আলোচনা : নাটক―হাসনাত আবদুল হাই : আমার দৃষ্টিতে হ্যাম-বেথ নাটক : আতাউর রহমান

হাসনাত আবদুল হাই শিক্ষাগত ও পেশাগত জীবনে একজন কীর্তিমান বাঙালি। উনি দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং পেশাগত জীবনে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদে আসীন ছিলেন। এই সবকিছুকে অতিক্রম করেছে তাঁর লেখকসত্তা। হাসনাত আবদুল হাই আমাদের দেশের তথা বাংলা সাহিত্যের একজন যশস্বী লেখক। তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় নেই এমন কম বাঙালিই আছেন। তাঁর লেখা নভেরা, একজন আরজ আলী, ভ্রমণ সমগ্র বিভিন্ন দেশের ওপর তাঁর সংস্কৃতি বিষয়ক রচনা ও পুস্তক বাংলাদেশের মানুষদের কাছে অতি পরিচিত।

সম্প্রতি হাসনাত আবদুল হাই হ্যাম-বেথ শিরোনামে একটি নাটক রচনা করেছেন। আগামী প্রকাশন এই নাটকের প্রকাশক। নাটকটি উনি উৎসর্গ করেছেন একজন মঞ্চ-নাটকের অঙ্গনের ডুবে থাকা মানুষকে এবং বর্তমান লেখক সেই ব্যক্তি। উৎসর্গ পৃষ্ঠায় লেখা আছেউৎসর্গ মঞ্চসারথি আতাউর রহমান।

এই নাটকটিকে সমালোচনা করার অভীপ্সায় আমি কলম ধরিনি। কোনো কোনো নাটক মঞ্চায়নের জন্যে লেখা হয় না; সাহিত্যকর্ম হিসেবে পাঠকের জন্য লেখা হয়। হাসনাত আবদুল হাই আমাকে জানিয়েছেন যে; উনি নাটকটি সাহিত্য কাজ হিসেবে রচনা করেছেন; মঞ্চায়িত হতেই হবে এমন কোনো অভিপ্রায় তাঁর নেই।

নাটকটি জগদ্বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের হ্যামলেট ও ম্যাকবেথ নাটকের সমন্বয়ে রচিত হয়েছে। ম্যাক-বেথ নাটকের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো : লাগাম ছাড়া উচ্চাশা কীভাবে মানুষকে জগতের ঘৃণ্যতম অপরাধের দিকে ঠেলে দেয় এবং ‘চলমান ছায়া’ সদৃশ আমাদের এই পার্থিব জীবন স্বাভাবিক পরিণতির পথে না গিয়ে কখনও কখনও মাঝপথেই অপরাধের রক্তাক্ত নদীতে আত্মাহুতি দেয়। হ্যামলেট নাটকের মূল সারাৎসার হলো জীবনের দোদুল্যমানতা কীভাবে একাধিক নাট্য-চরিত্রের অকাল পরিণতি ডেকে আনে। দু’টো নাটকেরই মূলে রয়েছে পার্থিব ক্ষমতা লোভের উচ্চাশা মানুষকে কীভাবে অকাল মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের হ্যাম-বেথ নাটক সম্পর্কে আমার সামান্য অভিমত এখন ব্যক্ত করি। নাটকটি পুস্তক আকারে ১৪৬ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত হয়েছে।

আমার কাছে নাটকটি কলেবরে একটু বৃহৎ মনে হয়েছে। মঞ্চায়ন করার সময় নাট্য-নির্দেশককে নাটকটিকে সম্পদনার মাধ্যমে ছোট করে দেড় থেকে দু’ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে হবে। নাটকের সংলাপগুলোকে আরেকটু সংকুচিত করা যেতে পারে। বাংলাদেশের একজন নাট্য নির্দেশক হিসেবে এই হলো আমার অভিমত।

যেহেতু, শেক্সপিয়রের দু’টো নাটকের মূলে রয়েছে মানুষের রক্তপায়ী লোভজনিত উচ্চাশা, সেহেতু আমার ধারণায় দু’টো নাটকের মিশ্রণ এক নব প্রয়াস এবং হাসনাত আবদুল হাই একজন দূরগামী দৃষ্টিসম্পন্ন লেখক হিসেবে এই প্রয়াসে সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন। নাট্যকার পরিশিষ্ট-ক’তে  মঞ্চ-নির্মাণের বিবরণ দিয়েছেন। পরিশিষ্টখ’তে আছে সংগীত ও পোশাকের পরামর্শ। পরিশিষ্ট-তে অন্যান্য টিকা দিয়েছেন। যেমন ম্যাকবেথ নাটকের ডাকিনীদের পরিবর্তে ভবিষৎ দ্রষ্টা নস্ট্রাডামাসকে এনেছেন যাঁর অনেক ভবিষৎ বাণী সত্য-রূপে পর্যবসিত হতে দেখেছে জগৎবাসী। আসলে মানুষের ষষ্ঠ (অন্তর্গত) ইন্দ্রিয় মাঝে মধ্যে অতীত ও ভবিষৎ সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে যায়। যেমন, আড়াই হাজার বছর আগে লেখা সফোক্লেসের ‘ত্রিকালদর্শী’ অন্ধ টাইরেসিয়াস অনেক সত্য কথা আগে থেকেই উচ্চারণ করতেন। বর্তমান বিশ্বের গণকেরা তাই করে থাকেন।

শেক্সপিয়রের হ্যামলেট ও ম্যাকবেথ নাটকদ্বয়ের মূলে রয়েছে মানুষের উচ্চাশাজনিত লোভ-লালসার বহিঃপ্রকাশ এবং পরিণামে নির্মম হত্যাকাণ্ডসমূহ। সুতরাং ম্যাকবেথ নাটকের পুণ্যবান রাজা ডানকান মিলেমিশে হ্যামলেটের ভ্রাতার হাতে নিহত তাঁর পিতা (জ্যেষ্ঠ হ্যামলেট) এক দেহে লীন হতে পারেন। প্রবল উচ্চাশায় ম্যাকবেথ ও হ্যামলেটের পিতৃব্য-সিংহাসনে আসীন রাজা ক্লডিয়াস এক সত্তায় বিলীন হয়ে যায়। এমনকি হ্যামলেট নাটকের আপাত সুবোধ ওফেলিয়ার  উচ্চাশার দৌড়ে ম্যাকবেথ নাটকে লেডি ম্যাকবেথ এবং হ্যামলেট নাটকের ওফেলিয়ার আত্মিক মিল রয়েছে। সবশেষে, বলব নাট্যকার হাসনাত আবদুল হাই একটি অনাস্বাদিত নিরীক্ষা করেছেন। আমার পরামর্শ যে, নাটকটি শেষ হতে পারেহ্যামলেট নাটকের ‘দ্য রেস্ট ইজ সাইলেন্স’ (অতঃপর নীরবতা) সংলাপটি দিয়ে। সঙ্গীতের মধ্যে দিয়েও এই সংলাপ ব্যক্ত করা যায়। আমাদের বৈচিত্র্যময় জীবনের এটিই শেষ উচ্চারণ বা কথা। তবে নাট্যকার হাসনাত আবদুল হাইয়ের নাটকটিতে বেশ কয়েকটি শব্দের ও বাক্যের/সংলাপের ছাপার প্রমাদ রয়েছে যা প্রকাশকের অনবধানতার কারণেই ঘটেছে বলে আশঙ্কা করছি। দ্বিতীয় মুদ্রণে নাট্যকার আশা করি এই ভুলগুলো শুদ্ধ করে দিবেন। অনেক শব্দে ‘চন্দ্রবিন্দু’র অহেতুক দৌরাত্ম্য দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আশা করি, নাটকটি পাঠকদের ও নাট্যজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, কারণ হ্যাম-বেথ নব চেতনা উদ্ভূত একটি সাহিত্যসৃজন। আমি নাটকটির সমৃদ্ধ সাহিত্য মূল্য বিচার করে বলব, নাটকটির ভবিষ্যতে একাধিক মঞ্চায়নেরও মুখ দেখব হয়তো।

হ্যাম-বেথ নাটকের আমি সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares