আলোচনা : প্রবন্ধ―হাসনাত আবদুল হাই : দারিদ্র্যরেখার নিচে যারা : অধ্যাপক মু. সিকান্দার খান

হাসনাত আব্দুল হাই এক প্রথিতযশা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার নাম। সত্তর-আশির দশকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও পরবর্তী বিভাগীয় কমিশনার পদ অলংকৃত করেন। চট্টগ্রামে থাকাকালে এখানকার শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য চট্টগ্রামের জনসাধারণের অত্যন্ত কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তার সান্ধ্যকালীন অবকাশ যাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সেখানে তখন বাংলা বিভাগে আনিসুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, চারুকলা বিভাগে মুর্তজা বশীর, রশীদ চৌধুরী প্রমুখ শিক্ষক কর্মরত। সান্ধ্যকালীন ঘরোয়া বৈঠকে আবু হেনা মোস্তফা কামালের বাসভবন ছিল হাসনাতের পরম আকর্ষণ। তখন তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সাধক।

অর্থনীতি বিষয়ের মেধাবী ছাত্র হাসনাত কর্মজীবনেও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার অধীত বিষয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ প্রায়োগিক বিষয়াবলির প্রতি অনুরাগী ছিলেন। অর্থনীতির ছাত্র এবং প্রথম জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকালে তার মধ্যে অর্থনীতি বিষয়ের যে ভিত রচিত হয় তা প্রশাসক হিসেবে উন্নয়ন কর্মে ব্রতী হতে সহায়ক হয়েছিল। উন্নয়ন প্রশাসনে নিযুক্ত থাকায় তিনি উন্নয়নতত্ত্ব বিশেষ করে গ্রামোন্নয়নের মাধ্যমে বিপুল জনসংখ্যার সমস্যাবলি সমাধানের সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগগুলোর বিশ্লেষণে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। বর্তমান গ্রন্থ ইবষড়ি ঃযব খরহব: জঁৎধষ চড়াবৎঃু রহ ইধহমষধফবংয এই পটভূমিতে রচিত একটি গবেষণা ফসল।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী নগর এবং গ্রামে বিভক্ত হয়ে আছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যাগুরুর বসবাস গ্রামাঞ্চলে এবং তা বিমোচনের সকল প্রয়াস তাই মূলত গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যেই পরিচালিত। লোকসংখ্যার তুলনায় দারিদ্র্য এখানে চাকরির সুযোগের অপ্রতুলতা এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য সমস্যা দ্বারা নির্ধারিত। গ্রন্থকার দারিদ্র্যের সংজ্ঞা  বোঝার জন্য বিভিন্ন গবেষক এবং গবেষণালব্ধ ধারণাগুলোর সমালোচনামূলক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। দারিদ্র্য দূরীকরণে নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের জন্য প্রথমত দারিদ্র্যের পরিমাপ গুরুত্বপূর্ণ। এ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন এ অংশে আলোচনা করা হয়েছে। দারিদ্র্যকে চিহ্নিতকরণ এবং দরিদ্রদের সংখ্যাগত পরিমাপ নির্ধারণের জন্য উপায় হিসেবে দারিদ্র্যের বিভিন্ন তাত্ত্বিক সংজ্ঞাগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ন্যূনতম মানের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাবই দারিদ্র্য। মৌলিক চাহিদা পূরণ করার মতো সম্পদ না থাকাই দারিদ্র্যএখানে মৌলিক চাহিদা কাঠামোয় খাদ্য এবং খাদ্য বহির্ভূত বস্তুও অন্তর্ভুক্ত।

দারিদ্র্যের পরিমাপ থেকে দারিদ্র্যের কারণ অনুসন্ধানের বিষয়টি লেখক পরবর্তী অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। এখানে আদর্শগত প্রশ্নগুলো উত্থাপন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আন্দ্রে গুন্দার ফ্রাঙ্কের কেন্দ্র-প্রত্যন্ত (পবহঃৎব-ঢ়বৎরঢ়যবৎু) অঞ্চল, রায় চৌধুরীর ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব, অমর্ত্য সেন এবং মায়ারডলের মতবাদ, শাসক (রাষ্ট্রের) দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবও এ বিশ্লেষণের অন্তর্ভুক্ত। অনুৎপাদনশীল বিনিয়োগ, উন্নয়ন কৌশলে শিল্প/নগর খাতে বিনিয়োগের প্রতি পক্ষপাতিত্ব এবং কৃষি খাতে ক্রমহ্রাসমান বরাদ্দ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার, আর্থিক খাতে আশি এবং নব্বইয়ের দশকে অনুসৃত কাঠামোগত বিন্যাসনীতি প্রভৃতি এ অধ্যায়ের আলোচনার বিষয়। এছাড়া আয় ও সম্পদ বণ্টন, চাকরি ও মজুরি হার, গ্রামীণ খাতে খামার বহির্ভূত চাকরি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রভৃতি এ অধ্যায়ের আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।

তৃতীয় অধ্যায়ে দরিদ্রদের চিহ্নিত করে তাদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত পরিসংখ্যানগত পরিচিতি, ভূমিহীনতার বিস্তার ইত্যাদির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। লেখক ক্ষুদ্র পেশাজীবী, নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে দারিদ্র্য দূরীকরণের বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবস্থান অনুসন্ধান করতে গিয়ে বন্যা, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। বার্ষিকচক্রে বিভিন্ন ঋতুতে দারিদ্র্যের প্রকোপ হ্রাস-বৃদ্ধিও এ আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।

দারিদ্র্যবিমোচন কৌশল অধ্যায়ে বিভিন্ন পরিকল্পনাকালে অনুসৃত নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার, রাজস্ব এবং মূল্যনীতি ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবন-মান উন্নয়ন এবং বিত্তশালীদের ব্যয় সংকোচনের উদ্দেশ্যে শিল্পের জাতীয়করণ, পুনর্বণ্টনের উদ্দেশ্যে ভূমি সংস্কার, শ্রমঘন উৎপাদন কৌশল, মৌলিক চাহিদা পূরণকারী দ্রব্যাদি উৎপাদনে গুরুত্ব আরোপের প্রয়াসগুলোর সবিস্তার ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথম পাঁচসালা পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) থেকে চতুর্থ পাঁচসালা পরিকল্পনাকাল (১৯৯০-৯৫) পর্যন্ত উদ্যোগ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। এ সময়ে বিশেষত দ্বিতীয় পরিকল্পনাকাল পর্যন্ত বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা থেকে প্রভূত সহায়তা পাওয়া গিয়েছে, পক্ষান্তরে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ করে দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে প্রায় অনুপস্থিত।

তৃতীয় পরিকল্পনা দলিলেও দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য উৎপাদনশীল কর্মসুযোগ সৃষ্টি, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাসকরণ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তবে উন্নয়ন কাক্সিক্ষত মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য সার্ক ঐকমত্য এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (চবৎংঢ়বপঃরাব চষধহহরহম) (১৯৯৫- ২০১০) দলিলে গৃহীত প্রয়োজনীয় কৌশল আলোচনার মাধ্যমে এ অধ্যায়ের সমাপ্তি টানা হয়েছে।

বিভিন্ন পরিকল্পনা দলিলে প্রস্তাবিত কৌশলের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে যে কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল পঞ্চম অধ্যায়ে তা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গ্রন্থকার এখানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগগুলোর পৃথক বর্ণনা দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে ভূমি সংস্কার, মৎস্য ও জলাশয় ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারের প্রগাঢ়তর ব্যবহারকল্পে গঠিত আদর্শ গ্রাম প্রকল্পের গঠন এবং কার্যক্রম পরিচালনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

একই অধ্যায়ে প্রান্তিক চাষি, ভূমিহীন ও দুস্থ নারীদের দারিদ্র্য দূরীকরণে গৃহীত সরকারি প্রকল্পগুলোর গঠন, পরিচালনা এবং অর্থায়ন বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে আলোচনায় উপস্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ সামাজিক সেবা, নারী ও যুবকদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, সম্প্রদায়ভিত্তিক সেবা, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, কয়েকটি পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প, গ্রামীণ দরিদ্র সমবায় প্রকল্প, ক্ষুদ্র ও ভূমিহীন সমবায় প্রকল্প, দুস্থ নারীদের জন্য আত্মকর্মসংস্থান, গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্পগুলো পৃথকভাবে উত্থাপিত হয়েছে। দরিদ্রদের জন্য ঋণ সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে কৃষি ব্যাংক এবং পি.কে.এস.এফ. (চধষষর কধৎসধ-ঝধযধুধশ ঋড়ঁহফধঃরড়হ) এর ভূমিকা অপেক্ষাকৃত বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ অংশে পি.কে.এস.এফ. প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়ায় আই.ডি.এফ. (ওহঃবমৎধঃবফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঋড়ঁহফধঃরড়হ) এর দৃষ্টিভঙ্গি তথা সরকারের সাথে বিদেশি সাহায্য সংস্থার দরাদরির একটি প্রামাণ্য চিত্র পাওয়া যায়। পি.কে.এস.এফ. এখন দারিদ্র্যবিমোচনে একটি অত্যন্ত সফল আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

সরকারের পাশাপাশি এ সময় অনেকগুলো বেসরকারি সংস্থাও দারিদ্র্যবিমোচনে অংশগ্রহণ করে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে এ রকম আটটি বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রম বিবৃত হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অনেকগুলো বেসরকারি সংস্থা মানবিক সাহায্যের জন্য গঠিত হয়েছিল। তাদের প্রায় সবগুলোই ক্রমান্বয়ে চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ ও বন্যা থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প নেয় তারা। সেসময় এ কৌশল সফলতা পাওয়ায় পরবর্তীকালে তা সরকারের তরফে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়। তাছাড়া এ সমস্ত সংস্থাগুলোকে অবকাঠামো নির্মাণ থেকে জলাশয় ও বন ব্যবস্থাপনায়ও অংশীদার করা হয়। বাংলাদেশের বৃহত্তম এবং প্রাচীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক এর বর্ণনা দিয়েই এ অধ্যায় শুরু হয়। দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর যাত্রা ১৯৭২ সালে। নানা পরীক্ষা পার হয়ে ১৯৮৬ সালে এর পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (জউচ) রূপ লাভ করে। ব্র্যাক মডেলে প্রকল্প সংগঠকের নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ, ঋণ, সামাজিক প্রকল্প এবং দল গঠন এখানে একীভূত। সঞ্চয় এখানে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রাম সংগঠকের মাধ্যমে ঋণদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। সামাজিক সচেতনতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টির জন্য দলের সকল সদস্যের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ব্র্যাকের ঋণদান প্রকল্প অন্যান্য উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা নিরসনের প্রয়াস হিসেবে গৃহীত হয়। শেষ পর্যন্ত এটি রূপান্তরিত হয় ব্র্যাক ব্যাংকে।

গ্রন্থকার এ অংশে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম বর্ণনা করেছেন। প্রাথমিকভাবে শস্যখাতের বাইরে গ্রামীণ পেশার অন্যান্য খাত নিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ দরিদ্রদের ঋণ সুবিধা দানের জন্য সরকারি আদেশ বলে ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সভ্যরাই গ্রামীণ ব্যাংকের সিংহভাগ শেয়ারের মালিক এবং মাত্র ১০ শতাংশ সরকারের মালিকানায়। গ্রামীণ ব্যাংককে ভ্রমবশত অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করেন। বর্তমান গ্রন্থেও গ্রামীণ ব্যাংককে এ অংশে অন্তর্ভুক্ত করায় একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এটি আইন বলে এবং এর ঋণদান কর্মসূচি মতে একটি বেসরকারি ব্যাংক হলেও এর বিশেষত্বই হলো ব্যাংকটির গঠন, সঞ্চয় আহরণ এবং ঋণদান পদ্ধতি ঋণগ্রহীতা এবং সঞ্চয়ীদের সুবিধার প্রতি বিশেষ বিবেচনায় উদ্ভাবিত এবং এই সভ্যদের সেবাতেই নিবেদিত। বিভিন্ন সময়ে এ ব্যাংকের স্থিতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে গ্রামীণ সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং পরবর্তী কার্যকারিতার জন্য সকল মহলের প্রশংসা অর্জন করেছে। ফলশ্রুতিতে, এই ব্যাংক এবং এর স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রধান ব্যক্তি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। এ দুটি বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়া আরও ৬টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। এসকল উদ্যোগের মধ্যে ঈঅজওঞঅঝ, রংপুর-দিনাজপুর পল্লী সমাজ (জউজঝ), আশা (অংংড়পরধঃরড়হ ভড়ৎ ঝড়পরধষ অফাধহপবসবহঃ), স্বনির্ভর, প্রশিকা, নিজেরা করি প্রভৃতি সংস্থার গঠন, সেবার ধরন, অর্থায়ন ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ৭ম অধ্যায়ে এ ধরনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য গৃহীত কৌশল, প্রকল্প এবং নকশা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার অবতারণা করা হয়েছে।

অষ্টম অধ্যায়ে গ্রন্থকার দারিদ্র্যবিমোচনে নিবেদিত বিভিন্ন উদ্যোগের মূল্যায়ন এবং বাংলাদেশের দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের জন্য একটি ধারণাগত কাঠামো তৈরি করেন। দারিদ্র্য ব্যাখ্যার জন্য গবেষণামূলক বিভিন্ন চলকের মধ্যকার সম্পর্ক (ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া) বোঝা দরকার। মূলত এই ব্যাখ্যামূলক চলকগুলো হচ্ছে এই প্রণালির নেতিবাচক মাত্রা। এর উপকারভোগীরা মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। কিন্তু, তারাই এখানে সর্বশক্তির অধিকারী। অন্যদিকে, বিশাল দরিদ্র জনগণ এখানকার উৎপাদন এবং বণ্টন ব্যবস্থা থেকে বিচ্যুত, প্রান্তে ভাসমান। এই বিশাল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উৎপাদনব্যবস্থায় ভূমি সম্পদ কিংবা মূলধনের মতো উৎপাদন উপকরণের মালিকানা না থাকার কারণে বিনিয়োগকারী হিসেবে তাদের ভূমিকা হারায়। তারা কিংবা তাদের পূর্বপুরুষগণ অসম বিনিময় হারের কারণে উৎপাদন সরঞ্জামের মালিকানা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে তারা ভরণপোষণের মজুরি পেশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে অসম বিনিময়ের কারণে তারা মজুরিতে চাকরি নিতে বাধ্য হয়। এ ভাবে সৃষ্ট দরিদ্রচক্র ক্রমাগতভাবে আবর্তিত হয়ে থাকে। গ্রন্থকার এ পর্যায়ে হার্ভে লাইবেনস্টেইন, গলবেথ এবং আলমগীর প্রমুখ অর্থনীতিবিদের মতবাদ এবং সমস্যা সমাধান সংক্রান্ত উদ্ভাবিত তত্ত্বসমূহ উপস্থাপন করেছেন।

গ্রন্থের উপসংহার অধ্যায়ে গ্রন্থকার করণীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা উত্থাপন করেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল জাতীয় অঙ্গীকার। প্রয়োজন একটা সময়কালের মধ্যে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, সম্পদ সংস্থান এবং সমন্বয় সাধন। অতীতের গৃহীত কৌশল এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্প পর্যালোচনায় বোঝা যায়, সঠিক পথে অগ্রসর হওয়ার পরও বরাদ্দকৃত সম্পদ অপ্রতুল এবং লক্ষ্যবস্তু অনিশ্চিত হওয়ার কারণে এ উদ্যোগগুলো কাক্সিক্ষত ফল লাভে ব্যর্থ। বিভিন্ন স্তরে গৃহীত অতীতের কর্মসূচি নিরীক্ষা করে এগুলোর ব্যর্থতার দিকগুলোর বিবেচনায় নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সামগ্রিক স্তরে ভূমি সংস্কার, জলাশয় বন্দোবস্ত, গ্রামীণ সরকারি খাতগুলোতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, গ্রামীণ পণ্যের উচ্চতর বিনিময় হার নিশ্চিতকরণ ইত্যাদির ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করতে হবে। উপরন্তু, কর নির্ধারণে ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক চাষিদের রেয়াত প্রদান, দরিদ্র অঞ্চলে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, পল্লী রেশনিং, ঋণদান কর্মসূচি (সম্প্রসারণ) ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (ঘ.এ.ঙ) কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দরিদ্রদের অবস্থার উন্নতি সাধন করা যায়। এভাবে অর্থনীতির মূল স্রোতের সঙ্গে তাদের একীভূত করার মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচন প্রয়াস সাফল্য লাভ করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares