আলোচনা : কবিতা―হাসনাত আবদুল হাই : হাইকুর হাসনাত আবদুল হাই : পিয়াস মজিদ

হাসনাত আবদুল হাই; আমাদের সাহিত্যের বহুমাত্রিক একজন। বাংলাদেশের কবিতাজগতে হাইকু-চর্চার অন্যতম পথিকৃৎও তিনি। প্রায় দুই যুগ আগে ১৯৯৭ সনে প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম হাইকু সংকলন  কিওতো হাইকু। আর ২০১৯ সনে ষড়ঋতু হাইকু-প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে তাঁর হাইকু-চর্চা শৌখিন কিছু বা অবসরের খেয়াল নয় বরং হাইকু তাঁর আত্মার আরাম, নিয়মতি শিল্প-অনুধ্যানের অংশ।

কিওতো হাইকু-এর নাম চয়নে তিনি হাইকুর জন্মস্থল জাপানের কিওতো শহর এবং ষড়ঋতু হাইকু-র নামায়নে হাইকুর অনিবার্য অনুঘটক ঋতুচক্রকে বিবেচনায় রেখেছেন।

উভয় বইয়ের ভূমিকাভাষ্য থেকে জানা যায় বিশ্ববিদ্যালয়-ছাত্র থাকাকালে হাইকুর সঙ্গে ঘটে প্রথম পরিচয়ের পরশ, তার তিরিশ বছর পর জাপান প্রবাসকালে আবিষ্কার করেন হাইকুকে ঘিরে উতরোল উল্লাস। পথে চলে যেতে যেতে একদিন লেখা হয়ে যায় তাঁর পহেলা হাইকু :

‘উড়ে যায় চিরকুট

ভেসে আসে স্রোতে

নাম পানিতেই লেখা’।

 ক্রমে হাইকু বিষয়ক নিবিড় পাঠে ও বিশেষজ্ঞ-আলাপে অবহিত হন হাইকুর অবধারিত ‘ঋতু-স্বভাব’ সম্পর্কে; আর তারপর ইংরেজিতে লেখা হাসনাত-হাইকু অনূদিত হয় জাপানি ভাষাতেও, কতক  ছাপা হয় ‘মাইনিচি ডেইলি নিউজ’-এর হাইকু বিভাগেও।

হাইকু নিয়ে হাসনাত আবদুল হাইয়ের মতামতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায় এক্ষণে :

‘হাইকু মানসিকতার অধিকারী হতে হলে একজন কবি বা ব্যক্তিকে,  অভিজ্ঞতার জন্যই একটি অভিজ্ঞতা অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত থাকতে হয়। এর বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকলে হাইকু মানসিকতা অকৃত্রিম থাকে না। এই লক্ষ্যে পৌঁছুতে গেলে বিষয়ের সঙ্গে দ্রষ্টার সম্পূর্ণ অভিন্নতা অর্জন এবং একাত্মতা লাভ প্রয়োজন। বিষয়ের সঙ্গে ব্যক্তিসত্তা মিশে অভিন্ন হয়ে গেলেই ব্যক্তিগত আবেগ বা অনুভূতি গৌণ হয়ে যায় এবং প্রকৃতি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করে বিশ্বজনীনতায় পৌঁছে দিতে পারে। মানুষের জীবনে দুঃখ, বেদনা ও নিঃসঙ্গতা অনিবার্য বলে এইসব ব্যক্তিগত অনুভূতিকে প্রকৃতির নৈর্ব্যক্তিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে রূপান্তরিত করে অতিক্রমণ সম্ভব।সাধারণ অনুভূতি মহৎ বা নিগূঢ় চিন্তা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে এই প্রক্রিয়ায়। হাইকুর সৌন্দর্য এবং আকর্ষণ, ব্যক্তিক থেকে নৈর্ব্যক্তিকতায় রূপান্তরের, এই ক্ষমতার জন্যই অনেকটা কেবল লেখা শেষে নয়, লেখার শুরু থেকেই আত্মার শান্তি আর মনের প্রশান্তি অর্জনের এক নির্মল মাধ্যম হাইকু পড়া আর লেখা।’

২.

হাসনাত আবদুল হাইয়ের হাইকু-ভুবন ভ্রমণেও আমরা সেই প্রশান্ত পরিসর খুঁজে পাই। সংক্ষিপ্ত তিন লাইনের আর সতেরো সিলেবলের আঁটোসাঁটো গঠন-সীমা ভেদ করে তাঁর কিওতো হাইকু যাত্রা করে অসীম সুন্দরের পানে। ‘হেমন্ত’, ‘শীত’, ‘বসন্ত’এবং ‘অন্যান্য’ বিভাগে গুচ্ছিত তাঁর হাইকু বৈচিত্র্যের বিভায় ঝলমল। প্রথমেই সাক্ষাৎ হয় তাঁর সৃজিত হৈমন্তী হাইকু-অভিঘাতের সঙ্গে :

‘পুকুরের ওপরে আগুন

নিচেও জ্বলছে লাল―

হেমন্ত দিন’

যেন ধ্বনিচিত্রের ঢেউ লাগে পাঠকের বোধের সমুদ্রে।

অনুষঙ্গ হিসেবে জাপানের প্রকৃতিও ভাস্বর এখানে। ক্রিসেনথিমাম ফুলের কণ্ঠে ‘সায়েনারা’ বা বিদায় বলার বিষয়টি আকর্ষক অভিঘাত তোলে চিত্তে।

তাছাড়া কোদাইজি মন্দির থেকে পাহাড় কিতায়ামা বা অবিরাম মেপলের পাতায় ভরা হাসনাত আবদুল হাইয়ের হেমন্ত-হাইকুর অঞ্চল।

‘শীত’ বিভাগ প্রারম্ভের প্রভা রাখে এইভাবে :

‘চোখেই পড়েনি ঝোপ

কাওয়াবাতাদোরি পাশে

এখন ক্যামেলিয়া’

জাপানি রাস্তা কাওয়াবাতাদোরি থেকে শীতপথে ফোটা ক্যামেলিয়া আশ্চর্য মেলবন্ধন-রসায়নে এক হয়ে যায় এখানে। জগতবিখ্যাত জাপানি ‘নো’ নাটককেও তাঁর হাইকুতে এক বিশিষ্ট চরিত্র দেখে উপলব্ধিতে আসে তাঁর বৈচিত্র্যের বিস্তার। আর শীতের এমন বরফবিভা যে কাউকে মুগ্ধ ও প্রলুব্ধ করতে সক্ষম :

‘আকাশে মেঘ নেই

বরফ ঝরছে ধীরে

জোছনায় ভিজে ভিজে।’

‘বসন্ত’ বিভাগে চেরি কিংবা উমে ফুল, পাহাড় হিইয়েজান, সাকুরার বাহার আমাদের নিয়ে চলে যেন জাপানি বসন্তের কূলে। আর কবির সঙ্গে আমরাও তখন কয়ে ওঠি কথা; এমনি হাইকুর স্বরে, ময়লা-ভেদী চেরির সুগন্ধি-স্বরলিপিতে :

‘রাশি রাশি থলি

ময়লায় সব ভরা

ওপরে ফুটেছে চেরি’।

‘অন্যান্য’ শিরোনামে ঋতুমর্মমের বাইরের হাইকুগুলো স্থান পেয়েছে। এখানেও জাপানি পুরাণ, ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের সমুদ্রধাবী রঙিন নহর বয়ে চলেছে। এখানেও মানুষের নির্মিত বাস্তবের বাইরে অপার প্রকৃতির আশ্চর্য লীলা প্রতিভাসিত এইভাবে ঠিক :

‘স্রোত বয়ে যায়

চাকায় ধরেছে জঙ

সাইকেল শুয়ে’

৩.

ষড়ঋতু হাইকু (২০১৯) তাঁর সাম্প্রতিক হাইকু-ফসল। কিওতো হাইকু হাইকুর জন্মভূমি জাপানে লেখা আর ষড়ঋতু হাইকু ষড়ঋতুর লীলাভূমি বাংলাদেশে লেখা। এ প্রসঙ্গে কবির কথকতা মূল্যবান :

‘বাংলার ষড়ঋতুর ওপর হাইকু লেখা নিয়ে এই বই, ষড়ঋতুর হাইকু। এবার জাপানি নয়, বাংলাদেশের ঋতু নিয়ে হাইকু লেখা হলো। একে বলা যায়, হাইকুর রূপান্তর বা দেশান্তর যাত্রা। জাপানিদের মতো বাঙালিরাও একসময় ঋতুর প্রেমিক ছিল এবং ঋতু নিয়ে অনেকেই কবিতা লিখেছেন। ষড়ঋতুর ওপর লেখা হাইকু বাংলা কবিতার সেই ঐতিহ্যের প্রতি নগণ্য এক নিবেদন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের বেশ কিছু ঋতুর মধ্যে পার্থক্য ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। যে গতিতে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে একসময় হয়তো ছয়টি ঋতুর মধ্যে একটি কি দুটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে। তবু স্মৃতিতে, সাহিত্যে এবং বিভিন্ন উৎসবের মাধ্যমে রীতিগুলো বেঁচে থাকবে। সে কথা মনে করেও ষড়ঋতুর ওপর লেখা হাইকু নিয়ে বইটি প্রকাশ হলো।’

‘শীত’ থেকে শুরু; হেমন্তে সমাপন। মধ্যিখানে ঋতুরঙ্গ: বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শরৎ।

‘গাছের পাতারা

হাই তুলে দেখে

পাশে শূন্য ডাল’

এমন শীতসবিতার পাশে হাসনাত আবদুল হাই জাজ্বল্য করেন করুণ দুঃখিনী  বাংলার এমন হিমবাস্তবতাও :

‘জড়িয়ে দু’জন

শুয়ে ফুটপাতে

মানুষ ও কুকুর।’

আর এরপর বসন্তের বর্ণিল ফোয়ারায় নিয়ে চলেন হাইকু-কার :

‘ফুলের মুকুট

লাল শাড়ি পরা

সব আজ রানি।’

আমাদের চেনাজানা গ্রীষ্মকে হাইকুর হরফে এভাবে চাক্ষুষ করে কে না চমকে উঠব অতঃপর ?-

‘আকাশে গর্জন

বর্ষণ মেঘের

বৈশাখী বিকেল’

অথবা প্রকৃতির মতো বিরান মানুষের গ্রীষ্ম-মুখ :

‘ঠেলাগাড়ি ঠেলে

হাঁপায় দুই বুড়ো

কাঠ-ফাটা রোদ।’

তারপর ‘বর্ষা’ এসে নগরবাংলা থেকে নিয়ে চলে এমন বৃষ্টিমায়ার গ্রামবাংলার গহিনে, গহনে :

‘ধাঁধানো সবুজ

হাসছে ধানক্ষেত

বৃষ্টির পর।’

শরতে কোন অতিথিইবা সাড়া না দিয়ে পারে এমন হাইকু-আবাহনে :

‘আকাশে নিজ রঙ

নীলে ধোয়া মোছা

হাসছে কাশফুল’

শেষের উপহার ‘হেমন্ত’। আর তাঁর শেষের কবিতা:

‘শূন্য মাঠ

এখন শ্বাস ফেলে

শুরু উত্তুরে হাওয়া।’

উত্তুরে হাওয়ার শিহরণে আমাদের নিষ্ক্রমণ ঘটে বটে ষড়ঋতু হাইকু-র বইসীমা থেকে তবে অন্তঃস্থ আভায় অশেষের রূপক্ষুধা জন্ম দিয়ে যায় ভীষণ।

আমরা স্নাত হই  হাসনাত আবদুল হাইয়ের হাইকু-কুসুমের পাপড়িপ্রভায়, ঝিলিক লাগে অন্তরে, গাণিতিক গঠনের কাঠামোর কাঠিন্য ভেঙেচুরে কবিকল্পনা অবাধে ও পদাবলি-প্রকৌশলের লালিত্যে মধুরিমার আলপনা আঁকা হয়ে চলে পাঠক-মনের উদার উঠোনে।

ঋদ্ধ  আমরা অপেক্ষায় থাকি, হাসনাত আবদুল হাইয়ের নতুনতর হাইকু-উপহারের তরে। ততক্ষণে মজে থাকি এমন হাসনাতীয় হেমন্ত―হাইকুর বাংলা-বিভায় :

‘পুকুরটা এঁদো

রোদ স্নান করে

শুষে নেয় পানি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares