্রকাশনায় উল্লেখযোগ্যতা পাবার দাবি করতেই পারে। শিল্পকলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা অংশে প্রয়োজনের একটি বই হিসেবেও এটিকে ভাবা যেতে পারে। এই মুহূর্তে দেশে শিল্পকলা চর্চার অবস্থা এবং বিস্তৃতি গর্ব করার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে। বহু শিল্পী বিভিন্ন মাধ্যমে হরেক ধরনের কাজ করছে। দেশব্যাপী অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অনুষদ এবং বিভাগ রয়েছে। কলেজও আছে কয়েকটি।  এসবে শিল্পকলার ইতিহাস এবং নান্দনিকতা পাঠ্য বিষয়। গবেষণায়ও নিয়োজিত থাকছে অনেকে। আরও একটি বিশেষ অংশ রয়েছে যাঁরা শিল্পকলার অনুরাগী। এই অত্যাধুনিক বিশ্বায়নের যুগটিতে দেশজুড়ে সাধারণ ভক্তের শুভানুধ্যায়ীদের সংখ্যা এখন বিশেষ ধর্তব্য জ্ঞান করার মতো চমৎকার পর্যায়ে রয়েছে। শিল্পকলা নিয়ে তাঁদেরও রুচির দিকটি বদলেছে, তৈরি হয়েছে শিল্পকলা যাঁচাইয়ের চোখ। শিল্পকলার তাবৎ দিকে তাঁদেরও আগ্রহ অপরিসীম। বিষয়টিকে নিয়ে জানার এবং ভাবার ব্যাপারে উৎসাহ অগাধ। অতএব তাঁদের কাছেও এটি সমাদৃত হবে যে, তা আশা করাই যায়। এ ছাড়াও সংগ্রাহকের জন্য আকর্ষণীয় হিসেবে গৃহীত হবার মতো এ গ্রন্থ।

আসলে শিল্পকলার বিবর্তন, গতি-প্রকৃতি, ধ্যান-জ্ঞান-দর্শন, বিভিন্ন সময়ে চর্চার রকমফের ইত্যাদি যেমন বিশাল তেমন জটিল এবং বিস্ময়কর। লেখক নিজেও জটিল শব্দটি ব্যবহার করেছেন শুরুতেই। সভ্যতার ইতিহাসের শুরু চিত্রকলা দিয়েই। ধীরে ধীরে কলা-কৈবল্যের অন্যান্য দিকেরও উন্মেষ ঘটেছে। শিল্পকলার তাবৎ দিককে কেন ভালো লাগে, কেন আকৃষ্ট হতে হয় তা ভাবতে গিয়ে সে সবের কারণ খুঁজতে খুঁজতে নান্দনিকতার ব্যাপার যুক্ত হয়েছে। শিল্পকলায় কী এমন থাকলে নান্দনিক কাণ্ডটি ঘটে, রস সৃষ্টি হয় তা দেখার চোখ, বিচার বুদ্ধি ও নিয়ম তৈরি করা হয়েছে। অতএব সবটা এক গ্রন্থে ইতিহাসসহ পাওয়া কম কথা নয়। তেমনই একটি গ্রন্থ এই শিল্পকলার নান্দনিকতা। এই নান্দনিকতার ব্যাপারটিতে লেখকের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে বোঝা যায়। অতএব লেখক নান্দনিকতাকে প্রাধান্য দিয়েই লেখাটি শুরু করেছেন প্রথম অধ্যায় হিসেবে।

শিল্পকলা নিয়ে লেখার ইচ্ছে লেখকের হুইম বা আনতাবাড়ি কোনো ভাবনাপ্রসূত নয়। দীর্ঘকাল ধরে ক্ষেত্রটির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার ব্যাপারটি শিল্পকলা চর্চায় যারা নিয়োজিত এ তাদের জানা। তিনি যে শুধু শিল্পকলার ব্যাপার স্যাপার নিয়েই ভাবেন বা মনোযোগী বেশি তাও হলফ করে বলা যাবে না। সাহিত্যচর্চা এবং বিশ্ব-সাহিত্য পাঠের, অবলোকনের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রের, বিষয়ের বইপত্রের নিষ্ঠাবান পাঠকও। যেমন শিল্পকলা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দিক যেমন চলচ্চিত্র নিয়েও মনোজ্ঞ বইপত্র লিখেছেন।

তবে শিল্পকলা এবং এর নান্দনিকতা বিষয়ে তাঁর আগ্রহ প্রায় সব দিককে ছাড়িয়ে যাবার মতো। এই বইটি তারই একটি দৃষ্টান্ত। তাঁর শিল্পকলার গুণগ্রাহী অবস্থাটি জানান দেওয়ার মতো এই বই। এবং বৃহৎ কলেবরে লিখবার তার ইচ্ছেটি হওয়াও এমনি হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়।

বিশ্বের শিল্পকলার আদি থেকে বর্তমান ইতিহাস নিয়ে পঠন-পাঠনের মাধ্যমে যা কিছু অর্জন, অভিজ্ঞতা, সবটাই বইতে উপস্থিত করার চেষ্টা করেছেন। সভ্যতার বিকাশ আদিম মানুষদের যুগে যুগে বোধবুদ্ধির উন্মেষ শিল্পকলাকে ভর করে, সে সবের খুঁটিনাটিকে এক গ্রন্থে ব্যক্ত করা, প্রকাশ করা সহজ নয়। লেখক সরাসরি অনুবাদের দিকে না গিয়ে নিজের মতো করে সাজিয়ে সবটাই উপস্থিত রাখার চেষ্টা করেছেন পূর্ণতা আনার জন্যে। আমার ধারণা এই প্রচেষ্টা ক্ষেত্রটির প্রয়োজনের কথা ভেবে। ব্যাপারটিকে আর একটু বিস্তৃত করে বলা যেতে পারে। গ্রন্থটি পাঠ করে বোঝা যায় যে, প্রাচীন থেকে বর্তমান পর্যন্ত শিল্পকলার গতি-প্রকৃতি, বিবর্তন, পরম্পরা, যুগোপযোগী বিভিন্ন মতবাদ, নতুনত্ব, ধরন-ধারণ, রীতি-নীতি, শিল্পীদের এবং শিল্পকলার বিশ্লেষক- গবেষকদের ভাবনার বিভিন্নতা, কোনো কোনোটায় বৈপরীত্য, আধুনিকতা, আধুনিকোত্তর অত্যাধুনিকতার বিভিন্ন পর্যায়-ধাপ ইত্যাদিকে নিরীক্ষণ এবং পঠনের একনিষ্ঠতা দিয়ে তিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে ঋদ্ধ করেছেন এবং বিশেষ রুচির অধিকারী হয়েছেন শিল্পকলার মতো বিষয়টিতে সম্পৃক্ত থেকে। যাঁরা ব্যাপারটি অবগত নন তাঁরা বইটি পাঠ করলে অনুধাবন করবেন বলে আমার বিশ্বাস।

৫৩৬ পৃষ্ঠার মহোদায়তনী বই। তাতে গ্রন্থসূচিতে অন্তর্ভুক্তি রয়েছে ২৫৬টি নাম এবং বইটি লেখার প্রস্তুতিপর্বেও গ্রন্থ পাঠ-পঠনজনিত দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। যদিও এ প্রসঙ্গে একটি সরল স্বীকৃতি-নোট লিখতে ভোলেন নি। নোটটি এই রকম ‘বইটি লিখতে গিয়ে যে সব বই পড়া হয়েছে সেগুলো এবং সেই সব বইয়ে অন্য যেসব বইয়ের নাম পাওয়া গিয়েছে তার মধ্যে নির্বাচিত কিছু বই গবেষকদের কাজে আসতে পারে মনে করে ওপরের গ্রন্থসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

 ব্যাপারটি প্রশংসিত হবার মতো। যেসব বই প্রয়োজনীয় মনে করে তিনি পড়েছেন (যার সংখ্যা যে কম নয় তা অনুমান করা যায়) সেইসব বইয়ের লেখকদের সহায়ক গ্রন্থের নাম এবং লেখকদের নামগুলো গবেষকদের জন্যে জানান দিয়েছেন তাঁদের প্রয়োজনের কথা ভেবে। ধারণা করছি গবেষকদের তা কাজে লাগবে।

নির্ঘণ্ট রয়েছে ৪ পৃষ্ঠা। সেসবে বইটি সম্পূর্ণতা ঘটেছে। পাঁচ পৃষ্ঠা ভূমিকাটি সংক্ষিপ্ত হলেও বইটি লেখার ব্যাপারে নিজের ইচ্ছা এবং এ ব্যাপারে তাঁর সম্পৃক্তির ঘটনা ও কারণ ব্যক্ত করেছেন নির্দ্বিধায়।

  লেখক নিজের শিল্পকলার প্রতি টান অনুভবের এবং সম্পৃক্তির দিকটির শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত অভিজ্ঞতা এবং ঘটনাবলি ব্যক্ত করেছেন ভূমিকায় অকপটে। কোথাও প্রচ্ছন্নতাকে তেমন প্রশ্রয় দেন নি। পঞ্চাশ দশকে দেশের চারুকলা চর্চার ক্ষেত্রটির নাজুকতা এবং নতুন সৃষ্ট আর্ট ইনস্টিটিউটকে ঘিরে ৫০ দশকের ছাত্র-শিক্ষক নিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে শিল্পকলাচর্চার সীমিত বিস্তারের সময়টির উল্লেখ করেছেন। মফস্সলে থাকার সুবাদে শিল্পকলার এই অবস্থাটিও তাঁর জানা ছিল না। অতএব কোনো আগ্রহ বা কৌতূহলও বোধ করেননি। ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তির সময় হঠাৎ কোনো পূর্বভাবনা ছাড়াই খেয়ালবশত একটি বই কিনেছিলেন। বইটি ছিল শিল্পকলা বিষয়ে প্রাজ্ঞ-রসজ্ঞ এবং জগদ্বিখ্যাত লেখক হার্বাট রিডের রচিত গবধহরহম ড়ভ ধৎঃ.

বইটি কেনার ব্যাপারে তার অকপট বক্তব্যটি এই রকম‘যে মফস্সল শহরে আমার স্কুলজীবন কেটেছে সেখানে শিল্পকলার চর্চা দূরের কথা, সে বিষয়ে কারও আগ্রহের কথাও জানতে পারিনি। শিল্পকলার প্রদর্শনী তো হয়ই নি, তার ওপর কাউকে আলোচনা করতেও শুনিনি। বাজারে বা স্কুলের লাইব্রেরিতে শিল্পের ওপর লেখা কোনো বই চোখে পড়েনি। শিল্পকলা বিষয়ে মনে নিñিদ্র অন্ধকার এবং আকাশজোড়া অজ্ঞতা নিয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষার পর ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হয়ে প্রথম বছরে স্কলারশিপের  টাকা দিয়ে যে কয়েকটি বই কিনি তার মধ্যে একটি হার্বাট রিডের লেখা গুরুগম্ভীর বইটি। সেই বই কেনার পেছনে পুরোনো আগ্রহ কিংবা অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা বা প্রেরণা কারণ হিসেবে কাজ করেনি।’

 বইটি কেনার কারণ হিসেবে তিনি নিজের কৌতূহল সম্পর্কে সন্দিহান কথাটিও লিখেছেন‘একটাই কারণ থাকতে পারে বলে মনে হয়েছে পরে: মনের অবচেতনে এই বিষয় সম্বন্ধে আগ্রহ ও কৌতূহল। সহজাত প্রবৃত্তির ভিত্তিতেই অবচেতনে এই আগ্রহ ও কৌতূহল জন্মেছিল।’

অর্থনীতি নিয়ে লেখাপড়া, পরে শিক্ষকতা এবং শেষে সিএসপি হবার সুবাদে চাকরিতে যোগ দিয়ে সরকারি আমলা হবার কঠিন দায়িত্ব থেকেও শিল্পকলা এবং নান্দনিক দিকের প্রতি দুর্বলতাকে এড়িয়ে থাকতে পারেননি। ব্যাপারগুলোর অন্তর-বাহির জানা এবং এসবে নিজের বোধকে জানান দেওয়ার জন্যে লেখালেখি ইতিপূর্বেও করেছেন। ছুটছাট প্রবন্ধের পাশাপাশি নন্দনতত্ত্ব ও চলচ্চিত্র বিষয়েও দুটি বই লিখেছেন। এই শিল্পকলার নান্দনিকতা গ্রন্থটি তাঁর তৃতীয়। বিষয়ের অভ্যন্তরের বিশদ জগৎকে নিজের মতো করে বই লেখার ব্যাপারে তিনি ‘ইন্সটিংক্ট’ এবং ‘ইনটুইশান’-কে প্রাধান্য দিয়েছেন ধারণা হিসেবে।

তবে এত গুরুত্বপূর্ণ আর কঠিন বিষয়কে নিয়ে বড় একটি বই লেখার ইচ্ছা যেভাবেই তাঁকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে থাকুক শিল্পকলার এবং নান্দনিকতার ক্ষেত্রটি যে উপকৃত হয়েছে তাতে কোনো দ্বিমত থাকার উপায় নেই।

তিনি মধ্যপঞ্চাশ দশকে অজান্তে যে হার্বাট রিডের বই কিনেছিলেন সে প্রসঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে। ঘটনাটি উল্লেখ করার লোভ সামলানো গেল না। তাঁর বইটি  কেনার ঘটনা ১৯৫৪-তে। আমার ঘটনাটি আরও পাঁচ বছর পরের। আট কলেজে ভর্তির কয়েক সপ্তাহ পর অধ্যক্ষ শিল্পাচার্য জয়নূল আবেদিন ক্লাসে এসে নান্দনিক ব্যাপার জানার জন্য অবশ্য পঠনীয় তিনটি বইয়ের কথা বলেছিলেন। প্রথমেই উল্লেখ করেছিলেন রিডের মিনিং অব আর্ট। অন্য দুটি ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী এবং অশোক মিত্রের পশ্চিম ইউরোপীয় চিত্রকলা। বুঝেছিলাম কলা-কৈবল্যের ব্যাপারে শুধু আঁকাআঁকি নয়; আলোকিত হবার একটি বড় দিক আছে। সেই কারণে প্রাথমিক হলেও বইগুলো পড়া প্রয়োজন। আমরা সবটা মান্যি করে নিউ মার্কেটের ক্রিসেন্ট বুক্স্ থেকে সে সব কিনেছিলাম।

বলা বাহুল্য ম্যাট্রিক পাস ছাত্রের পক্ষে রিডের বইটি পড়ে মাথায় নির্যাস গ্রহণ সহজ ছিল না। অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও কয়েক বছর। যাই হোক ধারণা ছিল সে সব ওই বয়সে শুধুই শিল্পকলার ছাত্র এবং শিল্পীদের জন্যে প্রয়োজনীয়। লেখক হাসনাত সাহেব অন্য ক্ষেত্রের হয়েও কিনে ফেলেছিলেন অজান্তে। কিন্তু সেটি তাঁকে শিল্পকলার সাথে বেঁধেই ফেলেছিল। যার ফলশ্রুতিতে তিনি ক্ষেত্রটিতে রসজ্ঞ হয়েছেন। সেইটি প্রকারান্তরে নান্দনিকতা নিয়ে ভাবার দরজাটি খুলে দিয়েছিল এমনটা ভেবে নেওয়া যায়। পরবর্তীকালে হার্বাট রিডের বইয়ে আলোচিত শিল্পীদের কাজ তাঁর বিদেশে মিউজিয়াম, গ্যালারি ইত্যাদিতে সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। সেই স্মৃতি তাঁকে উদ্বেলিত করেছিল নিশ্চয়ই।

দেশের জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ শিল্পীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা তাঁর বহুকালের। তাঁদের চর্চা এবং কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করেন। শিল্পকর্ম নিয়ে ভাব বিনিময়ও করে থাকেন। দেশ-বিদেশের শিল্পকলার ভাবজগতের অন্তরমহলে তাঁর প্রবেশ এবং পদচারণা তাঁকে ব্যাপারটিতে ঋদ্ধ করেছে যে তা বলাই বাহুল্য। ইতিহাসপর্বে মন দেওয়া এবং শিল্পকলার নান্দনিকতা এবং নন্দনতত্ত্বে  যে জ্ঞানার্জন করেছেন সেইসবকে গ্রন্থাকারে উপস্থিত করলেন এই গ্রন্থে।

 লেখক শিল্পকলার নান্দনিকতা নিয়ে লিখতে মনস্থ করার ব্যাপারে আত্মপক্ষ সমর্থন করে ভূমিকাটি লিখেছেন। নিজেকে বিষয়টির ক্ষেত্রে নিতান্তই অবোধ অর্বাচীন ঠাওর করার জন্যে বিষয়টিকে বাতিল আখ্যা দিয়ে শুরুতেই একটি প্রবাদবাক্য উদ্ধৃত করেছেন। সেটি এই রকম ‘যেখানে দেবদূতরাই হিমশিম খেয়ে যায় অবোধ শিশুরাই পারে যথেচ্ছ ঘোরাফেরা করতে।’ ব্যাপারটি বিনয় প্রসূত যে তা বোঝাই যায়। কারণ পরের কথায় তা প্রায় খণ্ডনের মতো উক্তি রয়েছে। লিখেছেন, ‘জীবনে অবশ্য কোনো কিছুই আকস্মিক নয়, এই বইটি লেখার পেছনেও ছোটখাটো ইতিহাস আছে যার ভেতর হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে যাকে বলে প্রস্তুতিপর্ব। হয়তো কেন, নিশ্চয়ই কেন না কারণ ছাড়া তো কোনো কাজ হয় না এই জগৎ-সংসারে’।  অতএব আটঘাট বেঁধেই কলম ধরেছিলেন তাঁর লেখালেখির এই পর্বে।

তিনি তাঁর এই বই সম্বন্ধে নিজের ভাবনা এবং শিল্পকলার দীর্ঘ ইতিহাস, বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট আন্দোলন ইত্যাদিও কতটুকু লেখা প্রয়োজন আর কী কী রাখা না রাখার ব্যাপারে কোনটা গুরুত্ববাহী বলে বিবেচনা করেছেন তার কারণগুলোও ব্যক্ত করেছেন। যেমন লিখেছেন, ‘শিল্পকলার ইতিহাসের ধারাবাহিক বর্ণনা এই বইতে অন্তর্ভুক্ত হলেও সব আন্দোলন ও শিল্পীর উল্লেখ করা হয়নি। আধুনিক যুগের পর প্রায় পঞ্চাশ বছরে ষাটটির অধিক শিল্প আন্দোলন হয়েছে বলে দেখা যায়। এর মধ্যে যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং স্থায়িত্বকাল যুক্তিপূর্ণভাবে দীর্ঘ, যে সব আলোচনায় এসেছে।’

 বোঝাই যায় যে সব আন্দোলনকে ধর্তব্যের মনে করেন নি। এও মনে করা যেতে পারে যে, মাইনর আন্দোলনগুলোকে নিয়ে আলোচনায় না যাওয়াটা লেখক সংক্ষেপকরণের জন্য। লেখক এই পর্যায়ে গিয়ে লেখাটি সম্বন্ধে নিজ ধ্যান ধারণাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন বেশি এবং প্রচলিত বিশ্লেষণ থেকে সরে এসে নিজের বিচার-বুদ্ধি অনুযায়ী অনেকাংশে প্রয়োজনে সাজিয়েছেন অবশ্য তাঁর নিজের ব্যাখ্যা, উপস্থাপন বা দৃষ্টিকোণ সম্বন্ধে কারও দ্বিমত পোষণের সুযোগ থাকতে পারে তেমন সন্দেহের কথাও বিনা  দ্বিধায় ব্যক্ত করেছেন। নিজ ভাবনা সম্পর্কে প্রায় দাবির মতো করে লিখেছেন, ‘শিল্প বিষয়ে তৃতীয় বিশ্বের কৌতূহলী ও সামান্য হলেও পড়াশোনা আছে, এমন একজন নিজের মতামত রাখতে পারবে না এ কথা গ্রহণযোগ্য নয় মনে করেই অসংকোচে নিজের ব্যাখ্যা ও মতামত রেখেছি এই বইতে।’ এসব থেকে ভেবে নেওয়া যায় যে আহ্বানের মতো করেই আলোচিত বা বিতর্কিত হবার দরজাটি খুলে রেখেছেন। যদি  তা হয় তাতেও ক্ষতি নেই বলেছেন।

একটা কথা না বললেই নয় যে শিল্পকলা এবং নান্দনিকতা এমন মনোজাগতিক বিষয় যে তা নিয়ে ভাবার, বিশ্লেষণের বা মন্তব্যের ব্যাপারে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকেই। বলার স্বাধীনতা তো রয়েছেই অতএব যুগে যুগে বিজ্ঞজনেরা বোধ এবং রুচিভেদে কোনো কোনো দিকে ভিন্নমত ভিন্ন ধারণা পোষণ করেছেন চিরকাল। এখনও করে থাকেন। অবশ্য এই মতভেদের পার্থক্যের কোনোটাই অগ্রাহ্য বা অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়  না। যাঁরা শিল্পকলা চর্চায় নিয়োজিত, তাঁরা নিজেদের ভাবনার সাথে যে ভাবটির মিল খুঁজে পান সে দিকে চোখ রাখেন। শিল্পকলার সব অনুরাগীরাই যে ব্যাপারগুলোর গভীরত্ব মাপার খুব চেষ্টায় থাকেন তাও নয়, তাঁদের বেশির ভাগই সরল বা সোজা-সাপ্টা ভালোলাগাকে প্রশয় দেন। শুধু গবেষক এবং বিশেষ পণ্ডিতবর্গ কেবল লেখকের ধারণাগুলোকে খণ্ডন করার ইচ্ছা পোষণ করতে পারেন। লেখক তাঁর লেখায় সেই ইঙ্গিতই করতে চেয়েছেন হয়তো।

বইটিতে বলা হয়েছে যে এই বই নিছক ইতিহাস বর্ণনা নয়, একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে শিল্প ইতিহাসকে দেখে তার বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন করার চেষ্টা রয়েছে ইতিহাসের ভিত্তিতে নান্দনিকতার মানদণ্ড, ভূমিকা ও উদ্দেশ্য। তা করতে প্রতিটি শিল্পধারা আলোচনার সময় এবং সারসংক্ষেপে বর্ণনা রয়েছে। উল্লেখ্য, যে ‘নান্দনিকতা’ প্রসঙ্গের অধ্যায়টি ছাড়া প্রায় প্রতিটি ধারার অধ্যায় শেষে সারসংক্ষেপ ব্যবহার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে লেখকের নিষ্ঠা আমার ভালো লেগেছে। এতে তিনি নিজের কিছু ধ্যান-ধারণা ব্যক্ত করার সুবিধেটুকু নিতে পেরেছেন।

তবে বইয়ের নান্দনিকতা অধ্যায়টিকে প্রথমেই স্থান দেওয়াটা ভালো হয়েছে। ৩৩ পৃষ্ঠাব্যাপী পুরো অধ্যায়টিকে লেখকের অত্যন্ত মনোযোগী প্রবন্ধ বলে ধরা যায়। শিল্পকলার দীর্ঘ ইতিহাসটি শুরুর আগে প্রবন্ধটিকে রাখা হয়েছে এই জন্যেই হয়তোবা যে এটিতে ভিন্নতা রয়েছে। দীর্ঘ ইতিহাসপাঠে সহায়ক বা প্রিলিউডও বলা যায়। ইতিহাসের গণ্ডি যুগে যুগে সৃষ্টি শিল্পকলার ধরন-ধারণ, কলা-কৌশল, রীতি-নীতি সময়-দুঃসময়কে ধরে ধরে এগিয়েছে। এ ভাবে ভালোলাগা না লাগার কারণ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার-স্যাপার ইত্যাদি নানান কিছু খোঁজা হয়েছে, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা থেকে অনেক ভাব-ভাবনা আবিষ্কৃত হয়েছে। সে সবকে নান্দনিকতার শব্দের মোড়ক দেওয়া হয়েছে। অতএব শুধু ইতিহাস বর্ণনায় না থেকে ইতিহাস অধ্যায়গুলোর আগে এই অংশটিকে রাখাটা প্রারম্ভিক কর্তব্য হিসেবে লেখক ভেবেছেন। শিল্প-কলার ইতিহাস বইতে তাঁর এই পর্বের অন্তর্ভুক্তি যথার্থ হয়েছে বলে ভাবা যেতে পারে। সভ্যতার শুরু এবং উন্মেষের, বিবর্তনের ধাপগুলো শিল্পকলার ইতিহাসকে ভর করে এগিয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে। নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, শিল্পতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, বিজ্ঞান ইত্যাদি বহু দিকের সমাহারে এবং যুক্ততার এই ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে। স্বকৃত সেইসব থেকে সরে আসার মতো জোরালো নতুন কোনো বিশ্বাসের কথা যুক্ত হয়নি। অতএব এই বইতেও লেখককে সেইখান থেকেই শুরু করতে হয়েছে। একমাত্র বা অবধারিত প্রমাণ গুহাচিত্রদিয়েই প্রাগৈতিহাসিক যুগটাকে ধরে এগুতে হয়েছে আর সবার মতো করেই নিয়ম মেনে। তবে লেখকের বর্ণনায় নিজস্বতা বিশেষ প্রাঞ্জল বৈশিষ্ট্যের যা বইটি পড়ায় আগ্রহ তৈরি করার মতো।

আঁকাআঁকির শুরুর যুগ, বছর বা দিন-সাল নির্ধারণে কিছু নতুন মতামত দেখা যাচ্ছে। আলটামিরা, লাসকুর গুহাচিত্রকে খুঁটি ভেবে কেউ বলেছেন ৮০ হাজার বছর, কেউ বলেন শুরুটা খৃষ্টপূর্ব ৫০ হাজার বছর। বোর্নিওতে গুহা আবিষ্কারের পর তাতে আঁকা ড্রইং দেখে কেউ কেউ নতুন গণনায় বলেছেন ৬৫ হাজার বছর।

এই গ্রন্থে লেখক বোর্ণিওর তথ্যটি যুক্ত করেন নি। এ নিয়ে অবশ্য কিছু বলার থাকে না। কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক এবং বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে আবার তেমন কিছু আবিষ্কার করলে (যার সম্ভাবনা থাকতেই পারে) বছর নিয়ে তথ্যগুলি বদলেও যেতে পারে। লেখক প্রথমটিকেই এই বইতে উল্লেখ করেছেন। তাঁর লেখার ধরনটি শুরুতেই ভালো লাগার মতো। অন্যান্য অনেক গ্রন্থের মতো সরাসরি ইতিহাস বর্ণনায় যান নি। বরং ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বর্ণিত ধারণাগুলোকে উপস্থিত করছেন। যেমন: গুহাচিত্রের ব্যাখ্যা নিয়ে মতদ্বৈধতার দিকটা।

‘পশু শিকারের উদ্দেশ্যে গুহাব্যাসী আদিম মানুষ যেসব পশু ও শিল্পীর প্রতিকৃতি আঁকত সেগুলো বাস্তবের অনুকরণ ছিল, না-তারা আলংকারিক (অর্নামেটাল) অথবা জ্যামিতিক (জিওমেট্রিক) প্রতিফলন ছিল, এই প্রশ্ন নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিকদের মধ্যে, এমনকি শিল্প-ঐতিহাসিকদের মধ্যেও মতানৈক্য দেখা দেয়। কেউ কেউ মনে করেছেন দেয়ালচিত্রের মানুষ ও পশু বাস্তবের অনুকরণে আঁকা হতো না।’

মূল বর্ণনায় এভাবেই সবটা শেষ না করে অধ্যায়টির সার সংক্ষেপে এ নিয়ে বিশেষ আলোচনা করেছেন পুনরায়। তিনি প্রাগৈতিহাসিক চিত্রকলা নিয়ে বক্তব্য নিজের ‘তর্কে না গিয়ে বলতে হয়’ ধারণাও ব্যক্ত করেছেন  সার সংক্ষেপ অংশে। লিখেছেন‘এইসব চিত্রে হুবহু অনুকরণের সঙ্গে সৃজনশীল অনুকরণ বিশেষ করে স্টাইলাইজেশনের ব্যবহার করা হয়েছে একই সঙ্গে।’ তবে অনেকের ধারণা শিল্পীদের অপটুতা থেকেও স্টাইলটা চেহারা পেয়েছে।

এ ব্যাপারে তাঁর কথাও হয়তো ঠিক। আসলে আদিম মানুষদের আঁকাআঁকি নিয়ে বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন সবটাই তো বিশেষজ্ঞদের ধারণাপ্রসূত। সেই আমলের প্রকৃতি, আবহাওয়া, পশুপাখী, রোগভোগের সাথে লড়াই করে করে বেঁচেবর্তে থাকার, পশু (খাদ্য হিসেবে) শিকার করে আনন্দিত হবার জীবনভিত্তিক বিষয়াদি নিয়ে আঁকা ছবিগুলো হয়তো দিনপঞ্জির মতন। আজকের বাস্তবতায় আমরা অর্থাৎ শিল্পীরা একটা ব্যাপার বুঝি যে অতি আনন্দিত মুড বা অতি দুঃখের হতাশায় শিল্পীরা সৃষ্টিশীল শিল্পচর্চায় উদ্দীপ্ত বোধ করে, মানসিক অবস্থা তাই একটি ফ্যাক্টর।

প্রাগৈতিহাসিক যুগের ওই মানুষদের মন তো নিশ্চয়ই আমাদের মতো এত কিছু জটিলতার ভার বহন করত না। কিন্তু তারপরও ছবি আঁকার দিকে কেন মনোযোগ দিতো কেউ কেউ, অনেকে আবার আকৃতির গড়নের দিকে কেন ইচ্ছে পোষণ করত তা নিয়ে নানান সময়ে হরেক ব্যাখ্যা দিয়েছেন নানাজনে। নৃতত্ত্বের, প্রত্নতত্ত্বের বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ইতিহাসবিদরাও তাই। তাঁদের সে সবকে উদ্ধৃত করে ইতিহাসে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে।

অজানা সময়টিকে বোঝার চেষ্টায় ধারণা বা কল্পনা ছাড়া উপায়ও নেই। লেখক হাসনাত আব্দুল হাই প্রকারান্তরে সেগুলোকেই উপস্থিত করেছেন। পাঠকের সুবিধার্থে তেমন বিভিন্ন বিজ্ঞজনদের মন্তব্যকেও তাঁর লেখা  ইতিহাসে যুক্ত করেছেন। মোক্ষমতার সাথে। এতে কৌতূহলী পাঠকবৃন্দ উপকৃত হবেন। এমনিতে তো অধিকাংশ এই ধরনের বইতে শুধু প্রচলিত ইতিহাসই বর্ণিত হয়। প্রাচীন সভ্যতার ধাপগুলোকে মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠিত ধারণার বাইরে নতুন কোনো ধারণার বা কল্পনার আশ্রয়ের খুব সুযোগ থাকে না বিশেষজ্ঞ বা ইতিহাসবিদদের। অতএব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মতের অমিল প্রায় থাকেই না বলা চলে।

শিল্পকলার নান্দনিকতা  গ্রন্থে লেখক আর সবার মতোই শিল্পকলার দিকটির ইতিহাসকে উপস্থিত করেছেন আবিষ্কৃত তথ্য-তত্ত্বকে উপজীব্য করেই। তবে বলার বা বর্র্ণনার শৈলীগত সাবলীলতা তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিটি রক্ষিত আছে।

ইতালীয় রেনেসাঁর আগ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রাচীন মিসর, মেসোপটেমিয়া, সিন্ধু সভ্যতা, প্রাচীন গ্রিক রোমক বা চৈনিক  সভ্যতার ব্যাপারগুলোর ধ্যান-ধারণা থেকে শুরু করে করণ-কৌশল, দর্শন, এমন কি ধরন-ধারণের কথা ওইসব সময়ের মানুষেরা নিজেরাই অনেকটা জানান দিয়ে গেছেন। সেসব থেকে সরে যাওয়া সম্ভব নয়। রেনেসাঁ সময় থেকে শিল্পী এবং শিল্পকলার ব্যাপারে ব্যক্তিক পছন্দ- অপছন্দ নিয়ে মত পার্থক্যের দিকটি প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে। আলোচনা- সমালোচনার, প্রচার-অপপ্রচার ইত্যাদির প্রচলন শুরু হয়। শিল্পকলার ইতিহাসে সে সব বর্ণিত রয়েছে। লেখক সে সব বিজ্ঞজনদের ভাবনাগুলোকেও লিপিবদ্ধ করেছেন।

একইভাবে তিনি পরবর্তী সব যুগেরই অধিকাংশ চিত্রকলা এবং ভাস্কর্যের মহিমা নির্মাণের ব্যাকগ্রাউন্ডের খুঁটিনাটি বর্ণনার চেষ্টা করেছেন। পুঙ্খানুপুঙ্খতাকে খুব নিষ্ঠার সাথে তাঁর সাহিত্যশৈলীকরণ দিয়ে এমনভাবে বর্ণনা দিয়েছেন যাতে পাঠকের চোখে শিল্পকর্মটি প্রায় দৃশ্যমানতা সৃষ্টি করতে পারে।

তাঁর লেখার একটি ধরন ভালো লাগার মতো বলে আমার মনে হয়েছে। তা হলো বিভিন্ন যুগের শিল্পকলা তা প্রাচীন হোক বা পরবর্তী যে কোনো যুগের, এমনকি বর্তমানেরও তা বিশ্লষণে অন্যান্য বিশ্বখ্যাত বিশ্লেষকদের মতবাদগুলো  ইতিহাসের অংশ হয়ে  গিয়েছে, সে সবের যথাযথ ব্যবহার করেছেন। সেই সাথে অন্যান্য অনেকের মতপার্থক্যের বা মত গ্রহণের দিকগুলোকেও উল্লেখ করতে ভোলেন নি। যেমন: মিসরীয় চিত্রকলার স্বীকৃত বিশ্লেষক আর্নল্ড হাউজার জার্মান দুই প্রত্নতাত্ত্বিক জুলিয়াস ল্যাঙ্গেরা ও এডলফ এরম্যানের ‘ফ্রলটালিটি’ সূত্রটিকে গ্রহণ করেছিলেন সেটিকে প্রাসঙ্গিক ভেবে বইতে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিল্পকলার ইতিহাস ক্ষেত্রটির নির্ধারিত যুগগুলোর ধারাবাহিকতা নিয়ে বেশির ভাগ গ্রন্থে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে গত শতাব্দীর পোস্ট মডার্নিজম পর্যন্ত রক্ষিত থাকে। কিন্তু এই বইয়ে লেখক দিকটিকে বিস্তৃত করেছেন আরও সাম্প্রতিক বা সমকালীন ধারাগুলোকে যুক্ত করে ভিন্ন একটি অধ্যায় রেখেছেন। অধ্যায়টি পোস্ট-পোস্ট মডার্নিজম আখ্যা দিয়ে তিনি এ ব্যাপারে নিজের বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন‘শিল্পের ইতিহাসের কোনো বইয়ে পোস্ট-পোস্ট মডার্নিজম কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে বলে আমার চোখে  পড়ে নি। বাহবা নেওয়ার জন্য এইসব ব্যতিক্রমী কাজ করা হয়নি, যুক্তিপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক হওয়ার জন্যই এদের অবতারণা।’

এই অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে শিল্পীদের অতি সাম্প্রতিক চর্চায় আনা ডিজিটাল আর্ট, ডিজিটাল ইমেজিং : ফটোগ্রাফে এবং প্রিন্ট, ইনস্টলেশন, ইন্টারনেট ও নেটওয়ার্ক আটর্, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি আর্ট ইত্যাদি। এই অধ্যায়টি লেখকের নিজের ইচ্ছাপ্রসূত। তবে অন্তর্ভুক্তিটা প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হতে পারে (যদিও বর্ণিত বর্তমান ধারাগুলো চলমান রয়েছে তাই এটিতে সবার খুঁটিনাটি জানার আগ্রহ তৈরি হবে। তবে এও ঠিক সমকালীন তাৎক্ষণিকতা মতন বহুদিক প্রযুক্তিকে ভর করে ক্রমে ক্রমে আরও ধরন, ধারার (সবগুলোকেই আর্ট বলা হবে কি না।) পরিবর্তন ঘটতে পারে। ইতিহাসে এসবের অনেকগুলোকেই টুকরো-টুকরো ক্ষণিক চর্চার ব্যাপার বলে অভিহিত হবে কি না সেইটির অপেক্ষায় থাকতে হবে।

শিল্পকলার নান্দনিকতা অধ্যায়টিতে ‘রস’ নিয়ে লিখেছেন। এই শব্দটি একান্তই বংলা ভাষার। উচ্চারণে খুবই ছোট হলেও এর ব্যবহার শিল্পকলার মতো বিশাল কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে বহুল উচ্চারিত। রসসৃষ্টি বা রসগ্রাহী করে তোলার ব্যাপারটি শিল্পীদের জন্যে অবধারিত দিক। কিন্তু তা এতটাই আপেক্ষিক যে, সংজ্ঞা দিয়ে বা কথা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। একেক শিল্পীর কাজের ধরনের, স্টাইলে, করণ প্রক্রিয়ায় একেকভাবে প্রতিভাত হয়, প্রকাশিত থাকে। দর্শক অথবা বোদ্ধাদের সেই রস আস্বাদনে কলারসিক মন ও চোখ বা বলা যায় মনোচক্ষু থাকতে হয় এইসব কথা বিভিন্নভাবে ব্যক্ত করেছেন বিজ্ঞজনরা। অনেকে বলেছেন ব্যাপারটি বোধের অন্তর্গত দিক, তাতে নির্ধারিত করে মাপার অবধারিত মাপকাঠি নেই। শিল্পকলা তাই সব কিছু মিলিয়ে এতটাই গোলমেলে যে তা নানাজন নানাভাবে ব্যাখ্যায় চেষ্টা করে থাকেন।

তবে শিল্পীরা এ নিয়ে কম কথাই বলে থাকেন। মনে পড়ছে, একবার শিল্পকলা কী এই প্রশ্ন শিল্পী টার্নারকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিশদে না গিয়ে বলেছিলেন ….ওঝ অ ঋটঘঘণ ইটঝওঘঊঝঝ’

 যাই হোক এই শিল্পকলার নান্দনিকতা গ্রন্থে লেখক সঠিক করেই বলেছেন যে, শিল্পকলা, নান্দনিকতা, রস ইতাদির মূল্যায়নে ‘নির্দেশিকা’ লিখিতভাবে নেই। ‘রস’ ব্যাপারটিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় রেখেছেন এবং সে প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উক্তিকে উদ্ধৃত করেছেন‘রস অনির্বচনীয় সুতরাং তার ক্রিয়ার মধ্যে একটা অনির্বচনীয় দিক রয়েছে সেই জন্য ঠিক করে কেউ বলতে পারে না কেমন করে কোন প্রক্রিয়া ধরে চললে রস হবে বা রস পাওয়া যাবে।’

বইয়ের শুরুর দিকেই লেখক যে শিল্পকলার নান্দনিকতা ইত্যাদি ব্যাপারগুলোকে জটিল বলেছেন, তা না মেনে উপায় নেই। এ এক রহস্যময় জগৎ। একের ভেতর হরেক দিকের সমাহার। সেখানে প্রবেশে জ্ঞানগম্যির মানুষ হতে হয় যেমন তেমনি সাধারণেরও মূল্যায়নের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। তবে বিশাল এই জগৎটির আনাচ- কানাচকে জানতে চিনতে পাঠ প্রয়োজন। লেখক সেই আয়োজনটি করেছেন বৃহৎ কলেবরে। নিষ্ঠার সাথে। তাঁকে পুনরায় সাধুবাদ জানাই এবং তাঁর এই গ্রন্থের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করছি।         

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares