আলোচনা : চলচ্চিত্র―হাসনাত আবদুল হাই : চলচ্চিত্রের নান্দনিকতায়ও আছেন তিনি : অনুপম হায়াৎ

লেনিন চলচ্চিত্রকে সর্বকালের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বলে বর্ণনা করেছিলেন। ১৮৯৫ সালে চলচ্চিত্র আবিষ্কারের আগে কে জানতো এই মাধ্যমটি এক সময় প্রযুক্তি-বিনোদন-বাণিজ্য-শিল্প- সংস্কৃতি-সমাজ- গণমাধ্যম- নন্দনতত্ত্ব জগৎকে আলোড়িত- বিলোড়িত করবে। ব্যাপারগুলো নতুন করে ভাবতে হলো কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাইয়ের চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা বইটি পড়তে পড়তে। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৫ সালে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লিমিটেড থেকে। বইটিতে ১৪টি ভুক্তি রয়েছে।

এগুলো হচ্ছে : ভূমিকা, সচল দৃশ্যকল্প, শ্রুত ভাষা, লিখিতভাষা, সাঙ্কেতিক ভাষা, কারিগরি ভাষা, সম্পদনার ভাষা এক ও দুই, মনস্তত্ত্বের ভাষা, নারীবাদী ভাষা, রাজনীতির ভাষা, রূপতত্ত্বের ভাষা, প্রথম পর্বের ফিল্মতত্ত্ব; একটি সমীক্ষা ও উপসংহার। এ ছাড়াও রয়েছে মুখবন্ধ এবং গ্রন্থপরিচয়।

২.

বাংলাদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাত ঘটে ১৯৫০ দশকে ফজলুল হকের সিনেমা, এস এম পারভেজের চিত্রালী ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে। আর সারা পাকিস্তানে প্রথম গ্রস্থ রচনার কৃতিত্ব আলমগীর কবিরের সিনেমা ইন পাকিস্তান (১৯৬৯) এর মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর চলচ্চিত্রবিষয়ক গ্রন্থ রচনার পরিমাণ বাড়তে থাকে। তবে সেসব বেশিরভাগ গ্রন্থই ইতিহাস-নির্ভর। ২০০৪-৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চলচ্চিত্র পঠন-পাঠনভুক্ত হয়। তখন থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে নানা ধরনের বইও প্রকাশিত হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে হাসনাত আবদুল হাইয়ের আলোচ্য গ্রন্থটি একেবারেই আলাদা। চলচ্চিত্র পরিচালনা, প্রযোজনা, অভিনয় বা কারিগরি বিষয় নয় একেবারে নন্দনতত্ত্ব নিয়ে গ্রন্থ। এ ক্ষেত্রে তিনি এ দেশে পথিকৃৎ বটে। এর আগে


অবশ্য তানভীর মোকাম্মেল আবেগময় চলচ্চিত্রের নন্দনতত্ত্ব ও ১২জন ফিল্ম ডিরেক্টর এবং সিনেমায় শিল্পরূপ নামে বই লিখেছেন। তবে হাসনাত আবদুল হাইয়ের গ্রন্থটির বিষয়বস্তু যেম একক তেমন ভিন্নতরও।

৩.

আলোচনার সূত্রপাত করা যেতে পারে গ্রন্থোর শেষ ‘গ্রন্থপঞ্জি’ থেকে। এতে ৬৪টি গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। চলচ্চিত্রের নান্দিকতা লিখতে গিয়ে কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই যে এতগুলো গ্রন্থের সহায়তা নিয়েছেন সেজন্য তাঁকে ধন্যবাদ। এতে স্পষ্ট হয় বিষয়টি সম্পর্ক তাঁর অন্বেষা ও অধ্যয়নের গভীরতার পরিমাণ, শ্রম ও মননশীলতা। গ্রন্থপঞ্জির সঙ্গে প্রকাশকের নাম, ঠিকানা ও সাল উল্লেখ করলে ভালো হতো।

‘মুখবন্ধ’ থেকে জানা যায় লেখকের চলচ্চিত্রের প্রতি গভীর আগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট বই সংগ্রহ সম্পর্কে। এই বইটি রচনার আগে তিনি সবার জন্য নন্দতত্ত্ব নামে আরেকটি বই লিখেছেন। প্রসঙ্গত গল্পকার, ঔপন্যাসিক তথা কথাশিল্পী এবং সুদক্ষ আমলা হাসনাত আবদুল হাই যে একজন উঁচু মানের চলচ্চিত্রপ্রেমী তার ইঙ্গিত ‘মুখবন্ধ’য় পাওয়া যায়। ভূমিকায় লেখক সংক্ষিপ্ত চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও তৎসঙ্গে নান্দনিক উৎকর্ষ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। চলচ্চিত্র আসলে গতিশীল চিত্রের ব্যঞ্জনা। ‘সচল দৃশ্যকল্প’ পর্বে সিনেমার নান্দনিকতার বিচার কীভাবে হবে গ্রন্থের পরবর্তী অধ্যায় বা পর্বে তার সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘শ্রুতভাষা’ পর্বে ‘শব্দ ও সংলাপ’, ‘সংগীত ও অ্যাকশন’, ‘নাটকীয় মুহূর্ত’ নিয়ে খুব সহজ ভাষায় আলোকপাত করা হয়েছে।

নান্দনিক গুণসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য লিখিত ভাষা অর্থাৎ সুলিখিত চিত্রনাট্য প্রয়োজন। এতে পরিচালক পাত্র-পাত্রী কলা-কুশলীদের জন্য নির্দেশনা থাকে। লিখিত ভাষা পর্বে ছক ও উদাহরণসহ চমৎকারভাবে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

‘সাঙ্কেতিক ভাষা’ পর্বটি খুবই চমৎকার এবং গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্র নির্মাণ, অধ্যয়ন, গবেষণা ও অনুভবের ক্ষেত্রে যেমন সোমিওলোজি বিরাট অবদান রাখে তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাকেও সমৃদ্ধ করে।  গ্রন্থের পঞ্চম পর্ব ‘কারিগরি ভাষা’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে লেখক ভিজ্যুয়াল ইমেজের নির্মাণ, শট, মিজঅঁ সিঁ ছবি তোলার আনুপাতিক হার ক্যামেরার কম্পোজিশন শট, শটের ফ্রেম, বস্তুগত ও নির্বস্তুগত আর্ট, গতিশীল শট, জুম ও ফিল্মশট, কাট ডিজলভ, ওয়াইপ ইত্যাদি নিয়ে উদাহরণসহ আলোচনা করেছেন। চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা সৃষ্টির পেছনে এসবের ভূমিকাও বর্ণনা করেছেন খুব সহজ ভাষায়। চলচ্চিত্রের নির্মাতা, গবেষক, শিক্ষক এবং রসিকদের জন্য এই পর্বটি অত্যাবশ্যক। কেননা চলচ্চিত্রের ভাষা আসলে কারিগরি ভাষা।

বলা হয়ে থাকে যে, চলচ্চিত্র আসলে নির্মিত হয় সম্পাদনার টেবিলে। উক্তিটি একেবারে মিথ্যে নয়। পরিচালনার পাত্র-পাত্রী-কুশলীরা যা-ই করুক না কেন শেষ পর্যন্ত তার যাচাই-বাছাই- সৃজন-ব্যঞ্জনা তৈরি হয় সম্পাদনার মেশিনে। সম্পাদক শট জোড়া দিয়ে শব্দ ব্যবহার করে তৈরি করেন আসল চলচ্চিত্র। এভাবে তৈরি হয় চলচ্চিত্রের ভাষা। লেখক হাসনাত আবদুল হাই অত্যন্ত দরদ দিয়ে বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন চলচ্চিত্র থেকে উদাহরণ টেনে ‘সম্পাদনার ভাষা’ (এক ও দুই) সাজিয়েছেন। সম্পাদনার ক্ষেত্রে কীভাবে ছন্দ, সময় স্থান, গভীরতা, মনতাজ, আন্দাজ পদ্ধতি কাজ করে এবং নির্বাক ও সবাক যুগে কীভাবে সম্পাদনা হতো প্রভৃতি নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা রয়েছে এই পর্বে।

চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা নির্মাণে মনস্তত্ত্ব বিরাট ভূমিকা পালন করে। লেখক এ  ক্ষেত্রে ১৯২০ দশকের পরাবাস্তববাদ থেকে শুরু করে ১৯৭০ দশক পর্যন্ত বিভিন্ন গবেষক-দার্শনিকের সহায়তায় চলচ্চিত্রে কীভাবে ‘মনস্তত্ত্বের ভাষা’ প্রয়োগ হয়েছে সে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। এতে তিনি ফ্রয়েড,  লাকাঁ, মেৎজ, মুলাভে প্রমুখের সহায়তা নিয়েছেন। নারীবাদ হচ্ছে আধুনিক ধারণা। কিন্তু শিল্প-সাহিত্যে নারীর ব্যবহার চলে আসছে সেই আদিকাল থেকে। আধুনিককালে নারীকে ‘মানুষ’ হিসেবে ভাবা হচ্ছে শুধু কামনার বস্তু হিসেবে নয়। কিন্তু চলচ্চিত্র আবিষ্কার পর্ব থেকে পুরুষের আধিপত্য চলে আসছে সেই পুঁজিলগ্নি থেকে শুরু করে প্রদর্শন পর্যন্ত। ১৯৭০ দশকে চলচ্চিত্র আলোচনায় নারীবাদী ধারণা পায়,  নির্মাণ প্রকরণ ও মূল্যায়ন সূত্রে। এ সবের মূল হচ্ছে নারীর ভাবমূর্তি নির্মাণ। নারীবাদের মূল বিষয়টি চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রতিনিধিত্ব, দর্শক, লিঙ্গ পার্থক্যের পাশাপাশি বিস্তৃত পরিধিতিতে বিবেচিত হয়। এখানে নারী শুধু যৌনতা বা সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। নারী হয়েছে সত্য-সুন্দর-কল্যাণ- সৃজনশীলতার প্রতীক। এই পরিপ্রেক্ষিতে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে ‘নারীবাদী ভাষা’।

যে রাজনৈতিক  বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় চলচ্চিত্র তৈরি হয় সেই চলচ্চিত্রটি বিরাজমান ব্যবস্থারই প্রতীক বা উদাহরণ। এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট করে বলা যায় ‘গড ফাদার’ মার্কিন পুঁজিবাদের উদাহরণ আর ‘অক্টোবর’ রুশ সমাজবাদের উদাহরণ। প্রথম মহাযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর চলচ্চিত্র নির্মাতারা রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিনোদনের পাশাপাশি চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে প্রচারের মাধ্যমও। আমেরিকা, জার্মানি, স্পেন, রাশিয়া চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আদর্শও তুলে ধরে। ১৯৬০ দশকের শেষ দিকে ল্যাটিন আমেরিকায় চালু হয় তৃতীয় চলচ্চিত্র ধারা। চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে বিপ্লবের মাধ্যমও। লেখক ওই পর্বে পুঁজিবাদ, ফ্যাসিবাদ, মার্কসবাদ, সমাজবাদ, গঠনবাদ কীভাবে চলচ্চিত্রের নান্দনিক ভাষা নির্মাণে প্রভাব বিস্তার করেছে তার বিবরণ দিয়েছেন।

গ্রন্থের পরবর্তী পর্ব ‘রূপতত্ত্বের ভাষা’ কীভাবে ১৯২০ দশকে রাশিয়ার সূত্রপাত তার উল্লেখ করে ১৯৮০ দশকেও কাজ করেছে তার বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন। এ ছাড়া রয়েছে, প্রথম পর্বের ফিল্মতত্ত্ব, একটি সমীক্ষা’ শিরোনামে আলোচনা। বিষয়টি ইতিহাস আশ্রয়ী। বিভিন্ন চলচ্চিত্র তত্ত্ব নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

উপসংহার পর্বটি ক্ষুদ্র এবং এতে তাড়াহুড়োর ছাপ রয়েছে।

পরিশেষে লেখকের গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ইতি টানছি :

‘পার্কিন্সের মতে, সিনেমাকে বিবেচনা করতে হবে দর্শক যেভাবে দেখবে তার ভিত্তিতে অর্থাৎ নির্মাণের স্তর থেকে উপলব্ধির স্তরের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে। সিনেমার সঠিক ও সার্বিক সংজ্ঞা দিতে হলে ভিউ ফাইন্ডার অথবা সম্পাদনায় কাটিং বেঞ্চ নয়, স্ক্রিনের প্রতিই মনোযোগী হতে হবে বেশি, যা দর্শকের কাছে সিনেমা হিসেবে পরিচিতি পায়।’ (পৃ.২০৩),

গ্রন্থটির বহুল প্রচার ও বিক্রি কাম্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares