আলোচনা : প্রবন্ধ―হাসনাত আবদুল হাই : সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব : নুরুল করিম নাসিম

যখন ধারাবাহিকভাবে সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব একটি স্থানীয় দৈনিকে ছাপা হচ্ছিল, তখন থেকে পাঠক আগ্রহ বোধ করেছে। নন্দনতত্ত্ব সবার জন্য নিশ্চয়ই নয় বিষয় হিসেবে, তবু লেখক অনেক যত্নে ও শ্রমে বইটি সহজবোধ্য করে লিখেছেন। যাতে সবার, যাঁরা সাহিত্যচর্চা করেন না, শিল্প সাহিত্যে যাঁদের অনুরাগ নেই, তাঁরাও বিষয়টির সহজ সরল উপস্থাপনার জন্য বইটি হাতে তুলে নেবেন।

নন্দনতত্ত্ব যে নিছক সৌন্দর্যের দর্শন নয়, এই কথাটি প্রবন্ধকার আটটি অধ্যায়ের আধারে অন্তর্ভুক্ত করে আমাদের একজন সফল শিক্ষকের মতো সাবলীলভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। পত্রিকায় যখন ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছিল, তখন এতটা সুসংগঠিত মনে হয়নি সঙ্গত কারণে। প্রতিসংখ্যায় এক একটি কিস্তির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে, সবসময় পেছনের রেফারেন্সের জন্য ফিরে তাকানো সম্ভব হয়নি, হয়তো পত্রিকার সাহিত্য পৃষ্ঠায় ছাপা হওয়ার কারণেই মনোযোগ তেমন একটা হয় না। কিন্তু গ্রন্থভুক্ত হয়ে একটি পরিপূর্ণ বই হিসেবে যখন পেলাম, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে বাধ্য হয়েছি। অসংখ্য বই রয়েছে যা শেষ পর্যন্ত সবটুকু পড়া হয় না। সম্ভবও নয়। কিন্তু নন্দনতত্ত্বের উপর লেখা এই বইটি প্রথম থেকে খুব টানে, পরবর্তী অধ্যায়ে অবলীলাক্রমে এগিয়ে যেতে হয়। নিঃসন্দেহে প্রবন্ধকারের এটা বিশেষ গুণ।

নন্দনতত্ত্ব বা এসথেটিকস্-এর ওপর বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত খুব বেশি বই হয়তো নেই, কিন্তু কলকাতায় এ বিষয়ে বেশ কিছু কাজ হয়েছে। বেশ কিছু গ্রন্থও আছে। তবে ইংরেজি ভাষায় অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। কিন্তু তারপরও নন্দনতত্ত্ব মুষ্টিমেয়ের আগ্রহের, অনুশীলনের ও পাঠের বিষয় হিসেবে গণ্য হতো। এ বিষয়টিতে সবার আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি। বিষয়টি সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছায়নি। সর্বসাধারণ বিষয়টির প্রতি কখনও কোনোদিন বিন্দুমাত্র উৎসাহ প্রদর্শন করেননি। কিন্তু কেন ? উত্তরটি খুব সহজ। এদিকটায় কেউ এগিয়ে আসেননি, এ বিষয়টি নিয়ে কেউ লেখেননি। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ছিটেফোঁটা লেখা হয়েছে। ফলে সাহিত্যের শিক্ষকেরা, সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীরা বাইরের বিদেশি ভাষায় লেখা গ্রন্থগুলোর ওপর নির্ভর করেছে। হাসনাত হাই প্রথম এ বিষয়টির ওপর একটি সারগর্ভ গ্রন্থ আমাদের উপহার দিলেন।

প্রথম অধ্যায়ে লেখা নন্দনতত্ত্বের ধারণা ও রূপরেখা এঁকেছেন। তারপর দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি অত্যন্ত পরিশ্রম ও যত্নে সাজিয়েছেন এর ইতিহাস। এখানে তিনি অসম্ভব খেটেছেন। অসংখ্য গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছেন। ‘নন্দনতত্ত্বের দেশকালপাত্র’ শিরোনামটি যথাযোগ্য হয়েছে বলে আমাদের ধারণা। তৃতীয় অধ্যায় ‘সৌন্দর্যের দর্শন’। প্রবন্ধকার নন্দনতত্ত্বকে এক বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করেননি, তিনি এর দার্শনিক, তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং ধারণাগত সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। চতুর্থ অধ্যায় ‘শিল্পের দর্শন’। এখানেও তিনি শিল্প বিষয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণাগুলো সংগ্রহ করে এই অধ্যায়ে সংযোজিত করেছেন। পঞ্চম অধ্যায় ‘সৌন্দর্যের দর্শন : দুই মহাদেশে।’ এটি একটি তুলনামূলক আলোচনা বা ‘ক¤পারেটিভ স্টাডি।’ ষষ্ঠ অধ্যায় ‘শিল্পতত্ত্ব’। এই অধ্যায়ে অ্যারিস্টটল, হার্বাড রিড, কলিংউড প্রভৃতি দার্শনিক/তাত্ত্বিকের মন্তব্যের নির্যাস সংক্ষিপ্তভাবে বিবৃত করেছেন। এই অধ্যায়টি ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হবে। অনেক সময় ভাষার প্রতিবন্ধকতার কারণে আমাদের অনেকের জন্য হার্বাড রিড, বা কলিংউডের মূলগ্রন্থ পড়া সম্ভব নাও হতে পারে। প্রবন্ধকার একাজটি সহজ করে দিয়েছেন। মূলগ্রন্থ না পড়েও আমরা শিল্পতত্ত্বের প্রধান পুরুষদের ভাবনা চিন্তার সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পাচ্ছি। সপ্তম অধ্যায় ‘সংস্কৃতি ও সমালোচনা তত্ত্ব’ পড়তে গিয়ে সংস্কৃতি বিষয়ে এডওয়ার্ড সাঈদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কালচার অ্যান্ড ইমপিরিয়ালিজম’ প্রসঙ্গত বিদগ্ধ পাঠকের মনে পড়বে। টি. এস এলিয়টও এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন তার সমালোচনা প্রবন্ধে। এই অধ্যায়ে প্রবন্ধকার সাংস্কৃতিক পালাবদল ও সমালোচনাতত্ত্বের ওপর সংক্ষেপে হৃদয়গ্রাহী আলোচনা করেছেন। রোমান্টিকতাবাদ, বাস্তববাদ, মার্ক্সবাদ ইত্যাদি বিষয়ে একটা সম্যক ধারণা আমরা এই অধ্যায়ে পাই। অষ্টম এবং শেষ অধ্যায় ‘নানন্দিক অভিজ্ঞতা।’ নান্দনিক বিষয়ের সঙ্গে নান্দনিক অভিজ্ঞতার স¤পর্ক এই অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

৩৯৫ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি লেখকদের জন্য, বিশেষ করে এই প্রজন্মের যারা লেখালেখিতে নিয়োজিত, তাদের অবশ্যপাঠ্য একটি বিষয়। আমরা সুন্দরকে নিয়ে কবিতা লিখি, অথচ নন্দনতত্ত্ব জানি না, নন্দনতত্ত্বের ইতিহাস জানি না। আজকে আমাদের এই সময়ে সাহিত্য করতে গিয়ে, নন্দনতত্ত্ব না জানলে আমাদেরই ক্ষতি ; কেননা আজকের পাঠক অনেক বেশি বোদ্ধা, অনেক বেশি বিদগ্ধ ও সচেতন। এই সময়কার পাঠককে কোনোভাবেই ছোটো করে দেখা যাবে না।

প্রবন্ধকারের পরিশ্রমের আরেকটা উজ্জ্বল উদাহরণ তাঁর ২২ পৃষ্ঠার এক বিশাল গ্রন্থপঞ্জি একটি বাড়তি পাওয়া। শুধু নন্দনতত্ত্ব বলি কেন, দীর্ঘ এই বইয়ের তালিকা ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী যে কোনো ব্যক্তির জন্য এক প্রয়োজনীয় নির্ঘণ্ট। একজন সাহিত্যের ছাত্র বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াকালীন কিছু নির্দিষ্ট বই পড়ে থাকে, এর বাইরেও যে পড়তে হয়, পড়া প্রয়োজন এ কথাটি কে বলবে ? বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ? তারা নিজেরাও তো একটি নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচির ভেতর বৃত্তবন্দি। অবশ্য ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। তবে তা খুবই নগণ্য। অনেক দিন আগে একটি বই পেয়েছিলাম। বইটি গ্রন্থতালিকা বিষয়ক। পৃথিবীর কোন দশকে কী কী ভালো বই রচিত হয়েছে তার তালিকা। এই সেদিন বইটি আবার হাতে পেলাম। বইটির পাতা উল্টে দেখলাম এই জীবনকালে কতটি বই পড়া হয়েছে, আর কী কী পড়া বাকি আছে। দুঃখের বিষয় এই যে, আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষক কিংবা প্রথিতযশা লেখকদের পাঠ্যতালিকা নেই। এদের পড়াশোনা একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর সীমাবদ্ধ। কথাগুলো এইজন্য উল্লেখ করছি যে, প্রবন্ধকার হাসনাত আবদুল হাই কয়েকশো বই পড়েছেন এবং তারপর এই বইটি লিখতে উদ্ধুদ্ধ হয়েছেন। এত শ্রম ও সময় ব্যয় করে একটি গ্রন্থ তৈরি করা নিঃসন্দেহে আমাদের প্রবন্ধ সাহিত্যের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। সবচেয়ে ভালো লাগে এই যে, প্রতিটি অধ্যায়ের আলাদা তালিকা তিনি তৈরি করেছেন। বিদগ্ধ পাঠক এই তালিকা পড়ে মিলিয়ে নিতে পারবেন নন্দনতত্ত্বের ওপর শুধু নয়, সাহিত্য বিষয়ে, সাহিত্য সমালোচনা বিষয়ে কী কী অবশ্যপাঠ্য বই তার পড়া প্রয়োজন। জানতে পারবেন তার জ্ঞানের পরিধি কোন জায়গায় এসে থেমে আছে। তাঁর ভূমিকা থেকে কয়েকটি বাক্য চয়ন করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন :

‘এর ফলে জীবনযাপন আরও একটু ‘সুন্দর’ এবং আনন্দময় হতে পারে। বইটিতে যে সব দর্শন তত্ত্ব এবং ধারণা স্থান পেয়েছে সে সবই অন্যের বই থেকে নেওয়া। তাঁদের অধিকাংশই বিদেশি এবং কিছু বাংলা ভাষাভাষী। আমি বিষয়টি সম্বন্ধে যা বুঝেছি সেই অনুযায়ী বিভিন্ন লেখকের বক্তব্যকে সাজিয়েছি। এই গ্রন্থনা সঠিক এবং স¤পূর্ণ, এমন দাবি করা যাবে না। অন্য কেউ, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, বিষয়গুলো অন্যভাবেও সাজাতে পারে।’

বেশ কিছুদিন আগে সীমন দা বভয়ারের লেখা দ্য সেকন্ড সেক্স পড়েছিলাম। পরে বাংলা ভাষায় লেখা দ্বিতীয় লিঙ্গ পড়ার সুযোগ হয়। ভাবতে খারাপ লাগছে বাংলা ভাষায় লেখা বইটির লেখক কোথাও মূল লেখকের কাছে ঋণ তো স্বীকার করেনইনি, বাংলা ভাষায় লেখা অন্য যে সব লেখকের লেখা থেকে ধারণা ধার নিয়েছেন সে ঋণও স্বীকার করেননি। হাসনাত আবদুল হাই, অনেক বেশি উদার ও বিনয়ী। তিনি লিখেছেন ‘বিভিন্ন লেখকের বক্তব্যকে সাজিয়েছি।’ প্রায় সবাই তাই করে, কিন্তু ঋণ স্বীকার করে না। হাসনাত হাই সবিনয়ে ঋণ স্বীকার করেছেন, তাঁর সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন।

নন্দনতত্ত্বের ওপর এ রকম গোছানো কাজ বাংলাদেশের সাহিত্যে হয়নি। সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি খুব দরকারি এই গ্রন্থের আত্মপ্রকাশকে আমরা অভিনন্দন জানাই। এই কালজয়ী কাজটি ঔপন্যাসিক-গল্পকার হাসনাত আবদুল হাইকে বাংলা সাহিত্যে একটি বিশেষ মর্যাদা দেবে বলে আমার বিশ^াস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares