আবার পড়ি : গল্প―হাসনাত আবদুল হাই : কার্নিভাল : হাসনাত আবদুল হাই

কার্বাইডের ছাইরঙা আলো। ধূসর চাঁদনি রাতের আলোর মতো জেগে আছে সেই কখন থেকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওরা, শেখ আন্দু আর রহিম বক্স। মানুষ তো নয় যেন বুনো জানোয়ার। বনবিড়ালের সবুজ চোখের মতো জ্বলছে মণি দুটো হিংস্র হয়ে। কার্বাইডের ছাইরঙা আলোতেও স্পষ্ট করে চোখে পড়ে।

অথচ এই কিছুক্ষণ আগেও একসঙ্গে বসে মাটির ভাঁড়ে চা খেয়েছে, মুড়ি চিবিয়েছে মুড়মুড়িয়ে। তারপর খাওয়া শেষে বিড়ি ধরিয়েছে আয়েশ করে। কথায় কথায় কী থেকে কী হয়ে গেল। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠল দু’জন হাতের আস্তিন গুটিয়ে, হিংস্র হয়ে চাইল এ ওর দিকে। কার্বাইডের ধূসর আলোর ঠাসবুুনুনিতে জেগে উঠল চারটে সবুজ বিন্দুর নকশা। মেলায় তখনও অনেক লোকের যাওয়া-আসা। হাটুরেরা পকেট ভারী করে এসেছে সন্ধেবেলা। রাত আর পকেট শেষ না করে যাবে না ওরা। দু-দুটো শো শেষ করেছে শেখ আন্দু। রহিম বক্সও তার ম্যাজিক আর কমিকের খেলা দেখানো শেষ করে পয়সা গুনে গুনে রাতের মতো ট্যাঁকে গুঁজেছে। মেলার কোলাহল এখন যেন সাগরের মতো দুলছে। আর ওরা দুই নির্জন দ্বীপের মতো পটভূমিতে সমাহিত।

 ডান দিকে রানিখাল। বর্ষাকালে খেয়া লাগে পার হতে। আগে ছিল এক গণ্ডা। পয়সা, এখন দু’গণ্ডা। শীতকালে খেয়ার ঝামেলা নেই। হাঁটুর নিচেই কাপড় রেখে পার হওয়া চলে। খালের ওপারে রূপগঞ্জের হাট। দশ গ্রামের লোকের জমায়েত হয় ফি রোববার। আনাজপাতির বেসাতি নিয়ে বসে দেহাতিরা। টিনের চালার নিচে মুদির দোকান সার সার। খালের পাড়-ঘেঁষে গরু-ছাগলের বাজার। বুড়ো বটগাছটার নিচে তিনটি বাঁশ দিয়ে বড় বড় দাঁড়িপাল্লা খাড়া করেছে পাটের আড়তদার। দালালরা ঘুর ঘুর করে চারদিকে চোখ ছুঁচালো আর কান খাড়া করে। বোকার মতো গালে হাত দিয়ে বসে থাকে পাটচাষির দল। বেপারির সঙ্গে তর্ক জুড়ে সুবিধা করতে পারে না। বেজার হয়ে ফিরে যায়।

অন্য সময় যেমন তেমন, কিন্তু শীতকালে রূপগঞ্জের হাট আর মেলা একাকার হয়ে যায়। সাত দিনের জন্য কাজ-কারবার চলে পুরোদস্তুর। রঙবেরঙের আলো জ্বলে। চরকি ঘোরে ছেলেবুড়োকে সওয়ার নিয়ে। তরজার বেড়া দেওয়া ঘরে শহরের মতো চায়ের দোকান বসে। চেয়ার-টেবিল পাতানো হয়, পরিষ্কার কাপ-পিরিচ, পেয়ালা থাকে। থাকে মিষ্টি, ভাজিভুজি ছাড়াও থাকে কেক-বিস্কুট। নানান ধরনের খাবার। জিভে জল আসে বুড়োদেরই তা ছেলে-ছোকরাদের আর দোষ কী। হু হু করে বিক্রি হয়। সারি সারি তরজা আর বেড়ার ঘরে দোকান বসে। খাওয়ার দোকান, কাপড়ের দোকান রঙবেরঙের হাঁড়ি-কলসির দোকান। সবার চোখ দেহাতিদের গ্যাঁটে কাঁচা পয়সার দিকে। সদ্য পাট বেচা টাকাগুলো ফুলে আছে কোলা ব্যাঙের মতো। সেই টাকার দিকে চোখ রেখে ও পাশের একচালা ঘরে ঘরে কুচবরণ, মেঘবরণ কন্যারা বেলেল্লা হাসির গমক ছোটায়। ঢেউ খেলিয়ে বুকে-পিঠে মাথা গুলিয়ে দেয় ছোকরা, জোয়ান, বুড়ো সবার। আর সেই টাকার লোভেই শেখ আন্দু মহকুমা শহর ছেড়ে ঘাঁটি পাতে রূপগঞ্জের মেলায়।

বর্ষার শেষে শীতের আগেভাগে ফিবছর শেখ আন্দু সাত দিনের জন্য পাততাড়ি গোটায় মহকুমা শহরের চকবাজার থেকে। সঙ্গে আনে মস্ত এক বোঁচকা আর রঙচটা ট্রাঙ্ক। আগে ছিল বাস, এখনও আছে। তিল্লাকপুরের সড়ক ভালো হওয়ায় রিকশায় করেই আসা যায় আজকাল। মাইলের রাস্তা দু’ঘণ্টায় পৌঁছে দেয় রিকশাঅলা। ভাড়াটা একটু বেশিই নেয় ওরা। নতুন কি না।

পুরনো বলেই মেলার কর্তারা খাতির করে। ভালো দেখে জায়গা ছেড়ে দেয় শেখ আন্দুকে। তিন দিকে তরজার বেড়া আর সামনে রঙিন চিত্র-বিচিত্র ক্যানভাসে মুড়ে দেয়। ঢোকার পথটা বাঁকা। পয়সা দেওয়ার কোনাটা পেরিয়ে লোকজন ঢুকতে পারে ভেতরে। গেটের বাইরে বাঁশের মাচা তৈরি করে ঢোলক বসায় শেখ আন্দু। ঢোল পিটিয়ে লোক জড়ো করে। নিজেই পেটায় সে। কখনও একটা ছোকরা রাখে ভাড়ায়। হাতের লাঠি ঢোলে পিটিয়ে চিৎকার করে জোরে জোরে―‘আজব দুনিয়া, আজব চিজ। মাত্তর দুই আনা, দুই আনা। দেইখা যান। এমুন সুযোগ পাইবেন না।’ মেলার লোকে শোনে হাঁ করে। তারপর দু’আনা ফেলে ঢোকে ভিতরে। বেরিয়ে এসে মাথা নাড়ে। সত্যি কথা। আজব ব্যাপারই ভেতরে। কারও কারও ভয় যায় না বাইরে এসেও। এটা-সেটা শুধায় শেখ আন্দুকে। বিজ্ঞের মতো গড়গড় করে আউড়ে যায় সে। একই কথা বলতে বলতে মুখস্থ হয়ে গেছে। সাপটা কী জাতের গো ?

এই বাবা। কী মস্ত ব্যাঙ ? নাম কী এর ? ওটা কী ? বেজির মতন নাগে যে ?

কিসের দাঁত বলল ? হাঙ্গর মাছ ? আরে বাবা, যার দাঁতই এ রকুম তার চেহারাডা জানি কুন ধরনের। বলতে বলতে লোকটার হাঁ বড় হয়।

গর্বের সঙ্গে সব উত্তর দেয় শেখ আন্দু। আজব দুনিয়ার কতটুকুই জানে এরা। দুই বেলা ভাত আর সকাল-বিকাল খেত-খামারের কাজ করতেই বুকের ঘড়ি অচল হয়ে আসে। সময় কই তাদের আজব দুনিয়ার আজব চিজ দেখার। তাই শেখ আন্দুকেই নেমে আসতে হয় মহকুমা থেকে রূপগঞ্জের মেলায় ফিবছর। দেখুক ব্যাটারা দুনিয়ার কত আজব চিজ পয়দা করেছে খোদা। হ্যাঁ, তবে মবলগ দু’আনা ফেলে দিয়ে।

মহকুমার চকবাজারে বসে মাসে যা আয় হয় না এখানে সাত দিনে তাই জমে। কাঁচা পয়সা সবার। শহুরেদের মতো গোনাগুনতি নেই। দু-চার আনা হরেদরে এদিক-সেদিক গেলে মন খারাপ করে না কেউ। আর শুধুই কি পয়সা ? এই মুখ্যসুখ্য চাষাভুষাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে মনে হয় এলেমের জাহাজ, অথবা বাদশাহনামদার। ব্যাটাদের চোখ দেখলেই বোঝা যায় কী তাজিম করে ওরা। গর্বে শেখ আন্দুর আটাশ ইঞ্চি বুক ফুলে সাড়ে আটাশ হয়। ঘন ঘন মোচে চুমড়ি দিয়ে বক্তৃতা দিয়ে যায়। গত তিন বছর ধরে এমন। শুধু এবার যেন ব্যতিক্রম। শেখ আন্দুর বাদশাহি বরাতে ফাটল ধরেছে। শীতের শুরুতে অন্য বারের মতো এবারেও পোঁটলা-পুটলি আর ট্রাঙ্ক নিয়ে মেলায় হাজির হলো শেখ আন্দু। কিন্তু সব যেন কেমন ঠাণ্ডা। মেলার কর্তারা তেমন তোয়াজ করে কথা বলল না। এগিয়ে এলো না জায়গা দেখিয়ে দিতে। একটু পরেই ব্যাপারটা খোলাসা হলো তার কাছে। ওর পুরনো জায়গায় বেশ বড় ধরনের তাঁবু পড়েছে একটা। তাঁবুর সামনে ব্যান্ড পার্টি। সঙের নাচ লোক জমিয়ে আনছে বাজনার তালে তালে। তাঁবুর সামনে লেখা ‘দি ইস্টার্ন ম্যাজিক অ্যান্ড কমিক পার্টি। হৈ হৈ ব্যাপার অ্যান্ড রৈ রৈ কাণ্ড।’ তারও নিচে ছোট করে লেখা ‘লক্ষেèৗর ম্যাজিশিয়ান’। ভ্রƒ কুঁচকে দেখল শেখ আন্দু। কাঁধে হাত পড়তে চোখ ফিরে তাকাল। চায়ের দোকানের রজব আলি, চেনা মানুষ। একগাল হেসে, রজব আলি বলল। কি গো মিয়া। ইবার মেলা খুব জমিছে কি বলো ? বলে তাঁবুর দিকে আঙ্গুল তোলে সে। হ। ছোট জবাব শেখ আন্দুর।

তুমার দেখি দেরি হইয়ে গেল। ব্যাপারডা কী ? কাজে আটকা ছিলা বুঝি ? উত্তর দেয় না শেখ আন্দু। বোকার মতো চেয়ে থাকে তাঁবুর দিকে। পিঁপড়ের মতো লোক ঢুকছে সারি বেঁধে। খই ফুটছে মুখ দিয়ে সবার। রজব আলি পিঠে উৎসাহের একটা চাপড়ানি দিয়ে তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেল। মহকুমার সেই পাগলটার কথা মনে পড়ল শেখ আন্দুর। ছালা গায় দিয়ে রাস্তার জঞ্জাল কুড়িয়ে বেড়ায়, বিড়বিড় করে আপন মনে। তারপর এর-ওর দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে ‘এইসা দিন নেহি রহেগা’। হাসতো শেখ আন্দু ওর পাগলামিতে। কিন্তু এখন সামনের ওই ম্যাজিকের তাঁবুর দিকে তাকিয়ে পাগলটার কথাগুলো মনে পড়লেও হাসি পেল না তার। একটা অসহায় দুর্বলতায় হাত-পা নির্জীব হয়ে এলো শুধু।

তবু খাড়া করল শেখ আন্দু তার দোকান। আগের মতোই মাচান বাঁধল ঘরের সামনে। ক্যানভাসের রঙিন পর্দা ঝুলিয়ে দিল। ঢোল পিটিয়ে জোর গলায় চিৎকার জুড়ল ‘আজব দুনিয়া―আজব চিজ। দেখবার চান যদি মাত্তর দুই আনা খরচা কইরা দেইখা যান।’ কিন্তু শেখ আন্দুর গলা যত চড়া হয়, লোক জমে না সেই তুলনায়। তারা দূরে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফোঁকে আর শেখ আন্দুর কেরামতি দেখে। তারপর ইয়ার দোস্তদের হাত ধরে চলে যায় তাঁবুর দিকে। শেখ আন্দু বোকার মতো চেয়ে দেখে আর ভ্রƒ কুঁচকায়। কোনোদিন যা করেনি সেই রাতে তাই করে বসল সে। মাতালের মতো টলতে টলতে বেপাড়ায় ঢুকল গিয়ে। কী বলছে মাইয়াগুলান ? ঠিকমতো ঠাহর হয় না কিছু। শুধু বেলেল্লা হাসির গমকে কেঁপে ওঠে বন্ধ গুমোট হাওয়া। গোলপাতার ঘরে মুখোমুখি দু’জন। শেখ আন্দু আর নাম না-জানা বেবুশ্যে মেয়েটা। টলতে টলতেই তাকায় শেখ আন্দু। হাসছে মেয়েটা কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে। ছ্যাঁৎ করে ওঠে বুকের মাঝখানটা। মরিয়মের মুখ অনেক দিন পর চোখে ভাসে। ধমকের সুরে কালো গভীর চোখ তুলে মরিয়ম যেন বলছে, ছিঃ!

মাথার ভিতর উথাল-পাথাল ঝড় বয়ে গেল। প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এলো শেখ আন্দু গোলপাতার ঘর থেকে। তেমনি দৌড়ে পার হয়ে এলো বেপাড়ার গলি। পিছনে পড়ে রইল হাসির হল্লা, ভাঙা গলার কুৎসিত গান আর মাতালের হৈ-হুল্লোড়। মরিয়ম ডাকছে যেন। স্পষ্ট শোনে শেখ আন্দু। সেই ডাকেই তো বেরিয়ে এলো বেপাড়ার খপ্পর থেকে।

ম্যাজিক কোম্পানির মালিক লোকটা ভালোই। হাসিখুশি দিলখোলা। নাম রহিম বক্স। আগেই পরিচয় হয়েছিল। ওকে দৌড়ে আসতে দেখে পথের মাঝখানে থমকে দাঁড়াল। কিগো শেখের পো। এই মাঝরাতে এমন দৌড় কিসের লাগি ? সাপো তাড়া করেছে মনে হয় ?

হ, সাপই তাড়া করেছে মিয়াভাই।

বলো কি ? ছোবল দেয় নাই তো ?

উহু, দিতে চাইছিল। ভাগলাম দেওনের আগেই।

রহিম বক্স চলে গেল। সাপের গর্তে পা দিতেই বোধহয়। মনে মনে হাসল শেখ আন্দু। সাপই তো ওরা। কিলবিলিয়ে ওঠে মানুষ দেখলে। ফণা তুলে তৈরি থাকে ছোবল দিতে। তাকেও দিত, মরিয়ম ঠিক সময়ে ডাক না দিলে।

আস্তানায় শুয়ে আকাশ-পাতাল মনে এলো শেখ আন্দুর। মরিয়মকে অনেক দিন পর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনে পড়ল তার। শুধুই কি মরিয়ম। ওকে কেন্দ্র করে একটা পুরনো জগৎই যেন জেগে উঠল আবার। ছেঁড়াখোঁড়া মেঘের মতো ছবি। বায়োস্কোপের মতো ভেসে গেল চোখের সামনে দিয়ে সার বেঁধে। ক’দিন-বা আগের কথা। দু’বছর বৈ তো নয়। এরই মধ্যে সবকিছু কেমন ওলটপালট হয়ে এসেছে। পিছনের ছবি খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এলো অনেক কিছু। তারই একটা নতুন আলোয় ঝলকে উঠল যেন।

ঘুমাবার আগে সিদ্ধান্তটা মনে মনে গড়ে নিল শেখ আন্দু।

ভোর হলেই রজব আলির জিম্মায় রেখে দিল তার পোঁটলা-পুঁটলি, ট্রাঙ্ক।

যাও কই শেখের পো ? রজব আলি অবাক হয়ে শুধোয়।

মহকুমা শহরে।

পরশু আইলা। আইজই যে যাও ?

কাজ আছে মিয়াভাই। মাল আনতে যাই।

নতুন মাল বুঝি ?

হুঁ। একদম নতুন। দেখো নাই এ রকম জিনিস।

বাসে উঠে বিড়ি ধরাল শেখ আন্দু। বিকেলেই ফিরে আসতে পারবে আবার। কাজের মধ্যে তো মহকুমা হাসপাতালের ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করা। তারপর কাজ সারতে আর কতক্ষণ।

বাস চলল ধুলো উড়িয়ে। শেখ আন্দুর মন চলল পেছনের কবর খুঁড়ে খুঁড়ে। দু’বছর আগের কথা। জেলা শহরে রিকশা টানতো আন্দু। শরীরটা লম্বা ছিল অনেক। এখন না হয় দুঃখ-শোকে হাড় জিরজিরে অবস্থা। রিকশা টানত কলিম মিয়ার। মহাজন লোক ভালো ছিল না তেমন। তা নাই-বা ছিল লোক ভালো। আসত যেত না কিছু শেখ আন্দুর। মহাজনের কিশোরী মেয়ে মন কেড়ে নিয়েছিল সেই জোয়ান বয়সে। এখনও বয়সের দিক দিয়ে জোয়ানই সে। শুধু মনের দিক দিয়ে বুড়িয়ে গেছে অনেক। কাজে-অকাজে মহাজনের বাড়ি হাজির হতো সে তখন। সময় বেছে বেছে যখন ঘরে থাকত না মহাজন তখনই যেত শেখ আন্দু। লাজুক পায়ে সামনে এসে দাঁড়াতো মরিয়ম। ডুরে শাড়ি, এলোচুল, হাতে কাচের রঙিন চুড়ি। চোখের পলক পড়ত না তার। কী যে সব কথা হতো মাথামুণ্ডু কিছু থাকত না তাদের। ফাঁকিটুকু অজানা ছিল না দু’জনের। থেকে থেকে তাই ফিক করে হাসি। হাত বাড়াতেই ছুটে পালাতো মরিয়ম। মনের সুখে রিকশা চালাতো শেখ আন্দু শহরময়। গলা খুলে গান গাইতো অবসরে ‘পরান বন্ধুরে’।

পয়সা দেখি মিয়া। কন্ডাক্টরের কথায় চমক ভাঙল তার।

কয় পয়সা যেন ? ভুলে গিয়ে শুধোয় সে।

আট আনা মিয়া, নতুন মনে হয় এই পথে ?

পয়সা দিয়ে মাথা নাড়ে শেখ আন্দু। উহু নতুন আর কই। ভুইলা যাই মাঝে মাঝে।

একদিন দুপুর বেলা লুকিয়ে মহাজনের বাড়ি এসে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে সে। বাঘের মতো লাফ দিয়ে সামনে এলো মহাজন।

হারামজাদা। পিরিতি করণের জায়গা পাস না আর। মাইরা হাড্ডি গুঁড়া করুম কইয়া দিলাম। দূর হ, দূর হ সামনে থিকা।

হকচকিয়ে যায় শেখ আন্দু। তারপর সামাল দিয়ে বলে, ব্যাপারডা কী মহাজন ? আমার তো কিছু মালুম অয় না।

মালুম হয় না। ভেংচি কাটে মহাজন। হাড্ডি গুঁড়া কইরা দিলে মালুম হইব।

কী যে কন মহাজন। আপনার মেজাজটা আজ ভালো নাই। যাই। পরে আসুম, কী কন ?

পরে আসন লাগবো না আর। আমার রিকশা ভাড়া দিমু না তোরে। হারামজাদার শখ দেখো। খাইবার ভাত জোটে না, পিরিত করে বেহুঁশ হইয়া।

কি মিয়া নামবা, না গাড়িতেই দিনডা কাটাবার মতলব? কন্ডাক্টরের গলা। আরে তাই তো। কখন শহরে পৌঁছে গেছে হুঁশই নেই তার। ব্যস্ত হয়ে নামে শেখ আন্দু গাড়ি থেকে। সেই বাসে করেই ফেরা। তখন সবে সূর্য ঢলে পড়েছে। ছায়াগুলো লম্বা হয়ে আঁকিবুকি কাটে মাঠে। বাসের দুলুনিতে মুশকিলে পড়ে শেখ আন্দু। হাতের বয়ামটা কিছুতেই ঠিকমতো রাখা যায় না। শেষটা নেমেই পড়ল বাস থেকে। বাকি পথ হেঁটেই যাবে না হয়। সন্ধ্যে নামতে ঢের দেরি এখনও।

মহাজন তো দিল নোটিশ ঝেড়ে। তা রিকশা-মহাজনী কি একা কলিম মিয়ারই ? ভাত ছড়ালে কাকের অভাব কি? রিকশা ভাড়া পাওয়া গেল দুলাই মহাজনের কাছে। কলিম মিয়ার চোখের সামনে দিয়াই রিকশা চালায় শেখ আন্দু। সময় বুঝে টুকটুক পা ফেলে হাজির হয় মরিয়মের কাছে। এই করে করে কাটল বছরখানেক। বিনা মেঘে বাজ পড়ার মতো শুনল একদিন, কলিম মহাজন নাকি বিয়ে দিচ্ছে মরিয়মের। জামাই দোকান করে চকবাজারে। শোনা অবধি শান্তি নেই মনে। এর দু’দিন পর শহর ছেড়ে পালাল শেখ আন্দু। সঙ্গে মরিয়ম। চলে এল মহকুমা শহরে। জোয়ান বয়সের গরম রক্ত। শরীরে তাকত, মনে ফুর্তি। কাজ জুটতে কতক্ষণ ? বছর না ঘুরতেই বাজারের সামনে পান-বিড়ির দোকান দিয়ে গুছিয়ে নিল শেখ আন্দু। মরিয়মের তখন ছেলেপুলে হবে।

আরে শেখের পো হেঁটেই যাও যে ? রিকশা দিয়া যেতে যেতে শুধোয় হাটের চেনা মানুষ।

অসুবিধা আছে মিয়া ভাই।

তাই কও।

ছেলেপুলে হবে মরিয়মের। ছেঁড়া শাড়ি জোড়া দিয়ে কাঁথা সেলাই করে বসে বসে।

দোকানে বসে টাকা গোনে আন্দু। কত টাকা জমলো ছেলের জন্য। বাজি ধরে বউয়ের সঙ্গে। বউ বলে মেয়ে, আন্দু বলে ছেলে হবে।

বাজিতে হারবা তুমি। বউ হেসে বলে।

দেখুম কেডা হারব। জবাব দেয় আন্দু।

বাজিতে হারজিত হলো না কারও, মরিয়ম মারা গেল হাসপাতালে। সে কি কষ্ট পেয়ে মরা। ছেলে তো নয় যেন রাক্ষস ধরেছিল পেটে। কিন্তু মরিয়মের রক্তহীন সাদা কাগজের মতো মুখটার দিকে তাকিয়ে মরা ছেলেকেই দেখবার জন্য অদম্য সাধ হয়েছিল আন্দুর। ডাক্তার প্রথমটা ইতস্তত করেছিল। কেন যে করেছিল না দেখার আগে বুঝতে পারেনি আন্দু।

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল সে গোলাকার ছোট্ট সেই মাংসপিণ্ডের দিকে। কি বীভৎস, ভয়ঙ্কর। এটা কি মানুষের বাচ্চা না অদ্ভুত কোনো জানোয়ারের! এটাকেই দশ মাস অসীম ধৈর্যে পেটে জাগা দিয়েছিল মরিয়ম ? এরই জন্ম দিতে গিয়ে প্রাণ হারাল বেচারি ?

ডাক্তার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কী বুঝলেন কে জানে। কাছে এসে বললেন, তোমার কপাল বড় খারাপ। যাক, দুঃখ করে কী আর হবে। আর হ্যাঁ, এটা তোমার নিয়ে কোনো লাভই নেই। আমরা রেখে দেবো হাসপাতালে বয়ামে করে। অদ্ভুত কেস কিনা। শুনে হু হা কিছু বলেনি আন্দু। বেরিয়ে এসে অনেকক্ষণ ভেবেছে চোখে পানি নেই কোনো।

আইলা নাকি শেখের পো ? হ্যাজাক বাতি জ্বালাতে জ্বালাতে বলে রজব আলি।

হ, মিয়া। দেরি হইয়া গেল। হাঁটা দিলাম কিনা।

জবর জওয়ান দেখি। রজব আলি হাসে।

পরদিন লোকে লোকারণ্য শেখ আন্দুর ‘আজব দুনিয়া’ ছাপরা ঘরের সামনে। ঢোল পিটাতে হচ্ছে না আর।

লোকের মুখে মুখেই ফিরছে ‘আজব চিজের কথা’। বানের জলের মতো ভেঙে পড়ছে লোক। সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে শেখ আন্দু। আর পয়সা ? দু’আনা থেকে চার আনা সেলামি এখন। তাই দিয়েই ঢুকছে লোক। সাপের খোলস, ব্যাঙের চোখ আর হাঙ্গরের দাঁতের দিকে নজর নেই কারও। ওসব তো দেখা। হুমড়ি খেয়ে প্রায় পড়ছে সবাই বয়ামে রাখা আজব চিজটির ওপর। কাল বিকেলে মহকুমা শহরে যে মাল আনতে গিয়েছিল শেখ আন্দু। বয়ামে তেলের ভেতর গুটিসুঁটি বসে থেকে সেই আজব চিজ লোক টেনে আনছে দলে দলে।

আই বাপ। কী জন্তু গো। মানুষের ছাও ? বলো কি ? অ্যা; দুইটা মাথা এক ধড়ে, দেখছো আলামতটা। আরে হাতও দেখো তিনডা। কিন্তুক চোখ একডা কেন ? আর একডা কই ? ঠিক মাইনসের মতো লাগে।

ঠিক মানে কী ? মানুষের পেটে হইছে মানুষের মতন লাগব না তো বকরির মতন লাগব ? মুখ খিস্তি করে ওঠে শেখ আন্দু। খালি খালিই মেজাজ গরম হয়ে যায় তার।

সারাদিন ফুরসত পায় না শেখ আন্দু। সন্ধ্যে হলে তো হাট জমে যায় তার ছাপরায়। কাজ সামলাতে দুটো ছোকরা রেখেছে সে। তবু দম ফেলার ফুরসত নেই তার।

ম্যাজিক কোম্পানির রহিম বক্স দেখে দূর থেকে। আর মাথা চুলকায়। বেচারার বিক্রি কমে গিয়েছে। এমন আজব চিজ থুয়ে কে যাবে সঙের নাচ দেখতে ?

এক রাতে হামদরদি করে চা খাওয়ায় শেখ আন্দু রহিম বক্সকে। মাটির ভঁাঁড়ে চা, শালের পাতায় কচুরি-শিঙাড়া। খেতে খেতেই বলে ওঠে রহিম বক্স, শেখের পো। সত্যি কইরা কও তো। আজব চিজটা আসল না নকল।

তার মানে ? বুঝতে না পেরে বলে আন্দু।

হে হে। মানে ওইটা মাটি কিবা রাবারের খেলনা জিনিস কি না জিগাই।

রাগে ফুঁসে ওঠে আন্দু। ছুড়ে ফেলে চায়ের ভাঁড়। আস্তিন গুটিয়ে বিশ্রী একটা গালাগাল দেয় রহিম বক্সকে। সেও উঠে দাঁড়ায় হাত গুটিয়ে। বলে, শেখের পো। আমার কাছে জারিজুরি চলব না। করতে আছ জোচ্চুরি। তার উপরে সিনাজুরি কেন শুনি ?

চোপ, হারামজাদা। খুন কইরা ফেলামু। সাবধানে কথা কইস।

কার্বাইডের ছাইরঙা আলো। ধূসর চাঁদনি রাতের মতো জেগে আছে সেই কখন থেকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওরা। শেখ আন্দু আর রহিম বক্স। মানুষ তো নয় যেন বুনো জানোয়ার। বনবিড়ালের সবুজ চোখের মতো জ্বলছে মণি দুটো হিংস্র হয়ে। কার্বাইডের ছাইরঙা আলোতেও স্পষ্ট করে চোখে পড়ে।

আবার পরদিন সকাল থেকে জমে উঠেছে শেখ আন্দুর ‘আজব দুনিয়া।’ লোক ঢুকছে পিঁপড়ের সারির মতো। শুধুই কি লোক ? কথার খই ফুটছে চারদিকে। শেখ আন্দুর নিঃশ্বাস ফেলার সময় পর্যন্ত নেই। এটা-সেটা কত কিছুর উত্তর দিতে হচ্ছে তাকে। ছোকরা দুটো বাইরে লাইন ঠিক করে দিচ্ছে লোক ধরে ধরে। এমন সময় ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকল রহিম বক্স। উত্তেজিত মুখচোখ।

সে চিৎকার করে বলে, মিয়া ভাইরা ঠকবেন না। জোচ্চুরি, সব ফেরেববাজি। তার মানে ? ফুঁসে উঠল শেখ আন্দু।

তার দিকে না তাকিয়ে বলে চলল রহিম বক্স, ওই যে দেখেন বয়ামের ভিতর ‘আজব চিজ’। ওইটা আদতেই খাঁটি না।

একটা গুঞ্জন ধ্বনি উঠল শেখ আন্দুর ছাপরায়। কয় কি লোকডা ? সবাই চোখ ছুঁচালো করে তাকাল বয়াম যেখানে সেই আলমারিতে। আর তারপর শেখ আন্দুর দিকে। রাগে, উত্তেজনায় কাঁপছে শেখ আন্দু।

রহিম বক্স বলে চলে, যদি আসল জিনিসই হয় বয়াম খুইলা দেখাক শেখের পো। একটা কাঠি দিয়া তুইলা দেখি আমরা।

হ, হ। ভালো কথা কইছো তুমি। সবাই মাথা নাড়ে। কাঁপতে কাঁপতে কী একটা গাল দিচ্ছিল যেন শেখ আন্দু। সবার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। না, সবাই যখন রহিম বক্সের দিকে। দুপুরের রোদের মতো উত্তেজনা জমাট বাঁধা।

একটা ছোট লাঠি হাতে এগিয়ে এলো রহিম বক্স। তার চোখেমুখে একটা ক্রূর হাসি ঝলকাচ্ছে। এখনই শেখ আন্দুর বুজরকি ফাঁস করে দেবে সে। ফরমালিনের ভিতরে রাখা অদ্ভুত মৃত প্রাণীটি চেয়ে আছে অপলক। এক বছর আগে মহকুমা হাসপাতালে এমন নিশ্চল চোখে তাকিয়ে ছিল ওটা।

একটা মুহূর্ত শুধু। তারপরই হুঙ্কার দিয়ে বয়ামের সামনে এসে রুখে দাঁড়াল শেখ আন্দু। চকমকি ঠুকে কেউ যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তার চোখে। দু’হাতে জাপটে ধরে বয়ামটা নিয়ে দৌড়ে বাইরে এসে দাঁড়াল সে। সমস্ত দেহ কাঁপছে উত্তেজনায়। পেছনের হৈ-হল্লা, হাসি-ঠাট্টা কোনো কিছুই পৌঁছাল না তার কাছে। তখন উঁচু আকাশ থেকে ঝাঁপ দিয়েছে একটা চিল তীক্ষèধার ঠোঁট বাঁকিয়ে। যে মুরগিটা নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ছোট্ট বাচ্চাগুলোর চারদিকে, সে এক লহমায় বাচ্চাগুলো আড়াল করে দাঁড়াল নিজের ডানা দিয়ে।

প্রকাশকাল : ১৯৬০

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares