আলোচনা : প্রবন্ধ―হাসনাত আবদুল হাই : জাপানের সংস্কৃতি : হাসনাত আবদুল হাই : সৈয়দ জাকির হোসাইন

দ্বীপদেশ জাপান। সূর্য উদয়ের দেশ জাপান। অতি বড় রাষ্ট্র নয়, তবে তার সংস্কৃতি বিচিত্র, সুপ্রাচীন ও অনন্য বৈশিষ্টের অধিকারী। এ কারণে পৃথিবীর সব দেশের মানুষের কাছে আকর্ষণ ও আগ্রহের বিষয় হয়ে রয়েছে জাপানের সংস্কৃতি।

পৃথিবীর সকল দেশেরই নিজস্ব সংস্কৃতি আছে কিন্তু জাপানিদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি যেমন ব্যাপক তেমন স্বকীয় বৈশিষ্ট্যময় এবং এমনটি বিশ্বের কম দেশেই দেখা যায়। জাপানের সংস্কৃতিতে সাহিত্যের বাইরে হাইকু, কাবুকি, নো, বনরাকু, ইকেবানা, চ্যানোয়ু, সামুরাই কিংবা শিন্টো ধর্ম বা জেন ধর্ম অনেক বড় স্থান অধিকার করে রয়েছে। জাপানের সংস্কৃতির অনেক কিছু তুলে ধরতে হলে বিশাল ক্যানভাস প্রয়োজন। স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই একাধিকবার জাপান ভ্রমণ করেছেন। সে সব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং তাঁর সংগৃহীত পুস্তক থেকে নেওয়া তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করেই বাংলা ভাষাভাষীর জন্য তিনি প্রণয়ন করেছেন জাপানের সংস্কৃতি শীর্ষক গ্রন্থটি। জাপানের সংস্কৃতি পাঠকের সামনে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। জাপানের সংস্কৃতির একটি বড় অংশের বিবরণ চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর প্রণীত পুস্তকে। জাপানের সংস্কৃতি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অ্যাডর্ন পাবলিকেশন।

জাপানের সংস্কৃতি গ্রন্থে তিনি নান্দনিকভাবে যে সকল বিষয় উপস্থাপন করেছেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে―১. জাপানের সংস্কৃতির পরিবর্তন, ২. জাপানের সংস্কৃতির দার্শনিকতা ও নান্দনিকতা, ৩. হাইকু, ৪. নো, ৫. কাবুকি, ৬. বুনরাকু, ৭. সঙ্গীত, ৮. কথা-সাহিত্য, ৯. চলচ্চিত্র, ১০. চিত্রকলা, ১১. ক্যালিগ্রাফি, ১২. ইকেবানা, ১৩. চ্যানোয়ু ইত্যাদি। জাপানি সংস্কৃতিতে স্থান দেওয়া সম্ভব হয়নি―জাপানের খাদ্য, পোশাক, বাসগৃহ ইত্যাদি। এসবের মাঝেও জাপানের সংস্কৃতির স্বকীয়তা খুঁজে পাওয়া যায়। উপস্থাপিত ক্যানভাস ছোট পরিসরের হওয়ায় লেখকেরও অতৃপ্তি রয়েছে।

তবে জাপানিদের জীবন যাপনে সংস্কৃতির ব্যবহারে বৈপরীত্য কিংবা সমন্বিত ব্যবহার অনেক দিন থেকেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখন বিশ্বায়নের যুগ। এখন সংস্কৃতি গতিশীল। তারপরও জাপানি সংস্কৃতির মূলধারা অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং অব্যাহত গতিতে তা চলমান।

প্রযুক্তির সঙ্গে সংস্কৃতির রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। মানুষের জীবন যাপনকে সহজ করে দেয় প্রযুক্তি। ফলে প্রযুক্তি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। জাপানিদের প্রতিভা ছিল ত্বরিতগতিতে অনুকরণের এবং গ্রহণ করে ব্যবহারের জন্য যা অনুকূল। এই প্রতিভার জন্য পাশ্চাত্যের উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কৃতি জাপানের সংস্কৃতিকে পর্যুদস্ত বা আমূল প্রভাবান্বিত করে রূপান্তরিত করতে পারেনি। পক্ষান্তরে জাপান শুধু পাশ্চাত্যের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বস্তুগত এবং অর্থনৈতিকভাবে এক সময় বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাকে যে অতিক্রম করে গিয়েছে তা হাসনাত আবদুল হাই তাঁর জাপানের সংস্কৃতি গ্রন্থে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। জাপানিদের চরিত্রের একটি চমৎকার দিক তিনি এতে তুলে ধরেছেন। জাপানিদের চরিত্রে একই সঙ্গে সৌন্দর্য ও যুদ্ধ বিগ্রহের বিষয়টির তথ্য তিনি তুলে ধরতে ভোলেননি। তবে  জাপানে সামাজিক বিন্যাসে সম্রাট এবং তাঁর বিশ্বস্তরাজন্যবর্গ সবার ওপরে থাকলেও তাদের সামরিক  ক্ষমতা ছিল দুর্বল। অনেক সময় সামরিক দলপতিদের কাছে সম্রাটের জমিদারি এলাকাও সংকুচিত  হয়ে যেত। সামরিক শ্রেণির কোনো সদস্য একাগ্রচিত্তে শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় মনোনিবেশ করেনি, কেননা এসব কাজে পৌরুষের এবং বীরত্বের প্রয়োজন নেই বলেই মনে করা হতো। জাপানের ইতিহাসে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক ক্ষমতা পরিচালনায় সামন্তযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সামুরাই শ্রেণি কর্তৃত্বের অধিকারী ছিল। তবে জাতি হিসেবে সবাই এই মানসিকতার অধিকারী ছিল তা নয়। যেসব শ্রেণি শিল্প সাহিত্যের চর্চা করেছে তাদের তেমন কোনো গুরুভার দায়িত্ব না থাকায় এবং অঢেল অবসরের জন্য তারা বংশানুক্রমে শিল্প সাহিত্যের কাজে লিপ্ত থেকেছে। বলা প্রয়োজন যোদ্ধা শ্রেণির সবাই যে কেবল যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত থেকেছে তা নয়। তাদের মধ্যে অনেক ব্যতিক্রমও আছে। কোনো কোনো সামুরাই দলপতি যোদ্ধার পেশা ত্যাগ করে অবসর নিয়ে সুন্দর উদ্যান সৃষ্টি করে শিল্পমণ্ডিত পরিবেশে জীবন যাপন করেছে।

এদিকে সামুরাই বা যোদ্ধা শ্রেণি বৌদ্ধ ধর্ম বিশেষ করে জেন শাখার বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিল বলে মনে করা হয়। তারা এই ধর্মের অধীনে সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে সেখানে তাদের অবদান রেখেছেন। যুদ্ধবাজ, লড়াকু মানসিকতার সামরিক শ্রেণিকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা যায় এজন্য যে তারা অবসর সময়ে সংস্কৃতির চর্চা করেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হয়েছিল।

কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের জাপানের সংস্কৃতি গ্রন্থে জাপানের সংস্কৃতির নানা দিক নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন এবং সার্থক হয়েছেন বলা যায়। বিষয়টি উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেছি এজন্য যে, আমি একজন প্রকাশকের বাইরে একজন নিবিষ্ট পাঠকও বটে। সমগ্র বইটি পাঠ করে আমি ঋদ্ধ হয়েছি। সাধারণ পাঠকের কাছেও জাপানি সংস্কৃতির তথ্যাবলি উপস্থাপন করার কাজে জনাব হাসনাত আবদুল হাই বলা যায় সার্থক হয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares