আলোচনা : কবিতা―হাসনাত আবদুল হাই : ছন্দের খাঁচায় নয়, মুক্তগদ্যে ডানার বিস্তার : রনজু রাইম

কবিতা কী, কবিতা কেন কবিতা কিংবা কবিতা কেন কবিতা নয়একবাক্যে এই জিজ্ঞাসার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কেননা, কবিতা কেবল দৃশ্যমান শব্দের ইমারত নয়, অথবা ছন্দোবদ্ধ বাক্যের সমষ্টিই নয়অন্তরালবর্তী অনুভব এবং নৈর্ব্যক্তিক ভাবনার বিস্তার থাকে কবিতার অবয়বজুড়ে। আর এই ভাবনা কেবল অনুভব যোগ্যব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে কবিতার এই আড়ালসত্য বা অনুভবকে দৃশ্যমান করা আদৌ সম্ভব নয়। তাই হয়তো বলা হয়ে থাকেচড়বঃৎু রং  যিধঃ রং ষড়ংঃ রং রহঃবৎঢ়ৎবঃধঃরড়হ. কবিতার এই অন্তর্গত অধরা সত্যকে বাক্সময় করার জন্য তবু গবেষক-সমালোচকদের নানামুখী নিরীক্ষা। অকবিতা, অল্প-কবিতা, ভালো-কবিতা, মন্দ-কবিতাসাহিত্যের গবেষক, সমালোচকরা এ রকম নানা ক্যাটাগরি করে থাকেন কবিতার। একটি উৎকৃষ্ট কবিতা বলতে কাব্যতত্ত্ব বিশেষ করে কাব্যের প্রথাগত শর্তসমূহ অর্থাৎ ছন্দ-অলংকারের যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি-না খোঁজ করেন তারা। আর এর ব্যত্যয় ঘটলে তাদের বিবেচনায় সেটি ‘না-কবিতা’।

কিন্তু যদি সমালোচকদের প্রকরণ সিদ্ধতার কথা বাদ দিই, যদি কবিতার মহার্ঘ পাঠকের বিবেচনা আমলে নেবার চেষ্টা করি, তাহলে দেখব শব্দের অন্তর্গত অনুরণন অর্থাৎ ধ্বনিমাধুর্য ও  স্নিগ্ধতার কারণেও একটি কবিতা কালজয়ী হতে পারে। তবে কবিতার এই ভালোলাগা মন্দলাগার বিষয়টা একান্তই আপেক্ষিক, পাঠকমাত্রই তার শিল্পরুচির অনুবর্তী কবিতাকে বেছে নেয় পরম মমতায়। 

সমালোচকদের মুখে একটা কথা খুব শোনা যায় যে, এখন কবিদের কথাসাহিত্যে চর্চা অর্থাৎ গল্প-উপন্যাস লেখার সময়। কেননা, বর্তমান সময়ের কথাসাহিত্যের ভাষা কাব্যগন্ধী, গল্প-উপন্যাসের অবয়বে ঠাঁই নিয়েছে কাব্যের আত্মা। আর কবিতাও ছন্দ-অলংকারের প্রকরণসর্বস্বতা থেকে বেরিয়ে ডানা বিস্তার করেছে গদ্যের নিঃসীম আকাশে। আর তাই সাম্প্রতিক সময়ে বিষয় ও প্রকরণগত দিক থেকে কবিতা ও কথাসাহিত্যের দূরত্ব অনেকখানি কমে এসেছে। কবিরা যেমন কথাসাহিত্যে তেমনি কথাসাহিত্যিকদের কেউ-কেউ আজকাল কবিতা নির্মাণে সাবলীল।

পুলিশ এলে বলবো আইডি নেই কবিতার বই দুটো ছাড়া শিরোনামের কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাইয়ের একমাত্র কবিতার বইটি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পড়লাম এ কারণে যে, কবিতার বইটির লেখক একজন কথাসাহিত্যিক। হাসনাত আবদুল হাই সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক, উপর্যুক্ত শিরোনামের গ্রন্থটি তার একমাত্র কবিতার বই। এই কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব কবিতাই তিনি লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। ফেসবুকে লেখার কারণে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে অনেকে। একজন প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিকের লেখা কবিতার স্বাদ-গন্ধই আলাদা। মহার্ঘ পাঠক তার এসব কবিতার প্রশংসা করেছেন। তবে, হাসনাত আবদুল হাই ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন, কিছু প্রশংসাকৃপণ কবি-লেখক তার লেখা কবিতার ফেসবুক পোস্টে প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে কবিতা নিয়ে তার নতুনধারার কাজটিকে এড়িয়ে গেছে। ফেসবুকে পড়ার পর তার কবিতাগুলোর বিষয় ও প্রকরণগত অভিনবত্ব আমাকে আন্দোলিত করে। বইটি গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য আমি প্রিয় লেখক হাসনাত আবদুল হাইকে অনুরোধ জানাই। তিনি সম্মত হলে জিনিয়াস পাবলিকেশন্স এর কর্ণধার হাবিবুর রহমান বইটি প্রকাশের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেন। উল্লেখ্য, হাসনাত আবদুল হাই তার কবিতার একমাত্র এই বইটি আমাকে উৎসর্গ করেছেন, আমি যারপরনাই সম্মানিত। কথাসাহিত্যে হাসনাত আবদুল হাইয়ের বিস্তর কাজসুলতান, নভেরার মতো মহার্ঘ উপন্যাসের জন্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো তার আসনটি সুদৃঢ়। কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতা প্রথম পাঠেই আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে। আর এ কারণেই নিবিড়ভাবে বার বার পাঠ করে পাঠোদ্ধারের এক ধরনের তাগিদ অনুভব করি। একজন কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে তার কবিতার বইয়ের দ্ব্যর্থকতা-অন্বিষ্ট শিরোনাম আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে।

কবিতার বইয়ের এ রকম গদ্যগন্ধী দীর্ঘ শিরোনাম সচরাচর চোখে পড়ে না। তবে হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতার বইয়ের শিরোনাম গদ্যগন্ধী হলেও তাতে আছে কবিতার পাঠকের ভালোলাগার মতো নানামুখী ব্যঞ্জনা। প্রথমত, কাউকে আইডিনটিফাই করার জন্য আইডি বা পরিচয়পত্র থাকা চাই। এটা হয়তো গড়পড়তা মানুষের বেলায় প্রযোজ্য। কিন্তু শিল্পের ও শিল্পীর তো কোনো দেশ নেই, কাল নেইতাই নেই তার কোনো আইডি বা পরিচয়পত্রও। শিল্পী তো সব দেশের সব কালের, আর শিল্প তো সর্বব্যাপ্ত। সব মানুষের মগজে ও মনের দরোজায় কড়া নাড়তে বাধা নেই শিল্পের। কবিতা তো উৎকৃষ্টতম শিল্প-মাধ্যম, সীমা পেরিয়ে অসীমে খুব সহজেই তার বিচরণ। অতি সাধারণ শব্দবন্ধের ভিতর অসাধারণ অতীন্দ্রিয় অনুভবকে ধরে রাখবার ক্ষমতা আছে কবিতার। হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতার বইয়ের শিরোনামে কবিতার পাঠকমাত্রই আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে, তাকে টেনে নিয়ে যাবে অন্তর্গত শব্দপাঠে। কবিতায় তো কেবলই শব্দপাঠ, তবে পাঠে-পাঠে খুলে যায় অনুভবের সহস্র কপাট।

কবিতা সতত দ্ব্যর্থক। কবিতার শব্দকে ছত্রিশ ব্যঞ্জনায় বাজানো যায়। শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থময়তাকে ছাপিয়ে আলঙ্কারিক ব্যঞ্জনায় প্রাণসঞ্চার করা হয় কবিতায়। অর্থাৎ কবিতা গদ্যের মতো একরৈখিক নয়, কবিতার পঙ্ক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বহুরৈখিক ভাবনাগুচ্ছ ডানা বিস্তার করে কখনও কখনও। আর এ কারণেই কবিতায় কথাসাহিত্যের চেয়ে অনেক বেশি আন্দোলিত হয় পাঠকমাত্রই। আর তা যদি হয় কথা ও কবিতা, অর্থাৎ কথকতা ও কবিতার মিশেল হলে তো কথাই নেইপাঠকের জন্য তা অনাস্বাদিত এক অনুভব। হাসনাত আবদুল হাই-এর কবিতায় আছে কথা ও কবিতার অপূর্ব মেলবন্ধন। আর এ কারণেই তার কবিতার প্রতি আমার তীব্র টান। হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতা আপাত অর্থে সহজ, সরল, গদ্যগন্ধী ও একরৈখিক মনে হলেও তার কবিতার শরীরজুড়ে রয়েছে বহুরৈখিক ভাবনার বিস্তার। গদ্যের পিঠে ভাবনার ডানা জুড়ে দিয়ে তিনি তা উড়িয়ে দিয়েছেন কবিতার আকাশে। একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে যখন তিনি কবিতা লেখার তাগিদ অনুভব করলেনগদ্যের স্বাধীনতাটুকুও তিনি নিয়েছেন কবিতা লিখতে গিয়ে। ছন্দ ও প্রকরণের বেড়াজালে তিনি কবিতাকে আটকে রাখতে চাননি। অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্তের গাণিতিক বিন্যাসের দিকে না গিয়ে তিনি গদ্যের চলনে কবিতাকে সাবলীল রেখেছেন। অর্থাৎ হাসনাত আবদুল হাই ছন্দের খাঁচায় কবিতার শব্দকে অন্তরীণ রাখেননিডানার বিস্তার ঘটিয়েছেন মুক্তগদ্যে। ফলে তিনি কবিতায় যে প্রাণসঞ্চার করতে চেয়েছেন, তা সহজেই করতে পেরেছেন। কবিরা কবিতাকে প্রথাগত ছন্দে বাঁধতে গিয়ে বেশিরভাগ সময় প্রাণসঞ্চার করতে পারেন না। কার কবিতায় যেন পড়েছিলাম, ‘ভিতরে শরীর নেই, কার জামা, কার জামা ঝুলছে বারান্দায়।’ জামার ভিতর যেমন শরীর নেই, তেমনি অনেক কবিতার শরীরেরও প্রাণ নেই। হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতা সপ্রাণ, স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীল। প্রকরণ না মেনে নিজের মতো মুক্তগদ্যে কবিতা নির্মাণ করলেও তার কবিতা পাঠক খুব সহজে কমিউনিকেট করতে পারে। পাঠকের মনের আকাশে সতত ডানার বিস্তার করে হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতা। সরল শাদামাটা বাক্যের কথকতা পাঠককে গভীর গভীরতর এক অনুভবের নিঃশব্দতায় নিমজ্জমান রাখে। হাসনাত আবদুল হাই কবিতায় অবিকল্প অনুভবের কথা গদ্যভঙ্গিমায় খুব সহজ করে বললেও তার কবিতা আনাস্বাদিত সত্যের অন্তপুরে নিয়ে যায় পাঠককে।

হাসনাত আবদুল হাই একদিন কথা প্রসঙ্গে বললেন, আমি এই বিরাশি বছর বয়সে লিখছি শুধু ট্র্যাকে থাকার জন্য, নতুন কিছু দেবার জন্য নয়। কিন্তু তার কাব্য পাঠের পর এই কথা আমার কাছে একজন মহান লেখকের বিনয়মাত্র বলেই প্রতীয়মান হলো। রবীন্দ্রনাথ যখন পত্রপুট, শেষলেখায় গদ্যকবিতা লিখছেন, তখনও তিনি মানসী, সোনারতরীর রবীন্দ্রনাথের চেয়ে কম প্রাসঙ্গিক নন। তখনও তিনি নিরীক্ষাপ্রবণ, জীবনবীক্ষায় ও লেখায় তারুণ্যদীপ্ত, শব্দের অন্তর্গত সৌন্দর্যকে মুদ্রিত করেছেন তার কবিতায় গভীর নিষ্ঠায়। আমার বিবেচনায় হাসনাত আবদুল হাই আমাদের কালের অন্যতম সচল লেখক। পাঠে-পাঠেই তার ভাবনা নবায়নযোগ্য, সৃষ্টিশীলতায় তিনি সমকাল-প্রাসঙ্গিক। তার উল্লেখযোগ্য সব লেখা হবে ভাবীকালের অগ্রদূতএ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এই নবায়নযোগ্যতার এক পরিপূর্ণ রূপ লক্ষ করা যায় হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতার বই, পুলিশ এলে বলবো আইডি নেই দুটো কবিতার বই ছাড়া কাব্যগ্রন্থে। তার এই কাব্যগ্রন্থের কোথায় কী অভিনবত্ব এই লেখায় তার কবিতা ঘিরে আমার ভালোলাগাটুকু তুলে ধরতে চাই।

ছন্দ না থাকলে কবিতা স্বচ্ছন্দ হয় নাএমনটাই আমার একান্ত ভাবনা। তবে কবিতার যে প্রথাগত ছন্দ, অর্থাৎ অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ততা অনেক সময় কবিতাকে আড়ষ্ট করে ফেলে, যদি কবিতার বিষয় ছন্দের অনুবর্তী না হয়। তবে এটা বাহুল্য ভাবনা নয় যে, কবিতা কেবলই প্রথাগত ছন্দের বেঁধে দেওয়া পথেই হাঁটবে। ছন্দ তো সবখানেইআমাদের কথা বলায়, পথ চলায়, প্রকৃতির সবকিছুর মধ্যে। প্রকৃতির মধ্যে ছন্দ আছে বলেই আমাদের জীবন গতিশীল, স্বচ্ছন্দ। আমরা যখন কথা বলি, বক্তৃতা করি কিংবা ভাষণ দিইএসব কিছুকে যদি ছন্দে ফেলে বিশ্লেষণ করতে বসি, তবে দেখব আমরা সবাই ছন্দেই কথা বলছি। কথা বলার সময় আমরা দম নিচ্ছি, আবার কথা বলছিআমরা প্রাত্যহিক কথা বলার কাজটি সম্পাদন করছি অক্ষরবৃত্তেই। তবু তা প্রথাগত ছন্দের বিন্যাসে নয় যেন। হাসনাত আবদুল হাই গদ্যের গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া একজন পথিকতবে তার গদ্যগন্ধী কবিতার মধ্যে যে ছন্দ নেই, এ কথা বলবার উপায় নেই। তার কবিতাকে গদ্যগন্ধী বলেছি, আবার বলেছি তার কবিতায় ছন্দের কারুকাজ আছে ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন আঙ্গিকে। তবে তার কবিতায় ছন্দের প্রচ্ছন্ন ব্যবহার থাকলেও তার কবিতা ছন্দের খাঁচায় বন্দি নয়। অর্থাৎ ছন্দ তার কবিতাকে শৃঙ্খলিত করতে পারেনি। মুক্তগদ্যে তার কবিতা ডানা মেলেছে আকাশে।

পুলিশ এলে বলবো আইডি নেই কবিতার বই দুটো ছাড়াহাসনাত আবদুল হাইয়ের এই কবিতার বইটির সমুদয় কবিতাকে তিনি তিনটি অংশে ভাগ করতে চেয়েছেন। তিনটি উপ-শিরোনাম না দিলেও তা বিষয়-ভাবনার দিক থেকে স্বতন্ত্র, এ রকম হতে পারে১. আটপৌরে বিষয় ও প্রেম, ২. দায়বদ্ধতা ও জীবন-বাস্তবতা, ৩. দার্শনিকতা ও শিল্পসৌকর্য। তবে এই তিন আরাধ্য অনুভবের বাইরেও নানামুখী ভাবনার অদৃশ্য অবয়ব তার কবিতায় নৃত্যরত। আটপৌরে বিষয়-আশয়, দৃশ্যমান শাদামাটা ব্যক্তিক প্রেম, নৈর্ব্যক্তিকতায় ও বিমূর্ততায় বিলীন। প্রেমিকাকে নিয়ে রিকশায় ঘুরতে যাওয়া, ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা কিংবা পার্কে-ফুটপাতে ঝালমুড়ি খাওয়ার চিত্রকল্পের মধ্যে যে নিত্যতা, তার মধ্যেও অনিত্যের আবেশ আছে। তার কবিতায় ইন্দ্রিয়-অন্বিষ্ট সকল আয়োজনই পাঠককে এক অতীন্দ্রিয় ভাবনার জগতে নিয়ে যায়। আর শব্দে শব্দে, পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে যে বালিকার সরব উপস্থিতি, যে দুর্নিবার প্রেমের মূর্ততাতা যেন আমাদের হৃদয়বৃত্তিকে দেয় সচেতনতার পাঠ। অপ্রেম, হতাশা আর দুর্দশাগ্রস্ত পৃথিবীকে প্রাণচাঞ্চল্যে জাগিয়ে তুলবার মতো প্রাণ-অফুরান রসদ যুগিয়ে যাচ্ছে হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতা। সবকিছুর মধ্যে সৌন্দর্য আর প্রেমকে ফুটিয়ে তুলবার আন্তরিক প্রয়াস লক্ষ করা যায় তার আলোচ্য গ্রন্থটির অনেক কবিতায়। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার এই যুগে যা কিছু সহজে পাই, তা যেন সহজেই হারাই। হোক না তা প্রেম, প্রিয় মানুষ কিংবা দুর্লভ কোন অর্জন। মানুষ যে ঘোরের মধ্যেই থাকুক না কেন, যতটা বিস্মৃতিপ্রবণই হোক না কেনহাসনাত আবদুল হাইয়ের আলোচ্য গ্রন্থের কবিতাগুলো তাদের ফিরে দেখার, শুদ্ধতার অবিকল্প পাঠ নেবার প্রণোদনা যোগাবে। ফেসবুক, ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ-এর যুগে ডাকহরকরার প্রসঙ্গ টেনে তিনি সেকাল ও একালের প্রেমের দৈর্ঘ্যপ্রস্থ সম্পর্কে পাঠককে সচকিত করেছেন। আর একটি বিষয়, সময়ের ক্ষিপ্র ঘোড়াকে তিনি লাগাম টেনে ধরতে না পারলেও প্রেম তার কবিতায় স্বতঃস্ফূর্ত। ‘এসো, কাছে বস/নাও ঝালমুড়ি, চায়ের পেয়ালা/জোরে কথা বল/ওমে ভরে যাবে ঘর।’ শব্দে শব্দে কী সুন্দর শরীরী নির্মিতি তার কবিতার। আর কী দক্ষতার সঙ্গে তিনি তাতে প্রাণসঞ্চার করলেন, জুড়ে দিলেন অশরীরী অন্তরাত্মা। তার কবিতায় চিত্রকল্পে নান্দনিকতার আবাহন, প্যারাডক্সে জীবন বাক্সময়, পৌরাণিক অনুষঙ্গের উপস্থাপনায় প্রজ্ঞার আশ্লেষ। শিল্পসাহিত্য, সঙ্গীত ও রাজনীতির কালপুরুষদের জীবন ও কর্ম ঘিরে বাস্তবতা ও দার্শনিকতার স্বরূপ উন্মোচিত। রবীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, সমর সেন, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, ইউজিন আয়োনেস্কোর প্রসঙ্গ হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতার বইটিকে দিয়েছে বহুরৈখিক তাৎপর্য ও ভিন্নমাত্রা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিথ শক্ত করে তুলেছে তার কবিতার ভিত। প্রেম, জীবন-বাস্তবতা ও দার্শনিকতার ত্রয়ী মেলবন্ধন ঘটেছে হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতার বই, পুলিশ এলে বলবো আইডি নেই কবিতার বই দুটো ছাড়া। প্রাকরণিক শুদ্ধতার একরৈখিক পথে না হাঁটলেও তার কবিতার সমস্ত আয়োজন পাঠককে নিয়ে গেছে শিল্পশুদ্ধতার এক অতীন্দ্রিয় জগতে। ছন্দের খাঁচায় বন্দি নয়, বরং তার কবিতার শব্দেরা ডানা বিস্তার করে মুক্তগদ্যের স্বাধীনতা নিয়ে। হাসনাত আবদুল হাইয়ের কবিতা যেন সমস্ত ইতিবাচক অনুরণন আর মুগ্ধতায় ভরপুর। মুক্ত পাখির মতো স্বাধীন তার কবিতার শব্দরা এবং শব্দের অন্তরালবর্তী অনুভবগুচ্ছ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares