আবার পড়ি : গল্প―হাসনাত আবদুল হাই : স্টিল লাইফ : হাসনাত আবদুল হাই

পারটেক্সের টিক ভিনিয়ার দেওয়া ঘরের দরজা আধখোলা, সোনালি রঙের হাতল, জায়গায় জায়গায় রং চটা। হাতলের মাপে দরজার কাঠের ওপর মোটা দাগের কালো চিহ্ন। মাঝখানে ভিনিয়ারের টেক্সচারে ওপর থেকে নিচে রেখায় রেখায় একটা ফর্ম জেগে উঠেছে। অবগুণ্ঠিতা এক নারী যেন ঝুঁকে আছে সামনে। এই ঝুঁকে থাকার একাধিক অর্থ হতে পারে। হয়তো হোঁচট খেয়েছে সে। হয়তো বা মুখ নিচু করে হঠাৎ কিছু পরিষ্কার করে দেখছে। অথবা নিছক সন্তর্পণে হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গি। রেখাগুলো যে দেখবে ইচ্ছামতো কল্পনা করে নিতে পারে। খোলা জানালা দিয়ে দমকা বাতাস এলো। মাটিতে ছড়িয়ে যেতেই একটা ছেঁড়া কাগজের টুকরোয় কিছু সম্পূর্ণ, কিছু অসম্পূর্ণ বাক্য ফুটে উঠল। লেখাটা পড়তে এ রকম :

                             আমার…………..

                              ……….এ সিদ্ধান্ত না।

                             … আপস যে করতে চাইনি তা ….

                             নিজের পছন্দের নয় ….. কিছু

                             কিন্তু যতই আত্মসমর্পণ …..

                             … উপেক্ষা বেড়ে …..। তুমি …

                             … কেন ….. থাকব। সংসা….

                             …. ব্যবস্থা একটা না একটা ….

                             …. জানি না কিন্তু ….

ঘরের ভেতর দুটো বিছানা, শিয়রের কাছে বেডসাইড টেবিল দু’দিকে। একটা খাটের বিছানা ব্যবহৃত, চাদর এলোমেলো, বালিশ ভাঁজ হয়ে পড়ে আছে মাঝখানে, গায়ে দেওয়ার রঙিন নকশি চাদর অর্ধেক মাটিতে লুটিয়ে আছে। এই খাটের বেডসাইড টেবিলের অ্যাসট্রেতে অনেকগুলো সিগারেটের ভাঙা টুকরো। কোনোটা অর্ধেক হয়েছে, কোনোটা সিকিভাগ, কোনোটা পুরোপুরি পুড়ে ফিল্টারে এসে শেষ হয়েছে। ঘরে বাতাস এলে অ্যাসট্রে থেকে ছাই উড়ছে। পোড়া সিগারেটের ভারী আর কটু গন্ধ। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল থেকে বোঁটকা গন্ধ এসে মিশে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে যে বাতাস আসে তার সঙ্গে মিশে থাকে বাতাবি লেবুর ফুলের মৃদু মিষ্টি গন্ধ। সেই গন্ধের রেশ বেশিক্ষণ থাকে না, ঘরের ভেতরকার এঁদো আর বোঁটকা গন্ধই টিকে থাকে শেষ পর্যন্ত।

বাতাসে টুকরো করে ছেঁড়া কাগজের একটি খণ্ড উল্টে যায়। সেখানে কয়েকটি অসম্পূর্ণ শব্দ চোখে পড়ে। পড়লে এ রকম দেখায় :

                                           নির..

                                           হবে।

                             ভবিষ্যৎ …. না ….

                              খুঁজে পাবে ….

                              যে আমাকে …..

                               সে ফিরে ….

                                মুখাপেক্ষী।

দ্বিতীয় বিছানাটা বিন্যস্ত। ব্যবহৃত নয়, পরিপাটি করে সাজানো। নীল রঙের পুরু বেড কভারে ঢাকা, শিয়রে বালিশের অর্ধেক দেখা যায়। এই বিছানার বেডসাইড টেবিলে একটি গ্লাস, পানি নেই। একটা বই পড়তে পড়তে কেউ যেন উল্টে রেখেছে। পাথরের তৈরি একটা পাখি, উড়ে যাওয়ার ভঙ্গি তার ডানায়।

ঘরের ভেতর একটা চড়ুই ঢুকে র্ফর্ফ শব্দে উড়ছে, ডাকছে কিচির মিচির করে। আকাশে একটা প্লেন উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটু পর দ্বিতীয় চড়ুই এলো, অন্যটির মতো অশান্ত হয়ে উড়ল ঘরময়, শব্দ করল কিচির মিচির করে। তারপর খোলা জানালা দিয়ে উড়ে গেল দুজনে একসঙ্গে। শব্দ হল ফুরুৎ, ফুরুৎ।

আর এক টুকরো কাগজের অক্ষরগুলো এখন জানালা গলিয়ে আসা আলোতে স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে। কোনো বাক্য সম্পূর্ণ নয়। শব্দও প্রায়ই খণ্ডিত। যা পড়া যায় :

                                           …. সে কথা তুমি …

                                              …. করতে ….

                                              …. তেই যেন …

                                             ….ধরেই নিয়েছ ….

                                             … সংসারে কেউই …

                                           …. চয়ে যায়। আমার ও …

ঘরের একপাশে দুটি ওয়ার্ডরোব। একটি খোলা, ভেতরে পুরনো খবরের কাগজ, হলুদ রং ধরেছে। এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে নিচে। কতগুলো কাঠের হ্যাঙ্গার ঝুলছে, সবগুলো শূন্য। একটা ছেঁড়া রুমাল ওয়ার্ডরোবের সামনে মেঝেতে পড়ে আছে। কাছে একটা পুরনো ময়লা শাড়ির নিচে সাদা ব্রার একাংশ দেখা যাচ্ছে। শাড়ি এবং ব্রার স্থানে স্থানে পোকা খাওয়ায় মেসেতার মতো দাগ হয়েছে। বাতাসে উল্টে যেতেই আর একটা টুকরো কাগজের অসম্পূর্ণ কথা এখন পড়া যাচ্ছে :

                                           এ বাড়ি …..

                             … থেকেই বুঝতে পেরেছি। দৈনন্দিনের …

                             … সংকোচ ধরে রেখেছিল। আ …

                             .. মি মুক্ত হতে পেরেছি। বন্ধন কিছু …

                             শেষ পর্যন্ত তা কেবলি শৃঙ্খল …                              

দ্বিতীয় ওয়ার্ডরোবের একটা পার্টিশন খোলা। অনেকগুলো সুট ঝুলছে। কয়েকটা সুট ড্রাই ক্লিনার্সের পলিথিন কভারের ভেতর, বাকিগুলো কোনো আবরণ ছাড়াই। একপাশে টাই র‌্যাকে নানা রঙের, ডিজাইনের টাই ঝুলছে। কয়েকটা টাই উল্টে আছে, কিছু নাম পড়া যাচ্ছে : অস্টিন রিড, ডানহিল, হার্মিস, ভ্যালেন্টিনো। বাতাস এলে টাইগুলো মৃদু নড়ছে। ওয়ার্ডরোবের কাছে রংচটা কাঠের আর কাপড়ের ভেতর ন্যাপথলিনের ঝাঁঝালো গন্ধ। একটা তেলাপোকা বেরিয়ে এসে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে মেঝে দিয়ে। জানালা গলিয়ে পড়া আলো এসে তার ব্রাউন রঙের পাখা প্লাস্টিকের মতো চকচক উজ্জ্বল করে তুলেছে। পোকাটি মেঝেতে পড়ে থাকা ছেঁড়া কাগজগুলো দেখল। একটা উল্টে গেল তার শুঁড়ে লেগে। সেখানে লেখা :

                                           … যেই আসুক

                                           … ব্যবহার করো।

                                             … না হলেও

                                           … মনোযোগ তাকে …

                                             তবু একটা …

চড়ুই দুটো ঘরে ঢুকল, একটা খোলা জানালা দিয়ে, অন্যটা আধ খোলা দরজা দিয়ে। দুটোর মুখেই খড়কুটো। র্ফর্ফ শব্দ করে ঘরের ভেতর কিছুক্ষণ উড়ল দুজন। স্থির হয়ে থাকা ইলেকট্রিক ফ্যানের ওপর বসল একটা, অন্যটা ওয়ার্ডরোবের ওপর। বসতেই ধুলো উড়ল ওয়ার্ডরোবের ওপর থেকে। পাখা ঝেড়ে নিল সেখানে বসে থাকা চড়ুইটা। ঘরের দেয়ালে জানালার নিচের দিকে একটা এয়ারকুলার। কার্ডবোর্ড দিয়ে ফাঁকা জায়গাগুলো ঢাকা। বৃষ্টিতে ভিজে কার্ডবোর্ডের ঝুলঝুলে অবস্থা। সেই দেয়ালের ওপর দিকে দুই কোণে দুটো ভেন্টিলেটর। প্রথমটা হার্ডবোর্ড দিয়ে পুরোপুরি ঢাকা। দ্বিতীয়টার হার্ডবোর্ড নিচে ঝুলে পড়েছে, একটা কোনা ছিঁড়ে গিয়েছে। ভেন্টিলেটরের শূন্য লম্বা দাগগুলো ¯পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাইরের আলো বাঁকা হয়ে গলিয়ে পড়েছে ভেন্টিলেটরের কাঠামোর ভেতর দিয়ে। ইলেকট্রিক ফ্যানে বসে থাকা চড়ুইটা উড়ে গিয়ে শরীর আটকে রাখল ভেন্টিলেটরের শূন্য স্থানের ভেতর, তার দুই পা এখন দেখা যাচ্ছে না। মুখের খড়কুটো ভেন্টিলেটরের ফাঁকের ভেতর রেখে সে ডেকে উঠল উল্লাসে। ইলেকট্রিক ফ্যান থেকে চড়ুইটা উড়ে যেতেই ব্লেডগুলো নড়ে উঠল। ফ্যানের পাখা অর্ধেক পাক খেল শূন্যে। বাইরে গমগম শব্দ তুলে চলে গেল ট্রাক কিংবা বাস। ভূমিকম্পের মতো ঘরটা মৃদু কেঁপে উঠল কিছুক্ষণ। মেঝেতে একটা কাগজের টকুরোতে লেখা :

                                           … বিষ্যতে কি পাব …

                                           সে বিষয়ে নিশ্চিত। দি …

                             … নিজেকে বিলীন করে দিয়েছে একটু এ …

                                           … র আসবে। আমি একজন …

                             করুণার প্রার্থী কেউ নই, সে …

                             … স্বাধীনতার সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার …

ওয়ার্ডরোবে বসে থাকা দ্বিতীয় চড়ুইটা দেয়ালে ভেন্টিলেটরে বসে থাকা চড়ুইকে দেখল। তারপর লেজ দুলিয়ে পাখা মেলে পৌঁছে গেল তার কাছে। তার মতোই দুপা দিয়ে আঁকড়ে ধরল ভেন্টিলেটরের একটা ফাঁক। তারপর মুখের খড়কুটো সেই ফাঁকের ভেতর রেখে ডেকে উঠল উল্লাসে। দুজনে খুব চঞ্চল হয়ে উড়ল কিছুক্ষণ ঘরের ভেতর, এ কোণ থেকে সে কোণ। বাইরে ফেরিঅলা ডেকে যাচ্ছে। গাড়ির হর্ন শোনা গেল। হু উ উ স করে শব্দ হল পর পর কয়েকটা গাড়ি চলে যাওয়ার। আধখোলা দরজা দিয়ে চড়ুই দুটো দ্রুত উড়ে চলে গেল বাইরে।

ঘরের ভেতর এককোণে একটা চেস্ট অব ড্রয়ার। তার ওপর ফ্রেমে বাঁধা ছবিতে একটি পুরুষ ও একটি মেয়ে পাশাপাশি, আবক্ষ ছবিতে পুরুষটির মাথা মেয়েটির মাথার ওপরে। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা, চোখে লাজুক দৃষ্টি, গলায় ভারী গহনা। ঠোঁটের উজ্জ্বল রং মুখের শ্যামলা রংকে একটা হালকা আভা দিয়েছে। নাকে ছোটো নাকফুল, একটা কানের অলঙ্কার দেখা যাচ্ছে, অন্যটি শাড়ির আঁচলে ঢাকা। পুরুষটি নীল রং সুট পরেছে, সঙ্গে লাল টকটকে টাই। ব্যাক ব্রাশ করা চুল চকচক করছে। পাতলা ঠোঁটে বেশ একটা ক্যাজুয়াল হালকা হাসি।

চড়ুই দুটো আবার ঘরে ঢুকল, ফরফরিয়ে উড়ে এবারে সোজা গিয়ে বসল খোলা ভেন্টিলেটরে। নতুন তৈরি করছে যে বাসা মুখের খড়কুটো সেখানে রেখে উল্লাসে ডেকে উঠল দুজন। তারপর উড়ে এসে বসল ইলেকট্রিক ফ্যানের ওপর। আধ চক্কর দিল ফ্যানটা তাদের ¯পর্শে। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হল। ঝুর ঝুর করে ধুলো ঝরে পড়ল ওপর থেকে। বাইরে কাকের তারস্বর। আর একটা প্লেন যাচ্ছে ওপর দিয়ে। কাগজের টুকরোতে কথা কটির ভগ্নাংশ :

                             … মি নয়, পৃথক একজন হিসেবে

                             … ক আর একজনের কাছে সব সময়

                             … মনোযোগ চায়। সেই মনো …

চড়ুই দুটো এবার উড়ে গেল খোলা জানালা দিয়ে। দমকা বাতাস এলো ভেতরে। বাতাবি লেবুর ফুলের ঝাঁঝাঁ কড়া গন্ধ জেগে থাকল কিছুক্ষণ। ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো গড়াগড়ি দিল মেঝেতে। তার একটায় লেখা :

                             কিছুটা বা ….

                             থেকে আ …

                             যা ছিল …

                             ভাঙার জন্য …

                             যাচ্ছি …

দেয়ালের কোণে ঘাপটি মেরে আছে টিকটিকি অদূরে একটা সাদা পোকা বাল্বের পাশে স্থির হয়ে। খুব মনোযোগ আর সতর্ক হয়ে অনেকক্ষণ দেখে পোকাটার দিকে পায়ে পায়ে এগুলো টিকটিকিটা। সামনের দেয়াল থেকে আর একটা টিকটিকি ডেকে উঠল তখন। মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে এ পাশের টিকটিকিটা মাথা তুলে দেখল, যেন বিরক্ত ভাব। তারপর কিছুক্ষণ মাথা নিচু রেখে আগের ভঙ্গিতে এগুতে থাকল সন্তর্পণে। সাদা পোকাটা স্থির হয়ে বসে আছে, যেন দেয়ালেরই একটা অংশ হয়ে গিয়েছে। খুব কাছে গিয়ে থেমে গেল টিকটিকিটা। তার নাক মুখ ফুলে উঠেছে, দেখা যাচ্ছে পেটের ভেতর নীল নাড়িভুঁড়ি নড়ছে চঞ্চল হয়ে। চোখ দুটোতে জমা হয়েছে রক্ত। হঠাৎ লাফ দিল সামনে, কিন্তু পোকাটা আগেই টের পেয়ে উড়ে গেল। শিকারি টিকটিকি চুপচাপ বসে বসে দেখল পোকাটা কোথায় বসল গিয়ে। তারপর কিছুক্ষণ স্থির থেকে টিকটিকিটা এগুতে থাকল। সামনের দেয়ালের টিকটিকিটা ডেকে উঠল এই সময়। এবার আর এ পাশের শিকারি টিকটিকি থমকে দাঁড়াল না, এগুতে থাকল সন্তর্পণে পায়ে পায়ে, দেয়ালের সঙ্গে শরীর মিশিয়ে।

ড্রেসিং টেবিলটা ওয়ার্ডরোব যে দেয়ালে তার উল্টো দিকে। কাঠের পেছনের মিনা করা রং উঠে যাওয়ায় মাঝে মাঝে আয়নায় কালো দাগ ফুটে উঠেছে। টেবিলের ওপর শূন্য কয়েকটা পারফিউমের শিশি। একটা শেষ হয়ে যাওয়া লিপস্টিক উল্টে পড়ে আছে। ভাঙা কালো কাঁচের চুড়ির অংশ ছড়ানো। কয়েকটা চুল বাঁধার ক্লিপ এক পাশে। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারগুলো সামনে টেনে রাখা। ভেতরে পুরনো হলুদ কাগজ ছাড়া আর কিছু নেই। সামনে বসার টুলটা উল্টে আছে। এই জায়গায় হালকা মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে; যেন খোলা শিশি থেকে বেরুচ্ছে এখনও। খুব কাছে এলে টের পাওয়া যায়।

দরজা দিয়ে একটা চড়ুই এল, মুখে খড়কুটো। সোজা গিয়ে বসল দেয়ালের ওপরে ভেন্টিলেটরে। ব্যস্ত হয়ে গুছিয়ে রাখল ঠোঁটের খড়কুটো। ভেন্টিলেটরের ফাঁকা জায়গাটা এখন বেশ ভরে আসছে। সাদা রঙের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে গৈরিক রঙের খড়কুটো। চড়ুইটা যেমন ব্যস্ত হয়ে এসেছিল তেমনভাবেই উড়ে গেল। আরও একটা ছেঁড়া কাগজের টুকরোতে অসম্পূর্ণ লেখা :

                                           … নিজেই জানি না

                                           … সেটা অভ্যাস

                                           … সব কাগজে

তারপর আরও একটা ছেঁড়া কাগজে পড়া যায় :

                                           সুমন;

                                           আমি চলে …

                                           কিন্তু আমাকে কিছুদিন থেকেই …

                                           কিছুই … হয় না

আবার একটা চড়ুই এলো, এত পর পর যে এটা প্রথম চড়ুই হতেই পারে না। এরও মুখে খড়কুটো। এ সব জোগাড় করে মুখে তুলতেও সময় নেয়। এটি দ্বিতীয় চড়ুই, পুরুষ না মেয়ে বোঝা যাচ্ছে না। ওরা একইভাবে ওড়ে, একই শব্দে চেঁচামেচি করে। তাদের শরীর আর গায়ের রং দেখে পৃথক ভাবার উপায় নেই। চড়ুইটি ব্যস্ত হয়ে দেয়ালের ভেন্টিলেটরের ভেতর মুখের খড়কুটো রেখে একটা চক্কর দিল ঘরের ভেতর, তারপর উড়ে গেল জানালার গ্রিলের ভেতর দিয়ে। বাইরে বাতাবি লেবুর ডালপালার সবুজ আর সজনে গাছের ডালে হলুদ ফুল রোদে উজ্জ্বল। গাছপালার পাতার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে আকাশের ছেঁড়া-খোঁড়া নীল রং। কয়েকটা কাক তারস্বরে ডাকছে। কুকুর চিৎকার করছে থেকে থেকে, যেন তার রাগ পড়ছে না কিছুতেই।

পোকাটাকে খেয়ে স্থির হয়ে বসে থাকল শিকারি টিকটিকি। তার পেটটা এখন ফুলে উঠেছে। লালচে জিভ বার করে কয়েকবার মুখের দুদিকে ঘুরিয়ে নিল। তারপর মাথা তুলে দেখল আগের দেয়ালে বসে থাকা অপেক্ষাকৃত কৃশকায় টিকটিকিটাকে। হঠাৎ দৌড়ে এগিয়ে গেল অনেক দূর। ওপাশের টিকটিকিটা তাকে দেখে পালাবার জন্য গেল সামনে। শিকারি টিকটিকি যেন আরও জেদের সঙ্গে অথবা ক্রুদ্ধ হয়ে আবার দৌড়াল এঁকেবেঁকে। এইভাবে কখনও ওপরে, কখনও নিচে, ডানে বাঁয়ে দুই টিকটিকির দৌড় প্রতিযোগিতা চলতে থাকল। সামনের টিকটিকি এক সময়ে ক্লান্ত হয়ে এলো, তার দৌড়ে তীব্র গতি আর দূরপাল্লার লক্ষ্য থাকল না। একটু এগিয়ে গিয়ে থেমে পড়ে সে। দুজনের দূরত্ব ক্রমেই কমে আসে। এক সময়ে পেছনের টিকটিকি ধরে ফেলল সামনের টিকটিকিকে। খুব নির্দয়ভাবে উঠে গেল তার শরীরের ওপর। নিচের টিকটিকি তখন কেবল তার ছোটো লেজটা নাড়তে পারছে। ওপর থেকে কামড়ে ধরেছে শিকারি টিকটিকি। তার গলা ফুলে উঠেছে, দুটো চোখে রক্ত এসে জমেছে আবার। পেটটা ফুলে আছে, ভেতরে নীল নাড়িভুঁড়ি ¯পষ্ট দেখাচ্ছে। সাদা পোকাটাকে বাইরে থেকে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, পেটের ভেতর একেবারেই মিশে গিয়েছে।

ঘরের লাগোয়া বাথরুমের দরজা বন্ধ। ক্যালেন্ডারের ওপরে বিদেশিনীর মদির কটাক্ষ। নিচে ছোটো অক্ষরে নম্বরগুলো দূর থেকে পড়া যায় না, কেবল মাসটার নাম দেখা যায়। জুলাই।

এবারে দুজনে একসঙ্গে ঢোকে, মুখে বড়ো বড়ো খড়কুটো। ক্রমেই যেন সাহসী হয়ে উঠছে তারা, আত্মবিশ^াস বাড়ছে। জানালার বাইরের আলো হঠাৎ নিভে এলো, কেমন যেন অন্ধকার। মেঘ ডেকে উঠল কয়েকবার। চড়ুই দুটো একে অন্যের দিকে তাকাল। তারপর ত্বরিতে বেরিয়ে গেল বাইরে।

মেঝেতে ছেঁড়া কাগজের টুকরোটায় লেখা :

                             জানো। ….

                             পেরেছি …।

                             তোমার ….

                             যাই করো―

                             … হয় না, …

পাশে খুব ছোটো আর এক টুকরো কাগজে লেখা  :

                             কিছুক্ষণের …

                              দিয়ো …

চড়ুই দুটো খুব দ্রুতগতিতে ঢুকে ব্যস্ত হয়ে মুখের খড়কুটো জড়ো করে রাখল ভেন্টিলেটরের ভেতর। তারপর সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেল জানালা দিয়ে বাইরে। বাতাবি লেবুর গাছের সবুজ এখন কালচে দেখাচ্ছে, শজনে গাছের ডালের হলুদ ফুল ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। আকাশ দেখা যাচ্ছে না কোথাও। জানালা দিয়ে জোর হাওয়া এলো, ডালপালা নড়ার শব্দ হচ্ছে। মেঘ ডেকে উঠল কয়েকবার। ঘরের ভেতর ছেঁড়া কাগজগুলো চঞ্চল হয়ে উঠেছে, উড়ে উড়ে জায়গা বদলাচ্ছে। উল্টে পাল্টে যাচ্ছে।

একটাতে লেখা :

                             …. যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি নিজেই …

                                             … যতে হবে …

চড়ুই দুটো ঘরে ঢুকল, ভিজে গিয়েছে। মুখে খড়কুটো। ধীরে সুস্থে উড়ে গেল ভেন্টিলেটরের কাছে, মুখের খড়কুটো নামিয়ে রাখল শূন্য খাদের ভেতর। এখন ফাঁকা জায়গাটা ভরে এসেছে। চড়ুই দুটো ঠোঁট দিয়ে খোঁচাখুঁচি করে খড়কুটোগুলোকে সাজিয়ে নিচ্ছে, দুপা দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে নিচের শূন্য খাঁজ। গলা উঁচিয়ে উপরের খাঁজ ভরিয়ে দিচ্ছে ঠোঁটে ধরে রাখা খড়কুটো দিয়ে।

দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল খোলা জানালার কপাট। ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল ছেঁড়া সাদা কাগজের টুকরো, সেখানে শুধু একটা শব্দ লেখা ‘এষা’। অস্পষ্ট আলোয় বেডসাইড টেবিলের বইটার নাম পড়া যাচ্ছে, ‘ডলস হাউস’।

বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। ঝমঝম শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটু পর ঘরের ভেতর ভেসে এল ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। আবছা আলোয় সব কিছু অস্পষ্ট এখন। ফ্রেমে বাঁধা ছবিটার পাশে এসে বসল চড়ুই দুটো। সামনে তাকিয়ে দেখল কিছুক্ষণ। ভেজা পাখা ঝেড়ে নিল দুজনে একসঙ্গে। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকল পাশাপাশি। তারপর মহা উল্লাসে একে অন্যের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল, ঠোঁট দিয়ে পাখার পশমে বিলি কাটল। কিচিরমিচির শব্দ তুলে ঘরময় উড়ে আবার বসল পাশাপাশি। তারপর ঠোঁট দিয়ে একে অন্যকে ¯পর্শ করল; দুজন খুব ঘন হয়ে এলো, মিশে গেল একে অন্যের শরীরের ভেতর। তারপর শব্দ করে আবার উড়ে বেড়াল ঘরের ভেতর কিছুক্ষণ। তাদের খুব উত্তেজিত আর উল্লসিত দেখাচ্ছে এখন। দুজনে আবার এসে বসল পাশাপাশি। কিছুক্ষণ একেবারে চুপ, শুধু তাদের পাখার পশম উড়ছে, শরীর কাঁপছে। তারপর দুজন মুখ তুলে ঘরটার চারধার দেখে উড়বার জন্য পাখা মেলে দিল। তাদের মুখ থেকে আনন্দের ডাক ঘরের দেয়ালে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এখন। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। চড়ুই দুটো উল্লাসে ঘরময় উড়ছে, একসঙ্গে বসছে, মিলিত হচ্ছে, তারপর উল্লসিত হয়ে আবার উড়ছে।

প্রকাশকাল ১৯৯৯

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares